বিদ্যা – অবিদ্যা


1wooden-saraswati-statue
পুরাণের বর্ণনা অনুসারে ভগবান নারায়ণ এবং দেবী লক্ষ্মীর মধ্যে কথোপকথনের সময় ভগবান নারায়ণের জিহ্বা থেকে এক পরমা সুন্দরী চতুর্ভুজা দেবীর আবির্ভাব ঘটে। চতুর্ভুজা দেবী আবির্ভুত হয়ে ভগবান নারায়ণের সামনে হাত জোড় করে দাঁড়ানোর পর ভগবান নারায়ণ দেবীকে বাক্শক্তি, জ্ঞান, শুভ চেতনা দানের জন্য নিযুক্ত করেন। সেই পরমা সুন্দরী দেবীর নাম রাখেন স্বরস্বতী। ভগবান নারায়ণের বাক্ বা কথা থেকে তিনি উৎপন্না বলে দেবীর আর এক নাম বাকদেবী। তিনি শুভ্রবস্ত্র পরিহিতা। তাঁর এক হাতে বীণা, এক হাতে পুস্তক, এক হাতে জপমালা এবং অন্য হাতে বরাভয় মুদ্রা। তিনি বীণা বাদনের সময় যখন দু-হাত ব্যবহার করেন তখন জপমালার হাত দিয়েই তিনি মানুষকে বরাভয় এবং আশীর্বাদ দান করে থাকেন। ভগবান নারায়ণের জিহ্বা থেকে যখন বাক্ দেবীর আবির্ভাব ঘটে তখন ভগবান নারায়ণের পৃষ্ঠদেশ থেকেও পরমাসুন্দরী দ্বিভূজা এক দেবীর আবির্ভাব ঘটে। তিনিও ভগবান নারায়ণের সামনে হাত জোড় করে দাঁড়ালে ভগবান নারায়ণ বললেন হে দেবী, তুমি যেহেতু আমার পৃষ্ঠদেশ থেকে উৎপন্ন হয়েছ তখন তোমার নাম হোক অবিদ্যা। যে সমস্ত মানুষ অর্থের ও বিদ্যার কারণে অহংকার পোষণ করবে তাদের তুমি অবিদ্যা দান করে বিপথগামী করবে। সেই থেকে একই সঙ্গে বিদ্যাদাত্রী স্বরস্বতী এবং অবিদ্যাদাত্রী দেবী সমভাবেই ত্রিলোক নিজ নিজ প্রভাব বিস্তারে ব্রতী হয়েছেন। কলির প্রভাবে পৃথিবীতে এখন বিদ্যাদেবীর চেয়ে অবিদ্যাদেবীর প্রাধান্যই পরিলক্ষিত হচ্ছে।
বৈদিক শিক্ষা ব্যবস্থায় শিশু চার বছর পূর্ণ হয়ে পাঁচ বছরে পা রাখলেই শুভদিন দেখে হাতে খড়ি দিয়ে বিদ্যা শিক্ষার ব্যবস্থা করা হতো। কাঁচা দুধ দিয়ে পাখীর পালক অথবা কঞ্চির কলম দিয়ে তিনবার কলাপাতায় লিখে দেয়ার পর শিশু তার উপর হাত ঘুরিয়ে বর্ণ লেখার অভ্যাস শুরু করতো। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সব কিছুরই পরিবর্তন ঘটেছে। এখন তিন বছর বয়সেই মা-বাবা তাদের সন্তানকে ইংরেজি নার্সারী স্কুলে ভর্তি করে দেন। প্রথাগতভাবে বিদ্যা শিক্ষা শুরু করার রীতি এখন শেষ হয়ে গেছে। স্বাধীনতা লাভের পরও রাষ্ট্র নায়কগণ বিদেশী ইংরেজি ভাষাকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আবশ্যিক ভাষা হিসেবে চালু না করলেও মাতৃভাষাকে গুরম্নত্ব না দিয়ে বিদেশী ইংরেজি ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের দ্বারা পরিচালিত কয়েক লক্ষ স্কুল, কলেজ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু রয়েছে। সারা বিশ্বজুড়েই অবিদ্যা প্রাধান্য থাকায় শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের সংখ্যা কমে গেছে। বিশ্বে ভোগ, বিলাস, ব্যভিচার, দম্ভ ও অহংকারের যেমন প্রাধান্য ঘটেছে তেমনি অবিদ্যা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মানুষ হিংসা, দ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, নারীর উপর অত্যাচারের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এক শ্রেণীর সন্ত্রাসবাদীর হুমকির কারণে বিদ্যা অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। তাতে বিদ্যার কোন ৰতি না হলেও ক্ষতি হচ্ছে মানব সভ্যতার। কারণ সূর্য, চন্দ্র, যেমন সকলকেই কিরণ দান করেন। নদী যেমন সকলকে জল দান করেন তেমনি বিদ্যা সকলেরই জন্য। যারা বিদ্যার আরাধনা করেন না তাদের একটা বড় অংশের মানুষকেই শেষ জীবনে বৃদ্ধাশ্রমে চরম অবহেলা এবং অনাদরে শেষ সময়টুকু কাটাতে হয়।
বৈদিক শিক্ষা ব্যবস্থায় মা ও বাবাকে দেব-দেবীর চেয়েও উচ্চ আসনে বসানো হয়েছে। বলা হয়েছে মাতা গুরু, পিতা গুরু, গুরু জ্যেষ্ঠ ভাই তার চেয়ে অধিক গুরু ত্রিজগতে নাই। যে কারণে প্রতিনিয়ত চলার পথে মা-বাবা এবং গুরুজনদের শ্রদ্ধা জানানো হতো। ইংরেজি শিক্ষার প্রভাবে আমরা আমাদের সনাতনী শিক্ষা ব্যবস্থাকে অবহেলা করার কারণে আমাদের মধ্যে যে ভোগবাদ সৃষ্টি হয়েছে তাতে আমরা আমাদের গুরুজনদের কথা ভুলে গেছি। বৃদ্ধ মা-বাবাকে অনেক ক্ষেত্রেই খরপোষ পাওয়ার জন্য আদালতের শরণ নিতে হচ্ছে।
ছোট সময়ে আমরা অধীর আগ্রহে স্বরস্বতী পূজার দিনটির জন্য অপেক্ষা করতাম। স্বরস্বতী পূজার অন্যতম ফুল হচ্ছে পলাশ ফুল। অভাবে উদাল ফুল।
এই মরশুমী স্বরস্বতী পূজার আগে থেকেই ফুটতে শুরু করে। শীত শেষ হলে এরাও আর ফুটে না। স্বরস্বতী দেবীর চরণে আত্মনিবেদনের জন্যই যেন পলাশের আবির্ভাব। পূজায় আমের মুকুল এবং কুল বড়ই লাগে। আমের মুকুল এবং কুল বড়ই স্বরস্বতী পূজার সময়েই পাওয়া যায়। নূতন বই। নূতন ক্লাসের আনন্দের মধ্যেই বিদ্যাদেবীর আরাধনার দিনটি আসে বলে স্কুল জীবনে স্বরস্বতী পূজা এক পরম আনন্দ নিয়েই আবির্ভূত হত। এখন যে সব ছেলে-মেয়েরা ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ে। অবিদ্যার প্রভাবে দেশে প্রেমের অভাব ঘটায় এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ এবং উচ্চ পদস্থ কর্মচারী গরীবের অর্থ শোষণ করে বিদেশী ব্যাংকে সুদ দিয়ে টাকা জমা রেখে আর্থিক এবং নৈতিক দিক দিয়ে দেশকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এরাই বিভিন্ন নেশায় ডুবে গিয়ে রাতের পর রাত হোটেলে অতিবাহিত করে যৌবন পার করে নিঃস্ব হয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে মৃত্যু কামনা করছে।
সুখ, যৌবন মানব জীবনে বিদ্যুৎ চমকের মতোই। কোটি কোটি বছর ধরে চলে আসা ধর্মের ঋষিগণ ও সাধকগণ তাই মানব জীবনে সাধনার গুরুত্বের কথা বলে এসেছেন। সাধনায় ভক্তি ও শ্রদ্ধার উন্মেষ ঘটে। আর সে কারণেই মানুষ হতাশায় যেমন নিমজ্জিত হয় না তেমনি আনন্দেও উল্লাসিত হয় না।
দুর্ভাগ্যের বিষয় সেই বিদ্যাকে দূরে সরিয়ে আমরা অবিদ্যাকে নিয়েই মেতে রয়েছি। দেবী স্বরস্বতীর আবির্ভাব ঘটেছিল মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে। তাই এই তিথিতে মা স্বরস্বতীর আরাধনা করে ভগবান বিষ্ণু স্বয়ং ত্রিলোকে দেবী স্বরস্বতীর পূজার প্রচলন করেছিলেন। বিদ্যা আমাদের নির্মল ভক্তি ও জ্ঞান অর্জনের শক্তি দান করুন। তাতেই আমাদের মর্তের পৃথিবীতে শান্তি, সমৃদ্ধি ও ভালবাসার বিকাশ ঘটবে।

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s