প্রশ্নঃ সরস্বতী কি বৈদিক দেবী? বেদে সরস্বতী সম্পর্কে কিরূপ বলা হয়েছে?


প্রশ্নঃ সরস্বতী কি বৈদিক দেবী? বেদে সরস্বতী সম্পর্কে কিরূপ বলা হয়েছে?

উত্তর:
সরস্বতী বিদ্যা, জ্ঞান, শিল্প, কলা ও সংগীতের দেবী। বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যায় অধ্যায়নরত বিদ্যার্থীরা এই পূজা সাড়ম্বরে করে থাকেন। মাতা সরস্বতী জ্ঞানদায়িনী অর্থাৎ কল্যাণ ও শান্তি বিধায়িনী, তিনি বরদা এবং জাগতিক মোহ ধ্বংসকারী। সুপ্রাচীন বৈদিক সাহিত্যে বিশেষত বেদে আমরা মাতা সরস্বতীকে পাই। সরস্বতী তাই পুরোপুরি বৈদিক দেবী। বৈদিক ঋষিরা বিভিন্ন ধ্যান মন্ত্রে তার বন্দনা করেছেন। যেমনঃ

চোদয়িত্রী সূনৃতানাং চেতন্তী সুমতীনাং।
যজ্ঞং দধে সরস্বতী॥ (ঋগ্বেদ ১/৩/১১)
মহো অর্নঃ সরস্বতী প্রচেতয়তি কেতুনা।
ধিয়ো বিশ্বা বিরাজতি॥ (ঋগ্বেদ ১/৩/১২)

অনুবাদঃ
সত্য ও প্রিয়বাণীর (মঙ্গলজনক বা মানব হিতকর কথা) প্রেরণাদাত্রী এবং সৎবুদ্ধির চেতনাদাত্রী মাতা সরস্বতী শুভকর্মকে ধারণ করে আছেন।জ্ঞানদাত্রী মাতা সরস্বতী প্রজ্ঞাশক্তি দ্বারা মহান জ্ঞান সমুদ্রকে প্রকাশ করেন এবং ধারণাবতী বুদ্ধি সমূহকে দীপ্তি দান করেন। (অনুবাদ ১/৩/১১-১২)
শংনো দেবা বিশ্বদেবা ভবন্তু শং সরস্বতী সহধীভিরস্তু।(ঋগ্বেদ ৭/৩৫/১১)

অনুবাদঃ
জ্ঞান জ্যোতির রক্ষক বিদ্বানেরা আমাদের কল্যাণ বিধান করুন। বিদ্যাদেবী সরস্বতী নানা প্রকারে বুদ্ধির সাথে কল্যাণদায়িনী হোক।
বৈদিক যুগে মাতা সরস্বতী বিভিন্নভাবে পূজিতা হয়ে থাকলেও তাকে ঋষিরা প্রধানত দুইটি রূপে বন্দনা করে থাকতেন। (১) নদীরূপে (২) মাতৃ বা দেবী রূপে। এই বিষয়ে এবার আমরা প্রামাণিক বৈদিক মন্ত্র দেখাবো

অম্বিতমে নদীতমে দেবীতমে সরস্বতী।
অপ্রশস্তা ইব স্মাসি প্রশস্তিমল্ব নস্কৃধি॥ (ঋগ্বেদ ২/৪১/১৬)

অনুবাদ:
মাতৃগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, নদীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, দেবীগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হে সরস্বতী! আমরা অসমৃদ্ধের ন্যায় রয়েছি, আমাদের সমৃদ্ধশালী কর।

এই মন্ত্রে আমরা দেখতে পেলাম তিনি যেমন মাতৃগণের মধ্যেও শ্রেষ্ঠ তেমনি নদীর মধ্যেও। এই সরস্বতী এক বিশাল নদী ছিল বৈদিক যুগে, যদিও বর্তমানে সেটা লুপ্ত। কিন্তু ঋষিদের বর্ণনায় আমরা সেই নদী সম্পর্কে বর্ণনা পাই। যেমনঃ
প্র ক্ষোদসা ধায়সা সস্র এষা সরস্বতী ধরুণামায়সী পূঃ।
প্রবাবধানা রক্ষেব যাতি বিশ্ব অপো মহিনা সিন্ধুরন্যাঃ॥
একচেতৎ সরস্বতী নদীনাং শুচির্যতী গিরিভ্য আসমুদ্রাৎ। (ঋগ্বেদ ৭/৯৫/১-২)

অনুবাদঃ
এ সরস্বতী আয়োনির্মিত পুরীর ন্যায় ধারয়িত্রী হয়ে ধারক উদক (জল) সাথে প্রবাহিতা হচ্ছেন। তিনি অন্য সমস্ত স্যন্দনশীল জলকে মহিমাদ্বারা বাধা প্রদান করে পথের ন্যায় গমন করেছেন। নদীগণের মধ্যে শুদ্ধা গিরি অবধি সমুদ্র পর্যন্ত গমনশালী একা সরস্বতী অবগত হয়েছিলেন।

বৃহদু গারিষে বচোহসূর্যা নদীনম্ ।
সরস্বতী মিণহয়া সুবৃক্তিভিঃ স্তোমৈর্ব সিষ্ট রোদসী॥ ১
উভে যরে মহিনা শুভ্রে অন্ধাসী অধিক্ষিয়ন্তি পুরবঃ।
সানো বোধবিত্রী মরুৎসখা চোদ রাধো মযোনাম্॥২ (ঋগ্বেদ ৭/৯৬/১-২)

অনুবাদঃ
হে বশিষ্ঠ! তুমি নদীগণের মধ্যে বলবতী সরস্বতীর উদ্দেশ্যে বৃহৎ স্তোত্রগান রচনা কর, দ্যাবা পৃথিবীতে বর্তমানা সরস্বতী! তোমার মহিমা দ্বারা মনুষ্যগণ উভয়বিধ অন্ন প্রাপ্ত হয়। তুমি রক্ষাকারিণী হয়ে হয়ে আমাদের অবগত হও, মরুৎগণের সখা হয়ে হবিষ্মানদের নিকট ধন প্রেরণ কর।

বৈদিক যুগে সরস্বতী নদীর তীরে মনোরম প্রাকৃতিক নতুন পরিবেশে, কল্লোলিনীর উচ্ছল জল তরঙ্গে শ্বেত শুভ্র রাজহংসের আনাগোনায়, সামগানের সুমধুর সুরে ভাবুক ঋষিমনে জ্ঞানদায়িনী সরস্বতী মাতার আবির্ভাব হয়। তিনি বাগদেবী বেদের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। নিরুক্তকার যাস্ক বলেছেন, ‘তত্র সরস্বতী ইতি এতস্য নদী বদ্বোবচ্চ নিগমা মূল ঋগ্বেদে সরস্বতীর উভয় প্রকার গুণ লক্ষিত হয়। পুরাকালে সরস্বতী নদীর তীরে যজ্ঞ সম্পাদন হত এবং ক্রমে সে সরস্বতী নদী সে পবিত্র মন্ত্রের দেবী ও বাগদেবী বলে পরিণত হলেন। বেদে সরস্বতী শুধু বিদ্যাদায়িনী বা জ্ঞানদায়িনী নয় তিনি অশুভ শক্তি ধ্বংসকারী।

সরস্বতী দেবনিদো নি বর্হয় প্রজাং বিশ্বাস্য বৃসয়স্য মায়িনঃ।
উত ক্ষিতিভ্যোহবনীরবিন্দো বিষমেভ্যো অস্রবো বাজিনীবতি॥ (ঋগ্বেদ ৬/৬১/৩)

আনুবাদঃ
হে সরস্বতী তুমি দেবনিন্দকগণকে বধ করেছ এবং সর্বব্যাপী মায়াবী কৃসয়ের পুত্রকে সংহার করেছ। হে অন্নসম্পনা দেবী! তুমি মানবগণকে ভূমি প্রদান করেছ এবং তাদের জন্য বারিবর্ষণ করেছ। মাতা সরস্বতী আমাদের অশুভশক্তি বিনাশে শক্তি দিয়ে থাকেন।

যস্ত্বা দেবী সরস্বতুৎপব্রুতে ধনে হিতো ইন্দ্রংন বৃত্রতূর্যে। (ঋগ্বেদ ৬/৬১/৫)

অনুবাদঃ হে দেবী সরস্বতী যে ব্যক্তি তোমাকে ইন্দ্রের ন্যায় স্তব করেন সে ব্যক্তি যখন ধনলাভার্থে যুদ্ধ করেন তখন তাকে তুমি রক্ষা কর।

দেবী সরস্বতী শুচি শুভ্র, শ্বেত অঙ্গকান্তি, শ্বেতপদ্মাসীনা এবং শ্বেত হংসবাহনা। তার কৃপায় মানুষের জাগতিক এবং পারমার্থিক জ্ঞান লাভ হয়। তিনি সঙ্গীতের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। সঙ্গীত ও রাগের সমন্বয়ে ‘ওঁ কার ও গায়ত্রী মন্ত্র শুদ্ধাচারে উচ্চারণে জীবাত্মা পরমাত্মায় লয় হয়। উপনিষদে বলা হয়েছে-

বিদ্যাং চাবিদ্যাং চ যস্তদ্ বেদোভয়্সঁহ।
অবিদ্যয়া মৃত্যুং তীত্বা বিদ্যায়াহমৃতমশ্নূতে॥ (ঈশ উপনিষদ/১১)

অনুবাদঃ
যে মানুষ সেই উভয়কে অর্থাৎ জ্ঞানের তত্ত্বকে ও কর্মের তত্ত্বকে ও একসঙ্গে যথার্থ রূপে জানতে পারে। সে কর্মসমুহ অনুষ্ঠানে মৃত্যুকে অতিক্রম করে আর জ্ঞানের অনুষ্ঠানে অমৃতকে উপভোগ করে অর্থাৎ আনন্দময় অমৃত লাভ করে। মার কৃপাতে আমরা উভয়বিধ জ্ঞানই পেয়ে থাকি। উপরের বর্ণনায় এটা প্রমাণিত যে দেবী সরস্বতী বেদের যুগ থেকেই পূজতিা।

Advertisements

মুখবন্ধ-০৭ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যথাযথ)


বাস্তবিকই ভগবানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক হচ্ছে সেবা করার সম্পর্ক। পরমেশ্বর হচ্ছেন পরম ভোক্তা এবং আমরা, জীবেরা হচ্ছি তাঁর সেবক। তাঁরই সন্তোষ বিধানের জন্য আমাদের সৃষ্টি হয়েছে এবং ভগবানকে সন্তুষ্ট করার জন্য আমরা যদি সর্বদাই তাঁর সেবা করে চলি, তবেই আমরা সুখী হতে পারি। এ ছাড়া আর কোনভাবেই সুখী হওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। উদরকে বাদ দিয়ে শরীরের কোন অঙ্গ যেমন স্বতন্ত্রভাবে সুখী হতে পারে না, আমরাও তেমন ভগবানের সেবা না করে সুখী হতে পারি না।

বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা বা তাঁদেরকে সেবা করা ভগবদ্‌গীতাতে অনুমোদনকরা হয়নি। সপ্তম অধ্যায়ের বিংশতি শ্লোকে বলা হয়েছে-

কামৈস্তৈস্তৈর্হৃতজ্ঞানাঃ প্রপদ্যন্তেঽন্যদেবতাঃ।

তং তং নিয়মমাস্থায় প্রকৃত্যা নিয়তাঃ স্বয়া।।

জগ-জাগতিক কামনা-বাসনা দ্বারা যাদের জ্ঞান অপহৃত হয়েছে যে, যাদের জ্ঞান অপরহৃত হয়েছে, তারা তাদের স্বীকা স্বভাব অনুযায়ী এবং পূজার বিশেষ নিয়মবিধি পালন করে বিভিন্ন দেব-দেবীদের শরণাগত হয়।” এখানে পরিষ্কার ভাবেই বলা হয়েছে যে, যারা কামনা-বাসনা দ্বারা পরিচালিত হয়, তারা পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবা না করে বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা করে। শ্রীকৃষ্ণ বলতে কোন সাম্প্রদায়িক ব্যক্তি-বিশেষের নাম বোঝায় না। শ্রীকৃষ্ণ নামের অর্থ হচ্ছে পরম আনন্দ। পরমেশ্বর ভগবান হচ্ছেন সমস্ত আনন্দের উৎস, সমস্ত আনন্দের আধার। আমরা সকলেই আনন্দের অভিলাষী। আনন্দময়োহভ্যাষাৎ (বেদান্তসূত্র ১/১/১২)। ভগবানের অংশ হবার ফলে জীব চৈতন্যময় এবং তাই সে সর্বদাই আনন্দের অনুসন্ধান করে। ভগবান সদানন্দময়, তিনি সমস্ত আনন্দের আধার, তাই জীব যখন ভগবন্মুখী হয়ে সর্বতোভাবে ভগবানের সেবাপরায়ণ হয়ে তাঁর সান্নিধ্যে আসে, তখন তার চিরবাঞ্ছিত দিব্য আনন্দ সে অনুভব করতে পারে।

ভগবান এই মর্ত্যলোকে অবতরণ করেন তাঁর আনন্দময় বৃন্দাবন-লীলা প্রদর্শন করার জন্য। এই বৃন্দাবন-লীলা হচ্ছে আনন্দের চরম প্রকাশ। শ্রীকৃষ্ণ যখন বৃন্দাবনে থাকেন, তখন সেখানে রাখাল বালকের সঙ্গে, গোপ-বালিকাদের সঙ্গে, বৃন্দাবনবাসীদের সঙ্গে এবং গাভীদের সঙ্গে তাঁর সমস্ত লীলা হচ্ছে দিব্য আনন্দ পরিপূর্ণ। বৃন্দাবনের প্রতিটি জীবই কৃষ্ণগত প্রাণ, শ্রীকৃষ্ণ ছাড়া আর কিছুই তাঁরা জানেন না। তিনি যে সব কিছুর পরম ভোক্তা, তাঁর পাদপদ্মে আত্মসমর্পনই যে শ্রেষ্ঠ সমর্পণ এবং বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা করাটা যে নিতান্ত নিষ্প্রয়োজন, তা প্রতিপন্ন করবার জন্য তিনি তাঁর পিতা নন্দ মহারাজকেও ইন্দ্রের পূজা করা থেকে নিরস্ত করেন। কারণ তিনি প্রতিপন্ন করতে চেয়েছিলেন যে, অন্য কোন দেব-দবীর পূজা করবার কোন দরকার নেই মানুষের। পরমেশ্বর ভগবানের সেবা করাই প্রতিটি মানুষের একমাত্র কর্তব্য, কারণ মানব-জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে ভগবৎ-ধামে ফিরে যাওয়া।

ভগবদ্‌গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়ের ষষ্ঠ অধ্যায়ের ষষ্ঠ শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আলয় ভগবৎধামের বর্ণনা করে বলা হয়েছে-

ন তদ্‌ভাসয়তে সূর্যো ন শশাঙ্কো না পাবকঃ।

যদ্‌গত্বা ন নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম ।।

আমার পরম ধাম সূর্য, চন্দ্র, অগ্নি অথবা বৈদ্যুতিক আলোকের দ্বারা আলোকিত নয়। সেখানে একবার পৌঁছলে আর এই জড় জগতে ফিরে আসতে হয় না।”

এই শ্লোকে সেই চিরশাশ্বত অপ্রাকৃত আকাশের কথা বলা হয়েছে। আকাশ সম্বন্ধে আমাদের একটি জড়-জাগতিক ধারণা আছে। এই জড় আকাশের কথা যখনই আমরা ভাবি, তখন সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ, নক্ষত্র আদির কথা আপনা থেকেই মনে আসে। কিন্তু এই শ্লোকে ভগবান বলেছেন যে, দিব্য আকাশকে আলোকিত করার জন্য সূর্য, চন্দ্র, অগ্নি অথবা কোন বৈদ্যুতিক আলোর প্রয়োজন হয় না, কারণ সেই আকাশ দিব্য ব্রহ্মজ্যোতির দ্বারা আলোকিত। এই ব্রহ্মজ্যোতি হচ্ছে ভগবানের দেহনির্গত রশ্মিচ্ছটা। অন্যান্য গ্রহাদিতে পৌঁছানোর জন্য আমরা কঠিন পরিশ্রম করছি, কিন্তু পরমেশ্বরের আলয় সম্বন্ধে ধারণা করা কিছুই কঠিন নয়। ভগবানের দিব্য ধামের নাম গোলোক। ব্রহ্মসংহিতায় (৫/৩৭) এই গোলোকের খুব সুন্দর বিবরণ আছে-গোলোক এব নিবসত্যখিলত্মভূতঃ। ভগবান চিরকালই তাঁর আলয় গোলোকে অবস্থান করেন, তবু এই জগতে থেকেও তাঁর সমীপবর্তী হওয়া যায় এবঙ এই জগতে ভগবান তাঁর প্রকৃত সচ্চিদানন্দময় রূপ নিয়ে আবির্ভূত হন।তিনি যখন তাঁর এই রূপ নিয়ে প্রকাশিত হন, তখন আর তাঁর রূপ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা করার কোন প্রয়োজনীয়তা আমাদের থাকে না। এই ধরনের জল্পনা-কল্পনা থেকে মানুষকে নিবৃত্ত করবার জন্য তিনি তার স্বরূপে অবতীর্ণ হন এবং তাঁর শ্যামসুন্দর রূপ প্রদর্শন করেন। দুর্ভাগ্যবশত অল্পবুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরা তাঁকে চিনতে পারে না এবং তাঁকে সাধারণ মানুষ বলে মনেউপহাস করে। ভগবান আমাদের কাছেআমাদেরই মতো একজনের রূপ নিয়ে আসেন এবংআমাদের সঙ্গে লীলাখেলা করেন, কিন্তু তাই বলে তাঁকে আমাদের মতো একজন বলে মনে করা উচিত নয়। তাঁর অনন্ত শক্তির প্রভাবে তিনি তাঁর অপ্রাকৃত রূপ নিয়ে আমাদের সামনে আসেন এবং তাঁর লীলা প্রদর্শন করেন।তাঁর আপন আলয় গোলক বৃন্দাবনে তাঁর যে লীলা, এই লীলা তাঁরই প্রতিরূপ।

চিন্ময় আকাশের ব্রহ্মজ্যোতিতে অসংখ্য গ্রহ ভাসছে। এই ব্রহ্মজ্যোতিতে বিচ্ছুরিত হচ্ছে পরম ধাম কৃষ্ণলোক এবং জড় পদার্থ দ্বারা গঠিত নয় সেই রকম অসংখ্য আনন্দময় চিন্ময় গ্রহ সেই ব্রহ্মজ্যোতিতে ভাসছে। ভগবান বলেছেন-ন তদ্‌ভাসয়তে সূর্যো না শশাঙ্কো ন পাবকঃ / যদ্‌গত্বা ন নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম। যে একবার সেই অপ্রাকৃত আকাশে যায়, তাকে আর এই জড় আকাশে নেমে আসতে হয় না। এই জড়-জাগতিক আকাশে, চাঁদের কথা ছেড়েই দিলাম, যদি মানুষ সবচেয়ে ঊর্ধ্বে যে ব্রহ্মলোক আছে সেখানেও যায়, তবে দেখবে যে, সেখানেও এখানকার মতো জন্ম, মৃত্যু, জরা ও ব্যাধির হাত থেকে নিস্তার নেই। এই জড় জগতের কোন গ্রহলোকের পক্ষেই এই চারটি জড় নিয়মের হাত থেকে নিস্তার পাওয়া সম্ভব নয়।

ক্রমশঃ

মুখবন্ধ-০৬ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যথাযথ)


বর্তমান জগতে ধর্ম বলতে আমরা সাধারণত যা বুঝি, সনাতন ধর্ম ঠিক তা নয়। ধর্ম বলতে সাধারণত কোন বিশ্বাসকে বোঝায়, এবং এই বিশ্বাসের পরিবর্তন হতে পারে। কোন বিশেষ পন্থার প্রতি কারও বিশ্বাস থাকতে পারে, এবং সে এই বিশ্বাসের পরিবর্তন করে অন্য কিছু গ্রহণ করতেও পারে। কিন্তু সনাতন ধর্ম বলতে সেই সব কার্য্যকলাপকে বোঝায়, যা পরিবর্তন হতে পারে না। যেমন, জল থেকে তার তরলতা কখনই বাদ দেওয়া যায় না, আগুন থেকে যেমন তাপ ও আলোককে বাদ দেওয়া যায় না, তেমনই সনাতন জীবেরসনাতন বৃত্তি জীবের থেকে আলাদা করা যায় না। জীবের সঙ্গে তার সনাতন ধর্ম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। সুতরাং যখন আমরা সনাতন ধর্মের কথা বলি, তখন শ্রীপাদ রামানুজাচার্যের প্রামাণ্য ভাষ্য মেনে নিতে হবে যে,এর কোন আদি-অন্ত নেই। যার কোন আদি নেই, অন্ত নেই, সেই ধর্ম কখনই সাম্প্রদায়িক হতে পারে না। এই ধর্ম সমস্ত জীবের ধর্ম, তাই তাকে কখনই কোন সীমার মধ্যে সীমিত রাখা যায় না। একে কোন সম্প্রদায়ের মধ্যে বদ্ধ রাখাও চলে না। কিন্তু তবু কিছু সাম্প্রদায়িক লোক মনে করে যে, ‘সনাতন ধর্মওএকটি সাম্প্রদায়িক ধর্ম, কিন্তু এটি তাদের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্কীর্ণতা ও বিকৃত বুদ্ধিজাত অন্ধতার প্রকাশ। আমরা যখন আধুনিক বিজ্ঞানের পরিপ্রেক্ষিতে সনাতন ধর্মের যথার্থতা বিশ্লেষণ করি, তখন দেখি যে এই ধর্ম পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের ধর্ম-শুধু তাই নয়, এই ধর্ম সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি জীবের ধর্ম।

অসনাতন ধর্মবিশ্বাসের সূত্রপাতের ইতিহাস পৃথিবীর ইতিহাসের বর্ষপঞ্জিতে লেখা থাকতে পারে, কিন্তু সনাতন ধর্মের সূত্রপাতের কোন ইতিহাস নেই, কারণ সনাতন ধর্ম সনাতন জীবের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত থেকে চিরকালই বর্তমান। জীব সম্বন্ধেও শাস্ত্রে বলা হয়েছে যে, সে জন্ম-মৃত্যুর অতীত। ভগবদ্‌গীতাতে বলা হয়েছে যে, জীবের জন্ম নেই, মৃত্যু নেই। সে শাশ্বত ও অবিনশ্বর এবং তার দেহের মুত্যু হলেও তার কখনই মৃত্যু হয় না। সনাতন ধর্ম বলতে যে ধর্ম বোঝায়, তা আমাদের বুঝতে হবে ধর্ম কথাটির সংস্কৃত অর্থের মাধ্যমে। ধর্ম বলতে বোঝায় যা অপরিহার্য অঙ্গরূপে কোন কিছুর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত থাকে। যেমন, তাপ ও আলোক এই দুটি গুণ আগুণের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাপ ও আলোক ছাড়া আগুনের কোন রকম প্রকাশ হতে পারে না। তেমনই জীবের অপরিহার্য অঙ্গ কি? জীবের অস্তিত্বের প্রকাশ কিভাবে হয়? তার নিত্য সঙ্গীরূপে যা তার সঙ্গে চিরকাল বিদ্যমান তা কি? তার এই নিত্য সঙ্গী হচ্ছে তার শাশ্বত গুণবৈশিষ্ট্য এবং এই শাশ্বত গুণবৈশিষ্ট্যই হচ্ছে তার সনাতন ধর্ম।

সনাতন গোস্বামী যখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুকে জীবের স্বরূপ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করেন, তখন শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেন, “জীবের স্বরূপ হয়-কৃষ্ণের নিত্যদাস।” পরম পুরুষোত্তম ভগবানের নিত্যদাসত্বই হচ্ছে জীবের স্বরূপ-বৈশিষ্ট। শ্রীমন্মহাপ্রভুর এই উক্তির বিশ্লেষণ যদি আমরা করি, তা হলে আমরা সহজেই বুঝতে পারি যে, প্রতিটি জীবই সর্বক্ষণ কারও না কারও সেবায় ব্যস্ত। এভাবে অপরের সেবা করার মাধ্যমেই জীব জীবনকে উপভোগ করে। নীচুস্তরের পশুরা ভৃত্য যেভাবে প্রভুর সেবা করে, ঠিক সেভাবে মানুষের সেবা করে। মানুষের ক্ষেত্রেও আমরা দেখতে পাই যে, ‘প্রভুকে সেবা করে, ‘প্রভুকে সেবা করে, আর সেবা করে প্রভুকে। এভাবে সকলেই কারও না কারও দাসত্ব করে চলেছে। এই পরিবেশে আমরা দেখতে পাই, বন্ধু বন্ধুর সেবা করে, মান সন্তানের সেবা করে, স্ত্রী স্বামীর সেবা করে, স্বামী স্ত্রীর সেবা করে ইত্যাদি। এভাবে খোঁজ করলে দেখা যাবে যে, জীবকুলের সমাজে সেবামূলক কাজের কোন অন্যথা নেই। রাজনীতিবিদেরা জনগণের কাছে তাদের নানা প্রতিশ্রুতি শুনিয়ে তাদের সেবার ক্ষমতা বোঝাবার চেষ্টা করে থাকে। ভোটদাতারা তাই মনে করে যে, রাজনীতিবিদেরা সমাজের খুব ভাল সেবা করতে পারবে, তাই তারা তাদের মূল্যবান ভোট তাদের দিয়ে দেয়। দোকানদর খরিদ্দারের সেবা করে এবং শিল্পী ধনিক সম্প্রদায়ের সেবা করে। ধনিক সম্প্রদায় তাদের পরিবারের সেবা করে এবং পরিবারের প্রতিটি সদস্য নিত্য জীবের নিত্য সামর্থ্য অনুযায়ী রাষ্ট্র ওসমাজের সেবা করে। এভাবে আমরা দেখতে পাই যে, কোন জীবই অপর কোন জীবের সেবা না করে থাকতে পারে না। এর ফলে আমরা সিদ্ধান্ত করতে পারি যে, সেবা হচ্ছে জীবের সর্বকালীন সাথী এবং সেবাকার্যই হচ্ছে জীবের শাশ্বত ধর্ম।

তবুও মানুষ দেশ-কাল-পাত্র অনুসারে হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ইত্যাদির ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করার ফলে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মালম্বী হয়ে পড়ে। এই ধরণের ধর্মবিশ্বাস কখনই সনাতন ধর্ম নয়। কোন হিন্দু তার বিশ্বাস পরিবর্তন করে মুসলমান হতে পারে অথবা কোন মুসলমান তার ধর্ম পরিবর্তন করে হিন্দু হতে পারে, কিংবা কোন খ্রিস্টান যে কোন ধর্মালম্বীই হোক না কেন, মানুষ প্রতিনিয়তই অপরের সেবা করে চলেছে। তাই যে কোন ধর্ম-বিশ্বাসকে অবলম্বন করা এবং সনাতন ধর্মাচরণ করার অর্থ এক নয়। সেবা করাই হচ্ছে সনাতন ধর্ম।

ক্রমশঃ

মুখবন্ধ-০৫ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা যথাযথ)


আমাদের জন্য ভগবান যতটুকু নির্ধারিত করে রেখেছেন, তা কিভাবে সদ্ব্যবহার করতে হবে তার অনেক সুন্দর সুন্দর উদাহরণ আছে। ভগবদ্‌গীতাতেও এর ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রারম্ভে অর্জুন ঠিক করেন তিনি যুদ্ধ করবেন না। এটি ছিল তাঁর নিজের সিদ্ধান্ত। অর্জুন পরমেশ্বর ভগবানকে বলেন যে, সেই যুদ্ধে নিজের আত্মীয়-পরিজনের হত্যা করে রাজ্যভোগ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। দেহাত্মবুদ্ধির ফলে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন যে, তাঁর প্রকৃত স্বরূপ হচ্ছে তাঁর দেহ, এবং তাঁর দেহজাত আত্মীয়-পরিজন, ভাই, ভাইপো, ভগ্নীপতি প্রভৃতিকে তিনি তাঁর আপনজন বলে মনে করেছিলেন। তাই তিনি তাঁর দেহের দাবিগুলি মেটাতে চেয়েছিলেন। তাঁর ঐ ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করার জন্যই ভগবান ভগবদ্‌গীতার দিব্যজ্ঞান তাকে দান করেন। এই জ্ঞান প্রাপ্ত হয়ে তা প্রকৃত অর্থ হৃদয়ঙ্গম করতে পারার ফলেই অর্জুন ভগবানের পরিচালনায় যুদ্ধ করতে ব্রতী হন। তখন তিনি বলেন, করিষ্যে বচনং তব-“তুমি যা বলবে আমি তাই করব।”

এই পৃথিবীতে মানুষ কুকুর-বেড়ালের মতো ঝগড়া করে দিন কাটাবার জন্য আসেনি। তাকে তার বুদ্ধিমত্তা দিয়ে মানব-জীবনের যথার্থ উদ্দেশ্য সম্বন্ধে সচেতন হতে হবে এবং একটি পশুর মতো জীবন যাপন করা বর্জন করতে হবে। সমস্ত বৈদিক শাস্ত্র মানব-জীবনের যথার্থ উদ্দেশ্য সম্বন্ধে নির্দেশ দিচ্ছে, এবং সমস্ত বৈদিক জ্ঞানের সারাংশ ব্যক্ত হয়েছে ভগবদ্‌গীতাতে। বৈদিক সাহিত্য মানুষের জন্য, পশুদের জন্য নয়। তাই প্রতিটি মানুষের কর্তব্য হচ্ছে বৈদিক জ্ঞান হৃদয়ঙ্গম করে মানবজীবন সার্থক করে তোলা। কোন পশু যখন অন্য পশুকে হত্যা করে, তাতে তার পাপ হয় না, কিন্তু মানুষ যদি তার বিকৃত রুচির তৃপ্তি সাধনের জন্য কোন পশুকে হত্যা করে, তখন সে প্রকৃতির নিয়ম ভঙ্গ করার অপরাধে অপরাধী হয়। ভগবদ্‌গীতাতে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করে বলা হয়েছে যে, প্রকৃতির বিভিন্ন গুণ অনুসারে তিন রকমের কর্ম সাধিত হয়, যথা-সত্ত্বগুণের প্রভাবে কর্ম, রজোগুণের প্রভাবে কর্ম এবং তমোগুণের প্রভাবে কর্ম। তেমনই আহার্য বস্তুও আছে তিন ধরনের-সত্ত্বগুণের আহার, রজোগুণের আহার, আর তমোগুণের আহার। এই সবই পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করা আছে এবং যদি আমরা ভগবদ্‌গীতার এই সব নির্দেশ যথার্থভাবে কাজে লাগাই, তা হলে আমাদের সারা জীবন পবিত্র হয়ে উঠবে এবং পরিণামে আমরা এই জড় জগতের আকাশের উর্ধ্বে আমাদের পরম লক্ষ্যে উপণীত হতে পারব (যদ্‌গত্বা ন নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম)।

এই পরম গন্তব্যস্থলের নাম সনাতন ধাম। সেই নিত্য শাশ্বত অপ্রাকৃত জগৎই হচ্ছে আমাদের প্রকৃত আলয়। এই জড় জগতে আমরা দেখতে পাই সব কিছু অস্থায়ী। তাদের প্রকাশ, কিছুকালের জন্য তারা অবস্থান করে, কিছু ফল প্রসব করে, ক্ষয় প্রাপ্ত হয় এবং তারপর এক সময় তারা অদৃশ্য হয়ে যায়। এটিই হচ্ছে জড় জগতের ধর্ম, আমাদের এই দেহ, অথবা এক টুকরো ফল অথবা অন্য যে-কোন কিছুরই দৃষ্টান্ত আমরা দিই না কেন। কিন্তু এই অস্থায়ী জগতের অতীত আর একটি জগৎ আছে, যার কথা আমরা জানতে পারি বৈদিক শাস্ত্রের মাধ্যমে। সেই জগৎ শাশ্বত, সনাতন। বৈদিক শাস্ত্রের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি জীবও শাশ্বত, সনাতন। ভগবদ্‌গীতার একাদশ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, ভগবান সনাতন এবং সনাতন ভগবানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হবার ফলে জীবাত্মাও সনাতন। ভগবানের সঙ্গে আমাদের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রয়েছে, এবং যেহেতু গুণগতভাবে সনাতন ধাম, সনাতন ভগবান ও সনাতন জীব-সবই এক, তাই ভগবদ্‌গীতার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদের সনাতন বৃত্তি অথবা আমাদের সনাতন ধর্মকে পুনর্জাগরিত করা। অস্থায়ীভাবে আমরা নানা ধরনের কর্মে নিয়োজিত হয়ে রয়েছি, কিন্তু এই সমস্ত কর্ম পবিত্রতা অর্জন করতে পারে, যদি আমরা এই সমস্ত অস্থায়ী কর্ম বর্জন করি আর পরমেশ্বর ভগবানের নির্দেশ মতো কর্মভার গ্রহণ করি। এরই নাম পবিত্র জীবন।

ভগবান ও তাঁর দিব্যধাম উভয়ই সনাতন। জীবও সনাতন। জীব যখন তার সনাতন প্রবৃত্তিকে জাগিয়ে তুলে সনাতন ধাম ভগবানের সান্নিধ্যে আসে, তখনই তার জীবন সার্থক হয়ে ওঠে। যেহেতু সমস্ত জীব পরমেশ্বরেরই সন্তান, সেই কারণে তাদের সকলেরই প্রতি তিনি পরম করুণাময়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভগবদ্‌গীতাতে (১৪/৪) বলেছেন, সর্বযোনিষু কৌন্তেয় মূর্তয়ঃ সম্ভবন্তি যাঃ/তাসাং ব্রহ্ম মহদ্‌যোনিরহং বীজপ্রদঃ পিতা-“হে কৌন্তেয়! সমস্ত যোনিতে যে সমস্ত দেহ উৎপন্ন হয়, ব্রহ্মরূপা প্রকৃতিই তাদের জননী এবং আমিই বীজ প্রদানকারী পিতা।” অবশ্যই বিভিন্ন কর্ম অনুসারে সব করমের জীব রয়েছে, কিন্তু এখানে ভগবান বলেছেন যে, তিনি সকলেরই পিতা। তাই এই পৃথিবীতে ভগবান অবতরণ করেন এই সমস্ত পতিত, বদ্ধ জীবাত্মাদের উদ্ধার করবার জন্য, যাতে তারা তাদের শাশ্বত সনাতন অবস্থা ফিরে পেয়ে ভগবানের সঙ্গে চিরন্তন সঙ্গ লাভ করে এবং সনাতন শাশ্বত চিদাকাশে আবার অধিষ্ঠিত হতে পারে। ভগবান স্বয়ং বিভিন্ন অবতাররূপে অবতরণ করেন, কখনও বা তিনি তাঁর বিশ্বস্ত অনুচরকে অথবা তাঁর প্রিয় সন্তানকে পাঠান, কখনও বা তাঁর অনুগামী ভৃত্যকে বা আচার্যকে পাঠন বদ্ধ জীবাত্মাদের উদ্ধার করবার জন্য।

তাই সনাতন ধর্ম বলতে কোন সাম্প্রদায়িক ধর্মপদ্ধতিকে বোঝায় না। এটি হচ্ছে পরম শাশ্বত ভগবানের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত নিত্য শাশ্বত জীবসকলের নিত্য ধর্ম। আগেই বলা হয়েছে, সনাতন ধর্ম হচ্ছে জীবের নিত্য ধর্ম। শ্রীপাদ রামানুজাচার্য সনাতন শব্দটির ব্যাখ্যা করে বলেছেন, “যার কোন শুরু নেই এবং শেষ নেই।” তাই যখন আমরা সনাতন ধর্মের কথা বলি, শ্রীপাদ রামানুজাচার্যের নির্দেশনুসারে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, এই ধর্মের আদি নেই এবং অন্ত নেই।

 

ক্রমশঃ