সহজ কথায় ধর্মঃ


সহজ কথায় ধর্মঃ
Image result for dharma
 ধর্মঃ
ধর্ম শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ধৃ(ধরে রাখা, বহন করা, রক্ষণ করা) ধাতু থেকে। অর্থাৎ, যা কোন কিছুকে ধরে রাখে বা রক্ষা করে অথবা যা ছাড়া কোন কিছুরই অস্তিত্ব অসম্ভব তাইই হল ধর্ম। বেদ ও অন্যান্য গ্রন্থের ধর্মালোচনা থেকে ধর্মের যে ধারণা পাওয়া যায়, তা হল; ন্যায়, বিশেষ পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত, নৈতিক মূল্যবোধ, কর্তব্যনিষ্ঠতা, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায়, নীতির প্রতি অবিচল আস্থা ও ন্যায্যকর্ম সম্পাদন, অন্যের(মানুষ বা যেকোনো প্রাণীর) প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন করা, জনকল্যাণে সংবেদনশীল ও সহযোগী হওয়া, প্রাকৃতিক গুনাগুণ বা চরিত্র, দায়িত্ব, কর্তব্য, সংবিধান ইত্যাদি। সোজা কথায়, ধর্ম হল এমন একটি পদ্ধতি যা, মহাজাগতিক শৃঙ্খলাকে ধরে রাখে, মানুষের জীবনের সাথে প্রকৃতির ঐকতান সৃষ্টি করে ও এই ঐক্যকে ধারণ করে। অর্থাৎ, আমরা যখন ধর্ম পালন করি, তখন আমরা আসলে বিশ্বপ্রকৃতির নিজস্ব প্রাকৃতিক নিয়মের সাথেই সহাবস্থান করি।
অবস্থাভেদে বা পরিপ্রেক্ষিত অনুযায়ী ধর্মের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের পরিবর্তন ঘটে। আর এই বিশেষ কারণে, মাত্র এক লাইনে ধর্মের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা সম্ভব নয়। এই কারনেই এর (ধর্মের) অর্থের প্রায়োগিক ব্যাপকতা অনেক বিস্তৃত ও গভীর।
আসুন, আরেকটু বিস্তৃত আলোচনা করা যাক। প্রথমেই আসি ধর্মের মূল আভিধানিক অর্থ; অর্থাৎ যা দ্বারা কোন কিছুকে ধারণ করা বোঝায়। যেমন, জলের ধর্ম তারল্য, বায়ুর ধর্ম বায়বীয়, কঠিন যেকোনো পদার্থের ধর্ম তার কাঠিন্য। এখন জল যদি তার তারল্য হারায়, তখন তা আর জল থাকবে না, অন্য কোন পদার্থ; বরফ বা বাস্পে পরিণত হতে পারে। একইভাবে, কঠিন পদার্থ তার কাঠিন্য, বায়ু তার বায়বীয়তা হারালে তা তাদের স্বাভাবিক সত্ত্বা হারিয়ে অন্য কোন পদার্থে রূপান্তরিত হবে। তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি,
ধর্ম হল পদার্থের বা অন্য যেকোনো কিছুর এমন এক নিজস্ব গুণ, যা হারালে পদার্থ তার স্বাভাবিক অবস্থা হারায়, তার নিজস্বতা হারিয়ে হয় ধ্বংস প্রাপ্ত হয় নয়ত অন্য কোন কিছুতে পরিণত হয়, যা তার স্বাভাবিক, গুনগত অবস্থা নয়।
এরপর আসি ধর্মের অন্য অর্থ যেমন; নীতি (বেদাদি ধর্মগ্রন্থ সমুহে এটি ধর্মের আরেক রুপ)। মানুষ পশু প্রজাতি হলেও, তার উন্নত মনন, দূরদৃষ্টি, চিন্তাভাবনার গতিশীলতা ও সাবলীলতার কারণে সে অন্যান্য প্রানীদের মত স্বভাবজাত নয়, বরং সে তার স্বতপ্রবৃত্তির বাইরে ও চিন্তা করতে পারে এবং নিজ আদিম প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই দারুন ক্ষমতার জন্যই সে আর সব প্রানী থেকে আলাদা। একই কারণে যে বন্য প্রাণীর মত স্বভাবজাত মানসিকতা নিয়ে চলতে পারেনা, বরং তার সমস্ত নিজস্ব কার্যকারণের আদ্যোপান্ত সে জানতে চায় ও তার সমর্থন চায়। আর এই কার্যকারণের পক্ষে সমর্থন যোগাতে সে নীতি আশ্রয়ী হয়, জীবনে চলার পথে নীতি-অনীতি, সত্য-অসত্য, ন্যায়-অন্যায়, ঔচিত্য-অনোচিত্য প্রভৃতি যাচাই করে এবং এই যাচাইের সুবিধার্থে নৈতিক কর্মপন্থার খোঁজ করে। একজন ব্যাক্তি তাঁর জীবনের জন্য এমন কিছু নীতির খোঁজ করেন বা এমন নীতি নিয়ে চলেন, যা তাঁকে বৃহত্তর সামাজিক সম্পর্কের পর্যায়ে স্বচ্ছন্দ করে তোলে, সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় নীতির সাথে সামঞ্জস্য সৃষ্টি করে একটি অর্থপূর্ণ, স্বচ্ছন্দ ও নিরাপদ জীবনযাপনে সহায়তা করে এবং বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট ঘাত প্রতিঘাত এড়িয়ে চলতে সাহায্য করে, শুধু তাই নয়, বিশেষ প্রয়োজনীয় মুহূর্তে তাঁর কর্তব্যকর্ম স্থির করতে ও সাহায্য করে। এরকম নীতি যেকোনো ব্যাক্তি বা সমষ্টি বা সামাজিক চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য উপাদান। এই উপাদান না থাকলে বা নষ্ট হলে, ব্যাক্তি বা সমাজের কোন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই থাকেনা। অনেকটা চরিত্রহীন, হীনমন্য, বিবেকহীন, বোধহীন পরজীবী ক্লীবে পরিণত হয়। এই ধরনের ব্যাক্তি বা সমাজের ধ্বংসই একমাত্র নিয়তি। এক্ষেত্রে, নীতিই ব্যক্তি বা সমাজের ধর্ম হিসেবে আবির্ভূত। যা থাকলে স্বীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হওয়া যায় আর না থাকলে নিজ গুনাগুণ রহিত হয়ে অপরের মুখাপেক্ষী হতে হয় এবং স্বীয় অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়।
অর্থাৎ, আবারো ধর্মহীনতাই বিলুপ্তির কারণ।
এরপর, ধর্মের আরেকটি অর্থের কথা বলতে হয়, যা হল ন্যায়। যারা মহাভারত পড়েছেন, তাঁরা জানেন, কুরু পাণ্ডবের মধ্যেকার যুদ্ধটি সংগঠিত হবার মূল কারণ ছিল ন্যায়। পাশাখেলায় পরাজিত হবার শাস্তি হিসেবে পাণ্ডবদের ১২ বছর বনবাস ও ১ বছর অজ্ঞাত বাস করতে হয়। শর্ত ছিল, শাস্তিভোগের পর পাণ্ডবরা তাঁদের রাজ্য ও সম্পদ ফিরে পাবে। কিন্তু, কৌরবরা শর্তভঙ্গ করে ও পাণ্ডবদের রাজ্য ফেরত দিতে অস্বীকার করে, উল্টো যুদ্ধের হুমকি দেয়। প্রাপ্য ফেরত পাওয়ার সমস্ত তৎপরতা এবং কুটনৈতিকতা (সাম, দান, ভেদ) ব্যর্থ হলে পাণ্ডবরা “কুরুক্ষেত্রে” যুদ্ধে(দণ্ডনীতি)অবতীর্ণ হয়। এই যুদ্ধ ছিল ন্যায্য প্রাপ্তির যুদ্ধ অর্থাৎ ন্যায়ের যুদ্ধ। আর এই ন্যায়ের যুদ্ধকেই মহাভারতে বলা হয়েছে ধর্মযুদ্ধ। এখানে, ন্যায় ও ধর্ম সমার্থক। দেখুন, যে কাউকেই সমাজে বসবাস করতে হলে, তাঁকে আর দশজনের সাথে মিলেমিশে বসবাস করতে হয়। মানুষের মধ্যেকার পারস্পরিক সম্পর্ক যেমন তৈরি হয় তেমনি আবার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সংঘাত ও তৈরি হয়। ঠিক এই জায়গাটাতেই ন্যায়ের প্রশ্ন আসে। আমি যদি অপর ব্যাক্তির সাথে অন্যায় আচরণ করি, তবে তারও আমার প্রতি অন্যায় আচরনের অধিকার আছে, কারণ, আমি আগে অন্যায় আচরণ করে তাঁকে সে অধিকার দিয়েছি। এটা আইন শৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়। এটা নৈতিকতার প্রশ্ন ও অধিকারের প্রশ্ন। দুই বা ততোধিক ব্যাক্তির পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে যদি ন্যায় অনুপস্থিত হয়, তবে সম্পর্কের মধ্যে অন্যায় আসবে, একপাক্ষিকতা আসবে, বঞ্চনা আসবে, বৈষম্য আসবে। এই ধরনের সম্পর্কের মধ্যে কোন শ্রদ্ধাবোধ বা ভালবাসা তৈরি হয়না বরং শঠতা ও প্রতারনা তৈরি হয়। পরিণামে তা একটি সুস্থ, স্বাভাবিক সম্পর্কের অন্তরায় হয়, সুস্থ, স্বাভাবিক সমাজ ও জাতি গঠন অসম্ভব হয়ে পড়ে। অরাজকতা তৈরি হয়, মাৎস্যন্যায় তৈরি হয়, দুর্বলের উপর সবলের উৎপাত বৃদ্ধি পায়, পরিবার ও সমাজের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ ভেঙ্গে পড়ে এবং এর ফল অবশ্যম্ভাবী ধ্বংস। কুরুক্ষেত্রে কৌরবদের ধ্বংস হয়েছিল। আর বর্তমানে ক্ষয়িষ্ণু হিন্দুরা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
অতএব আবার দেখতে পাচ্ছি, ন্যায়স্বরূপ ধর্মের অনুপস্থিতি এবং নিশ্চিত ধ্বংস।
 ধর্মের সংজ্ঞাঃ
Dharma is an expression of “Ethical Principals” which uphold a cosmic order that harmonize the relationship “among men and also between men and broader nature” through combining both “materialistic development and spiritual enlightenment”, which, when practiced consciously ultimately leads to “Moksha” that is releasing oneself from the cycle of “birth and death”.
ধর্ম হল কর্তব্যকর্মের এমন এক নীতিমালা, যা এক মহাজাগতিক শৃঙ্খলার নির্দেশক, যা বৈষয়িক উন্নয়ন ও আধ্যাত্মিক জ্ঞ্যানকে একীভূত করে, মানুষে মানুষে এবং মানুষ ও বৃহত্তর প্রকৃতির মধ্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্কের ঐকতান সৃষ্টি করে, যার সচেতন চর্চায় মোক্ষলাভের (জন্ম ও মৃত্যুর চক্র হতে মুক্তি) পথ সুগম হয়।
অতএব, আমরা দেখতে পাচ্ছি, ধর্ম বলতে কর্তব্যকর্ম সম্পাদনের নীতিকেই বোঝায়, যে নীতির আলোকে মানুষ তাঁর আর্থ ও কাম চরিতার্থ করবে, যে নীতিতে মানুষ তাঁর পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, বৃহত্তর মানবজাতি ও বৃহত্তর প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক স্থাপন করবে, তাঁদের কল্যাণে নিজের জীবন উৎসর্গ করবে, যে নীতির সচেতন চর্চায় তাঁর সুপ্ত মানবিক গুনগুলোকে সুষমামণ্ডিত করে তুলবে এবং ধাপে ধাপে তাঁর আধ্যাত্মিক সত্তাকে উপলব্ধি করবে, জীবাত্মা ও পরমাত্মার পার্থক্য দুরীভুত হবে।
কর্তব্যকর্ম ছেঁড়ে যারাই মোক্ষের প্রত্যাশায় লালায়িত হবে, সংসার ছেঁড়ে, সংসারের প্রতি দায়িত্ব ছেঁড়ে যারাই আধ্যাত্মিকতার চর্চা করতে যায়, তাঁরা অধার্মিক। ধর্ম ও ধার্মিক সমাজের চোখে তাঁরা অনাকাঙ্ক্ষিত ও অথর্ব। তাঁরা মানবজাতির কাছে ভারসম। আবার যারা কর্তব্যকর্ম ছেঁড়ে কেবলমাত্র আত্মসর্বস্ব জীবনযাপন করেন, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র চুলোয় যাক, আপনি বাচলে বাপের নাম, কর্তব্য এড়াতে যারা কখনও দর্শনের নামে, কখনও বিশ্ব মানবতার নামে, কখনও অহিংসার নামে কঠিন বাস্তবতাকে অস্বীকার করেন, তারাও সমান অধার্মিক, শঠ, প্রতারক এবং তারাও ধর্মের চোখে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অথর্ব। এরাও মানবজাতির কাছে অপ্রয়োজনীয় ও ভারসম।
কেবল যারা যোগী (কর্মযোগী), যারা পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, সভ্যতা, ন্যায় অন্যায়, রাজনীতি, আর্থসামাজিক চাপানউতর এর মধ্যে শান্ত, সংযত, কর্তব্যপরায়ণ ও ধীসম্পন্ন থাকেন, ধর্মে অবিচল থাকেন, ধর্ম প্রতিষ্ঠায় অবিচল থাকেন, ধর্ম প্রচার, প্রসার ও রক্ষায় বাঘের ন্যায় ক্ষিপ্র, সাহসী, ধৈর্যশীল ও বলবান থাকেন, যেকোনো বাঁধার সামনেই অভিযোগশুন্য, অকুতোভয়, সাত্ত্বিক ও বলীদানে প্রস্তুত থাকেন তাঁরাই প্রকৃত ধার্মিক। এঁদের হাতেই ধর্মের প্রতিষ্ঠা হয়, ধর্মের সুরক্ষা হয়, অপরাপর মানুষের, সমাজের, সংস্কৃতির ও সভ্যতার সুরক্ষা হয়। এঁরাই (পুরুষ ও স্ত্রী উভয়ই) নেতৃত্ব দানের যোগ্য, এঁরাই সহজাত নেতা হন। এঁদের সংখ্যা কম হতে পারে, কিন্তু এঁদের প্রভাবই সমাজকে, সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এরা যেকোনো কেউ বা যে কোন পেশার হতে পারেন।
এঁরা সকলে যেক্ষেত্রে এক কাতারে দাঁড়ান, তা হল ধর্মের প্রতি অনন্যসাধারণ চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞা, অসাধারণ শক্ত মানসিকতা, প্রজ্ঞ্যা, ধী এবং সর্বোপরি যা তাঁদের বাকী সবার চাইতে অনন্য ও আলাদা করে, বাকী সবার চোখে তাঁরা নায়ক/ নায়িকার আসনে অধিষ্ঠিত হন, তা হল যেকোনো বৃহত্তর স্বার্থে নিঃশঙ্ক চিত্তে “আত্মত্যাগের” ক্ষমতা।

Advertisements

প্রশ্ন:ভাইফোঁটা কী?



উত্তর: ভাইফোঁটা হিন্দুদের একটি উৎসব। এই উৎসবের পোষাকি নাম ভ্রাতৃদ্বিতীয়া অনুষ্ঠান। কার্তিক মাসের শুক্লাদ্বিতীয়া তিথিতে (কালীপুজোর দুই দিন পরে) এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। পশ্চিম ভারতে এই উৎসব ভাইদুজ নামেও পরিচিত। সেখানে ভ্রাতৃদ্বিতীয়া পাঁচ-দিনব্যাপী দীপাবলি উৎসবের শেষদিন। আবার, মহারাষ্ট্র, গোয়া ও কর্ণাটকে ভাইফোঁটাকে বলে ভাইবিজ। নেপালে ও পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চলে এই উৎসব পরিচিত ভাইটিকা নামে। সেখানে বিজয়াদশমীর পর এটিই সবচেয়ে বড় উৎসব।

এই উৎসবের আরও একটি নাম হল যমদ্বিতীয়া। কথিত আছে, এই দিন মৃত্যুর দেবতা যম তাঁর বোন যমুনার হাতে ফোঁটা নিয়েছিলেন। অন্য মতে, নরকাসুর নামে এক দৈত্যকে বধ করার পর যখন কৃষ্ণ তাঁর বোন সুভদ্রার কাছে আসেন, তখন সুভদ্রা তাঁর কপালে ফোঁটা দিয়ে তাঁকে মিষ্টি খেতে দেন। সেই থেকে ভাইফোঁটা উৎসবের প্রচলন হয়। ভাইফোঁটার দিন বোনেরা তাদের ভাইদের কপালে চন্দনের ফোঁটা পরিয়ে দিয়ে ছড়া কেটে বলে-
“ ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা।
যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা।।
যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা,
আমি দিই আমার
ভাইকে ফোঁটা॥
কাটা যেনো নড়ে না
ভাই যেনো মরে না।।”

এইভাবে বোনেরা ভাইয়ের দীর্ঘজীবন কামনা করে। তারপর ভাইকে মিষ্টি খাওয়ায়। ভাইও বোনকে কিছু উপহার বা টাকা দেয়।

পশ্চিমবঙ্গে ভাইফোঁটা একটি ঘরোয়া অনুষ্ঠান হলেও ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে পালিত হয়। পশ্চিম ভারতের ভাইবিজ একটি বর্ণময় অনুষ্ঠান। সেখানে এই উপলক্ষ্যে পারিবারিক সম্মেলনেরও আয়োজন করা হয়। মহারাষ্ট্রে মেয়েদের ভাইবিজ পালন অবশ্যকর্তব্য। এমনকি, যেসব মেয়েদের ভাই নেই, তাঁদেরও চন্দ্র দেবতাকে ভাই মনে করে ভাইবিজ পালন করতে হয়। এই রাজ্যে বাসুন্দি পুরী বা শ্রীখণ্ড পুরী নামে একটি বিশেষ খাবার ভাইবিজ অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি করার রেওয়াজ আছে।
সূত্র: উইকিপিডিয়া

জেনে নিন কালীমূর্তির প্রকৃত রহস্য- 


হিন্দুদের অন্যতম আরাধ্যা দেবী কালিকা বা কালীর সবচেয়ে জনপ্রিয় মূর্তিতে দেবীকে নগ্নিকা হিসেবে দেখা যায়। দেবীর এই মূর্তি অনেকের কাছে কৌতুহলের কারণ, অনেকের কাছে কৌতুকেরও। সেক্ষেত্রে এই দেবীরূপের প্রকৃত তাৎপর্য জানা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।

প্রথমেই বলে রাখা ভাল যে, হিন্দুধর্মে যে কোনও দেব বা দেবীমূর্তিই আদপে প্রতীকী। হিন্দু শাস্ত্রে ব্রহ্মকেই একমাত্র সত্য বলে গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি নিরুপাধি, নির্গুণ। মায়াকে আশ্রয় করে তিনি সগুণ রূপ লাভ করেন। এই সগুণ ব্রহ্মই ঈশ্বর, স্রষ্টা। পুরুষ ও প্রকৃতির লীলার মাধ্যমে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি, অতঃপর স্থিতি ও বিলয় ঘটে থাকে। শক্তি হলেন প্রকৃতি স্বরূপিনী। তিনি জগন্মাতৃকা। আদ্যাশক্তি নিরাকারা এবং মানুষের কল্পনার অতীত। কিন্তু ভক্তের সুবিধার্থেই তাঁকে মানুষের ইন্দ্রিয়বোধ্য রূপে কল্পনা করা হয়ে থাকে। দেবী কালীর প্রচলিত ও সাধারণ্যে পূজিত মূর্তিটিও তাঁর তেমনই একটি কল্পিত রূপমূর্তি। কিন্তু এই রূপকল্পনার বিশেষ শাস্ত্রীয় তাৎপর্য রয়েছে। তাঁর মূর্তির প্রতিটি অংশই গভীর প্রতীকী অর্থ সম্পন্ন। কীরকম সেই অর্থ? সংক্ষেপে জেনে নেওয়া যাক—

১. দেবীর মাথায় কালো চুলের ঢল। তাঁর এই মুক্ত কেশপাশ তাঁর বৈরাগ্যের প্রতীক। তিনি জ্ঞানের দ্বারা লৌকিক মায়ার বন্ধন ছেদন করেছেন। তাই তিনি চিরবৈরাগ্যময়ী।

২. দেবীর গায়ের রং কালো। আসলে তিনি যে কোনও বর্ণের অতীত। আর কালো রং সকল বর্ণের অনুপস্থিতির প্রতীক। কখনও দেবীকে গাঢ় নীল বর্ণেও কল্পনা করা হয়। তিনি গাঢ় নীল আকাশের মতোই অসীম। তাঁর নীল গাত্রবর্ণ সেই গগনসম অসীমতার ইঙ্গিতবাহী।

৩. দেবী ত্রিনয়ন সম্পন্না। এই ত্রিনয়ন চন্দ্র, সূর্য ও অগ্নির ন্যায় অন্ধকার বিনাশকারী। এই ত্রিনয়নের মাধ্যমে দেবী যেমন অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ দর্শন করে থাকেন, তেমনই প্রত্যক্ষ করেন সত্য, শিব ও সুন্দরকে; অর্থাৎ বৃহত্তর অর্থে সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়কে।

৪. দেবী সাদা দাঁতের দ্বারা নিজের রক্তবর্ণ জ্বিহাকে কামড়ে ধরে রয়েছেন। লাল রং রজোগুণের ও সাদা রং সত্ত্বগুণের প্রতীক। দাঁতের দ্বারা জিহ্বাকে চেপে ধরে দেবী তাঁর ভক্তকুলকে বোঝাতে চাইছেন, ত্যাগের দ্বারা ভোগকে দমন করো।

৫. দেবী মুণ্ডমালিনী। দেবীর গলায় রয়েছে মোট ৫০টি মুণ্ডের মালা। এই মুণ্ডগুলি ৫০টি বর্ণ (১৪টি স্বরবর্ণ ও ৩৬টি ব্যঞ্জনবর্ণ) বা বীজমন্ত্রের প্রতীক। এই বীজমন্ত্রই সৃষ্টির উৎস। দেবী নিজে শব্দব্রহ্মরূপিনী।

৬. দেবী চতুর্ভুজা। তাঁর ডানদিকের উপরের হাতে রয়েছে বরাভয় মুদ্রা, নীচের হাতে আশীর্বাদ মুদ্রা। কারণ দেবী তাঁর সন্তানদের যেমন রক্ষা করেন, তেমনই ভক্তের মনোবাঞ্ছাও পূর্ণ করেন। বাঁ দিকের উপরের হাতে তিনি ধরে রয়েছেন তরবারি, আর নীচের হাতে একটি কর্তিত মুণ্ড। অর্থাৎ জ্ঞান অসির আঘাতে তিনি যেমন জীবকুলকে মায়াবন্ধন থেকে মুক্তির পথপ্রদর্শন করতে পারেন, তেমনই মায়াচ্ছন্ন জীবের মস্তিস্কে প্রদান করতে পারেন প্রজ্ঞা কিংবা বিশেষ জ্ঞান।

৭. দেবী কোমরে কর্তিত হাতের মেখলা পরিহিতা। এই হাত কর্মের প্রতীক। মানুষের সমস্ত কর্মের ফলদাত্রী দেবী। জীবনচক্রের শেষে সমস্ত আত্মা স্বয়ং দেবীর অঙ্গীভূত হয়। এবং পরে মাতৃজঠর থেকেই পুনরায় তাদের কর্মফল অনুসারে জন্মলাভ করে।

৮. দেবীর পদতলে শিব শায়িত। শিব স্থিতি, দেবী গতি। শিব ব্রহ্মচৈতন্য, দেবী ব্রহ্মশক্তি। তাঁদের সম্মিলন ব্যতীত সৃষ্টির উৎপত্তি সম্ভব নয়। বঙ্গে সাধারণত দক্ষিণা কালীর পুজো হয়ে থাকে। এই মূর্তিতে দেবীর দক্ষিণ পদ বা ডান পা শিবের বুকে স্থাপিত থাকে।

৯. দেবী নগ্নিকা। তিনি বিশ্বব্যাপী শক্তির প্রতীক। তিনি অসীম। এই চিরশক্তিকে আবৃত করে এমন সাধ্য কোন বস্ত্রের রয়েছে! দেবী তাই দিগম্বরী।

দীপান্বিতা লক্ষ্মীপুজো


থায় বলে, বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। পয়লা বৈশাখে গণেশপুজো-হালখাতা দিয়ে সূচনা আর চৈত্র সংক্রান্তির গাজনে সমাপ্তি। সেই অনুসারে সারা বছরেই নানা পুজো-পার্বণ থাকলেও বাংলার প্রকৃত উত্সবের মরশুম আরম্ভ হয় দুর্গাপুজো দিয়ে আর শেষ কালীপুজোতে। তিথি নক্ষত্রের হিসেবে আশ্বিন-অমাবস্যা (মহালয়া) থেকে কার্তিক-অমাবস্যা (কালীপুজো)— এই এক মাস কাল হল বাংলার প্রধান উত্সবের মরশুম। দুর্গাপুজো শেষ হলে আসে লক্ষ্মীপুজো এবং তার পরে কালীপুজো তথা দীপাবলি।

দীপাবলি আদতে আলোর উত্সব। বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মের মধ্যেই এক ধরনের আলোক উত্সবের কথা বলা আছে। তারই একটি হল হিন্দু তথা ভারতীয় সংস্করণ, দীপাবলি। এই উত্সবে পুজোর থেকেও বেশি উল্লেখযোগ্য হল দীপমালার সজ্জা। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতীয় সংস্কৃতির নানা কাহিনি, যেগুলির সঙ্গে কালীর থেকেও বেশি সম্পর্ক লক্ষ্মীর।

প্রচলিত বিশ্বাস হল— কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতেই সমুদ্র থেকে ধন্বন্তরী উঠে এসেছিলেন। তাই এই তিথির নাম ধন্বন্তরি ত্রয়োদশী বা সহজ কথায় ধনতেরাস। সে জন্য এই দিন ধনের উপাসনা করতে হয় আর ওই দিন একই সঙ্গে দেবী লক্ষ্মীও সমুদ্র থেকে উঠে আসেন বলে লক্ষ্মীর আরাধনাও করা হয়। লক্ষ্মী পুরাণ অনুযায়ী স্বর্গে ফিরে গেলেন, কার্তিক-অমাবস্যায়। তাই লক্ষ্মীর স্বর্গে ফেরা উপলক্ষে স্বর্গকে সাজিয়ে তোলা হয়েছিল আলোকমালায়। আর একটি কাহিনি অনুসারে, লঙ্কা বিজয় সেরে সীতা ও লক্ষ্মণকে নিয়ে রামচন্দ্র যে দিন অযোধ্যায় ফেরেন, তিথি হিসেবে সেটি ছিল ওই কার্তিক-অমাবস্যা। ভগবান বিষ্ণুর সপ্তম অবতার রামের লীলাসঙ্গিনী লক্ষ্মীদেবীকে বরণ করে নেওয়ার জন্য সেই রাতে অযোধ্যা নগরীকে সাজানো হয়েছিল অগণ্য দীপমালায়। অন্য এক কাহিনি আবার বলে, কার্তিক-চতুর্দশীতে কৃষ্ণ নরকাসুরকে বধ করে তার কারাগারে বন্দি ১৬ হাজার গোপিনীকে মুক্ত করেন। সেই উপলক্ষে, পরের দিন অর্থাত্ কার্তিক-অমাবস্যাতে আলোকমালা সাজিয়ে উত্সব হয়েছিল। দীপাবলিতে দীপ জ্বালানো নিয়ে এমন হরেক কাহিনি প্রচলিত আছে হিন্দু পুরাণ-শাস্ত্রগুলিতে।

শৈব (শিবের উপাসক), বৈষ্ণব (বিষ্ণুর উপাসক), শাক্ত (শক্তির উপাসক), গাণপত (গণেশের উপাসক), সৌর্য (সূর্যের উপাসক)— ভারতীয় হিন্দু ধর্মের এই পাঁচ উপ-বিভাগের অন্যতম শাক্তদের প্রাধান্য পূর্ব ভারতেই বেশি। প্রাচীন কাল থেকেই বাংলায় এই ধারা চলে আসছে। বাংলার উত্সব মরশুমে এই শক্তি আরাধনাই হয় দুর্গা ও কালীপুজোর মধ্যে দিয়ে। কিন্তু মধ্যযুগে চৈতন্যদেব প্রবর্তিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব ভাবধারার প্রাধান্যও লক্ষ করা যায় বাংলার শক্তি আরাধনার ক্ষেত্রে। দেবীপক্ষের শেষ দিন অর্থাত্ আশ্বিনের শুক্লপক্ষের পূর্ণিমায় হয় কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো। আর তার পনেরো দিন পরে কার্তিক-অমাবস্যায় দীপাবলীর দিন হয় কালীপুজো। হিন্দু পুরাণ-শাস্ত্র অনুসারে দেবী কালিকা দুর্গারই আর এক রূপ। শক্তির উপাসকেরা দীপাবলীর দিন কালীপুজো করেন আর সে দিন সারা ভারত জুড়ে বিষ্ণুর উপাসকেরা আরাধনা করেন মহালক্ষ্মীর। বঙ্গদেশেও তার ব্যতিক্রম হয় না। কালীপুজোর রাতে দীপান্বিতায় অলক্ষ্মী বিদায় ও মহালক্ষ্মীর পুজো দিয়ে সূচনা হয় পশ্চিমবঙ্গীয়দের কার্তিক, পৌষ, চৈত্র ও ভাদ্র মাসের লক্ষ্মী পুজোর। এমনকী বাংলার অন্যতম প্রাচীন শক্তিপীঠ মহাতীর্থ কালীঘাট মন্দিরে এই কার্তিক-অমাবস্যায় দীপান্বিতা মহালক্ষ্মীর পুজো করেন হালদার বংশীয় সেবাইতরা। এর কারণ জানতে গেলে আমাদের চোখ ফেরাতে হবে অতীতের দিকে।

কালীঘাটের প্রতিষ্ঠা ঠিক কবে হয়েছিল তা বলা খুবই কঠিন। ইতিহাস, পুরাণকথা, কিংবদন্তী মিলেমিশে এমন হয়ে আছে যে তার থেকে এর প্রকৃত উদ্ভবের কাল উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভবই বলা যায়। খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে রচিত টলেমির ভারতের ভৌগোলিক বিবরণে এই অঞ্চলে কালীগ্রাম নামের এক জনপদের উল্লেখ আছে! আবার ভবিষ্যপুরাণের এক জায়গায় লেখা হয়েছে,
তাম্রলিপ্ত প্রদেশে চ বর্গভীমা বিরাজতে।
গোবিন্দপুরপ্রান্তে চ কালী সুরধুনীতটে।।

টলেমির কালীগ্রামই যে আজকের কালীঘাট— তার যেমন কোনও প্রমাণ নেই তেমনই টলেমির সমসাময়িক কালে লেখা ভবিষ্যপুরাণে গোবিন্দপুর গ্রামের উল্লেখ প্রায় অসম্ভব। আসলে কালীঘাটের প্রাচীনত্ব ও মহিমা জাহির করতে ওই সব তথ্য হাজির করা হয়েছে অনেক পরে। ইতিহাসগত ভাবে কালীঘাটের কথা জানা যায় ষোড়শ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে। কথিত আছে, আত্মারাম ব্রহ্মচারী নামে এক দলছুট সন্ন্যাসী ঘুরতে ঘুরতে কালীঘাট অঞ্চলে নির্জন বনের মধ্যে পর্ণকুটির তৈরি করে বসবাসকালে একটি বড় প্রস্থরখণ্ডকে কালীরূপে পুজো করতেন। তিনি এবং ব্রহ্মানন্দ গিরি নামে আর এক সন্ন্যাসী সংলগ্ন কুণ্ড থেকে একটি ছোট পাথরখণ্ড খুঁজে পান। তাঁরা সেই খণ্ডটি সতীর দক্ষিণ পদের কনিষ্ঠ অঙ্গুলী বলে দাবি করেন। পরে সেটিকে বড় পাথরটির নীচে স্থাপন করেন। সতীপীঠ হিসেবে কালীঘাটের পরিচিতির সূচনা তখন থেকেই।

আত্মারাম ও ব্রহ্মানন্দের পর থেকে দীর্ঘকাল মূলত সন্ন্যাসীদের হাতেই ছিল কালীঘাটের পুজোর ভার। তাঁরা প্রধানত শৈব হলেও তন্ত্র মতে শক্তির উপাসনাও করতেন। ইতিমধ্যে শক্তিপীঠ হিসেবে কালীঘাট যথেষ্ট পরিচিত হয়ে উঠেছে। প্রথমে যশোহরের রাজা বসন্ত রায় ও পরে সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের আনুকূল্যে তৈরি হয়েছে মন্দিরও। সেই সময়ে অন্যান্য শৈব ও শক্তি পীঠগুলির ন্যায় কালীঘাটেও মন্দিরের সেবাপুজো ও রক্ষণাবেক্ষণের ভার থাকত সন্ন্যাসীদের হাতে। ভুবনেশ্বর গিরি নামে এমনই এক তান্ত্রিক সেবাইত ও তাঁর ভৈরবী যোগমায়ার, উমা নামে এক কন্যা জন্ম নেয়। ওই উমাকে কেন্দ্র করে পাল্টে যায় কালীঘাটের সেবাপুজোর ইতিহাস।

যশোহরের জনৈক পৃথ্বীধর চক্রবর্তীর ছেলে ভবানীদাস তাঁর হারিয়ে যাওয়া বাবার খোঁজে ঘুরতে ঘুরতে কালীঘাটে উপস্থিত হন। ভবানীদাস আদতে ছিলেন কৃষ্ণের উপাসক কিন্তু নানা কারণে তিনি কালীঘাটে থেকে যান এবং নিজের ইষ্ট দেবতা বিষ্ণুর পাশাপাশি কালীরও উপাসক হয়ে ওঠেন। কালীর পুজোয় ভবানীদাসের নিষ্ঠা দেখে ভুবনেশ্বর গিরি তাঁর সঙ্গে মেয়ে উমার বিয়ে দিলেন এবং তাঁকেই করে গেলেন কালীঘাট মন্দিরের ভবিষ্যত্ উত্তরাধিকারী। শেষ হল সন্ন্যাসীদের যুগ, কালীঘাটের দেবী দক্ষিণাকালীর সেবাপুজোর ভার অর্পিত হল গৃহস্থ-সেবায়েত ভবানীদাস চক্রবর্তীর হাতে। সেই শুরু। কালীঘাটের আজকের সেবাইত হালদারেরা ওই ভবানীদাসেরই উত্তরপুরুষ।

শাক্ত পরিবারের সন্তান হলেও ভবানীদাস নিজে ছিলেন বিষ্ণুর উপাসক। যশোহরের খনিয়ান গ্রামে ছিল তাঁর কুলদেবতা বাসুদেব। ভবানীদাস কালীঘাটে থাকাকালীন, গ্রামের বাড়িতে তাঁর প্রথম পক্ষের স্ত্রী-পুত্রেরাই পুজো করতেন কুলদেবতার। কালীঘাট মন্দিরের সব দায়িত্ব পাওয়ার পরে তিনি যশোহর থেকে পরিবারকে নিয়ে আসেন কালীঘাটে। পরে কুলদেবতার বিগ্রহও নিয়ে আসেন এবং প্রতিষ্ঠা করলেন দক্ষিণাকালীর মূর্তির ঘরেই। একই সঙ্গে চলল কালী ও কৃষ্ণের পুজো। বিষ্ণুভক্ত কালীসেবক ভবানীদাসই প্রথম কালীর নাসিকাগ্রে আঁকেন বৈষ্ণবীয় তিলক। সেই প্রথা আজও বজায় আছে। তিলক আঁকার পাশাপাশি কালীপুজোর দিন কালীঘাটে লক্ষ্মীপুজোর প্রবর্তনও করেন তিনি। দীপান্বিতার সন্ধ্যায় এই পুজো হয়, তাই এর নাম দীপান্বিতা লক্ষ্মীপুজো।

কালীঘাট মন্দিরে কালীপুজোর সন্ধ্যার এই লক্ষ্মীপুজো একান্ত ভাবেই সেবাইতদের পুজো, এর সঙ্গে কালীঘাট মন্দির কমিটির বিশেষ কোনও সম্পর্ক নেই। অমাবস্যা তিথি থাকলে কালীপুজোর দিন সূর্যাস্তের ২৪ মিনিটের মধ্যে আরম্ভ হয় লক্ষ্মীপুজো। তার আগে অবশ্য সেরে নেওয়া হয় অলক্ষ্মী বিতাড়ন পর্ব। তিন বা চার ইঞ্চি মাপের অলক্ষ্মী পুতুল তৈরি করা হয় গোবর বা জলে চটকানো পিটুলি (চালবাটা) দিয়ে। সেটিকে রাখা হয় মন্দিরের গর্ভগৃহের বাইরে। এ বার অলক্ষ্মী পুতুলের সামনে পাটকাঠিতে আগুন লাগিয়ে সেবাইতরা তিন বার মন্দির প্রদক্ষিণ করেন। আর জোরে জোরে কুলো বাজিয়ে অলক্ষ্মী বিদায় করে আরম্ভ হয় লক্ষ্মীপুজো। এটি যেহেতু সেবাইতদের পুজো তাই নিরামিষ ভোগ আসে সেবাইতদের বাড়ি থেকেই। সেগুলি রাখা হয় কালীমূর্তির সামনেই। আবার কালীর যে হেতু আমিষ ভোগ, সেখানে মাছ-মাংসও থাকে, সেগুলিও রাখা হয় তার পাশেই, তবে লক্ষ রাখা হয় যেন আমিষ ও নিরামিষ ভোগ ছোঁয়াছুঁয়ি না হয়। ভোগ ছাড়াও সেবাইতরা দেন তাঁতের শাড়ি। সেগুলি কালীর অঙ্গেই পরানো হয়। ভোগ-বসন সাজানোর পরে পুরোহিত পুজো শুরু করেন। প্রায় তিন-সাড়ে তিন ঘন্টা ধরে হয় কালীপুজোর সন্ধ্যার ওই দীপান্বিতা লক্ষ্মীপুজো।

হিন্দু পুরাণ-শাস্ত্র অনুসারে লক্ষ্মী ধন-সম্পদ-সৌভাগ্যের দেবী। তাই হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে লক্ষ্মীপুজোর আলাদা এক গুরুত্ব আছে। বাঙালিরাও তার ব্যতিক্রম নয়। বাঙালির ঘরে সোমবচ্ছর উপাচার, নৈবেদ্যর বাহুল্য ছাড়াই লক্ষ্মীর উপাসনা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেখানে পুরোহিতেরও প্রয়োজন হয় না। সামান্য ফল-ফুল আর পাঁচালি-ব্রতকথা দিয়েই সারা হয় বাঙালি গৃহবধূর লক্ষ্মী-আরাধনা। কলকাতার অনেক বনেদি বাড়িতে এখনও কালীপুজোর সন্ধ্যায় দীপান্বিতা লক্ষ্মীর পুজো হয় নিয়ম মেনে।

তথ্য: গৌতম বসুমল্লিক
নিজস্ব চিত্র