প্রভু জগন্নাথের আত্মাবদল কীভাবে হয়?


Image result for puri temple

আর কিছুদিন পরে পুরীর মন্দিরে নবকলেবর উৎসবের মধ্য দিয়ে শ্রীজগন্নাথদেব, শ্রীবলভদ্র ও শ্রীসুভদ্রার নতুন দারুমূর্তি নির্মাণ করে তাতে ব্রম্ভ স্হাপনের পবিত্র কাজটি সুসম্পন্ন হবে. এই ব্রম্ভ স্হাপনকেই বলা হয় আত্মাবদল. “শুদ্ধ আষাঢ়”-এর অমাবস্যার দিন চোখ বেঁধে এই আত্মাবদলের কাজটি সুসম্পন্ন করবেন এক প্রবীণ দইতাপতি. শোনা যায়, আত্মাবদলের এই কাজটি করার পর সেই প্রবীণ দইতাপতি আর বেশিদিন বাঁচেন না. জগন্নাথদেবের আত্মাবদল উৎসবের তাৎপর্য কী? কী ভাবেই বা তা হয়.

অপেক্ষা আর মাত্র কয়েক মাসের. পুরীর মন্দিরে পুনরায় ‘নব-কলেবর’ নামে এক বিশেষ উৎসবৈর মধ্য দিয়ে শ্রীজগন্নাথদেবের, শ্রীবলভদ্র ও শ্রীসুভদ্রার নতুন দারুমূর্তি নির্মাণ করে তাতে ‘ব্রম্ভ’ স্হাপনের পবিত্র তম কাজটি সুসম্পন্ন হবে. ব্রম্ভ স্হাপনের অর্থ প্রাণপ্রতিষ্ঠা. পুরানো কলেবর পরিত্যাগ করে এই তিন বিগ্রহের নব শ্রীঅঙ্গধারণ. পুরানো দারুমুর্তিগুলিরই ‘ব্রম্ভ’ নতুন মুর্তিতে অত্যন্ত গোপন এক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে স্হানান্তরিত হয়. তিন বিগ্রহের পাশাপাশি সুদর্শনেও ‘নব কলেবর’ ও ‘ব্রম্ভ’ স্হাপন হয়. যিনি জগদীশ্বর, যাঁর ইচ্ছা অনিচ্ছায় এই বিশ্ব ব্রম্ভান্ডের স্হিতি ও লয় সেই জগন্নাথদেবের আত্মা পরিবর্তন? তাও আবার কিনা রক্ত মাংসের এক মানুষের হাতে! এ কেমন কথা?

হিন্দু ধর্ম বিশ্বাস করে আত্মা অবিনশ্বর. সেই আত্মা শুধু এক শরীর থেকে আর এক শরীরে আশ্রয়লাভ করে. শ্রীমদ্ভগবদগীতার শ্লোক-স্মরণ করা যেতে পারে. যুদ্ধক্ষেত্রে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুণকে আত্মার প্রকৃত স্বরুপ জানার কথা বলেছেন. এই আত্মার কখনও জন্ম হয় না বা মরেনও না এই আত্মার অস্তিত্ত্ব উৎপত্তিসাপেক্ষ নয়.কারণ, আত্মা জন্মরহিত নিত্য, সনাতন এবং পুরাতন, শরীর বিনষ্ট হলেও আত্মা বিনষ্ট হন না. যেমন মানুষ পুরানো বস্ত্র পরিত্যাগ করে অন্য নতুন বস্ত্র গ্রহণ করে, তেমনই জীবাত্মা পুরানো শরীরগুলিকে ত্যাগ করে অন্য নতুন শরীর গ্রহন করে. মানুষের যেমন জন্ম-মৃত্যু আছে, জগন্নাথদেবও তাঁর পুরনো শ্রী অঙ্গ ছেড়ে নতুন দেহ ধারন করেন.

সম্ভবত এরকম ধারনা থেকে জগন্নাথদেবের ‘নব-কলেবর’ কথাটির উৎপত্তি. এই নব-কলেবর কী ভাবে সংঘটিত হয়? কীভাবেই বা “ব্রম্ভ” পরিবর্তনের ঘটনাটি ঘটে? পুরীর মন্দিরের এইসব গূঢ় ব্যাপার সম্বন্ধে আলোকপাত করার অব্যবহিত পূর্বে জানিয়ে রাখি, নব-কলেবর ও ব্রম্ভ দুটি বিষয়ই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত. অর্থাৎ জগন্নাথদেবের নব কলেবর না হলে ব্রম্ভ পরিবর্তনের প্রশ্ন নেই. আবার ব্রম্ভ পরিবর্তন না হলে নব-কলেবরের কোনও অর্থই হয় না. ব্রম্ভহীন পুরানো দারুমূর্তিগুলিই বা কোথায় রাখা হয়?..

নব কলেবর ও রথযাত্রা একসঙ্গে হলে তার গুরুত্বও সীমাহীন. ১৯৯৬ সালে সেরকম ব্যাপার হয়েছিল.সেবার রথযাত্রা হয়েছিল অন্য চেহারার. বলা যায় জন বিস্ফোরন হয়েছিল পুরীতে. এই বছর নব-কলেবর উৎসব শুরু ২৩শে মে, আর রথ যাত্রা প্রায় দুমাস পরে ১৮ই জুলাই. ১৯৯৬ থেকে ২০১৫ সাল, দীর্ঘ ১৯ বছর পর নব কলেবর উৎসব হতে চলেছে. একবিংশ শতাব্দীর এটিই প্রথম নবকলেবর. তাই এর গুরুত্ব সীমাহীন. জগন্নাথদেবের সব কলেবর সম্বন্ধে একটা কথা বলার আছে তাঁর নব কলেবরের বিশেষ নিম গাছের ইদানীং কিন্তু ওড়িশার উপকূলবর্তী অঞ্চল গুলিতেই পাওয়া যাচ্ছে. ১৯৫০ সালে জামালপুর গ্রামের এক মুসলমানের বাড়িতে শ্রীবলভদ্রের নিমগাছের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল. সেই কাঠ দিয়েই বলভদ্রের মূর্তি নির্মাণ করা হয়.

পুরীর মন্দিরের অন্যতম প্রধান উৎসব এই নবকলেবর. এ দেশের আর কোনও মন্দিরেই নবকলেবরের মতো বিস্তৃত অনুষ্ঠান হয় না. এক্ষেত্রে পুরীর জগন্নাথদেবর মন্দির অবশ্যই অনন্যতা দাবি করতে পারে. যে মাসে চন্দ্রমাস গণনা অনুসারে দুটি আষাঢ় মাস হয়, সেই বছর জগন্নাথদেবের ‘অনবসর’ সময় ১৫ না হয়ে ৮৫ দিনে হয়. দ্বিতীয় মাসটিকে মলমাস বলে. এই সময় জগন্নাথদেব, বলভদ্র, সুভদ্রা ও সুদর্শনের নব কলেবর অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়. ব্যাপক আয়োজন ও আড়ম্বরের মধ্যদিয়ে চার দারু বিগ্রহের জন্য নিম্বদারু (নিমকাঠ) সংগ্রহ করে শ্রীজগন্নাথ মন্দিরে আনা হয়. এরপর হয় নির্মাণ. এই নিমকাঠ সংগ্রহ, মুর্তি নির্মাণ, কীবাবে হয় সেসব জানার আগে নব কলেবর উৎসব সম্বন্ধে কিছু জরুরী কথা বলে রাখা দরকার.

এই উৎসব সাধারণত ১২ বছর পর অনুষ্ঠিত হয়. তবে কখনও কখনও একই বছড়ে দুটি আষাঢ়মাসের দেখা দীর্ঘ ১৯ বছর পরেও হতে পারে. আবার অষ্টম ও একাদশ বছরেও জগন্নাথদেবের নব কলেবর হয়েছে. একাধারে তিনি মহাপ্রভু, পুরুষোত্তমও বটে. বেদে বর্ণিত ‘পুরুষ’ শব্দ থেকে ‘পুরুষোত্তম’ কথার উৎপত্তি. পুরুষোত্তম অর্থাৎ এই জগৎ সংসারের সর্বোত্তম পুরুষ তিনি. তাঁর অজানা কিছু নেই. সর্বত্র তাঁর গতি. তিনি অন্তর্যামী. তিন লোক অর্থাৎ স্বর্গ, মর্ত পাতালের অধীশ্বররুপে তাঁকে বর্ণনা করা হয়েছে. পুরুষোত্তম জগন্নাথের নব কলেবর মল মাসে হয় বলে একে পুরুষোত্তম মাসও বলে..

জগন্নাথদেবের প্রথম নবকলেবর কবে অনুষ্ঠিত হয়?
পুরীর মন্দিরের রাজভোগ মদলাপাঁজি অনুযায়ী মোটামুটি দশম শতাব্দীর প্রথম ভাগে কলিঙ্গ প্রদেশের একাংশের রাজা সোমবংশের প্রতিষ্ঠাতা মহাশিবগুপ্ত যযাতি তাঁর রাজ্য শাসনের একাদশ বছরেই শ্রীজগন্নাথদেবের দারুমুর্তির সন্ধান পান. কোনও কোনও ঐতিহাসিকের মতে মহাশিবগুপ্ত যযাতিই হলেন যযাতকেশরী. তাঁর রাজত্বের প্রায় ১৪৬ বছর আগে “রক্তবাহু” নামে প্রবল পরাক্রমশালী এক মুসলমান বহিঃশত্রুর হঠাৎ আক্রমণে কলিঙ্গ প্রদেশের অনেক অঞ্চলই বিধ্বস্ত হয়. নির্মম অত্যাচারের জন্য সে রক্তবাহু উপাধিপায়. পুরীও ধ্বংস হয় রক্তবাহুর হাতে. শোনা যায় যে সেই সময় জগন্নাথ,বলভদ্র, সুভদ্রা ও সুদর্শনের দারুমুর্তি পুরীর মন্দিরের পুজারীরা সোনপুরা নামে এক আঞ্চলে লুকিয়ে রাখেন. প্রত্যন্ত গ্রাম গোপালি. সেখানেই বিগ্রহগুলির পুজো অর্চনা সাধারন এক পর্ণকুটিরে চলতে থাকে.

শুধু কলিঙ্গ নয়, ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলমান শাষকদের অবিরাম আক্রমন চালাতে থাকে. তখন অার কোনও উপায় না দেখে কলুষিত হওয়ার আশঙ্কায় জগন্নাথকে “পাতালি” (পুঁতে দেওয়া) করা হয়েছিল. সেই পাতালি করা শ্রী বিগ্রহের খোঁজ খবর অনেক পাঁজি-পুথি ও লোক-কথার উপর ভিত্তি করেই পেয়েছিলেন যযাতকেশরী. শ্রীজগন্নাথ উদ্ধারপর্বে রাজা হয়েও তিনি হাত লাগালেন. শেষ পর্যন্ত খুজে পাওয়া গেল জগন্নাথের পাতালি দারুমুর্তি. সঙ্গে বলভদ্র, সুভদ্রা ও সুদর্শন. কিন্তু দীর্ঘকাল মূর্তিগুলি মাটির নীচে চাপা থাকার দরুন ওই দারুমুর্তিগুলি একরকম নষ্ট হয়েগেছিল. যযাতিকেশরীর নির্দেশে নতুন করে জগন্নাথ, বলভদ্র, সুভদ্রা ও সুদর্শনের দারুমুর্তি নির্মাণ করা হল. এরপর নব কলেবরের মুর্তিগুলি যযাতিকেশরী নির্মিত নতুন মন্দিরে যথোচিত মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করা হয়. এটিই জগন্নাথদেবের প্রথম নব-কলেবর বলে মনে করেন গরিষ্ঠ সংখ্যক ঐতিহাসিক.

জগন্নাথদেবের দ্বিতীয় নবকলেবর অনুষ্ঠানটি হয়েছিল যযাতিকেশরীর কয়েকশো বছর পর. কিন্তু এতদিন দারুবিগ্রহগুলি কালের উপেক্ষা করে কি ভাবে রয়ে গেল তা আমার জানা নেই বা সে ব্যাপারে আমার কাছে কোনো প্রমান নেই. খুরদায় আবিস্কৃত তালপাতার পুথিতে কালাপাহাড়ের পুরীর মন্দির আক্রমনের উল্লেখ আছে. আবুল ফজলের “আইন-ই-আকবরি”তেও এই জঘন্য আক্রমনের কথা জানা যায়. “মাকজান-ই-আফগান ও আইন-ই আকবরি দুটি গ্রন্থেই জগন্নাথদেবের মুর্তি পুরিয়ে দেওয়ার কথা আছে. ১৫৬৮ থেকে ১৫৯২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ২৪ বছর পুরীর মন্দিরে জগন্নাথ, বলভদ্র, সুভদ্রার কোনও বিগ্রহ ছিলনা.

খুরদার রাজা রামচন্দ্রদেব সম্রাট আকবরের একান্ত বিশ্বাস ভাজন অর্থমন্ত্রী টোডরমলের সাহায্যে ওড়িশায় তাঁর রাজ্য স্হাপন করেন ও জগন্নাথের বিগ্রহকে শ্রীমন্দিরে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন. রামচন্দের হাতেই জগন্নাথদেবের দ্বিতীয় নবকলেবর হয়. একটি প্রশ্ন এখানে স্বাভাবিক ভাবেই উঠে আসে. যে কোনও কারনেই হোক মুর্তি বিনিষ্ট হলে তাঁদের “ব্রম্ভ” কী ভাবে অটুট থাকে? যদিনা মন্ত্রপুত সেই ব্রম্ভগুলি মূর্তি বিনষ্ট হওয়ার আগেই কোনও পবিত্র স্হানে স্হানান্তরিত করা হয়.

মাদলাপাঁজি অনুযায়ী রাজ্য শাসনের নবম বছরে জগন্নাথ, বলভদ্র, সুভদ্রা ও সুদর্শনের ব্রম্ভগুলি কুজঙ্গগঢ় থেকে খুরদায় নিয়ে এলেন রামচন্দ্রদেব. তাহলে দেখা যাচ্ছে মুর্তিগুলি বিনষ্ট হওয়ার আগেই তাঁদের ব্রম্ভগুলি সরিয়ে ফেলা হয়. এরপর রাজধানীতে এক বিরাট যজ্ঞ করলেন রাজা. তাঁর নির্দেশে এক শুভ দিনে তিন বিগ্রহ ও সুদর্শনের নতুন দারু মুর্তি নির্মাণ শুরু হল. ইতিমধ্যেই দু দুটি বছর গরিয়ে গিয়েছে. সেবার শ্রাবণ মাসের পুর্নিমার নবম তিথিতে পুরীর মন্দিরের রত্ন সিংহাসনে নবনির্মিত তিন দারুমুর্তিকে প্রতিষ্ঠিত করাহয়. কুজঙ্গগড়ে পুজিত সেই ব্রম্ভগুলিই তিন বিগ্রহ ও সুদর্শনের বক্ষদেশে যথাপচারে স্হাপন করা হয়.

মাদলাপাঁজির মতোই চাকদা পুঁথি. পুরীর মন্দিরের ইতিহাস নিয়ে রচিত একটি প্রয়োজনীয় গ্রন্হ এই “চাকদা পু্ঁথি”. এখানে জগন্নাথ দেবের মুর্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব রাজা রামচন্দ্রদেবকে দেওয়া হলেও একটু অন্যরকম তথ্য নিবেদন করা হয়েছে. জগন্নাথদেবের স্বপ্নাদেশ পান রাজা. মহাপ্রভু তাঁকে কুজঙ্গগড়ের কথা বলেন. সেখান থেকে “ব্রম্ভ” এনে বিগ্রহ গুলির পুন:প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন. অর্থাৎ ১৫৯২ খ্রিষ্টাব্দের পরই জগন্নাথদেবের নব কলেবর সুসম্পন্ন হয়.

সরকারি রেকর্ডে ১৭৩৩ খ্রিষ্টাব্দের নব কলেবর উৎসবের উল্লেখ আছে. এরপর ১৮০৯,১৮২৮,১৮৫৫,১৮৭৪,১৮৯৩ সালে নবকলেবর অনুষ্ঠিত হয়. ১৮২৮ থেকে ১৮৫৫ ওই একবারই দীর্ঘ ২৭ বছরের ব্যবধানে নব কলেবর হয়. বিংশ শতাব্দীর প্রথম নবকলেবর ১৯১২ সালে. এর পর ১৯৩১,১৯৫০,১৯৬৯,১৯৭৭ সালে নব কলেবর হয়. শেষ নব কলেবর উৎসব হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ১৭ জুলাই.

জগন্নাথদেবের দইতাপতি সেবকরাই নব কলেবর ও “ব্রম্ভ” পরিবর্তনের দায়িত্ব পালন করেন. নবকলেবর ও ব্রম্ভ পরিবর্তন – পুরীর মন্দিরের দুটো পবিত্র তম কর্ম সুষ্ঠভাবে সম্পাদন করা সোজা ব্যাপার নয়. দইতাপতি সেবকরা এই কলিযুগেও দেবী মঙ্গলার স্বপ্নাদেশ পান. এভাবেই জানা যায় বিগ্রহ নির্মাণের উপযুক্ত নিমগাছ কোন কোন জায়গায় পাওয়া যাবে. আর নবকলেবরের সময় “ব্রম্ভ” পরিবর্তন সাধারণত রাতে হয়. অবশ্য তা তিথি নক্ষত্র বিচার করেই করা হয়. পুরীর মন্দিরের প্রক্তন প্রশাসক শ্রী রবিনারায়ণ বাবুকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম “ব্রম্ভ” বস্তুটি কি জিনিস? তিনি বলেন ” ব্রম্ভ যে কী জিনিস তা কেউ জানে না. ‘ব্রম্ভ’ পরিবর্তনের কাজটি একজন দইতাপতি সেবকই করেন, যখন পুরীর মন্দিরে কেউ থাকেনা.”..

পুরীর মন্দিরের ৪০কিমি পূর্বে ‘কাকতপুর’ নামে এক গ্রামে দেবী মঙ্গলার পুজো অর্চনা করেন একদল দইতাপতি সেবক. প্রাচী নদীর তীরে একসময় দেবী মঙ্গলার মন্দির ছিল. বন্যার জন্য ওই মন্দির কিছুটা দূরে সরিয়ে নেওয়া হয়. এখন মন্দিরটি মঠ হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে. দেবী মঙ্গলার পুজোর পর দইতাপতি সেবকরা ওই মঠে নৃসিংহ মন্ত্র, স্বপ্নাবতী মন্ত্র বারংবার জপ করেন. রবিনারায়ণ বাবু বলেন, “আমার ধারণা মন্ত্রশক্তির কিছু বিশেষত্ব আছে. এরপর স্বপ্নাদেশ পাওয়া শুধু সময়ের ব্যাপার. তারপর চারটি দলে বিভক্ত হয়ে দইতাপতিরা বেরিয়ে পড়েন সেই বৃক্ষগুলির সন্ধানে.

এই বিশেষ নিমগাছগুলি খু্ঁজে পাওয়াত পর সেগুলির নীচে তিনদিন ধরে ব্রাম্ভণরা যজ্ঞ করবেন. একে বনযজ্ঞ বলেন. যজ্ঞে নৃসিংহদেবতার নামে আগুনে ঘৃত অর্পণ করা হয়. যথোচিত পুজো অর্চনার পর গাছগুলিকে কেটে কাঠের গাড়িতে চাপিয়ে পুরীর মন্দিরের কোইলি বৈকুন্ঠে আনা হয়. এরপর দইতাপতি সেবকদের কড়া নজরদারিতে কোইলি বৈকুন্ঠের নির্মাণ মন্ডপে নতুন দারু বিগ্রহের নির্মাণপর্ব শুরু হয়. যাঁরা (চারজন) বিগ্রহগুলি নির্মাণ করেন তাঁদের বিশ্বকর্মা বলা হয়. এঁরাও দইতাপতি সেবক. বিগ্রহ নির্মাণ শুরুর আগে আরও একবার পুজো হয়. বিগ্রহগুলি নির্মাণের জন্য মোট ১৩ দিন সময় দেওয়া হয়. বিগ্রহ নির্মাণ পদ্ধতি অনুযায়ী জগন্নাথদেব,বলভদ্র ও সুভদ্রার শ্রীঅঙ্গগুলিক চার-পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়-শ্রীমুখ, হিয়া (হৃৎপিন্ড),পরিধাপানা ( কোমর)ও শ্রীপায়ার (শ্রীচরণ).

বিগ্রহগুলির ব্রম্ভ পরিবর্তনের জন্য প্রতিটি শ্রীঅঙ্গে একটি ছোট গর্ত থাকে. “শুদ্ধ আষাঢ়’ -মাসের অমাবস্যার দিন চোখ বেঁধে ‘ব্রম্ভ’ পরিবর্তনের কাজ সুসম্পন্ন করেন এক প্রবীন দইতাপতি. শোনা যায়, ‘ব্রম্ভ’ পরিবর্তন কাজটি করার পর সেই দইতাপতি বেশিদিন বাঁচেন না. এদিকে কোইলি বৈকুন্ঠেই প্রায় ৯ হাত গভীর ও ৬ হাত ব্যসার্ধের একটি গর্তে রেশমের বস্ত্র ও তুলোর বালিশে তিন বিগ্রহ ও সুদর্শনকে শুইয়ে সমাধি দেওয়া হয়. আরেকটি কথা, কোইলি বৈকুন্ঠে বিগ্রহগুলির নির্মাণ শেষ হলে আনুষ্ঠানিক ভাবে রত্নবেদিতে প্রতিষ্ঠার আগে তাঁদের অবয়বগত আরও কিছু প্রক্রিয়া রয়েছে. .

পুরীকে কেন জগন্নাথধাম বলে?

শ্রীক্ষেত্র পুরীকে বলা হয় ‘জগন্নাথ ধাম’. মন্দিরটির নামও জগন্নাথ মন্দির. কিন্তু জগন্নাথের সঙ্গে একই বেদীতে রয়েছেন বলভদ্র ও সুভদ্রা. তাঁদের ভুমিকাটা কী? কেউ তো বলে না বলরামের মন্দির কি সুভদ্রার মন্দির. অথচ এই তিন দেব দেবীর অবস্হান ও গুরুত্ব সমান. তিন জনের পূজার আলাদা মন্ত্র. বিশেষ বেশবাস. বিশেষ ভোগের ব্যবস্হা. তিন জনের তিন খানি রথ, নিদির্ষ্ট নিয়ম মেনে তৈরী করা হয়. নবকলেবরের তিন দেবদেবী সেই সঙ্গে সুদর্শনের দারু চিহ্নিত করা সংগ্রহ ও প্রতিষ্ঠা আলাদাভাবেই হয়. রথযাত্রার সময় বলরাম আর সুভদ্রার রথ জগন্নাথের আগে আগে চলে. মন্দির থেকে বেরবার কিংম্বা ঢোকার সময় বলরাম ও সুভদ্রা আগে যান. তবু পুরীর রথ সবার মুখে জগন্নাথের রথ. সচরাচর কেউ বলে না আমি বলরাম দর্শনে এসেছি বা সুভদ্রা দর্শনে. সবাই বলে আমি জগন্নাথ দর্শনে এসেছি.

এর কারণ খুজলে দেখা যাবে আদিতে বলরাম- সুভদ্রার নাম পাওয়া যায় না. জগন্নাথ কাহিনীর সুরুতে শবররাজ পূজিত যে নীলমাধবের উল্লেখ আছে সেখানে তিনি একা. আবার ঐতিহাসিক দিকটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় দ্বাদশ শতাব্দীর পূর্ব পর্যন্ত পুরীর দেবতা হিসেবে রয়েছে পুরুষোত্তমের নাম. ১০২০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১০৪০ খ্রিষ্টাব্দ এই সময় কালে রচিত রাজমর্তন্ডে পুরুষোত্তম নামটির উল্লেখ আছে. এই সময় পুরীকেও পুরুষিত্তমক্ষেত্র বলা হত. এই সময় কালে জগন্নাথদেবের নামের উল্লেখ পাওয়া যায় না. ১০৭৮ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১১৪৭ খ্রিষ্টাব্দ রাজা চোড়গঙ্গ দেবের রাজত্বকালে পুরীর নাম পুরুষোত্তম ক্ষেত্রই ছিল. শ্রী মন্দিরে একা দারুদেবতাই বিরাজ করতেন. শিব পুরাণে বলা হয়েছে…

“পুরুষোত্তমাৎ পরম ক্ষেত্রং নাস্ত্যন্যৎ ভবমোচনম্..
তত্র সাক্ষাৎ পরম ব্রম্ভ দারু ব্রম্ভ শরীর ভৃৎ..”

—‘অর্থাৎ মুক্ত লাভ করার জন্য পুরুষোত্তম ক্ষেত্রছাড়া অন্য ক্ষেত্র সংসারে নেই. এই ক্ষেত্রে সাক্ষাৎ পরম ব্রম্ভ দারুব্রম্ভরুপে শরীর ধারণ করে রয়েছেন’..

অনিরুদ্ধ দাস নামে পুরীর মন্দিরের একজন গবেষক একটি মাদলাপাঁজি আবিস্কার করেন. সেই মালদাপাঁজি অনুযায়ী আদি শংকরাচার্য ধর্মপ্রচার করতে করতে পরীতে উপস্হিত হন. তখন নাকি যযাতিকেশরীর রাজত্ব. শংকরাচার্যের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন তিনি. শ্রীজগন্নাথ মন্দিরের কিছু কিছু নির্মাণ, মুর্তি প্রতিষ্ঠা, সেবা পূজোর বিধি প্রভৃতি ক্ষেত্রে শংকরাচার্যের নির্দেশে অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন যযাতিকেশরী. জগন্নাথদেবের পুজোয় এতদিন যে বৌদ্ধ রীতিনীতি অনুসরণ করা হত শংকরাচার্যের প্রচেষ্টায় তার কিছু কিছু পরিবর্তন হয়. জগন্নাথদেবকে পুরুষোত্তমরুপে পুজো করা সুরু হল.

এই মাদলাপাঁজিতে আরও জানা যায় শংকরাচার্য এবং যযাতিকেশরী নেপালে যান. নেপালের তৎকালীন রাজা কয়েকটি শালগ্রাম শিলা শংকরাচার্যের হাতে অর্পণ করেন. জগন্নাথদেব, বলভদ্র,সুভদ্রা ও সুদর্শনের দারুমুর্তির বক্ষদেশে এই মন্ত্রপুত দুর্মূল্য শালগ্রাম শিলাচারটি স্হাপন করা হয়. এইগুলিই বিগ্রহগুলির ব্রম্ভ. নেপালের রাজা শালগ্রামশিলারুপী এই ‘ব্রম্ভ’ গুলি দান করেছিলেন বলেই নাকি পুরীর মন্দিরে জগন্নাথদেবের পুজোয় আজও তাঁদের একটি বিশেষ অধিকার আছে. এ ব্যাপারে পুরীর রাজার যতটুকু অধিকার নেপালের রাজার ততটুকুই.
তবে এখানেও একটা প্রশ্ন হয়তো ঘুরে ফিরে আসে. কি প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে জানব কালকের শেষ পর্বে..

কৌমারী:- শুম্ভ নিশুম্ভ সমরে চন্ডী থেকে ময়ূরবাহনে দেবী কৌমারী আবির্ভূতা হয়েছিলেন. অন্ধক নামক দৈত্যের সঙ্গে মহাদেবের যে ঘোরতর যুদ্ধে অন্ধককে মহাদেব শূলের দ্বারা আঘাত করলে শূলাঘাতে অন্ধকের দেহ থেকে রক্ত ক্ষরিত হয়ে সেই রক্ত থেকে সহস্র সহস্র অসুর সৃষ্ট হতে দেখে মহাদেব কতিপয় মাতৃকার সৃষ্টি করেছিলেন. কৌমারী তাঁর অন্যতমা. তাঁরা অন্ধকের রক্ত পান করেন. তাতে আর নতুন অন্ধক উৎপন্ন হতে পারলনা. চতুঃষষ্টি যোগিনীর অন্যতমা. জীব যখন ময়ূরধর্ম হয়ে কুটিল বৃত্তরুপ ভূজঙ্গগুলো বিনাশ করতে উদ্যত হয় , তখনই, শ্রেষ্ঠ ময়ূর পরিশোভিত কৌমারীরুপে আবির্ভূতা হয়ে অমর- সৈন্যগণের পরিচালনার ভার গ্রহণপূর্বক অসুরকূল বিনাশ করতে উদ্যত হন এবং জীবসন্তান তখন অসুরভীতি থেকে পরিত্রাণ লাভ করেন. দেবী স্বয়ং অনঘা-অঘরহিতা হওয়ার হেতু তাঁর দর্শনে জীব অনঘ ও নিষ্পাপ হয় এবং জীবের সকল দ্বৈতপ্রতীতির বিলয় হয়. জীবত্ব নাশ ও ব্রম্ভত্ব লাভ হয়..

দশম শতাব্দীর প্রথম ভাগে রাজা যযাতিকেশরীর রাজত্বের কথা জানা যায়. কিন্তু আদি শংকরাচার্যের সময় কাল নবম শতাব্দীর প্রথম কাল পর্যন্তই বিস্তৃত (মাধবাচার্যের ‘শংকর দিগ্বিজয়’ গ্রন্হ অনুযায়ী শিবাবতার আচার্য শংকর ৭৮৮ খ্রিষ্টাব্ধে জন্মগ্রহন করেন.). তাহলে কি আদি শংকরাচার্য নন., অন্য কোনও শংকরাচার্যের সঙ্গে নেপালে যান যযাতিকেশরী? আবার এমনও হতে পারে যে, যযাতিকেশরীর রাজত্বের সঠিক সময়ের ব্যাপারেই ভ্রান্তি রয়েছে.

পুরীর মন্দিরের দইতাপতি সেবক গনেশ দইতাপতি তাঁর বংশের চতুর্দশ পুরুষ. তিনি ১৯৬৯,১৯৭৭,১৯৯৬ সাল- তিনবারই নব-কলেবর উৎসবের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন. তাঁর বাবা গঙ্গাধর দইতাপতি ‘ব্রম্ভ’ পরিবর্তনের মতো পুরীর মন্দিরের সব থেকে গুরুত্বপুর্ণ কাজটি করেছিলেন ১৯৬৯ সালে. গনেশ দইতাপতি বলেন ” তখন আমার বয়স ১৫ বছর. বাবার বয়স ৭০. ‘ব্রম্ভ’ পরিবর্তনের কর্মভার তাঁর ওপর ন্যস্ত হলে অদ্ভুত এক আনন্দে বাবা কে সব সময় ঘিরে রাখতো. এই দায়িত্বলাভ পুরীর মন্দিরের কোনও প্রাচীন দইতাপতি সেবকের কাছে পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার”.

গনেশ দইতাপতির কাছে সরাসরি জানতে চেয়েছিলাম –

“ব্রম্ভ” এই জিনিসটা কি মন্ত্রমূত শালগ্রামশিলা? তাঁকে সুত্র ধরে মালদাপাঁজি র কথা বলেছিলাম. গেনশদইতাপতি বলেন ”মালদাপাঁজির কথা বলতে পারবোনা. তবে এই “ব্রম্ভ” কি তা আমিও জানিনা. কেউ বলতে পারে না.

এই ‘ব্রম্ভ’ পরিবর্তনের পর কিছুদিনের মধ্যেই কি যিনি ‘ব্রম্ভ’ পরিবর্তণ করেন তার মৃত্যু হয়?

গনেশ দইতাপতি বলেন আমিও তাই জানি ও দেখেওছি. এ ভারি আশ্চর্যের ব্যাপার. ‘ব্রম্ভ’ পরিবর্তনের পর সেই প্রবীণ সেবক সাধারণত ২-৪ বছর বাঁচেন. সেই দইতাপতি সেবক যেন অমৃতলোকে যাত্রা করেন.” ..সমাপ্ত..

এরপর আমরা জানব কেন শুধুমাত্র আমরা বলি জগন্নাথ দর্শনে যাচ্ছি? কেন বলি না সুভদ্রা বা বলরাম দর্শনে যাচ্ছি?

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s