আত্মার বিজ্ঞান


640Reincarnation

সমগ্র বিশ্ব এই ভ্রান্ত মোহে কর্মমুখর যে আমরা হচ্ছি এই দেহ। মানুষের সমগ্র কাজকর্মই তাদের জড় শরীরকে ঘিরে আবর্তিত হয়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতায় প্রথম যে বিষয়টি আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন, তা হচ্ছে, “আমরা এই দেহ নই, আমরা চিন্ময় আত্মা।” এমনকি সামান্য একটু চিন্তা করলেই আমরা বুঝতে পারব যে আমরা এই দেহ নই।

আত্মা প্রকৃ্তপক্ষে কি?

আত্মা হচ্ছে জীবনী শক্তির এক চিন্ময় স্ফুলিঙ্গ যা প্রত্যেকটি দেহকে ক্রিয়াশীল করে, সেটিকে বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপ সম্পাদনে সক্ষম করে, ঠিক যেমন ইলেক্ট্রন কণার স্রোত তামার তারের মধ্যে প্রবাহিত হবার সময় শক্-এর সৃষ্টি করে। দেহকে একটি গাড়ীর সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে, আর আত্মাকে তুলনা করা যায় গাড়ীটির চালকের সংগে। আত্মা সেই জীবনের এক স্ফুলিঙ্গ, যার উপস্থিতির ফলে দেহকে জীবন্ত বলে মনে হয়, আর যখন আত্মা দেহটি ছেড়ে চলে যায়, তখন আমরা বলি যে লোকটি ‘মৃত’।
আত্মার অস্তিত্বের বিজ্ঞানভিত্তিক প্রমাণ

(সূত্রঃ ভগবদগীতার সারতত্ব ছয় পর্বের প্রাথমিক পাঠক্রম )

আমারা কেবল জড় পদার্থ ও শক্তির সংগে সমন্বিতভাবে ‘বিজ্ঞান’ শব্দটিকে বুঝতে অভ্যস্ত। কিন্তু আরো এক উচ্ছতর মাত্রায় বিজ্ঞান রয়েছে, যা আত্মা ও অ-জড়, চিন্ময় শক্তি সম্বন্ধে আলোকপাত করে। আত্মা স্বরূপতঃ জড়াতীত, চিন্ময়, অপ্রাকৃত বস্তু। অন্য কথায়, আত্মা মূলগত ভাবেই জড় ইন্দ্রিয়ের প্রত্যক্ষণের পরিধির অতীত। জড়বিজ্ঞানের পরীক্ষা নিরীক্ষামূলক কলাকৌশলগুলি আত্মার অস্তিত্ব ‘প্রমাণ’ করার জন্য অপর্যাপ্ত, অনুপযুক্ত, ঠিক যেমন কানের দ্বারা আলোর অনুভব লাভের চেষ্টা বৃথা। কিন্তু অধ্যাত্ম-বিজ্ঞানের নিয়মবিধির অনুসরণের মাধ্যমে একে এক উচ্চতর বাস্তবতা বলে উপলব্ধি করা যায়। চরমে, সমগ্র পারমার্থিক সত্যই প্রকাশিত ও ‘প্রমাণিত’ হয় আভ্যন্তরিকভাবে, অনুভবের মাধ্যমে। তবু আত্মার উপস্থিতি উপলব্ধিতে নীচের বিষয়গুলি আমাদের সাহায্য করতে পারে।

১. সাধারণ জ্ঞান
যখন কেউ মারা যায়, আমরা বলি, “উনি চলে গেলেন।” এখন, কে চলে গেছেন? ব্যক্তিটির শরীর তো এখনো সেখানে শায়িত রয়েছে? সত্যটি হচ্ছে এই যে জীবনের উৎস আত্মা দেহটি ছেড়ে চলে গিয়েছে, এবং সেজন্য ব্যক্তিটিকে এখন বলা হচ্ছে মৃত।

২। স্বজ্ঞা-গত উপলব্ধি
আমাদের প্রত্যেকেরই একটি স্বজ্ঞাগত বোধ রয়েছে যে প্রকৃ্ত সত্তা বা ব্যক্তি, ‘আমি’ দেহ, মন ও বুদ্ধি থেকে আলাদা, পৃথক। আমরা বলি “আমার হাত,” “আমার মাথা” ইত্যাদি। এইভাবে আমরা দেহটির উপরের মাথার চুল থেকে শুরু করে পায়ের ডগা পর্যন্ত ‘আমার এটা, সেটা’ বলে অভিহিত করতে পারি। এটি নির্দেশ করছে যে ঐসব বস্তুগুলি কোনো একজনের, কোনো মালিকের। চোখ, কান বা মস্তিষ্ক হচ্ছে কেবল কতকগুলি যন্ত্র, যেগুলির মাধ্যমে “আমরা” দেখি, শুনি, অথবা চিন্তা করি। এইসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি নিজেরা কোনো কিছু করতে পারে না। এমনকি একটি মৃতদেহেরও মস্তিষ্ক রয়েছে, কান রয়েছে, চোখ রয়েছে কিন্তু সেগুলি অকেজো, ক্রিয়াশক্তিরহিত। চালক, অর্থাৎ আত্মা এই দেহ-রূপ যানটিকে পরিত্যাগ করেছে বলেই এইসব যন্ত্রের কাজকর্ম সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে গেছে।

৩. চেতনা (Consciousness)
জীবন্ত দেহে রয়েছে চেতনা। ঠিক যেমন সূর্য তার চতুর্দিকে তাপ ও আলোকরশ্মি বিকিরণ করে, তেমনি আত্মাও সমগ্র দেহে চেতনা পরিব্যাপ্ত করে- পায়ের ডগা থেকে মাথার চুল পর্যন্ত, সর্বত্র। দেহে পরিব্যাপ্ত এই চেতনাই আমাদেরকে চিন্তা, অনুভব বা চলাফেরা করতে সক্ষম করে। অতএব চেতনা হচ্ছে আত্মার লক্ষণ। চেতনার অস্তিত্বই একটি মৃত দেহের সঙ্গে জীবন্ত দেহের পার্থক্য সূচিত করে। এমন একটি যন্ত্র সহজেই তৈরী করা যেতে পারে, যেটির লেন্সে লাল আলো পড়া মাত্রই সেটি সাড়া দেয় ও তার থেকে এই তথ্য লেখা কাগজের টেপ বেরিয়ে আসেঃ “আমি লাল আলো দেখছি”, কিন্তু এই যান্ত্রিক সাড়া বা প্রক্রিয়ার মধ্যে কি সত্যি সত্যি কোনো অনুভবের স্পন্দন আছে, যা একটি চেতন জীব উপলব্ধি করে- যেমন কোনো মানুষের প্রভাতের রক্তিম সূর্যোদয় দেখে অনুভব করে? টমাস হাক্সলি যেমন যথার্থই বলেছেন, “এই বিশ্বে একটি তৃতীয় পদার্থ রয়েছে, অর্থাৎ চেতনা, যাকে আমি আদপেই কোনো জড় পদার্থ বা শক্তি বলে মনে করি না।” এই চেতনার অস্তিত্ব আত্মার অস্তিত্বকেই প্রমাণ করে।

৪। আসন্ন-মৃত্যুর অভিজ্ঞতা (N.D.E- Near Death Experience)
গবেষণায় সংগৃহীত তথ্যের দৃষ্টান্ত দ্বারা প্রদর্শিত হয় যে মন জড়ীয় মস্তিষ্ক ও দেহ হতে স্বতন্ত্র। এন.ডি.ই-র মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে দেহাতিরিক্ত অভিজ্ঞতা বা ও.বি.ই (আউট-অব-বডি এক্সপিরিয়েন্স), যেখানে বিভিন্ন মানুষ তাদের নিজেদের দেহ ও অন্যান্য দেহসংক্রান্ত ঘটনাবলীর কথা জানাচ্ছেন যা দেহাতীত কোন পটভূমিতে থেকে পর্যবেক্ষণ করা- তাদের গুরুতর অসুস্থতা, দৈহিক যন্ত্রণা বা অপারেশনের সময়, যখন তাদের দেহ থাকে অজ্ঞান বা ‘অচেতন’। এর আদর্শ দৃষ্টান্ত হচ্ছে, একজন হৃদরোগী শল্য চিকিৎসার পর কিঞ্চিৎ সুস্থ হয়ে অপারেশনকালীন সমস্ত ঘটনার আনুপূর্বিক বর্ণনা দিচ্ছেন, যেন বাইরে থেকে তিনি সেসব দেখেছেন। এইরকম অনুভবের সময় মেডিক্যাল অভিমত অনুসারে তার মস্তিষ্কের স্বাভবিক ক্রিয়াকলাপ বন্ধ হয়ে যায়- যন্ত্রে ব্রেন-ওয়েভের রেখাচিত্র বা গ্রাফের রেকর্ড থেকে তা স্পষ্ট বোঝা যায়, এবং ঐ রোগী তখন অজ্ঞান অবস্থায় থাকেন।

এন.ডি.ই নিয়ে পরিপূর্ণ বিজ্ঞানসম্মত, নিখুঁত গবেষণা করে বহু ব্যক্তি তাদের রিসার্চ-রিপোর্ট উপস্থাপন করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, এমরি ইউনিভার্সিটি মেডিক্যাল স্কুলের প্রফেসর ও কার্ডিওলজিস্ট ডক্টর মাইকেল বি. স্যাবম্ প্রথমে এন.ডি.ই- সম্পর্কে ছিলেন অত্যন্ত সন্দিগ্ধ; কিন্তু ঐগুলির সত্যতা তদন্ত করে দেখার পর তিনি তাঁর মত পরিবর্তন করেন। কঠোর রিসার্চ-এর ভিত্তিতে ডক্টর স্যাবম্ লেখেন, “মানুষের মস্তিষ্ক যদি এই দুটি মৌলিক উপাদান দিয়ে নির্মিত হয়- ‘মন’ ও ‘মস্তিষ্ক’, তাহলে বহু মানুষের মৃত্যুকালীন অভিজ্ঞতার ঘটনা কি অত্যন্ত অস্থায়ী সময়ের জন্য হলেও মন ও মস্তিষ্কের বিচ্ছিন্নতাকেই প্রদর্শন করে না? এই দেহাতীত অভিজ্ঞতার জবানবন্দী আসলে প্রচলিত ধর্মীয় তথ্যের সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি সঙ্গগিপূর্ণ মনে হয়। সেই মন, যা শরীরস্থ মস্তিষ্ক হতে বিমুক্ত হয়ে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে- সেটি কি আসলে মূলগতভাবে আত্মা হতে পারে, চরমে জড় শরীরের বিনাশের পরেও যার অস্তিত্ব থাকে অব্যাহত, ঠিক যেমন কিছু কিছু ধর্মীয় মতবাদে বলা হয়ে থাকে? আমার মনে হচ্ছে যে এই সব এন.ডি.ই-র রিপোর্টগুলি যে চরম প্রশ্নটিকে তুলে ধরেছে, এ হচ্ছে সেই প্রশ্ন।”

৫। পূর্বজন্মের স্মৃতি
বহু নিষ্ঠাবান গবেষক এই পূর্বজন্মের স্মৃতির উপর নিরপেক্ষ কঠোর ও নিয়মানুগভাবে বহু পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন। আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার সাইক্রিয়াট্রির অধ্যাপক ইয়ান স্টিভেনসন শিশুদের দ্বারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথিত তাদের পূর্বজন্মের স্মৃতির উপর ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন। শিশুদের দেওয়া তাদের পূর্ব জন্মের জন্মস্থান, তাদের পূর্ব নাম ও চেহারা, তাদের স্বজন-বর্গের ও অন্যান্য পরিচিতদের নাম পুনর্জন্মের সত্যতাকেই হুবহু সমর্থন করে। প্রফেসর স্টিভেনসন বহু সংখ্যক ঘটনার-বিবরণী একত্রিত করে সেগুলির সত্যতা যাচাইয়ে ব্রতী হন এবং সেই সাথে কোন প্রকার জালিয়াতি যাতে না হতে পারে সে ব্যাপারে তিনি কঠো সতর্কতা গ্রহণ করেন। তাঁর গবেষণা বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করে যে চেতন আত্মা একটি জড় শরীর থেকে অপর একটি জড় শরীরে গমন করতে পারে, দেহান্তরিত হতে পারে। স্পষ্টতঃই, যখন একটি দেহের মৃত্যু হয় তখন তার মস্তিষ্কের কোষগুলি নষ্ট হয়ে যায়, এবং কোন রকম বাহ্যিক প্রক্রিয়ার সাহায্যেই সেগুলিকে আর অন্য আরেকটি মস্তিষ্কে প্রভাবিত করতে পারে না, সেইজন্য কখনই কোন মৃত মানুষের স্মৃতি কোনো শিশুর মস্তিষ্কে শারীরিকভাবে সঞ্চারিত হবার বা করবার কোনো সম্ভাবনাই নেই। সেজন্য একটি শিশুর পূর্বজন্মের স্মৃতিচারণ এটিই প্রমাণ করে যে ঐ দেহস্থ ব্যক্তি আগের জন্মে ঐ পূর্বেকার দেহটি ব্যবহার করেছে, যার কিছু স্মৃতি সে অভিব্যক্ত করতে পারছে। অতএব সরলার্থ হচ্ছে এই যে চেতন আত্মা অবশ্যই এমন একটি সত্তা যা দেহস্থ মস্তিষ্ক থেকে পৃথক।

স্থুল দেহ ও সূক্ষ্ম দেহ
Fetus in the womb and Paramatma

(সূত্রঃ ভগবদগীতার সারতত্ব ছয় পর্বের প্রাথমিক পাঠক্রম )

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভগবদগীতায় বলেছেনঃ
অবিনাশী তু তদ্বিদ্ধি যেন সর্বং ইদং ততম্।
বিনাশং অবিনাশ্যস্য ন কিঞ্চিৎ কর্তুমর্হসি।।

“সমগ্র শরীরে পরিব্যাপ্ত রয়েছে যে অক্ষয় আত্মা, জেনে রেখো তাকে কেউ বিনাশ করতে সক্ষম নয়।” (ভ.গী.– ২/১৭)
ভগবদগীতা অনুসারে, আপনি এই দেহ নন। আপনি মন নন। আপনি বুদ্ধিও নন, আপনি মিথ্যা অহঙ্কারও নন। আপনি এই জড় দেহের সমস্ত জড় পদার্থের অতীত বস্তু। আপনি হচ্ছেন সেই চেতনা, সারা দেহে যা পরিব্যাপ্ত রয়েছে। আপনি হচ্ছেন চির অবিনাশী আত্মা। এরপর শ্রীকৃষ্ণ বলেন,

“ভূমিরাপোহনলো বায়ুঃ খং মনো বুদ্ধিরেব চ।
অহঙ্কারং ইতীয়ং মে ভিন্না প্রকৃতিরষ্টধা।।”

“ভূমি, জল, বায়ু, আকাশ, মন, বুদ্ধি এবং অহঙ্কার- এই অষ্ট প্রকারে আমার ভিন্না জড়া প্রকৃতি বিভক্ত।” (ভ.গী. ৭/৪)
এই উপাদানগুলি সর্বদাই পরিবর্তনশীল। স্থূল শরীর তৈরী হয়েছে উপরোক্ত প্রথম পাঁচটি উপাদান দিয়েঃ ‘ভূমি’ বলতে বোঝায় সমস্ত কঠিন পদার্থকে। জল বলতে বোঝায় সমস্ত তরল পদার্থ। অগ্নি হচ্ছে আলোক ও তেজ (তাপ)। বায়ু হচ্ছে সমস্ত গ্যাসীয় পদার্থ। আকাশ হচ্ছে শূন্যস্থান (ইথার) এবং শব্দ। স্থূল দেহে এই পাঁচটি পদার্থ রয়েছে।

সূক্ষ্ম শরীর তিনটি সূক্ষ্ম উপাদান দ্বারা গঠিতঃ মন, বুদ্ধি ও মিথ্যা অহংকার (ভ্রান্ত ‘আমি’ বোধ)। প্রকৃত অহঙ্কার হচ্ছে এই উপলব্ধিঃ ‘আমি চিন্ময় আত্মা, কৃষ্ণের নিত্য দাস’। মিথ্যা অহঙ্কার হচ্ছে মোহগ্রস্ত অবস্থায় এই রকম চিন্তা করা, “আমি এই দেহ।” সূক্ষ্ম দেহ ও স্থূল দেহ হচ্ছে চেতনার উপর জড়ীয় আবরণ। এইরকম সূক্ষ্ম এবং স্থূল দেহে বদ্ধ একটি জীবাত্মাকে বলা হয় ‘বদ্ধ জীব’। যিনি এইরকম আবরণ থেকে মুক্ত এবং ভগবদ্ধাম প্রাপ্ত হন, তাঁকে বলা হয় মুক্তাত্মা। তারপর শ্রীকৃষ্ণ বলেন,
অপরেয়মিতস্ত্বন্যাং প্রকৃতিং বিদ্ধি মে পরাম্।
জীবভূতং মহাবাহো যয়েদং ধার্যতে জগৎ।।
“হে মহাবাহো ! এই নিকৃষ্টা প্রকৃতি ব্যতীত আমার আর একটি উৎকৃষ্টা প্রকৃতি রয়েছে। সেই প্রকৃতি চৈতন্য-স্বরূপা ও জীবভূতা; সেই শক্তি থেকে সমস্ত জীব নিঃসৃত হয়ে এই জড় জগৎকে ধারণ করে আছে।” (ভ.গী. ৭/৫)
ভগবানের শক্তিরাজি (God’s Energies)

অপরা (নিকৃষ্টা) জড়া শক্তি পরা (উৎকৃষ্টা, চিন্ময়)শক্তি
(Inferior Material Energy) (Superior Spiritula Energy)

স্থূল উপাদান সূক্ষ্ম উপাদান চিন্ময় দেহ (আত্মা)
(Gross Elements) (Subtle Elelments)
১. ভূমী (Earth) ১. মন (Mind) ১. সৎ (Eternal)
২. জল (Water) ২. বুদ্ধি (Intelligence) ২. চিৎ (Full of knowledge)
৩. অগ্নি(Fire) ৩. মিথ্যা অহঙ্কার (False Ego) ৩. আনন্দ (Full of Bliss)
৪. বায়ু (Air)
৫. আকাশ (Ether)

অনুৎকৃষ্টা অপরা শক্তি (জড় বস্তু) এবং উৎকৃষ্টা পরা শক্তি (আত্মা) উভয়ই পরমেশ্বর ভগবানের অধীন। আত্মাই হচ্ছে জীবন। শরীরটি সবসময়ই মৃত। ঠিক যেমন আপনি যদি হাতে দস্তানা পরেন এবং আঙুলগুলি সঞ্চালন করতে থাকেন, তাহলে দস্তানাকে জীবন্ত বলে মনে হতে পারে। ঠিক তেমনি আত্মা শরীরকে সঞ্চালন করে। শরীরটি সবসময়ই মৃত, এমনকি যখন আত্মা ঐ দেহের মধ্যে অবস্থান করতে থাকে তখনও দেহটি মৃত, কেননা শরীরটি কেবল কিছু মৃত অচেতন জড় পদার্থ দিয়ে তৈরী- মাটি, জল, আগুন, বাতাস, আকাশ এবং মন, বুদ্ধি ও মিথ্যা অহঙ্কার।
(সূত্রঃ ভগবদগীতার সারতত্ব ছয় পর্বের প্রাথমিক পাঠক্রম )
মানুষ কি কেবল একটি শক্তিশালী কম্পিউটার/ রোবট?

কম্পিউটারের হার্ডওয়ারটি কতকগুলি নির্দেশের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় (এই সব নির্দেশগুচ্ছের জন্য নানারকম ভাষাও রয়েছে, যেমন ফরট্রান, বেসিক, অথবা সি প্লাস প্লাস, ইত্যাদি)। এটি স্পষ্ট যে একটি কম্পিউটারকে কার্যক্ষম হওয়ার জন্য অবশ্যই একজন বুদ্ধিমান মানুষের দ্বারা নির্দেশিত (প্রোগ্রাম্ড্) হতে হয়। যে-ক্ষমতাই একটি কম্পিউটারের থাকুক না কেন, তা সে সংখ্যার কচকচি, তথা সংরক্ষণ, বস্তু সনাক্তকরণ, বা স্বাভাবিক ভাষার প্রক্রিয়াকরণ ইত্যাদি যাই হোক না কেন- তার সমস্ত ক্রিয়াক্ষমতাই একজন সংবেদনশীল চেতন মানুষ-এর দ্বারা প্রদত্ত। অন্য কথায়, যদি কম্পিউটারের কার্যনির্দেশক বা প্রোগ্রামার কম্পিউটার-সিস্টেমকে দুই যোগ দুই = পাঁচ, এই অঙ্ক কষতে প্রোগ্রাম করে রাখে, তাহলে কম্পিউটার ঐরকমই করবে। ঠিক সেই রকম দেখার ক্যামেরা-ব্যবস্থার সংগে সংযুক্ত কোনো কম্পিউটারকে যদি কোনো ঘনকাকৃ্তি (স্কয়ার)বস্তুকে গোল বলে সনাক্ত করার প্রোগ্রাম করা থাকে, তাহলে সেটি তাই-ই করবে। কম্পিউটার নিজে থেকে কোনো কিছুই বুঝতে পারে না। প্রোগ্রাম করা না থাকলে শুধু কম্পিউটারটি কেবল একটি বোবা যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়।
উদাহরণস্বরূপ, একটি নাটকাভিনয়ের কথা মনে করুন। একদল বিচারকমণ্ডলী নাটকটি দেখছেন, আর একটি ভিডিও ক্যামেরার দ্বারা পুরো নাট্যাভিনয়টি রেকর্ড করা হচ্ছে। বিচারক অভিনীত ঘটনাবলীকে রেকর্ড করতে তাঁর চোখকে ব্যবহার করছেন, আর ভিডিও ক্যামেরাটি সমস্ত ঘটনাবলীকে রেকর্ড করছে লেন্সের মাধ্যমে, যা চোখেরই যান্ত্রিক রূপায়ণ বা মেশিন-এনালগ। ঐ দর্শন –যন্ত্র এবং মানুষ – উভয় পর্যবেক্ষক তথ্য-উপাত্ত রেকর্ড করছে, কিন্তু মানুষ-পর্যবেক্ষক পরিদৃশ্যমান ঘটনাবলীকে “উপলব্ধি”-ও করছে। দৃষ্টন্তস্বরূপ, বিচারকমণ্ডলী একটি আবেগময় নাটকের সমগ্র আবেগমথিত দৃশ্যাবলী প্রত্যক্ষ করলেন, তাঁরা নাটকে গর্ব, দুঃখ, প্রকাশিত হতে দেখলেন। অপরদিকে ভিডিও ক্যামেরাটি আবেগ-অনুভূতিহীনভাবে কেবল কিছু অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সঞ্চালন ও শব্দাবলী রেকর্ড করল। নাটক সমাপ্ত হলে বিচারকমণ্ডলী তাঁদের চোখের সামনে দৃশ্যায়িত দৃশ্য-চিত্রের ভিত্তিতে সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনয়কারীকে নিরূপণ করলেন। কিন্তু ভিডিও ক্যামেরাটি কি ঐরকম কোন সিদ্ধান্ত দিতে সক্ষম- যদিও সে নাটকের প্রতিটি দৃশ্যই অভ্রান্তভাবে রেকর্ড করে রেখেছে?
পার্থক্যটি হচ্ছে এই যে, যদিও মানুষ ও ক্যামেরা – উভয় পর্যবেক্ষকই নাটকটি নিরীক্ষণ করছে, মানুষ হচ্ছে “চেতন”, কিন্তু ক্যামেরাটি সম্পূর্ণরূপে চেতনাহীন। সুতরাং মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে প্রধান পার্থক্যটি হচ্ছে চেতনা- চেতনাগত পার্থক্য।
(সূত্রঃ ভগবদগীতার সারতত্ব ছয় পর্বের প্রাথমিক পাঠক্রম )

দেহ এবং আত্মার সম্বন্ধঃ দেহ একটি গাড়ীর মতো; আত্মা তার চালক

(সূত্রঃ ভগবদগীতার সারতত্ব ছয় পর্বের প্রাথমিক পাঠক্রম )

দেহকে একটি গাড়ীর সংগে তুলনা করা হয়, আত্মাকে তুলনা করা হয় চালকের সংগে। যদি একটি বোধশক্তিহীন কুকুরের ছানা রাস্তায় কোন একটি বড় গাড়ীকে আসতে দেখে, তাহলে সে এই ভেবে ভয় পেতে পারে যে ওটি একটি চার চাকার চলমান বড় কোন জন্তু। কিন্তু বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ বুঝতে পারে যে ওটি জন্তু নয়- একটি মৃত ব্যক্তিত্বহীন গাড়ী যা একজন চেতন চালকের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। গাড়ীতে রাস্তা দেখার জন্য হেডলাইট রয়েছে, ঠিক যেমন আপনি আপনার চোখের সাহায্যে দেখেন। গাড়ী হর্ণের সাহায্যে আওয়াজ করে, আপনি মুখের সাহায্যে। গাড়ীর চারটি চাকা রয়েছে, আপনার দেহটির দুটি হাত ও দুটি রয়েছে। গাড়ীটি এক জায়গা হতে অন্যত্র চলাফেরা করে, আপনিও সেটাই করেন। কিন্তু গাড়ীতি থেকে চালক নেমে যাওয়ার পর ঐ গাড়ীটি এমনকি দশ লক্ষ বছরেও এক ইঞ্চি চলতে পারে না। ঠিক তেমনি, যখন একজন মানুষ মারা যায়, শরীরটি তখন পুরোপুরিই ঐ চালক-বিহীন গাড়ীটির মতোই – নিশ্চল, অনড়। সুতরাং আমরা যে দেহটিকে দেখি তা সবসময়ই মৃত। আত্মার উপস্থিতির জন্যই দেহকে জীবন্ত বলে মনে হয়। আত্মা যখন দেহ ত্যাগ করে, তখন দেহটি সম্পূর্ণ চলচ্ছক্তিহীন নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।
একবার একজন বিজ্ঞানী একটি মৃতদেহ নিয়ে সেই দেহটির সমস্ত রাসায়নিক পদার্থকে পৃথক করে তার বাজার মূল্য যাচাই করে রিপোর্ট করে দিলেন যে ঐ দেহটির দাম দাঁড়াচ্ছে ১১০ টাকা (যদি সেটিকে বাজারে বিক্রী করা হয়)! তা, আপনি কি এমন মনে করেন যে আপনার মূল্য ১১০ টাকা? কিন্তু যখন একজন জীবিত ব্যক্তি তাঁর দেহের ছোট্ট একটি আঙুল হারায়, কিংবা তাঁর কিডনীটিকে বদলাতে হয়, তাহলে তিনি লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে থাকেন। জীবিত দেহের মধ্যে এমন কোন পদার্থ রয়েছে যা এই দেহকে এত মূল্যবান করে তোলে? আর একটি মৃতদেহে কি অনুপস্থিত যা ঐ দেহকে মূল্যহীন জঞ্জালে পরিণত করে? উত্তর হচ্ছেঃ আত্মা।
আত্মা (জীবনী শক্তি), উদ্ভিদ, পশুপাখী এবং মানুষ সকলের মধ্যেই রয়েছে। যেখানেই জীবন রয়েছে, সেখানে অবশ্যই আত্মা রয়েছে, কেননা আত্মাই হচ্ছে জীবন। অ্যামিবাই হোক, হাতি হোক, অথবা একটি মানুষ হোক- সব জীবিত দেহের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে আত্মা।
আধুনিক যুগঃ খাঁচা-পরিচর্যার সংস্কৃতি

(সূত্রঃ ভগবদগীতার সারতত্ব ছয় পর্বের প্রাথমিক পাঠক্রম )

শরীরকে একটি খাঁচার সংগেও তুলনা করা হয়, আর খাঁচার টিয়া পাখীকে তুলনা করা হয় শরীরস্থ আত্মার সংগে। ধরুন কেউ খাঁচায় এইভাবে একটি পাখী পুষে কেবল খাঁচাটিকে সুন্দরভাবে তদ্বির করছে – যেমন বিশেষ ডিজাইনের সুন্দর সোনার খাঁচায় পাখীটিকে রেখে প্রতিদিন খাঁচাটিকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, খাঁচাটিকে ভালভাবে ঘষে-মেজে পালিশ করে ঝকঝকে করা ইত্যাদি। সকলে খাঁচাটিকে দেখে বিমুগ্ধ হয়ে প্রশংসা করে, এবং তাতে উৎসাহিত হয়ে সে আরো ভালভাবে খাচাটির যত্ন নিতে থাকে। কিন্তু এসব করতে গিয়ে সে পাখীটির কথা বেমালুম ভুলে যায়। পাখীটিকে দেয় না খাদ্য জল। ঠিক তেমনি, বর্তমান যুগে, আধুনিক সভ্যতায় প্রত্যেকে দেহের জন্য সমস্ত রকম আরাম স্বাচ্ছন্দ্য, বিলাসিতার ব্যবস্থা করার জন্য অত্যন্ত ব্যস্ত, কিন্তু আত্মার প্রয়োজনের দিকে কেউ দৃষ্টিপাত করছে না। সেজন্য প্রত্যেকেই পারমার্থিকভাবে ‘অনশনে’ ভুগছে। প্রত্যেকেই অন্ত্ররে বিষণ্ন, নিরানন্দ, এবং প্রত্যেকেই অজ্ঞান-তমসায় আবৃত হয়ে দুর্দশা ভোগ করছে। দেহ-খাঁচাটি যে অচিরেই ছাড়তে হবে, সে সম্বন্ধে অধিকাংশেরই কোনো জ্ঞান নেই, আর সে শিক্ষাও দেওয়া হচ্ছে না কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফলে, বিশ্বজুড়ে এই দেহতদ্বিরের, খাঁচাটি-পালিশের গভীরতাহীন সংস্কৃতি গড়ে উঠছে।
আত্মা-সম্পর্কিত জ্ঞান

(সূত্রঃ ভগবদগীতার সারতত্ব ছয় পর্বের প্রাথমিক পাঠক্রম )

আত্মা অবিনশ্বর
শ্রীকৃষ্ণ বলেন, “নৈনং ছিন্দন্তি শস্ত্রাণি নৈনং দহতি পাবকঃ । ন চৈনং ক্লেদয়ন্ত্যাপো ন শোষয়তি মারুতঃ ॥২৩॥ অর্থাৎ অনুবাদ:- আত্মাকে অস্ত্রের দ্বারা কাটা যায় না, আগুনে পোড়ান যায় না, জলে ভেজানো যায় না, অথবা হাওয়াতে শুকানোও যায় না।” ভ. গী. ২/২৩

আত্মা একজন ব্যক্তি
প্রত্যেক আত্মাই পৃথক পৃথক চেতনা-সমন্বিত এক একজন ব্যক্তি। আপনি আপনার দেহ, মন, বুদ্ধি ও মিথ্যা অহঙ্কার সম্বন্ধে সচেতন। আপনার মাথাব্যথা আমি অনুভব করতে পারি না, আবার আমি কি চিন্তা করছি আপনি তা জানেন না। কিন্তু ভগবান সৃষ্টির প্রত্যেকটি কণিকা সম্বন্ধে সচেতন; ন ত্বেবাহং জাতু নাসং ন ত্বং নেমে জনাধিপাঃ। ন চৈব ন ভবিষ্যামঃ সর্বে বয়মতঃপরম্ ॥১২॥ “এমন কোন সময় ছিল না যখন আমি, তুমি ও এই সমস্ত রাজারা ছিলেন না এবং ভবিষ্যতেও কখনও আমাদের অস্তিত্ব বিনষ্ট হবে না । ” (ভ. গী. ২/১২) মমৈবাংশো জীবলোকে জীবভূতঃ সনাতনঃ। মনঃষষ্ঠানীন্দ্রিয়াণি প্রকৃতিস্থানি কর্ষতি ॥৭॥ ‘এই জড় জগতে বদ্ধ জীবসমূহ আমার সনাতন বিভিন্নাংশ। জড়া প্রকৃতির বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ফলে তারা মন সহ ছয়টি ইন্দ্রিয়ের দ্বারা প্রকৃতিরূপ ক্ষেত্রে কঠোর সংগ্র্রাম করছে।’ (ভ. গী. ১৫/৭)

3497_1

আত্মার রূপ আছে
আত্মা ‘নিরাকার নির্গুণ জ্যোতি’ বা ‘শূন্য’ কিছু মানুষ যেমন ভুল করে ভেবে থাকেন। আত্মা হচ্ছে এক সুন্দর ব্যক্তিত্ব, যার দেহ সৎ-চিৎ-আনন্দময়। আত্মা কেবল শক্তি মাত্র নয়, আত্মা একজন পূর্ণচেতন ব্যক্তি।

আত্মা শাশ্বত
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেনঃ ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিন্ নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ । অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে ॥২০॥ “আত্মার কখনও জন্ম হয় না বা মৃত্যু হয় না, অথবা পুনঃ পুনঃ তাঁর উৎপত্তি বা বৃদ্ধি হয় না৷ তিনি জন্মরহিত শাশ্বত, নিত্য এবং পুরাতন হলেও চিরনবীন। শরীর নষ্ট হলেও আত্মা কখনও বিনষ্ট হয় না।” (ভ. গী. ২/২০)।

আত্মার একটি শরীর রয়েছে, যা সৎ (নিত্য, শাশ্বত), চিৎ (জ্ঞান), আনন্দময়
আত্মা এই জড়জগতে এসেছে ভগবৎ-ধাম থেকে, আর এজন্য ভগবদ্ধামে ভগবানের সংগে প্রত্যক্ষভাবে সম্বন্ধিত হবার উপযোগী আত্মার একটি শাশ্বত, জ্ঞানময় ও আনন্দময় শরীর রয়েছে, যা অ-জড়, চিন্ময় – অর্থাৎ পূর্ণচেতন। কিন্তু আত্মা যখন একজন স্বাধীন ভোক্তা হতে আকাঙ্খা করে, তখন তাকে জড় জগতে প্রেরণ করা হয়, যেখানে তাকে একটি জড় শরীরে আবদ্ধ হতে হয়। এটা হচ্ছে ঠিক একটি টিয়া পাখীর (আত্মা) খাঁচায় (জড় দেহে) আবদ্ধ হওয়ার মতো। কেন আমরা দুর্দশা ভোগ করি? কারণ সচ্চিদানন্দময় আত্মা এমন একটি দেহে আবদ্ধ হয়েছে যা অসৎ-আচিৎ-নিরানন্দ, সুতরাং চিদরূপময় আত্মার ক্ষণস্থায়ী জরা-ব্যাধিগ্রস্ত জড়শরীরে অবস্থান অত্যন্ত অসামঞ্জস্যপূর্ণ। আর সেজন্যই আমাদের দুঃখ ভোগ করতে হয়- আমাদের যাবতীয় দুর্দশার এটিই মূল কারণ।

আত্মার অবস্থান হৃদয়-প্রদেশে
আত্মা সারা দেহকে চেতনা দ্বারা পরিব্যাপ্ত করে, ঠিক যেমন একটি বাতি সারা ঘরকে আলোয় ভরে দেয়। সারা ঘরকে যে বাতিটি আলোকোজ্জ্বল করে তুলছে, সেই বাতিটি ঘরের একটি কোণে থাকতে পারে। ঠিক তেমনি আত্মা হৃদয়-প্রদেশে (হৃৎ-পিণ্ডে) অবস্থান করেও সারা দেহে চেতনা পরিব্যাপ্ত করে। হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপনের সময় আত্মাকে দেহ থেকে সরানো যায় না, কেননা আত্মা চিন্ময় (অ-জড়)। দৃষ্টান্তস্বরূপ, যখন একটি গাড়ী থেকে স্টেপনী কিংবা রেডিয়েটর সরিয়ে নেওয়া হয়, তখন ঐ গাড়ীতে বসে থাকা চালকের কিছুই হয় না। ঠিক তেমনি একটি -হৃৎপিণ্ড (যে কেবল রেডিয়েটরের মতো একটি রক্ত-সঞ্চালনকারি যন্ত্র) অন্য আরেকটি দ্বারা প্রতিস্থাপন করলেও শরীরস্থ আত্মা তাতে প্রভাবিত হয় না।

আত্মা দেহ-পরিবর্তন করে
‘বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায় নবানি গৃহ্ণাতি নরোহপরাণি । তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণান্য- ন্যানি সংযাতি নবানি দেহী ॥২২॥’ “মানুষ যেমন জীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করে, দেহীও তেমনই জীর্ণ শরীর ত্যাগ করে নতুন দেহ ধারণ করেন। ” (ভ. গী.- ২/২২)। ‘দেহিনোহস্মিন্ যথা দেহে কৌমারং যৌবনং জরা ।তথা দেহান্তরপ্রাপ্তির্ধীরস্তত্র ন মুহ্যতি ॥১৩॥’ “দেহীর দেহ যেভাবে কৌমার, যৌবন ও জরার মাধ্যমে তার রূপ পরিবর্তন করে চলে, মৃত্যুকালে তেমনই ঐ দেহী ( আত্মা ) এক দেহ থেকে অন্য কোন দেহে দেহান্তরিত হয়। স্থিতপ্রজ্ঞ পণ্ডিতেরা কখনও এই পরিবর্তনে মুহ্যমান হন না ।” (ভ. গী.- ২/১৩)

আত্মার আয়তন
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে এবং শ্রীমদ্ভাগবতে বীজ-রূপে জড়দেহে বিরাজিত আত্মার আয়তন বর্ণিত হয়েছে। যেমন শ্বেতাশ্বতর উপ-৫/৮-এ বলা হয়েছে, ‘বালাগ্র শতভাগস্য শতধা কল্পিতস্য চ। ভাগো জীবঃ স বিজ্ঞেয়ঃ স চানন্ত্যায় কল্পতে।।’ ‘কেশাগ্রকে শতভাগে ভাগ করলে তার যে আয়তন হয়, আত্মার আয়তনও ততখানি।’ এই হচ্ছে আত্মার বীজ-রূপী আয়তন। আত্মা জড়-ব্রহ্মাণ্ডে নানা শরীরে ভ্রমণকালে তার এই আয়তন থাকে। কিন্তু চিন্ময় জগতে ভগবদ্ধামে আত্মার একটি আদি, অপরূপ-সুন্দর সচ্চিদানন্দময় অর্থাৎ নিত্য, আনন্দময় ও জ্ঞানময় দেহ রয়েছে, যাকে বলা হয় আত্মার ‘স্বরূপ’ (আত্মার আদি নিত্য-সনাতন স্বরূপদেহ); পক্ষান্তরে জড় জগতে বদ্ধাবস্থায় আত্মার জড় শরীরকে বলা হয় বিরূপ বা বিকৃ্ত জড় রূপ)। তার নিত্য চিন্ময় স্বরূপে প্রত্যেক আত্মার ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সংগে নিম্নোক্ত পাঁচটি রসের যেকোন একটিতে এক শাশ্বত মধুর সম্পর্ক রয়েছেঃ শান্ত রস, দাস্য রস, সখ্য রস, বাৎসল্য রস এবং মাধুর্য (দাম্পত্য) রস।

আত্মা অচিন্ত্য
চুলের অগ্রভাগের দশ হাজার ভাগের এক ভাগ এতই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র যে এমনকি বর্তমানের সবচেয়ে শক্তিশালী ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপেও তা দেখা অসম্ভব। কিন্তু আমরা যদি এমনকি এই ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপের থেকেও অনেক শক্তিশালী কোনো অনুবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কারেও সক্ষম হই, এবং তার মধ্য দিয়ে আত্মাকে দেখার চেষ্টা করি, তবুও আমাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হবে। আমরা এমনকি আমাদের চিন্তাকেও দর্শন করতে পারি না, তা পরিমাপ করতে পারি না। এমনকি মনও- যা হচ্ছে জড়ের সূক্ষ্ম রূপ- আমাদের কাছে অদৃশ্য, দৃষ্টির অগোচর, অব্যক্ত। সংজ্ঞানুযায়ী আত্মা মনেরও অতীত। এটি কেবল অব্যক্তই নয়, আত্মা আচিন্ত্য, অচিন্তনীয়। আপনি এমনকি এর- চিন্তাও করতে পারেন নাঃ অব্যক্তোহয়মচিন্ত্যোহয়মবিকার্যোহয়মুচ্যতে । তস্মাদেবং বিদিত্বৈনং নানুশোচিতুমর্হসি ॥২৫॥, “এই আত্মা অব্যক্ত, অচিন্ত্য ও অবিকারী বলে শাস্ত্রে উক্ত হয়েছে। অতএব এই সনাতন স্বরূপ অবগত হয়ে দেহের জন্য তোমার শোক করা উচিত নয় ।” (ভ. গী. – ২/২৫)।
দেহ ও আত্মার পার্থক্য

দেহ (Body) আত্মা (Soul)

১. অচেতন(Unconscious) ১. চেতন(Conscious), দেহে পরিব্যাপ্ত চেতনার উৎস;
২. জড়, আট রকম জড় উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত; ২.জড় উপাদানশূন্য, চিন্ময়, চিৎকণা
(তিন রকম চিদ্বিভাবের অভিভাজ্য রূপ)
৩.সদা পরিবর্তনশীল; প্রতিদিনই দেহের রূপান্তর হয় ৩.চির অ-পরিবর্তনীয়, অব্যয়; ‘অবিকারী’,
(বৃদ্ধি-ক্ষয় প্রভৃতি ৬টি পরিবর্তনের অধীন) বৃদ্ধি-ক্ষয় প্রভৃতি পরিবর্তনহীন;
৪. নশ্বর, বিনাশশীল, অনিত্য; ৪. অবিনশ্বর, নিত্য, শাশ্বত;
৫.ভগবানের বহিরঙ্গা, অপরা জড়া প্রকৃ্তির সৃষ্টি; ৫.ভগবানের অবিচ্ছেদ্য-অংশ,
তটস্থা শক্তি, পরা প্রকৃ্তি-সম্ভূত;
৬. স্থূল, পরিমাপযোগ্য; ৬. সূক্ষ্ম, অপরিমেয়;
৭. ইন্দ্রিয় দ্বারা অনুভবযোগ্য; ৭. জড় ইন্দ্রিয়ের অগোচর;
৮. অস্ত্রাদির দ্বারা বিনাশযোগ্য; ৮. অচ্ছেদ্য, অদাহ্য, অক্লেদ্য, অশোষ্য;
৯. অজ্ঞান বস্তুপিণ্ড; ৯. জ্ঞানময়; সকল গুণাবলীর আধার;
১০. ব্যক্তিত্বহীন যন্ত্র; ১০. মূল ব্যক্তি, ব্যক্তিত্বের কেন্দ্র;
১১. দুঃখ-ক্লেশের আধার নিরানন্দময়; ১১. আনন্দময়;
১২. পরিচালিত যন্ত্র (Car, Instrument); ১২. পরিচালক (Driver, user);
১৩. অনুভব- সামর্থ্যহীন; ১৩. অনুভূতিশীল; অনুভবের কেন্দ্র;
১৪. ইচ্ছা-দ্বেষ-বাসনা-সক্রিয়তা শূন্য; ১৪. ইচ্ছা-দ্বেষ-মান-অভিমান-বাসনা-সক্রিয়তা যুক্ত;
১৫. মিথ্যা অহঙ্কার নামক সূক্ষ্ম উপাদান সমন্বিত; ১৫. মিথ্যা অহঙ্কার বিহীন; প্রকৃ্ত আমি
(Real person);
১৬. জড় ইন্দ্রিয়যুক্ত; ১৬. চিন্ময় ইন্দ্রিয়যুক্ত;
১৭. মন, বুদ্ধি জড়; ১৭. মন, বুদ্ধি চিন্ময়;
১৮. অস্থায়ী পোশাক, ‘বিরূপ’। ১৮. শাশ্বত ব্যক্তি, ‘স্বরূপ’।
(সূত্রঃ ভগবদগীতার সারতত্ব ছয় পর্বের প্রাথমিক পাঠক্রম )

আমি কি ভগবান?

(সূত্রঃ ভগবদগীতার সারতত্ব ছয় পর্বের প্রাথমিক পাঠক্রম )

ভারতবর্ষে বর্তমানে অদ্বৈতবাদ, অর্থাৎ “আমি ভগবান। তুমি ভগবান। প্রত্যেকেই ভগবান” – এই দর্শন খুবই প্রচলিত। এই ধরণের দর্শন সেই সব বদ্ধ জীবাত্মাদের অন্তরে অসীম সন্তোষ প্রদান করে থাকে, যাদের ভোক্তা ও নিয়ন্তা হবার বাসনা প্রবল। বদ্ধ জীবাত্মা এমন ভোক্তা ও নিয়ন্তা হতে চায়। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে এমন কেউ কি আছে যে নিয়ন্ত্রণাধীন, নিয়ন্ত্রিত নয়? সংজ্ঞানুসারে ভগবান পরম স্বরাট্, স্বাধীন স্বতন্ত্র পুরুষ এবং তিনি কারো নিয়ন্ত্রণাধীন নন। তিনিই পরম নিয়ন্তা। জীব অবিনাশী, শাশ্বত, অব্যক্ত এবং অচিন্ত্য, কিন্তু তবুও সে কি ভগবান হতে পারে? এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর আপনার পারমার্থিক জীবনের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

ভগবদগীতা এ-বিষয়ে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে জীব কখনো ভগবান নয়, কখনো সে ভগবান হতেও পারবে না; সমস্ত জীবসত্তা ও ভগবান নিত্য স্বতন্ত্র, যদিও উভয়ে চিন্ময়, সেজন্য গুণগতভাবে উভয়েই এক। জীব ক্ষুদ্রচিদ্ অণু, তাই সূর্যের কিরণকণা যেমন সূর্যের মতো ধর্ম বিশিষ্ট হলেও স্বয়ং সূর্য নয়, তেমনি চিৎ-কণাজীব ভগবানের মতো চিদ্ধর্ম বিশিষ্ট হলেও পরিমাণগতভাবে অত্যন্ত ক্ষুদ্র। ভগবদগীতায় এটাও দ্বার্থহীন ভাষায় ঘোষণা করা হয়েছে যে এমনকি মোক্ষ বা মুক্তিলাভের পরও জীব আত্মস্বাতন্ত্র্য হারিয়ে ভগবানে একীভূত হয়ে যায় না; প্রত্যেকের ব্যক্তিত্বই শাশ্বত। ভগবদগীতায় বলা হয়েছে (১৫/১৬)ঃ

দ্বাবিমৌ পুরুষৌ লোকে ক্ষরশ্চাক্ষর এব চ। ক্ষরঃ সর্বাণি ভূতানি কুটস্থোহক্ষর উচ্যতে।। “ক্ষর এবং অক্ষর দুই প্রকার জীব রয়েছে। এই জড় জগতে প্রতিটি জীবই ক্ষর এবং চিজ্জগতে প্রতিটি জীবই অক্ষর।”

এই জগতে আমরা যারা আমাদের শাশ্বত চিন্ময় স্বরূপ সম্বন্ধে অসচেতন, তারা ক্ষর (পরিবর্তনশীল দেহ-সম্পন্ন জীব)। এই ব্রহ্মাণ্ডের প্রথম সৃষ্ট জীব ব্রহ্মা থেকে শুরু করে নগণ্য একটি পিঁপড়ে পর্যন্ত যে জীব-সত্তাই জড়ের সংস্পর্শে এসেছে, জড়-পদার্থের আবরণে তৈরী দেহাবয়ব ধারণ করেছে, সে ক্ষর। কিন্তু চিন্ময় জগতে দেহটি জড় পদার্থের তৈরী নয়, সেজন্য সেই দেহে কোনো পরিবর্তন হয় না; ঐ চিদ্-দেহ চির-শাশ্বত, অপরিবর্তনীয়। ঐ দেহে কখনো জরা-ব্যাধি-বার্ধক্য আসে না, সেই দেহের জন্ম-মৃত্যুও নেই। যে সব জীবসত্তা চিন্ময় জগতে পরম পুরুষ ভগবানের সংগে আনন্দবিলাসরত, তাঁরা সকলেই অক্ষর (অপরিবর্তনীয়), তাঁরা অনন্তকালের জন্য অপরিবর্তনীয় শাশ্বত আনন্দময় স্বরূপ-বিশিষ্ট।

উত্তম পুরুষস্ত্বন্যঃ পরমাত্মেত্যুদাহৃঢ়ঃ।।
যো লোকত্রয়মাবিশ্য বিভর্ত্যব্যয় ঈশ্বরঃ।।
“এই উভয় পুরুষ থেকে ভিন্ন, পুরুষোত্তম, পরমাত্মা রূপে সমগ্র বিশ্বে প্রবেশ করে তাদের পালন করেন” (ভ. গী. ১৫/১৭)। এখানে এটা অত্যন্ত সুষ্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে অগণিত জীবসত্তা-সমূহের মধ্যে কিছু জীব বদ্ধ, এবং অন্য সমস্ত জীব মুক্ত; এবং এই বদ্ধ ও মুক্ত (ক্ষর ও অক্ষর) উভয় জীবসত্তার মধ্যে পরম পুরুষোত্তম হচ্ছেন পরমাত্মা, ভগবান।

ভগবানের সংজ্ঞা:-

ভগবানের একটি সরল সংজ্ঞা হচ্ছে : ‘জন্মাদাস্য য্তঃ’ – “যাঁর থেকে সমস্ত প্রকাশিত হয়” (ভা: 1/1/1)৷ ‘ভগবান’ শব্দটি সংস্কৃত, এবং এর অর্থ বিশ্লেষণ করেছেন ব্যাসদেবের পিতা পরাশর মুনি- “(১) সমগ্র ঐশ্বর্য (ধনসম্পদ), (২) সমগ্র বীর্য (শক্তিমত্তা), (৩) সমগ্র য্শ, (৪) সমগ্র শ্রী (সৌন্দর্য, রূপবত্তা), (৫) সমগ্র জ্ঞান ও (৬) সমগ্র বৈরাগ্য যাঁর মধ্যে পূর্ণ-রূপে বর্তমান, সেই পরম পুরুষ হচ্ছেন ভগবান ৷” ‘ভগ’ শব্দের অর্থ ছয়টি ঐশ্বর্য (ষড়ৈশ্বর্য ) এবং ‘বান’ শব্দের অর্থ যুক্ত বা সমন্বিত৷ যেমন জ্ঞানবান অর্থ জ্ঞান-সমন্বিত, ধনবান শব্দের অর্থ ধন-সমন্বিত, তেমনি ভগবান শব্দের অর্থ যিনি সম্পূর্ণভাবে ৬টি ঐশ্বর্য সমন্বিত৷ ঐ সমস্ত ঐশ্বর্য অন্যকে আকর্ষণ করে- আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হবার এটিই রহস্য৷ কারও যে-পরিমাণে এই ঐশ্বর্য থাকে, তিনি ততটাই আকর্ষণীয় হন৷ এজগতে সকলেরই ঐসব ঐশ্বর্য কিছু কিছু পরিমাণে রয়েছে- কিন্তু কেউই সমগ্র ঐশ্বর্য-সম্পন্ন নয়৷ অনেক ব্যক্তি রয়েছেন যাঁরা অত্যন্ত ধনবান, খুব বলবান, খুব রূপবান, অত্যন্ত য্শস্বী, খুব জ্ঞানী এবং অত্যন্ত বৈরাগ্যবান, কিন্তু কেউই দাবী করতে পারে না যে তাঁর সমগ্র ধনৈশ্বর্য , সমগ্র বলবত্তা, সমগ্র সৌন্দর্য ইত্যাদি রয়েছে- একমাত্র ভগবানেরই এগুলি পূর্ণমাত্রায় রয়েছে৷ উপরোক্ত ছয়টি ঐশ্বর্য যাঁর পূর্ণ মাত্রায় আছে, তিনি নিশ্চয়ই ‘সর্বাকর্ষক’৷ সংস্কৃত ভাষায় সর্বাকর্ষক শব্দের সমতুল শব্দ হচ্ছে ‘কৃষ্ণ’৷

এইভাবে আমরা দেখতে পাই যে, শ্রীকৃষ্ণই একমাত্র পুরুষ, যিনি শাশ্বত কাল ধরে, সম্পূর্ণভাবে সমস্ত ঐশ্বর্যের অধিকারী ৷ শ্রীকৃষ্ণই পূর্ণ ঐশ্বর্যসম্পন্ন পরমপুরুষ, পরমেশ্বর ভগবান৷ পূর্ণ মাত্রায় ঐশ্বর্য সমূহের অধিকারী হওয়ায় শ্রীকৃষ্ণ পরম আকর্ষক, তিনি সর্বাকর্ষক পরম পুরুষ, সেজন্যই তাঁর নাম ‘কৃষ্ণ’, যিনি সকলকে আকর্ষণ-পূর্বক আনন্দ প্রদান করেন৷
সংক্ষেপে ভগবান ও জীবের পার্থক্য

অতএব, সংক্ষেপে আমাদের উপলব্ধি করা উচিতঃ

***আমরা জীবাত্মা; ভগবান হচ্ছেন পরমাত্মা;
***আমরা অণূ (ক্ষুদ্র চিৎ-কণ); ভগবান বিভু (অসীম);
***আমরা কেবল আমাদের নিজ দেহটি সম্বন্ধে সচেতন, অবগত; ভগবান প্রত্যেকের সম্বন্ধে এবং সমস্তকিছু সম্বন্ধে অবগত;
***আমরা নিত্যকালের জন্য পরমেশ্বর ভগবানের প্রেমময় সেবক, দাস, আর ভগবান হচ্ছেন আমাদের প্রেমময় প্রভু;
***আমরা গুণগতভাবে ভগবানের সংগে অভেদ, কিন্তু পরিমাণগতভাবে আমরা ভগবান হতে ভিন্ন। এই বাস্তব সত্যকে স্বীকার করে নেওয়ার উপর আমাদের জীবনের পরম সার্থকতা লাভ নির্ভর করে।
পরমাত্মাঃ জীবাত্মার বন্ধু

(সূত্রঃ ভগবদগীতার সারতত্ব ছয় পর্বের প্রাথমিক পাঠক্রম )

যখন জীবাত্মা এই জড় জগতে পতিত হয়, তখন তাকে নানা দেহে দেহান্তরিত করা, তার তত্ত্বাবধান করা এবং তাকে পথনির্দেশ দানের জন্য পরমপুরুষ ভগবানের এক প্রকাশ জীবাত্মার সঙ্গী হন। শ্রীকৃষ্ণের এই প্রকাশ প্রতিটি জীবের হৃদয়ে বিরাজ করেন- ঈশ্বর সর্বভূতানাং হৃদ্দেশেঃ অর্জুন তিষ্ঠতি- ভ. গী. ১৮/৬১), এবং প্রত্যেক পরমাণুর মধ্যেও তিনি প্রবেশ করেন (পরমাণুচয়ান্তরস্থং, ব্রহ্মসংহিতা – ৩৫)। তাঁকে বলা হয় পরমাত্মা।

দুই প্রকারের আত্মা রয়েছেঃ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র চিৎ-কণ (অণু-আত্মা, জীবাত্মা), এবং পরম আত্মা (বিভু-আত্মা, পরমাত্মা)। জীবাত্মার অর্থ একটি স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তা, পরমাত্মার অর্থ একজন পরম ব্যক্তিসত্তা। জীবাত্মা ও পরমাত্মা উভয়েরই স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব রয়েছে, উভয়েই ব্যক্তিত্ব সমন্বিত। উভয়ের মধ্যে পার্থক্য এই যে, জীবাত্মা কেবল একটি বিশেষ দেহে আবদ্ধ, পক্ষান্তরে পরমাত্মা সর্বত্র বিরাজমান। কঠোপনিষদেও একথা সমর্থিত হয়েছেঃ

অণোরণীয়ান্মহতো মহীয়ান্
আত্মাস্য জন্তোর্নিহিত গুহায়াম্।
তমক্রতুঃ পশ্যতি বীতশোকো
ধাতুঃ প্রসাদন্মহিমানমাত্মনঃ।।
“পরমাত্মা এবং জীবাত্মা উভয়েই বৃক্ষসদৃশ জীবদেহের হৃদয়ে অবস্থিত। যিনি সব রকম জড় বাসনা এবং সব রকমের শোক থেকে মুক্ত হতে পেরেছেন, তিনিই কেবল ভগবানের কৃপার ফলে আত্মার মহিমা উপলব্ধি করতে পারেন।”

পরমাত্মার কৃপার ফলেই অণু আত্মা ভিন্ন ভিন্ন দেহ প্রাপ্ত হয়। বন্ধু যেমন বন্ধুর মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করে, পরমাত্মাও তেমনি অণু আত্মার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন। মুণ্ডকোপনিষদ্ ও শ্বেতাশ্বেতর উপনিষদে আত্মা এবং পরমাত্মাকে একই গাছে বসে থাকা দুটি পাখির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একটি পাখী (জীবাত্মা) সেই গাছের ফল ভক্ষণ করছে, অপর পাখীটি (শ্রীকৃষ্ণ) তাঁর বন্ধুকে পর্যবেক্ষণ করে চলেছে। এই দুটি পাখী গুণগতভাবে যদিও এক, (উভয়েই সচ্চিদানন্দময়, অ-জড়), তবুও তাদের একজন (জীবাত্মা) সেই জড়জগৎ-রূপ গাছের ফলের আকর্ষণে আবদ্ধ। কখনো সে তিক্ত ফল আস্বাদন করে শোক করছে, কখনো বা সে মিষ্টি ফল খেয়ে আনন্দ করছে। পক্ষান্তরে অন্যজন তার সখাটির কার্যকলাপ কেবল পর্যবেক্ষণ করে চলেছে।

অর্জুন হচ্ছেন ফল-আহারে রত পাখী, আর পর্যবেক্ষণরত পাখীটি হচ্ছেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। যদিও তাঁরা একে অপরের বন্ধু, তবুও তাঁদের একজন হচ্ছেন প্রভু এবং অন্যজন হচ্ছেন ভৃত্য। পরমাত্মার সঙ্গে তাঁর এই সম্পর্কের কথা ভুলে যাবার ফলেই জীবাত্মা-রূপ পাখী এক গাছ থেকে অন্য গাছে, অর্থাৎ এক দেহ থেকে আরেক দেহে ঘুরে বেড়ায়। এই জড়দেহ-রূপ বৃক্ষে জীবাত্মা তার কর্মের ফল-স্বরূপ নানা রকম দুঃখ-কষ্ট ভোগ করে, কিন্তু যে মুহূর্তে সে পরমাত্মার নিত্য দাসত্ব বরণ করে তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করে- সেই মুহূর্তে সে জড়বন্ধন থেকে মুক্ত হয় এবং তার সবরকম দুঃখ-কষ্টের নিবৃত্তি ঘটে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের চরণে অর্জুনের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে আমরা এই তত্ত্ব উপলব্ধি করতে পারি। কঠোপনিষদ এবং শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে আছে-

সমানে বৃক্ষে পুরুষো নিমগ্নোহনীশয়া শোচতি মুহ্যমানঃ।
জুষ্টং যদা পশ্যত্যন্যমীশমস্য মহিমানমিতি বীতশোকঃ।।

“দুটি পাখী একই গাছে বসে, কিন্তু যে পাখীটি ফল আহারে রত, সে তাঁর কর্মের ফলস্বরূপ সর্বদাই শোক, আশঙ্কা এবং উদ্বেগের দ্বারা মুহ্যমান। কিন্তু যদি সে একবার তার নিত্যকালের বন্ধু অপর পাখীটির দিকে ফিরে তাকায়, তবে তার সমস্ত শোকের অবসান হয়, কারণ তার বন্ধু হচ্ছেন পরমেশ্বর ভগবান এবং তিনি সমগ্র ঐশ্বর্যের দ্বারা মহিমান্বিত।”

পদ্মপূরাণ থেকে আমরা জানতে পারি যে এই ব্রহ্মাণ্ডে মোট ৮৪ লক্ষ ধরণের জীব-শরীর বা প্রজাতি রয়েছে এদের মধ্যে ৯ লক্ষ প্রজাতি হচ্ছে জলচর জীব, ২০ লক্ষ উদ্ভিদ প্রজাতি, কীট-পতঙ্গ হচ্ছে ১১ লক্ষ প্রজাতির, পাখী-প্রজাতি হচ্ছে ১০ লক্ষ, পশু ৩০ লক্ষ প্রজাতির, এবং মানুষ ৪ লক্ষ প্রজাতির। জীবসত্তা নানা প্রজাতির বিভিন্ন রকম জীব-শরীরে অবিরাম দেহান্তরিত হয়ে চলে, কিন্তু পরমাত্মা একান্ত সখার মতোই সর্বদাই তার সঙ্গে থাকেন; সেই জীবসত্তা মানবদেহে বা একটি কীট দেহে- যে দেহেই অবস্থান করুক না কেন, ভগবান সর্বক্ষণ তার সঙ্গে থাকেন।
পুনর্জন্ম কি?

(সূত্রঃ ভগবদগীতার সারতত্ব ছয় পর্বের প্রাথমিক পাঠক্রম )

জড় বস্তু ও চেতন পদার্থের স্বরূপ সম্বন্ধে শাস্ত্র আমাদেরকে তথ্য প্রদান করে। প্রথম যে মৌলিক জ্ঞান আমাদের শিক্ষা দেওয়া হয়, তা হচ্ছে এই যে, আমরা এই জড়দেহগুলি নই, আমরা চেতন আত্মা। আত্মার শরীর সচ্চিদানন্দময়, জড়-উপাদান-বিহীন; তাঁকে বলা হয় স্বরূপ দেহ। পরিবর্তনশীল জড় দেহটি জড় পদার্থের নির্মিত। প্রকৃ্তপক্ষে, জড় শরীরের দুটি ভাগ রয়েছে স্থূল ও সূক্ষ্ম। মাটি (কঠিন পদার্থ), জল (তরল), অগ্নি (তাপ), বায়ু (গ্যাসীয়) এবং আকাশ, এই পাঁচটি উপাদানে তৈরী হয় স্থূল শরীর। মন, বুদ্ধি ও অহঙ্কার – এই তিনটি উপাদানে তৈরী হয় সূক্ষ্ম শরীর। এই দুটি শরীরই আত্মার জড় আবরণ বিশেষ। স্বরূপতঃ প্রতিটি জীবসত্তাই চিন্ময়, অজড় (সচ্চিদানন্দময়), কিন্তু যখন কোন জীব জড়জগৎকে উপভোগ করার বাসনা করে, তখন সে চিন্ময় জগৎ হতে জড় জগতে অধঃপতিত হয়। এভাবে যখন আত্মাকে জড় জগতে প্রেরণ করা হয়, তখন জড়জগতে তাকে জড় শরীরের আবরণে আচ্ছাদিত করা হয়, যাতে সে এই জড় পরিবেশের সংগে সামঞ্জস্যবিধান করে চলতে পারে, জড়জগতে বাস করতে পারে। ঠিক যেমন আপনি যখন বিদেশে যান, তখন সেই ঠান্ডা দেশের উপযোগী শীত বস্ত্র নিয়ে যান। জীবাত্মাকে প্রথমে মানব বা উচ্চতর কোনো প্রজাতির জন্ম দেওয়া হয়; কিন্তু সে যখন তার অপরাধ প্রবণতা সংশোধন না করে অধিকতর জড়-বিষয় সম্ভোগে আকাঙ্ক্ষিত হয়, তখন তাঁকে নিম্নতর প্রজাতিতে অধঃপতিত হতে হয়। তাঁর বিবর্তনের ধারায় ৮৪ লক্ষ প্রজাতির জীব শরীর- জলচর, উদ্ভিদ, পশু প্রভৃতি নানা জীব-শরীরে দেহধারণ করার পর তার মূল্যবান মানব-জন্ম লাভ হয়। তাকে বার বার দেহান্তরিত হওয়ার এই অন্তহীন চক্র হতে মুক্ত হবার আরেকটি সুযোগ প্রদান করা হয়। যে সরল প্রক্রিয়ায় জীব এক দেহ হতে অপর দেহে স্থানান্তরিত হয়, তাকে পূনর্জন্ম বলা হয়।
বাংলাতেই সংগৃহীত পুনর্জন্মের এক বাস্তব কেস-হিস্ট্রিঃ

(সূত্রঃ ভগবদগীতার সারতত্ব ছয় পর্বের প্রাথমিক পাঠক্রম )

ডঃ স্টিভেনসন-এর সংগৃহিত ২০০০ কেস-হিস্ট্রির একটি হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের একটি ছোট্ট মেয়ে। শুক্লার বয়স যখন মাত্র দেড় বছর, কথা বলতে শিখেছে কি শেখেনি, তখন থেকেই সে একটি বালিশ নিয়ে দোলনায় দোল দিত, আর বলত যে এটি হচ্ছে ‘মিনু’। সে বলত সে মিনু হচ্ছে তাঁর মেয়ে। পরবর্তী তিন বছরে শুক্লা তার পূর্ব জন্মের অনেক ঘটনাই স্মরণ করতে পারল, যাতে বোঝা গেল যে মিনু সত্যিই গত জন্মে তাঁর মেয়ে ছিল।

শুক্লা ছিল পশ্চিমবঙ্গের কম্পা গ্রামের এক রেলকর্মীর মেয়ে। সে কেবল তার মেয়ে মিনুর কথাই বলত না, ‘মিনুর বাবা’, অর্থাৎ তার স্বামী কথাও বলত, (অবশ্য তার নাম সে বলেনি- হিন্দু স্ত্রী তাঁর স্বামীর নামোচ্চারণ করে না)। সে তার গত জন্মের দুটি ভাইয়ের কথাও বলত- খেতু এবং কানাই। সে বলেছিল যে এরা সবাই ভাটপাড়ার রথতলাতে থাকত।

শুক্লার পরিবার- গুপ্তরা ভাটপাড়া অল্প চিনতেন; এটা ছিল প্রায় ১১ মাইল দূরের একটা বাজার, কিন্তু তাঁরা কখনো রথতলার কথা শোনেননি, বা যেসব লোকদের শিশু শুক্লা নাম করেছিল, তাঁদেরকেও তাঁরা চিনতেন না। শুক্লা সেখানে যাওয়ার জন্য জিদ করতে থাকে এবং বলে যে তারা না নিয়ে গেলে সে একাই ওখানে যাবে।

শুক্লার বাবা, শ্রী কে. এন. গুপ্ত বিষয়টি সম্বন্ধে তাঁর বন্ধুবান্ধবদেরকে বললেন। তিনি তাঁর একজন রেলের সহকর্মী, অ্যাসিস্ট্যান্ট স্টেশন মাষ্টার শ্রী এন. সি. পালকেও ঘটনাটি বলেন। শ্রীপাল ভাটপাড়ার কাছাকাছি অঞ্চলে থাকতেন, আর ভাটপাড়ায় তাঁর দুই ভাইপো থাকত। তাঁর ভাইপ োদের কাছে খোঁজ-খবর নিয়ে তিনি জানতে পারলেন যে সত্যিই ভাটপাড়ার কাছে রথতলা বলে একটি জায়গা রয়েছে। সেখানে খেতু বলে একজন ব্যক্তির খবরও পাওয়া গেল। খেতুর একটি শ্যালিকা ছিল, নাম মান্না। সে কয়েক বছর আগে (১৯৪৮) মিনু নামের একটি ছোট শিশু কন্যাকে রেখে মারা যায়। শ্রীসেনগুপ্ত বিষয়টি আরো অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিলেন। পরিবারের সম্মতি গ্রহণ করে তিনি একদিন রথতলায় যাবার জন্য তৈরী হলেন। শুক্লা বলল যে সে পথ দেখিয়ে বাড়ীতে নিয়ে যেতে পারবে।

সুতরাং একদিন ১৯৫৯ সালে, শুক্লার বয়স যখন পাঁচ, শ্রীসেনগুপ্ত পরিবারের আরো পাঁচ জনকে ও শুক্লাকে নিয়ে ভাটপাড়ার দিকে রওনা হলেন। সেখানে পৌঁছানোর পর শুক্লাই পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে লাগল। বিভিন্ন মোড় অতিক্রম করে, ভুল রাস্তায় না গিয়ে সে সরাসরি সে তাঁর পূর্বজন্মের শ্বশুর অমৃতলাল চক্রবর্তীর গৃহে সবাইকে নিয়ে উপস্থিত হলে। ঘটনাক্রমে, ঐ বাড়ীর শ্রীচক্রবর্তী তখন বাড়ির বাইরে রাস্তাতে ছিলেন। তাঁকে দেখতে পেয়ে শুক্লা সলজ্জভাবে তাঁর দিকে তাকাতে লাগল, ঠিক যেমন একজন বাঙ্গালী গৃহবধু পরিবারের বয়স্ক পুরুষকে দেখে লজ্জা অনুভব করে থাকে। কিন্তু শুক্লা বাড়ীতে প্রবেশ করতে গিয়ে হতচকিত হলো। মনে হলো সে বাড়ীর প্রবেশ পথটি চিনতে পারছে না। পরে জানা গেল কেন এমন হয়েছে- মনার (শুক্লার পূর্ব জীবনের নাম) মৃত্যুর পর বাড়ীর প্রধান প্রবেশ পথ বড় রাস্তা থেকে সরিয়ে গলিতে করা হয়েছে।

গুপ্ত পরিবার অবিলম্বে দেখলেন, শুক্লা কেবল বাড়ীটিকেই সনাক্ত করে নি, বাড়ীর লোকজনকেও সে যথাযথভাবে চিনিয়ে ছিল- তাঁর (মনার ) শ্বাশুড়ী মা, ঠাকুরপো, তাঁর স্বামী, এবং তাঁর মেয়েকে। সেসময় শ্রীঅমৃতলাল চক্রবর্তী মহাশয়ের বাড়ীতে শুক্লাকে ঘিরে ঐ ঘরটিতে প্রায় ২০ থেকে ৩০ জন লোক ছিল। যখন শিশু শুক্লাকে জিজ্ঞাসা করা হল, “তুমি কি এর মধ্য থেকে তোমার স্বামীকে দেখাতে পারো?” উত্তরে শুক্লা ঠিকঠিক ভাবে শ্রীহরিধন চক্রবর্তীকে চিনিয়ে দিল, সে-ই ছিল মনার স্বামী।

শুক্লা ও হরিধন চক্রবর্তীর এরপর বেশ কয়েকবার সাক্ষাৎ হয়েছিল, শুক্লা এজন্য সাগ্রহে প্রতীক্ষা করত। যখন হরিধন চক্রবর্তী একবার শুক্লাদের বাড়ীতে এলেন, শুক্লা তাঁর পরিবারকে গলদা চিংড়ি রান্না করতে বলল; সে বলেছিল যে এটাই তাঁর পূর্ব-স্বামীর প্রিয় খাবার। তাঁর কথামত তাঁর পরিবার ঐ খাবারই তৈরি করলেন, এবং পরে তাঁরা দেখলেন যে শুক্লা ঠিক কথাই বলেছে। হরিধন চক্রবর্তীর সংগে ছোট্ট শুক্লা একজন যথার্থ হিন্দু স্ত্রীর মতোই আচরণ করত। শ্রীচক্রবর্তী খাওয়া হলে সেই থালার অবশিষ্ট খাবার শুক্লা সযন্তে খেত, ঠিক যেমন একজন হিন্দু গৃহিণী করে থাকেন। কিন্তু শুক্লা কখনো অন্য কারো থালা থেকে তাদের উচ্ছিষ্ট খেত না।

একটি প্রত্যক্ষ প্রমাণঃ
শুঁয়ো পোকা থেকে প্রজাপতিঃ শুঁয়োপোকা সকলের কাছেই অপাংক্তেয় – তার বিদঘুটে চেহারা, ততোধিক বিদঘুটে চলাফেরা আর অ্যাসিড-ভর্তি শুঁয়ো বা রোমের জন্য – ছোঁয়া লাগলেই বিপত্তি। কিন্তু সেই শুঁয়োপোকা যখন বড় হয়, তখন সে নিজের মুখের লালা দিয়ে সুপুরির খোলসের মতো দেখতে একটি গুটি তৈরি করে। ঐ গুটির মধ্যে থেকে সে পুরো মুখটি আটকে দেয়। পরে গুটি ভেঙ্গে বেরিয়ে আসে ঝলমলে, রঙীণ পূর্ণাঙ্গ এক প্রজাপতি- শিল্পের এক অনবদ্য সৃষ্টি, যার কাজ শুধু আনন্দে ওড়া আর ফুলের মধু খাওয়া। গুটির মধ্যে পড়ে থাকে শুঁয়োপোকার অস্পর্শ্য মৃতদেহটি। শুঁয়োপোকার দেহের মালিকটিই এখন প্রজাপতি দেহে, যে জীবন-কণা শুঁয়োপোকার দেহে ছিল, সেই জীবন-কণা এখন বিরাজ করছে প্রজাপতি দেহে; দেহের সাথে সাথে তার বদলে গিয়েছে খাদ্যাভাস, চলন-গমন – সবকিছু।
আমাদের জীবনে পূর্বজন্মের প্রাসংগিকতা:

(সূত্রঃ ভগবদগীতার সারতত্ব ছয় পর্বের প্রাথমিক পাঠক্রম )

উপরে উল্লেখিত ঘটনাটির মতো একইরকম ঘটনার সংগে পরিচিতি বহু মানুষের রয়েছে। তবুও অনেকেই মৃত্যর পর জীবনের অস্তিত্বের কথা ভেবে ভীত হয়ে পড়েন, তাঁরা শীঘ্রই সবকিছু ভুলে গিয়ে দৈনন্দিন জীবনের বাঁধাধরা কার্যকলাপে মগ্ন হয়ে পড়েন। বর্তমান যুগে মানুষ তাদের নিজস্ব কেরিয়ার, পরিকল্পনা নিয়ে এতই ব্যস্ত যে তাদের এর বাইরে ভাবনা-চিন্তা করার সময় বা ইচ্ছা, কোনটাই নেই। সবকিছুকেই তারা ব্যক্তিগত, ঐহিক লাভালাভের ভিত্তিতে বিচার করে থাকেঃ “বেশ, পূর্বজন্ম সত্যি। কিন্তু তা জেনে আমার লাভ কোথায়? এইসব নিরর্থক আলোচনার প্রয়োজন কি? আমার জীবনে পুনর্জন্মের কি উপযোগিতা আছে?” নিঃসন্দেহে, আমাদের জীবনে পুনর্জন্মের অত্যন্ত অর্থপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যখন আমরা জন্মান্তর তত্ত্ব উপলব্ধি করি, তাকে সত্যি বলে স্বীকার করি, তখন স্বভাবতঃই এটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে আমরা এই দেহ নই, আমরা চিন্ময় আত্মা। কিন্তু ঘুম থেকে সকালে জেগে ওঠার পর থেকে সারা দিনে-রাত্রে, শোবার সময় পর্যন্ত আমরা যা-কিছু করে থাকি- অফিসে যাওয়া, অর্থ রোজগার করা, খাওয়া, ঘুমানো, সন্তান উৎপাদন করা, আত্মরক্ষার বন্দোবস্ত করা, আমোদ-প্রমোদ করা- এ সবই আমরা করে থাকি দেহের জন্য, যেটি কেবল একটি পোশাক ছাড়া আর কিছুই নয়। আসল ট্রাজেডি আসে তখন, যখন দেহ-পোশাকটি জীর্ণ-হয়ে যায় আমাদের সঞ্চিত অর্থ, সম্পদ-সম্পত্তি, আত্মীয়স্বজন, পুত্র-পরিজন- এমনকি সকল কর্মাবর্তের কেন্দ্রবিন্দুস্বরূপ অতিপ্রিয় এই দেহটিকেও মৃত্যু নিষ্ঠুরভাবে ছিনিয়ে নেয়। আত্মাকে দেহ থেকে বের করে দেওয়া হয়, তারপর আত্মা পূর্ব দেহকৃ্ত কর্মফল অনুসারে অন্যত্র কোনো একটি শরীর গ্রহণ করে থাকে।

অবশ্য, দেহান্তরিত হবার সময়, একটি-দেহ ত্যাগ করার সময় আত্মা পুরোপুরি জড়-আবরণ বা শরীর-পোশাক হতে মুক্ত হয় না। স্থুল শরীরটি চলে গেলেও মন-বুদ্ধি-ও অহঙ্কার (মিথ্যা ‘আমি’-বোধ), এই তিনটি সূক্ষ্ম, অদৃশ্য জড় উপাদানে নির্মিত শরীরটি থাকে। যতদিন জড়বাসনা, ভোগপ্রবৃত্তি নির্মূল হয়ে শুদ্ধ ভক্তির উন্মেষ না হয়, ততদিন আত্মা জড়দেহ হতে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হয় না।

এই সব বাসনা, কর্মফল, সূক্ষ্ম শরীরের সাহায্যে এক স্থুল দেহ হতে অন্য স্থুলদেহে বাহিত হয়। আত্মা তার সূক্ষ্ম শরীরে কি কি বহন করে নিয়ে যায়? (১) পূণ্য কর্মফল, (২) পাপ কর্মফল, (৩) ত্রিগুণের প্রভাব, (৪) জড় বাসনা, (৫) ভক্তিমূলক সুকৃ্তি। এগুলির মধ্যে প্রথম দুটির ফলে ভাল ও খারাপ ফল ভোগ করতে হয়, তৃ্তীয়টি অর্থাৎ বিভিন্ন মাত্রার ত্রিগুণের প্রভাবে বিশেষ ধরণের শরীর ও স্বভাব লাভ হয়, চতুর্থটি- অর্থাৎ জড়বাসনা জড়শরীর লাভকে সুনিশ্চিত করে (জড়জগৎরূপ কারাগারের মেয়াদ বৃদ্ধি করে) এবং পঞ্চম অর্থাৎ ভক্তিমূলক সুকৃতি বা সেবা-কর্ম আত্মাকে সমস্ত কর্মফল, গুণ-প্রভাব, জড়বন্ধন থেকে মুক্ত করে ভগবদ্ধামে নীত করে, যেখানে তিনি সরাসরি ভগবানের সংগে নিত্য লীলাবিলাসে অংশগ্রহণ করতে পারেন, যা দিব্যমধুর, পরমানন্দদায়ক!

আপনি কি কসাইখানায় একটির পর একটি ছাগলের শিরশ্ছেদ হতে দেখেছেন? ছাগলের বুদ্ধির কথা একটু ভাবুন। একটি কসাইখানায় যদি দুটি ছাগল দেখেন, তাহলে দেখবেন যে একটি ছাগলকে যখন মুন্ডু কেটে তাঁর চর্ম ছাড়িয়ে কেটে কেটে বিক্রি করা হচ্ছে, অন্য ছাগলটি তখন সামনে ফেলে দেওয়া কিছু কচি ঘাস পরম নিশ্চিন্ত মনে আধ বোজা চোখে চিবোচ্ছে! আপনি যদি তাকে গিয়ে বলেন, ‘ওহে, দেখছ না এরপরই তোমার পালা আসছে? তোমারও এখনই মুন্ডু কাটা হবে! ঘাসের লোভে এখানে পড়ে থেকো না, এখনি পালাও!’ সে আপনার কথায় আদপেই কর্ণপাত করবে না। সে তার অর্ধনিমীলিত চোখে সুখের আবেশে কেবল মাথাটি নাড়বে, চিবোতে থাকবে কচি ঘাস। কিন্তু কিছুক্ষণ পর … … … ওকস্মাৎ তাকে ধরে নিয়ে যওয়া হয়, এক ধারাল খড়গ মাথার উপর নামে বিদ্যুৎগতিতে, আলাদা হয়ে যায় ধড় থেকে মুণ্ডটি মুহুর্তেই, ভেঙে যায় সুখ-তৃপ্তির মধুর দিবাস্বপ্ন!

জড় দেহঃ আত্মার পরিবর্তনশীল পোশাক:

(সূত্রঃ ভগবদগীতার সারতত্ব ছয় পর্বের প্রাথমিক পাঠক্রম )

জড়দেহটি সর্বদা পরিবর্তনশীল। কোষগুলি সদা-সর্বদা রূপান্তরিত হয়ে চলেছে। সাত বছর অন্তর দেহের সমস্ত কোষগুলিই যায় বদলে। আপনি সাত বছর বা চৌদ্দ বছর পূর্বে যে দেহটি ব্যবহার করতেন, এখন আপনার সেই দেহটি নেই। ঠিক যেমন আপনার কয়েক বছর আগের পোশাকটি এখন আর পূর্বের মতো নেই। একটি নধর কোমল শিশুদেহ এভাবে ৮০ বছরে এক জরা-জীর্ণ দেহে রূপান্তরিত হয়।

কিন্তু অস্থায়ী জড়দেহ-রূপ পোশাকটির এতসব রূপান্তর ঘটলেও দেহাভ্যন্তরস্থ আত্মা সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত থাকে – আত্মার কোনো পরিবর্তন বা বিকার হয় না (অবিকারী, ভ.গী-২/২৫)। আত্মার এমনকি জন্ম বা মৃত্যুও নেই, কেননা আত্মা শাশ্বত। সেজন্য শরীর পরিবর্তিত হলেও আত্মা থাকে অপরিবর্তিত। অমাবশ্যার চাঁদ থাকে অদৃশ্য; তারপর “প্রথমা”, “দ্বিতীয়” তারপর “তৃ্তীয়া”- এইভাবে তিথির সংগে চন্দ্রকলা বাড়তে থাকে, অবশেষে “চতুর্দশী”-র পর আসে পূর্ণিমা। তারপর চন্দ্রকলা হ্রাস পেতে থাকে। ১৪ দিন পর আসে অমাবস্যা- চাঁদকে আর দেখাই যায় না। এইভাবে হ্রাস-বৃদ্ধির এই চক্র ক্রমাগত চলতেই থাকে। কিন্তু স্বয়ং চাঁদের কি কোনো পরিবর্তন হয়? আদপেই নয়। আমাদের আপেক্ষিক অবস্থানের জন্য আমাদের কাছে চন্দ্রকলার হ্রাস-বৃদ্ধি প্রতীয়মান হয়, আমরা একে দ্বিতীয়া, তৃতীয়া বলে থাকি। আমাদের অবস্থানের ভিত্তিতে আমরা এমন মনে করে থাকি- চাঁদের কোনো পরিবর্তন হয় না। ঠিক তেমনি, আমরা পরিবর্তনশীল দেহের সংগে নিজেদের আত্মপরিচয় মিশ্রিত, একীভূত করে ফেলি, অর্থাৎ শরীরের সংগে নিজেদের সম্পৃক্ত করে ফেলি। আমরা অবিরাম বিভিন্ন ধরণের শরীরের অভিজ্ঞতা পেতে থাকি- শিশুদেহ, কৈশোর, বার্ধক্য, মৃত্যু, কখনো উদ্ভিদ দেহ, কখনো পশু-দেহ। আমরা জড়-অস্তিত্বের এইসব নানা অবস্থার সংগে নিজেদেরকে এক করে ফেলি, কিন্তু প্রকৃ্তপক্ষে আমরা স্বরূপতঃ অপরিবর্তনীয় শাশ্বত আত্মা, ঐ সব অবস্থার সংগে আমাদের কোনো শাশ্বত সম্পর্ক নেই। বাহ্যিক স্থূল দেহটি আসলে এই জড়জগতে চলবার উপযোগী আত্মার একটি কোটের মতো। ভগবদগীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেন, “মানুষ যেমন জীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করে, দেহীও তেমনই জীর্ণ শরীর ত্যাগ করে নতুন দেহ ধারণ করেন।”

জড়া প্রকৃতির তিনটি গুণ

(সূত্রঃ ভগবদগীতার সারতত্ব ছয় পর্বের প্রাথমিক পাঠক্রম )

জড়া প্রকৃতি ত্রিগুণাত্মিকা- তিনটি গুণে গঠিত; এগুলি হচ্ছে (১) সত্ত্ব গুণ (২) রজো গুণ এবং (৩) তমো গুণ।

‘গুণ’ শব্দের অপর একটি অর্থ হচ্ছে ‘রজ্জু’ বা দড়ি। তিন ‘তন্তু’ (সূত্র) পাকিয়ে দড়ি তৈরী করা হয়। প্রথমে তন্তু পাকিয়ে তিনটি সূত্র করা হয়। তারপর এগুলি পাকিয়ে একটি মোটা সূত্র হয়। এইরকম তিনটি করে সূত্র পাকিয়ে অপেক্ষাকৃত মোটা সূত্র বানানো হয় এবং এইরকম আরো তিনটি সূত্র অসংখ্যবার পাকিয়ে খুব শক্ত দড়ি তৈরী করা হয়। এইভাবে তিনটি গুণ পারস্পারিক মিশ্রণে প্রথমে নয় রকমের হয়, ঐগুলির পারস্পারিক মিথস্ক্রিয়া থেকে ৯ x ৯ = ৮১ টি মিশ্রণ হয়; এইভাবে তিনটি গুণের মিথস্ক্রিয়ায় অসংখ্য ‘রঞ্জক’ বা মিশ্রণ উৎপন্ন হয়, ঠিক যেমন লাল, হলুদ ও সবুজ- এই তিনটি রঙের বিভিন্ন মাত্রার মিশ্রণে বহুরকমের রঞ্জক সৃষ্টি করা যায়।

এই ‘গুণ’ বা দড়ির দ্বারা জড়া শক্তি জীবাত্মাকে জড় জগতে আবদ্ধ করে রাখে। চেতনায় জড় গুণের প্রভাব যত বর্ধিত হয়, জড়বন্ধন ততই তীব্র হয়, জড় আসক্তি ততই প্রবল হতে থাকে। আমাদের নিজেদের চেষ্টায় আমরা এই গুণের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারি না।

জীবাত্মার এই জড় বন্ধনে আবদ্ধ থাকাকে শাস্ত্রে ‘প-বর্গ’ বলে অভিহিত করা হয়েছে, আর বন্ধনমুক্তিকে বলা হয় ‘অপবর্গ’। ব্যকরণের বর্ণমালা পাঁচটি বর্গে বিভক্ত; এর মধ্যে পঞ্চম বর্গটি হচ্ছে প; এই বর্গে পাঁচটি বর্ণ রয়েছেঃ প, ফ, ব, ভ, ম। জড়বন্ধনকালীন দুর্দশাকে পাঁচটি অক্ষরের প্রতীকে ব্যক্ত করা হয়েছে; তা এইরকমঃ

প = পরিশ্রমঃ এই জড় জগতে প্রত্যেক জীব সত্তাকে ‘বেঁচে’ থাকার জন্য অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। একে বলা হয় ‘জীবন সংগ্রাম’, অস্তিত্ব রক্ষার কঠোর লড়াই।

ফ = ফেনাঃ যখন একটি ঘোড়াকে কঠোর পরিশ্রম করানো হয়, যেমন একটি ভারী মালবোঝাই গাড়ী টানানো- তখন তার মুখের দু’পাশ দিয়ে ফেনা বেরিয়ে আসে। ঠিক তেমনি আমাদেরকেও কঠোর পরিশ্রম করতে হয়; সরাসরি দেখা না গেলেও ঐ একইভাবে যেন মুখে ফেনা বেরিয়ে আসে- অর্থাৎ শেষ শক্তি ব্যয় করে পরিশ্রম করে যেতে হয়। প্রত্যেকেই ইন্দ্রিয়তৃপ্তির জন্য মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রাত-দিন জ্ঞান না করে পরিশ্রম করে চলে।

ব = ব্যর্থতাঃ আমাদের কঠোর প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এই জগতে আমাদের সকল আশা ব্যর্থ হয়, সকল প্রয়াস বিফল হয়।

ভ = ভয়ঃ জড় জাগতিক জীবনে আমরা সর্বদাই নানা ভয়, উৎকণ্ঠা, শঙ্কার দাবানলে দগ্ধীভূত হতে থাকি।

ম = মৃত্যুঃ আমাদের সমস্ত আশা, মমত্বলালিত সুখস্বপ্নের অন্তিম সমাধি রচনা করে অপ্রতিরোধ্য, অনিবার্য মৃত্যু। জন্মের পর জন্ম – অন্তহীন কাল ধরে জড় অস্তিত্বের দুর্দশাভোগ থেকে, এই ‘প-বর্গ’ থেকে বেরিয়ে আসার নিশ্চিত উপায় হচ্ছে কৃষ্ণভাবনামৃত অনুশীলন। অন্য কথায়, কৃষ্ণভাবনামৃত গ্রহণ করলে আমরা ‘অপবর্গ’ লাভ করি, যার অর্থ হচ্ছে এই প-বর্গ হতে অব্যাহতি, অর্থাৎ আমরা এমন স্তরে উন্নীত হই, সেখানে এই জড় অস্তিত্ব-জাত কঠোর সংগ্রাম, ব্যর্থতা, ভয় বা মৃত্যু – কোনটিরই অস্তিত্ব নেই।

সত্ত্ব, রজো, ও তমোগুণে প্রভাবিত মানুষের লক্ষণ :

(সূত্রঃ ভগবদগীতার সারতত্ব ছয় পর্বের প্রাথমিক পাঠক্রম )

সত্ত্ব গুণঃ সত্ত্ব গুণসম্পন্ন মানুষ অন্যদের থেকে জ্ঞানী হন। যেহেতু তিনি শাস্ত্র-নির্দেশ অনুসারে জীবনযাপন করেন, সেজন্য তিনি জড় দুঃখ-দুর্দশার দ্বারা খুব বেশি প্রভাবিত হন না। তিনি নিজেকে জ্ঞানী মনে করেন। নিজেকে জড়-বিষয়ক জ্ঞানে অন্যদের থেকে তিনি সুখী ভাবেন, কেননা তিনি পাপকর্মের কু-ফল থেকে অনেকটা মুক্ত থাকেন। সত্ত্বগুণের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছেন একজন যথার্থ ব্রাহ্মণ।

যখন কোন জীবসত্তা সত্ত্বগুণে প্রভাবিত হয়ে মানব শরীর ধারণ করে, তখন তিনি নিজেকে অন্যদের তুলনায় বেশী জ্ঞানী ও সুখী বলে অভিমান করেন এবং এইভাবে জ্ঞানাসক্তি ও সুখাসক্তি দ্বারা আবদ্ধ হন। এর প্রকৃষ্টতম উদাহরণ হচ্ছে বিজ্ঞানী, কবি, সাহিত্যিক ও দার্শনিকগণ। এঁদের প্রত্যেকেই তাঁর নিজের জ্ঞানের জন্য খুবই গর্বিত, এবং যেহেতু তাঁরা ধীরে ধীরে তাঁদের জীবনের অবস্থার উন্নতি সাধন করতে থাকেন, সেজন্য তাঁরা এক ধরণের জড় সুখ অনুভব করতে থাকেন। উন্নত সুখের এই ধারণার ফলে তাঁরা জড়া প্রকৃ্তির সত্ত্বগুণের দ্বারা আবদ্ধ হন। যতদিন তাঁরা এইভাবে কর্ম সম্পাদনে আগ্রহী থাকবেন, জ্ঞানাসক্তি (জড় জ্ঞান) ও সুখাসক্তি দ্বারা আবদ্ধ থাকবেন, ততদিন তাঁদেরকে একের পর এক এইরকম জড় শরীর ধারণ করতে হবে। এইভাবে মুক্তিলাভ করে চিন্ময় জগতে ফিরে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা তাঁদের থাকে না। এইভাবে বার বার একজনকে বিজ্ঞানী হয়ে জন্মাতে হয়, কাউকে বা বার বার দার্শনিকের জন্ম গ্রহণ করতে হয়, এবং প্রত্যেক জন্মে জন্ম জরা, মৃত্যু-রূপ ভয়ঙ্কর অসুবিধাগুলি তাঁদের সহ্য করতে হয়। কিন্তু মায়াময় জড়াশক্তির দ্বারা মোহিত হবার ফলে প্রত্যেক জীবনকেই তাঁরা অত্যন্ত সুখময় বলে মনে করেন। সেইজন্য, “ভগবদগীতায় শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন, হে নিষ্পাপ ! এই তিনটি গুণের মধ্যে সত্ত্বগুণ অপক্ষাকৃত নির্মল, প্রকাশক এবং পাপশূন্য । এই সত্ত্বগুণ ‘আমি সুখী’ এই প্রকার সুখাসক্তি এবং ‘আমি জ্ঞানী’ এই প্রকার জ্ঞানাসক্তির দ্বারা আত্মাকে আবদ্ধ করে। ”(ভ.গী. ১৪/৬)

সত্ত্বগুণে প্রভাবিত হবার দৃষ্টান্তঃ

ডঃ ব্রাইট ও তাঁর স্ত্রী মিসেস ব্রাইট তাঁদের দুটি সন্তান সহ একটি শান্ত গ্রাম্য শহরে একটি ছোটখাট কিন্তু সুন্দর একটি গৃহে থাকেন। ডঃ ব্রাইট একজন স্থানীয় এম. ডি; তিনি খুব চিন্তাশীল, গুণবান মানুষ এবং তাঁর দায়িত্ব সততার সংগে নিঃস্বার্থভাবে পালন করার জন্য তিনি তাঁর অঞ্চলে অত্যন্ত সম্মানিত। তাঁর সখ হচ্ছে দর্শন, কাব্য ও বিজ্ঞান-সম্বন্ধীয় বই পড়া। ছেলেমেয়েরা যখন বাড়িতে থাকে, তখন মিসেস ব্রাইট তাঁদেরকে নিয়ে বাড়ীর চারপাশের বাগান দেখাশনা করেন, শাক-সব্জি চাষ করেন এবং তাঁদের গরুটির যত্ন নেন। এই ব্রাইটেরা বেশ সচ্ছল, সম্পন্ন পরিবার; এবং ঈশ্বর তাঁদের যা দিয়েছেন সেজন্য তাঁরা তাঁকে ধন্যবাদ জানান, এবং ধর্ম আচরণকে এক অবশ্যপালনীয় কর্তব্য বলে মনে করেন। যে কেউ-ই তাঁদেরকে অত্যন্ত পুণ্যবান বলে নিঃসন্দেহে অভিহিত করবেন। তাঁরা জুয়া বা লটারী খেলেন না, সবরকম নেশা তাঁরা কঠোরভাবে বর্জন করেছেন; মদ্যপান বা ধূমপান দূরে থাকুক, তাঁরা চা কিংবা কফিও পান করেন না। চিকিৎসক ব্রাইট তাঁর অনেক রুগীদেরকে তাদের অবৈধ যৌন সংসর্গের জন্য নানা রোগে ভুগতে দেখেছেন; তাঁদের পরিবার সম্পূর্ণভাবে অবৈধ সংসর্গ থেকে মুক্ত। তিনি তাঁর স্ত্রীর প্রতি বিশ্বস্ত, তাঁর স্ত্রীও তাঁর প্রতি অত্যন্ত বিশ্বস্ত। বহু পূর্বেই ব্রাইট ও তাঁর স্ত্রী স্থির করেছিলেন যে, যেহেতু পশুহত্যা সংগঠিট পাপকর্ম, সেজন্য তাঁরা পশুদের দেহ ভক্ষণ করবেন না। সুতরাং তাঁরা নিরামিষ আহার করেন- মাছ-মাংস কখনই গ্রহণ করেন না। এইভাবে, ব্রাইটেরা খুব পরিচ্ছন্ন, সরল ও সুখী জীবন যাপন করেন। কিন্তু ব্রাইট সম্পত্তি সুখ ও জ্ঞানের অভিমানের দ্বারা প্রভাবিত; তাঁরা তাঁদের স্বপ্নিল সুখময় জগতের প্রতি আসক্ত; সেজন্য তাঁরা সত্ত্বগুণের দ্বারা জড়াপ্রকৃ্তিতে আবদ্ধ রয়েছেন।

রজোগুণ, রজোগুণের প্রভাবের দৃষ্টান্তঃ

(সূত্রঃ ভগবদগীতার সারতত্ব ছয় পর্বের প্রাথমিক পাঠক্রম )

রজোগুণ

নর-নারীর পারস্পারিক আকর্ষণের সৃ্ষ্টি হয় রজোগুণের ক্রিয়ার ফলে। নারী পুরুষের প্রতি আসক্ত, পুরুষ নারীর প্রতি আকৃষ্ট। এই আকর্ষণ রজোগুণের প্রভাব সৃষ্ট। যখন এই রজোগুণ কোন মানুষের মধ্যে বৃদ্ধি পায়, তখন প্রবল জড়বিষয়ভোগের বাসনা উৎপন্ন হয়। ইন্দ্রিয়তৃপ্তি উপভোগের জন্য তাঁর হৃদয় অত্যন্ত লুব্ধ হয়। ইন্দ্রিয়সম্ভোগের জন্য মানুষ সমাজের মধ্যে বা জাতির মধ্যে সম্মানিত হতে চায়, এবং একটি সুন্দর বাড়ী, সুন্দরী স্ত্রী, ছেলেমেয়ে নিয়ে একটি সুখী পরিবারে নিজেকে দেখবার জন্য সে অত্যন্ত আকুল হয়ে ওঠে। সে ধনী, যশস্বী হতে চায়, উচ্চপদ লাভ করতে চায়, প্রভাবশালী রজোগুণের এই ক্রিয়ার ফল তার মধ্যে প্রকাশিত হয়। যতক্ষণ হৃদয়ে রজোগুণজাত আকাঙ্ক্ষা থাকে, ততক্ষণ তাঁকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। স্ত্রী, সন্তান ও সমাজকে পরিতুষ্ট করার জন্য তাঁকে তার সমগ্র জীবনীশক্তি প্রয়োগ করে পরিশ্রম করতে হয়। রজোগুণসম্পন্ন মানুষ সকাম কর্মে নিয়োজিত হয়; তাঁর মধ্যে প্রবল কর্মোদ্যম দেখা দেয়। সে যতটা সম্ভব জড় সম্পদের অধিকারী হবার চেষ্টা করে, এবং কখনো কখনো সৎকাজে তা ব্যয়ও করে থাকে। সমাজে তাঁর সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য সে হাসপাতাল খোলা, বিভিন্ন দাতব্য সংস্থায় অর্থদান ইত্যাদি করে। বাড়ী করতে চাইলে সে প্রাসাদোপম অট্টালিকা তৈরী করতে চায়, সকলের উপর প্রভুত্ব করতে চায়, সবকিছুই তার ইচ্ছায় পরিচালিত হোক – এইরকম সে আকাঙ্ক্ষা করতে থাকে, এবং এইসব আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য সে চেষ্টার ত্রুটি করে না। এইভাবে রজোগুণের প্রভাবে তার মন সর্বদাই নানা দুষ্পূরণীয় বাসনায় অধীর থাকে। আধুনিক মানব সমাজ সভ্যতা বিশেষভাবে রজোগুণের দ্বারা প্রভাবিত; গগনচুম্বী অট্টালিকা, বিশাল বিশাল শহর, অতিকায় সব কলকারখানা, অতি দ্রুতগতি যানবাহন, রকেট, অতি ভয়ংকর বিধ্বংসী অস্ত্রশস্ত্র – সবই রজোগুণের প্রকাশ। এই সভ্যতা রজোগুণের পরিপ্রেক্ষিত ‘উন্নত’, সত্ত্বগুণের ভিত্তিতে বিচার করলে এই সভ্যতা কেবল উৎকট কামনার প্রকাশ। সমগ্র জড়জগত কম-বেশি রজোগুণের দ্বারা প্রভাবিত এবং আধুনিক জড়সভ্যতা বিশেষভাবে রজোগুণের দ্বারা আশ্লিষ্ট। প্রাচীন বৈদিক সভ্যতা ছিল সত্ত্বগুণভিত্তিক।

রজোগুণের প্রভাবের দৃষ্টান্তঃ

শহরতলীর একটি অত্যাধুনিক সুযোগ সুবিধাযুক্ত বাড়ীতে বাস করেন স্মিথ পরিবার। প্রতিদিন সকালে ল্যারি স্মিথ অতি দ্রুত প্রাতরাশ গলাধঃকরণ করে ছোটেন যানবাহন ধরে যথাসময়ে অফিসে পৌঁছাতে। সেখানে সারাদিন তাঁকে বিস্তর ঝক্কি ঝামেলায় ব্যস্ত থাকতে হয়। তাঁর কাজটা বেশ কঠিন, কিন্তু তিনি এটাকে মেনে নেন এজন্য যে এই চাকরি তাঁকে এমন রোজগার দেয় যা দিয়ে তিনি বিলাসিতার সংগে কাটাতে পারেন, এবং তারপরও কিছু টাকা থাকে যা দিয়ে তিনি স্টক মার্কেটে বিনিয়োগ করেন এবং পাশাপাশি রহস্যময় কিছু ব্যবসাও করে থাকেন। “মুদ্রাই মধু” (মানি ইজ হানি), ল্যারির দর্শন। তাঁর স্ত্রী গ্লোরিয়া সকালে উঠে তার ছেলেমেয়েদের সাজগোজ করিয়ে স্কুলে পাঠান (পারিবারিক সম্মান স্মিথদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ), গ্লোরিয়ার সারা দিনের সঙ্গী তাঁর শিশুটি (“যাকে আমরা চাইনি”, ল্যারী বলেন)। গ্লোরিয়া বাড়ীতে থাকার সময় টিভি চলতে থাকে; তিনি খেলার মাঠে অন্যান্য গৃহবধু ও ছেলেমেয়েদের সংগে সময় কাটান, বিউটি পার্লারে যান, কিংবা শপিং বা কেনাকাটা করতে বেরোন (কখনো মনে হয় যে এটির কোনো শেষ নেই)। সারা দিনটা এভাবে স্মিথেরা কর্মমুখর, ব্যস্ত থাকেন, রাত্রে তাঁরা বিশ্রাম নেন; কিন্তু দিনের ধকল সুব বেশি হওয়ার জন্য প্রায়ই রাত্রে তাদের সুনিদ্রা হয় না। কখনো তাঁরা অতি তুচ্ছ বিষয় নিয়ে উচ্চৈঃস্বরে কথা কাটাকাটি করতে থাকেন। তবে মি. ল্যারি এবিষয়ে বিজ্ঞের অভিমত প্রকাশ করে বলেন, “এমন কোনো সমস্যা নেই, রতিক্রিয়ায় যার সমাধান হয় না!” সপ্তাহ শেষে রবিবার তাঁরা নিজেদেরকে ধার্মিক প্রতিপন্ন করতে গীর্জায় যান, কিন্তু এটা আসলে একটি সামাজিক ব্যাপার ছাড়া কিছুই নয়, কেননা তাঁরা সচরাচর ধর্মগ্রন্থের নির্দেশের পরিপন্থী আচরণ করে থাকেন। এই পরিবারটি আদর্শ রজোগুণ সম্পন্ন পরিবার।

তমোগুণঃ, তমোগুণের প্রভাবের দৃষ্টান্তঃ

(সূত্রঃ ভগবদগীতার সারতত্ব ছয় পর্বের প্রাথমিক পাঠক্রম )

তমোগুণ হচ্ছে সত্ত্বগুণের ঠিক বিপরীত। তমোগুণের দ্বারা প্রভাবিত হলে মানুষ অজ্ঞানতায় আচ্ছন্ন হয়, কোন কিছু সম্বন্ধে সে যথার্থভাবে অবগত হতে পারে না। তমোগুণে আচ্ছাদিত মানুষ অত্যন্ত অলস এবং তাদের পারমার্থিক জীবনের প্রতি, আধ্যাত্মিকতার প্রতি কোনো আকর্ষণ থাকে না। রজোগুণ-সম্পন্ন মানুষের মতো তামাসিক মানুষেরা অত সক্রিয়ও নয়। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ঘুমানো তাদের অভ্যাস। ৬ ঘন্টা ঘুমালেই যথেষ্ট, অথচ তমোভাবাপন্ন মানুষেরা দশ-বারো ঘণ্টা ঘুমিয়ে থাকে। বিশেষতঃ এরা কখনই ভোরে শয্যা ত্যাগ করতে পারে না- সকাল ৮/৯ টা অবধি ঘুমায়। তমো-আচ্ছন্ন মানুষকে হতাশ ও বিষণ্ণ মনে হয়, এবং সাধারণতঃ এঁরা মাদকাসক্ত হয়ে থাকে। চা-কফি, ধুমপান থেকে শুরু করে নানাবিধ নেশায় এঁরা আসক্ত থাকে, নেশার দাসত্ব থেকে বেরিয়ে আসার মানসিক বল তারা হারিয়ে ফেলে। এঁরা পচা, বাসী, দুর্গন্ধযুক্ত দ্রব্য আহার করতে ভালবাসে। তমোভাবাপন্ন মানুষ যা-কিছুই করুক তাতে তাঁর নিজের বা অপরের- কারোর কোনো কল্যাণ হয় না।

তমোগুণের প্রভাবের দৃষ্টান্তঃ

জন ডাল ও বেটি গ্রাম্বেলের জীবনধারা তমোগুণে প্রভাবিত হবার প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। এঁরা বিবাহ না করেও নিউইয়র্ক শহরের একটি সস্তা অপরিচ্ছন্ন কামরায় একসংগে থাকে। জন নেশার দ্রব্য ফেরি করে বিক্রি করে। ধর্ম সম্বন্ধে তারা বহু পূর্বেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে- এর কোনো উপযোগিতা তাদের জীবনে নেই। তারা প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা ঘুমিয়ে সময় কাটায়, নতুবা কড়া নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে কামরায় পড়ে থাকে। খিদে পেলে রসুন মেশানো সসেজ খেয়ে আর মদ্যপান করে তাদের উদর পূর্তি করে। বহু বছর ধরে তারা স্পেনে গিয়ে একটি কমিউন (সমভাবাপন্ন কিছু মানুষকে নিয়ে তৈরী একটি ছোট গোষ্ঠী, যারা একসংগে থাকে) শুরু করার স্বপ্ন দেখে, অবশ্য তা রূপায়িত করার জন্য তারা কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করে না, কেবল স্বপ্নিল আশাতেই তৃপ্ত থাকে।
আমাদের বিশেষ বিশেষ ধরণের স্বভাব, আচরণ কেন?

(সূত্রঃ ভগবদগীতার সারতত্ব ছয় পর্বের প্রাথমিক পাঠক্রম )

আমরা সাধারণতঃ ভেবে থাকি যে আমরাই আমাদের কার্যকলাপের নিয়ামক এবং আমরাই আমাদের চলা-ফেরা কাজকর্মের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি। কিন্তু পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ব্যাখ্যা করেন যে বিষয়টি আদৌ তা নয়। তিনি বলেন যে আমরা সম্পূর্ণভাবে তাঁর অপরা প্রকৃতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত; আমারা প্রকৃতির ক্রীড়নক (পুতুল) মাত্র। তারের দ্বারা যেমন উপর থেকে পুতুল নাচানো হয়, তেমনি প্রকৃতির ত্রিগুণ-রূপ রজ্জু বা দড়ির দ্বারা আমরা নিয়ন্ত্রিত হই; আমাদের আচার-আচরণ, কাজকর্ম জড়গুণগুলির দ্বারা উদ্রিক্ত হয়, সেজন্য বিভিন্ন মাত্রার বিভিন্ন গুণে আচ্ছাদিত থাকায় বিভিন্ন মানুষের – সকল বদ্ধজীবের স্বভাব, আচরণের ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। ভগবদগীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেন, “সকলেই অসহায়ভাবে মায়াজাত গুণসমূহের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কর্ম করতে বাধ্য হয়। তাই কর্ম না করে কেউই ক্ষণকালও থাকতে পারে না।” (ভ.গী.)৩/৫)। কেবল আপনি আমি নই, শ্রীকৃষ্ণ বলেনঃ “এই পৃথিবীর মানুষদের মধ্যে অথবা স্বর্গের দেবতাদের মধ্যে এমন কোন জীব নেই, যে প্রকৃতির গুণ থেকে মুক্ত”।

পূর্বে প্রদত্ত সত্ত্বগুণের দৃষ্টান্তে ফিরে আসা যাক। আমাদের বিজ্ঞ চিকিৎসক ডঃ ব্রাইট নিজেকে খুব জ্ঞানী বলে জানেন এবং তাঁর সুন্দর ঘরে, তাঁর লাইব্রেরীতে জীবন অতিবাহিত করে তিনি জড়জাগতিকভাবে সুখী মনে করেন। যদিও আপাতঃদৃষ্টিতে তাঁর জীবন আনন্দময় মনে হয়, তাঁর ধারণা সত্যি মনে হয়, কিন্তু বাস্তব চিত্রটি সম্পূর্ণ অন্য। তিনি দেহাত্মবুদ্ধিতে আচ্ছন্ন, জড়জাগতিক ভ্রান্ত ধারণায় প্রভাবিত; নিজের নশ্বর, অস্থায়ী দেহটিকে তিনি ‘আমি’ মনে করেন, অথচ সেটি কিছু জড় উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত জড়াপ্রকৃতির তৈরী একটি যন্ত্র মাত্র, যা অচিরেই বিশ্লিষ্ট হয়ে প্রকৃতির ভৌত উপাদানে মিশে যাবে। দেহাত্মবুদ্ধিতে আচ্ছন্ন থাকায় তিনি মোহগ্রস্ত, অজ্ঞানতায় আচ্ছন্ন। তিনি নিজেকে ভাবছেন তিনি হচ্ছেন “ডঃ ব্রাইট”, একজন ‘আমেরিকান’, ‘মধ্য বয়স্ক’, ‘স্বামী’, ‘পিতা’, ‘সুশিক্ষিত’, ‘ভদ্রলোক’। তিনি এখনো এই উপলব্ধি লাভ করতে পারেন নি যে বাস্তবে তাঁর ক্ষণস্থায়ী দেহটিও নন, মনও নন; তিনি শুদ্ধ চিন্ময় আত্মা, জীবাত্মা, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নিত্য দাস। যেহেতু তিনি নিজেকে তাঁর দেহের সংগে সম্পৃক্ত করে ফেলেন, এক, অভিন্ন বলে ভাবেন, সেজন্য তিনি অবশ্যই ঐ শরীরের নিয়ামক প্রকৃতির আইন বা নিয়মগুলির প্রভাবাধীন, বদ্ধ। সেজন্য তিনি অবশ্যই জড় শরীরের সমস্যাগুলি- জন্ম-জরা-ব্যাধি দ্বারা পীড়িত হতে থাকবেন, এগুলি থেকে তিনি অব্যাহতি পাবেন না।

সত্ত্বগুণের দ্বারা প্রভাবিত, আবদ্ধ হলে যদি এই পরিণতি হয়, তাহলে যারা নিম্নতর গুণগুলির দ্বারা আবদ্ধ তাদের কথা আর বলার কি আছে? স্মিথদের মতো যাঁরা রজোগুণে আচ্ছাদিত, তাঁরা তাঁদের অন্তহীন বিষয়বাসনা, জড় ভোগ-তৃষ্ণা আর কর্ম-প্রবণতার দ্বারা আবদ্ধ হন। আর মিঃ ডাল ও মিস গ্রাম্বেলের মতো যারা তমোভাবাচ্ছন্ন, তারা প্রমাদ, আলস্য ও নিদ্রার দ্বারা জড়া প্রকৃতিতে আবদ্ধ থাকে ও নিরন্তর জরা, ব্যাধি ও মৃত্যু দ্বারা ভঙ্গুর জড় শরীরে নিষ্পেষিত হতে থাকে।

আমাদের প্রকৃত জীবন হচ্ছে চিন্ময়, এবং সেজন্য তা শাশ্বত, দিব্যজ্ঞানময় ও আনন্দময়। সত্ত্বগুণে প্রভাবিত হলে আমরা ঐ শাশ্বত পারমার্থিক বাস্তবতার আভাস আমাদের জড় জ্ঞান ও জড় সুখের মধ্যে আস্বাদন করার চেষ্টা করি; রজোগুণের দ্বারা প্রভাবিত হলে আমরা কাম ও ধন-সম্পদের মাধ্যমে তা পেতে চাই (ঐ চিন্ময় বাস্তবতাকে প্রতিফলিত দেখতে চাই), আর তমোগুণে প্রভাবিত হলে আমরা নিদ্রা ও মাদকাসক্তির মাধ্যমে তা আস্বাদন করি। এইভাবে আমাদের জড়াপ্রকৃতির গুণগুলির প্রভাবে উৎপন্ন দূষিত বাসনাগুলির প্রভাবে আমাদের শুদ্ধ চিন্ময় স্বরূপ এই জড় জগতে বিকৃতভাবে প্রতিভাত হয়।

শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন ‘স্বরাট’, অর্থাৎ তিনি সম্পূর্ণ রূপে স্বাধীন। তিনি তাঁর যা ইচ্ছা, তাই-ই করতে পারেন। আর আমরা যেহেতু ভগবানের ক্ষুদ্র অংশ, সেজন্য আমাদের মধ্যেও স্বতন্ত্রতা-বোধ, স্বাধীন ইচ্ছা রয়েছে – তবে তা অতি ক্ষুদ্র পরিমাণে। সেজন্য আমাদের বাসনা অনুসারে আমাদের দেহ সত্ত্ব, রজো বা তমো গুণে, অথবা এইসব গুণের মিশ্রণের প্রভাবে ক্রিয়া-আচরণ করতে থাকে, কেননা এই বাসনাগুলি জড়। এই বাসনাগুলি পূরণের চেষ্টা করি তাও জড়।

ভ্রান্ত তত্ত্বঃ একটি পাপময় জীবনের বিনিময়ে অনন্তকাল নরক বাস?

(সূত্রঃ ভগবদগীতার সারতত্ব ছয় পর্বের প্রাথমিক পাঠক্রম )

পৃথিবীর কিছু কিছু ধর্ম-সম্প্রদায়ে এই মত প্রচলিত রয়েছে যে জীবন একটিই, এবং এই জীবন সৎকর্ম করে অতিবাহিত করলে অনন্ত কালের জন্য স্বর্গ-বাস লাভ হয়, আর পাপকর্মে অতিবাহিত করলে অনন্ত কালের জন্য নরকের অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত হতে হয়, যেখান থেকে ফিরে আসার আর কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু এটি কেবল ধর্মীয় মতান্ধতা ছাড়া কিছুই নয়, কেননা জীবন একটি নয়; জীবন একটি হলে পৃথিবীতে বিভিন্ন জীবনের যে অসাম্য রয়েছে, তার ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না, বিধাতা পক্ষপাত-দুষ্ট হয়ে পড়েন; তাছাড়া কেউ সম্পূর্ণভাবে পাপী নয়, আবার পরিপূর্ণভাবে সৎকর্মকারীও খুবই বিরল; সুতরাং তাদের পুণ্য ও পাপের ফল লাভ ঘটবে কিভাবে? স্পষ্টতঃই, সংবেদনশীল, ভগবৎ-সচেতন মানুষের কাছে এই ধরণের চরম বিচারের ব্যবস্থাটিকে ঈশ্বরীয়র থেকে বরং আসুরিক ধরণের মনে হয়। এটা কি সম্ভব যে মানুষও যখন অন্যদের প্রতি করুণা, দয়া প্রদর্শন করে থাকে, তখন ভগবানের মধ্যে এইরকম অনুভূতি নেই, তিনি নিষ্করুণ? ভগবান ও তাঁর নিজ অবিচ্ছেদ্য অংশ জীবসমূহের মধ্যে যে শাশ্বত প্রেমের বন্ধন রয়েছে, ঐসব অযৌক্তিক ধর্মীয় শিক্ষা তার পরিপন্থী। সংজ্ঞানুসারে (মানুষ ঈশ্বরের অনুরূপে তৈরী- ম্যান ইজ মেড ইন দ্য ইমেজ অব্ গড), সমস্ত গুণাবলী ভগবানের মধ্যে পূর্ণতার পরম মাত্রা পর্যন্ত থাকতে হবে। এর মধ্যে একটি গুণ হচ্ছে করুণা। একটি সংক্ষিপ্ত মানব জীবনের শেষে অনন্ত কাল নরকে দগ্ধ হওয়ার এই ধারণা অত্যন্ত করুণার অধিকারী একজন পুরুষের ধারণার সঙ্গে আদৌ সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এমনকি একজন সাধারণ পিতাও তার পুত্রের জীবনকে সুন্দর করার জন্য ঐ পুত্রের অনেক ভুল ক্ষমা করেন, একাধিক সুযোগ তাকে দিয়ে থাকেন।

ভগবান পূর্ণ, সুতরাং তাঁর গুণাবলীও পূর্ণ। এরকম একটি গুণ হচ্ছে তাঁর করুণা। ভগবান পরম করুণাময়, সেজন্য কোনো জীবকে তিনি অনন্ত নরকবাসের শাস্তি দিতে পারেন না। বৈদিক শাস্ত্রে বার বার ভগবানের করুণাপরতার কথা বলা হয়েছে। ভগবান প্রত্যেক জীব-হৃদয়ে অবস্থান করেন, এবং তাদের সমস্ত আকাঙ্ক্ষার কথা জানেন; সেজন্য তাদের উপলব্ধির বিকাশের জন্য তিনি তাদের ঐসব আকাঙ্ক্ষাগুলি চরিতার্থ করার সুযোগ দেন। প্রকৃতপক্ষে, ভগবানের করুণার কোনো অবধি নেই, শ্রীকৃষ্ণ আমাদের সুহৃদ, প্রত্যেক জীবাত্মাকে তিনি ভালবাসেন, তাই তিনি অসীম করুণাময়। আমাদের যোগ্যতা না থাকলেও তিনি আমাদের বার বার সুযোগ দান করেন যাতে আমরা আত্মোপলব্ধির স্তরে উপনীত হই, জন্ম-মৃত্যুর চক্র হতে অব্যহতি লাভ করি।

পুনর্জন্মের তত্ত্ব অনুসারে, এমনকি একজন কুক্রিয়াসক্ত ব্যক্তিও যদি সামান্য একটুও সৎকর্ম করেন, শ্রীকৃষ্ণ তা বিস্মৃত হন না, তিনি তা সঞ্চিত রাখেন। কেউই সম্পূর্ণতঃ একশো ভাগ পাপী নয়। তেমনি কোন জীবাত্মা যদি সামান্য একটুও পারমার্থিক উন্নতি করে, সেটি ধ্বংস হয় না; পরজন্মে তাকে আরো পারমার্থিক উন্নতি করার জন্য অধিকতর উন্নত সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয়, যাতে করে সে তার অন্তর্নিহিত চিন্ময় গুণাবলী বিকশিত করার সুযোগ পায়। এভাবে ভগবৎচেতনা লাভ করলে তার আর জড় দেহের প্রয়োজন হয় না, সে শ্রীকৃষ্ণের কৃপায় চিন্ময় জগতে তার নিত্য আলয়ে ফিরে যায়।

কর্মবন্ধন-শূন্য কর্ম করা যায় কিভাবে?

(সূত্রঃ ভগবদগীতার সারতত্ব ছয় পর্বের প্রাথমিক পাঠক্রম )

তাহলে, কুকর্ম করলে দুঃখভোগ করতে হবে, আবার সৎকর্ম করলেও ফলভোগের বন্ধনে, কর্মবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে জন্ম-মৃত্যু-প্রভৃতি দুর্দশাভোগ করতে হবে, তাহলে কেমন ধরণের কর্ম করা উচিত আমাদের? উত্তর হচ্ছে, কর্ম সম্পাদিত হওয়া উচিত জড়ীয় ত্রিগুণের প্রভাবহীন, অ-প্রাকৃত, চিন্ময় স্তরে। যখন সচ্চিদানন্দবিগ্রহ ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সন্তুষ্টিবিধানের জন্য কোনো কর্ম সম্পাদিত হয়, কার্যকলাপ যখন কৃষ্ণ-সম্বন্ধযুক্ত হয়, তা তখন প্রকৃতির গুণের স্পর্শ-লেশশূন্য, চিন্ময় হয়ে ওঠে। এইভাবে কৃতকর্মের ফলভোগে কর্মকর্তা বাধ্য থাকেন না; এই কর্মে কর্মবন্ধন হয় না, বরং জড়বন্ধন স্তব্ধ হয়। এজন্য এই ফলবন্ধন-রহিত কর্মকে বলা হয় অ-কর্ম। কর্ম করেও ‘কর্ম’ না করা, অর্থাৎ কর্মফলে বিজড়িত না হবার একমাত্র উপায় এইটি, শ্রীকৃষ্ণ যা শিক্ষা দিয়েছেন। সম্পাদনকারী জন্ম-মৃত্যুর চক্র হতে, জড়া প্রকৃতির ভঙ্গুর আবরণ – জড় দেহ হতে বিমুক্ত হয়ে চিন্ময় জগতে ভগবদ্ধামে প্রত্যাবর্তন করেন, সেখানে নিত্য – শাশ্বত আনন্দময় জীবন উপভোগ করেন।

উদাহরণস্বরূপ, ক্লাসে কোনো দুজন ছাত্রের একজন ভক্ত, অন্য জন জড়-বিষয়াসক্ত সকাম কর্মী। ভক্ত ছাত্রটি শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্যে পড়াশুনা করে। কেমন করে তা সম্ভব? ক্লাসে যে-সমস্ত বিষয় সে অধ্যায়ন করে তা সবই জড় বস্তু সম্বন্ধীয়; তাহলে এই পড়াশুনা কিভাবে কৃষ্ণভাবনাময় কর্ম হবে? ভক্ত ছাত্রটি উপলব্ধি করতে পারে যে তার এই কলেজের শিক্ষা অবশেষে তাকে একটি কাজ বা চাকরী দেবে, যের সাহায্যে সে তার পরিবারের সদস্যদের, তার উপর যারা নির্ভরশীল তাদের ভরণ-পোষণের সংস্থান করতে পারবে; কিন্তু প্রকৃত জীবন, প্রকৃত বাস্তব ও শাশ্বত সম্পর্ক হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে, জাগতিক সমস্ত সম্পর্কই অস্থায়ী। সুতরাং সে প্রতিদিন যে নির্দিষ্ট সংখ্যায় হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করে, চারটি বিধিনিষেধ পালন করে, শ্রীল প্রভুপাদের গ্রন্থ অধ্যায়ন করে; সাপ্তাহিক গীতা বা ভাগবত ক্লাসে যোগদান করে- এইভাবে সে চেতনার পবিত্রতা রক্ষা করে। এছাড়াও, কেবল শ্রীকৃষ্ণের প্রীতির উদ্দেশ্যে কর্তব্য পালনের জন্য সে তাঁর কলেজের শিক্ষা গ্রহণ করে। সে তাঁর জীবনের উদ্দেশ্য জানেঃ শুদ্ধ কৃষ্ণচেতনা, শুদ্ধ ভগবদ্ভক্তি লাভ করে শ্রীকৃষ্ণের শাশ্বত ধামে ফিরে যাওয়া।

অপর ছাত্রটি জানে যে শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন ভগবান; কিন্তু প্রবলভাবে সে জড়জগতের ভোগবিলাসের প্রতি আকৃষ্ট। সে তার ভোগ বাসনাগুলি পূরণের উদ্দেশ্যে অধ্যায়ন করে – কঠোর প্রচেষ্টা। বিধিনিয়মগুলি সে পালন করে না, এবং সবসময়ই ভবিষ্যতের ইন্দ্রিয়তৃপ্তির সুযোগ সৃষ্টির পরিকল্পনায় – নিজের, বা পরিবারের জন্য – ব্যস্ত থাকে। এইভাবে, সে হচ্ছে সকাম কর্মী, অর্থাৎ জড়ীয় ভোগবাসনা পূরণের জন্য সে কর্ম পড়াশুনা করে।

আপাতঃদৃষ্টিতে দুজন ছাত্র একই কর্ম – কলেজশিক্ষা গ্রহণ করছে বলে মনে হলেও তাদের চেতনার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে, তাদের ভবিষ্যৎ পরিণতিও হবে ভিন্ন। সকাম কর্মী ছাত্রটি তার ভবিষ্যতের জন্য, অর্থাৎ আমৃত্যু বিষয় ভোগ করে যাওয়ার সুবন্দোবস্ত করার জন্য বহুরকম পরিকল্পনায় নিমগ্ন থাকায় জড়া প্রকৃতির গুণগুলির দ্বারা, বিশেষতঃ রজোগুণের দ্বারা- আরো বেশি বেশি করে প্রভাবিত হতে থাকবে। পক্ষান্তরে ভক্তিযোগী ছাত্রটি কলেজে বা উত্তর জীবনে কৃষ্ণভাবনামৃত অনুশীলন করতে থাকবে, এবং ধীরে ধীরে জড়গুণগুলির প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে শুদ্ধসত্ত্ব, অর্থাৎ নির্গুণ বা চিন্ময় অবস্থা লাভ করবে। এইরকম শুদ্ধসত্ত্ব-চেতনাসম্পন্ন ভক্ত সরাসরিভাবে শ্রীকৃষ্ণের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হন। তার উপর জড়ীয় গুণগুলির ক্রিয়া স্তব্ধ হয়ে যায়, এবং তার মধ্য দিয়ে শ্রীকৃষ্ণের করুণাধারা প্রবাহিত হতে শুরু করে।

অর্জুন ও দুর্যোধনঃ আদর্শ দৃষ্টান্ত হচ্ছে অর্জুন ও দুর্যোধন। অর্জুন ও দুর্যোধন উভয়েরই রথ ছিল; দুজনেরই তীর-ধনুক ছিল; দুজনেই ছিল ক্ষত্রিয়; দুজনেই প্রবল পরাক্রমের সংগে যুদ্ধ করার জন্য তৈরী ছিল। বাইরে থেকে দুজনের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই বলে মনে হয়। কিন্তু উভয়ের চেতনার মধ্যে ছিল বিরাট পার্থক্য। দুর্যোধন তার নিজের বাসনা পূরণের উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করছিলেন, আর অর্জুন যুদ্ধ করছিলেন শ্রীকৃষ্ণের প্রীতিবিধানের জন্য। দুর্যোধন নিজেকে সবকিছুর নিয়ন্তা বলে মনে করত এবং পাণ্ডবদের শেষ করার জন্য সে বহু বহু মাস্টার-প্ল্যান তৈরী করেছিল। পক্ষান্তরে অর্জুন জানতেন যে সবকিছুই চলছে, কার্য করছে শ্রীকৃষ্ণের পরম ইচ্ছার প্রভাবে, এবং তিনি কেবল শ্রীকৃষ্ণের হাতের একটি যন্ত্র বা পুতুল মাত্র, শ্রীকৃষ্ণ যেভাবে ইচ্ছা সেইভাবে তাঁকে ব্যবহার করতে পারেন। এই হচ্ছে অনাসক্ত হয়ে কর্ম করার পন্থা।

সকল মানুষের জন্য সর্বোত্তম কল্যাণ কর্ম :

(সূত্রঃ ভগবদগীতার সারতত্ব ছয় পর্বের প্রাথমিক পাঠক্রম )

ভক্তদেরকে হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র জপ করতে দেখে অনেকে তাদের বলে, “আপনারা কেবল সারাক্ষণ হরেকৃষ্ণ জপ করেন, দরিদ্র মানুষদের জন্য আপনারা কিছু করেন না কেন? রোগাক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল বা দাতব্য চিকিৎসালয় তৈরী করেন না কেন? অন্ততঃ এভাবে তো মানুষের কিছু সেবা করা যায়?” আপনি যদি ভক্ত হন তাহলে প্রায়ই আপনাকে এই প্রশ্নটির সম্মুখীন হতে হবে। তার কারণ হচ্ছে, কেউ যদি কৃষ্ণভক্তির অমৃতময় আস্বাদন সামান্য মাত্রও লাভ না করে, তাহলে সে প্রথমে কৃষ্ণভাবনামৃতের দিব্য মহিমা অনুভব করতে পারবে না।

জড় শরীরটির যত্ন গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে; কিন্তু দেহটি ব্যক্তি নয়; প্রকৃত ব্যক্তি আত্মার যত্ন গ্রহণ না করলে, আত্মার প্রয়োজনগুলিকে অবহেলা করে কেবল নশ্বর জড়শরীরের পরিচর্যা আত্মহত্যারই নামান্তর মাত্র। জড় শরীরের যত্নগ্রহণের পাশাপাশি অকৃত্রিম শুদ্ধ পারমার্থিক শিক্ষা প্রদান ও অনুশীলনের দ্বারা আত্মার পুষ্টিবিধানের গুরুত্ব বোঝাতে শ্রীল প্রভুপাদ কৃপাপূর্বক বহু বহু দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করেছেন। তার মধ্যে এক্তিঃ এক মহিলা একটি সুন্দর তোতা পাখী পুষতে শুরু করেন। সুন্দর ঐ পাখীটির জন্য তিনি একটি বহুমূল্য সোনার খাঁচা কেনেন। সেই খাঁচায় পাখীটিকে রেখে তিনি গভীর মনোযগ সহকারে বহুমূল্য খাচাটির যত্ন নেওয়া শুরু করেন। প্রত্যেক দিন তিনি খাঁচাটি মুছতেন, পরিষ্কার করে উজ্জ্বল ঝকঝকে করে রাখতেন। এক সপ্তাহ পরে যখন তাঁর এক বান্ধবী তাঁর বাড়ীতে আসেন, তিনি সব দেখে তাঁকে ডেকে সবিস্ময়ে বলেন, “একি! তুমি পাখীর খাঁচাটিকে তো খুবই পরিচর্যা করছ, কিন্তু এতে পাখীটির কি উপকার হচ্ছে? পাখীটার কি হাল হয়েছে একবার দেখেছ? ওটাতো মৃত্যুপথযাত্রী!”বর্তমান যুগে ঠিক একইভাবে মানুষ সম্পূর্ণভাবে দেহ-সচেতন, বাহ্যিক দেহ- খাঁচাটির পরিচর্যায় মশগুল। তারা দেহ পরিচর্যার জন্য বছরের পর বছর শিক্ষা গ্রহণ করে; এর জন্য খাদ্য ও বিলাসবহুল বাসস্থানের ব্যবস্থা করে। দেহকে সুস্থ রাখতে গিয়ে তারা জিমে গিয়ে কসরৎ করে। দেহের জন্য তারা কত ব্যয় করে, ভালো পোশাকে, অলংকারে এটিকে সাজায় এবং দেহের সবরকম সুখস্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করার জন্য সর্বদাই কর্ম-তৎপর থাকে; তারা জানে না যে এই জড় দেহটি আসলে ব্যক্তি আত্মার একটি অস্থায়ী আচ্ছাদন মাত্র। এইজন্য যেহেতু তারা আত্মার জন্য পারমার্থিক খাদ্যের ব্যবস্থা করে এর পুষ্টিবিধান করে না, সেজন্য তারা তাদের সবরকম প্রয়াস সত্ত্বেও সুখী হতে পারে না; তারা জানে না যে যথার্থ আনন্দময় জীবন হচ্ছে পারমার্থিক জীবন।

প্রকৃত কল্যাণ কর্ম হচ্ছে আত্মোপলব্ধি লাভ করে নিজ কর্তব্য পালন করা এবং অপরদের মধ্যে একই পারমার্থিক শিক্ষার বিস্তার করা। একজন ধনবান, কোটিপতি জমিদার ছিলেন। একবার তিনি সাঁতার কাটতে গিয়ে বিপদগ্রস্ত হন- স্রোত তাঁকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। তাকে ডুবে যেতে দেখে সবাই চিৎকার করতে লাগল, “বাঁচাও, বাঁচাও! – জমিদারমশাইকে বাঁচাও!” তখন একজন সবল-দেহী যুবক এগিয়ে এলো। অল্পক্ষণের মধ্যেই, সে দেখল যে জমিদার একটি বহু মূল্য সোনালী কোট পরে আছেন। তা দেখে যুবকটি তৎক্ষণাত জলে ঝাঁপ দিল। সে গিয়ে ডুবন্ত জমিদারের দেহ থেকে সুদক্ষভাবে কোটটি নিয়ে তীরে উঠে এল। অল্পক্ষণের মধ্যেই, বলা বাহুল্য, জমিদার অদৃশ্য হয়ে গেলেন- তার সলিল সমাধি হল। তখন সেই যুবক ঐ সোনালী কোটটি সকলকে দেখিয়ে বলল, ‘যাক্, বহুমূল্য কোটটাকে বাঁচাতে পেরেছি! একেবারে নষ্ট হয়ে যেত!’

আপনার কি মনে হয়- মানুষ এর জন্য কি তাকে খুব বাহবা দেবে? লোকেরা তাকে ভৎর্সনা করে বলল, “মূর্খ! তুমি যদি স্বয়ং জমিদারকে বাঁচাতে, তাহলে তার কিছু ভাল করতে পারতে। তিনি ডুবে যাচ্ছেন, আর তাঁর কোটটা নিয়ে তুমি চিন্তায় শেষ হয়ে যাচ্ছো! তিনি বেঁচে ফিরলে তো তোমাকে লক্ষ লক্ষ টাকা বকশিশ দিতেন!”

উপরের দুটি গল্পের নীতিকথা হচ্ছে এই যে আত্মার প্রয়োজনগুলিকে অবহেলা করে কেবল দেহের আরাম-বিলাসগুলি বৃদ্ধি করে চলা উচিত নয়। এই জড়দেহটি একটি জামার চেয়ে খুব বেশি ভাল কিছু নয়। অবশ্য মানুষ প্রায়ই এই বিখ্যাত প্রশ্নটি জিজ্ঞাসা করে, “আগে পেট না ভরলে মানুষ কিভাবে ভগবানের আরাধনা করবে বলে আপনি আশা করেন?” আমরা বলি, “হ্যাঁ, আমরা মানুষকে সুস্বাদু কৃষ্ণপ্রসাদ ভোজন করাব- আত্মা ও দেহ উভয়েরই এর ফলে পুষ্টি হয়।” বিখ্যাত সেই প্রবাদ বাক্যে যেমন বলা হয়েছে, “ভগবান প্রত্যেকের যা প্রয়োজন, তা দিয়েছেন, যতটা লোভ, ততটা দেন নি।”*

পৃথিবীতে খাদ্য ও অর্থের কোনো অভাব নেই; পর্যাপ্ত পরিমাণে তা রয়েছে। কিন্তু তবু পৃথিবীর মানুষ নানা সমস্যায় কবলিত, কেননা তাঁরা পরমেশ্বর ভগবানের কর্তৃত্ব স্বীকার করে না, এবং তাঁরা আইন লঙ্ঘন করে নানাবিধ পাপকর্মে নিয়োজিত হচ্ছে। তাঁরা লোভী, বিষয়ভোগ তৃষ্ণায় আকুল; আরো আরো ধন সম্পদ সঞ্চয় করার জন্য তাঁরা একে অপরকে শোষণের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। আজাকাল যদি আপনি কোনো ভিখারীকে কিছু খাবার দেন, সে নিতে চাইবে না সে টাকা চাইবে, কেননা টাকা হলে ধুমপান সহ নানারকম নেশা ভাঙ করা যায়। সুতরাং মানুষ যতক্ষণ পাপময় কার্যকলাপ বন্ধ না করছে, ততক্ষণ অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান কাজ-অর্থ-স্বাচ্ছন্দ্য – কোনও সমস্যারই সমাধান হবে না, মানুষের জীবন যাপনে শান্তি আসবে না। শ্রীল প্রভুপাদ বলেন, “পাপকর্মের মূল কারণ হচ্ছে ভগবানের কর্তৃত্বকে অস্বীকার করার মাধ্যমে ভগবৎ-প্রদত্ত আইনগুলিকে সুপরিকল্পিতভাবে অমান্য করা।” সুতারং ভগবানের কর্তৃত্ব, তাঁর অধীনতা স্বীকার করতে না চাওয়ার এই বিদ্রোহী স্বভাবের জন্য জীবসত্তাসমূহ এ-জগতে দুঃখ-দুর্দশায় জর্জরিত হতে থাকে।

আজ আমি একজনকে কিছু খাদ্য দিলাম, কিন্তু কাল আবার সে ক্ষুধার্ত হবে। ভিখারীকে যদি চাকরী বা ব্যবসা করতে দেওয়া হয়, আর কিছু দিন পর যদি সে বছরে কয়েক কোটি টাকাও মুনাফা করে, সে আরো চাইবে- এতে তৃপ্ত হবে না। সে অর্থচিন্তায়, নানা পরিকল্পনায় আমৃত্যু মশগুল থাকবে- শান্ত হতে পারবে না। পরম পরিতৃপ্তি, সন্তোষ একজন ভক্তই কেবল লাভ করতে পারেন, কেননা শ্রীভগবানের প্রীতিবিধান ব্যতীত তাঁর আর কোনো উদ্দেশ্য নেই। তিনি ধনীই হোন বা দরিদ্র হোন, ভগবান তাঁকে যা দিয়েছেন, সেটাকে তিনি ভগবানের করুণা রূপে গ্রহণ করেন এবং সুখে জীবন কাটান। অন্তহীন তৃষ্ণার আগুন তাঁর মনকে নিরন্তর দগ্ধ করে না, শত শত আশা-বাসনা তাঁর চিত্তকে বিক্ষুব্ধ করে না। সুতরাং, জনগণকে প্রকৃত ধর্ম-শিক্ষা দানের মাধ্যমে তাদেরকে কৃষ্ণভাবনাময় করে তোলাই হচ্ছে একমাত্র সমাধান। বিশ্বজুড়ে ভগবৎ-চেতনার প্রসারই হচ্ছে বিশ্বের মানুষের শান্তি ও সমৃদ্ধির একমাত্র উপায়। কৃষ্ণভাবনামৃত দর্শন পৃথিবীর সকল সামাজিক, রাজনৈতিক, নৈতিক সমস্যার সমাধান। ব্যক্তিগতভাবে যেকোন মানুষ যখন ভগবানের কর্তৃত্ব স্বীকার করে, কৃষ্ণভাবনামৃত গ্রহণ করে, তখন সে শান্তি লাভ করে, হৃদয়ে যথার্থ সুখ অনুভব করে।

যিনি ভগবৎচেতনা দান করেন, তিনিই যে সর্বশ্রেষ্ঠ শুভানুধ্যায়ী, সে বিষয়ে একটি সুন্দর গল্প আছে।
একবার একজন কোটিপতি ধনী ব্যক্তি একটি বড় উৎসবের সময় তাঁর ছোট শিশুপুত্রকে হারিয়ে ফেলেন। তিনি সমস্ত সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দিলেন, কিন্তু তাঁর পুত্রের কোনো সংবাদ পেলেন না। উৎসব শেষ হয়ে যাওয়ার পর একাকী শিশুটি একটি ভিখারী অনাথের মতো রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল। পরপর চারজন লোক তাকে দেখলেন। প্রথম মানুষটি দেখলেন যে শিশুটি ক্ষুধার্ত। তার প্রতি করুণাপরবশ হয়ে তিনি তাকে কিছু খাবার দিলেন। দ্বিতীয় মানুষটি দেখলেন যে শিশুটির জামা-প্যান্ট ছিঁড়ে গেছে, শীতের পোশাকও নেই। দয়াপরবশ হয়ে তিনি তাকে এক সেট নতুন পোশাক, চাদর কিনে দিলেন। তৃতীয় মানুষটি দেখলেন যে শিশুটির দেহে একটি ক্ষত স্থান রয়েছে, সেটি নিরন্তর তাকে কষ্ট দিচ্ছে; তিনি সেখানে লাগানোর জন্য কিছু ওষুধ-পত্র তাঁকে এনে দিলেন। কিন্তু যখন চতুর্থ মানুষটি তাঁকে দেখলেন, তিনি বুঝতে পারলেন যে শিশুটি একজন ক্রোড়পতির পুত্র, যাকে তিনি চিনতেন। তিনি ঐ শিশুটির প্রতি প্রবল করুণা অনুভব করলেন। তাঁকে সংগে নিয়ে তিনি ক্রোড়পতি পিতার বাড়ীর উদ্দেশ্যে রওনা হলেন, এবং পরিশেষে শিশুটিকে তাঁর পিতার কাছে ফিরিয়ে দিলেন। এই চারজনের মধ্যে কাকে আপনি ঐ শিশুটির সবচেয়ে বড় কল্যাণকারী বলে মনে করেন?

স্পষ্টতঃই চতুর্থ মানুষটিই ঐ শিশুর সর্বোত্তম মঙ্গল করেছেন, কেননা, যখন শিশুটি গৃহে ফিরে এল, পিতা অপরিসীম স্বস্তি ও আনন্দ অনুভব করলেন। তিনি তাঁর প্রিয় পুত্রকে আলিঙ্গন করে প্রেম প্রীতিতে তাঁকে নিঃস্নাত করলেন। শিশুটির সকল কষ্ট তিরোহিত হল; তার যখন খাবার প্রয়োজন হল, অজস্র সুস্বাদু অন্ন-ব্যঞ্জনে তাঁকে ভুরিভোজন করানো হল। তাকে একঘর ভর্তি সুন্দর পোশাক পত্র দেওয়া হল- ইচ্ছামত বেছে নেওয়ার জন্য। তার অন্যান্য সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, আরাম-বিলাসের কোনো অভাব ছিল না- পর্যাপ্ত পরিমাণে সে পেতে থাকল। গভীর পিতৃস্নেহে তাঁর পূর্বের দুঃখময় স্মৃতি মন থেকে মুছে গেল। এইভাবে তাঁর পিতার সংগে মিলিত হওয়ার ফলে শিশুটি সর্বতোভাবে সুখী হল।

এই উপমাটিতে, প্রথম যে তিনজন মানুষ শিশুটিকে খাদ্য, বস্ত্র ওষুধ দিয়েছিল, তাদের তুলনা করা যায় সমাজসেবীদের সংগে। সমাজসেবীরা মানুষের জন্য কতরকম ‘ভাল’ কাজ করে থাকেনঃ দরিদ্রদেরকে খাওয়ানো, দাতব্য চিকিৎসালয় তৈরী, বিদ্যালয় স্থাপন ইত্যাদি। মানুষ এই সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে ক্ষণস্থায়ী সুখ লাভ করতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, প্রধান যে জড় দেহজাত চারটি সমস্যা – জন্ম, মৃত্যু, জরা, ব্যাধি- এগুলিকে বন্ধ করা যাবে কিভাবে? কে তাদেরকে ভগবৎ-তত্ত্ব জ্ঞান দান করবে? অজ্ঞান্তার গভীর তমিস্রা থেকে মুক্ত করে কে তাদের জ্ঞানালোকে উদ্ভাসিত করবে, ভগবদ্ধামে ফিরে যেতে সাহায্য করবে?

যিনি শিশুটিকে তার পিতার কাছে, তার নিজের বাড়িতে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি হচ্ছেন একজন ভগবদ্ভক্তের মতো। ভগবানের শুদ্ধভক্ত কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচারের মাধ্যমে জীব-সত্তাকে জড় জগতের বন্ধন থেকে মুক্ত করে তাকে পরমপুরুষ পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কাছে, তাঁর ধামে কৃষ্ণলোকে ফিরিয়ে নিয়ে যান, আর শ্রীকৃষ্ণই আমাদের চির-শুভাকাঙ্ক্ষী, শাশ্বত পিতা। আর একবার যদি আপনি শ্রীকৃষ্ণের কাছে ফিরে যান, তখন আপনার সমস্ত প্রয়োজন, অভাব, চাহিদা পরিপূর্ণ হয়ে যায়। “জয় শ্রীকৃষ্ণ”।।

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s