বিজ্ঞানকর্ত্তৃক দর্শনের দোষোদঘাটন।


Image result for philosophy and science

আধুনিক উন্নত জড়বিজ্ঞানের মতে দর্শনশাস্ত্র অসার, শূন্যগর্ভ ও কাল্পনিক জ্ঞানে পরিপূর্ণ; এ শাস্ত্রের আলোচনায় সমাজের তাদৃশ কোন বিশেষ উপকার নাই এবং এই অপদার্থ ও অলীক শাস্ত্র অনুশীলন করিয়াই এতকাল সুধীবর্গ কেবল বিপথে চালিত হন। আজ কাল অনেকেই বলেন, যে দিন হইতে বিজ্ঞান পাশ্চাত্য জগতে পদার্পণ করে, সেই দিন হইতেই মানবসমাজ প্রকৃত জ্ঞানালোকে উদ্ভাসিত হয় এবং তৎপূৰ্ব্বে উহা ঘোরান্ধকারে আচ্ছন্ন থাকে। তাহার সাক্ষ্য দেখ না, পাশ্চাত্য জগৎ বিজ্ঞানালোক প্রাপ্ত হইয়া উন্নতির পথে কিরূপ দ্রুতপদে অগ্রসর, আর প্রাচ্যজগৎ দর্শনশাস্ত্র অনুশীলন করিয়া কিরূপ রক্ষণশীল বা কিরূপ অবনত ? অতএব দর্শনশাস্ত্র অপেক্ষা বিজ্ঞান যে সহস্র গুণে শ্রেষ্ঠ, তদ্ববিষয়ে অনুমাত্র সন্দেহ নাই। ফলতঃ জগৎ ক্রমশঃ উন্নতির দিকে ধাবমান বলিয়াই আজকাল জ্ঞানের এত উন্নতি ও বিজ্ঞানের এত প্রাদুর্ভাব।

বিজ্ঞানের মতে একজন দর্শনশাস্ত্রবিশারদ পণ্ডিত অপেক্ষা একজন অধমাধম জুতানিৰ্ম্মাতা ও সমাজের অধিক উপকারক। দর্শনশাস্ত্র অনুশীলন করিয়া একজন পণ্ডিত সমাজের যে কি উপকার সাধন করেন, তাহা বুঝা যায় না; কিন্তু একজন জুতা-নিৰ্ম্মতা জুতা প্রস্তুত করিয়া লোকের পদযুগল কণ্টকাদি হইতে রক্ষা করে; অতএব সে ব্যক্তি সমাজের মহোপকারক। আর নিভৃতে একজন দার্শনিক পণ্ডিত জটিল দুর্বোধ্য দর্শনশাস্ত্র অনুশীলন করিয়া কতকগুলি মানবকপোলকল্পিত জ্ঞানে বিভোর হন ও কাল্পনিক আনন্দে উন্মত্ত হন; আর সেই সঙ্গে তিনি সংসারের অস্তিত্ব বিস্মৃত হন; অতএব তিনি সংসারের একজন অপোগণ্ডক মাত্র। যে বেদান্ত অধ্যয়ন করিয়া লোকে সংসার ত্যাগ করিতে ও বিজয় পান করিতে শিক্ষা করে, সেই বেদান্তের আবার সুখ্যাতি করা উচিত ? সমাজ আর কিরূপে অধঃপাতে যায়, বল ?

বিজ্ঞানের মতে দার্শনিক জ্ঞান মাত্রেই কাল্পনিক ও ভ্রমসঙ্কুল, আর বাগড়ম্বরে ও বাক্যালঙ্কারে পূর্ণ; দর্শনের ভালরূপ পর্য্যবেক্ষণ, পরীক্ষা ও পরিদর্শন নাই এবং পরীক্ষাযন্ত্র ত আদৌ নাই; আছে মাত্র কেবল স্বকপোলকল্পনা ও অনুমান। উহাদের সাহায্যে দার্শনিক পণ্ডিত একটি অপরূপ জ্ঞানবূহ্য রচনা করেন এবং তাহাতেই আপনাকে জড়ীভূত করিয়া ফেলেন।

বিজ্ঞানের মতে দর্শনশাস্ত্র মূলে ভ্রান্ত; ইহার মৌলিক বিশ্বাস গুলি সৰ্ব্বৈব অনুমানসিদ্ধ; সেজন্য ইহা আদ্যোপান্ত ভ্ৰমেই পরিপূর্ণ। দেখ, যে অট্টালিকার বনিয়াদ মন্দ, সে অট্টালিকা মন্দ এবং ইহা কদাচ বহুকাল স্থায়ী হইতে পারে না। সেইরূপ দর্শনের বুনিয়াদ মন্দ, ইহা কতকগুলি অনুমানসিদ্ধ প্রমাণের উপর প্রতিষ্ঠি ; অতএব ইহা কি প্রকারে বহুকাল স্থায়ী হইতে পারে ? দর্শন বস্তর যে সকল মৌলিক গুণ নির্দেশ করে বা প্রকৃতির আদ্যস্তর যেরূপভাবে বর্ণন করে, বিজ্ঞান তাহা কস্মিনকালে গ্রাহ্য করিতে পারে না এবং এক তুড়িতে তাহা উড়াইয়া দিতে চেষ্টা পায়। সেজন্য বিজ্ঞান দর্শনপ্রতিপাদিত ঈশ্বর, আত্মা, পরলোক, অতীন্দ্রিয়জ্ঞান প্রভৃতি কিছুই মানে না।

বিজ্ঞান সদৰ্পে ও সাহঙ্কারে দর্শনের উপর উপহাস করিয়া বলে, “রে ভ্রান্তদর্শন! ত্রিংশ শতাব্দি ব্যাপিয়া তুমি যে মানবমনকে চালাইয়া আসিলে, তাহাতে তুমি মানবসমাজের কি কি মঙ্গলসাধন করিয়াছ, বল? এতকাল মানবসমাজ কেবল তোমার অনুশীলন করিয়া বিপথে চালিত হয় এবং ঘোরান্ধকারে আচ্ছন্ন থাকে। কিন্তু দেখ, অল্পদিন মাত্র হইতে চলিল, আমি পাশ্চাত্যসভ্যজগৎ চালিত করিতেছি; ইতিমধ্যেই সৰ্ব্বত্র আমার বাহবা পড়িয়া গিয়াছে এবং সৰ্ব্বত্র আমার জয়জয়কার হইতেছে। তাহার সাক্ষ্য দেখ না, আমার সৃষ্ট বাষ্পীয়রথ, বাষ্পীয়পোত, তাড়িৎবাৰ্ত্তাবহ দ্বারা মানবসমাজের যে কত মহোপকার সাধিত তাহার কি কিছুমাত্র ইয়ত্তা আছে ? ভবিষ্যতে আমি নুতন নূতন আবিষ্কার ও উদ্ভাবনাবলে মানবসমাজের সুখসমৃদ্ধি আরও যে কি পরিমাণে বৰ্দ্ধন করিব, তাহারও কিছুমাত্র ইয়ত্তা নাই। রে নিবোধ দর্শন! এতদিন মানব কেবল তোমার কুহকে পতিত হইয়া নিজ শ্রেয় বুঝিতে পারেন নাই এবং তুমিই তাঁহাকে প্রকৃত সভ্যতাসোপানে আরোহন করিতে দেও নাই। আজকাল সভ্যজগতের লোকেরা তোমার গুণাগুণ ভালরূপ বুঝিতে পারিয়াছে, তজ্জন্য তাহারা আর তোমার কুহকজালে পতিত হয় না। তোমার অপদার্থতা ও অসারত্ব দর্শন করিয়াই ত তাহারা আজকাল তোমার এত অনাদর করে। বস্তুতঃ তোমাতে অনুমাত্র সারবত্তা নাই, তুমি সৰ্ব্বথা অনাদরেরই পাত্র।”

আজকাল সভ্যজগতে জড়বিজ্ঞানেরই প্রাদুর্ভাব ও সমাদর; অতএব বিজ্ঞান দর্শনসম্বন্ধে যাহা প্রকাশ করে, জনসাধারণ তাহাই শিরোধাৰ্য্য করিয়া লয়। কিন্তু যাঁহারা প্রকৃতজ্ঞানী, তাঁহারা কদাচ দর্শনের অনাদর করেন না। তাঁহারা ভালরূপ জানেন, যে দর্শন মানবকে আধ্যাত্মিক পথে অগ্রসর করায়, যে দর্শন জগতের আদ্যস্তর সম্যক ব্যাখ্যান করে, সেই দর্শন কি কদাচিৎ অনাদরের পাত্র হইতে পারে? আর যাঁহারা জগতের বাহ্যিক চাকচিক্যে মুগ্ধ ও ক্ষণভঙ্গুর আধিভৌতিক উন্নতির জন্য ব্যগ্র, তাঁহারাই বিজ্ঞানের সমাদর ও দর্শনের অনাদর করেন।

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s