শারদোৎসব এর উৎস (আচার্য্য যোগেশচন্দ্রের পুজা-পার্বণ গ্রন্থ থেকে)


durga_puja

শারদোৎসব এর উৎস

সুপ্রাচীনকালে সকলের পক্ষে দুর্গাপুজা করা সম্ভব ছিল না, করতে পারত না। এখনো করে না বা পারে না। তবুও সমাজের সকলের অন্তরে উৎসবের হিল্লোল অনুভব করে। প্রবাসী ঘরে ফিরবার জন্য ছট্‌ফট্‌ করতে থাকে। চাকরীজীবিরা দিন গুনেন আর পরিবাবারের সবার জন্য পরিধেয় ক্রয়ে ফর্দ তৈরি করেন। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা বাড়ী ফিরবার জন্য ব্যাকুল হয়। মা ছেলে-মেয়েকে অনেক দিন দেখে না; কবে আসবে, কবে আসতে পারবে, পুনঃ পুনঃ জিজ্ঞাসা করে। এই সেকালে ও এমন ছিল যোগাযোগের মাধ্যম উন্নত হবার কারনে কিছুটা পরিবর্তন বা এই ভাব একালে ও আছে। 

ঘরদ্বার, পথঘাট, তৈজসপত্র পরিষ্কার করা হয়। কেউ দ্বারে ও উঠানে আলপনা আঁকেন। কন্যা, জামাই নাতি-নাতিন সহ শশুর বাড়ি হতে আসে। প্রত্যকে বাড়িতেই যেন ছোটখাট উৎসব আরম্ভ হয়। গৃহস্থ কার আগমনে প্রতীক্ষা করে? কাহার অভ্যররথনার নিমিত্ত সাজসজ্জা করে? সে জানে না, কাহার জন্য।
এ কি শরতের আহ্বান? নভোমণ্ডল আ-নীল নির্মল। কদচিৎ অতি-উচ্চে পাংশবর্ণ মেঘ কার্পাস তুলার ন্যায় দৃষ্ট হয়। কিন্তু পবন নাই, অভ্রের সঞ্চরণও নাই। অন্তরীক্ষ রাজোনির্মুক্ত। অন্ধকার রাত্রে তারকাসকল হীরকবৎ দীপ্তি পাইতে থাকে। কবির নিকট শরতের চন্দ্র সৌন্দর্যের এক বিখ্যাত উপমা। নদী-জল প্রায় নির্মল হইয়াছে। শরোবরে শ্বেতকমল শোভা পাইতেছে। পথের কর্দম শুকাইয়া আসিতেছে। কিন্তু প্রকৃতি নীরব, নিস্তব্ধ, শান্ত, স্নিগ্ধ; ইহার উদ্দীপনা নাই।
তবে কাহার আহ্বানে ঘরদ্বার ভূষিত হয়েছে, আত্মীয়-স্বজন মিলিত হয়েছে? গৃহস্থ কাহার আগমনে প্রতীক্ষা করছে? সে জানে না, শরৎ ঋতুর; জানে না, নববর্ষের আহ্বান অন্তরে অনুভব করে।
আগমনীর উৎপত্তি চিন্তা করতেছি। ঋগ্‌বেদের ঋষিগণ রবির উত্তরায়ণ হতে বৎসর আরম্ভ করিতেন। হিম অর্থাৎ শীত ঋতুতে আরম্ভ, কারণ তাঁহারা ‘হিম’ শব্দে বৎসর বুঝতেন। শত হিম বললে শত বৎসর বুঝাতো। খ্রীষ্টান জাতি শীত ঋতু হতে বৎসর গণনা আরম্ভ করে। ২২শে ডিসেম্বর উত্তরায়ণ, ২৩শে ডিসেম্বর হতে নতুন বর্ষ আরম্ভ হওয়া উচিত, কিন্তু ভ্রমে ১লা জানুয়ারি হতে আরম্ভ করে। এইরূপ, বেদের ঋষিগণও হিম ঋতু হতে বৎসর গণিতেন। কতকাল পরে কে জানে, তাঁহারা শরৎ ঋতু হতেও আর এক বৎসর গণতে আরম্ভ করেন। এই বৎসরের নাম শরৎ। শতং শরদঃ জীবতু, শত শরৎ বাঁচিয়া থাক, এইরূপ আশীবর্চন ছিল। ইহা আজও শুনতে পাই আমরা সে দুই বৎসরই গণিয়া আসতেছি, কিন্তু জানি না। আমরা ১লা বৈশাখ কেন বৎসর ধরি, কিন্তু এই রীতি বেশী দিনের নয় মাত্র ১৬৯৯ বৎসর পূর্বে, ২৪১ শকে, ইং ৩৮৯ সালে এর আরম্ভ হয়েছে; তাও ভারতভূমির সর্বত্র নয়। তখন হতেই আমাদের বর্তমান পঞ্জিকার গণনা চলতেছে। সে সময় চৈত্র-বৈশাখ বসন্ত ও আশ্বিন কার্ত্তিক শরৎ, এইরূপ হতো। এখন ঠিক তা হয় না, না হলে সেই পঞ্জিকা মেনেই আমরা চলেছি।

সূর্যের উত্তরায়ণ দেখে হিম ঋতুর আরম্ভ বুঝতে পারা যায় কিন্তু শরৎ ঋতু বুঝবার কোন উপায় নেই। ঋষিগণ হিম ঋতু হতেই মাস গণনা করে শরৎ ঋতুর আরম্ভ বুঝিতেন। মাস চাদ্র মাস; পুর্ণিমা হতে পূর্ণিমা, অথবা অমাবস্যা হতে অমাবস্যা। কোন নক্ষত্র হতে সেই নক্ষত্রে ফিরে আসতে সূর্যের ৩৬৫ বার উদয় হয়, আরও কিছু সময়ও লাগে। ভাঙ্গা দিনের পরিবর্তে আর্যেরা বৎসরে ৩৬৬দিন গণনা করতেন, সে সময়ে বারটি পূর্ণিমা হয়ে বার দিন বাড়ে। অতএব বার চাদ্র মাসে বার দিন যোগ করলে বৎসর পাওয়া যায়। দুই মাসে এক ঋতু শীত, বসন্ত, গ্রীষ্ম, বর্ষা- এই চারি ঋতুতে ৮ চান্দ্র মাস ও অতিরিক্ত ৮ দিন(তিথি) অন্তে শরৎ ঋতুর প্রবেশ হয়। ইহার প্রমাণ আছে(যাহারা জ্যোতিষ শাস্ত্র বুঝেন তাহারা বুঝাতে পারবেন)।
বৈদিক যজ্ঞের দিন-নির্ণয়ের নিমিত্ত কয়েকটি সূত্র প্রণীত হয়েছিল, সেসকল সূত্র এখনও আছে, নাম বেদাঙ্গ-জ্যোতিষ। খৃষ্ট-পূ চতুর্দশ শতাব্দে এই সকল সূত্র রচিত হয়েছিল। তাতে আছে, পৌষ অমাবস্যা উত্তরায়ণ। অতএব অদবধি আট মাস আট তিথি গতে আশ্বিন শুক্লাষ্টমী গতে নবমীতে শরৎ-প্রবেশ হতো। বর্ষা ও শরতের সন্ধিক্ষণেই দূর্গা পূজার সন্ধিক্ষণ। এই কারনেই দুর্গাপূজায় সন্ধিক্ষণের মাহাত্ম্য কিন্তু এই গণনা স্থূল; সূক্ষ্ম গণনায় আমাদের বর্তমান পঞ্জিকাতে নবমীতে নয়, দশমীতে শরৎ-প্রবেশ হয় এবং সেই বিধি অনুসারে দশমীতে বিজয়া হয়। সে দিন বিজয়োৎসব। সেই উৎসবের জন্য ববৎসরের নবসূর্যকে অভ্যর্থনা করবার জন্যই আমরা গৃহদ্বার মাজি ও সজ্জিত করি, নিজদেহ নববস্ত্রে শোভিত করি। সুখে দুঃখে এ বৎসর অতীত হয়েছে, নব বৎসরে আমাদের বিজয় হউক, আমাদের মনস্কামনা সিদ্ধ হোক। এই নিমিত্ত আমরা জজ্জননীর পূজা করি; আর, গুরুজনের আশীর্বাদ প্রার্থনা করি, আত্মীয়-স্বজনের কুশল কামনা করি, তাদের নিয়ে উত্তম দ্রব্য ভোজন করি। এই বিজয়-কামনা হেতু এই দশমীর নাম বিজয়া-দশমী হয়েছে। সেদিন আনন্দে কাটিলে সারা বৎসর আনন্দে কাটে।

এখানে ‘দশ-হরা’ ‘গর্বানৃত্য’ উৎসবের কিছু তথ্য জানতে পারবেন।
বঙ্গদেশে(বর্তমান বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিম বঙ্গ), আসামে ও বিহারের কিছু অংশে দুর্গাপূজা হয়। ভারতের অন্যত্র লোকে নবরাত্র ব্রত করে। পরদিন দশরাত্রি, সংক্ষেপে দশ-রা। সে সে প্রদেশের লোকে ‘দশহরা পড়ব’ বলে(দশহরা নয়)। ‘দশরা’তে নববর্ষের প্রথম রবির উদয় হবে। এইজন্যই উৎসব বা আনন্দ-প্রকাশ।
কাঠিয়াবাড় ও গূজরাত প্রদেশের নারীরা এই নবসূর্য্যের উদয় সম্ভাবনায় আনন্দে নৃত্যগীত করে। সে দেশে পূরনারীরা নৃত্যগীত দুষ্যনয়। তারা একটি শতচ্ছিদ্র শ্বতরঞ্জিত হাঁড়ির মধ্যে প্রজ্বলিত দীপ রাখে ও সেই হাঁড়ি বেষ্টন করে নৃত্য-গীত করে। বর্ষীয়সী নারী সে হাঁড়ি মাথায় নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় দেখায় ও গান গেয়ে বেড়ায়। এই নৃত্যগীতের নাম ‘গর্বা’। সংস্কৃত ‘গর্ভ’ শব্দের অপভ্রংশ মনে করা হয়। ছিদ্রপথে দীপের রশ্মি বহির্গত হয়। হাঁড়িটিকে সূর্যের প্রতিরূপক, ইহাই গর্ভ। নবরাত্রি গতে এই গর্ভের জন্ম হয়।
কিন্তু আমাদের সকলের এত তথ্য জানা নেই। ‘দশ-রা’ কেন আনন্দের দিন, তাহারও কারণ পায় না। মনে করে, রামরাবণের যুদ্ধ হয়েছিল, নবমীতে রাবণ রণক্ষেত্রে পতিত হয়, লঙ্কা জয় করিয়া রামচন্দ্র দশমীতে অযোধ্যা-যাত্রা করেছিলেন। তাঁহার বিজয়ে আমাদের সকলের বিজয় হয়। নবরাত্র ব্রতের দেশের লোকে রামলীলার অভিনয় করে হর্ষধ্বনি করে। কিন্তু এই ব্যাখ্যাটি ঠিক নয়। অথবা উক্ত অঞ্চলে ‘শ্রীরাম’ সর্বাধিক উপাস্য এই কারণে শ্রীরামলীলা কথা এখানে সংযোজন!
শরৎকালে রামরাবণের যুদ্ধ হয় নাই, কুরুপাণ্ডবের যুদ্ধও হয় নাই। কোন বড় যুদ্ধ শরৎকালে হোত না, হতে পারত না (তখনকার দিনে এমন নিয়ম ছিল) হেমন্ত যুদ্ধের কাল। শরতে যুদ্ধ বাল্মীকির রামায়ণে নেই, ব্যাসদেবের মহাভারতেও নেই।

শারদোৎসব অল্প দিনের নয়, সাড়ে ছয় হাজার বৎস ধরে এই উৎসব চলে আসছে। দুর্গোৎসব নয় শারদোৎসব; শরৎ-ঋতু প্রবেশ-জনিত উৎসব। কোন্‌ সময়ে কি আকার ছিল, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা তুলে ধরা অধিক সময় সাপেক্ষ্য। পূর্বে যে যে দিন শরৎ-প্রবেশ হতো, আমরা অদ্যপি সে সে দিন পালন করছি, কিন্তু উৎপত্তি নিয়ে ভাবি নাই। এখানে পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দিতে কিছু তথ্য-
(১) ২৪১ শকের গণিত অনুসারে দশমীতে শরৎ আরম্ভ হয়েছে। এর পূর্বকালে এই তিথির পরে হোত। মহাভারত পাঠে আমরা জানতে পারি, কুরুকুলপতি মহাত্মা ভীষ্ম মাঘী শুক্লাষ্টমীতে স্বর্গারোহণ করেছিলেন। সেদিনকে আমরা ভীষ্মাষ্টমী বলি। পূর্বদিন সপ্তমীতে রবির উত্তরায়ন হয়েছিল। মহেশ্বর যুগ (শ্রীশ্রীসরস্বতী পূজা আরম্ভ) অনুসারে ইহা খৃষ্ট-পূ ৪৫০ অব্দের ঘটনা। এখানে পূর্ণিমা হতে পূর্ণিমা মাস। মাঘী শুক্লসপ্তমী হতে আট মাস আট দিন গণনা করলে আশ্বিন-পূর্ণিমা আসে। সেদিন আমরা লক্ষ্মীপূজা করি। রাত্রিকালে লক্ষ্মীর আগমন হবে, এই আশায় রাত্রি জাগরণ ও করি। সেদিন দ্যুতক্রীয়া করতে হয় এবং জয় হলে বুঝতে হয় সংবৎসর বিজয় হবে।
(২) আরও প্রাচীনকালে যাওয়া যাক। যজুর্বেদে ও অথর্ববেদে আছে, মাঘ কৃষ্ণাষ্টমীতে উত্তরায়ণ হয়। তদনুসারে জানতে পারি, আশ্বিন কৃষ্ণাষ্টমীতে আটমাস ও তদনন্তর আট দিন পরে কার্ত্তিক শুক্ল প্রতিপদে শরৎ ঋতু আরম্ভ হোত। এইদিনটি পঞ্জিকাতে দ্যুত-প্রতিপদ নামে খ্যাত। এই নাম হতেই উৎপত্তি বুঝিতেছি। পূর্বদিন শ্যামাপূজা হয়েছে আশ্বিন শুক্লা নবমীতেও অবিকল, সেইরূপ দূর্গাপূজা হয়েছে। দশমী শরৎ বৎসরের প্রথম দিন; সেইরূপ কার্ত্তিক শুক্ল প্রতিপদ শরৎ বৎসরের প্রথম দিন। গুজরাতে এই শরৎ বৎসর আজও চলিতেছে। বণিকেরা সেদিন শুদ্ধাচারে থাকে, আত্মীয়-স্বজনের সহিত উত্তম ভোজন করে এবং বাণিজ্যের নূতন খাতা করে। আশ্বিন অমাবস্যায় যে দীপালী হয়, তার সাথে নববর্ষ উৎসবের সম্বন্ধ নেই। তার হয়ত অন্য কারণ ছিল।

খৃষ্ট-পূর্ব ২৫০০ অব্দে যজুর্বেদ প্রণীত হয়েছিল। ইহার পূর্বে ঋগ্‌বেদের কাল চলছিল। সে কাল অন্ধকার। কদাচিৎ কোথাও দুই একটা নক্ষত্র দেখতে পাওয়া যায়, কিন্তু তদ্‌দ্বারা হিমবর্ষ বা শরৎ বর্ষের আরম্ভ ধরতে পারা যায় না। কিন্তু অন্য উপায় আছে, সে উপায় কি? আপনি/আমি কিন্তু জানেন/জানি!!!
(৩) আজ পর্যন্ত কোটি কোটি মানুষ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পাঠ করে। ভগবান্‌ অর্জ্জুনকে বলতেছেন, “মাসানাং মার্গশীর্ষোহহং”,- আমি দ্বাদশ মাসের মধ্যে মার্গশীর্ষ। বঙ্গদেশে আমরা এই মাসকে ‘অগ্রহায়ণ’ বলি। ইহার অর্থ, যে মাস হায়নের (বৎসরের) অগ্র(প্রথম)। অতএব, মার্গশীর্ষ বা অগ্রহায়ণ মাস এককালে এক বৎসরের প্রথম মাস গণিত হোত। আমরা অনেকেই ভগবদুক্তির তাৎপর্য্য জানি না। অনুধাবন করলে বুঝতাম, এখানে আর্যকৃষ্টির এক পুরাতন ইতিহাস লুক্কায়িত আছে। কদাচিৎ কেউ জানিতে চাহেন, মার্গশীর্ষ কোন্‌ বৎসরের প্রথম মাস ছিল? কত কাল পূর্বে ছিল? দুইটি প্রশ্নই গুরুত্ব-পূর্ণ। আমরা যে শারদোৎসব করি, আমরা তাহার আরম্ভকাল জানতে পারব। আরও জানব, আমাদের পূজা-পার্বণে অনেক পুরাতন ইতিহাস নিহিত আছে। আমরা অন্ধ, দেখিতে পাই না। মনে করি, সেসব কু-সংস্কার।
প্রথম দেখি, মার্গশীর্ষ নাম কেন হইল। চন্দ্র নক্ষত্রপথে গমনামন করিতেছে। যে নক্ষত্রে কিম্বা নক্ষত্রের নিকট পূর্ণচন্দ্রের উদয় হয়, সে নক্ষত্রের নামে সে পূর্ণিমার নাম। মৃগশীর্ষ বা মৃগশিরা নামে এক নক্ষত্র আছে। সেই নক্ষত্রে পূর্ণচন্দ্রের উদয় হলে সে পূর্ণিমার নাম মার্গশীর্ষী পূর্ণিমা। এইরূপে, অপর এগারটি পূর্ণীমার নাম হয়েছে। যে মাসে মার্গশীর্ষী পূর্ণীমা হয়, সে মাসের নাম মার্গশীর্ষ। ঋগ্‌বেদের কালে মৃগের শীর্ষ বা শিরে নক্ষত্র না ধরিয়া সমগ্র নক্ষত্রকে মৃগ’বলা হোত। ইহা আমাদের পরিচিত কালপুরুষ নক্ষত্র। অগ্রহায়ণ মাসে সন্ধ্যাকালে এই নক্ষত্রে পূর্ণচন্দ্রের উদয় দেখতে পাওয়া যায়। আমরা যেমন দেখি, পূর্বকালেও তেমন দেখা যেত। নক্ষত্রের নড়চড় নাই, পূর্ণিমারও নাই। কিন্তু শীত-গ্রীষ্মাদি ঋতু শনৈঃ শনৈঃ পশ্চাদ্‌গামী হতেছে। কালিদাসের বিরহী যক্ষ নব জলধরকে দূত করেছিলেন। ‘আষাঢ়স্য প্রশম দিবসে’, আষাঢ় মাসের শেষ দিনে, বর্ষাতুর আরম্ভ হয়েছিল। আমরা সেদিনকে অম্বুবাচী বলি। কালিদাস ২৪১শকের গণিত অনুসারে শ্রাবণ-ভাদ্র বর্ষাকাল ধরেছেন। এখন ৮ই আষাঢ় অম্বুবাচী হয়। বর্ষাঋতু ২৩ দিন পিছিয়ে এসেছে কিঞ্চি অধিক দুই হাজার বৎসরে এক মাস পিছায়। মাস যেখানে, সেখানেই থাকে। উত্তরায়ণ পিছায়, সকল ঋতুর আরম্ভ পিছায়।
এখন উপরের প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়- মার্গশীর্ষ কোন বৎসরের প্রথম মাস ছিল? ঋগ্বে‌দের কালে হিমবর্ষ ও শরৎবর্ষ, এ দুইটি বৎসর ছিল। পরে আর এক বর্ষ, বসন্তবর্ষ গণনা হতে থাকে এই তিন বর্ষের কোন্‌ বর্ষের আরম্ভ সন্ধ্যাকালে মৃগনক্ষত্রে পূর্ণচন্দ্রে উদয় হোত? বসন্তবর্ষ হতে পারে না, হিমবর্ষ ও হতে পারে না কারণ, ঋতু পশ্চাদ্‌গামী, মাস অগ্রগামী হয়। তখনও হিমঋতু পৌষে আরম্ভে আসতে পারে নাই। অতএব, অগ্রাহায়ণ মাস শরৎবর্ষের প্রথম মাস ছিল, এবং দুই সহস্র বৎসর ধরেই শরৎঋতুর প্রথম মাস গণ্য হোত। এক সময় অগ্রহায়ণ পূর্ণিমায় শরৎঋতুর প্রবেশ হোত, এবং আমরা যেমন শরৎ প্রবেশকে বিশেষ দিন ধরে থাকি, সে পূর্ণিমাকেও তখনকার লোকেরা সেরূপ বিশেষ দিন গণ্য করতেন। শ্রীমদ্ভাগবতে গোপীরা অগ্রহায়ণ মাসে কাত্যায়নীব্রত করতেন। কাত্যায়নী দুর্গা, অগ্রহায়ণ মাসে দুর্গাব্রত আকস্মিক নয়।

অগ্রহায়ণ পূর্ণিমায় শরৎঋতুর আরম্ভ হলে নিশ্চয় তৎকালে অশ্বিনী পূর্ণিমায় বর্ষাঋতুর আরম্ভ হোত। আশ্বিন হতে কার্ত্তিক ও কার্ত্তিক হতে আগ্রহায়ণ পূর্ণিমা দুইমাস বর্ষাকাল ছিল। অতএব জানতেপারি, আমরা যেদিন কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা করি, সেদিন অম্বুবাচী হইত। আর, এই পুরাতন ইতিহাস লক্ষ্মীর ধ্যানে নিহিত আছে। চারি গজ শুণ্ড দ্বারা চারি ঘট লয়ে লক্ষ্মীর দেহে বারি সেচন করতেছে। অনেকে অম্বুবাচীর দিন পক্ক অন্ন ভোজন করেন না(আশ্বিনে রাধে কার্ত্তিকে খায়), ফল মূল খেয়ে থাকেন। কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার দিন নারিকেল চিপিটক(জলে ভেজা ধান অল্প ভেজে নিয়ে ঢেঁকিতে পিষে চিঁড়ে তৈরি করা। গোধূমচূর্ণ – বৈদ্যক মতে ইহা অত্যন্ত পুষ্টিকারক।) খাওয়াই তাহার অনুকম্প। উপরের লেখায়, এইদিনে নববর্ষও আরম্ভ হইত। সেই কারণে রাত্রি জাগরণ ও দ্যূত-ক্রীয়া দ্বারা নববর্ষে শুভাশুভ পরীক্ষা করা হয়।
কতকাল পূর্বে আশ্বিন-পূর্ণিমায় অম্বুবাচী হইত, এখন অক্লেশে বলতে পারি। অশ্বিনীতে পূর্ণচন্দ্র থকালে আশ্বিন-পূর্ণিমা। তখন এই নক্ষত্রের বিপরীত দিকে চতুর্দশ নক্ষত্রে অর্থাৎ চিত্রা নক্ষত্রে সূর্য থাকেন। অতএব, তৎকালে সূর্য চিত্রা নক্ষত্রে আসলে আম্বুবাচী হইত। অম্বুবাচীতে দক্ষিণায়ন আরম্ভ হয়। মহাবিষুব হতে দক্ষিণায়নাদি ৯০ অংশ। অতএব, তৎকালে চিত্রা নক্ষত্র মহাবিষুব হতে ৯০ অংশ দূরে ছিল। বর্তমানে মহাবিষুব হতে চিত্রা তারা ২০৩ অংশ দূরে আছে। ইহা হতে ৯০ অংশ বাদ দিলে ১১৩ অংশ থাকে। ৭৩ বৎসরে অয়ন ১ অংশ পশ্চাদ্‌গামী হইত। অতএব, ১১৩*৭৩=৮২৪৯ বৎসর পূর্বে চিত্রা নক্ষত্রে রবির দক্ষিণায়ন আরম্ভ হইত।
আরও দেখতেছি, শরৎঋতু আরম্ভের চারিমাস পরে হিমঋতু আরম্ভ হয়। অগ্রহায়ণ-পূর্ণিমায় শরৎঋতু আরম্ভ হলে ইহার চারিমাস পরে চৈত্র-পূর্ণিমায় হিমঋতুর আরম্ভ হইত। সেদিন রবির উত্তরায়ণ। অতএব, রবি চিত্রা নক্ষত্রে আসলে দক্ষিণায়ন হইত।
পূর্বে দেখেছি, ছয় সহস্র বৎসর পূর্বে ফাল্গুনী পূর্ণিমায় শীত ঋতুর আরম্ভ হইত। দোলযাত্রায় আমরা তাহার স্মৃতি রক্ষা করতেছি। এখানে আরও দুই সমস্র বৎসর পূর্বের, অর্থাৎ খ্রী-পূ প্রায় ছয় সহস্র বৎসর পূর্বের স্মৃতির নিদর্শন পাইতেছি।
ভারতের অতীত ইতিহাস স্মরণ করলে বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয়। প্রাচীন আর্যগণ ঋতু আরম্ভে যজ্ঞ করতেন। যাঁহারা যজ্ঞ করতেন, তাহাঁরা ঋত্বিক্‌। শারদ যজ্ঞদিনে আমরা এখন দেবীপূজা করতেছি। তাহাঁরা শরৎপ্রবেশে নিশ্চয় আনন্দ অনুভব করতেন।
পূর্ব-পিতামহগণের এই পূণ্যকাহিনী শ্রবণ করলে মন পবিত্র ও উদার হয়; দেব, ঋষি ও পিতৃপুরুষের প্রতি ভক্তি হয়; চিত্ত নির্মল হয়; ঈর্ষা, দ্বেষ, অসত্য, প্রতারণা প্রবৃত্তি নিরুদ্ধ হয়; এবগ আমরা বলি, দেবীর কৃপায় নববর্ষে সকলের বিজয় হউক, স্বস্তি।।
ক্রমশঃ

শারদোৎসবের এই সুদীর্ঘ ইতিহাস আচার্য্য যোগেশ চন্দ্র রায় বিদ্যানিধির পূজা পার্বণ গ্রন্থ থেকে সংকলিত।
জয় দুর্গতিনাশিনী।।

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s