মহালয়া ও পিতৃপক্ষ, অজানা অনেক তথ্য-


maadurga_
শারদীয় দুর্গোৎসবের পূণ্যলগ্ন, শুভ মহালয়া। কল্যাণময়ী জগতজননী দুর্গা দেবীকে মর্ত্যে আসার আমন্ত্রণ জানানোর দিন। মানবকল্যাণ প্রতিষ্ঠায় মহাশক্তির প্রতীক দেবী দুর্গা। মায়ের মতোই আবির্ভাব ও ভূমিকা তার। এ জন্যই তিনি সকলের মা দুর্গা। প্রতিবছর শরৎকালে দুর্গা দেবী মাতা মর্ত্যে আসেন ভক্তদের কল্যাণ সাধন করে শত্রুর বিনাশ ও সৃষ্টিকে পালন করার উদ্দেশ্যে। সঙ্গে নিয়ে আসেন তার সন্তান গণেশ, কার্ত্তিক, লক্ষ্মী আর সরস্বতীকে।
এবারও তার আগমনী বার্তা পৌঁছে গেছে বাঙালির ঘরে ঘরে। দুর্গাপূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব। মঙ্গলবার মহালয়া উদযাপনের মাধ্যমে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। মণ্ডপে মণ্ডপে উচ্চারিত হবে মা দুর্গার আগমনী ধ্বনি। সারাদেশের মণ্ডপগুলোতে পূজা, মন্ত্র ও চণ্ডীপাঠ, মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্বলনের মধ্য দিয়ে মা দুর্গাকে মর্ত্যে আসার আহ্বান জানানো হবে।
রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরসহ অন্যান্য পূজামণ্ডপে মহালয়া উপলক্ষে ভোর থেকেই পূজার্চনাসহ নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অন্য পূজামণ্ডপগুলোতেও ঘট স্থাপন করে ফুল, বেলপাতা, ফলমূল দিয়ে দশভূজা দেবী মাকে আমন্ত্রণ করা হবে। এরপর প্রতিপদে ঘট স্থাপন করে দ্বিতীয়া, তৃতীয়া, চতুর্থা ও পঞ্চমীতেও পূজার আয়োজন থাকবে। তবে মূল পূজা শুরু হবে ষষ্ঠীতে অধিবাস (বোঁধন) ও আমন্ত্রণের মাধ্যমে।
পিতৃপক্ষ
” ওঁ পিতা স্বর্গঃ পিতা ধর্ম পিতা হি পরমন্তপঃ ।।
পিতরি প্রীতিমাপন্নে প্রীয়ন্তে সর্বদেবতাঃ ।।”
পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে পার্বন শ্রাদ্ধ ও তর্পণ করার অনুষ্ঠান বা রীতিই হল পিতৃপক্ষ। এই পক্ষ ষোলোশ্রাদ্ধ, কানাপাত, জিতিয়া মহালয়াপক্ষ নামেও পরিচিত।।এই পক্ষ সূচিত হয় প্রধানতঃ দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতে গণেশ উৎসবের পরবর্তী পূর্ণিমা তিথিতে। শেষ হয় মহালয়া অমাবস্যা তিথিতে। অন্যদিকে, উত্তর ভারত ও নেপালে ভাদ্রের পরিবর্তে আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষকে পিতৃপক্ষ বলা হয়।
জলদানের মাধ্যেমে পিতৃলোকের তৃপ্তিসাধনই হল তর্পণ বিধি।পিতৃপক্ষে ‘পুত্র বিনা মুক্তি নাই’। পুত্র কর্তৃক শ্রাদ্ধানুষ্ঠান সনাতন ধর্মে অবশ্য করণীয় একটি অনুষ্ঠান।
মহালয়া পক্ষ সাধারণত পনেরোটি তিথিতে বিভক্ত। সেগুলি হল, প্রতিপদ, দ্বিতীয়, তৃতীয়া, চতুর্থী, পঞ্চমী,ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী,দশমী, একাদশী, দ্বাদশী, ত্রয়োদশী, চতুর্দশী ও অমাবশ্যা। ধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ী, যে ব্যক্তি তর্পণে ইচ্ছুক হন, তাকে তার পিতার মৃত্যুর তিথিতে তর্পণ করতে হয়।
সর্বপিতৃ অমাবস্যা দিবসে তিথির নিয়মের বাইরে সকল পূর্বপুরুষেরই শ্রাদ্ধ করা হয়।। যারা নির্দিষ্ট দিনে শ্রাদ্ধ করতে ভুলে যান, তারা এই দিন শ্রাদ্ধ করতে পারেন। এই দিন গয়ায় শ্রাদ্ধ করলে তা বিশেষ ফলপ্রসূ হয়। উল্লেখ্য, গয়ায় সমগ্র পিতৃপক্ষ জুড়ে মেলা চলে।। বাংলায় মহালয়ার দিন দুর্গাপূজার সূচনা হয়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিন দেবী দুর্গা মর্ত্যলোকে আবির্ভূতা হন। মহালয়ার দিন অতি প্রত্যুষে চণ্ডীপাঠ করার রীতি রয়েছে।। আশ্বিন শুক্লা প্রতিপদ তিথিতে দৌহিত্র মাতামহের তর্পণ করেন।


তর্পণ বিধি-
শ্রাদ্ধকর্তাকে স্নান করে শুদ্ধ হয়ে ধুতি পরে শ্রাদ্ধ করতে হয়। শ্রাদ্ধের পূর্বে তিনি কুশাঙ্গুরীয় (কুশ ঘাসের আঙটি) ধারণ করেন। এরপর সেই আঙটিতে পূর্বপুরুষদের আবাহন করা হয়। শ্রাদ্ধ খালি গায়ে করতে হয়, কারণ শ্রাদ্ধ চলাকালীন যজ্ঞোপবীতের অবস্থান বারংবার পরিবর্তন করতে হয়। শ্রাদ্ধের সময় সিদ্ধ অন্ন, ময়দা, ঘি ও তিল দিয়ে মাখিয়ে পিণ্ডের আকারে উৎসর্গ করা হয়। একে পিণ্ডদান বলে। এরপর দুর্বাঘাস, শালগ্রাম শিলা বা স্বর্ণমূর্তিতে বিষ্ণু এবং যমের পূজা করা হয়। এরপর পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে খাদ্য প্রদান করা হয়।
এই খাদ্য সাধারণত ছাদে রেখে আসা হয়। যদি কোনও কাক এসে সেই খাদ্য খেয়ে যায়, তাহলে ধরা হয় যে খাদ্য পিতৃগণ কর্তৃক গৃহীত হয়েছে। মনে করা হয়, পাখিটি আসলে যম বা পিতৃগণের আত্মার প্রতিনিধি। গোরু ও কুকুরদেরও খাওয়ানো হয়।অনুষ্ঠান শেষে ব্রাহ্মণদের ফল, পান, সুপারি, গামছা, চাল ও ধূপ দেওয়া হয়। কোথাও কোথাও ব্রাহ্মণদের ভোজনও করানো হয়।
পূর্বপুরুষ (কাকের বেশে) এবং ব্রাহ্মণেরা ভোজন করলেই তবে পরিবারের সদস্যরা অন্নগ্রহণ করেন।।কোনো কোনো পরিবারে পিতৃপক্ষে ভাগবত পুরাণ, ভগবদ্গীতা বা শ্রীশ্রীচণ্ডী পাঠ করা হয়। অনেকে পূর্বপুরুষের মঙ্গল কামনায় ব্রাহ্মণদের দান করেন।পূর্বপুরুষকে যে খাদ্য উৎসর্গ করা হয়, তা সাধারণত রান্না করে রুপো বা তামার পাত্রে কলাপাতার উপর দেওয়া হয়। এই খাদ্যগুলি হল ক্ষীর, লপসি, ভাত, ডাল, গুড় ও কুমড়ো।
মার্কণ্ডেয় পুরাণ গ্রন্থে বলা হয়েছে, পিতৃগণ শ্রাদ্ধে তুষ্ট হলে স্বাস্থ্য, ধন, জ্ঞান ও দীর্ঘায়ু এবং পরিশেষে উত্তরপুরুষকে স্বর্গ ও মোক্ষ প্রদান করেন। পুরাতাত্ত্বিক উষা মেননের মতেও, পিতৃপক্ষ বংশের বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে সম্পর্ককে সুদৃঢ় করে। এই পক্ষে বংশের বর্তমান প্রজন্ম পূর্বপুরুষের নাম স্মরণ করে তাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করে। পিতৃপুরুষের ঋণ হিন্দুধর্মে পিতৃমাতৃঋণ অথবা গুরুঋণের সমান গুরুত্বপূর্ণ।

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s