প্রহ্লাদের পাঠশালায় শিক্ষা


প্রহ্লাদের পাঠশালায় শিক্ষা

সনাতনগোপাল দাস ব্রহ্মচারী

sri_prahlada_maharaja

অসুর হিরণ্যকশিপু তাদের পরিবারের আনুষ্ঠানিক কার্যকলাপ সম্পাদন করার জন্য শুক্রাচার্যকে পৌরোহিত্যে বরণ করে।  শুক্রাচার্যের দুই পুত্র ষণ্ড ও অমর্ক।  তারা হিরণ্যকশিপুর গৃহের নিকটে বাস করত।  কোনও ব্রাহ্মণের উচিত নয় যে, নাস্তিক ভগবদ্ বিরোধী লোকের পুরোহিত হওয়া।  কিন্তু শুক্রাচার্য  কেবল তাঁর পুত্র ও বংশধরদের ধন লাভের ব্যাপারেই আগ্রহী।

বালক প্রহ্লাদ পূর্বে ভগবৎভক্তি শিক্ষায় শিক্ষিত ছিল।  কিন্তু তার পিতা হিরণ্যকশিপু যখন শিক্ষা লাভের জন্য তাকে শুক্রাচার্যের দুই পুত্রের কাছে পাঠালেন, তখন তারা প্রহ্লাদকে তাদের পাঠশালায় অন্য অসুর-বালকদের সঙ্গে গ্রহণ করেন।

ষণ্ড ও অমর্ক এই দুই শিক্ষক রাজনীতি, অর্থনীতি প্রভৃতি বিষয়ে যে শিক্ষা দিয়েছিলেন, বালক প্রহ্লাদ অবশ্যই তা শিখছিল ও পাঠ করছিল।  কিন্তু প্রহ্লাদ বুঝতে পেরেছিল যে, রাজনীতিতে সমাজের কাউকে বন্ধু বলে বিবেচনা করা হয় এবং কাউকে শত্রু বলে বিবেচনা করা হয়।  এই ব্যাপারটা তার মোটেই ভালো লাগেনি।

প্রহ্লাদ আরও লক্ষ্য করেছিল যে, ভগবানের শুদ্ধ ভক্ত সবারই হিতাকাঙ্ক্ষী।  কিন্তু আসুরিক ভাবাপন্ন লোকেরা শুদ্ধ ভক্তের উপদেশ অনুসরণ করে না, বরং ভক্তকে তাদের শত্রু বলে মনে করে।  প্রহ্লাদের চিন্তা ছিল সবার মধ্যে শ্রীহরি রয়েছেন।  শ্রীহরি সবার অন্তর্যামী।  শ্রীহরির প্রতি ভক্তি অনুশীলন করতে থাকলে কারও মধ্যে বৈষম্য ও হিংসাভাব থাকে না।

একদিন দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপু তার পুত্র প্রহ্লাদকে কোলে করে অত্যন্ত স্নেহভরে জিজ্ঞাসা করলেন–হে বৎস, তোমার শিক্ষকদের কাছে তুমি যে সমস্ত বিষয় পাঠ করেছ, তার মধ্যে কোন্ বিষয়টি তুমি শ্রেষ্ঠ বলে মনে করো, তা আমাকে বলো।

অসুর হিরণ্যকশিপু মনে করলেন, তার পুত্র প্রহ্লাদ যা ষণ্ড-অমর্কের কাছে শিখেছে- অর্থনীতি, রাজনীতি কিংবা অন্য কিছু যেটা সে বললে বেশ শ্রুতিমধুর হবে এবং ভালো লাগবে।  কিন্তু, প্রহ্লাদ মনে-প্রাণে কৃষ্ণভক্তি শিক্ষাটাই গ্রহণ করেছিল।  সেই জন্য তার উত্তর ছিল অন্যরকম।

প্রহ্লাদ বলল, আমার গুরুদেবের কাছে জেনেছি, যারা তাদের ক্ষণস্থায়ী দেহকেই কেন্দ্র করে গৃহব্রতী জীবন যাপন করে, তাদের আত্মজ্ঞান লাভ হয় না।  অন্ধ কুঁয়োতে যেখানে জল নেই, তবুও লোকে সেখানে জলের খোঁজ করে এবং কেবল উদ্বেগ লাভ করে।  সেই পরিস্থিতি ত্যাগ করে বনে গিয়ে কৃষ্ণভাবনামৃতের পন্থা অবলম্বন করা কর্তব্য।

প্রহ্লাদ পরোক্ষভাবে তার পিতাকে জানালো যে, তুমি ‘আমি-আমার’ করে অহংকারী হয়ে ‘আমি রাজা, আমার রাজ্য, আমার ক্ষমতা, আমার বৈভব’ করে বৃথা দিনযাপন করছ।  এই সবই ক্ষণস্থায়ী।  এখন তোমার ঘর ছেড়ে বানপ্রস্থ নেওয়া কর্তব্য, যেখানে হরিভজন করে বাকী দিনগুলি কাটালে জীবন সার্থক হয়ে যাবে।

পুত্রের মুখে হরিভক্তির বিষয় শুনে অসুর হিরণ্যকশিপু বিস্মিত হলেন।  ক্রোধান্বিত হয়ে ষণ্ড-অমর্ককে ডেকে এনে বললেন, কি ব্যাপার! প্রহ্লাদকে তোমরা কি শিখিয়েছ?  তারা বলেন, মহারাজ, আমরা হরিভক্তি শিখাইনি।  ওসব কথা প্রহ্লাদ নিজের থেকেই বলছে।

হিরণ্যকশিপু বললেন, বালকদের বুদ্ধি শত্রুর দ্বারা বিপর্যস্ত হয়।  তোমরা শোনো, এই বালককে গুরুকুলে এমনভাবে রক্ষণ করো যাতে ছদ্মবেশী বৈষ্ণবরা আর তার বুদ্ধিকে প্রভাবিত করতে না পারে।

হিরণ্যকশিপুর ভৃত্যেরা তারপর প্রহ্লাদকে গুরুকুলে নিয়ে এসেছিল।  তখন ষণ্ড ও অমর্ক প্রহ্লাদকে ছলনা করে মিষ্টি কোমল ভাষায় জিজ্ঞাসা করতে লাগল, বাছা প্রহ্লাদ, তোমার মঙ্গল হোক।  তুমি সত্যি কথা বল,  মিথ্যা বলো না।  এই সমস্ত কত বালক এখানে রয়েছে।  তারা তো তোমার মতো নয়,  তোমার মত তারা উল্টা-পাল্টা কথা বলে না।  তুমি কি শিখেছ, যা তোমার বাবার কাছে বললে, কিভাবে তুমি সেই কথা বললে, কে তোমাকে শিখিয়েছে? তোমার বুদ্ধি এভাবে বিপর্যস্ত হলো কি করে ?

ষণ্ড-অমর্কের চিন্তার বিষয় হল এই যে, পাঠশালায় সব বালক ভালো।  কেননা তারা হরিভজন শিক্ষা পায়নি, তাদের বুদ্ধি বিপর্যস্ত হয় নি।  কেবলমাত্র প্রহ্লাদের বুদ্ধি বিপর্যস্ত হয়ে গেছে।  কিন্তু কিভাবে হল?  তারা বলল, কোন্ শক্র এভাবে তোমার ক্ষতি করল?  আমরা তোমার গুরু।  আমাদের কাছে তুমি সত্য কথা বল।

প্রহ্লাদ বলল, যাঁর মায়া মানুষের বুদ্ধিকে বিমোহিত করে ‘আমার বন্ধু’ ও ‘আমার শত্রু’ এই ভেদভাব সৃষ্টি করায়, সেই পরমেশ্বর ভগবানকে আমি আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করি।  যদিও আমি এই বিষয়ে পূর্বে প্রামাণিক সূত্রে শ্রবণ করেছি, কিন্তু এখন আমি তা বাস্তবিক উপলব্ধি করছি।

বাস্তব উপলব্ধি হচ্ছে, ভগবান পরম প্রভু এবং আমরা তাঁর সেবক।  সেই সূত্রে আমরা সকলেই সমান।  এই শিক্ষা প্রহ্লাদ তাঁর গুরুদেব শ্রীনারদমুনির কাছ থেকে পেয়েছিল, কিন্তু বিভ্রান্ত জীবেরা যে কিভাবে এক ব্যক্তিকে তাদের শত্রু এবং অন্য ব্যক্তিকে তাদের বন্ধু বলে মনে করে, তা দেখে প্রহ্লাদ আশ্চর্যান্বিত হয়।
প্রহ্লাদ বলল, ভগবান যখন কোনও জীবের প্রতি তার ভক্তির ফলে প্রসন্ন হন, তখন তিনি পণ্ডিত হন, এবং শত্রু-মিত্র ও নিজের মধ্যে কোন ভেদ দর্শন করেন না।  তখন তিনি বুদ্ধিমত্তা সহকারে মনে করেন, আমরা সকলেই ভগবানের নিত্য দাস এবং তাই আমরা পরস্পরের থেকে ভিন্ন নই।  যারা সর্বদা ‘শত্রু’ ও ‘মিত্র’ চিন্তা করে, তারা তাদের অন্তরে ভগবানকে উপলব্ধি করতে পারে না।

ষণ্ড-অমর্ক অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে বলল, আমরা মহারাজ হিরণ্যকশিপুর সেবক।  তুই আমাদের অপযশের কারণ।  তোকে শায়েস্তা না করলে নয়।

এই বলে একটা বেত এনে প্রহ্লাদকে প্রহার করতে লাগল।  তাকে কুলাঙ্গার প্রভৃতি কটু বাক্যে তিরস্কারও করল।  সেদিন এভাবে কাটল।  ষন্ড-অমর্ক খুব সাবধানে ধর্ম অর্থ ও কাম, এই ত্রিবর্গ শিক্ষা দিতে লাগল–  ধর্মের উদ্দেশ্য হচ্ছে অর্থ সংগ্রহ করা, অর্থের উদ্দেশ্য হচ্ছে কাম উপভোগ করা, কামের উদ্দেশ্য হচ্ছে এই জীবনটাকেই সুখের জীবন বলে ভেবে নেওয়া।

মানুষ সাধারণতঃ এই তিনটি বিষয় নিয়েই মগ্ন থাকে।  কেউই মুক্তির প্রতি আগ্রহী নয়।  ভগবৎ-ভক্তি মুক্তিরও ঊর্ধ্বে।  তা সাধারণের বোধগম্যও নয়।  প্রহ্লাদ ভগবৎ-ভক্ত।  ষণ্ড ও অমর্ক তাকে জড়বাদী জীবনের পন্থা অবলম্বন করাতে চেষ্টা করলেও প্রহ্লাদ সেগুলিতে আগ্রহী নয়।  তবুও তারা প্রহ্লাদকে শিক্ষা দিতে শুরু করল, কিভাবে প্রজাদের উপর খুব ভালভাবে আধিপত্য করার জন্য রাজনীতিবিদ হতে হয়।

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s