বেদ ও প্রাচীন ভারতের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য (নিয়মিত পর্ব-১৪)


ওঁ তৎ সৎ
%e0%a6%ac%e0%a7%87%e0%a6%a6-%e0%a6%93-%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%a4%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%86%e0%a6%a7%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a6%95-%e0%a6%90

বেদের যে আলাদা আলাদা নাম আছে সেই নামানুসারে বোঝা যাবে বেদকে কি অর্থে গ্রহণ করা হচ্ছে। বেদকে পাঁচ রকম ভাবে অর্থ করা হয়- নিগম, শ্রুতি, আমনায়, ত্রয়ী ও বেদ। বেদ কথার অর্থ আমরা আগেই বলেছি, বিদ্‌ ধাতু থেকে বেদ এসেছে, বিদ্‌ ধাতুর অর্থ হচ্ছে জানা। আস্তিক দর্শন আর নাস্তিক দর্শন সম্বন্ধে আমরা জেনে গেছি। এখন এই আস্তিক দর্শনের ছটি দর্শন আছে এদের একসঙ্গে বলা হয় ষড়দর্শন। এই ছটি দর্শনের মধ্যে একটা দর্শন মীমাংসা। মীমাংসকরা পুরো শক্তিটা বেদের উপরই দিয়েছেন, বেদের ব্যাখ্যাতেই এদের গোটা দর্শন দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই দর্শন খুবই কঠিণ। তবে এটাই আশ্চর্যের যে, যদিও বেদ আমাদের শেষ কথা, আর মীমাংসকরা এই বেদকে নিয়েই তাদের দর্শনকে প্রতিষ্ঠিত করছেন, অথচ শঙ্করাচার্যের প্রধান প্রতিপক্ষ হচ্ছে এই মীমাংসকরা, তাঁর প্রধান লড়াই এদের সাথেই। আমাদের যখন শাস্ত্র পড়ান হয় তখন চারটে দর্শন পড়ানোর পরে মীমাংসা পড়ান হয়, একেবারে শেষে বেদান্ত পড়ান হয়ে থাকে। কেননা মীমাংসা দর্শন বুঝে নিলে পরে বেদান্ত পড়তে সহজ হয়। শঙ্করাচার্যের সময় মীমাংসকদের বলা হত প্রধানমল্ল। মীমাংসা দর্শন এতো শক্তিশালী ছিল যে যদি কেউ মীমাংসকদের হারিয়ে দিতে পারে তাহলে ধরে নেয়া হবে জগতের যত দর্শন আছে সবাইকে সে হারিয়ে দিয়েছে। কলকাতার যে সবথেকে বড় মল্লবীর সে যদি পাঞ্জাবে গিয়ে ওখানকার চ্যাম্পিয়নকে হারিয়ে দিতে পারে তাহলে পাঞ্জাবের সব মল্লবীরকেই হারিয়ে দেওয়া হল।
মীমাংসকদের হারাতে গিয়ে শঙ্করাচার্যকে খুব কঠিণ কঠিণ শক্তির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। প্রথমে তিনি খোঁজ নিলেন মীমাংসকদের প্রধান কে আছে। খোঁজ নিয়ে জানলেন যে তাদের প্রধান হচ্ছেন কুমারিল ভট্ট। কুমারিল ভট্টকে যখন তিনি খুঁজে বার করলেন তখন কুমারিল ভট্ট একটা অনুশোচনায় প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য তুষের আগুনে নিজেকে আত্মাহুতি দিয়ে মৃত্যুর অপেক্ষা করছেন। কুমারিল ভট্ট বৌদ্ধ ধর্মকে জানার জন্য নিজের ধর্ম ত্যাগ করে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। বৌদ্ধ ধর্মকে আক্রমণ করলেন, আর এমন আক্রমণ করলেন যে সারা ভারতে বৌদ্ধধর্মকে একেবারে নস্যাৎ করে ছেড়ে দিলেন। কিন্তু নিজের ধর্মকে যেহেতু ত্যাগ করে বিধর্মী হয়েছিলেন সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য তিনি নিজকে তুষাগ্নিতে আহুতি দিয়ে তিল তিল করে পুড়তে পুড়তে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। শঙ্করাচার্য যখন কুমারিল ভট্টকে খুঁজতে খুঁজতে সেখানে পৌঁছেছেন তখন কুমারিল ভট্ট একমাস ধরে একটু একটু করে পুড়ছেন। ঐ অবস্থাতে শঙ্করাচার্য গিয়ে তাঁকে বলছেন ‘আমি আপনার সাথে তর্ক করতে এসেছি’। কুমারিল ভট্ট শঙ্করাচার্যকে তখন বলছেন ‘আমারতো এই অবস্থা দেখছ, আমি তো এখন পুড়ছি, এই অবস্থাতে আমি তোমার সাথে কি আর তর্ক করব। তবে মিথিলাতে আমার শিষ্য মণ্ডন মিশ্র আছে, তুমি তাকে গিয়ে হারাও, ওকে হারালে আমাকেই হারান হবে’। শঙ্করাচার্য কুমারিল চট্টের মৃত্যু পর্যন্ত সেখানে অপেক্ষা করে থেকে তাঁর মৃত্যুর পর ক্রিয়াকর্মাদি করিয়ে দিয়ে মিথিলাতে এসে মণ্ডন মিশ্রের কাছে এসে তাকে তর্কে আহ্বাণ করলেন। সাত দিন ধরে এই তর্ক চলেছিল। সাত দিন পর মণ্ডন মিশ্র নিজের পরাজয় স্বীকার করে শঙ্করাচার্য্যের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাস নিয়ে নিলেন। পরবর্তি কালে শঙ্করাচার্যের চারজন প্রধান শিষ্যের মধ্যে মণ্ডন মিশ্র একজন প্রধান শিষ্য হয়েছিলেন, তাঁর নাম হয়েছিল সুরেশ্বরাচার্য। মণ্ডন মিশ্রকে যেদিন শঙ্করাচার্য হারিয়ে দিলেন সেই দিন থেকে ভারতের প্রধান দর্শন হয়ে গেল বেদান্ত। শঙ্করাচার্য পরবর্তি প্রায় তেরশো বছর ভারতের উপর দিয়ে অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে কিন্তু আজ পর্যন্ত বেদান্তকে কেউ হারাতে পারেনি। বেদান্তর মধ্যে প্রচুর শাখা-প্রশাখা আছে- দ্বৈতবাদ, বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ, অদ্বৈতবাদ, অচিন্ত্যভেদাভেদবাদ ইত্যাদি আর এদের প্রত্যেকের মধ্যে প্রচণ্ড বাদ-বিতণ্ডা লেগেই থাকে, কিন্তু অন্য দর্শন বা ধর্ম থেকে কেউ আক্রমণ করলে এরা সবাই এক জোট হয়ে পাল্টা আক্রমণ করবে।
ক্রমশঃ

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s