মা কালীর মূর্তির বিভিন্ন অঙ্গের অর্থ বর্ণনঃ-


শিবের ওপর কালীঃ- মহাদেব এখানে শব রূপ। এর মৃত্যুরুপ শিবের বুকে স্বয়ং জগত মাতা। এর মানে হল মৃত্যু কে জয়।

দিগম্বরীঃ- দেবী কালী দিগম্বরী। এর অর্থ তিনি কোন কিছুর বন্ধনে আবদ্ধ নন। তিনি দেশ কালের ওপরে। তিনি সকল জীবের মাতা।

এ প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন কিছু পণ্ডিত বসনকে কামনা বাসনার প্রতীক বলেছেন। ভগবান শ্রী কৃষ্ণ গোপীনি দের বস্ত্র হরণ করেছিলেন। যারা মূর্খ , নাস্তিক তারা এর মধ্যে অশ্লীলতার প্রসঙ্গ খোঁজেন।

এর মানে কিন্তু এই না আমাদের বসনহীন হয়ে থাকতে হবে। খালি কামনা বাসনা আদি ষড়রিপু বর্জন করতে হবে। তবেই দেবকৃপা পাওয়া যাবে। তাই সম্পূর্ণ রিক্ত হয়ে অহং ও অবিদ্যা কে ত্যাগ করেই মায়ের কাছে যেতে হবে।

মুক্তকেশীঃ- মা মুক্ত স্বভাবা । তাই তিনি মুক্তকেশী । তাঁর জ্ঞান খড়গের দ্বারা অষ্টপাশ ছিন্ন হলেই নিস্কাম সাধক দেবীর কৃপা পান । তবেই মুক্তি ঘটে। রামপ্রসাদ তাই গাইলেনঃ–

“ মুক্ত কর মা মুক্তকেশী
ভবে যন্ত্রনা পাই দিবানিশি । ”

দেবী কালীর সেই কেশ মৃত্যুর প্রতীক। চন্ডীতে আছে মহিষাসুরের হাতে পরাজিত দেবতারা যখন ত্রিদেবের কাছে গেলেন তখন ত্রিদেব ও সমস্ত দেবতাদের তেজ রাশি একত্রিত হয়ে ভগবতী মহামায়ার আবির্ভাব ঘটে। যমের তেজে দেবীর কেশরাশি গঠিত হয় ।

মুন্ডমালাঃ- মায়ের কন্ঠে মুণ্ডমালা । কন্ঠমালা পঞ্চাশৎ । যা সংস্কৃত পঞ্চাশৎ বর্ণমালার প্রতীক । শব্দই হল ব্রহ্ম। কামধেনু তন্ত্রে দেবী স্বয়ং বলেছেনঃ—
“ মম কণ্ঠে স্থিতং বীজং পঞ্চাশদ্ বর্ণমদ্ভুতম্ । ”

রামপ্রসাদ তাই গেয়েছেনঃ–

“যত শোন কর্ণপুটে সকল মায়ের মন্ত্র বটে ।
কালী পঞ্চাশৎ বর্ণময়ী বর্ণে বর্ণে নাম ধরে ।”
মুন্ডমালা হল জ্ঞান শক্তির প্রতীক । দেবী ব্রহ্মজ্ঞান প্রদান করেন । তিনি চেতনা দান করেন। অন্ধকারে আবদ্ধ জীবকে আলোর পথ দেখান ।

হস্তের মেখলাঃ- দেবী কালী কটি দেশে নর হস্তের মেখলা । কিন্তু কেন ? হস্ত কর্মশক্তির প্রতীক ।

ত্রিনয়নীঃ- দেবী কালীর ত্রিনয়ন । দেবীর একটি নয়ন চন্দ্র স্বরূপ , আর একটি সূর্য স্বরূপ । তৃতীয়টি অগ্নি স্বরূপ । দেবী ভূত , ভবিষ্যৎ , বর্তমান সব কিছুই প্রত্যক্ষ করেন । তাঁর ত্রিনয়নের ইঙ্গিতেই ত্রিকাল নিয়ন্ত্রিত হয়।

প্রকাশ্য দিবালোকে , সন্ধ্যায় বা রাত্রে আমরা যে কাজ করিনা কেন তিনি দেখছেন। আমরা যদি গোপনে পাপ কাজ করে প্রভাব খাটিয়ে এই পৃথিবীর বিচারসভার হাত থেকে নিস্কৃতি পাইও , তবুও দেবী সব দেখেন – তাঁর বিচার থেকে নিস্কৃতি পাওয়া যাবে না ।

চারহস্তঃ- দেবীর চার হাত । তাঁর ওপরের দুহাতে অভয় ও খড়গ । নীচে বর মুদ্রা ও ছিন্ন নরমুণ্ড । অভয় ও বরামুদ্রা সৃষ্টির প্রতীক ।

খড়গ ও ছিন্ন নরমুণ্ড ধ্বংসের প্রতীক । দুটি বিপরীত কাজ হলেও আমরা মা কালীর মধ্যে দুটিকেই দেখতে পাই । এর অর্থ দেবী কালীর ইচ্ছাতেই সৃষ্টি হয় , তার ইচ্ছাতেই ধ্বংস হয় । দেবী তার খড়গ দ্বারা অবিদ্যা রুপী অসুরকে ধ্বংস করেন ।

কৃষ্ণবর্ণঃ- কালী মাতা কৃষ্ণবর্ণা । আদিতে যখন বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড কিছুই ছিল না তখনও তিনি ছিলেন । তিনি অনন্ত । তিনি আদিতেও ছিলেন , তাই তিনি কৃষ্ণবর্ণা । কখনো তিনি নীলবর্ণা ।

যা সুদীর্ঘ সুনীল নীল আকাশের তুলনীয় । এর অর্থ দেবী অনন্ত । অনন্ত তার লীলা প্রকাশ । যা ব্রহ্মা , বিষ্ণু , মহেশ্বরের অগোচর ।

বিবসনা স্তন্য, দেবী কালী উলঙ্গিনীঃ- তাই কিছু নাস্তিক , মূর্খ ও বুদ্ধিজীবি শ্রেনীর মানুষ অনেক সময় খারাপ কিছুর সঙ্গে উলঙ্গিনী মায়ের তুলনা করে বসেন ।

মা উলঙ্গিনী বটে – কিন্তু তিনি যে তাঁর বাৎসল্যের স্নেহধারা তাঁর সকল সন্তান দের জন্যই রেখেছেন । তিনিই ত অন্নপূর্ণা রুপে ধান , শস্যে ভরিয়ে দিয়েছেন ।

তিনি শাকম্ভরী , তিনিই শতাক্ষী । মা হল পরম করুণাময়ী । সন্তানের দুঃখে তিনি কাঁদেন , সন্তানের উল্লাসেই তিনি আনন্দিত হন ।

এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন । অনেক পণ্ডিতরা বলেন মা শীতলা নাকি সকলকে বসন্ত রোগের জীবানু দেন ।

এমন কোন মা আছে যে তার সন্তান দের তিনি রোগ দেবেন ? তাঁর সন্তান রা রোগে কষ্ট পাবে আর তিনি দেখবেন । এমন ধারনা ‘মা’ শব্দের অপমান ।

রক্তমাখা জিহ্বাঃ- দেবীর রক্তমাখা জিহ্বা রজঃ গুনের প্রতীক । তিনি তার শ্বেত দন্ত পাটি দ্বারা জিহ্বা কেটেছেন । শ্বেত বর্ণ হল স্বত্বঃ গুনের প্রতীক । এর মানে মা আমাদের স্বত্বঃ গুন দ্বারা রজঃ গুনকে সংহত করার শিক্ষে দিচ্ছেন ।

মহা শ্মশ্মান বাসিনীঃ-বদেবী মহাশ্মশ্মান এ বিচরণ করেন । কর্মফল ভোগান্তে জীবের শেষ আশ্রয় স্থল হল শ্মশ্মান । যেখানে তারা জননীর কোলে সুখে নিদ্রা যায় ।

মায়ের আঁচল এর তুলনা কোটী কোটি স্বর্গের সাথেও হয় না । যেখানে বাৎসল্যের ছোঁয়া লেগেই থাকে । “ মায়ের কোলে ঘুমায় ছেলে , এ শান্তি মা কোথায় বল ?” মহানির্বাণ তন্ত্র বলেনঃ–

“ সৃষ্টৈরাদৌ ত্বমেকাসীত্তোমারুপগোচরম্ ”

ধ্বংসের দেবীঃ–ধ্বংসের মধ্যেই সৃষ্টির বীজ লুকিয়ে আছে । যেমন ঘন কালো রাত্রির পর দিন আসে । তেমনি ধ্বংসের পর সৃষ্টি হয় । ঘন কালো মেঘ বিদায় হলেই আকাশে ঝলমলে সূর্য ওঠে । তাই ধ্বংস ছাড়া সৃষ্টির বিকাশ সম্ভব নয় ।

মা কালী হলেন আদ্যাশক্তি । জগতের মূল শক্তি ইনি । ইনি মহা সরস্বতী । ইনিই মহা লক্ষ্মী । ইনি রুদ্রানী শিবানী । ইনি ব্রহ্মার শক্তি ব্রহ্মাণী , নারায়নের শক্তি নারায়নী , শিবের শক্তি শিবা । ইনি নারসিংহী , ইনি বারাহী , ইনি কৌমারী , গন্ধেশ্বরী ।

ইনি শ্রী রামচন্দ্রের শক্তি সীতা দেবী ( বামস্য জানকী ত্বং হি রাবনধ্বংসকারিনী ) , ইনি শ্রীকৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তি , ইনি শ্রী রামকৃষ্ণের সহধর্মিণী মা সারদা । ইনি মহিষমর্দিনী চণ্ডী , ইনি চামুন্ডা , কৌষিকী , দুর্গা ভগবতী । এই ব্রহ্মাণ্ড তাঁর ইচ্ছাতেই চলছে । মায়ের ইচ্ছা ভিন্ন গাছের একটা পাতাও নড়ে না ।

সংহার রুপিনীঃ- সংহার শব্দের অর্থ ঠিক ধবংস নয় । সংহরন । নিজের ভিতরে প্রত্যাকর্ষণ । যেমন সমুদ্রের ঊর্মিমালা সমুদ্রের বক্ষ থেকেই উদ্ভুত হয় আবার সমুদ্রেই লয় হয় । যেম্ন উর্ণণাভ নিজের গর্ভ থেকে জাল রচনা করে আবার নিজের পেটেই গুটিয়ে নেয় ।

মৃত্যুর অর্থ পৃথিবী থেকে , নিকট জনের থেকে চির বিদায় নেওয়া – কিন্তু সেই জগত জননীর কোলে আশ্রয় পাওয়া । এই ব্রহ্মাণ্ড সেই মহামায়ার ইচ্ছাতেই রচিত , সংহার কালে তিনি আবার সব গুটিয়ে নেন।

সংগৃহীত লেখা-

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s