দর্শনের সাথে জড়বিজ্ঞানের বিরোধ।


Image result for philosophy and scienceImage result for philosophy and science

যেরূপ পাশ্চাত্যবিদ্যার সার পাশ্চাত্যবিজ্ঞান, সেইরূপ প্রাচ্যবিদ্যার সার দর্শনশাস্ত্র। ইহাকে প্রাচ্যবিজ্ঞান বলা যায়। প্রসর, ক্রিয়া, বিষয় ও উদেশ্য লইয়া প্রাচ্য ও প্রতীচ্যবিজ্ঞানের ভিতর অনেক প্রভেদ।
প্রাচ্যবিজ্ঞান মূলানুসন্ধায়ী যুক্তিবলে (By Synthetic a priori Deductive method) তত্ত্বোম্ভেদ করে। ইহা প্রথমে পদার্থের কতকগুলি মৌলিক গুণনির্দ্দেশ করিয়া উহার বাহ্যগুণাগুণ বিচারে প্রবৃত্ত হয়। মৌলিক গুণনির্দ্দেশে ইহা কোনরূপ প্রমাণ চায় না, বরং উহাদিগকে এক প্রকার স্বতঃসিদ্ধান্ত করিয়া লয়। কিন্তু উহাদের সাহায্যে ইহা যাবতীয় পদার্থের বাহ্যগুণাগুণ বিচার ও সিদ্ধান্ত করে। মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিতদিগের মতে বস্তুর মৌলিক গুণ, যাহা দর্শন স্বতঃসিদ্ধান্ত করিয়া লয়, তাহা অধ্যাত্মবিজ্ঞান হইতে গৃহীত। তাহার সাক্ষ্য, বেদান্তের মায়াবাদ ও পরব্রহ্মের অস্তিত্ব, সাংখ্যদর্শনের বস্তুর মৌলিক গুণ এবং যোগের নিয়মাবলি অধ্যাত্মবিজ্ঞান হইতে গৃহীত। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানবিৎ পণ্ডিতগণ বলেন, দর্শন প্রতিপাদিত বস্তুর মৌলিক গুণাগুণ কেবল অনুমানসিদ্ধ। বস্তুতঃ এ কলিযুগে আমাদের আধ্যাত্মিক অধঃপতন বশতঃ আমরা উহাদিগকে এখন অনুমানসিদ্ধ জ্ঞান করিয়া থাকি।
পাশ্চাত্যবিজ্ঞান কার্য্যানুসন্ধায়ী-যুক্তিবলে (By Analytic, a posterior, Inductive method) তত্ত্বান্বেষণ করে। ইহা পৰ্য্যবেক্ষণাদি বলে পদার্থ বিশেষের বাহ্যগুণাগুণ সম্যক বিচার করিয়া, অথবা পরীক্ষাগারে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রদ্বারা পদার্থ বিশেষের বাহ্য গুণ গুণ সম্যক পরীক্ষা করিয়া, উহার আভ্যন্তরিণ মৌলিকধৰ্ম্ম নির্দ্দেশ করিতে চেষ্টা পায়। দর্শন সকল বিষয়ের প্রাথমিক অন্তঃস্তর অনুমানবলে সিদ্ধান্ত করিয়া, অথবা অধ্যাত্মবিজ্ঞানলব্ধ সত্য দ্বারা মীমাংসা করিয়া, উহাদের বাহ্যস্তর গুলি প্রথমোক্তস্তর সাহায্যে ব্যাখ্যা করে। কিন্তু বিজ্ঞান পদার্থ বিশেষের বাহ্যস্তরগুলি অতি মনোনিবেশ পূর্ব্বক পর্য্যালোচনা করিয়া তল্লব্ধজ্ঞানে উহার অন্তঃস্তর ব্যাখ্যা করিতে চেষ্টা পায়। দর্শনের গতি কেন্দ্র হইতে পরিধির দিকে (Centrifugal); আর বিজ্ঞানের গতি পরিধি হইতে কেন্দ্রের দিকে (Centripetal)। দর্শন বস্তুর সাধারণ ধৰ্ম্ম হইতে বৈশেষিক ধৰ্ম্মের অনুসন্ধানে তৎপর; আর বিজ্ঞান বস্তুর বৈশেষিক ধৰ্ম্ম সম্যক আলোচনা করিয়া উহার সাধারণ ধৰ্ম্ম আবিষ্কার করিতে ব্যগ্ৰ।
এ দেশের প্রাচীন আয়ুৰ্ব্বেদশাস্ত্র ও আধুনিক উন্নত ইংরাজিচিকিৎসাবিজ্ঞান পৰ্য্যালোচনা করিলে, দর্শন ও বিজ্ঞানের বিরোধ ভালরূপ বুঝা যায়। প্রাচ্য আয়ুৰ্ব্বেদের মূলভিত্তি দর্শনপ্রতিপাদিত, অনুমানসিদ্ধ বাতপিত্ত কফের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং প্রত্যেক আয়ুৰ্ব্বেদ গ্রন্থে প্রত্যেক পীড়া বাতজ, পিত্তজ ও কফজ এই তিন শ্রেণীতে বিভক্ত। কিন্তু পাশ্চাত্য চিকিৎসাবিজ্ঞান শবব্যবচ্ছেদলব্ধ চাক্ষুস পরীক্ষিত প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং ইহার প্রত্যেক গ্রন্থে পীড়া গুলি শরীরের যন্ত্রানুসারে বিভক্ত। সত্য বটে, কবিরাজগণ মনে করেন, বাত পিত্ত কফ এই মতটি প্রাচীনকালের আর্য্যঋষিদিগের যোগসিদ্ধ বা অধ্যাত্মবিজ্ঞান হইতে সংগৃহীত; কিন্তু আধুনিক পাশ্চাত্যপণ্ডিতগণ বিবেচনা করেন, ইহা কেবল অনুমানসিদ্ধ। তাঁহারা ভাবেন, মুখ ও মলদ্বার হইতে বাত, পিত্ত ও কফ নিঃসৃত হয়, অতএব বাত পিত্ত কফই শরীরের প্রধান রস এবং উহাদের বিকৃতিতে শরীরের বিকৃতি ও উহাদের সাম্যাবস্থায় শরীরের স্বাস্থ্যভোগ। তাঁহারা আরও ভাবেন, যেমন ভারতীয় দর্শনশাস্ত্রে সত্ত্বরজস্তম প্রকৃতির ত্রিগুণ, সেইরূপ ভারতীয় আয়ুৰ্ব্বেদশাস্ত্রে বাত পিত্ত কফ শারীরিক প্রকৃতির ত্রিগুণ।
এখন বাত পিত্ত কফ এই মতটি সত্য হউক বা মিথ্যা হউক, অনুমানসিদ্ধ হউক বা যোগসিদ্ধ হউক, এই বাত পিত্ত কফ লইয়াই আয়ুৰ্ব্বেদশাস্ত্রে সমস্ত পীড়ার লক্ষণ নির্দেশ করা হয়। কিন্তু পাশ্চাত্যচিকিৎসাবিজ্ঞান প্রত্যেক রোগের প্রত্যেক লক্ষণটি শরীরস্থ যন্ত্রের বিকৃতির সহিত দেখিতে চেষ্টা পায় এবং কোন রোগে যন্ত্রের কিরূপ বিকার উপস্থিত হয়, তাহারই ভালরূপ অনুসন্ধান করে। আয়ুৰ্ব্বেদবিজ্ঞান ও পাশ্চাত্য চিকিৎসাবিজ্ঞান উভয়েই প্রত্যেক রোগের লক্ষণ ও উপসর্গ ভালরূপ পর্যবেক্ষণ করে ও নানারোগ আরোগ্য বা উপশম করে। কিন্তু আয়ুৰ্ব্বেদ শারীরিক প্রকৃতির অদ্যস্তর বাত পিত্ত কফ সিদ্ধান্ত করিয়া উহাদের যোগে রোগের বাহ্য লক্ষণ গুলি ব্যাখ্যা করে; আর পাশ্চাত্যবিজ্ঞান রোগের লক্ষণ, উপশম ও যন্ত্রের বিকারাদি সমস্ত পর্য্যবেক্ষণ করিয়া উহাদের আদি কারণ আবিষ্কার করিতে বা উহাদের সাধারণ ধৰ্ম্ম নির্দ্দেশ করিতে চেষ্টা পায়। আয়ুৰ্ব্বেদের গতি কেন্দ্র হইতে পরিধির দিকে বা সাধারণ ধৰ্ম্ম হইতে বৈশেষিক ধৰ্ম্মের দিকে, আর পাশ্চাত্যচিকিৎসাবিজ্ঞানের গতি পরিধি হইতে কেন্দ্রের দিকে বা বৈশেষিক ধৰ্ম্ম হইতে সাধারণ ধৰ্ম্মের দিকে। প্রথমের ভিত্তি প্রাচ্য দর্শনশাস্ত্র, আর অপরের ভিত্তি পাশ্চাত্য বিজ্ঞানশাস্ত্র।
বিষয় ও উদ্দেশ্য লইয়া দর্শন ও বিজ্ঞানের বিস্তর পার্থক্য আছে। দর্শন অধ্যাত্মজগৎ ও মনোজগতের তত্ত্বান্বেষণে যেমন অধিক রত, বাহ্যজগতের সত্যানুসন্ধানে সেইরূপ অল্প রত, আর বিজ্ঞান বাহ্যজগতের ‘সত্যান্বেষণে যেমন অধিক অনুরক্ত, মনোজগতের তত্ত্বান্বেষণে সেইরূপ অল্প অনুরক্ত। দর্শন অধ্যাত্মবিজ্ঞানের সুবিমল জ্যোতিঃ প্রাপ্ত হইয়া মনোজগতের ক্রিয়া সম্যক ব্যাখ্যা করে; আর বিজ্ঞান পঞ্চেন্দ্রিয় যোগে বাহ্যজগতের সুবিমল জ্যোতিঃ প্রাপ্ত হইয়া মনোজগতের ক্রিয়া ব্যাখ্যা করিতে চেষ্টা পায়। দর্শনের মতে স্থূলজড় সূক্ষ্মবুদ্ধির চরম পরিণাম বা বিকার; ইন্দ্ৰিয়াতীত সূক্ষ্মবুদ্ধি ও সূক্ষ্মপদার্থের ক্রমবিবৰ্ত্তনে ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য স্থূল বিশ্বপ্রপঞ্চ সৃষ্ট। কিন্তু বিজ্ঞানের মতে কেবলমাত্র জড় ও শক্তির সংযোগে ও বিয়োগে এ জগৎ সৃষ্ট; ইহার মতে সূক্ষ্মবুদ্ধি স্থূলজড়ের চরম পরিণাম, স্থূলজড় ভৌতিক নিয়মানুসারে ক্রমবিবৰ্ত্তিত হইয়া উৎকৃষ্ট জীবদিগের স্বল্পবুদ্ধি উৎপাদন করে। দর্শনের মতে মানববুদ্ধি বৈশেষিক ও স্বৰ্গীয়, পশুবুদ্ধি হইতে সম্পূর্ণ বিভিন্ন। বিজ্ঞানের মতে মানববুদ্ধি ও পশুবুদ্ধিতে পরিমাণগত বিস্তর প্রভেদ থাকিলেও বস্তুতঃ কোন প্রকারগত প্রভেদ নাই; কেবল মানবের মস্তিষ্ক অধিক স্ফুরিত হওয়ায় তাহার বুদ্ধি শক্তি এত অধিক স্ফুরিত। দর্শনের মতে মানবজাতি ব্যতীত উৎকৃষ্ট বুদ্ধিবিশিষ্ট বিভিন্ন অবস্থাপন্ন জীব অন্য অদৃশ্য জগতে বিদ্যমান; কিন্তু বিজ্ঞানের মতে উহা এক প্রকার অসম্ভব কথা।
দর্শনের প্রধান উদ্দেশ্য মানবের আধ্যাত্মিক উন্নতি; কি প্রকারে তাঁহার আত্মার প্রকৃত উন্নতিসাধন হয়; কি প্রকারে তিনি এ জগতের দ্বন্দ্বজ ক্ষণস্থায়ি আধিভৌতিক সুখ দুঃখ উপেক্ষা করতঃ প্রকৃত আধাত্মিক সুখে সুখী হন। ইহার মতে মানবের চরম উন্নতি, কি প্রকারে তিনি যোগবলে অলৌকিক ক্ষমতা প্রাপ্ত হন; কি প্রকারে তাঁহার আত্মায় অষ্টসিদ্ধি স্ফুরিত হইয়া তিনি যোগবলে বলীয়ান হন; কি প্রকারে ধৰ্ম্ম প্রবৃত্তিগুলি স্ফুরিত হইয়া তিনি দেবত্বে পরিণত হন।
বিজ্ঞানের প্রধান উদ্দেশ্য মানবের আধিভৌতিক উন্নতি; কি প্রকারে তিনি এ জগতে অশেষ ভৌতিক সুখে সুখী হন; কি প্রকারে তিনি নিজ বুদ্ধি বলে প্রকৃতির বিপক্ষে গমন করতঃ আপন ইন্দ্রিয় সুখসম্ভার বৃদ্ধি করেন। ইহার নিকট এই প্রত্যক্ষ পরিদৃশ্যমাণ জগৎই সৰ্ব্বস্ব এবং এই স্থূলজগতের উপর আধিপত্য বিস্তারই ইহার চরম উদ্দেশ্য। বিজ্ঞান কেবল মানবের বুদ্ধিশক্তির প্রাধান্য স্বীকার করে এবং বুদ্ধি বলে তাঁহাকে দেবত্বে পরিণত করিতে চাহে। ইহার মতে ধৰ্ম্ম মানবমনের দুৰ্ব্বলতামাত্র।
বিজ্ঞানের মতে এ জগতের এক অজ্ঞেয় কারণ থাকিলেও থাকিতে পারে; কিন্তু ইহ লোকপ্রখ্যাত বা লৌকিক ঈশ্বরের অস্তিত্ব মানে না। ইহার মতে আত্মার ও অস্তিত্ব নাই, পরলোকেরও অস্তিত্ব নাই এবং মানবের যথাসৰ্ব্বস্ব মানবমন কেবল মানবমস্তিষ্ক হইতে উৎপন্ন বা উহার ক্রিয়া মাত্র। পঞ্চেন্দ্রিয়যোগে বাহ্য বস্তুর যে জ্ঞান লাভ করা যায়, তাহাই ইহার মতে একমাত্র প্রমাণসিদ্ধ এবং তাঁহাই একমাত্র বিশ্বসনীয়। ইহার মতে অতীন্দ্রিয় জ্ঞান কল্পনা মাত্র। ইহা অনুমানসিদ্ধ প্রমাণকে একেবারে আগ্রাহ করে এবং যাহা চাক্ষুস প্রমাণ, তাহাই সাদরে গ্রহণ করে।
এইরূপ নানাবিষয় লইয়া দর্শনের সহিত বিজ্ঞানের ঘোরতর বিবাদ বিসম্বাদ চলিতেছে। এ বিবাদ মিটিয়া যাইবে কি না, বা কত দিনে মিটিবে, তাহা এখন বলা যায় না।

সংকলনে- কৃষ্ণকমল।

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s