শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা : পঞ্চম অধ্যায় – সন্ন্যাসযোগ


শ্রীমদ্ভগবদ্‌গীতা : পঞ্চম অধ্যায় – সন্ন্যাসযোগ

(স্বামী জগদীশ্বরানন্দ)

অর্জুন উবাচ –

সন্ন্যাসং কর্মণাং কৃষ্ণ পুনর্যোগঞ্চ শংসসি ।
যচ্ছ্রেয় এতয়োরেকং তন্মে ব্রূহি সুনিশ্চিতম্ ॥ ১
অর্জুন জিজ্ঞাসা করিলেন
হে কৃষ্ণ, আপনি শাস্ত্রীয় কর্মের ত্যাগ আবার শাস্ত্রীয় কর্মের অনুষ্ঠান করিতে বলিতেছেন । এই দুইটির মধ্যে যেটি প্রকৃতপক্ষে মোক্ষদায়ক তাহা আমাকে নিশ্চয় করিয়া বলুন । ১
শ্রীভগবান্ উবাচ –
সন্ন্যাসঃ কর্মযোগশ্চ নিঃশ্রেয়সকরাবুভৌ ।
তয়োস্তু কর্মসন্ন্যাসাৎ কর্মযোগো বিশিষ্যতে ॥ ২
উত্তরে শ্রীভগবান্‌ বলিলেন
কর্মের ত্যাগ ও কর্মের অনুষ্ঠান উভয়ই মুক্তিমার্গ; কিন্তু তাহাদের মধ্যে জ্ঞানহীন কর্মসন্ন্যাস অপেক্ষা নিষ্কাম কর্মের অনুষ্ঠান উৎকৃষ্টতর । ২
জ্ঞেয়ঃ স নিত্যসন্ন্যাসী যো ন দ্বেষ্টি ন কাঙ্ক্ষতি ।
নির্দ্বন্দ্বো হি মহাবাহো সুখং বন্ধাৎ প্রমুচ্যতে ॥ ৩
যিনি দুঃখ ও দুঃখের সাধনকে দ্বেষ করেন না এবং সুখ ও সুখের সাধনকে আকাঙ্ক্ষা করেন না, সেই রাগদ্বেষাদিশূন্য কর্মযোগীকে নিত্যসন্ন্যাসী বলিয়াই জানিবে । কারণ হে মহাবাহো, রাগদ্বেষাদি-দ্বন্দ্বহীন ব্যক্তি সংসারবন্ধন হইতে অনায়াসে মুক্ত হন । ৩
সাংখ্যযোগৌ পৃথগ্‌বালাঃ প্রবদন্তি ন পণ্ডিতাঃ ।
একমপ্যাস্থিতঃ সম্যগুভয়োর্বিন্দতে ফলম্ ।। ৪
অজ্ঞ ব্যক্তিগণ সাংখ্য এবং যোগকে পরস্পরবিরুদ্ধ ও ভিন্ন-ফল-বিশিষ্ট বলিয়া থাকেন; কিন্তু আত্মজ্ঞানিগণ তাহা বলেন না । কারণ উভয়ের ফল এক মোক্ষ। সেইজন্য একটি সম্যগ্‌রূপে অনুষ্ঠিত হইলে উভয়ের ফল মোক্ষ লাভ হয় । ৪
যৎ সাংখ্যৈঃ প্রাপ্যতে স্থানং তদ্‌যোগৈরপি গম্যতে ।
একং সাংখ্যঞ্চ যোগঞ্চ যঃ পশ্যতি স পশ্যতি ।। ৫
জ্ঞাননিষ্ঠ সন্ন্যাসিগণ মোক্ষ নামক যে ব্রহ্মপদ প্রাপ্ত হন, যোগিগণও সেই ব্রহ্মপদই লাভ করেন। সাংখ্য ও যোগের ফল একই মোক্ষ বলিয়া উভয়কে যিনি অভিন্ন দেখেন, তিনিই যথার্থদর্শী, সম্যক্‌ জ্ঞানী । ৫
সন্ন্যাসস্তু মহাবাহো দুঃখমাপ্তুমযোগতঃ ।
যোগযুক্তো মুনির্ব্রহ্ম ন চিরেণাধিগচ্ছতি ।। ৬
হে মহাবাহো, নিষ্কাম কর্মযোগ ব্যাতীত জ্ঞানযুক্ত পরমার্থ সন্ন্যাস লাভ করা অসম্ভব। নিষ্কাম কর্মযোগনিষ্ঠ ব্যক্তি সন্ন্যাসী (মুনি) হইয়া অচিরে পরব্রহ্ম প্রাপ্ত হন । ৬
যোগযুক্তো বিশুদ্ধাত্মা বিজিতাত্মা জিতেন্দ্রিয়ঃ ।
সর্বভূতাত্মভূতাত্মা কুর্বন্নপি ন লিপ্যতে ।। ৭
যিনি নিষ্কামকর্মযোগ দ্বারা শুদ্ধচিত্ত, অতএব সংযতদেহ ও জিতেন্দ্রিয় এবং এইরূপে যিনি ব্রহ্ম হইতে স্তম্ব পর্যন্ত সর্বভূতের আত্মাকে স্বীয় আত্মারূপে দর্শন করেন, তিনি স্বাভাবিক বা লোক-সংগ্রহার্থ কর্ম করিয়াও লিপ্ত (বদ্ধ) হন না । ৭
নৈব কিঞ্চিৎ করোমীতি যুক্তো মন্যেত তত্ত্ববিৎ ।
পশ্যন্ শৃণ্বন্ স্পৃশন্ জিঘ্রন্নশ্নন্ গচ্ছন্ স্বপন্ শ্বসন্ ।। ৮
প্রলপন্ বিসৃজন্ গৃহ্নন্নুন্মিষন্নিমিষন্নপি ।
ইন্দ্রিয়াণীন্দ্রিয়ার্থেষু বর্তন্ত ইতি ধারয়ন্ ।। ৯
নিষ্কাম কর্মযোগী ক্রমে তত্ত্বদর্শী হইয়া দর্শনে, শ্রবণে, স্পর্শনে, আঘ্রাণে, ভোজনে, গমনে, নিদ্রায়, নিঃশ্বাস-গ্রহণে, কথনে, মলমূত্রাদি ত্যাগে, গ্রহণে, চক্ষুর উন্মেষে এবং নিমিষেও ইন্দ্রিয়গণ স্ব স্ব বিষয়ে প্রবৃত্ত – এইরূপ দৃঢ় ধারণা করিয়া ‘আমি অকর্তা, কিছুই করি না’ – ইহা নিশ্চিত জানেন । ৮-৯
ব্রহ্মণ্যাধায় কর্মাণি সঙ্গং ত্যক্ত্বা করোতি যঃ ।
লিপ্যতে ন স পাপেন পদ্মপত্রমিবাম্ভসা ।। ১০
যে মুমুক্ষু কর্মফলে আসক্তি ত্যাগপুর্বক পরমেশ্বরের উদ্দেশে সকল কর্ম করেন, জল যেমন পদ্মপত্রকে আর্দ্র করিতে পারে না, পাপপুণ্য সেইরূপ তাঁহাকে স্পর্শ করে না । ১০
কায়েন মনসা বুদ্ধ্যা কেবলৈরিন্দ্রিয়ৈরপি ।
যোগিনঃ কর্ম কুর্বন্তি সঙ্গং ত্যক্ত্বাত্মশুদ্ধয়ে ।। ১১
নিষ্কাম কর্মযোগীগণ ফলাসক্তি বর্জনপূর্বক মমত্ব-ভাবশূন্য (‘আমার’ – এই ভাবরহিত) হইয়া কায়, মন, বুদ্ধি ও ইন্দ্রিয়সমূহ দ্বারা চিত্তশুদ্ধির জন্য কর্ম করেন । ১১
যুক্তঃ কর্মফলং ত্যক্ত্বা শান্তিমাপ্নোতি নৈষ্ঠিকীম্ ।
অযুক্তঃ কামকারেণ ফলে সক্তো নিবধ্যতে ।। ১২
ঈশ্বরের নিমিত্ত কর্ম করিতেছি, ফললাভের জন্য নহে – এইরূপে কর্মফল ত্যাগপূর্বক নিষ্কাম কর্মযোগী জ্ঞাননিষ্ঠার ফলস্বরূপ চিরশান্তির (মোক্ষের) অধিকারী হন; কিন্তু সকাম কর্মী কর্মফলে আসক্তিবশে সংসারে আবদ্ধ হন । ১২
সর্বকর্মাণি মনসা সংন্যস্যাস্তে সুখং বশী ।
নবদ্বারে পুরে দেহী নৈব কুর্বন্ন কারয়ন্ ।। ১৩
কিন্তু যিনি পরমার্থদর্শী, সেই জিতেন্দ্রিয় পুরুষ বিবেক-বুদ্ধি দ্বারা নিত্য, নৈমিত্তিক, কাম্য ও নিষিদ্ধ – সমস্ত কর্ম ত্যাগপূর্বক নিজে কিছু না করিয়া এবং দেহেন্দ্রিয়াদিকে কোন কর্মে প্রবর্তিত না করিয়া দেহেন্দ্রিয়াদি-সঙ্ঘাতে আত্মাভিমানশূন্য, নিরায়াস ও প্রসন্নচিত্ত হইয়া নবদ্বার-বিশিষ্ট দেহনগরে অবস্থান করেন । ১৩
ন কর্তৃত্বং ন কর্মাণি লোকস্য সৃজতি প্রভুঃ ।
ন কর্মফলসংযোগং স্বভাবস্তু প্রবর্ততে ।। ১৪
কারণ আত্মা মানুষের কর্তৃত্ব, কর্ম ও কর্মফলপ্রাপ্তি সৃষ্টি করেন না; কিন্তু অবিদ্যারূপিণী মায়াশক্তি কর্তৃত্বাদিরূপে প্রবর্তিত হয়। অর্থাৎ অবিদ্যাপ্রভাবে কর্তৃত্ব ও কারয়িতৃত্বাদি আত্মাতে আরোপিত হয় । ১৪
নাদত্তে কস্যচিৎ পাপং ন চৈব সুকৃতং বিভুঃ ।
অজ্ঞানেনাবৃতং জ্ঞানং তেন মুহ্যন্তি জন্তবঃ ।। ১৫
পরমার্থতঃ আত্মা কাহারও পাপ বা পূজা জপহোমাদিরূপ পুণ্যও গ্রহণ করেন না । পূর্বোক্ত অবিদ্যা দ্বারা ‘আমি কর্তৃত্ব ও কারয়িতৃত্বাদিরহিত’ – এই বিবেকজ্ঞান আত্মজ্ঞান দ্বারা আবৃত বলিয়া প্রাণিগণ মোহগ্রস্থ হয়, অর্থাৎ মোহবশে ‘আমি করি ও করাই’, ‘আমি ভোগ করি ও করাই’ – ইত্যাদি ভ্রম করিয়া থাকে । ১৫
জ্ঞানেন তু তদজ্ঞানং যেষাং নাশিতমাত্মনঃ ।
তেষামাদিত্যবজ্‌জ্ঞানং প্রকাশয়তি তৎ পরম্ ।। ১৬
কিন্তু আত্মজ্ঞান দ্বারা যাঁহাদের অনাদি অজ্ঞান বিনষ্ট হইয়াছে, সূর্য যেমন সকল বস্তুকে অবভাসিত করেন, তেমন তাঁহাদের আত্মজ্ঞান শ্রুতিস্মৃতি-প্রসিদ্ধ ব্রহ্মকে সর্ববস্তুতে প্রকাশিত করে । ১৬
তদ্বুদ্ধয়স্তদাত্মানস্তন্নিষ্ঠাস্তৎপরায়ণাঃ ।
গচ্ছন্ত্যপুনরাবৃত্তিং জ্ঞাননির্ধূতকল্মষাঃ ।। ১৭
যাঁহাদের বুদ্ধি ব্রহ্মনিষ্ঠ, ব্রহ্মে যাঁহাদের আত্মভাব, ব্রহ্মে যাঁহাদের স্থিতি, যাঁহারা ব্রহ্মপরায়ণ, ব্রহ্মজ্ঞান দ্বারা যাঁহাদের সমস্ত পাপ ও পুণ্য বিধৌত হইয়াছে, তাঁহারা মোক্ষ লাভ করেন; তাঁহাদের আর পুনর্জন্ম হয় না । ১৭
বিদ্যাবিনয়সম্পন্নে ব্রাহ্মণে গবি হস্তিনি ।
শুনি চৈব শ্বপাকে চ পণ্ডিতাঃ সমদর্শিনঃ ।। ১৮
বিদ্বান্‌ ও বিনয়ী ব্রাহ্মণ, গরু, হস্তী, কুকুর ও চণ্ডালে ব্রহ্মজ্ঞানিগণ সমদর্শী হন, অর্থাৎ ব্রহ্মদর্শন করেন । ১৮
ইহৈব তৈর্জিতঃ সর্গো যেষাং সাম্যে স্থিতং মনঃ ।
নির্দোষং হি সমং ব্রহ্ম তস্মাদ্ ব্রহ্মণি তে স্থিতাঃ ।। ১৯
যাঁহাদের মন সর্বভূতস্থ ব্রহ্মে নিশ্চল, এই জীবনেই তাঁহারা সৃষ্টি বা জন্ম জয় করেন; কারণ, ব্রহ্ম ব্রাহ্মণচণ্ডালাদিতে সর্বত্র অভিন্ন এবং তাহাদের গুণদোষাদি দ্বারা অস্পৃষ্ট । অতএব তাঁহারা ব্রহ্মেই অবস্থিত ও দেহেন্দ্রিয়াদিতে অভিমানহীন, তাঁহাদিগকে দোষ-গন্ধও স্পর্শ করে না । ১৯
ন প্রহৃষ্যেৎ প্রিয়ং প্রাপ্য নোদ্বিজেৎ প্রাপ্য চাপ্রিয়ম্ ।
স্থিরবুদ্ধিরসংমূঢ়ো ব্রহ্মবিদ্ ব্রহ্মণি স্থিতঃ ।। ২০
নির্দোষ ব্রহ্মই সর্বভূতে এক আত্মরূপে বিরাজিত – এই প্রকার স্থির বুদ্ধি ও জ্ঞান দ্বারা মোহশূন্য ব্রহ্মবিৎ পুরুষ প্রিয় বস্তু পাইয়া উৎফুল্ল বা অপ্রিয় বস্তু পাইয়া উদ্বিগ্ন হন না । ২০
বাহ্যস্পর্শেষ্বসক্তাত্মা বিন্দত্যাত্মনি যৎ সুখম্ ।
স ব্রহ্মযোগযুক্তাত্মা সুখমক্ষয়মশ্নুতে ।। ২১
যিনি শব্দাদি বাহ্যবিষয়ে অনাসক্ত, তিনি প্রত্যগাত্মাতে বাহ্যবিষয়নিরপেক্ষ শাশ্বত সুখ অনুভব করেন এবং ব্রহ্মযোগযুক্ত হইয়া অক্ষয় ব্রহ্মানন্দের অধিকারী হন । ২১
যে হি সংস্পর্শজা ভোগা দুঃখযোনয় এব তে ।
আদ্যন্তবন্তঃ কৌন্তেয় ন তেষু রমতে বুধঃ ।। ২২
হে কৌন্তেয়, রূপরসাদি বিষয় হইতে উৎপন্ন সকল সুখ সর্বদা দুঃখেরই কারণ; এগুলির আদি আছে, অন্ত আছে, অতএব ক্ষণিক। ইহা ইহলোকে যেমন সত্য, পরলোকেও তেমনি সত্য। সেই জন্য জ্ঞানিগণ ইহাতে প্রীতিলাভ করেন না । ২২
শক্নোতীহৈব যঃ সোঢ়ুং প্রাক্ শরীরবিমোক্ষণাৎ ।
কামক্রোধোদ্ভবং বেগং স যুক্তঃ স সুখী নরঃ ।। ২৩
এই জীবনে যিনি আমরণ কাম ও ক্রোধের বেগধারণ করিতে পারেন, তিনিই যোগী, তিনিই সুখী । ২৩
যোহন্তঃসুখোহন্তরারামস্তথান্তর্জ্যোতিরেব যঃ ।
স যোগী ব্রহ্মনির্বাণং ব্রহ্মভূতোহধিগচ্ছতি ।। ২৪
যিনি আত্মাতেই সুখ অনভব করেন বাহ্যবিষয়ে নয়, যিনি আত্মাতেই ক্রীড়াযুক্ত বাহ্যবিষয়ে নয়, এবং যিনি অন্তর্জ্যোতি ও ব্রহ্মস্বরূপ, তিনি ইহজীবনেই ব্রহ্মানন্দ লাভ করেন । ২৪
লভন্তে ব্রহ্মনির্বাণমৃষয়ঃ ক্ষীণকল্মষাঃ ।
ছিন্নদ্বৈধা যতাত্মানঃ সর্বভূতহিতে রতাঃ ।। ২৫
যাঁহারা নিষ্কাম কর্ম দ্বারা পাপমুক্ত, শ্রবণ ও মনন দ্বারা সংশয়রহিত, নিদিধ্যাসন দ্বারা জিতেন্দ্রিয় এবং সকল জীবের কল্যাণে নিরত, সেই সম্যগ্‌দর্শি সন্ন্যাসিগণ ইহজীবনেই ব্রহ্মনির্বাণ (মোক্ষ) লাভ করেন ।  ২৫
কামক্রোধবিযুক্তানাং যতীনাং যতচেতসাম্ ।
অভিতো ব্রহ্মনির্বাণং বর্ততে বিদিতাত্মনাম্ ।। ২৬
কামক্রোধ হইতে মুক্ত, সংযত-চিত্ত, আত্মজ্ঞ সন্ন্যাসিগণের জীবিতাবস্থায় ও মৃত্যুর পরে উভয়তঃ ব্রহ্মনির্বাণ বিরাজ করে । সেই জীনন্মুক্তগণের মৃত্যুর পরে আর দেহধারণ হয় না । ২৬
 স্পর্শান্ কৃত্বা বহির্বাহ্যাংশ্চক্ষুশ্চৈবান্তরে ভ্রুবোঃ ।
প্রাণাপানৌ সমৌ কৃত্বা নাসাভ্যন্তরচারিণৌ ।। ২৭
যতেন্দ্রিয়মনোবুদ্ধির্মুনির্মোক্ষপরায়ণঃ ।
বিগতেচ্ছাভয়ক্রোধো যঃ সদা মুক্ত এব সঃ ।। ২৮
মন হইতে বাহ্য বিষয় বাহির করিয়া দৃষ্টি যেন ভ্রূযুগলের মধ্যে স্থির করিয়া, নাসিকার মধ্যে বিচরণশীল প্রাণ ও অপান বায়ুর ঊর্ধ্ব ও অধোগতি সমান (রোধ) করিয়া এবং ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি সংযমপূর্বক ইচ্ছা, ভয় ও ক্রোধ-শূন্য হইয়া যে মুনি সর্বদা বিরাজ করেন, তিনি জীবন্মুক্তই হন । ২৭-২৮
[উক্ত সমাহিতচিত্ত যোগিগণের দ্বারা কি বিজ্ঞেয় ? তাহার উত্তরে শ্রীভগবান্‌ বলিতেছেন – ]
ভোক্তারং যজ্ঞতপসাং সর্বলোকমহেশ্বরম্ ।
সুহৃদং সর্বভূতানাং জ্ঞাত্বা মাং শান্তিমৃচ্ছতি ।। ২৯
কর্তা ও দেবতারূপে আমি যজ্ঞ ও তপস্যার ভোক্তা, সর্বলোকের মহেশ্বর এবং সকলের উপকারী সুহৃদ্‌ এই প্রকারে আমাকে স্বীয় আত্মরূপে জানিয়া যোগী শান্তি (মুক্তি) লাভ করেন । ২৯
শ্রীভগবান্‌ ব্যাসকৃত লক্ষশ্লোকী শ্রীমহাভারতের ভীষ্মপর্বের অন্তর্গত শ্রীমদ্ভগবদ্গীতারূপ উপনিষদে ব্রহ্মবিদ্যাবিষয়ক যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে কর্ম-সন্ন্যাসযোগনামক পঞ্চম অধ্যায় সমাপ্ত ।

২) আত্মজ্ঞানহীনের কর্মসন্ন্যাস – [শাঙ্করভাষ্য]
কর্তৃত্বাভিমানহেতু আত্মজ্ঞানহীনের কর্মসন্ন্যাস অসম্ভব; কিছু কর্মত্যাগ হইতে পারে কিন্তু তাহার পক্ষে সম্পূর্ণ কর্মত্যাগ সম্ভব নহে । অবিদ্বানের পক্ষে কর্মসন্ন্যাস অপেক্ষা কর্মযোগ সহজ বলিয়া শ্রেষ্ঠ । তবে বৈরাগ্য থাকিলে অবিদ্বানের কর্মসন্ন্যাস নিষিদ্ধ নহে । যথা ‘যে দিনই সথার্থ বৈরাগ্য হইবে, সে দিনই সংসারত্যাগ করিবে ।’ – [জাবাল উপঃ, ৪]
৩) নিত্যসন্ন্যাসী : তিনি কর্মে নিরত থাকিয়াও সদা নিষ্কাম ও অনাসক্ত
৫) সাংখ্য : জ্ঞানের উদয় হইলে যে সন্ন্যাস হয় তাহাই সাংখ্য বা বিদ্বৎ-সন্ন্যাস
যোগ : ফলাকাঙ্ক্ষাবর্জিত ও ঈশ্বরে সমর্পিত বেদবিহিত কর্মের অনুষ্ঠান
৬) পরমার্থ সন্ন্যাস : পরমার্থযোগ; আত্মজ্ঞানের স্বরূপই সন্ন্যাস । এইজন্য পরব্রহ্ম শব্দ দ্বারা সন্ন্যাসই প্রতিপাদিত । বৈদিক কর্মযোগ ইহার উপায় বলিয়া যোগও সন্ন্যাস নামে উপচারিত হয় ।
১৩) নিত্য কর্ম = সন্ধ্যাবন্দনাদি অবশ্য কর্তব্য দৈনিক কর্ম
নৈমিত্তিক কর্ম = নিমিত্তবশতঃ যাহা করিতে হয়
কাম্য কর্ম = স্বর্গাদিফলপ্রদ অশ্বমেধাদি কর্ম (নিষ্কাম কর্মীর ত্যাজ্য)
নিষিদ্ধ কর্ম = ব্রাহ্মণহত্যা ইত্যাদি (সকলেরই ত্যাজ্য)
নবদ্বার : আত্মার উপলব্ধির দ্বারস্বরূপ সাতটি ছিদ্র মুখমণ্ডলে এবং মূত্র ও পুরীষ (মল)-ত্যাগের জন্য দুইটি ছিদ্র নিম্নদেহে আছে । মানষীর দেহপুর এই নবদ্বারযুক্ত ।
১৪) আত্মা কাহাকেও ‘কর’ বলিয়া নিয়োগ করেন না – সুতরাং কারয়িতা নহেন । তিনি প্রাণিগণের অভিলষিত বস্তুও নির্মাণ করেন না – অতএব তিনি কর্তাও নহেন । কিংবা তিনি যে প্রাণিগণের কৃতকর্মের ফল প্রদান করেন এবং তজ্জন্য কর্মফলদাতা হন, তাহাও নহে । স্বরূপতই আত্মা কর্তৃত্ব ও ভোক্তৃত্বাদিরহিত । নীলিমাশূন্য আকাশে যেমন নীলিমা-ভ্রম হয়, সেইরূপ আত্মাতে কর্তৃত্ব ও ভোক্তৃত্বাদিভ্রম হয় ।
১৬) অজ্ঞান অনাদি, অথচ সান্ত । অজ্ঞানের উৎপত্তি জানা যায় না, কিন্তু জ্ঞান হইলে উহা বিনষ্ট হইয়া যায় ।
সূর্যের উদয়মাত্র যেমন ঘটাদিবস্তু প্রকাশের আবরক অন্ধকার অপসারিত হয়, সেইরূপ আত্মজ্ঞানোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই আত্মার ব্রহ্মস্বরূপতার আবরক অজ্ঞান বিদূরিত হয় এববগ আত্মাই ব্রহ্ম – এই জ্ঞান সাক্ষাৎ ব্যক্ত হয় ।
১৮) উৎকৃষ্ট ও অপকৃষ্ট বস্তু বা ব্যক্তিতে এইরূপ সমদৃষ্টির জন্য দোষের আশঙ্কা ভগবান্‌ বারণ করিতেছেন ।
সূর্য যেমন গঙ্গাজলে ও সুরাতে প্রতিবিম্বিত হইলে গঙ্গাজলের গুণে বা সুরার দোষে লিপ্ত হন না, সেইরূপ ব্রহ্ম শুদ্ধ ও অশুদ্ধ বস্তুতে অবস্থিত হইলেও তাঁহাকে শুদ্ধি বা অশুদ্ধি স্পর্শ করে না ।

২১) ব্রহ্মযোগ = ব্রহ্মে যোগ (সমাধি), ব্রহ্মের সহিত আত্মার অভেদানুভব

২৩) কামবেগের চিহ্ন : শরীরে রোমাঞ্চ, হৃষ্টনেত্র ও হৃষ্টবদনাদি
ক্রোধবেগের লক্ষণ : শরীরে কম্প, প্রস্বেদ, অধরোষ্ঠের দংশন ও আরক্ত নেত্র প্রভৃতি

২৪) ব্রহ্মস্বরূপ হইয়া তিনি ব্রহ্মপ্রাপ্ত হন, অর্থাৎ মায়াবলে বিস্মৃত ব্রহ্মত্বের জ্ঞান লাভ করেন ।

২৬) ঈশ্বরে সর্বভাব অর্পণপূর্বক তাঁহাতে সকল কর্ম সমর্পণ দ্বারা অনুষ্ঠিত কর্মযোগের (চিত্তশুদ্ধি, জ্ঞান-প্রাপ্তি ও সর্বকর্ম-সন্ন্যাসক্রমে) মোক্ষপ্রদত্ত এবং সম্যগ্‌দর্শননিষ্ঠ সন্ন্যাসীদের সদ্যোমুক্তি বলা হইয়াছে ।
সদ্যোমুক্তি : জ্ঞানলাভকালেই জীবিতাবস্থায় ব্রহ্মরূপে অবস্থান এবং দেহান্তে অপুনর্জন্ম ।

_________________________________________
*Hard Copy Source:
“Srimadbhagabadgeeta” translated by Swami Jagadeeshwarananda, edited by Swami Jagadananda. 27th Reprint – January, 1997 (1st Edition – 1941), © President, Sriramkrishna Math, Belur. Published by Swami Satyabrotananda, Udbodhan Office, 1 Udbodhan Lane, Bagbazar, Kolkata-700003. Printed by Rama Art Press, 6/30 Dum Dum Road, Kolkata-700030.

Sanskrit Source
English Translation


Disclaimer: This site is not officially related to Ramakrishna Mission & Math. এটি এক অর্বাচীন ভক্তের প্রয়াস মাত্র ।

 

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s