দুর্গোৎসব এবং কিছু প্রশ্ন


দুর্গোৎসব-প্রশ্ন
বহু বিজ্ঞ জনে দুর্গাপুজার উৎপত্তি অনুসন্ধান করেছেন। কোন কোন ঐতিহাসিক বিজয়া দশমীর শবরোৎসব দেখিয়া মনে করেছেন, কিরাত ও শবর জাতির একটি উৎসব মার্জিত হয়ে দুর্গাপুজায় পরিণত হয়েছে। কেহ নবপত্রিকা দেখিয়া বুঝিয়াছেন, শরৎকালে আশুধান্য সংগ্রহ হয়, দুর্গাপূজা নবান্নের উৎসব। কারো মতে বসন্তাগমে আমরা যেমন বসন্তোৎসব করি, শরৎঋতু দেখিয়া তেমন শরদুৎসব করি। এইরূপ, যিনি দুর্গোৎসবের অঙ্গ দেখেছেন, তিনি অন্ধের মতন হস্তী-দর্শন করেছেন।
কয়েক বৎসর হতে দুর্গাপূজার পূর্বে ভক্ত ও ভাবুক দেবীর পুরাণক্ত মহিমা কীর্তন করতেছেন। কোন কোন পণ্ডিত বৈদিক গ্রন্থে ও পুরাণে দেবীর নামোল্লেখ প্রদর্শন করেন। এতদ্দ্বারাদেবী কল্পনার প্রাচীনতা জানিতে পারছি, কিন্তু দুর্গাপূজা ও উৎসবের উৎপত্তি ও স্বরূপ পাইতেছি না।
বাস্তবিক প্রশ্নটি সোজা নয়, দুর্গাপূজা ও ততসম্পৃক্ত উৎসব, এই দুই অঙ্গের উৎপত্তি ও প্রকৃতি চিন্তা করতে হবে। ইহাদের অনুপূর্বিক ইতিহাস সঙ্কলন দুঃশক্য। কারণ আমাদের অধিকাংশ পূজায় বহুপ্রাচীন স্মৃতি জড়িত আছে। সে প্রাচীন যে কোন্‌ অতীত কালের সাক্ষী, কোন্‌ মানব-চিত্ত-বৃত্তির বাহ্য প্রকাশ, তা বলবার উপায় নেই। কালে কালে দেশে দেশে পূজা-পদ্ধতির পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। পুরাতন অনুষ্ঠান গেছে, নূতন এসেছে, তথাপি নুতনে পুরাতনের চিহ্ন কিছু কিছু রয়ে গেছে। কারণ মানবের স্বভাব এই, নূতন কিছু করতে হলে পুরাতনকে আশ্রয় করে।
দেবীর পূজার উৎপত্তি ও স্বরূপ চিন্তা করতে হলে পূজা প্রকরণ অনুধাবন কর্তব্য। কিন্তু পূর্বকালের পূজা-পদ্ধতি কিছুই জানা নেই। এই সম্বন্ধে কয়েকটি প্রশ্ন উত্থাপন করছি। যথা-
(১) আশ্বিন শুক্ল নবমীতে ষোড়শোপচারে সমারোহে দেবীর পুজাবিহিত, কিন্তু পূজারম্ভের কয়েকটি দিন আছে। তবে অষ্টোমী-নবমীর সন্ধিক্ষণের মাহত্ম্য কেন? ভাদ্র কৃষ্ণ-নবমী, আশ্বিন শুক্ল প্রতিপদ ষষ্ঠী, সপ্তমী ও অষ্টমী হতে পূজা আরম্ভ করা যেতে পারে বিভিন্ন দিনে পূজারম্ভের হেতু কি? কেবল অষ্টমীতে, কেবল নবমীতে পূজা করা যাইতে পারে। এত দিনের মধ্যে সপ্তমী অষ্টমী নবমী মাত্র এই তিন দিন প্রতিমার পূজা হয়। অধিকাংশ গৃহে আশ্বিন শুক্ল প্রতিপদ হতে পূজা আরম্ভ হয়ে থাকে। অবশিষ্ট দিনে জলপূর্ণ ঘটে দেবীর পূজা হয়। জলপূর্ণ ঘট, মুখে আম্র-পল্লব, কিসের দ্যোতোক? ঘটে পটে প্রতিমায় দেবীর পূজা করা যাইতে পারে। যদি ঘটে পূজা সিদ্ধ হয়, প্রতিমার প্রয়োজন থাকে না। ষষ্ঠীর সায়ংকালে বিল্ববৃক্ষমূলে, তদ্ভাবে যুগ্মফলযুক্ত বিল্ব-শাখায় দেবীর বোধন এবং আমন্ত্রণ ও অধিবাস হয়। এর অর্থ কি? তবে কি প্রতিপদ হতে পঞ্চমী পর্যন্ত পূজা বৃথা হইতেছিল? বোধন শব্দের অর্থ কি দেবীকে জাগরিত করা? তিনি কি এত দিন নিদ্রিত ছিলেন? নিদ্রা হইতে পারেন। যিনি সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়-কারিণী জগজ্জনী তাঁহার নিদ্রায় প্রলয় হয়। বোধন সময়ে বিল্ববৃক্ষে পূজা করতে হয়। বিল্ববৃক্ষ অম্বিকার প্রিয়। ইহার কারণ কি? আরও, বিল্ববৃক্ষের সমীপে নবপত্রিকা স্থাপন করিতে হয়। নাম নবপত্রিকা, কিন্তু নয়টি বৃক্ষের পত্র না হয়ে নয়টি বৃক্ষ কিম্বা নয়টি বৃক্ষের শাখা শ্বেত অপরাজিতার লতা দ্বারা বাঁধিয়া স্থাপন করিতে হয়। সে নয়টি বৃক্ষ এই -রম্ভা, কচু, হরিদ্রা, জয়ন্তী, বিল্ব, দাড়িম, অশোক, মান ও ধান্য। নব পত্রিকায় পূজা করেন অতএব মনে হয়, নবপত্রিকা দুর্গার স্বরূপ বা নবদুর্গা। তাহা হইলে প্রতিমার প্রয়োজন কি? নবদুর্গাই বা কি? বিল্বশাখা ও নবপত্রিকা স্থাপনের নিমিত্ত চন্ডীপন্ডপ হতে পৃথক এক স্থানে সূত্র-বেষ্টনদ্বারা এক বস্ত্রগৃহ নির্মিত হয়। ইহারই বা হেতু কি? এই গৃহে অনক্তক সূত্র ও ছুড়িকা রাখা হয়। এ সকলের প্রয়োজন কি? সপ্তমীতে নবপত্রিকা চণ্ডীমণ্ডপে প্রতিমার পার্শ্বে স্থাপিত হয় এবং প্রত্যেক বৃক্ষ পূজিত হয়। নবমীতে পূজার সময় ছাগ বলিদানের পূর্বে (কোথাও)ইক্ষু ও কুমড়া বলি দেওয়া হয়ে থাকে। পশুবলির সহিত এই দুই উদ্ভিদের বলি বিসদৃশ নয় কি?

তন্ত্র শাস্ত্রের অর্থ বিকৃতিতে নরবলির প্রকৃত অর্থ মানুষকে বলি দেওয়া নয় কিন্তু প্রকৃত অর্থ থেকে দূরে সরে গিয়ে বিকৃত করে বলি দেওয়ার কুলশিত রীতিও আমরা প্রাচীন কালের ইতিহাসে পাই যেমন-
কালিকা-পুরাণে নরবলির ব্যবস্থা আছে। সে লোমহর্ষণ ব্যাপার পড়লে আমাদের হৃৎকম্প হয়। কিন্তু দেবীকে প্রসন্ন করবার নিমিত্ত নরবলি শ্রেষ্ঠবলি গণ্য হইত। শত্রুরাজ্যের রাজপুত্রকে পাইলে উত্তম। অভাবে, ব্রাহ্মণ ব্যতীত অপর উচ্চজাতির যুবককে কয়েকদিন উত্তমরূপে ভোজন করাইয়া দেবীর প্রীত্যর্থে বলি দেওয়া হইত। শুধু দুর্গাপূজায় কেন, কাপালিকেরাও নরবলিদ্বারা অভীষ্টলাভের আশা করিত। সেই নরবলির স্মৃতি অদ্যাপি পূর্ববঙ্গে এবং কলিকাতাতেও লক্ষিত হতেছে। কোথাও পিটালীর, কোঠাও ঘণীভূত ক্ষীরের, কোথাও ময়দার নশশিশু নির্মাণ করে বলি দেওয়া হয়। ইহার নাম শত্রুবলি।*
পূর্ববঙ্গে দুর্গাপূজায় সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, এই তিন দিন ছাগ, মহিষ, ইক্ষু, কুষ্মাণ্ড ইত্যাদি বলি দেওয়া হয়। নবমীর দিন ১০/২০ ইঞ্জি লম্বা পিটালীর নরমূর্তি নির্মাণ করে মানকচুর পাতায় মুড়ে হাড়িকাঠে চাপাইয়া বলি দেয়া হয়। এই নরমূর্তির বলির নাম শত্রুবলী।

বলি অর্থ ত্যাগ বা নিজের পশুত্ব কে ভগবানে উৎসর্গ করা। মানুষের খারাপ বা আসুরিক কামনা, বাসনা, ক্রোধ, লালসা প্রভৃতি বৃত্তিগুলিকে উৎসর্গ করা।
বলি-শব্দ এসেছে বল-ধাতু থেকে , মানে বর্দ্ধন। তাই, ”মায়ের পূজায় যে বলি হয় তার মানে বেড়ে ওঠা। নিজের ভিতরকার আসুরিক শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে শুভ শক্তিতে বলিয়ান হয়ে উঠাই।

কলিকাতার এক ধনাঢ্য বৈষ্ণব কায়স্থ গৃহে পশুবলি দেওয়া হয় না, কিন্তু ক্ষীরের শত্রুবলি দেওয়া হয়। বলিপ্রদত্ত নরের মাংস মহামাংস। দেবী মহামাংসে ও সুরায় সম্যক্‌ প্রীত হন। লোকে জানে না, কুষ্মাণ্ড নরবলির পরিবর্ত। এই কারণে পূর্ব্বঙ্গে বিধবারা কুষ্মাণ্ড ভক্ষণ করেন না। ইক্ষু হতে গুড় এবং গুড় হতে গৌড়ী মদ্য হয়। ইক্ষু সুরার প্রতীক।
কুমারীপূজা দুর্গাপূজার এক বিশেষ অঙ্গ। কুমারীপূজার হেতু কি? ইত্যাদি নানা প্রশ্ন উদিত হয়।
উৎসব সম্বন্ধেও প্রশ্ন আছে। দুর্গাপূজার পূর্বে পথ-ঘাট গৃহ পরিষ্কার, চণ্ডীমণ্ডপে বনমালা লম্বিত, মণ্ডপের দুই পাশে কলাগাছ রোপন করা হোত। পুরাকালে ধ্বজা উত্তোলন করা হইত। বহুকালে হতে আর হয় না। নববস্ত্র পরিধান উৎসবের এক প্রধান অঙ্গ। আমরা লক্ষ্মী-সরস্বতী পূজা করি, কিন্তু তদুপলক্ষ্যে নববস্ত্র পরিধানের রীতি নেই। স্থানবিশেষে শ্যামাপূজার সময় ও বিষ্ণুর দোলযাত্রার সময় নববস্ত্র পরিধানের বিধি আছে। দশমী তিথিতে দেবীর বিসর্জনের পর নদীতে কিম্বা তড়াগে দেবীর প্রতিমা, বিল্বশাখা ও নবপত্রিকা নিক্ষিপ্ত হয়। তখন জল ও কাঁদা পরস্পরের গাত্রে নিক্ষেপ করে কাদাখেলা হয়। আর, সে সময়ে অশ্রাব্য অকথ্য ভাষা প্রয়োগদ্বারা শবরোৎসব করতেন। ইহা উৎসবের এক অঙ্গ নির্দিষ্ট হয়েছে। দক্ষিণ রাঢ়ে(গঙ্গার তীরবর্তী রাঢ় অঞ্চল) জল-কাঁদা নিক্ষেপ ও খেলা-কৌতুক আছে, কিন্তু অশ্লীল ভাষা প্রয়োগ কখনও শুনা যায়নি। বোধহয় পূর্বকালে প্রচলিত ছিল। শবরখেলার পর গৃহে এসে গুরুজনকে প্রণাম, বন্ধুজনের পরস্পরের কুশল-সম্ভাশন ও সকলের সিদ্ধিপানের ব্যবস্থা আছে। এখানে জিজ্ঞাসা, অন্য দেবীর পূজায় শবরোৎসব হয় না, সিদ্ধি পানও হয় না। দুর্গোৎসবে হয় কেন? দশমীতে দেশীয় রাজ্যে নীরাজন হয়। যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্র মার্জন, তেল লেপন, অশ্ব-গজাদির গাত্র ধৌত, অলঙ্কৃত, পদাতি রণ-সজ্জায় ভূষিত হয়। মন্ত্রদ্বারা তাহাদের পূজা হয়। অপরাহ্নে রাজা কিম্বা সেনাপতি যুদ্ধযাত্রা করেন। সে দিন যাত্রা করে থাকলে পরে আবশ্যক কালের যুদ্ধে জয়লাভ হয়।

সিংহ-বাহিনী মহিষাসুরমর্দিনী রণচণ্ডী রূপে দশভুজার পূজা হয়। প্রতিমায় যে বীর ও রৌদ্র রস প্রকটিত হয়, তা বঙ্গদেশে বাৎসল্য রসে পরিণত হয়েছে। কবে হতে এবং কেন চণ্ডী শিবের ঘরণী হলেন, বঙ্গের ইতিহাসবেত্তারা অনুসন্ধান করেছিলেন কিনা জানি না। যজমান গৃহী ও গৃহিণী মনে করেন, পার্বতী উমা পিতৃগৃহে তিন দিনের জন্য আসছেন। তিন দিন থেকে কন্যা শ্বশুর-গৃহে পত্যাবর্তন করেন। গৃহিণী কন্যাকে নির্মঞ্চন করেন।*
তাঁহার চক্ষু ছল ছল করতে থাকে, আর বলেন, মা, আসছে বছর আবার এসো। পঞ্জিকাতে দুর্গা প্রতিমার চিত্রে শিবের অনুচর নন্দীকে বিদায়কালীন উপহার সামগ্রী বাঁধতে দেখা যায়। এসব কোথা হতে কবে আসল?
(লোকে বলে বরণ। কিন্তু বিসর্জনকালে বরণ হতে পারে না। প্রাচীন সাহিত্যে “নিছিয়া ফেলিল পান” সেই কর্ম। আমান্ন(চাউল) ভোজ্য(তেল) তাম্বুল(পান) প্রভৃতি দেবী-প্রতিমার সম্মুখে ধরিয়া প্রতিমার পশ্চাতে নিক্ষিপ্ত হয়। স মঞ্চ ধাতু পুজায়। কেহ কেহ নির্মঞ্চন বলেন। কিন্তু মঞ্চ ধাতু আছে কি?)
মহাভারতের বিরাট পর্বে ও ভীষ্ম পর্বে, দুই স্থানে দুর্গার স্তব আছে। মহাভারতে এই দুই স্তব প্রক্ষিপ্ত বিবেচিত হয়। প্রক্ষিপ্ত হোক, অন্ততঃ দুই সহস্র বৎসরের পুরাতন। সেই দুই স্তব পাঠ করলে আরও অনেক প্রশ্ন উদিত হয়। কিছু কিছু তুলে ধরছি। যথা- বিরাট পর্বের ৬এর অধ্যায়ে যুধিষ্ঠির বলছেন, “হে যশোদা নন্দিনি, নারায়ণ-প্রণয়িনি, কংসবধ্বংসকারিণি কৃষ্ণে, হে বালার্কসদৃশে চতুর্বক্ত্রে! বিন্ধাচল আপনার শাশ্বত বাসস্থান।” দুর্গা যশোদা-র্ভসম্ভূতা, ইহা মার্কণ্ডেয় পুরাণে ও অন্য পুরাণেও আছে। ইনি কংসাসুর বধ করেছিলেন? দুর্গার এক নাম বিন্ধ্যবাসিনী কেন হইল? কিন্তু সেখানেই আছে, কংস তাঁহাকে শিলাতলে নিক্ষেপ করতে উদ্যত হলে তিনি আকাশপথে গমন করেছিলেন। ভীষ্ম পর্বে ২৩-এর অধ্যায়ে অর্জুন বাসুদেবের বাক্যানুসারে স্তব করছেন, হে গোপেন্দ্রানুজে, নন্দগোপকুলসম্ভবে, কোকন্মুখে! তুমি জম্বু,কটক ও চৈত্যবৃক্ষের সন্নিধানে নিরন্তর অবস্থান কর। হে কান্তারবাসিনি, তোমার প্রসাদে রণক্ষেত্রে আমরা যেন জয়লাভ করতে সমর্থ হই।” দুর্গা চতুর্মূখা। ব্রহ্মা চতুর্মুখা। কারণ চারি বেদ তাঁহার মুখ-কমল হতে নির্গত হয়েছে। মহেশ্বর মহাকাল, চতুর্যুগ নিরীক্ষণ করেন। দুর্গা কালী, তাঁহারও চতুর্মুখ হতে পারে। কিন্তু এমন প্রতিমা দেখিতে পাই না। দুর্গা কোকমুখে(কোক, বন্য কুকুর) দুর্গার মুখে কুকুরের তুল্য। শিবা শব্দে দুর্গা ও শৃগালী বুঝায়। ইহার কারণ কি? তিনি থাকেন কোথায়? কান্তারে জম্বু, কটক ও চৈত্যবৃক্ষ ্সন্নিধানে। জম্বুগাছ জামগাছ, কটক-কতক, অরিষ্ট-নির্মলী ফলের গাছ। বৈত্যবৃক্ষ অশ্বত্থ বোধ হয়। দুর্গা ও কালী স্বরুপতঃ একই। বঙ্গদেশে অনেক স্থানে শ্বশান-কালীর মন্দির দেখতে পাওয়া যায়। অনেক স্থানে মন্দিরে মূর্তি নেই, নষ্ট হয়ে গেছে, কিন্তু শ্বশানকালী নাম আছে। বোধ হয় কান্তারে ঐ সকল বৃক্ষের সমীপস্থকালী পরে শ্মশান-কালী নাম পেয়েছেন। বাঁকুরা রাইপুরে দুর্গার কোকমুখে পাষাণময়ী মূর্তি পূজিত হইতেছে। পূর্বে এক বৃক্ষমূলে ছিল, এক্ষণে এক মন্দিরে স্থপিত হয়েছে। কোন প্রদেশে এই দুর্গা স্তব রচিত হয়েছিল তা বুঝবার উপায় নেই। মহাভারতে বনপর্বে ২২৯-এর অধ্যায়ে আরও আশ্চর্য কথা আছে। দুর্গা মহিষাসুরবধ করেন নাই, কার্ত্তিকেয় করেছিলেন।
এইরূপ বিরোধের মীমাংসা করতে গিয়ে পুরাণ-কারেরা বলেন কল্পান্তরে দেবী নানা মূর্তি ধারণ করে নানা অসুর বধ করেছিলেন। কিন্তু কল্পান্তর সামান্য কথা নয়। ব্রহ্মার এক দিনের নাম কল্প। ব্রহ্মার সৃষ্টি যত কাল থাকে তত কাল। এক সৃষ্টি লয় পাইলে আর এক সৃষ্টি আরম্ভ হলে কলাল্পান্তর বলা যায়। আমরা দি চারি শত বর্ষের কথা স্মরণ রাখতে পারি না। কল্পান্তরে কি হয়েছিল সে জানতে পারে? বোধ হয় ভিন্ন চিন্ন দূরবর্তী প্রদেশে দুর্গার কীর্তি সম্বন্ধে যে সকল কাহিনী প্রচলিত ছিল পুরাণ-কারেরা সেসকল বুদ্ধি ও কল্পনাবলে লিখে গেছেন। পরে স্মার্ত ভট্ট্যাচার্য্যের পুজা-পদ্ধতিও দুর্গামাহাত্ম্যের মধ্যে নিবিষ্ট করেছিলেন।
কালী ও দুর্গা পূজায় জাতিবর্ণনির্বিশেষে সকলেরই অধিকার আছে। শাস্ত্রকারেরা দেবী পূজায় এই অধিকার দিয়েছেন, একথা বলতে পারা যায় না। সঙ্কটকালে ও যুদ্ধোদ্যমে দেবীর আশির্ব্বাদ প্রার্থনা সকলেই করতে পারে ও করে থাকে। অধিক কালের কথা নয় ডাকাতেরা কাটারীতে কালীপূজা করে ডাকাতি করতে বাহির হোত।
ভারতের পূর্বোত্তর অংশে আসামে ও বঙ্গদেশে এবং দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে কেরলে একই দেবীর পূজায় প্রায় একই প্রকার উৎসব হয়ে থাকে। কিন্তু আসাম বিহার ও বঙ্গ ব্যতীত আর কুত্রাপি মৃন্ময়ী দশভুজার পূজা হয় না। ইহারই বা হেতু কি?
দুর্গাপূজার পদ্ধতিতে অনেক দেশাচার বিধিবদ্ধ হয়েছে। রঘুনন্দন ভট্টাচার্য্য দুর্গাপুজাতত্ত্ব ও দুর্গোৎসবতত্ত্ব লিখেছেন। তিনি চারশত বৎসর ৪৬৫ ছিলেন। তিনি কোন কোন বিধানের পৌরাণিক প্রমাণ তুলতে পারেননি। সে সে স্থলে ইহার আচার বলেছেন। দেশাচারের উৎপত্তি নির্ণয় দুঃসাধ্য। দেশাচার ব্যতীত কুলাচার আছে। প্রসিদ্ধ পুরোহিত-বংশের এক এক দুর্গাপূজার পদ্ধতির পুথী আছে। তদনুসারে পুরোহিত যজমানের দুর্গাপূজা করে থাকেন। সপ্তমীতে পশুবলির বিধান নেই। কিন্তু কোন কোন বাড়িতে ছাগবলি হয়ে থাকে। বাঁকুড়া বিষ্ণুপুরের মল্লরাজারা বৈষ্ণব ধর্ম এত প্রচলিত করেছিলেন যে দুর্গাপূজায় পশুবলি উঠে গিয়েছিল। এক কায়স্থ জমিদার-বাড়িতে বস্ত্রাচ্ছাদিত নবপত্রিকার উপর একটি মৃন্ময় নারীমুণ্ড বদ্ধ হয়, এবং নবপত্রিকা দুর্গারূপে পূজিত হয়, পশুবলি হয় না। কিন্তু অন্ন ও মাগুর মাছের ঝোল ভোগ দেওয়া হয়। বিষ্ণূপুরের এক ভট্টাচার্য্যের বাড়িতে দুর্গাপূজা হয়। ধাতুনির্মিত দশভুজা প্রতিমা আছে। তদুপরি একটি মৃন্ময় নারীমুণ্ড স্থাপিত হয়, প্রতিমা বস্ত্রাচ্ছাদিত থাকে। ইহার নাম মুণ্ডপূজা। পশুবলি নাই কিন্তু বিসর্জনের সময় পান্তা-ভাত ও পোড়া চেং মাছ জামিরের রস ও নুন মাখিয়া ভোগ দেওয়া হয়। কন্যা পতি-গৃহে যাইতেছেন, অন্ন ভোজন করে যাইবার রীতি নাই, তিনি দই ও মুড়কির ফলার করিয়া যান। এইরূপ নানা স্থানে নানাবিধ কুলাচার পূজার অঙ্গ হয়ে গেছে।

প্রতিমা-নির্মাণেও দেশাচার প্রবল হয়েছেল রাঢদেশে সূত্রধর প্রতিমা-নির্মাণ করে। কারণ সুত্রধর সেকালে ইঞ্জিনিয়ার। প্রতিমা-নির্মাণে মাপ-জোখের বিশেষ প্রয়োজন আছে। কলিকাতা ও পূর্ব্বঙ্গে কুম্ভকার এবং পূর্বদিক মৈমনসিংহ ও ত্রিপুরায় গ্রহাচার্য প্রতিমা-নির্মাণ করে। প্রতিমা-নির্মাণ শিল্পকর্ম। বিশ্বকর্মার পূজা না করলে শিল্পকর্মে অধিকার জন্মে না। শাস্ত্রজ্ঞান, কর্মাভ্যাস ও ধ্যান, এই তিনের যোগে প্রতিমা-নির্মাণ সার্থক হয়।
বঙ্গদেশে মৃন্ময়ী দশভূজার পূজা অধিক পুরাতন মনে হয় না। যাঁহারা এ বিষয়ে অনুসন্ধান করেছেন, তাঁহারা শূলপাণি কৃত “দুর্গোৎসব বিবেক” নাম উল্লেখ করিয়া থাকেন। শূলপাণি বঙ্গীয় নিবন্ধকার ছিলেন। তিনি চতুর্দশ খ্রীষ্ট-শতাব্দে ছিলেন। মিথিলার কবি বিদ্যাপতি কতিপয় “দুর্গাভক্তি তরঙ্গিনী” লিখেছিলেন। তিনিও এই শতাব্দে ছিলেন। ইহাদের পূর্বে বঙ্গীয় ভবদেব ভট্ট দুর্গার মৃন্ময়ী মূর্তি পূজার ব্যবস্থা দিয়াছেন। তিনি একাদশ খ্রীষ্ট-শতাব্দে ছিলেন। তিনি কতিপয় পূর্ববর্তী স্মৃতি-কারের নাম উল্লেখ করেছেন। দুর্গার প্রতিমা পূজার লিখিত নিদর্শন দশম খ্রীষ্ট-শতাব্দের সেদিকে পাওয়া যায়নি। এই পূজা কোথা হতে আসল?
নিবন্ধ থাকলেও দুর্গাপূজা অধিক প্রচলিত ছিল না। লোকবল ও ধনবল না থাকলে এই পূজা সম্পন্ন হতে পারত না। এর পরিবর্তে লোক মঙ্গল-চণ্ডীর পূজা করত। এই পূজা আট দিনে সম্পন্ন হইত।
প্রায় শত বৎসর পূর্বে রাঢ়দেশে(গঙ্গা পাড়ের অঞ্চল) অনেক বাড়িতে দুর্গোৎসব হইত। বর্তমানে তা আর এক আনা মাত্র আছে কিনা সন্দেহ। শরৎঋতু যমদংষ্ট্রা, লক্ষ্মীও চঞ্চলা। মেলেরিয়ায় ও কালদোষে যাবতীয় উৎসব শ্রীহীন ও লুপ্তপায় হয়েছে। বাঙ্গালীর জীবন-যাত্রায় কত ব্রত, কত পূজা, কত পড়ব ছিল তাহা পঞ্জিকা দেখলে বুঝতে পারা যায়। প্রত্যেকটিতেই অস্ফুট আশঙ্কা ও বিমল তৃপ্তি মিলিত হয়ে জীবন মধুময় ও উপভোগ্য হইত।

শারদোৎসব পূর্বকালের সে ভক্তি সে আনন্দ সে ‘দীয়তাং ভূজ্যতাম্’ ধ্বনি আর নেই। ‘গিরি হে, গৌরী আমার এসেছিল”, এই হৃদয়স্পর্শী গানও এখন পূজার মণ্ডপে বাজে না। এখন যাঁহারা পূজা করছে, তাদের নিকট পূজা এখন আরম্বর মাত্র, অর্থ ক্ষমতার প্রভাব আর কুলশতা মাত্র। পিতৃপুরুষের অনুষ্ঠিত ব্রত অনেকেই মহানবমীতে ঘটে পূজা করে নিয়ম রক্ষা করতেছেন।
বিগত কয়েক বৎসর হতে নগরে নগরে সর্বজনীন দুর্গাপূজা হচ্ছে। সে কালে যাকে বারোয়ারী বলা হইত এখন তাহা সর্ব্বজনীন নাম পেয়েছে। কারণ বার শব্দ সংস্কৃত। ইহার অর্থ ‘সমূহ’। সমূহ মিলিয়া যে পূজা, তাহা বার-আরী, বারোয়ারী পূজা। বারোয়ারী কালীপূজা প্রচলিত ছিল। গ্রামস্থ সকলে মিলিয়া কালীপূজা করত। বিশেষতঃ মহামারী হলে গ্রামস্থ সকলে মিলিয়া রক্ষাকালীর পূজা করত। সর্বজনীন হোক, বারোয়ারী হোক, কবি বলেছেন, “শক্তিপূজা মুখের কথা নয়”
এখনকার যুবক-যুবতীরা দেবদেবীর পূজার অর্থ বুঝতে পারে না। কেহ কেহ মনে করে কুসংস্কার। অনেকে পূজা শব্দের অর্থ ও জানে না। মনে পুষ্প নৈবদ্য না দিলে পূজা হয় না।
রাষ্ট্রপতি, প্রধান মন্ত্রী, মন্ত্রী বা অন্য কোন দেশের অতিথি দেশে আসবার পূর্বে পথ পরিস্কার করা ও জলসিক্ত, পথের দুই পার্শ্বে বনমালা লম্বিত, স্থানে স্থানে তোরণ নির্মিত, সভামণ্ডপ সুসজ্জিত হয়। আগমণ কালে তূর্যধ্বনি হয়, মাইকে আগমণ ঘোষনা করে। তিনি সভামণ্ডলে প্রবেশ করলে সমবেত ভদ্রমণ্ডলী দন্ডায়মান হয়ে তাহার স্তব করে, তাহার গুণ ও কর্ম কীর্তন করেন। ইংরেজীতে বলি addrees পাঠ করেন। স্তবের শেষে বর প্রার্থনা করেন। যেমন, আমাদের জল কষ্ট হচ্ছে বিশুদ্ধ জলের ব্যবস্থা করুন, আমরা সড়ক, বিদ্যুৎ, চিকিৎসা ইত্যাদির সুবিধা চেয়ে আবেদন করি। আমরা গুরুজনের পূজা করি, বন্ধুর পূজা করি। আচরণ দ্বারা প্রসন্ন করে গুরুজনের আশির্বাদ, বন্ধুজনের সহৃদয়তা কামনা করি। যাহা হতে উপকার আশাকরি, তাহা আমাদের পূজার্হ। আমরা গাভীর পূজা করি। গাভীর দ্বারা আমাদের কি উপকার হয়, তাহা স্মরণ করি। গৃহের অঙ্গনে তুলসী গাছ পালন করি, দেখিলে হরি স্মরণ হয়। ইহার মধ্যে কু কোথায়? বর্ষে বর্ষে এক নিদির্ষ্ট দিনে বিভিন্ন মহাত্মাদের পূজা হয়। তাহার চিত্র পুষ্পমাল্য বেষ্টিত হয়ে উচ্চ মঞ্চে স্থাপিত হয়। ভক্তেরা তাহার স্তব করেন। কেহ কি চিত্রের পূজা করেন? তবে চিত্র কেন? পুষ্পমাল্য কেন? দিন নির্দিষ্ট কেন?

দুর্গাপূজা জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইহার কল্পান্তর ও আনুষঙ্গিক অসংলগ্ন অঙ্গ দেখলে মনে হয়, এই পূজা একদেশে প্রবর্তিত ও বর্ধিত হয় নাই। নানা দেশের প্রচলিত বিধি ও আচার যুক্ত হয়েছে। ঐতিহাসিকেরা এই সকল আগন্তুক অনুষ্ঠান দেখে উৎপত্তি চিন্তা করেছেন। কেবল শাখা-পল্লব দেখলে এইরূপ ভ্রম অবশ্যম্ভাবী। আমি ছয়টি প্রকরণে মূল হতে শাখা অনুসন্ধান করতে যাচ্ছি।

ক্রমশঃ-

সুত্রঃ- পূজা-পার্বণ- আচার্য্য যোগেশ চন্দ্র রায় বিদ্যানিধি।

সংকলনে- কৃষ্ণকমল।

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s