শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা : দ্বিতীয় অধ্যায় – সাংখ্যযোগ (স্বামী জগদীশ্বরানন্দ)


শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা : দ্বিতীয় অধ্যায় – সাংখ্যযোগ

(স্বামী জগদীশ্বরানন্দ)
সঞ্জয় বলিলেন
অর্জুন উক্ত প্রকারে দয়ার্দ্র হইয়া শোক করিতে লাগিলেন; অশ্রুপূর্ণ হওয়ায় তাঁহার চক্ষুর্দ্বয় দর্শনে অসমর্থ হইল। তখন শ্রীকৃষ্ণ তাঁহাকে এই কথা বলিলেন । ১
শ্রীভগবান্‌ বলিলেন
হে অর্জুন, এই সঙ্কটকালে আর্যগনের অযোগ্য, স্বর্গগতির প্রতিবন্ধক ও অযশস্কর এই মোহ তোমাতে কোথা হইতে আসিল ? ২
পার্থ, ক্লীবভাব আশ্রয় করিও না; এইরূপ কাপুরুষতা তোমার শোভা পায় না । হে শত্রুতাপন, হৃদয়ের এই তুচ্ছ দুর্বলতা ত্যাগ করিয়া যুদ্ধার্থ উত্থিত হও । ৩
অর্জুন বলিলেন
হে অরিসূদন (শত্রুমর্দন), হে মধুসূদন, ভীষ্ম দ্রোণাদি আমাদের পূজনীয় । তাঁহাদের সহিত বাণাদির দ্বারা কিরূপে প্রতিযুদ্ধ করিব । ৪
মহানুভব গুরুজনদিগকে বধ না করিয়া ইহজগতে ভিক্ষান্ন গ্রহণ করিলেও আমার কল্যাণ হইবে । কিন্তু তাঁহাদিগকে বধ করিলে ইহলোকেই শোণিতসিক্ত ধনসম্পদ ও কাম্যবস্তুরূপ ভোগ্যবিষয়সকল ভোগ করিতে হইবে । ৫
এই যুদ্ধে যদি আমরা জয়লাভ করি, অথবা ইঁহারা আমাদিগকে পরাজিত করেন, এই উভয়ের মধ্যে কোন্‌টি আমাদের পক্ষে শ্রেয়স্কর, তাহা বুঝিতে পারিতেছি না । যাঁহাদিগকে বধ করিয়া আমরা বাঁচিয়া থাকিতে ইচ্ছা করি না, সেই ধৃতরাষ্ট্রপক্ষীয়গণই আমাদের সম্মুখে অবস্থিত রহিয়াছেন । ৬
‘ইহাদিগকে বধ করিয়া কি প্রকারে জীবনধারণ করিব’ – এইরূপ কার্পণ্য- (দীনতা-) দোষে আমার শৌর্যতেজাদিযুক্ত স্বভাব অভিভূত ও আমার চিত্ত স্বধর্মবিষয়ে বিমূঢ় হইয়াছে । আমি আপনার নিকট প্রার্থনা করিতেছি, আমার পক্ষে যাহা মঙ্গলকর, তাহা নিশ্চয়পূর্বক বলুন । আমি আপনার শিষ্য, আমি আপনার শরণাগত, আমাকে উপদেশ দিন । ৭
পৃথিবীতে শত্রুশূন্য সমৃদ্ধ রাজ্য এবং স্বর্গের আধিপত্য পাইলেও আমার ইন্দ্রিয়বর্গের সন্তাপক শোক নিবারণ করিতে পারে, এমন কোনও উপায় দেখিতেছি না । ৮
সঞ্জয় বলিলেন
পরন্তপঃ (শত্রুতাপন) গুড়াকেশঃ (জিতনিদ্র) অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে এইরূপ বলিবার পর ‘আমি যুদ্ধ করিব না’ বলিয়া নিরব হইলেন । ৯
ভারত (হে ধৃতরাষ্ট্র), শ্রীকৃষ্ণ উভয় সেনাদলের মধ্যে বিষাদকারী অর্জুনকে যেন হাসিতে হাসিতে এই কথা বলিলেন । ১০
[আমি ইঁহাদের, ইঁহারা আমার – এই ভ্রান্তি-বুদ্ধিই শোক-মোহ-কর্তৃত্ব-ভোক্তৃত্বরূপ সংসারের কারণ । একমাত্র আত্মজ্ঞানেই এই ভ্রান্তির আত্যন্তিক নিবৃত্তি হয় । এইজন্য শ্রীভগবান অর্জুনকে আত্মতত্ত্বের উপদেশ দিতেছেন ।]
শ্রীভগবান্‌ বলিলেন
যাঁহাদিগের জন্যে শোক করা উচিত নয়, তাঁহাদিগের জন্য তুমি শোক করিতেছ; অথচ প্রাজ্ঞের মত কথা বলিতেছ । পণ্ডিতগণ মৃত বা জীবিত কাহারও জন্য শোক করেন না । ১১
পূর্বে আমি কখনও ছিলাম না এমন নহে; তুমি কখনও ছিলে না তাহা নহে বা এই নৃপতিগণও ছিলেন না – ইহা সত্য নহে । এই দেহধারণের পূর্বে আমরা সকলেই নিত্য আত্মরূপে বিদ্যমান ছিলাম । এই দেহত্যাগের পরেও যে আমরা কেহ থাকিব না, ইহাও নহে । বর্তমানে দেহসত্ত্বেও আমরা নিত্য আত্মস্বরূপে বিরাজমান থাকিব । ১২
যেমন দেহীর (আত্মার) এই দেহে কৌমার, যৌবন ও জরা ক্রমে উপস্থিত হয়, তাহাতে দেহীর কোনও পরিবর্তন হয়না, সেইরূপ দেহান্তরপ্রাপ্তিতে (মৃত্যুতে) দেহী অবিকৃত থাকেন । মৃত্যু দৈহিক বিকার মাত্র । এইজন্য দেহান্তরপ্রাপ্তি বিষয়ে জ্ঞানিগণ মোহগ্রস্থ হন না । ১৩
হে কৌন্তেয়, ইন্দ্রিয়ের সহিত বিষয়ের সংযোগহেতু শীত ও উষ্ণ, সুখ ও দুঃখাদি দ্বন্দ্ব অনুভূত হয় । কিন্তু এই সকল দ্বন্দ্ব উৎপত্তিবিনাশশীল; অতএব অনিত্য । হে ভারত, হর্ষ ও বিষাদশূন্য হইয়া অপ্রতিকারপূর্বক এই সকল সহ্য কর । ১৪
কারণ, হে পুরুষ-ঋষভ (পুরুষশ্রেষ্ঠ), সুখে দুঃখে অবিচলিত যে জ্ঞানী ব্যক্তিকে শীতোষ্ণাদি দ্বন্দ্ব বিচলিত করিতে পারে না, (অর্থাৎ আত্মার নিত্যত্ব-জ্ঞান হইতে বিচ্যুত করিতে পারে না) তিনি অমৃতত্বলাভের প্রকৃত অধিকারী । ১৫
প্রত্যক্ষাদি প্রমাণের গোচর হইলেও শীতোষ্ণাদি উৎপত্তি-বিনাশশীল বলিয়া অসৎ । ইহাদের পারমার্থিক অস্তিত্ব নাই । কিন্তু আত্মার পারমার্থিক সত্তা আছে । অজ্ঞদের অবিজ্ঞাত হইলেও আত্মার কখনও অনস্তিত্ব হয় না । তত্ত্বদর্শিগণ সৎ ও অসৎ উভয়ের যথার্থ স্বরূপ উপলব্ধি করিয়াছেন । ১৬
যিনি এই সমগ্র জগৎ পরিব্যাপ্ত করিয়া আছেন, তাঁহাকেই অবিনাশী আত্মা (বা ব্রহ্ম) বলিয়া জানিবে । কেহই এই অব্যয় আত্মার বিনাশ করিতে সমর্থ হয় না । ১৭
প্রত্যক্ষাদি প্রমাণের অতীত, অবিনাশী ও নিত্য আত্মার এই সকল দেহ নশ্বর বলিয়া উক্ত হইয়াছে । অতএব হে অর্জুন, তোমার এই জড়দেহ কালে বিনষ্ট হইবেই; কিন্তু তুমি আত্মারূপে অবিনাশী । অতএব যুদ্ধ করিয়া স্বধর্ম পালন কর । ১৮
যিনি ইঁহাকে হন্তা বলিয়া মনে করেন এবং যিনি ইঁহাকে নিহত বলিয়া ভাবেন, তাঁহারা উভয়েই আত্মার প্রকৃত স্বরূপ জানেন না । আত্মা কাহাকেও হত্যা করেন না এবং কাহারও দ্বারা নিহতও হন না । কারণ, আত্মা অবিনাশী । ১৯
এই আত্মা কখনও জাত বা মৃত হন না । কারণ, পূর্বে না থাকিয়া পরে বিদ্যমান হওয়ার নাম জন্ম এবং পুর্বে থাকিয়া পরে না থাকার নাম মৃত্যু; আত্মাতে এই দুই অবস্থার কোনটিই নাই । অর্থাৎ আত্মা জন্ম-ও-মৃত্যু-রহিত, অপক্ষয়হীন এবং বৃদ্ধিশূন্য; শরীর নষ্ট হইলেও আত্মা বিনষ্ট হন না । ২০
হে পার্থ, যিনি এই আত্মাকে অবিনাশী, নিত্য, অজ ও অব্যয় বলিয়া জানেন, তিনি কিরুপে কাহাকেই বা হত্যা করেন এবং কাহাকেই বা হত্যা করান ? ২১
মানুষ যেমন জীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করিয়া অন্য নূতন বস্ত্র গ্রহণ করে, আত্মা সেইরূপ জীর্ণ শরীর ত্যাগ করিয়া অন্য নূতন শরীর গ্রহণ করেন । ২২
কোন শস্ত্র এই আত্মাকে ছেদন করিতে পারে না । অগ্নি ইঁহাকে দহন করিতে পারে না । জল ইঁহাকে আর্দ্র করিতে পারে না এবং বায়ু ইঁহাকে শুষ্ক করিতে পারে না । ২৩

এই অপরোক্ষ আত্মা অচ্ছেদ্দ্য, অদাহ্য, অক্লেদ্য, অশোষ্য, নিত্য, সর্বব্যাপী, স্থির, অচল এবং সনাতন । ২৪

এই আত্মা অব্যক্ত, অচিন্ত্য ও অবিকারী বলিয়া শাস্ত্রে উক্ত হইয়াছে। অতএব আত্মার এই সনাতন স্বরূপ অবগত হও এবং শোক পরিত্যাগ কর । ২৫
আর যদি তুমি মনে কর যে, আত্মা প্রত্যেক শরীরের উৎপত্তির সঙ্গে জাত হন এবং প্রত্যেক শরীরের বিনাশের সঙ্গে মৃত হন, তথাপি হে মহাবাহো, ইঁহার জন্য তোমার অনুশোচনা করা উচিত নয় । ২৬
কারণ, জাত ব্যক্তির মৃত্যু নিশ্চিত এবং স্বীয় কর্মানুসারে মৃত ব্যক্তির পূনর্জন্ম অবশ্যম্ভাবী (আত্মজ্ঞান ব্যতীত পূনর্জন্ম রোধ হয় না) । সেইহেতু এই অপরিহার্য বিষয়ে শোক করা তোমার উচিত নয় । ২৭
হে ভারত, জীবগণের শরীর উৎপত্তির পূর্বে অপ্রকাশিত, স্থিতিকালে মাত্র প্রকাশিত এবং বিনাশের পরেও অপ্রকাশিত থাকে । তাহাতে শোক কি ? ২৮
কেহ এই আত্মাকে আশ্চর্যতুল্য দেখেন । অন্য কেহ ইঁহাকে আশ্চর্যরূপে বর্ণনা করেন । অপর কেহ এই আত্মাকে আশ্চর্যরূপে শ্রবণ করেন এবং কেহ কেহ ইঁহাকে শুনিয়া, বলিয়া বা দেখিয়াও জানিতে পারেন না । কারণ, আত্মা দুর্বিজ্ঞেয় । ২৯
দ্বিতীয় ব্যাখ্যা – যিনি আত্মাকে দর্শন করেন, তিনিই আশ্চর্য (দুর্লভ) । যিনি আত্মতত্ত্ব উপদেশ দেন বা শ্রবণ করেন, তিনিও আশ্চর্য । এইরূপ আত্মদর্শী, আত্মোপদেষ্টা বা আত্মতত্ত্ব-শ্রোতা অনেক সহস্রের মধ্যে কদাচিৎ দুই-একজনই হয় । কারণ, আত্মতত্ত্ব অত্যন্ত দুর্বোধ্য । ২৯ (শাঙ্করভাষ্য)
হে ভারত, প্রাণিগণের দেহে অবস্থিত আত্মা সদা অবধ্য । সেইজন্য কোন প্রাণীর দেহনাশে তোমার শোক করা উচিত নয় । ৩০
আর স্বধর্ম লক্ষ্য করিয়াও তোমার ভীত হওয়া উচিত নয় । কারণ, ধর্মসঙ্গত যুদ্ধ অপেক্ষা ক্ষত্রিয়ের পক্ষে মঙ্গলকর আর কিছুই নাই । ৩১
হে পার্থ, অনায়াসপ্রাপ্ত, উন্মুক্ত স্বর্গদ্বারসদৃশ এই প্রকার ধর্মযুদ্ধ ভাগ্যবান ক্ষত্রিয়গণই লাভ করেন । ৩২
আর যদি এই ধর্মযুদ্ধ না কর, তাহা হইলে স্বীয় ক্ষত্রিয়ধর্ম ও কীর্তি পরিত্যাগহেতু তুমি প্রত্যবায়ভাগী হইবে । ৩৩
আরও সকলে চিরকাল তোমার অখ্যাতি ঘোষণা করিবে । সম্মানিত ব্যক্তির পক্ষে অখ্যাতি মৃত্যু অপেক্ষাও অধিকতর দুঃখদায়ক । ৩৪
কর্ণাদি মহারথগণ মনে করিবেন, তুমি ভয় পাইয়াই যুদ্ধ হইতে নিবৃত্ত হইয়াছ এবং তুমি যাঁহাদের নিকট সম্মানিত ছিলে তাঁহাদের নিকট হেয় হইবে । ৩৫
এবং তোমার শত্রুগণও তোমার সামর্থ্যের নিন্দা করিয়া বহু অকথ্য বাক্য বলিবে । তাহা অপেক্ষা অধিকতর দুঃখকর আর কি হইতে পারে ? ৩৬
হে কৌন্তেয়, এই যুদ্ধে নিহত হইলে তুমি স্বর্গলাভ করিবে; আর জয়ী হইলে রাজ্য ভোগ করিবে । অতএব যুদ্ধের জন্য দৃঢ়সঙ্কল্প হইয়া উত্থিত হও । ৩৭
তুমি ক্ষত্রিয়; ধর্মযুদ্ধই তোমার স্বধর্ম । সুতরাং তুমি সুখে অনুরাগ ও দুঃখে দ্বেষ না করিয়া এবং লাভ ও ক্ষতি, জয় ও পরাজয় তুল্য জ্ঞান করিয়া ধর্মযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও । এইরূপ করিলে গুরুজনাদি-বধজনিত প্রত্যবায় তোমার হইবে না । ৩৮
হে পার্থ, সাক্ষাৎ শোকমোহাদি সংসারহেতু-নাশক সাংখ্য নামক তত্ত্বজ্ঞানের উপদেশ তোমাকে দেওয়া হইল । এখন কর্মযোগের কথা বলিতেছি; শ্রবণ কর । নিষ্কাম কর্মযোগবিষয়ক এই জ্ঞানলাভ করিলে তুমি ধর্মাধর্মরূপ কর্মের বন্ধন হইতে মুক্ত হইবে । ৩৯
এই মোক্ষমার্গরূপ নিষ্কাম কর্মযোগে কোন প্রকার প্রচেষ্টা নিষ্ফল হয় না এবং বৈগুণ্যজনিত প্রত্যবায়ও হয় না । এই নিষ্কাম কর্মযোগের অল্পমাত্র অনুষ্ঠানও জন্মমরণরূপ সংসারের মহাভয় হইতে পরিত্রাণ করে । ৪০
কুরু-নন্দন, এই নিষ্কাম কর্মযোগে নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি একনিষ্ঠ হয় (সকাম বুদ্ধির বহুমুখী ভাবনাশক হয়) । অস্থিরচিত্ত সকাম ব্যক্তিগণের বুদ্ধি বহুশাখাবিশিষ্ট ও বহুমুখী । ৪১
হে পার্থ, অবিবেকি পুরুষগণ বেদোক্ত কর্মের প্রশংসায় অনুরক্ত । স্বর্গাদিফলজনক কর্ম ব্যতীত অন্য কিছুই নাই – তাহারা এইরূপ বিশ্বাস করেন । তাঁহারা কামনাযুক্ত ও স্বর্গকামী । তাঁহারা জন্মরূপ কর্মফলপ্রদানকারী এবং ভোগপ্রাপ্তি ও ঐশ্বর্যলাভের উপযোগী বহু ক্রিয়াকলাপের প্রশংসা করিয়া থাকেন । যাহাদের চিত্ত সেই সকল পুষ্পিত বাক্যে বিমুগ্ধ এবং ভোগ ও ঐশ্বর্যে আসক্ত, তাহাদের অন্তঃকরণে নিশ্চয়াত্মিকা শুদ্ধা বুদ্ধি স্থির হয় না । ৪২-৪৪
হে অর্জুন, বেদের কর্মকাণ্ড কামনামূলক ও সংসৃতিদায়ক । তুমি নিষ্কাম হও এবং ঈশ্বরার্থ কর্ম কর । তুমি সুখ-দুঃখাদি দ্বন্দ্বরহিত ও সদা সত্ত্বগুণাশ্রিত এবং যোগ (অপ্রাপ্তের প্রাপ্তি) এবং ক্ষেমের (প্রাপ্তের রক্ষণের) আকাঙ্ক্ষারহিত ও অপ্রমত্ত হও । ৪৫
সর্বস্থান জলপ্লাবিত হইলে যেরূপ কূপাদি ক্ষুদ্র জলাশয়ের স্নানপানাদিরূপ প্রয়োজনসমূহ প্লাবনের জলরাশিতে সিদ্ধ হয়, সেরূপ ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষের ব্রহ্মানন্দরূপ যে ফল তাহাতে বেদোক্ত সকল কাম্য কর্মের ফল অন্তর্ভুক্ত হয় । ৪৬

কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষুকদাচন

কর্মে তোমার অধিকার, ফলে নহে । অতএব কর্ম কর । কিন্তু কর্মফলে যেন কখনও তোমার আসক্তি না হয়; কারণ, কর্মফলের তৃষ্ণাই কর্মফল-প্রাপ্তির হেতু হয় । সুতরাং কর্মফল-প্রাপ্তির হেতু হইও না কর্ম সকাম ভাবে করিও না । আবার কর্মত্যাগেও তোমার প্রবৃত্তি না হউক । ৪৭
হে ধনঞ্জয়, যোগস্থ হইয়া অর্থাৎ কেবল ঈশ্বরার্থে কর্ম কর । ঈশ্বরার্থে কর্ম করিবার কালেও ‘ঈশ্বর আমার প্রতি প্রসন্ন হউন’ – এই প্রকার আশাও ত্যাগ করিতে হইবে । কর্তৃত্বাদি-অভিনিবেশশূন্য হইয়া কার্য করিলে সত্ত্বশুদ্ধিজনিত জ্ঞানপ্রাপ্তিতরূপ সিদ্ধিতে হর্ষ এবং তদ্বিপর্যয়ে বিষাদ উপস্থিত হয় । উহাতে নির্বিকার থাকিয়া কর্ম কর । ফলাফলে চিত্তের সমত্ব বা নির্বিকার ভাবই যোগ । ৪৮
হে ধনঞ্জয়, কাম্য কর্ম নিষ্কাম কর্ম অপেক্ষা নিতান্ত নিকৃষ্ট । অতএব তুমি কামনাশূন্য হইয়া সমত্ব বুদ্ধির আশ্রয় গ্রহণ কর । যাহারা ফলাকাঙ্ক্ষী হইয়া কর্ম করে, তাহারা অতি হীন । ৪৯

নিষ্কাম কর্মযোগী ঐহিক জীবনেই পাপ ও পূণ্য উভয় হইতে মুক্ত হন । সুতরাং তুমি নিষ্কাম কর্মযোগের অনুষ্ঠান কর । কর্মের কৌশলই যোগ (কর্মের স্বভাব বন্ধন, কর্মে সমত্ববুদ্ধিরূপ কৌশল অবলম্বন করিলে কর্মের স্বাভাবিক বন্ধনশক্তি নষ্ট হয়, ফলাসক্তি চলিয়া যায়) । ৫০

নিষ্কাম কর্মযোগী মনীষিগণ কর্মজাত ফল ত্যাগ করিয়া জন্মরূপ বন্ধন হইতে মুক্ত হন এবং সর্বপ্রকার উপদ্রবরহিত (সংসারস্পর্শশুন্য) ব্রহ্মপদ লাভ করেন । ৫১

যখন তোমার বুদ্ধি মোহাত্মক অবিবেকরূপ কলুষ অতিক্রম করিবে, তখন তুমি শ্রোতব্য ও শ্রুত কর্মফলবিষয়ে বৈরাগ্যলাভ করিবে অর্থাৎ শ্রোতব্য ও শ্রুত উভয়ই তোমার নিকট নিষ্ফল হইবে । ৫২
নানা কর্মফলশ্রবণে বিক্ষিপ্ত তোমার চিত্ত যখন পরমাত্মাতে স্থির ও অচল হইবে, তখন তুমি তত্ত্বজ্ঞান লাভ করিবে । ৫৩
অর্জুন জিজ্ঞাসা করিলেন
হে কেশব, ব্রহ্মসমাধিতে অবস্থিত স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তির কি লক্ষণ ? স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি কিভাবে কথা বলেন ও কিরূপে অবস্থান করেন এবং কিরূপেই বা তিনি বিচরণ করেন ? ৫৪
শ্রীভগবান্‌ বলিলেন
হে পার্থ, বাহ্যলাভে নিরপেক্ষ ও পরমার্থদর্শনে প্রত্যগাত্মাতেই পরিতৃপ্ত হইয়া যখন যোগী সমস্ত মনোগত বাসনা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করেন, তখন তিনি স্থিতপ্রজ্ঞ বলিয়া উক্ত হন । ৫৫
দুঃখে উদ্বেগহীন, সিখে নিঃস্পৃহ এবং আসক্তিশূন্য, ভয়মুক্ত ও ক্রোধরহিত মুনিই স্থিতপ্রজ্ঞ বলিয়া উক্ত হন । ৫৬
যিনি সকল বস্তু ও ব্যক্তিতে স্নেহবর্জিত এবং প্রিয় ও অপ্রিয় বিষয় উপস্থিত হইলে যিনি যথাক্রমে আনন্দিত বা দুঃখিত হন না, তিনি স্থিতপ্রজ্ঞ হইয়াছেন । ৫৭
ভয় পাইলে কূর্ম যেমন মস্তক ও হস্তপদাদি অঙ্গসমূহ সঙ্কুচিত করে, সেইরূপ যে জ্ঞাননিষ্ঠ যোগী শব্দাদি বিষয়পঞ্চক হইতে ইন্দ্রিয়গণকে প্রত্যাহার করেন, তিনি স্থিতপ্রজ্ঞ হন । ৫৮
বিষয়গ্রহণে অসমর্থ আতুর ব্যক্তি বা বিষয়ভোগ-পরাঙ্মুখ কঠোর তপস্বী ইন্দ্রিয়-বিষয় হইতে নিবৃত্ত হন বটে; কিন্তু তাঁহার বিষয়াসক্তি দূর হয় না । আর পরমাত্মার সাক্ষাৎকার হইলে বিষয় ও বিষয়তৃষ্ণা উভয়ই চিরতরে নিবৃত্ত হয় । ৫৯
হে কুন্তীপুত্র, বিক্ষেপকারী ইন্দ্রিয়গণ অতি যত্নশীল মেধাবী পুরুষের মনকেও বলপূর্বক বিষয়াভিমুখে আকর্ষণ করে । ৬০
অতএব, যোগী সেই ইন্দ্রিয়সমূহকে সংযত করিয়া সমাহিতভাবে আত্মস্থ হইয়া অবস্থান করিবেন । কারণ যাঁহার ইন্দ্রিয়সকল বশীভূত হইয়াছে, তাঁহারই বিবেকজা (ঋতম্ভরা) প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত, অর্থাৎ তিনি স্থিতপ্রজ্ঞ । ৬১
বিষয়সমূহ চিন্তা করিতে করিতে তৎসমুদয়ে মানুষের আসক্তি জন্মে, আসক্তি হইতে কামনা (তৃষ্ণা) হয়, কামনা প্রতিহত হইয়া ক্রোধে পরিণত হয়, ক্রোধ হইতে কর্তব্যাকর্তব্যরূপ বিবেকনাশ এবং বিবেকনাশ হইতে শাস্ত্রাচার্যোপদেশজনিত সংস্কারের স্মৃতিবিলোপ, স্মৃতিবিভ্রম হইতে পুরুষের সদসদ্‌বিচারবুদ্ধি বিনষ্ট হয় এবং বিচারবুদ্ধি বিনষ্ট হইলে মানুষ পুরুষার্থের অযোগ্য হয় । ৬২-৬৩
কিন্তু সংযতচিত্ত পুরুষ প্রিয় বস্তুতে স্বাভাবিক আসক্তি ও অপ্রিয় বস্তুতে স্বাভাবিক বিদ্বেষ হইতে মুক্ত হইয়া স্ববশীভূত ইন্দ্রিয়দ্বারা অবর্জনীয় (দেহস্থিতিহেতু অপরিহার্য) বিষয়সমূহ পতিত তৃণের ন্যায় অনাসক্তভাবে গ্রহণ করিয়া চির-প্রসন্নতা লাভ করেন । ৬৪
প্রসন্নতালাভ হইলে স্বচ্ছচিত্ত ব্যক্তির সর্বদুঃখের বিনাশ হয়; কারণ তাঁহার বুদ্ধি আত্মস্বরূপে শীঘ্র নিশ্চল হয় । ৬৫
অসমাহিত ব্যক্তির আত্মস্বরূপবিষয়িণী শুদ্ধাবুদ্ধি নাই এবং তাহার পরমার্থবিষয়ে অভিনিবেশও হয় নাই । আর পরমার্থ-চিন্তাশূন্য ব্যক্তির বিষয়তৃষ্ণায় বিরতি নাই । এইরূপ বিষয়তৃষ্ণ পুরুষের প্রকৃত সুখ কোথায় ? ৬৬
ঘূর্ণায়মান বায়ু যেমন জলস্থিত নৌকাকে উন্মার্গগামী করে, সেইরূপ স্ব স্ব বিষয়ে ধাবমান ইন্দ্রিয়গণের যেটিকে মন অনুসরণ করে, সেই ইন্দ্রিয়টিই অসংযত ব্যক্তির আত্মানাত্মবিবেকবুদ্ধি হরণ করে ও তাহার মনকে বিষয়াভিমুখী করে । ৬৭
হে মহাবাহো, সেইহেতু যাঁহার ইন্দ্রিয়গণ শব্দাদি বিষয় হইতে সর্বপ্রকারে নিবৃত্ত হইয়াছে, তাঁহার প্রজ্ঞা প্রতিষ্ঠিত অর্থাৎ তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ । ৬৮
সর্বভূতের পক্ষে যাহা রাত্রিস্বরূপ (অজ্ঞাত), সেই ব্রহ্মে স্থিতপ্রজ্ঞ জাগ্রত থাকেন (সর্বদা ব্রহ্মদর্শন করেন) । আর, যে অজ্ঞানরূপ রাত্রিতে ভূতগণ জাগ্রত থাকে (সংসার দর্শন করে) স্থিতপ্রজ্ঞের পক্ষে তাহা রাত্রিস্বরূপ অর্থাৎ তিনি সংসার অনুভব করেন না । ৬৯
যেমন বারিরাশি পরপূর্যমাণ সমুদ্রে প্রবেশ করিলেও উহা স্ফীত হয় না এবং বেলাভূমি লঙ্ঘন না করিয়া অবিকৃত থাকে, সেইরূপ অজ্ঞ ব্যক্তির কাম্য শব্দাদি-বিষয়সমূহ যে ব্রহ্মপ্রতিষ্ঠ পুরুষে প্রবেশ করিয়া বিলীন হয়, অর্থাৎ যাহাকে বিচলিত করিতে পারে না, তিনিই চির শান্তিলাভ করেন । কিন্তু যিনি বিষয় কামনা করেন, তাঁহার পক্ষে শান্তিলাভ অসম্ভব । ৭০
যিনি নিঃশেষরূপে সমস্ত বাসনা পরিত্যাগ করেন, শরীর ও জীবনধারণার্থ প্রয়োজনীয় বিষয়েও ‘মমত্ব’-ভাববর্জিত ও বিদ্যাবত্তাদি অহঙ্কাররহিত হন এবং শরীরে ও জীবনে স্পৃহাশূন্য এবং জীবনধারণমাত্রে চেষ্টাযুক্ত হইয়া পর্যটন করেন, তিনি সকল সংসারদুঃখের নিবৃত্তিরূপ পরম শান্তি (ব্রহ্মনির্বাণ) লাভ করেন অর্থাৎ ব্রহ্মস্বরূপে সুপ্রতিষ্ঠিত হন । ৭১
হে পৃথাপুত্র, এই অবস্থাই ব্রাহ্মী স্থিতি । এই অবস্থা লাভ করিলে আর কেহ মোহগ্রস্ত হন না । অন্তিম সময়েও যিনি এই অবস্থা লাভ করেন, তিনি ব্রহ্মনির্বাণ প্রাপ্ত হন । ৭২
ভগবান্‌ ব্যাসকৃত লক্ষশ্লোকী শ্রীমহাভারতের ভীষ্মপর্বের অন্তর্গত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতারূপ উপনিষদে যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে সাংখ্যযোগ নামক দ্বিতীয় অধ্যায় সমাপ্ত ।

২) ভগবান্‌ = সমগ্র ঐশ্বর্য, বীর্য, যশ, শ্রী, জ্ঞান ও বৈরাগ্য – এই ছয়টি ‘ভগ’ পূর্ণভাবে যাহাতে বিদ্যমান । অথবা যিনি ভূতগনের উৎপত্তি ও বিনাশ, পরলোকে গতি ও ইহলোকে আগমন, বিদ্যা ও অবিদ্যা অবগত আছেন ।

৭) কার্পণ্য, কৃপণ – ‘হে গার্গি, যিনি এই অক্ষর ব্রহ্মকে না জানিয়া ইহলোক হইতে প্রয়াণ করেন, তিনি কৃপণ ।’ – [বৃহদারণ্যক উপঃ, ৩|৮|১০]
স্বধর্মবিষয়ে – যুদ্ধত্যাগপূর্বক ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন ক্ষত্রিয়ের ধর্ম কি অধর্ম – ইহা নির্ধারণে অসমর্থ ।
১৬) সৎ (আত্মা, ব্রহ্ম) সৎই; ইহার কখনও বিনাশ হয় না । কারণ আত্মার সত্তা ত্রিকালাবাধিত, অর্থাৎ অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ – এই তিন কালে অবাধিত, অবিনষ্ট ! ব্রহ্মবস্তুই একমাত্র সৎ । তিনি অবিদ্যার দৃষ্টিতে উৎপত্তি-বিনাশাদি ধর্মবিশিষ্টরূপে বিকল্পিত হন, অর্থাৎ জগৎরূপে বিবর্তিত হন ।

অসৎ (অনাত্মা, আত্মা ব্যতীত অন্য সব কিছুই) অসৎই, অর্থাৎ কখনও সৎ হয় না । কারণ, তাহাদের কোন স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নাই ।

২০) জড়ের বিকার = জন্ম, অস্তিত্ব, বৃদ্ধি, পরিণাম, অপক্ষয় ও বিনাশ

আত্মা এই ষড়্‌বিধ জড় ধর্ম-বর্জিত ।
২৭) আত্মজ্ঞান ব্যতীত পুনর্জন্ম রোধ হয় না
২৯) আশ্চর্য = যাহা অকস্মাৎ দৃষ্ট হয়, যাহা অদ্ভুত ও অদৃষ্ট (যথা – স্বপ্নমায়া, ইন্দ্রজালাদি) – [নীলকণ্ঠ সূরি]
৩৯) সাংখ্য (সংখ্যা) = সম্যক জ্ঞান; ইহার দ্বারা সম্যকরূপে প্রকাশিত হয় পরমাত্মতত্ত্ব
 কর্মযোগ = ফলাকাঙ্ক্ষা পরিত্যাগপূর্বক ঈশ্বরের আরাধনার্থ অনাসক্তভাবে কর্মানুষ্ঠান
৪৪,৫৩) সমাধি/অন্তঃকরণ = পুরুষের উপভোগের জন্য বাসনারূপ সকল বস্তু যাহাতে সমাহিত হয়;
যাঁহাতে চিত্ত সমাহিত হয় অর্থাৎ পরমাত্মা ।
বৈদিক সকাম কর্মের এই নিন্দা নিন্দার জন্য নহে; পরন্তু নিষ্কাম কর্মের প্রশংসার নিমিত্ত ।
৫০) কর্মের কৌশল : কর্মের স্বভাব বন্ধন । কর্মে সমত্ববুদ্ধিরূপ কৌশল অবলম্বন করিলে কর্মের স্বাভাবিক বন্ধনশক্তি নষ্ট হয়, ফলাসক্তি চলিয়া যায় ।
৫৫) মনোগত বাসনা : বাসনা মনেই বাস করে, আত্মাতে নহে ।
স্থিতপ্রজ্ঞ : যখন হৃদয়স্থিত সকল কামনা হইতে মানুষ মুক্ত হয়, তখন সেই মর্ত্য অমর হয় এবং এই দেহেই ব্রহ্মসম্ভোগ করে । – [কঠঃউপঃ, ২|৩|১৪]

৬৫) দুঃখ = মানব জীবনে তিন প্রকার – আধ্যাত্মিক (শোকমোহাদিজনিত মানসিক ও ব্যাধিজনিত শারীরিক), আধিদৈবিক (ঝড়, বৃষ্টি ও অগ্নি আদি নিমিত্ত) ও আধিভৌতিক (সর্প ও বৃশ্চিকাদি দংশনজনিত)

৭২) ব্রহ্মনির্বাণ, ব্রাহ্মী স্থিতি, ব্রহ্মজ্ঞান, সিদ্ধি ও মোক্ষ একার্থবোধক


*Hard Copy Source:

“Srimadbhagabadgeeta” translated by Swami Jagadeeshwarananda, edited by Swami Jagadananda. 27th Edition – January, 1997 (1st Edition – 1941), © President, Sriramkrishna Math, Belur. Published by Swami Satyabrotananda, Udbodhan Office, 1 Udbodhan Lane, Bagbazar, Kolkata-700003. Printed by Rama Art Press, 6/30 Dum Dum Road, Kolkata-700030

Sanskrit Source
English Translation


Disclaimer: This site is not officially related to Ramakrishna Mission & Math. এটি এক অর্বাচীন ভক্তের প্রয়াস মাত্র ।
[Digitised by scanning (if required) and then by typing mostly in Notepad using Unicode Bengali “Siyam Rupali” font and Avro Phonetic Keyboard for transliteration. Uploaded by rk]
Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s