শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা : তৃতীয় অধ্যায় – কর্মযোগ


শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা : তৃতীয় অধ্যায় – কর্মযোগ

(স্বামী জগদীশ্বরানন্দ)

[২য় অধ্যায়ে ভগবান্‌ নিবৃত্তিবিষয়ক জ্ঞাননিষ্ঠা ও প্রবৃত্তিবিষয়ক কর্মনিষ্ঠা – এই দুই প্রকার নিষ্ঠা নির্দেশ করিয়াছেন । জ্ঞানের দ্বারাই জ্ঞাননিষ্ঠদিগের পরমপুরুষার্থ লাভ হয় – এই উপদেশ দিয়াছেন । আবার কর্মও কর্তব্য – এই উপদেশও দিয়াছেন; কিন্তু কর্ম দ্বারা যে শ্রেয়প্রাপ্তি হয়, তাহা বলেন নাই । ইহাতে কর্ম হইতে জ্ঞান শ্রেষ্ঠ মনে করিয়া – ]

অর্জুন জিজ্ঞাসা করিলেন
হে জনার্দন, যদি আপনার মতে কর্ম অপেক্ষা জ্ঞান শ্রেষ্ঠ হয়, তবে আমাকে এই হিংসাত্মক কর্মে (যুদ্ধে) কেন নিযুক্ত করিতেছেন ? ১

আপনি সন্দেহজনক-রূপে প্রতীয়মান বাক্য দ্বারা আমার মন যেন ভ্রান্ত করিতেছেন । এই উভয়ের একটি আমাকে নিশ্চয় করিয়া বলুন, যাহা দ্বারা আমি শ্রেয়োলাভ করিতে পারি । ২
শ্রীভগবান্‌ বলিলেন
হে অনঘ (নিষ্পাপ) অর্জুন, ইহলোকে জ্ঞানাধিকারিগণের জন্য জ্ঞানযোগ এবং নিষ্কাম কর্মিগণের জন্য কর্মযোগ – এই দুই প্রকার নিষ্ঠার বিষয় সৃষ্টির প্রারম্ভে আমি বেদমুখে বলিয়াছি । ৩

কর্মানুষ্ঠান না করিয়া কেহ নৈষ্কর্ম্য (নিষ্ক্রিয় আত্মা-রূপে অবস্থিতি, মোক্ষ) লাভ করিতে পারে না । কর্মযোগে চিত্তশুদ্ধি ও আত্মবিবেক না হইলে নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধি হয় না । কেবলমাত্র জ্ঞানশূন্য কর্মত্যাগ দ্বারা উক্ত অবস্থালাভ অসম্ভব । ৪
কর্ম না করিয়া কেহই ক্ষণকালও থাকিতে পারে না । অ-স্বতন্ত্র হইয়া সকলেই মায়াজাত সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ গুণের প্রভাবে কর্ম করিতে বাধ্য হয় । ৫
যে মূঢ় ব্যক্তি হস্ত, পদ ও বাক্যাদি পঞ্চকর্মেন্দ্রিয় সংযত করিয়া মনে মনে শব্দরসাদি ইন্দ্রিয়বিষয় স্মরণপূর্বক অবস্থান করে, তাহাকে মিথ্যাচারী বলে । ৬
কিন্তু যিনি বিবেকযুক্ত মনের দ্বারা চক্ষুকর্ণাদি পঞ্চজ্ঞানেন্দ্রিয় সংযত করিয়া অনাসক্তভাবে কর্মেন্দ্রিয় দ্বারা কর্মানুষ্ঠান করেন, তিনি পূর্বোক্ত মিথ্যাচারী অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ । ৭
তুমি শাস্ত্রোপদিষ্ট নিত্যকর্ম কর । কর্ম না করা অপেক্ষা কর্ম করাই শ্রেয়ঃ। কর্মহীন হইলে তোমার দেহযাত্রাও নির্বাহ হইবে না । ৮
ঈশ্বরের প্রীতির জন্য অনুষ্ঠিত কর্ম ব্যতীত অন্য কর্ম বন্ধনের কারণ হয় । অতএব, তুমি ভগবানের উদ্দেশে অনাসক্ত হইয়া বর্ণাশ্রমোচিত সর্ব কর্ম কর । ৯
সৃষ্টির প্রারম্ভে ব্রহ্মাযজ্ঞের সহিত ব্রাহ্মণাদি ত্রিবর্ণ সৃষ্টি করিয়া বলিয়াছিলেন – এই যজ্ঞ দ্বারা তোমরা সদা সমৃদ্ধ হও, এই যজ্ঞ দ্বারা তোমাদের অভীষ্টপ্রদানে কামধেনুর তুল্য হউক । ১০
এই যজ্ঞ দ্বারা তোমরা ইন্দ্রাদি দেবতাগণকে সংবর্ধনা কর এবং দেবতাগণও তোমাদিগকে বৃষ্ট্যাদি দ্বারা শস্যাদি উৎপাদনপূর্বক অনুগৃহীত করুন । এইরূপে পরস্পরের ভাবনা দ্বারা তোমরা পরম মঙ্গল লাভ করিবে । ১১
দেবতাগণ যজ্ঞ দ্বারা আরাধিত হইয়া তোমাদিগকে বাঞ্ছিত ভোগ্যবস্তু প্রদান করিবেন । সুতরাং এই দেবতাপ্রদত্ত বস্তু দেবতাগকে নিবেদন না করিয়া যিনি ভোগ করেন, তিনি নিশ্চয়ই চোর । ১২
যে সদাচারগণ যজ্ঞাবশেষ (নিবেদিত অন্ন) ভোজন করেন, তাঁহারা সকল পাপ হইতে মুক্ত হন । যে পাপাচারগণ কেবল নিজের জন্য অন্নপাক করে, তাঁহারা পাপান্ন ভোজন করে । ১৩
অন্ন হইতে প্রাণীদিগের শরীর উৎপন্ন হয়, মেঘ হইতে অন্নের উৎপত্তি হয়, যজ্ঞধূম হইতে মেঘ সৃষ্ট হয় এবং যজ্ঞ (অপূর্ব, অদৃষ্ট বা কর্মফল) বেদবিধি হইতে উৎপন্ন হয় । ১৪
যজ্ঞাদি কর্ম বেদ হইতে উৎপন্ন জানিবে । বেদ অক্ষর পরমাত্মা হইতে সমুদ্ভূত । অতএব সর্বার্থ-প্রকাশক বেদ সর্বদা যজ্ঞে প্রতিষ্ঠিত আছেন । ১৫
হে পার্থ, যে ব্যক্তি এই প্রকারে ঈশ্বরকর্তৃক প্রবর্তিত কর্মচক্রের অনুগামী না হয়, সেই ইন্দ্রিয়াসক্ত পাপী ব্যক্তি বৃথা জীবনধারণ করে । ১৬
কিন্তু যে ব্যক্তি আত্মাতেই প্রীত, আত্মাতেই তৃপ্ত এবং আত্মাতেই সন্তুষ্ট, তাঁহার কোন কর্তব্য নাই । ১৭
আত্মজ্ঞানীর ইহজগতে কর্মানুষ্ঠানের কোনও প্রয়োজন নাই । কর্ম না করিলেও তাঁহার কোন প্রত্যবায় হয় না; এবং ব্রহ্মাদি স্থাবর পর্যন্ত কোন প্রাণীতে তাঁহার কোন প্রয়োজন-সম্বন্ধ নাই । ১৮
অতএব তুমি অনাসক্ত হইয়া সর্বদা কর্তব্য (নিত্য) কর্মের অনুষ্ঠান কর । কামনাশূন্য হইয়া কর্ম করিলে মানুষ নিশ্চয়ই মুক্তিলাভ করে । ১৯
জনক, অশ্বপতি প্রভৃতি রাজর্ষি নিষ্কাম কর্ম করিয়াই মোক্ষ লাভ করিয়াছিলেন । সুতরাং লোকসংগ্রহের নিমিত্তও তোমার নিষ্কাম কর্ম করা উচিত । ২০
কোন সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠ ব্যাক্তি যাহা যাহা আচরণ করেন, সেই সম্প্রদায়ের সাধারণ লোকে তাহাই অনুসরণ করে । তিনি যে লৌকিক বা বৈদিক কর্ম প্রামাণিক বলিয়া অনুষ্ঠান করেন, অন্য লোকে তাহাই অনুসরণ করে । ২১
হে পার্থ, স্বর্গমর্ত্যাদি তিন লোকে আমার কোন কর্তব্য কর্ম নাই এবং আমার অপ্রাপ্ত বা প্রাপ্তব্য বস্তু নাই । তথাপি আমি লোক-কল্যাণের নিমিত্ত সর্বদা কর্মে ব্যাপৃত আছি; কর্মত্যাগ করি নাই । ২২
হে পার্থ, যদি আমি অনলস হইয়া শুভ কর্মে প্রবৃত্ত না হই, তবে মানবগণ সর্বপ্রকারে আমার অবলম্বিত পথেরই অনুবর্তী হইবে – অর্থাৎ অলস হইয়া কর্মত্যাগ করিবে । ২৩
उत्सीदेयुरिमे लोका न कुर्यां कर्म चेदहम् ।
संकरस्य च कर्ता स्यामुपहन्यामिमाः प्रजाः ॥3.24॥

যদি আমি কর্ম না করি, লোকস্থিতিকর কর্মের অভাবে এই সকল লোক উৎসন্ন হইবে । আমি বর্ণসঙ্করাদি* সামাজিক বিশৃঙ্খলার হেতু এবং সেই জন্য প্রজাগণের বিনাশের কারণ হইব । ২৪
হে ভারত, অজ্ঞানীগণ আসক্ত হইয়া যেরূপ কর্ম করেন, জ্ঞানীগণ অনাসক্ত হইয়া লোকশিক্ষার জন্য সেইরূপ কর্ম করিবেন । ২৫
জ্ঞানীগণ কর্মাসক্ত জ্ঞানহীনগণের বুদ্ধিভেদ জন্মাইবেন না । তাঁহারা অবহিতচিত্তে সকল কর্ম অনুষ্ঠান করিয়া জ্ঞানহীনদিগকে কর্মে প্রবৃত্ত করিবেন । ২৬
প্রকৃতির গুণত্রয় শরীরেন্দ্রিয়াদিসংঘাতে পরিণত হইয়া লৌকিক ও বৈদিক সমস্ত কর্ম সম্পাদন করে । অহংকার দ্বারা যাঁহার চিত্ত বিমূঢ় হইয়াছে, তিনি ‘আমি কর্তা’ এইরূপ মনে করেন । ২৭
হে মহাবাহো, সত্তগুণের পরিণাম চক্ষু ও কর্ণাদি ইন্দ্রিয়সকল, তমগুণের পরিণাম রূপ ও রসাদি বিষয়-সকলে প্রবৃত্ত আছে । কিন্তু আত্মা নিঃসঙ্গ – ইহা জানিয়া গুণবিভাগ ও কর্মবিভাগের যথার্থ তত্ত্বজ্ঞ কর্তৃত্বাভিমান ত্যাগ করেন । ২৮
প্রকৃতির গুণ দ্বারা ভ্রান্ত ব্যক্তিগণ দেহেন্দ্রিয়সংঘাতের কর্মে আসক্ত হন অর্থাৎ ফলের জন্য আমরা কর্ম করি – এইরূপ অভিমান করেন । সর্বজ্ঞ আত্মবিৎ সেই অজ্ঞ অনাত্মবিৎ মন্দবুদ্ধি ব্যক্তিগণকে বিচালিত করিবেন না । ২৯
পরমেশ্বরের জন্য ভৃত্যবৎ কর্ম করিতেছি – এই বুদ্ধি দ্বারা আমাতে সমস্ত কর্ম সমর্পণ করিয়া ফলাভিসন্ধিরহিত, মমত্বহীন ও শোকশূন্য হইয়া তুমি যুদ্ধ কর । ৩০
যাঁহারা নিষ্কাম কর্মবিষয়ে শ্রদ্ধাবান ও অসূয়াশূন্য হইয়া আমার এই মত সর্বদা অনুষ্ঠান করেন, তাঁহারাও ধর্মাধর্মাদি কর্মের কর্তৃত্ববুদ্ধিরূপ বন্ধন হইতে মুক্ত হন । ৩১
কিন্তু যে অশ্রদ্ধাবান ব্যক্তিগণ আমার এই বাক্যের নিন্দা করে এবং উহা পালন করে না, সেই বিবেকহীন ব্যক্তিগণকে সর্বজ্ঞান-মূঢ় (কর্ম-, সগুণ- ও নির্গুণজ্ঞানে অযোগ্য) ও পরমার্থভ্রষ্ট বলিয়া জানিও । ৩২
জ্ঞানীও স্বীয় প্রকৃতির অনুরূপ কার্য করেন, অজ্ঞের কি কথা ? প্রাণিগণ স্ব স্ব প্রকৃতিকে অনুসরণ করে; সুতরাং আমার বা অন্যের শাসন বা নিষেধে কি ফল হইবে ? ৩৩
সকল ইন্দ্রিয়েরই অনুকূল ও প্রতিকূল বিষয়ভেদে যথাক্রমে আসক্তি ও বিদ্বেষ অবশ্যম্ভাবী । কিছুতেই উহাদের বশীভূত হইবে না । কারণ, এই দুইটি জীবের শ্রেয়োমার্গের প্রতিকূল । ৩৪
স্বধর্মের অনুষ্ঠান দোষযুক্ত হইলেও উত্তমরূপে অনুষ্ঠিত পরধর্ম অপেক্ষা উৎকৃষ্ট । বর্ণাশ্রমবিহিত স্বধর্মসাধনে নিধনও কল্যাণকর; কিন্তু অন্যের বর্ণাশ্রমোচিত ধর্মের অনুষ্ঠান অধোগতির কারণ বলিয়া বিপজ্জনক । ৩৫
অর্জুন জিজ্ঞাসা করিলেন
হে কৃষ্ণ, মানুষ কাহার দ্বারা চালিত হইয়া অনিচ্ছাসত্ত্বেও যেন বলপূর্বক নিয়োজিত হইয়াই পাপানুচরণে প্রবৃত্ত হয় ? ৩৬
শ্রীভগবান কহিলেন
ইহা রজোগুণজাত, দুষ্পূরণীয় ও অত্যূগ্র কাম এবং ইহাই ক্রোধ । সংসারে ইহাকে মহাশত্রু বলিয়া জানিবে । ৩৭
যেরূপ ধুম দ্বারা অগ্নি, ময়লা দ্বারা দর্পণ এবং জরায়ু দ্বারা গর্ভ আচ্ছন্ন থাকে, সেইরূপ কামনা দ্বারা এই বিবেকবুদ্ধি আবৃত থাকে । ৩৮
হে কৌন্তেয়, এই কাম জ্ঞানীর চিরশত্রু । ইহা অনলের (ন অলং – নাই পর্যাপ্তি) ন্যায় দুষ্পূরণীয় । এই তৃষ্ণারূপ কাম দ্বারা বিবেকবুদ্ধি আবৃত থাকে । ৩৯
পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় ও পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়, সংকল্পবিকল্পাত্মক মন এবং নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি কামের আশ্রয় বলিয়া কথিত হয় । ইহাদিগের দ্বারা বিবেকজ্ঞান আবৃত করিয়া কাম দেহাভিমানী জীবকে ভ্রান্ত করে । ৪০
হে ভরতবংশশ্রেষ্ঠ, তুমি প্রথমে ইন্দ্রিয়দিগকে বশীভূত করিয়া জ্ঞান- ও বিজ্ঞান-নাশক পাপরূপ এই কামকে পরিহার কর । ৪১
স্থূল দেহ হইতে ইন্দ্রিয় শ্রেষ্ঠ । ইন্দ্রিয় হইতে মন এবং মন হইতে বুদ্ধি শ্রেষ্ঠ । যিনি দেহাদিবুদ্ধ্যন্ত সকলের অভ্যন্তরে অবস্থিত, তিনিই বুদ্ধির দ্রষ্টা শুদ্ধ-বুদ্ধ-মুক্ত আত্মা । ৪২
হে অর্জুন, শুদ্ধ বুদ্ধি দ্বারা মনকে সমাহিত করিয়া বুদ্ধির দ্রষ্টা পরমাত্মাকে এইরূপে জানিয়াই অজ্ঞানমূলক দুর্জয় শত্রু কামকে জ্ঞান দ্বারা মূলোচ্ছেদপূর্বক বিনাশ কর । ৪৩
ভগবান্‌ ব্যাসকৃত লক্ষশ্লোকী শ্রীমহাভারতে ভীষ্মপর্বের অন্তর্গত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতারূপ উপনিষদে ব্রহ্মবিদ্যাবিষয়ক যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে কর্মযোগ নামক তৃতীয় অধ্যায় সমাপ্ত ।
_________________________________________
২) যজ্ঞাদি কাম্য কর্ম ও নিত্য কর্মসমূহ চিত্তশুদ্ধি দ্বারা আত্মজ্ঞান বা মোক্ষের সাধক হয় । কর্মনিষ্ঠা জ্ঞাননিষ্ঠার হেতু বলিয়া পরতন্ত্রভাবে মোক্ষের কারণ হয়, স্বতন্ত্রভাবে নহে ।
৮) বৈদিক কর্ম চতুর্বিধ – নিত্য, নৈমিত্তিক, কাম্য ও নিষিদ্ধ
৯) যজ্ঞই বিষ্ণু, ঈশ্বর, কারণ বিষ্ণু বেদাধিপতি বা যজ্ঞাধিপতি
১২) অনিবেদিত অন্নব্যঞ্জনাদি অপবিত্র
১৩) পঞ্চযজ্ঞ = ঋষিযজ্ঞ, ভূতযজ্ঞ, পিতৃযজ্ঞ, নৃযজ্ঞ ও দেবযজ্ঞ
কণ্ডনী (উদুখল), উদকুন্তী, পেষণী, চুল্লী ও মার্জনী দ্বারা যে পঞ্চবিধ পাপ হয়, তাহা দূর করিবার জন্য এই পঞ্চ যজ্ঞের অনুষ্ঠান বিহিত । – [আনন্দগিরি]
২০) স্বামীজী বলিতেন – “কর্মযোগ অন্যনিরপেক্ষ মুক্তিমার্গ” । নিষ্কামকর্ম দ্বারা চিত্তশুদ্ধি হইলে মোক্ষ বা জ্ঞান লাভ হয় ।
লোকসংগ্রহ = মানুষকে অসৎ পথ হইতে নিবৃত্ত করা এবং সৎপথে বা স্বধর্মে প্রবৃত্ত করাই লোকসংগ্রহ । এই জন্য অবতার বা অবতারকল্প দেবমানবগণ যুগে যুগে ইহলোকে অবতীর্ণ হন ।
২৪) মূল শ্লোকে “বর্ণের” উল্লেখ নেই । [uploader’s comment]
২৭) লৌকিক কর্ম = অনিষিদ্ধ ও অবিহিত কর্ম
বৈদিক কর্ম = নিষিদ্ধ ও বিহিত কর্ম
অহংকার = শরীরেন্দ্রিয়াদিতে ‘আমি’ ও ‘আমার’ বোধ । শ্রীরামকৃষ্ণ বলিতেন, ‘আমি’ ও ‘আমার’ ভাবনাই অজ্ঞান ।
২৮) আমি আত্মা; ত্রিগুণের পরিণাম কার্যকারণ সংঘাত দেহেন্দ্রিয়াদি আমি নহি – ইহাই গুণ হইতে আত্মার বিভাগ । কর্ম আমার (আত্মার) নহে, দেহেন্দ্রিয়াদির – ইহাই কর্ম হইতে আত্মার বিভাগ । তত্তজ্ঞ গুণ ও কর্ম হইতে বিভক্ত (পৃথক) যে আত্মা তাহার সাক্ষাৎকার করেন ।
৩১) গুণে (ঈশ্বরে) দোষাবিষ্কার : আমাদিগকে ভগবান দুঃখাত্মক কর্মে প্রবৃত্ত করিয়াছেন, এইজন্য তিনি করুণাহীন ।
৩২) মূঢ় = কর্মজ্ঞানে, সগুণজ্ঞানে ও নির্গুণজ্ঞানে অযোগ্য
৩৩) প্রকৃতি = বর্তমান জন্মের আদিতে অভিব্যক্ত পূর্বজন্মকৃত ধর্মাধর্মাদির সংস্কারই প্রকৃতি । প্রাণিবর্গ প্রকৃতির বশবর্তী ।
৩৪)  রাগদ্বেষবশতঃ শাস্ত্রার্থ বিপরীতভাবে গৃহীত এবং পরধর্ম স্বধর্মরূপে প্রতিভাত হয় । কিন্তু পুরুষকার দ্বারা এদের সংযত করিলে মানুষের শাস্ত্রদৃষ্টি জন্মে এবং প্রকৃতির অধীন হয় না ।
৩৭) কাম কোন কারণবশতঃ প্রতিহত হইলেই ক্রোধরূপে পরিণত হয় । রজোগুণের অতীত ও সত্ত্বগুণে আরূঢ় না হইলে কামজয় বা ক্রোধজয় অসম্ভব ।
৩৯) জ্ঞানহীন ব্যক্তির নিকট কাম তৃষ্ণাকালে মিত্র ও তৃষ্ণাজনিত দুঃখকালে শত্রু । কাম্যবস্তুসমূহের উপভোগ দ্বারা কামনা কখনও নিবৃত্ত হয় না । ঘৃত প্রদান করিলে যেমন অগ্নি বর্ধিত হয়, সেইরূপ উপভোগের দ্বারা বাসনার বৃদ্ধি হয়; কেবল ত্যাগ দ্বারাই কামনার নিবৃত্তি হয় ।
৪১) জ্ঞান = শাস্ত্র ও গুরুর উপদেশজাত, বুদ্ধিগত
বিজ্ঞান = নিদিধ্যাসনজাত বা সাধনলব্ধ, স্বানুভূতজ্ঞান
৪২) ইন্দ্রিয় বাহ্য দেহ হইতে সূক্ষ, প্রকাশক, ব্যাপক ও অন্তঃস্থ বলিয়া শরীর হইতে শ্রেষ্ঠ । ইন্দ্রিয়াদির প্রবর্তকরূপে মন শ্রেষ্ঠ । বুদ্ধি নিশ্চয়াত্মিকা বলিয়া সঙ্কল্পাত্মক মন হইতে শ্রেষ্ঠ । পরমাত্মা বুদ্ধি হইতে শ্রেষ্ঠ ।
৪৩) ইন্দ্রিয়সংযমপূর্বক আত্মজ্ঞানলাভ দ্বারাই সম্পূর্ণ কামজয় সম্ভব হয়; অন্য উপায়ে অসম্ভব । – [আনন্দগিরি]
কামের আশ্রয় দেহেন্দ্রিয়াদি হইতে আত্মা পৃথক – এই জ্ঞান যত দৃঢ় হইবে, কামের প্রভাব ততই কমিবে । দেহবুদ্ধিই কামের মূল – দেহবুদ্ধি যত ক্ষীণ হয়, কাম তত নিস্তেজ হয় । কাম ও ক্রোধ রজোগুণজাত । সুতরাং রজোগুণাতীত ও সত্ত্বগুণে সমারূঢ় হইলে কামজয় হয় ।
_________________________________________
*Hard Copy Source:
“Srimadbhagabadgeeta” translated by Swami Jagadeeshwarananda, edited by Swami Jagadananda. 27th Reprint – January, 1997 (1st Edition – 1941), © President, Sriramkrishna Math, Belur. Published by Swami Satyabrotananda, Udbodhan Office, 1 Udbodhan Lane, Bagbazar, Kolkata-700003. Printed by Rama Art Press, 6/30 Dum Dum Road, Kolkata-700030.

Sanskrit Source
English Translation


Disclaimer: This site is not officially related to Ramakrishna Mission & Math. এটি এক অর্বাচীন ভক্তের প্রয়াস মাত্র ।
Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s