বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়


কথাসাহিত্যিক
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ( জন্মঃ- ১২ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৪ – মৃত্যুঃ- ১লা নভেম্বর, ১৯৫০)

বিভূতিভূষণ পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগণা জেলার কাঁচরাপাড়ার নিকটবর্তী ঘোষপাড়া-সুরারিপুর গ্রামে নিজ মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস উত্তর ২৪ পরগণা জেলার বারাকপুর গ্রামে। তার পিতা মহানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন প্রখ্যাত সংস্কৃত পণ্ডিত। পাণ্ডিত্য এবং কথকতার জন্য তিনি শাস্ত্রী উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। মাতা মৃণালিনী দেবী। পিতামাতার পাঁচ সন্তানের মধ্যে বিভূতিভূষণ ছিলেন সবার বড়।

পিতার কাছে বিভূতিভূষণের পড়ালেখার পাঠ শুরু হয়। এরপর নিজ গ্রাম ও অন্য গ্রামের কয়েকটি পাঠশালায় পড়াশোনার পর বনগ্রাম উচ্চ ইংরাজী বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে তিনি অবৈতনিক শিক্ষার্থী হিসেবে পড়ালেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি মেধাবী ছিলেন। অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময় পিতা মারা যান। ১৯১৪ সালে প্রথম বিভাগে এনট্রান্স এবং ১৯১৬ সালে কলকাতার রিপন কলেজ (বর্তমানে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) থেকে প্রথম বিভাগে আইএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯১৮ সালে একই কলেজ থেকে বিএ পরীক্ষায়ও ডিস্টিইংশনসহ পাশ করেন। এরপর তিনি এমএ ও আইন বিষয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে হুগলী জেলার জাঙ্গীপাড়ায় দ্বারকানাথ হাইস্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ার সময় বসিরহাটের মোক্তার কালীভূষণ মুখোপাখ্যায়ের কন্যা গৌরী দেবীর সাথে বিয়ে হয়। কিন্তু বিয়ের এক বছর পরই গৌরী দেবী মারা যান। স্ত্রীর শোকে তিনি কিছুদিন প্রায় সন্ন্যাসীর মতো জীবনযাপন করেন। পরে ১৩৪৭ সালে ফরিদপুর জেলার ছয়গাঁও নিবাসী ষোড়শীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে রমা দেবীকে বিয়ে করেন। বিয়ের সাত বছর পর একমাত্র সন্তান তারাদাস বন্দোপাধ্যায় জন্মগ্রহণ করেন।

শিক্ষকতার মাধ্যমে পেশাগত জীবনে প্রবেশ করেন। এসময় কিছুদিন গোরক্ষিণী সভার প্রচারক হিসেবে বাংলা, ত্রিপুরা ও আরাকানের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করেন। পরে খেলাৎচন্দ্র ঘোষের বাড়িতে সেক্রেটারি, গৃহশিক্ষক এবং তাঁর এস্টেটের ভাগলপুর সার্কেলের সহকারী ম্যানেজারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিছুদিন আবার ধর্মতলার খেলাৎচন্দ্র মেমোরিয়াল স্কুলে শিক্ষকতা করেন। এরপর যোগ দেন গোপালনগর স্কুলে। এই স্কুলেই তিনি আমৃত্যু কর্মরত ছিলেন। এই মহান কথাসাহিত্যিক ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ১লা নভেম্বর তারিখে বিহারের(বর্তমানে ঝাড়খন্ড) ঘাটশিলায় মৃত্যুবরণ করেন।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় মূলত উপন্যাস ও ছোটগল্প লিখে খ্যাতি অর্জন করেন। পথের পাঁচালী ও অপরাজিত তাঁর সবচেয়ে বেশি পরিচিত উপন্যাস। অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে আরণ্যক, আদর্শ হিন্দু হোটেল, ইছামতী ও অশনি সংকেত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উপন্যাসের পাশাপাশি বিভূতিভূষণ প্রায় ২০টি গল্পগ্রন্থ, কয়েকটি কিশোরপাঠ্য উপন্যাস ও কয়েকটি ভ্রমণকাহিনি এবং দিনলিপিও রচনা করেন। বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী উপন্যাস অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত চলচ্চিত্রটি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন।

১৯২১ খ্রিস্টাব্দে (১৩২৮ বঙ্গাব্দ) প্রবাসী পত্রিকার মাঘ সংখ্যায় উপেক্ষিতা নামক গল্প প্রকাশের মধ্য দিয়ে তার সাহিত্যিক জীবনের সূত্রপাত ঘটে। ভাগলপুরে কাজ করার সময় ১৯২৫ সালে তিনি পথের পাঁচালী রচনা শুরু করেন। এই বই লেখার কাজ শেষ হয় ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে। এটিই বিভূতিভূষণের প্রথম এবং শ্রেষ্ঠ রচনা। এর মাধ্যমেই তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। এরপর অপরাজিত রচনা করেন যা পথের পাঁচালীরই পরবর্তী অংশ। উভয় উপন্যাসেই তার ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিফলন ঘটেছে। বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় পথের পাঁচালী উপন্যাসের কাহিনীকে চলচ্চিত্রে রূপদানের মাধ্যমে তার চলচ্চিত্র জীবনের সূচনা করেছিলেন। এই চলচ্চিত্রও দেশী-বিদেশী প্রচুর পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছিল। এরপর অপরাজিত এবং অশনি সংকেত উপন্যাস দুটি নিয়েও সত্যজিৎ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। এর সবগুলোই বিশেষ প্রশংসা অর্জন করেছিল। পথের পাঁচালী উপন্যাসটি ভারতীয় ভাষা এবং ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

পুরস্কার ও সম্মাননা
রবীন্দ্র পুরস্কার – ১৯৫১ (মরণোত্তর), ইছামতী উপন্যাসের জন্য
পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বনগাঁ মহকুমার (লেখকের জন্মস্থান) পারমাদান বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের নাম লেখকের সম্মানার্থে রাখা হয়েছে “বিভূতিভূষণ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য”।

গ্রন্থতালিকা
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে:
উপন্যাস
পথের পাঁচালি (১৯২৯)
অপরাজিত (১ম ও ২য় খণ্ড, ১৯৩২)
দৃষ্টিপ্রদীপ (১৯৩৫)
আরণ্যক (১৯৩৯)
আদর্শ হিন্দু হোটেল (১৯৪০)
বিপিনের সংসার (১৯৪১)
দুই বাড়ি (১৯৪১)
অনুবর্তন (১৯৪২)
দেবযান (১৯৪৪)
কেদার রাজা (১৯৪৫)
অথৈজল (১৯৪৭)
ইচ্ছামতী (১৯৫০)
অশনি সংকেত (অসমাপ্ত, বঙ্গাব্দ ১৩৬৬)
দম্পতি (১৯৫২) গল্প-সংকলন
মেঘমল্লার (১৯৩২)
মৌরীফুল (১৯৩২)
যাত্রাবাদল (১৯৩৪)
জন্ম ও মৃত্যু (১৯৩৮)
কিন্নর দল (১৯৩৮)
বেণীগির ফুলবাড়ী (১৯৪১)
নবাগত (১৯৪৪)
তালনবমী (১৯৪৪)
উপলখন্ড (১৯৪৫)
বিধুমাস্টার (১৯৪৫)
ক্ষণভঙ্গুর (১৯৪৫)
অসাধারণ (১৯৪৬)
মুখোশ ও মুখশ্রী (১৯৪৭)
আচার্য কৃপালিনী কলোনি (বর্তমান নাম ‘নীলগঞ্জের ফালমন সাহেব’, ১৯৪৮)
জ্যোতিরিঙ্গন (১৯৪৯)
কুশল-পাহাড়ী (১৯৫০)
রূপ হলুদ (১৯৫৭)
অনুসন্ধান (বঙ্গাব্দ ১৩৬৬)
ছায়াছবি (বঙ্গাব্দ ১৩৬৬)
সুলোচনা (১৯৬৩) কিশোরপাঠ্য
চাঁদের পাহাড় (১৯৩৮)
আইভ্যানহো (সংক্ষেপানুবাদ, ১৯৩৮)
মরণের ডঙ্কা বাজে (১৯৪০)
মিসমিদের কবচ (১৯৪২)
হীরা মাণিক জ্বলে (১৯৪৬)
সুন্দরবনের সাত বৎসর (ভুবনমোহন রায়ের সহযোগিতায়, ১৯৫২)
ভ্রমণকাহিনী ও দিনলিপি
অভিযাত্রিক (১৯৪০)
স্মৃতির রেখা (১৯৪১)
তৃণাঙ্কুর (১৯৪৩)
ঊর্মিমুখর (১৯৪৪)
বনে পাহাড়ে (১৯৪৫)
উৎকর্ণ (১৯৪৬)
হে অরণ্য কথা কও (১৯৪৮) অন্যান্য
বিচিত্র জগৎ (১৯৩৭)
টমাস বাটার আত্মজীবনী (১৯৪৩)
আমার লেখা (বঙ্গাব্দ ১৩৬৮)
প্রবন্ধাবলী
পত্রাবলী
দিনের পরে দিন

Advertisements

ডঃ ভূপেন হাজারিকা


গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক এবং কণ্ঠশিল্পী
ডঃ ভূপেন হাজারিকা (জন্মঃ- ৮ সেপ্টেম্বর, ১৯২৬ – মৃত্যুঃ- ৫ নভেম্বর, ২০১১)

ভূপেন হাজারিকা একজন স্বনামধন্য কন্ঠ শিল্পী ও ভারতীয় সঙ্গীত জগতের পুরোধা ব্যক্তিত্ব এবং বিশ্বশিল্পী। এই কিংবদন্তিতুল্য কণ্ঠশিল্পীর জন্ম ভারতের অসমে। অত্যন্ত দরাজ গলার অধিকারী এই কণ্ঠশিল্পীর জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী। অসমিয়া চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে গানের জগতে প্রবেশ করেন তিনি। পরবর্তীকালে বাংলা ও হিন্দি ভাষায় গান গেয়ে ভারত এবং বাংলাদেশে অসম্ভব জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

জীবনী
আসামের সদিয়ায় ভূপেন হাজারিকার জন্ম। তাঁর পিতার নাম নীলকান্ত হাজারিকা, মায়ের নাম শান্তিপ্রিয়া হাজারিকা। পিতা-মাতার দশ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন সকলের বড়।

ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত ভূপেন হাজারিকা কানাডায় বসবাসরত প্রিয়ম্বদা প্যাটেলকে বিয়ে করেন। একমাত্র সন্তান তেজ হাজারিকা নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন।

শিক্ষাগ্রহণ
তিনি ১৯৪২ সালে গুয়াহাটির কটন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট আর্টস, কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৪ সালে বি.এ. এবং ১৯৪৬ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম.এ. পাস করেন। ১৯৫২ সালে নিউ ইয়র্কের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচ.ডি. ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল “প্রাপ্তবয়স্কদের শিক্ষায় শ্রবণ-দর্শন পদ্ধতি ব্যবহার করে ভারতের মৌলিক শিক্ষাপদ্ধতি প্রস্তুতি-সংক্রান্ত প্রস্তাব”।

কর্মজীবন
ড. ভূপেন হাজারিকা তাঁর ব্যারিটোন কণ্ঠস্বর ও কোমল ভঙ্গির জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তাঁর রচিত গানগুলি ছিল কাব্যময়। গানের উপমাগুলো তিনি প্রণয়-সংক্রান্ত, সামাজিক বা রাজনৈতিক বিষয় থেকে তুলে আনতেন। তিনি আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়ে লোকসঙ্গীত গাইতেন।

তিনি মাত্র ১০ বছর বয়স থেকেই গান লিখে সুর দিতে থাকেন। আসামের চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের সূচনা হয় এক শিশুশিল্পী হিসেবে। ১৯৩৯ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি অসমীয়া ভাষায় নির্মিত দ্বিতীয় চলচ্চিত্র জ্যোতিপ্রসাদ আগরওয়ালা পরিচালিত ইন্দুমালতী ছবিতে “বিশ্ববিজয় নওজোয়ান” শিরোনামের একটি গান গেয়েছিলেন। পরে তিনি অসমীয়া চলচ্চিত্রের একজন নামজাদা পরিচালক হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশ, আসাম ও তার প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল ব্যাপক ও বিশাল। অসমীয়া ভাষা ছাড়াও বাংলা ও হিন্দি ভাষাতেও তিনি সমান পারদর্শী ছিলেন এবং অনেক গান গেয়েছেন। অবশ্য এসব গানের অনেকগুলোই মূল অসমীয়া থেকে বাংলায় অনূদিত।

বাংলা গান
ভূপেন হাজারিকার গানগুলোতে মানবপ্রেম, প্রকৃতি, ভারতীয় সমাজবাদের, জীবন-ধর্মীয় বক্তব্য বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। এছাড়াও, শোষণ, নিপীড়ন, নির্যাতনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ প্রতিবাদী সুরও উচ্চারিত হয়েছে বহুবার।

আজ জীবন খুঁজে পাবি
আমি এক যাযাবর
আমায় ভুল বুঝিস না
একটি রঙ্গীন চাদর
ও মালিক সারা জীবন
গঙ্গা আমার মা প্রতিধ্বনি শুনি
বিস্তীর্ণ দুপারে
মানুষ মানুষের জন্যে
সাগর সঙ্গমে
হে দোলা হে দোলা
চোখ ছলছল করে
চলচ্চিত্র জগতে

পুরস্কার
২৩তম জাতীয় চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ আঞ্চলিক চলচ্চিত্র ‘চামেলী মেমসাহেব’ ছবির সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন তিনি।(১৯৭৫)
পদ্মশ্ৰী (১৯৭৭)
‘শ্রেষ্ঠ লোকসঙ্গীত শিল্পী’ হিসেবে ‘অল ইন্ডিয়া ক্রিটিক অ্যাসোসিয়েশন পুরস্কার’ (১৯৭৯)
অসম সরকারের শঙ্করদেব পুরস্কার (১৯৮৭)
দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার (১৯৯২)

জাপানে এশিয়া প্যাসিফিক আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে রুদালী ছবির শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালকের পুরস্কার অর্জন। তিনিই প্রথম ভারতীয় হিসেবে এই পুরস্কার পান। (১৯৯৩)
পদ্মভূষণ (২০০১)
অসম রত্ন (২০০৯)
সঙ্গীত নাটক অকাদেমি পুরস্কার (২০০৯)

স্বীকৃতি
১৯৯৩ সালে ড. ভুপেন হাজারিকা অসম সাহিত্য সভার সভাপতি হন।
১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ সালে অল আসাম স্টুডেন্টস্‌ ইউনিয়নের উদ্যোগে গুয়াহাটির ডিঘালিফুখুহুরি হ্রদের তীরবর্তী জিএসবি রোডে একটি স্মারক ভাস্কর্য তৈরী করে। আসামের ভাস্কর্যশিল্পী বিরেন সিংহ ফাইবার গ্লাস ও অন্যান্য পদার্থ সহযোগে চমকপ্রদ ‘ড. ভুপেন হাজারিকা ভাস্কর্য’ তৈরী করেন।

মৃত্যু
ড. ভূপেন হাজারিকাকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় মুম্বইয়ের কোকিলাবেন ধীরুভাই আম্বানী হাসপাতাল ও চিকিৎসা গবেষণা ইন্সটিটিউটের আইসিইউতে ৩০ জুন, ২০১১ সালে ভর্তি করা হয়। অতঃপর তিনি কিডনী বৈকল্যসহ বার্ধক্যজনিত সমস্যায় জর্জরিত হয়ে ৫ নভেম্বর, ২০১১ সালে স্থানীয় সময় (আইএসটি) বিকাল ৪:৩৭ ঘটিকায় ধরাধাম ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে এই গুণী শিল্পীর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।
…………………………
মানুষ মানুষের জন্যে
জীবন জীবনের জন্যে
একটু সহানুভূতি কি
মানুষ পেতে পারে না… ও বন্ধু।
মানুষ মানুষকে পণ্য করে,
মানুষ মানুষকে জীবিকা করে,
পুরোনো ইতিহাস ফিরে এলে
লজ্জা কি তুমি পাবে না… ও বন্ধু।
বলো কি তোমার ক্ষতি
জীবনের অথৈ নদী
পার হয় তোমাকে ধরে
দুর্বল মানুষ যদি।
মানুষ যদি সে না হয় মানুষ
দানব কখনো হয় না মানুষ
যদি দানব কখনো বা হয় মানুষ
লজ্জা কি তুমি পাবে না… ও বন্ধু।
……………………………

কথা – শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায় সুর – ভূপেন হাজারিকা

বিস্তীর্ণ দুপারের অসংখ্য মানুষের
হাহাকার শুনেও
নিঃশব্দে নিরবে ও গঙ্গা তুমি
গঙ্গা বইছ কেন
নৈতিকতার স্খলন দেখেও
মানবতার পতন দেখেও
নির্লজ্জ অলস ভাবে বইছ কেন
সহস্র বরষার উন্মাদনার মন্ত্র দিয়ে
লক্ষ জনেরে সবল সংগ্রামী
আর অগ্রগামী করে তোলনা কেন
জ্ঞান বি‌হীন নিরক্ষরের
খাদ্য বিহীন নাগরিকের
নেতৃবিহীনতায় মৌন কেন
সহস্র বরষার উন্মাদনার মন্ত্র দিয়ে
লক্ষ জনেরে সবল সংগ্রামী
আর অগ্রগামী করে তোলনা কেন
ব্যক্তি যদি ব্যক্তি কেন্দ্রিক
সমষ্টি যদি ব্যক্তিত্বরোহী
তবে শিথিল সমাজকে ভাঙ না কেন
সহস্র বরষার উন্মাদনার মন্ত্র দিয়ে
লক্ষ জনেরে সবল সংগ্রামী
আর অগ্রগামী করে তোলনা কেন
স্রোতস্বিনী কেন নাহি বও
তুমি নিশ্চই জা‌‌হ্ণবী নও
তা‌হলে প্রেরণ দাও না কেন
উন্মত্ত ধরার কুরুক্ষেত্রের
শর শয্যাকে আলিঙ্গন করা
লক্ষ কোটি ভারত বাসিকে
জাগালে না কেন

অকাল বোধন


অকাল বোধন
স্বামী হৃদয়ানন্দ মহারাজ (লালন)

Related image
শাস্ত্রে উল্লেখ্য যে, মনুষ্যকুলের ছয়মাস দেবতাদের এক দিন। ঘন্টার হিসেবে ১২ ঘন্টা বাকী, ছয়মাস দেবতাদের ১ রাত্রি। ঘন্টার হিসেবে ১২ ঘন্টা অর্থাৎ দেবতাদের দিনে রাতে ২৪ ঘন্টায় মনুষ্যকুলের ১ বছর / ১২ মাস এর মধ্যে উত্তরায়নপর্ব দেবতাদের দিন। দক্ষিনায়নপর্ব রাত। তাই দেবতাদের উত্তরায়ন পর্বে যাগ-যজ্ঞদির উৎকৃষ্ট সময়। কারণ এসময় দেবতারা জাগ্রত থাকেন। কিন্তু শ্রীরামচন্দ্র রাবনকে বধ করবার জন্য মহামায়ার কৃপা লাভের উদ্দেশ্যে দেবীর অকাল বোধন করেছিলেন।
বোধন শব্দের শাব্দিক অর্থ বোধসম্পাদন করা অর্থাৎ জাগ্রত করা। ঋতুর গণনায় শরত কাল থেকে দক্ষিণায়ন ও বসন্তকাল থেকে উত্তরায়ণ। উত্তরায়ণে দেবীর পূজাতে বাসন্তী পূজা ও শরৎকালে দক্ষিনায়ণে দেবীর পূজাকে শারদীয় দুর্গা পূজা বলা হয়। অসময়ে বা অকালে (রাত্রিতে) দেবীর আরাধনা করা হয় বলে শরৎকালীন দুর্গাপূজাকে বলা হয় অকালবোধন। এই অকালবোধন বিল্ববৃক্ষে করা হয়। বিল্ববৃক্ষ দেবীর খুব প্রিয়। বিল্ববৃক্ষে প্রণামমন্ত্রে বলা হয়েছে “মহাদেব প্রিয়কর বাসু দেব প্রিয় সদা উমাপ্রীতি করো যম্মাদ্বিল্ববৃক্ষ নমোস্ততে ॥”
পুরান ও
তন্ত্রশাস্ত্রে ও বিল্ববৃক্ষের নানা প্রকার মহিমা বর্ণিত আছে। প্রাচীন কালে ঋষিরা দুটি অরণী কাষ্ঠের ঘর্ষণের দ্বারা অগ্নি প্রজ্বলন করে যজ্ঞ নিস্পন্ন করতেন। যজ্ঞ কাষ্ঠের মধ্যে বিল্ব কাষ্ঠ অন্যতম। একমতে অরণী কাঠের অগ্নি প্রজ্জ্বলনই বোধন। কল্পনা করা হয়, অগ্নিবর্ণা দুর্গা বিল্ববৃক্ষে নিদ্রিতা। তাকে তপস্যা দ্বারা জাগিয়ে সাধক তার কাংখিত ফল লাভ করবেন- এজনই বোধন। দেবী পুরাণে দুর্গা পূজাকে অশ্বমেধ যজ্ঞের সাথে তুলনা করা হয়েছে। “অশ্বমেধ অবাপ্নতি ভক্তিনা সুরসত্তমা মহা নবম্যিয়াম পূজয়েয়ম সর্বকাম প্রদায়িকা ॥”
যোগিনী তন্ত্রে শিব পার্বতীকে বলছেন- “অতস্তম বিল্ববৃক্ষমাশ্রিত্ব তিষ্ঠামীচ দিবানীসম সর্বোতীর্থ।
ময়ো দেবী সর্ব দেব ময়া সদা শ্রী বৃক্ষস্ব: পরমেশ্বানী এতএব ন সংশয়:”
সরলার্থ: বিল্ববৃক্ষকে আশ্রয় করে আমি দিবানিশী অবস্থান করব। এই বিল্ববৃক্ষ সর্বোতীর্থময় এবং সর্বদেবোময়। এ বিষয়ে সংশয় নেই।
রাম যেমন অসুর রাবনকে বধ করার জন্য মহামায়ার আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন তেমনি সকলের মনের অসুর প্রবৃত্তির বিনাশ হোক, মায়ের কাছে এই প্রার্থনা জানাই তিনি যেন আমাদের অন্তরের আসুরিক শক্তির বিনাশ করে শুভ শক্তির উদ্বোধন করেন।
কালিকাপুরাণে দেবীর বোধনমন্ত্রে বলা হচ্ছে “শ্রীবৃক্ষে বোধয়ামি ত্বাং যাবৎ পুজাং করোম্যহম্” অর্থাৎ শ্রীবৃক্ষে (বিল্ববৃক্ষ) দেবীরই বোধন ও পূজা করছি। সুতরাং অসময়ের দেবীর এই বোধন যেন শুভ অশুভের দ্বন্দ্বে দেবীর মহাশক্তিরই জাগরণ। তাই মহালয়ার আগমনী গানে উচ্চারিত হচ্ছে “জাগো, তুমি জাগো, জাগো দুর্গা, জাগো দশপ্রহরণধারিণী, অশুভ শক্তি বল প্রদায়িনী তুমি জাগো”।
পরিশেষে, বলা যায় প্রকৃতপক্ষে বোধন হচ্ছে আমাদের মনের দৈবী প্রকৃতির উদ্বোধন বা জাগরণ ঘটানো।
যা দেবী সর্বভূতেষু চেতনেত্যভিধীয়তে।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ॥ শ্রীশ্রী চন্ডী ৫-১৭/১৮/১৯
অর্থাৎ, যে দেবী সর্বপ্রাণীতে চেতনারূপে অবস্থিতা তাঁকে পুন: পুন: নমস্কার।
লেখক: আশ্রম প্রদান, রামকৃষ্ণ মিশন, সুনামগঞ্জ।

রাখি বন্ধনের নেপথ্যের ইতিহাস:


‘রাখি বন্ধন’ উৎসবের প্রীতি ও শুভেচ্ছা।


রাখি বন্ধন নেপথ্যের ইতিহাস কি?
রাখি বন্ধন ভারতবর্ষ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে পালনীয় ঘরোয়া উৎসব। রাখি মানেই রক্ষা বন্ধন উৎসব। রক্ষা বন্ধন উৎসবে ভাই-বোন কে রক্ষার প্রতিশ্রুতি এবং বোন ভাইয়ের কল্যাণ কামনায় প্রার্থনা করে থাকেন। এই পৃথিবীর সমস্ত কিছুই একে অপরের সঙ্গে এক নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ। মানব সংসারের এই বন্ধনের ভিত্তি হল স্নেহ, প্রেম, মায়া। ভারতবর্ষে সব উৎসবের মূল মন্ত্রই হল মিলনের মন্ত্র, ঐক্যের সুর।
এই উৎসব সম্পর্কে তিনটি তথ্য পাওয়া যায়। এক রামায়নে শ্রীরাম সমস্ত বানর সেনাদের ফুল দিয়ে রাখি বেধে ছিলেন। দুই লক্ষ্মী বলিকে ভাই হিসেবে মেনে রাখি পরিয়েছিল যাতে সে উপহার স্বরূপ বিষ্ণুকে স্বর্গে তার কাছে ফিরে যেতে বলে, তিন সাম্প্রদায়িকতা মেটাতে রবীন্দ্রনাথ জাতি ধর্ম নির্বিশেষে রাখি বন্ধন উৎসব প্রচলন করেন। যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ২ এর নিয়মই পালন করা হয়। এই নিয়মটি যদিও একটি একাধিপত্যের বার্তা বহন করে এবং সম্পর্কে মানুষকে সচেতন হতে হবে। এখন অবশ্য জায়গায় জায়গায় বিভিন্ন ধরনের রাখি উৎসব পালন করা হয় ,সেটা জাতি ধর্ম নির্বিশেষে রক্ষা বন্ধন উৎসবে ভাইবোনের মধ্যকার স্বর্গীয় সম্পর্ক উদযাপন করা হয়। রাখী নামেও পরিচিত এই রক্ষা বন্ধন প্রতি বছর শ্রাবন মাসের পূর্ণিমার দিন পালন করা হয়। বোনেরা তাদের ভাইদের হাতের কব্জিতে সুন্দর সুন্দর পবিত্র সূতা বেঁধে দেয় যা ‘নিরাপত্তা ও রক্ষা বন্ধন’ চিহ্ন হিসেবে প্রকাশিত। তারা তাদের ভাইদের মঙ্গল কামনা করে এবং ভাইয়েরা বোনদের রক্ষা করা প্রতিশ্রুতি প্রদান করে। ঐ দিন পরিবারের সকলে একত্রে মিলিত হয়, বিশেষ খাবার দাবারের ও উপহারের ব্যবস্থা করা হয় এবং সকলে মিলে আনন্দ ফুর্তিতে মেতে ওঠে। এই বিশেষ দিনে পরিবেশে “যম” তত্ত্ব বেশি থাকে, এতে ভাইয়ের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, কিন্তু রাখি বন্ধনের ফলে তা দূর হয়ে যায়।
রাখি বন্ধনের নেপথ্যের ইতিহাস:


সুভদ্রা কৃষ্ণের ছোট বোন, কৃষ্ণ সুভদ্রাকে অত্যন্ত ভালবাসতেন। তবে আপন বোন না হয়েও দ্রৌপদী ছিলেন কৃষ্ণের অতীব স্নেহভাজন। একদিন সুভদ্রা কিছুটা অভিমান ভরে কৃষ্ণকে প্রশ্ন করলেন এর কারন। উত্তরে কৃষ্ণ বললেন যথা সময়ে এর কারন তুমি বুঝতে পারবে।
এর কিছুদিন পর শ্রীকৃষ্ণের হাত কেটে রক্ত পড়ছিল, তা দেখে সুভদ্রা রক্ত বন্ধের জন্য কাপড় খুঁজছিলেন, কিন্তু মন মত পাতলা সাধারন কাপড় পাচ্ছিলেন না, এর মাঝে দ্রৌপদী সেখানে আসলেন, দেখে বিন্দুমাত্র দেরি না করে সাথে সাথে নিজের মুল্যবান রেশম শাড়ি ছিঁড়ে কৃষ্ণের হাত বেধে দিলেন, কিছুক্ষন পর রক্তপাত বন্ধ হল। তখন শ্রীকৃষ্ণ বোন সুভদ্রা কে ডেকে বললেন- এখন বুঝতে পেরেছ কেন আমি দ্রৌপদীকে এত স্নেহ করি? সুভদ্রা বুঝতে পারল ভক্তি ও পবিত্র ভালবাসা, শ্রদ্ধা কি জিনিস! দাদা কৃষ্ণের চেয়ে মুল্যবান বস্ত্র নিজের কাছে বেশি প্রিয় এটা ভেবে সুভদ্রা দারুন লজ্জিত হলেন। কোন বোন তার ভাইয়ের কোনোরূপ কষ্ট, অমঙ্গল সহ্য করতে পারে না। ভাইয়ের কষ্ট দুরের জন্য সে সর্বত্তম চেষ্টা করে। অন্যদিকে ভাই ও তার বোন কে পৃথিবীতে সর্বাধিক স্নেহ করে, সারাজীবন তাকে রক্ষা করে থাকে, যেরকম শ্রীকৃষ্ণ দ্রৌপদীকে রাজসভায় চরম কলঙ্ক থেকে রক্ষা করেছিলেন। সকল ভাইবোনের উচিত এই পবিত্র দিনে মনে এরকম ভক্তিভাব ও ভালবাসা বজায় রাখা। কৃত্রিমতা, যান্ত্রিকতার এই বর্তমান যুগে ভাই বোনের মাঝে ভালবাসা ও শ্রদ্ধার বড় অভাব। সনাতন ধর্মে বড় বোন/দিদিকে মাতৃস্থানীয় এবং বড় ভাইকে পিতৃস্থানীয় সম্মান ও ভালবাসা দেয়ার কথা বলা আছে।
সংগ্রহীত।
#কৃষ্ণকমল।