প্রশ্নঃ সংক্রান্তি বলতে কি বুঝায় এবং সংক্রান্তি অনুষ্ঠান কেন করা হয়?


প্রসন্ন কুমার সিংহ :: অনন্ত কাল ধরে সময় প্রবাহমান। সময়ের এই প্রবাহ যতই বেড়ে চলছে সৌরজগতের বয়স তথা পৃথিবীর বয়সও ততই বেড়ে চলেছে। যার ফলে আজ যেটা নূতন কাল সেটা নুতনত্ব হারিয়ে পুরাতন হয়ে যাচ্ছে। সবকিছু যেন অতীতের দিকে ধাবিত হয়ে চলছে। কিন্তু প্রকৃতির প্রবাহমান সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে মানুষ বর্ষপঞ্জি বেঁধে দেওয়ায় মনে করে সময় বার বার ফিরে আসে। তাই গ্রীষ্মকাল অতিবাহিত হলেই বর্ষা, বর্ষার পর শরৎ এভাবে হেমন্ত, শীত ও বসন্ত কাল আসতে থাকে। সেরকম বাংলা বারোটি মাসও আবর্তিত হতে থাকে। এই আবর্তনে প্রতিমাসের শেষ দিন অর্থাৎ যে দিন মাস পূর্ণ হবে সে দিনকে সংক্রান্তি বলা হয়। এভাবে বারোটি মাসে বারোটি সংক্রান্তির মধ্যে বিশেষ ভাবে পৌষমাসের সংক্রান্তি উল্লেখ্যযোগ্য এবং তাৎপর্যপূর্ণ।

সংক্রান্তি অর্থ সঞ্চার বা গমন করা। সূর্যাদির এক রাশি হতে অন্য রাশিতে সঞ্চার বা গমন করাকেও সংক্রান্তি বলা যায়। সংক্রান্তি শব্দটি বিশ্লেষণ করলেও একই অর্থ পাওয়া যায়; সং+ক্রান্তি, সং অর্থ সঙ সাজা এবং ক্রান্তি অর্থ সংক্রমণ। অর্থাৎ ভিন্ন রূপে সেজে অন্যত্র সংক্রমিত হওয়া বা নুতন সাজে, নুতন রূপে অন্যত্র সঞ্চার হওয়া বা গমন করাকে বুঝায়। বাস্তবেও তা-ই দেখা যায়। মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ, কন্যা, তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ এবং মীনÑএই বারটি একটির পর আরেকটি চক্রাকারে অবর্তিত হতে থাকে। রাশিচক্রস্থ দৃশ্যমান গমন পথ যাকে ইংরেজীতে ঊপষরঢ়ঃরপ বা ক্লান্তিবৃত্ত বলে; সেপথে সূর্য গমনের ফলে (জ্যোতিষতত্ত্বমতে) পৃথিবীর পরিমণ্ডলে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে। এভাবে পৃথিবী নানারূপে সঞ্চারের কারণে প্রাকৃতিক দৃশ্যপট প্রতিমাসে পরিবর্তিত হতে থাকে। পৃথিবীর পরিমণ্ডলে এধরনের পরিবর্তনের মধ্যে সনাতন ধর্মের অনুসারীগণের মধ্যে চারটি দিন উল্লেখযোগ্য। তন্মমধ্যে দুই অয়ন এবং দুই বিষুব দিন। দুই অয়ন হল উত্তরায়ন ও দক্ষিণায়ন এবং বিষুব হল মহাবিষুব ও জলবিষুব। চৈত্র সংক্রান্তিতে মহাবিষুব ও আশ্বিন সংক্রান্তিতে জলবিষুব আরম্ভ হয়। উল্লেখ্য বছরে যে দুইদিন দিবা ও রাত্রি সমান হয় তাকে বিষুব দিন বলা হয়। বসন্তকালে যে বিষুব হয়, তাকে মহাবিষুব আর শরৎকালে যে বিষুব হয় তাকে জলবিষুব বলা হয়। মৎস্যপুরাণেও তাই বলা হয়েছে-

“মৃগকর্কটসংক্রান্তিঃ দ্বে তূদগ্দক্ষিণায়নে।
বিষুবতী তুলামেষে গোলমধ্যে তথাপরাঃ ॥”

অর্থাৎ সুর্য ধনুরাশি ত্যাগ করে মকর রাশিতে সঞ্চার হওয়াকে উত্তরায়ণসংক্রান্তি, মিথুনরাশি হতে কর্কটরাশিতে সঞ্চার হওয়াকে দক্ষিণায়ন সংক্রান্তি, কন্যারাশি হতে তুলারাশিতে সঞ্চার হওয়াকে জলবিষুবসংক্রান্তি আর মীনরাশি হতে মেষরাশিতে সঞ্চার হওয়াকে মহাবিষুব সংক্রান্তি বলা হয়ে থাকে।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, দুই অয়নে এক বছর হয়। সনাতন শাস্ত্রবিদগণের মতে পরমাণু হল অত্যন্ত সূক্ষ্ম কাল অর্থাৎ সর্বশেষ কালের একক। এভাবে দুটি পরমাণুতে হয় এক অনু ও তিন অনুতে একটি ত্রসরেণু হয়। জানালার ফাঁকে আসা সূর্যের কিরণে ত্রসরেণু উড়তে দেখা যায়। এরূপ তিনটি ত্রসরেণু অতিক্রম করতে সূর্যের যে সময় নেয়, তাকে ত্র“টি বলে। এরকম একশত ত্র“টিতে একটি লব, তিন লবে এক নিমেষ, তিন নিমেষে এক ক্ষণ (১.৬ সেকেন্ড) হয়। পাঁচ ক্ষণে এক কাষ্ঠা (৮ সেকেন্ড), পনের কাষ্ঠাতে এক লঘু (২ মিনিট), পনের লঘুতে এক নাড়ি (৩০ মিনিট), ছয় নাড়িতে এক প্রহর (৩ ঘন্টা) আর অষ্টপ্রহরে এক দিনরাত (৩ঢ৮=২৪ ঘন্টা) হয়। পনের দিন-রাতে এক পক্ষ, দুই পক্ষে এক মাস, ছয় মাসে এক অয়ন আর দুই অয়নে এক বছর হয়। মাঘ, ফাল্গুন, চৈত্র, বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ আষাঢ় এই ছয় মাস উত্তরায়ন কাল এবং শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ ও পৌষ এই ছয় মাস দক্ষিণায়ন কাল। সেজন্য আষাঢ়ের সংক্রান্তিতে দক্ষিণায়ন এবং পৌষ সংক্রান্তিতে উত্তরায়ণ শুরু হয়। অয়ন ভেদে সুর্যেরও দিক পরিবর্তন হয়। উত্তরায়ণে সুর্যের সঞ্চার হওয়া মাত্র সূর্য দক্ষিণ দিক থেকে উত্তর দিকে এবং দক্ষিণায়ণে পুনরায় সূর্য দক্ষিণ দিকে সঞ্চার হতে আরম্ভ করে।

পৌষ মাসের শেষ দিনে সূর্য উত্তরায়ণের দিকে যাত্রা শুরু করে বলে এই সংক্রান্তিকে উত্তরায়ণ সংক্রান্তিও বলা হয়। শাস্ত্রমতে মানুষের এক বছর দেবতাদের একটি দিন-রাতের সমান অর্থাৎ মানুষের উত্তরায়ণের ছয়মাস দেবতাদের একটি দিন ও দক্ষিণায়নের ছয়মাস দেবতাদের একটি রাত। রাত্রে মানুষ যেমন সকল দরজা-জানালা, প্রধান ফটক ইত্যাদি বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েন, তেমনি দেবতাগণও রাত্রে অর্থাৎ দক্ষিণায়ণে সবকিছু বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েন। এসময় বাহির থেকে প্রবেশ করার সুযোগ নেই, অর্থাৎ দক্ষিণায়ণে দেবলোক পুরোপুরি বন্ধ থাকে। আবার দেবগণের রাত পৌষ সংক্রান্তির দিন শেষ হয় বলে পরবর্তী উদয়ের ব্রহ্মমুহূর্ত থেকে (গোস্বামী মতে) দেবগণের দিবা শুরু হয়। উক্ত সময়ে স্বর্গবাসী ও দেবলোকের সকলেই নিদ্রা ভঙ্গ হয় এবং নিত্য ভগবৎ সেবা মূলক ক্রিয়াদি শুরু হতে থাকে। এই জন্য সনাতন ধর্মাবলম্বীগণ ব্রহ্মমুহূর্তে স্নান, নামযজ্ঞ, গীতাপাঠ, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনি ও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিবসটিকে আনন্দময় করে তোলেন।

স্মৃতিচিন্তামণি গ্রন্থে বিষয়টি এভাবে উল্লেখ করা হয়েছে-
“দিনসংক্রমণে কৃৎস্নং দিনং পুণ্যম।

অর্থাৎ সংক্রান্তি দিনের বেলা সংক্রমণ ঘটলে সমস্তদিনই পুণ্যকাল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

কোন ব্রত বা উপবাস করার পূর্বে যেরকম সংযম করে ব্রতাদি পালন করা হয় এবং কীর্তন শুরুর পূর্বে যেমন অধিবাস অনুষ্ঠিত হয় তেমনি উত্তরায়ণকে সামনে রেখে পূর্ববর্তী তিথিতে সনাতন ধর্মাবলম্বীগণ পূজা-পার্বণ এবং নামযজ্ঞাদির অনুষ্ঠান করে থাকেন। উত্তরায়ণে দেবতাগণ জাগ্রত হওয়ার শুভলগ্নে পুজা-পার্বণের দ্বারা তাঁদের সন্তুষ্টির ক্রমে যাতে দেবধামে পৌছে পরবর্তীতে সেখান থেকে দেবগণের সহায়তায় ভগবৎধামে যাওয়ার সুর্কীতিটুকু অর্জন করা যায়; এই উদ্দেশ্যে দেবতাদের পূজা-পার্বণ করে তাঁদের অশেষ কৃপা লাভ করা। মানুষ যা করতে পারে না দেবগণ তা অতি সহজে করতে পারেন। তাই উত্তরায়ণ পদার্পণের শুভক্ষণে এবং দেবগণ জাগ্রত হওয়ার পূণ্যলগ্ন ব্রহ্মমুহূর্তে স্নানসমাপন পূর্বক আহ্নিক ক্রিয়াদি শেষে ফুল-তুলসি, সাধ্যমত প্রসাদি নিবেদন পূর্বক যজ্ঞ, পূজা, প্রার্থনা, অতিথিসেবা ইত্যাদির মাধ্যমে ভগবৎধামে যাওয়ার সুর্কীতিটুকু অর্জন করার চেষ্টা করা হয়। কারণ জীবের প্রকৃত ঠিকানা ভগবৎধাম।

তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছেন-‘যদ্গত্বা ন নিবর্তন্তে তদ্ধাম পরমং মম’ (১৫/৬)। অর্থাৎ যাকে প্রাপ্ত হলে জীব আর সংসারে ফিরে আসে না, সেটাই আমার পরম ধাম। একথায় ইহাই বুঝানো হয়েছে যে, পরমাত্মার ধাম জীবের নিজের মূল ঠিকানা বলে আর ফিরতে হয় না। মানুষ যেমন নিজ বাড়ীতে গেলে অন্য বাড়ীতে থাকার প্রয়োজন হয় না তেমনি জীব পরমাত্মার ধামে গেলে আর ফিরত হয় না। ভগবান আরও বলেছেন-‘মামুপেত্য তু কৌন্তেয় পুনর্জম্ম ন বিদ্যতে’ (৮/১৬) অর্থাৎ হে কুন্তীপত্রÑ আমাকে প্রাপ্ত হলে আর পুনর্জন্ম হয় না। কারণ জীব পরমাত্মারই অংশ (১৫/৭)। সুতরাং জীব যখন নিজ অংশী পরমাত্মার কৃপায় তাঁকে প্রাপ্ত হয়, তখন সে আর দুঃখ, কষ্ট ভোগের জন্য জন্ম-মৃত্যুরূপ সংসারে ফিরে আসে না। শাস্ত্রমতে ইহাই জীবমুক্তি।

ভগবৎধামে অনন্ত সৌন্দর্য, অনন্ত মাধুর্য, অনন্ত সুখ ভাগ্যবান ভক্তবৃন্দই কেবল আস্বাদন করে থাকেন। এই সুর্কীতিটুকু অর্জনের মানসে উত্তরায়ণের প্রাক্কালে দেবগণের বিশুদ্ধ ও নির্মলচিত্ত থাকা অবস্থায় কায়মনবাক্যে প্রার্থনার বিধান হয়ত আর্য ঋষিগণ রেখে গেছেন, যাতে সহজে দেবগণের মন বিগলিত হয়ে তাঁদের কৃপাদৃষ্টি লাভ করা যায়। কারণ দেবগণের নিদ্রার সময় অপেক্ষা জাগ্রত অবস্থায় পূজা, পার্বন ও তাদের উদ্দেশ্যে কর্মাদি করা উত্তম। এসকল কারণেই উত্তরায়ণ সংক্রান্তির গুরুত্ব অত্যাধিক।

অন্যদিকে, মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের বিশ্ববিখ্যাত বীর, মহাপ্রাজ্ঞ, সর্বত্যাগী ও জিতেন্দ্রিয় মহাপুরুষ ভীষ্মের মহাপ্রয়াণের স্মৃতির জন্য উত্তরায়ণ সংক্রান্তি আরও মর্যাদাপূর্ণ হয়েছে। উল্লেখ্য, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কৌরবপক্ষের চারজন সেনাপতির মধ্যে তিনিই প্রথম সেনাপতি। উভয় পক্ষের আঠারদিন যুদ্ধের দশম দিবসে সূর্যাস্তের কিছুক্ষণ পূর্বে পাণ্ডব পক্ষের সেনাপতি অর্জুনের শরাঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে ভীষ্মদেব রথ থেকে মাটিতে পড়ে যান। কিন্তু তিনি মাটি স্পর্শ না করে আটান্ন দিন তীক্ষè শরশয্যায় শুয়ে উত্তরায়ণের অপেক্ষা করে পৌষ সংক্রান্তির দিনে যোগবলে দেহত্যাগ করেছেন। শাস্ত্রমতে ভীষ্মদেব মৃত্যুর পরে ভগবদ্ ধামে যাননি।

তিনি ছিলেন ‘দৌ’ মতান্তরে দ্যু নামক অষ্টবসু (আজান দেবতা), যিনি মহর্ষি বশিষ্ঠের অভিশাপগ্রস্ত হয়ে ইহলোকে মনুষ্য হিসাবে কৃতকর্ম ভোগের জন্য জন্ম নিয়েছিলেন। তাই তাঁর পুনরায় দেবলোকেই যাবার কথা। কারণ তিনি সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা। দক্ষিণায়নের সময় দেবলোকে রাত্রি, সেই সময় সেখানকার সবকিছু বন্ধ থাকে। ভীষ্ম যদি দক্ষিণায়নে দেহত্যাগ করতেন, তবে তাঁকে তাঁর লোকে প্রবেশ করার জন্য বাইরে প্রতীক্ষা করতে হত। তিনি ইচ্ছামৃত্যু বরণ করেছিলেন বলে ভেবে দেখলেন, দক্ষিণায়নে মহাপ্রয়াণ করলে দেবলোকে গিয়ে বাইরে প্রতীক্ষা করার চেয়ে এখানে থেকে উত্তরায়ণের প্রতীক্ষা করাই ভালো। কারণ এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দর্শন লাভ হবে এবং সৎসঙ্গ হতে থাকবে, যার ফলে সকলেরই মঙ্গল হবে। দেবলোকে একলা প্রতীক্ষা করে কী হবে ? এই ভেবে তিনি দক্ষিণায়নে শরীর ত্যাগ না করে উত্তরায়ণে শরীর ত্যাগ করেছিলেন। ভীষ্মদেবের এই মহাপ্রয়াণের স্মৃতির জন্য সনাতণ ধর্মাবলম্বীগণের নিকট উত্তরায়ণ সংক্রান্তি বেশী গুরুত্ব পেয়েছে।

উত্তরায়ণ সংক্রান্তিকে মকর সংক্রান্তিও বলা হয়। এই দিনে মকর স্নান করার জন্য মাতা যশোমতী বালক শ্রীকৃষ্ণকে উদ্দেশ্য করে সংক্রান্তির পূর্ব রাত্রে বলেছেন-
“আসিল যে পৌষ মাস শুনহ রাজন।
দ্বিদশ নবম দিন দিল দরশন ॥

অর্থাৎ এখানে যশোমতী বলেছেন, শুন রাজন; পৌষ মাস তো এসে গেছে। এই মাসের ২৯ তারিখ মকর সংক্রান্তি হবে।

তারপর বলেছেন-
রাণী বলে আজিকার লীলা সম্বরিয়া।
এস বাপু নিদ্রা যাও পালঙ্কে শুইয়া ॥
কল্য অতি প্রত্যুষে করিয়া গাত্রোত্থান।
যমুনার বারিতে করিতে হবে স্নান ॥

মাতা যশোমতীর মুখে আগামীকল্য ভোরে যমুনাতে স্নানের কথা শুনে পুত্র শ্রীকৃষ্ণ মাকে জিজ্ঞাসা করছেন, ‘ব্রহ্মমুহূর্তে যমুনাতে স্নান করলে কি ফল হয় বলে ? উত্তরে মা বলেছেন-
রাণী বলে কল্য বাপু দিন শুভক্ষণ ।
ধনুত্যজি মকরেতে আসিবে তপন ॥
বলিয়া মকর-যাত্রা তার নাম কয়।
মকরে করিলে স্নান আয়ুবৃদ্ধি হয় ॥

অর্থাৎ আগামীকল্য সূর্য ধনুরাশি ত্যাগ করে মকরে সঞ্চারিত হবে বলে দিনটি শুভ। এজন্য একে মকর-যাত্রা বলে এবং উক্ত সময় স্নান করলে আয়ুবৃদ্ধি হয়।

এরপর যশোমতী বলেছেন, ষোল জাতের নানান উপাচার নিয়ে ব্রহ্মমুহূর্তে যমুনায় মকর-স্নান করবে এবং স্নান শেষে সকলে মিলে সে সব আহার করবে।

তারপর বলেছেন-
মকরে-তণ্ডুলে সবে পাতাবে মকর।
এতশুনি হৃষ্ট হল দেব দামোদর ॥
শ্রীমতি চাহিয়া তবে কহিলা ইঙ্গিতে।
মকর করিব কল্য তোমার সহিতে ॥”
(—-বৃহৎ/কৃষ্ণলীলা সারাবলী, মকর স্নানযাত্রা)

উপরোক্ত পংতিটুকুতে শ্রীকৃষ্ণ শ্রীমতি রাধিকার সহিত কল্য মকর করিব বলে উল্লেখ করেছেন। এই মকর করা বা মকর পাতানো-ই পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তির মূল অর্জনীয় বিষয়। মকর পাতানো বলতে দুই সখা বা সখী অথবা নিকট প্রাণের সম্পর্ক আছে এমন প্রণয়ী ও প্রণয়িনীর মধ্যে চিরস্থায়ী প্রীতির বন্ধন সূচনা করা বুঝায়। এধরনের বন্ধন কেবল আত্মার সহিত আত্মার বন্ধন বুঝায়। এই প্রীতিবন্ধন সুখ ইন্দ্রিয়ের দ্বারা বুঝা বা উপলব্ধির সুখ নহে। ইহা আত্ম উপলদ্ধির সুখ এবং আত্মার জন্য পরম সুখকর সুখ। নিজ আত্মার সহিত পরমাত্মার যে সমন্ধ সেটাই এখানে বুঝানো হয়েছে। নিজ আত্মা হল রাধিকা তূল্য এবং পরমাত্মা হল শ্রীকৃষ্ণ তূল্য। তাই মকর সংক্রান্তির এই দিনে উত্তরায়ণের প্রাক্কালে আত্মার সহিত পরমাত্মার চিরস্থায়ী প্রীতির বন্ধন সূচনা করার নিমিত্তে উপরোল্লিখিত মকর পাতানো একান্ত অপরিহার্য। এই প্রীতির সম্পর্ক অন্যন্য ও দৃঢ় হলেই মনুষ্য জীবনের চরম সার্থকতা আসে। মকর সংক্রান্তির দিনে ইহাই প্রার্থনীয়।

পৌষ সংক্রান্তিকে যেমন উত্তরায়ণ সংক্রান্তি বলা হয় তেমনি তিল সংক্রান্তিও বলা হয়। সনাতন ধর্মের অনুসারীগণ উক্ত দিনে তিল দিয়ে তৈরী করা নাড়–, মিষ্টি, ফল ইত্যাদি দিয়ে পূজার নৈবেদ্য হিসাবে নিবেদন করে থাকেন। তাছাড়া নানা জাতের পিঠা, পায়েস ইত্যাদির আয়োজন করে দিনটিকে সমৃদ্ধিশালী করে তোলেন। মোট কথা দিনটি উৎসবে আয়োজনে আনন্দমুখর হয়ে উঠে। এই আনন্দ, উৎসব এবং আয়োজন সবই ভগবৎ সেবার উদ্দেশ্যে নিবেদন করা প্রয়োজন।

কারণ ভগবান শ্রীগীতায় বলেছেন-
‘যৎ করোষি যদশ্নাসি যজ্জুহোষি দদাসি যৎ।
যৎ তপস্যসি কৌন্তেয় তৎ কুরুস্ব মদার্পণম্ ॥ (৯/২৭)

অর্থাৎ -হে কৌন্তেয়, তুমি যা কিছু কর, যা কিছু ভোজন কর, যা হোম কর, যা কিছু দান কর, যে তপস্যা কর, তা সমস্তই আমাকে অর্পণ করিও। কারণ জগৎ সংসার ভগবানের, জগৎসংসার ভগবানের হলে নিজের দেহটাও ভগবানের অর্থাৎ ভগবানের কৃপায় মনুষ্যদেহ লাভ এবং দেহস্থিত জীবাত্মাও পরমাত্মার অংশ। তাই, যে দেহের মধ্যে আমি আমি করে সেও যদি নিজের না হয় তবে মানুষ সংসারে যা যা ভোগ করে তা নিজের হবে কেমন করে ? তাই যাঁরা এভাবে সবকিছু ভগবানে অর্পণ পূর্বক পরে ভগবৎ প্রসাদরূপে গ্রহণ করে থাকেন; নিঃসন্দেহে তাঁদের ব্রহ্মপ্রপ্তি হয়। ভীষ্মদেবও নিজের কর্ম ও কর্মফল শ্রীভগবানে অর্পণ করার পর দেহত্যাগ করেছিলেন (শ্রীমদ্ভাগবত ১/৯/৩২)। তাই পৌষ সংক্রান্তির এই শুভদিনে; উত্তরায়ণের প্রাক্কালে; অষ্টবসুর অন্যতম ভীষ্মদেবের মহাপ্রয়াণের স্মৃতি বিজড়িত পূণ্য দিবস উপলক্ষ্যে যার যে নিবেদন, যা কিছু আয়োজন সকল-ই যেন করুণাময়ী ভগবানের উদ্দেশ্যে নিবেদন করে করুণাময়ীর করুণাকমল যেন প্রস্ফুটিত হয়ে সকলকে কৃপাসৌরভ দান করেন এই প্রত্যাশাটুকু কাম্য।

কৃতজ্ঞতায়- প্রসন্ন কুমার সিংহ

http://www.sylhetview24.com/news/details/Feature/21397#sthash.Po1Gbsl3.dpuf

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s