যুদ্ধক্ষেত্রে গীতার অবতারণা (আলোচনার সূত্রপাত) কেন?


%e0%a6%af%e0%a7%81%e0%a6%a6%e0%a7%8d%e0%a6%a7%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b7%e0%a7%87%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%87-%e0%a6%97%e0%a7%80%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%85%e0%a6%ac%e0%a6%a4%e0%a6%be
গীতার উপদেশ সাংসারিক সর্ব ব্যাপারেই প্রযোজ্য। গীতাকার তাঁহার বক্তব্য প্রচারের জন্য যুদ্ধের ঘটনার আশ্রয় লইলেন কেন, তাও ভাববার বিষয়। তিনি কথায় কথায় শ্রীকৃষ্ণের দ্বারা বলিয়াছেন,
তস্মাত্তমত্তিষ্ঠ যশো লভস্ব
জিত্বা শত্রুন্‌ ভুঙ্‌ক্ষ্ব রাজ্যং সমৃদ্ধম। ১১/৩৩
অত্থাৎ, অতএব তুমি উঠ, যশোলাভ কর, শত্রু জয় করিয়া সমৃদ্ধ রাজ্য ভোগ কর।

সমস্ত সনাতন ধর্মশাস্ত্রের উপদেশের মূল উদ্দেশ্য আত্যন্তিক (অত্যধিক, খুব বেশি, অশেষ;)দুঃখনিবৃত্তি। মোক্ষলাভের আগ্রহও অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুঃখনিবৃত্তির ইচ্ছা হতেই উৎপন্ন। সাধারণে পুনঃপুন জন্মগ্রহণের কষ্ট নিয়ে মাথা ঘামায় না। এই জন্মেই সে যা কষ্ট ভোগ করে, তা হতেই উদ্ধারের উপায় সে চিন্তা করে। আত্যন্তিক দুঃখনিবৃত্তি হলে রোগ শোক দুঃখ দারিদ্র ইত্যাদি সকল কষ্টেরই নিবৃত্তি হবে আশা করা যায়। সংসারে থাকলে কিছু না কিছু কষ্ট সকলকেই ভোগ করতে হয়। এই কষ্ট নিবারণের জন্য নানা উপায় কল্পিত হয়েছে। প্রাচ্য ও প্রতীচ্য দেশে সাংসারিক দুঃখনিবৃত্তির উপায়-কল্পনার আদর্শের ধারা একেবারে বিভিন্ন। পাশ্চাত্ত্যের শিক্ষা নিজেকে সংসারসংগ্রামের উপযোগী কর, পরের সাথে প্রতিদ্বন্দিতায় যাতে নিজের অধিকার ও সত্তা অক্ষুন্ন থাকে তার চেষ্টা দেখ, জ্ঞানার্জন করে প্রকৃতিকে নিজ সুখস্বাচ্ছন্দ্য বিধানে নিয়োজিত কর; মোট কথা, পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে নিজের সুবিধানুয়ায়ী পরিবর্তিত কর। সংসার-কন্টকারণ্যের যতগুলি পার কন্টক উৎপাটন কর। প্রাচ্যে যে এরূপ চেষ্টা নাই, তা নহে। তবে এখানকার সনাতন আদর্শ অন্যরূপ। সংসারের সমস্ত কন্টক তুমি কিছুতেই দূর করতে পারবে না। কাজেই তোমার নিজেকেই এমনভাবে গঠন করতে হবে, যাতে কন্টক তোমাকে বেদনা দিতে না পারে। রাস্তার কঙ্কর দূর করবার বৃথা চেষ্টা না করে পায়ে জুতা পরাই ভাল। এক আদর্শে বহিঃপ্রকৃতির উপর প্রভুত্ব, এবং অপর আদর্শে নিজের উপর প্রভুত্বের চেষ্টাই কাম্য। পাশ্চাত্ত্য আদর্শ মতে সমগ্র প্রকৃতির উপর প্রভুত্ব ও আত্যন্তিক দুঃখনিবৃত্তি সম্ভবপর নহে, তবে প্রকৃতিকে আমি তোমার অপেক্ষা বেশী পরিমাণে নিজের কাজে লাগাতে শিখে অধিকতর সুখস্বাচ্ছন্দ্য থাকতে পারি, প্রচুর ধনোপার্জন করে সুখে ইচ্ছামত আহার বিহার করতে পারি। একেবারেই আমার কোনও কষ্ট থাকবে না, এমন কথা বলতে পারি না। রোগ শোক দুঃখ ইত্যাদির হাত হতে একেবারে নিস্তার পাওয়া অসম্ভব।
সনাতন/হিন্দু আদর্শ বলবে আত্যান্তিক দুঃখনিবৃত্তি সম্ভব। রোগ-শোক, দুঃখ-দারিদ্র্য, মৃত্যু-ভয়, ইত্যাদি সকল প্রকার অশান্তি দূর করা যেতে পারে এবং তুমি আমি চেষ্টা করলে এইরূপ অবস্থায় পৌছালেও পৌছাতে পারি। এত বড় কথা বোধ হয় পৃথিবীতে আর কেহ কখনও বলে নাই। এই দুঃখময় সংসারের সকল দুঃখ যে মৃত্যু ভিন্নও নিবারিত হতে পারে, তাহা বিশ্বাস করাই কঠিন। আমাদের দেশের আদর্শ যাঁরা মানেন তাঁদের ভিতরেও কি উপায়ে এইরূপ আত্যন্তিক দুঃখনিবারণ হতে পারে, সে সম্বন্ধে বিলক্ষণ মতভেদ আছে। কেহ বলেন, সংসার পরিত্যাগ করেই সমস্ত আত্মীয়স্বজন ও ভোগবিলাসের মায়ামমতা বিসর্জন দিয়ে দণ্ড-কৌপীন মাত্র সম্বল করে নির্জনে আত্মচিন্তাই ইহার উপায়। কৌপীনবন্তী খলু ভাগ্যবন্তঃ। তুমি আমি এই উপায় অবলম্বন করতে বিলক্ষণ ইতস্তত করব, কারণ সংসার পরিত্যাগের ইচ্ছামাত্রই সাধারণ মানুষের পক্ষে কষ্টকর। তবে যদি কারও সংসারে বিরতি হয়ে থাকে, তাঁহার কথা স্বতন্ত্র। কেহ বলবেন, যাগ-যজ্ঞ ও ভগবানের উপাসনা ইত্যাদি কর, শান্তি পাবে; কিন্তু এই উপায়ে কিরূপে রোগ শোক ইত্যাদি কষ্ট নিবারণ হবে তা সাধারণ বুদ্ধির অগম্য। অবশ্য বলা যেতে পারে যে এই সকল প্রক্রিয়ায় মানসিক শক্তি বৃদ্ধি পায় ও কষ্ট সহ্য করবার ক্ষমতা হয় কিন্তু কষ্ট সহ্য করা এক ও কষ্ট না হওয়া আর এক। কেহ বলবেন, যোগ অভ্যাস কর, যোগীর পৃথিবীতে কষ্ট নাই। প্রাপ্তস্য যোগাগ্নিময়ং শরীরং ন তস্য রোগো ন জরা ন দুঃখম্‌। যোগাগ্নিময় শরীর পাইলে তাহার রোগ জরা, দুঃখ থাকে না। কথাটি বড়ই অদ্ভুত। সত্যিই যদি এ প্রকার হয় তবে বাস্তবিকই এই মার্গ অনুসরণিয়। যোগ অভ্যাস সকলের সাধ্যায়ত্ত নহে এবং যদি কেহ যোগ অভ্যাস করতে মনস্থ করেন, তবে তাঁহার মনে এরূপ সন্দেহ উঠা স্বাভাবিক যে, এত কষ্ট করে যোগ অভ্যাস করবার পর যে আত্যান্তিক দুঃখনিবৃত্তি হবে তাহার সঠিক প্রমাণ কোথায়? কোথায় সেই যোগী যিনি বলতে পারেন এই দেখ আমি সাংসারিক সমস্ত দুঃখ কষ্টের উর্দ্ধে উঠেছি। লঙ্কায় প্রচুর সোনা পাওয়া যায় শুনলেও হয়ত অনেকেই সোনা আনবার জন্য কষ্ট স্বীকার করে সেখানে যেতে রাজী হবেন না। কাজেই অধিকাংশ ব্যক্তিই অনিশ্চিতের আশায় কঠোর যোগ অভ্যাসে প্রবৃত্ত না হয়ে সাংসারিক কাজকর্মে লিপ্ত থাকলেও আমরা তাদেরকে দোষ দিতে পারি না।
ভক্তিমার্গে ভগবৎলাভ হয় ও ভগবৎলাভ হলে আত্যন্তিক দুঃখনিবৃত্তি হতে পারে, এ কথা হয়ত সত্য, কিন্তু আমার মনে যদি ভক্তি না উঠে, তার উপায় কি ? লঙ্কায় যাইলে সোনা মিলতে পারে কিন্তু আমার যাবার শক্তি কই? যাঁহাদের মন ভক্তিপ্রবণ তাঁহারা এই মার্গের অনুসরণ করতে পারেন।
নিজ নিজ প্রবৃত্তি অনুসারে মানুষ কেহ ভক্তিমার্গে, কেহ যোগমার্গে, কেহ সন্ন্যাসমার্গে যাইয়া থাকে। গীতাকার বলেন, তোমাকে কোন নূতন পন্থা ধরতে হবে না। তোমার নিজের মার্গে চলেই কি করে আত্যন্তিক দুঃখ নিবৃত্তি হতে পারে, আমি তাই বলব। এরূপ আশঙ্কা করিও না যে, আমার উপদেশের সমস্ত না বুঝলে বা তার অনুসরণ করে পূর্ণমাত্রায় চলতে না পারলে সমস্ত পরিশ্রমই পণ্ড হবে। স্বল্পমপ্যস্য ধর্মস্য ত্রায়তে মহতো ভয়াৎ। গীতা শাস্ত্রের সামান্য মাত্র বুঝিয়াও তুমি মহৎ ভয় হতে উদ্ধার পেতে পার। সংসারে যে যতই কষ্টকর অবস্থার মধ্যে থাকুক না কেন গীতোক্ত ধর্মের মহিমা বুঝলে তার সমস্ত কষ্টের নিবৃত্তি হবে। এ অতি আশ্চর্য্য কথা। তুমি ভিক্ষুক হও, পরের দাস হও, রোগী হও, ভোগী হও, ধনবান হও, যাই হও না কেন এবং যে অবস্থাতেই থাক না কেন, গীতার মর্ম উপলব্ধি করলে তোমাকে কোন কষ্ট স্পর্শ করতে পারবে না। স্বল্প উপলব্ধিতেও অনেক লাভ।
সংসারে যত প্রকার কষ্ট আছে, কোন্‌ অবস্থায় তাদের সবগুলি প্রকট হয় প্রশ্ন উঠলে বলা যায় যে যুদ্ধ। যুদ্ধে অঙ্গহানির সম্ভাবনা; রোগ শোক মৃত্যু ত আছেই, তা ছাড়াও যা কিছু মানুষের প্রিয়, সমাজের যা কিছু কল্যাণকর বন্ধন, সমস্তই বিপর্যস্ত হয়ে যায়। এমন কোনও কষ্টই আমরা কল্পনায় আনতে পারি না যা যুদ্ধের ফলে উৎপন্ন হতে পারে। যে ব্যক্তি যুদ্ধে লিপ্ত হয় সে নিজে ত এই সকল কষ্টভোগ করতেই পারে, পরন্তু অন্যকেও এই সকল দুঃখ-কষ্টের অংশীদার করে। অতএব এক কথায় যুদ্ধের মত দুঃখের ব্যাপার আর কিছুই নাই এমত অবস্থায় পড়েও যদি দুঃখনিবৃত্তি সম্ভব হয়, তবে সর্বাবস্থাতেই তা সম্ভব। এই জন্য গীতাকার যুদ্ধের অবতারণা করেছেন। মহাভারতের যুদ্ধ বহুকাল পূর্বে হলেও গীতার উপদেশ সর্বব্যক্তির পক্ষে সর্বাবস্থায় প্রযোজ্য।
ভগবদ্‌গীতা- শ্রীগিরীন্দ্রশেখর বসু
সংকলনে #কৃষ্ণকমল

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s