অধ্যাত্মবিজ্ঞান, দর্শনশাস্ত্র ও জড়বিজ্ঞান।


Image result for indian philosophy

প্রথম দর্শনশাস্ত্র ও জড়বিজ্ঞানের উৎপত্তিবিষয় কিঞ্চিৎ তুলেধরা যাক; পরে অধ্যাত্মবিজ্ঞানের বিষয় যৎকিঞ্চিৎ উল্লেখ করা যাবে। বিজ্ঞানবিৎপণ্ডিতদিগের মতে মানবের জাতীয় ইতিহাসে জ্ঞানোন্নতি সম্বন্ধে তিনটি যুগ বর্তমান; (১) অসভ্য যুগ, (২) দার্শনিক যুগ (৩) বৈজ্ঞানিক যুগ। অসভ্য যুগে অশিক্ষিত মানব জগৎকে বিভীষিকাময় দর্শন করেন এবং ভীতিসংবলিত চমৎকার রস কর্তৃক চালিত হয়ে কল্পনাবলে সকল বিষয়ের কাল্পনিক কারণতত্ত্ব উদ্ভাবন করে আপনার দুৰ্ব্বল মনকে সান্তনা করেন। আধুনিক অসভ্য মানবসমাজ দর্শন কর, জগতের এ অবস্থাটি তোমার সম্যক বোধগম্য হবে। পরে জাতীয় সাধনার গুণে বিদ্যাবুদ্ধির ক্রমোন্নতির সাথে অসভ্যাবস্থা হতে উন্মুক্ত হয়ে মানব সভ্যতাসোপানে আরূঢ় হলে পরে, তিনি জাতীয় সুখবৰ্দ্ধন উদ্দেশ্যে জীবনের ও জগতের কূটপ্রশ্ন মীমাংসায় স্বীয় উন্নত ও মার্জিত বুদ্ধিশক্তি চালনা করেন। এস্থলে স্বাভিপ্রায় সাধনোদেশে তিনি দুইটি বিপরীত পথ (দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক পথ) দেখতে পান। প্রথমতঃ তিনি বহুদিবস দার্শনিক পথে বিচরণ করেন; অবশেষে ঐ পথের অসারত্ব দর্শনে অশেষ ফলপ্রদ বৈজ্ঞানিক পথ অনুসরণ করতে আরম্ভ করেন।
অধ্যাত্মবিজ্ঞানবিৎ মহাত্মাদিগের মতে সৃষ্টির সত্য ত্রেতা-দ্বাপর যুগে অধ্যাত্মবিজ্ঞান সম্যক অনুশীলিত হয়। তৎপরে যুগধৰ্ম্মানুসারে মানবের আধ্যাত্মিক অপগমনের সঙ্গে তার মনে জ্ঞানশক্তি স্ফুরিত হলে, যদিও তিনি সংসারে আধিভৌতিক উন্নতির প্রার্থী হন, তথাচ পূর্ব্বতন যুগের আধ্যাত্মিকতা প্রাপ্তির জন্য ও জ্ঞানশক্তির সম্যক স্ফুর্তির জন্য তিনি বহুদিবস দর্শনশাস্ত্র অনুশীলন করেন। পরে কলিযুগবৰ্দ্ধনের সঙ্গে তাহার জ্ঞান শক্তি সম্যক স্ফুরিত হইলে, তিনি আধ্যাত্মিকতা একেবারে ভুলিয়া গিয়া সমাজের আধিভৌতিক উন্নতির জন্য সবিশেষ উৎসুক হন এবং আধুনিক জড়বাদী জড়বিজ্ঞান অনুশীলন করতে আরম্ভ করেন।
বিজ্ঞানের মত সত্য হোক, বা অধ্যাত্মবিজ্ঞানের মত সত্য হোক, পুরাকালে সভ্যজগতে দর্শনশাস্ত্রের যেরূপ সমাদর ও অনুশীলন হইত, আজকাল সভ্যজগতে জড়বিজ্ঞানের সেরূপ সমাদর ও অনুশীলন দেখা যায়। ঐতিহাসিক সময়ে প্রাচ্যভূমিতে মানব প্রথম সভ্যতাসোপানে আরূঢ় এবং প্রাচ্যজগৎই দর্শনশাস্ত্রের প্রকৃত জন্মভূমি। ভারতবর্ষ, চীন, পারস্য, এসিরিয়া, ব্যাবিলন, মিসর, গ্ৰীস, রোম প্রভৃতি দেশ পুরাকালে সভ্যতার উচ্চপদবীতে আরূঢ় হয়। সভ্যতার পূর্ণবিকাশের সময় ঐ সকল দেশে, বিবিধ দর্শনশাস্ত্র রচিত ও সম্যক অনুশীলিত হয়। কিন্তু ইহা আমাদের পরম গৌরবের বিষয়, যে ভারতবর্ষে দর্শন শাস্ত্রের চরম উন্নতিসাধন হয় এবং হিন্দুজাতি উন্নত দর্শনশাস্ত্রে পৃথিবীস্থ অন্যান্য জাতির আদিগুরু। মহামহোপাধ্যায় কপিলাদি-মুনিগণ যে সকল দর্শনশাস্ত্র, রচনা করেন, তাহা জগতে অতুলনীয়, তাঁহারা মানবজীবন সম্বন্ধে যে সকল তত্ত্ব উদ্ভাবন করেন, তা চিরদিন, জগতে আদৃত। ভারতের নিকট গ্রীস দর্শন শাস্ত্রকারেরা চিরঋণে আবদ্ধ। কথিত আছে, পিথাগোরাস, প্লেট প্রভৃতি,গ্ৰীসদেশীয় সুবিখ্যাত পণ্ডিতগণ দর্শনশাস্ত্র জ্ঞান লাভ করবার জন্য পূৰ্ব্বদেশে আগমন করতেন। তৎকালেও, সভ্যদেশগুলি নানাকারণে ঘনিষ্ঠ সংস্রবে আনীত হইত। দিগবিজয়; বাণিজ্য-বিস্তার, ধৰ্মপ্রচার, তীর্থভ্রমণ প্রভৃতি নানাকারণে একজাতি, অন্যজাতির সাথে স্বাধীনভাবে মিলিত হইত; ইহাতেই একদেশের উৎকৃষ্ট মতামত অন্যদেশে নীত ও আদৃত হইত। Image result for indian philosophy
ভারতবর্ষে যতগুলি দর্শনশাস্ত্র রচিত হয়, তন্মধ্যে ষড়দর্শন বিখ্যাত এবং আজপৰ্য্যন্ত, সমগ্র ভারতে উহারা সম্যক আদৃত। কপিল, ব্যাস, পাতঞ্জল, কণাদ, গৌতম ও জৈমিনি ঐসকল দর্শনশাস্ত্র রচনা করিয়া আজ ভুবনবিখ্যাত। সেইরূপ গ্ৰীসদেশে পিথাগোরাস, সক্রেটিশ, প্লেটো, আরিষ্টটল, ষ্ট্রাবো, ডিমোক্রাইটস প্রভৃতি পণ্ডিতগণ দর্শনশাস্ত্রের উন্নতি সাধন করেন। গ্ৰীকদর্শনের সাথে হিন্দুদর্শনের তুলনা করলে, শেষোক্তটি যে উচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত, তাহা বিজাতীয় পণ্ডিতেরাও মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করেন। যথার্থ বলতে কি, যেমন সংস্কৃত দেবভাষা ও সনাতন হিন্দুধৰ্ম আমাদের পূৰ্ব্বতন গৌরবের প্রধান কীৰ্ত্তিস্তম্ভ, সেরূপ হিন্দুদর্শনও আমাদের জাতীয় উন্নতির আর একটি প্রধান স্মৃতিচিহ্ল। যে জাতি মানবমনের এত গভীরতম প্রদেশে অনুপ্রবেশ করেন, সে জাতি জগতে কতদূর উন্নতি সাধন করেন, সে বিষয়ে কেহ কি কিছুমাত্র সন্দেহ করতে পারেন ?
গ্ৰীকদের নিকট হতে রোমানেরা এ বিদ্যা প্রাপ্ত হয়। পরে মধ্যযুগে সমগ্র ইউরোপ গ্ৰীস ও রোমের ভগ্নাবশেষ অনুশীলন করে আধুনিক সভ্যতাসোপানে অধিরোহন করতে সমর্থ হয়। অতএব সাহঙ্কারে বলা উচিত, আধুনিক উৎকৃষ্ট সভ্যতার মুলীভূত কারণ হিন্দুদিগের দর্শনাদি বিদ্যা। তাহার সাক্ষ্য দেখ না, আমাদেরই গণিতশাস্ত্র পৃথিবীস্থ যাবতীয় জাতির গণিতশাস্ত্রের আদিগুরু এবং আমাদেরই গণনাপদ্ধতি এখন সকল সভ্যদেশে প্রচলিত। হিন্দুজাতির নিকট অন্যান্য জাতি নানাবিষয়ে কিরূপ ঋণগ্রস্ত, সে বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব নিতান্ত অসম্পূর্ণ হইলেও এখন কিছু কিছু নির্দেশ করে। এখনও এসিরিয়া ব্যাবিলন ও মিসরদেশের প্রাচীন ইতিহাস সম্যক আবিষ্কৃত হয় নাই; সেজন্য প্রাচীনকালে ভারতের সহিত উহাদের কিরূপ সংস্রব ছিল, তা প্রায় অজ্ঞাত।
হিন্দুজাতি চিরদিন দর্শনশাস্ত্রের অনুশীলনে কিরূপ অনুরক্ত, তা পণ্ডিতবর ম্যাক্সমুলার সাহেবের একটা কথায় সম্যক প্রকাশ পায়। তিনি হিন্দুজাতিকে দার্শনিকজাতি বলে অশেষ সুখ্যাতি করেন। যে ইংরাজজাতি আজ বাণিজ্য বলে জগতে অগ্রগণ্য, সে জাতি অন্যান্য জাতির নিকট দোকানদারের জাতি (a nation of shop-keepers) বলে প্রখ্যাত। সেইরূপ আমরাও চিরদিন দর্শনশাস্ত্রের অনুশীলনে রত বলে অন্যান্য জাতির নিকট দার্শনিক-জাতি (a nation of philosophers) বলিয়া প্রখ্যাত। যথার্থ বলতে কি, আমাদের এত অধিক আধ্যাত্মিক স্ফুৰ্ত্তি কেবলমাত্র দর্শনশাস্ত্রের প্রগাঢ় অনুশীলন হতে উপজাত এবং দর্শনশাস্ত্রের আলোচনা করেই আমরা ধৰ্মপথে ও আধ্যাত্মিক পথে এত অগ্রসর।
পুরাকালে জ্ঞানজগতে দর্শনশাস্ত্রেরই সম্যক সমাদর হয়। তৎকালে সুধীবর্গের মানসিক শক্তি এই শ্রেষ্ঠ বিদ্যার অনুশীলনে ব্যয়িত হয় এবং তাঁহারা ইহাতেই অপার আনন্দ উপভোগ করেন। তৎকালে তাঁহারা এর সম্যক অনুশীলন করে নিজেদের আধ্যাত্মিকতা ও জ্ঞানশক্তির স্ফুৰ্ত্তি আনতে চেষ্টা পান। ইহা জ্ঞানজগতের একটা জলন্ত সত্য, যুগধৰ্ম অনুসারে প্রাকৃতিক কারণে মানববুদ্ধির যেরূপ পরিবর্তন ঘটে, বিদ্যা অনুশীলনেরও প্রায় তদনুরূপ পরিবর্তন দৃষ্ট হয়। তোমার নিকট দর্শনশাস্ত্র এখন জটিল ও দুর্বোধ্য, কিন্তু বিজ্ঞানশাস্ত্র সহজ ও সুগম। এখন তুমি পুরাণকাহিনী ভাল বাস না, কিন্তু তৎপরিবর্ত্তে তুমি ইতিহাসের সম্যক আদর কর।
বিজ্ঞানবিৎ পণ্ডিতগণ বলেন, দর্শনশাস্ত্রের অনুশীলন দ্বারা মানববুদ্ধি ক্রমশঃ প্রখর হয় এবং এই প্রকারে ইহা আধুনিক বৈজ্ঞানিক যুগের পথ পরিষ্কৃত করে দেয়। খৃষ্টীয় সপ্তদশ শতাব্দিতে জগৎ-বিখ্যাত পণ্ডিত বেকন সাহেব আরিষ্টটলের মতানুযায়ী জ্ঞানানুশীলনের নুতনমার্গ প্রদর্শন করেন। তদবধি পাশ্চাত্যজগতে পুরাতন মার্গানুসৃত দর্শনশাস্ত্রের পূর্ব গৌরব খৰ্ব্ব হয়ে যায় এবং নববিজ্ঞানের অভ্যুদয় হয়। তিন শত বৎসরের মধ্যেই নববিজ্ঞান অতিদ্রুতপদে উন্নতিপথে কিরূপ অগ্রসর এবং উহার অসাধারণ উন্নতিতে সমগ্র জগৎ আজ কিরূপ বিমুগ্ধ, তা সকলেই জানেন। সুবিশাল জ্ঞানবৃক্ষের ভিন্ন ভিন্ন শাখা নিয়ে আজ নানা বিজ্ঞানশাস্ত্র রচিত এবং উহাদের উন্নতিও আজ অলৌকিক। নববিজ্ঞানের কল্যাণে পাশ্চাত্যজগৎ আজ সভ্যতাজ্যোতিতে উদ্ভাসিত এবং উহার যশসৌরভ আজ দিগদিগন্ত ব্যাপ্ত। নববিজ্ঞানের সাহায্যে পাশ্চাত্যজগৎ আজ সমগ্রজগৎ গ্রাস করতে উদ্যত এবং উহার ভয়ে সমগ্র জগৎ ভীত ও ত্রস্ত। নববিজ্ঞানের সাহায্যে জ্ঞানজগতে আজ অসংখ্য অসংখ্য সত্য আবিষ্কৃত এবং মানবসমাজের সুখবৰ্দ্ধনের জন্য অসংখ্য অসংখ্য উদ্ভাবনা আজ পরিকল্পিত। নববিজ্ঞানের সাহায্যে জঙ্গলাকীর্ণ পৃথিবী আজ রম্য নন্দনকাননে, শুষ্ক মরুভূমি আজ স্নিগ্ধ জলাশয়ে, কঠিন শৈল আজ সুকোমল শয্যায়, অনুজ্জ্বল অঙ্গার আজ সমুজ্জ্বল হীরকে পরিণত। নববিজ্ঞানের সাহায্যে প্রকৃতির উপর আজ আমাদের অদৃষ্টচর ও অশ্রুতপূৰ্ব্ব আধিপত্য বিস্তীর্ণ। বাষ্পীয়পোত(জলযান), বাষ্পীয়রথ, তাড়িৎ বার্তাবহ, তাড়িতালোক, টেলিফোন প্রভৃতি যে সকল উদ্ভাবনাবলে সভ্যজগতের সুখসম্ভার আজ সম্যক বৰ্দ্ধিত, তাহা কেবল বিজ্ঞানানুশীলনের একমাত্র ফল। বস্তুতঃ মানবসমাজের আধিভৌতিক উন্নতিসাধনে নববিজ্ঞান যুগান্তর আনয়নে সমর্থ। এখন জ্ঞানজগতে বিজ্ঞান কতকাল রাজত্ব করবে, তাহা কেহ বলতে পারেন না।
এখন অধ্যাত্মবিজ্ঞান সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ উল্লেখ করা যাক। অধ্যাক্সবিজ্ঞান, ব্রহ্মবিদ্যা, পরমার্থবিদ্যা, রাজগুহযোগ, গুপ্তবিদ্যা (Isoteric Science), তত্ত্ববিদ্যা(Theosophy) সকলই একপ্রকার শাস্ত্র। এ শাস্ত্র সম্বন্ধে ম্যাডাম ব্ল্যাভিষিক স্বরচিত পুস্তকাবলিতে কিঞ্চিৎ লিখিয়া যান। এ শাস্ত্র বহুকাল হইতে জনসাধারণের নিকট অবরুদ্ধদ্বার, এমন কি, ইহার অস্তিত্বের বিষয় কেহ অবগত নয়।
মহাত্মাগণের বিশ্বাস, অতিপ্রাচীনকালে বা সত্যযুগের প্রারম্ভে, যখন সুমেরুস্থ দেবভূমিতে স্থূলদেহবিশিষ্ট মানবের পরিবর্ত্তে সূক্ষ্মরূপধারী দেবগণ বিচরণ করেন তখন তাঁহাদের ভিতর অধ্যাত্মবিজ্ঞান দৈববাণীযোগে সৰ্ব্বপ্রথম প্রকটিত হয়। ইহাই প্রাথমিক শ্রুতি(Primeval revelation) বা বেদ; আধুনিক বেদ ও প্রত্যেক বৈশেষিক ধৰ্ম্মের ধৰ্ম্মগ্রন্থ ইহার নকলমাত্র। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেন–

ইমং বিবস্বতে যোগং প্রোক্তবানহমব্যয়ম্‌।
বিবস্বান্মনবে প্রাহ মনুরিক্ষাকবেহব্রবীৎ।।
এবং পরস্পরাপ্রাপ্তমিমং রাজষয়ো বিদুঃ
স কালেনেহ মহতা যোগো নষ্টঃ পরন্তপ।
স এবায়ং ময়া তেহদ্য যোগঃ প্রোক্তঃ পুরাতনঃ।
ভক্তোহসি মে সখা চেতি রহস্য হ্যেতদুত্তমম্‌।।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা চতুর্থোঽধ্যায়ঃ- জ্ঞানযোগ।

“আমিই পূৰ্ব্বে এই অবিনাশি যোগশাস্ত্র (অধ্যাত্মবিজ্ঞান) সূৰ্য্যদেবকে বলি, সূৰ্য্যদেব মনুকে, মনু ইক্ষ্বাকুকে বলেন। এই প্রকারে রাজর্ষিগণ পরম্পরাগত অধ্যাত্মবিজ্ঞান অবগত হন। কিন্তু কালক্রমে সেই ৰিজ্ঞান নষ্ট হইয়া যায়। তুমি আমার একান্ত ভক্ত, প্রিয় ও সখা এবং ইহাও অত্যুত্তম রহস্য; অতএব সেই পুরাতন যোগশাস্ত্র আজ আমি তোমায় বলিতেছি।”
যদি তুমি একথার গীতোক্ত প্রমাণ না মান, ইহার কোন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ দেওয়া এখন অসম্ভব। তোমার পূজ্যতম জড়বিজ্ঞান সবেমাত্র জগতে জন্মগ্রহণ করেছে। ব্ৰহ্মার সেই অমরপুত্র অধ্যাত্মবিজ্ঞানের সমক্ষে জড়বিজ্ঞান দুগ্ধপোষ্য বালক মাত্র; ইহা অধ্যাত্মবিজ্ঞানের অস্তিত্বের বিষয় কি জানবে? ইহার প্রত্নতত্ত্ব এখনও ঘোর তমসাচ্ছন্ন; কালক্রমে ইহার যতই উন্নতিসাধন হবে, প্রাচীনকাল সম্বন্ধে ততই নূতন নুতন সত্য জগতে আবিষ্কৃত হবে।
অনৈতিহাসিক সময়ে যে সকল জাতি জগতীতলে সভ্যতাসোপানে আরূঢ় হয় এবং যাহাদের ধৰ্ম্মগ্রন্থের বিশেষ নিদর্শন পাওয়া যায়, সে সকল প্রাচীন ধৰ্ম্মগ্রন্থ পাঠে স্পষ্ট বোধগম্য হয়, সকল ধৰ্ম্মের আদ্যস্তরটি প্রায় এক সমতলক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত এবং প্রাচীন ধৰ্ম্মগ্রন্থ মাত্রেই প্রায় একরূপ ভাবে ও মতামতে পূর্ণ। ইহাতে অনেকে অনুমান করেন, সকলগুলিই সেই প্রাচীনকালের অধ্যাত্মবিজ্ঞান হইতে সংগৃহীত। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানবিৎ পণ্ডিতদিগের মতে, মানব প্রকৃতি একপ্রকার বলিয়া প্রাচীনকালের যাবতীয় ধৰ্ম্মগ্রন্থ প্রায় একরূপ ভাবে পরিপূর্ণ। তাঁহারা বলেন, যেমন অসভ্যাবস্থায় বৰ্ব্বরজাতিমাত্রেই প্রস্তরনিৰ্ম্মিত অস্ত্র ব্যবহার করে এবং জড়োপাসনায় রত হয়, সেইরূপ মানবপ্রকৃতি একপ্রকার বলিয়া সেই প্রাচীনকালেও অতিদূরবর্ত্তী দেশের ধৰ্ম্মগ্রন্থগুলি প্রায় একরূপ মতামত প্রকাশ করে। ফলতঃ যখন ঐ সকল ধর্মগ্রন্থ অত্যুচ্চ অধ্যাত্মবিজ্ঞানের স্বৰ্গীয়ভাবে পূর্ণ, তখন আমরা কি প্রকারে বিশ্বাস করতে পারি, মানবপ্রকৃতি একরূপ বলিয়া উহার অত্যুচ্চ ভাব প্রকাশ করে ? অতএব এন্থলে অসম্পূর্ণ জড়বিজ্ঞানের কথায় কর্ণপাত করা আমাদের উচিত নয়।
যুগধৰ্ম্মানুসারে মানবদেহ ষেরূপভাবে স্থূলত্বে পরিণত হইয়া বিভিন্ন চৰ্ম্মাবৃত হয় এবং যেরূপতাকে তাঁহার তৃতীয় নয়ন ক্রমশঃ অপগত হতে থাকে, তাঁহার আধ্যাত্মিকতা সেই পরিমাণে হ্রাস প্রাপ্ত হয় এবং সেই সঙ্গে অধ্যাত্মবিজ্ঞানও মানবসমাজে গুপ্ত হয়ে যায়। এজন্য গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেন—
“স কালেন মহতা যোগোনষ্টঃ পরন্তপ।”
“হে অৰ্জুন! সেই যোগ বহুকালে নষ্ট হইয়া যায়।” মানবসমাজে ইহা ক্রমশঃ লুপ্ত হয় বটে; কিন্তু কোন কোন দেশে যোগেশ্বর মহাত্মাগণ, এ শাস্ত্র চিরদিন অনুশীলন করেন, যেমন ভারতবর্ষ, তিব্বত প্রভৃতিদেশ এবং কোন কোন দেশে মন্দিরের গুপ্তদীক্ষায় এ শাস্ত্র দীক্ষিত হয়, যেমন- গ্ৰীশদেশ। জনসাধারণ এ শাস্ত্রের বিষয় অবগত হইলে, যোগের অষ্ট সিদ্ধিলাভের জন্য অতীব ব্যগ্র হয়। ইহাতে কলিকালে মানবসমাজের প্রভূত, অনিষ্টোৎপত্তি হবার সম্ভাবনা; এজন্য মহাত্মাগণ যুগধৰ্ম্মে বাধ্য হইয়া অধ্যাত্মবিজ্ঞান সাধারণ মানবমণ্ডলীর ভিতর গোপন করেন। তাঁহারা নিভৃতস্থলে বা গিরিগহবরে থাকিয়া এ স্বৰ্গীয় শাস্ত্র অনুশীলন করেন। অধ্যয়ন দ্বারা এ শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তিলাভ হয় না। সদগুরুর কৃপা ব্যতীত ও যোগাভ্যাস ব্যতীত, এ শাস্ত্রে, কাহারও প্রবেশাধিকার নাই। যাঁহার আধ্যাত্মিকতা যেরূপ স্ফুরিত, অধ্যাত্মবিজ্ঞান তাঁহার সেইরূপ আয়ত্ত। এ শাস্ত্র আয়ত্ত করা, কলিকলুষিত মানবের দুঃসাধ্য। কোন মহাত্মাকে এ পাপনয়নে দর্শন করি নাই বা কোন মহাত্মার সদুপদেশ এ পাপকর্ণে শ্রবণ করি নাই, কেমন করিয়া সেই স্বর্গীয় অধ্যাত্মবিজ্ঞানের বিষয়অরগত হইব!
যে সকল যোগেশ্বর মহাত্মাগণ সময়ে সময়ে গুপ্ত অধ্যাত্মবিজ্ঞানের যৎকিঞ্চিৎ জগতে প্রচার করেন, তন্মধ্যে বশিষ্ঠাদি মহর্ষিগণ, জরথুস, শ্ৰীকৃষ্ণ, ব্যাসদেব, ঋষভদেব, যোগাচাৰ্য্য, কপিলদেব, হারমিজ, মুষা, কনফুউসস, বুদ্ধদেব, প্লেটো, ঈষা, মহম্মদ ও শঙ্করাচাৰ্য্য বিখ্যাত। তাঁহারা জনসাধারণের নিকট এই স্বৰ্গীয়শাস্ত্রের অত্যল্প মাত্র প্রচার করেন। কিন্তু তাঁহারা ইহার যৎসামান্য যাহা সাধারণভাবে প্রচার করেন এবং যেরূপ অলৌকিক যোগবল -ক্রমশঃ-

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s