ঋগ্বেদ পরিচয় – (৩) ঋগবেদের কাল


ঋগ্বেদ পরিচয় – (৩) ঋগবেদের কাল

 Related image
ঋগবেদের কাল নির্ণয় নিয়ে মতের অনেক পার্থক্য আছে। সর্বাপেক্ষা প্রাচীন হতে অপেক্ষায় অধুনাতমকালে তাকে স্থাপন করবার চেষ্টা হয়েছে। এদের ব্যবধান কয়েক সহস্র বৎসর। নানা মনীষী এই প্রসঙ্গে যে সকল তথ্য দিয়েছেন সেগুলি বিবেচনা করে একটি যুক্তিসম্মত কাল নির্দেশ করতে হবে। প্রথমে বিভিন্ন মতগুলি স্থাপন করা যেতে পারে।

অধ্যাপক হেরমান জাকোবির মত অনুসারে বৈদিক সাহিত্যের রচনার কাল খৃষ্টপূর্ব ৪০০০ বৎসর। বাল গঙ্গাধর তিলকও অনুরূপ মত পোষণ করতেন মনে হয়।

প্রচলিত ধারণা আছে যে বেদব্যাস বেদগুলি চারভাগে সংকলন করেছিলেন। আমরা জানি তিনি মহাভারতের যুগের মানুষ। হোরেস হেম্যান উইলসনের ধারণায় বেদব্যাস এই সংকলন কার্য সম্পাদন করেন যুধিষ্ঠিরের পৃষ্ঠপোষকতায় (Rigveda Samhita Vol.1, Introduction)। সুতরাং এই প্রসঙ্গে মহাভারতের কাল নির্ণয় প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

আমাদের দেশে একটা ধারণা আছে যে দ্বাপরের শেষে কলিযুগের আরম্ভ হয় খৃষ্টপূর্ব ৩১০১ বর্ষে। ঐতিহ্য অনুসারে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ সংঘটিত হয় দ্বাপর যুগের শেষে। সুতরাং এই যুক্তির ভিত্তিতে মহাভারতের ঘটনাকে খৃষ্টপূর্ব ৩২০০ অব্দে ঠেলে নিয়ে যাওয়া যায়। ফলে বেদের রচনার কাল তারও কিছু পুর্বে নির্ধারণ করা যায়। কিন্তু মহাভারতের কাল নির্ণয়ের চেষ্টা একাধিক মনীষী ভিন্নভাবেও করেছে।

তাঁদের মধ্যে ইংরেজ ভারততত্ত্ববিদ এফ.ই. পার্জিটার অন্যতম। পুরাণসমূহে প্রাচীন ভারতের রাজবংশ এবং রাজাদের তালিকা দেওয়া আছে। সেইসব তালিকা হতে যে তথ্য উদ্ধার করা গেছে তাকে ভিত্তি করে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে মহাভারতে বর্ণিত কুরু-পান্ডবদের যুদ্ধের কাল হল আনুমানিক খৃষ্টপূর্ব ৯৫০ অব্দে অর্থাৎ খৃষ্টপূর্ব দশম শতকের মধ্যভাগে।

ঐতিহাসিক হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী পার্জিটারের অনুসৃত পথ অনুমোদন করেন নি। তাঁর ধারণায় পুরাণগুলিতে বর্ণিত রাজবংশের তালিকাগুলির কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই এবং অনেক সময় কাহিনীগুলি কল্পিত। তাই তিনি পুরাণ গুলি হতে লব্ধ তথ্যকে উপেক্ষা করেছেন। তিনি নির্ভর করেছেন বৈদিক সাহিত্যের অন্তর্ভূক্ত ব্রাহ্মণাদি গ্রন্থে যে রাজবংশ, রাজা, ঋষি ও ঋষি পরম্পরার উল্লেখ আছে তাদের মধ্য হতে সংগৃহীত তথ্যের ওপর। এই তথ্যকে ভিত্তি করে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে মহাভারতের যুদ্ধ সংঘটিত হয় খৃষ্টপূর্ব দশম শতকে।

সুতরাং যদিও পার্জিটার ও হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী বিভিন্ন তথ্যের উপর নির্ভর করেছেন, তাঁদের সিদ্ধান্ত একই দাঁড়িয়েছে। এই সিদ্ধান্ত অনুসারে তাহলে চারটি বেদের সংকলন কাল নির্ধারিত হয়ে যায় খৃষ্টপূর্ব দশম শতাব্দীতে। এই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ঋগবেদের রচনাকাল আরও দু’এক শতাব্দী আগে টেনে নিয়ে যাওয়া যায়। আমরা দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে আলোচনা করে দেখিয়েছি যে অথর্ববেদের আবিস্কার হয় সবার শেষে এবং ব্রাহ্মণের যুগে পর্যন্ত তিনটি বেদের অস্তিত্বই মানুষ জানত। অপর পক্ষে তিনটি বেদের মধ্যে ঋগ্বেদ প্রাচীনতম। ঋগবেদের যে এক হাজারের উপর সূক্ত আছে সেগুলিও রচিত হয়েছিল দীর্ঘকাল ধরে। সুতরাং ঋগবেদের রচনাকাল এক শতাব্দী কাল ধরে বিস্তারিত ছিল ধরে নেওয়া যায়। যদি ধরে নেওয়া যায় অথর্ববেদের আবির্ভাব হয়েছিল ঋগবেদের শতবৎসর পরে, তাহলে ঋগ্বেদের কাল কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় হতে আরও দুই-শতাব্দী এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। সুতরাং এই যুক্তির ভিত্তিতে ঋগবেদের কাল নির্ণীত হওয়া উচিত খৃষ্টপূর্ব দ্বাদশ শতাব্দীতে।

ভাষাতত্ত্ববিদ ডঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ভাষাতত্ত্বের ভিত্তিতে ঋগবেদের কাল নির্ণয় করেছেন। তাঁর অভিমত এইরূপঃ ইরানের প্রাচীন আর্য ভাষা দুটি – আবেস্তার ভাষা ও প্রাচীন পারসীক ভাষা। এই দুটি ভাষার সহিত বৈদিক সংস্কৃত ভাষার অনেক সাদৃশ্য দেখা যায়। আবেস্তার প্রাচীনতম অংশ হল তার গাথা অংশ। তার আনুমানিক রচনাকাল খৃষ্টপূর্ব ৬০০।

বৈদিক ভাষা ও আবেস্তার ভাষার যে বৈসাদৃশ্য দেখা যায়, অনুমান করা হয়, কয়েক শতাব্দী পুর্বে যখন বৈদিক আর্যগণ ও পারসীক আর্যগণ একসঙ্গে বাস করতেন তখন তা ছিল না। ডঃ চট্টোপাধ্যায়ের ধারণা এই বৈসাদৃশ্য গড়ে উঠতে তিন’শ বা চার’শ বছরের বেশী লাগা উচিত নয়। সুতরাং তাঁর ধারণায় ঋগবেদের রচনাকাল ১০০০ হইতে ৯০০ খৃষ্টপূর্বাব্দে ফেলা যায়। সুতরাং তিনি পার্জিটার ও হেমচন্দ্র রায়চৌধুরীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে প্রস্তুত আছেন। (রমেশচন্দ্র দত্তের ঋগ্বেদ সংহিতা, তৃতীয় সংস্করণ ভূমিকা)।

এই প্রসঙ্গে জার্মান-ভারত তত্ত্ববিৎ ম্যাক্সমূলার-এর অভিমত বিবেচনা করা যেতে পারে। আমরা জানি ঋগবেদের সংহিতা অংশ সব থেকে প্রাচীন এবং বেদগুলির ব্রাহ্মণ গুলি রচিত হয় তারপরে। প্রাচীন উপনিষদগুলির আবির্ভাব হয় আরও পরে। এই ভিত্তিতেই ম্যাক্সমূলার-এর চিন্তা স্থাপিত। তাঁর যুক্তি এইরূপঃ

আমরা জানি যে ভগবান বুদ্ধের আবির্ভাবকাল ছিল খৃষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী। তাঁর সময় উপনিষদ প্রচলিত ছিল। সুতরাং উপনিষদের কালকে খৃষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে ফেলা যায়। সুতরাং ব্রাহ্মণগুলির রচনার কাল খৃষ্টপূর্ব সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দীতে স্থাপন করা যায়। কাজেই ঋগবেদের প্রাচীন অংশকে খৃষ্টপূর্ব একাদশ বা দ্বাদশ শতাব্দীতে ঠেলে দেওয়া যায়। তাঁর ধারণায় ঋগবেদ সম্ভবত আরও প্রাচীন।

ম্যাক্সমূলার-এর সিদ্ধান্তটি অন্যভাবেও পরীক্ষা করে নিতে পারি। ছান্দোগ্য উপনিষদের তৃতীয় অধ্যায়ের ষোড়শ ও সপ্তদশ খন্ডে পুরুষ যজ্ঞের বর্ণনা আছে। সেখানে একটি মানুষের সমগ্র জীবনের সহিত একটি যজ্ঞ সম্পাদনের তুলনা করে হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে কৃচ্ছ্রসাধন দীক্ষার স্থান গ্রহণ করে, জীবনে ভোগ উপসৎ এর স্থান গ্রহণ করে, প্রীতিপুর্ণ আচরণ স্তুতশাস্ত্রের স্থান অধিকার করে। তপস্যা, দান, আর্জব ও অহিংসা সেই যজ্ঞের দক্ষিণা স্বরূপ এবং মরণ অবভৃথ বা সমাপ্তি স্বরূপ। এই প্রসঙ্গে আরও বলা হয়েছে অঙ্গিরস পুত্র ঘোর ঋষি এই যজ্ঞের কথা দেবকী পুত্র কৃষ্ণের নিকট ব্যাখ্যা করেছিলেন।

এখন মহাভারতকে ঐতিহাসিক গ্রন্থ বলে স্বীকার করা হয়। তাতে বর্ণিত কুরু-পান্ডবের যুদ্ধকেও ঐতিহাসিক ঘটনা বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এখন দেখা যাচ্ছে মহাভারতের অন্যতম নায়ক ঐতিহাসিক পুরুষ কৃষ্ণের ছান্দোগ্য উপনিষদে উল্লেখ আছে। সুতরাং এই উপনিষদের রচনাকাল মোটামুটি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সমসাময়িক বলে ধরে নেওয়া যায়। ঐতিহাসিকদের সিদ্ধান্ত হল মহাভারতে বর্ণিত কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ সংঘটিত হয় খৃষ্টপূর্ব দশম শতকে। সুতরাং ধরে নেওয়া যেতে পারে প্রাচীন উপনিষদগুলি এর সমসাময়িক। তা যদি হয় তাহলে ব্রাহ্মণগুলি তারও পূর্বে রচিত এবং ঋগবেদের প্রাচীন অংশ তারও আগে রচিত। ব্রাহ্মণগুলি যদি আরও একশ বছর প্রাচীন হয় এবং ঋগবেদ সংহিতা তারও একশ বছর আগে রচিত হয়েছে অনুমান করা যায় তাহলে ঋগবেদের রচনাকাল দাঁড়ায় খৃষ্টপূর্ব দ্বাদশ শতক। এই সিদ্ধান্ত ম্যাক্সমূলার-এর সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করে।

প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার ফলে বর্তমানকালে মানুষের প্রাচীন ইতিহাসের এক নতুন দিগন্ত আবিস্কৃত হয়েছে। তাতে ভাল করে না হলেও প্রাগৈতিহাসিক যুগের মোটামুটি একটি ইতিহাস খাড়া করা যায়। তার অবলম্বন হল ঢিপি খুঁড়ে প্রাচীনকালের বসতির মধ্যে আদিম মানুষের যে সাংস্কৃতিক নিদর্শন পাওয়া যায় তাই। যেমন, মৃতপাত্র, পাথরের কুচি, কঙ্কাল এবং তার সঙ্গে প্রোথিত অন্য জিনিসপত্র। আদিমানব অনেক ক্ষেত্রে শীত হতে পরিত্রাণের জন্য গুহার বাস করত। সেখানে তার রাখা কিছু চিত্রের নিদর্শনও পাওয়া যায়। যেমন সংস্কৃতির অগ্রগতি হতে লাগল তেমন যন্ত্রাদিরও উন্নতি হতে লাগল। পাথরের কুচি আরও সুদৃশ্য ও মসৃণ হল। হাড়ের লাঙ্গল হল। পরবর্তীকালে তামার বা ব্রোঞ্জের অস্ত্রাদির আবির্ভাব হল। তারও পরবর্তীকালে চাষ আবিস্কার হল, অশ্বযান এল। এমন কি গণনা রীতি এবং লিপিও আবিস্কৃত হল।

বৈদিক যুগের মানুষ ভারতে এসেছিল বাহির হতে এবং তারাও প্রাগৈতিহাসিক যুগের অন্তর্ভূক্ত। পূর্বে ধারণা ছিল আদিম ভারতীয়গণ অসভ্য ছিল এবং আর্যগণই প্রথম এসে সভ্যতার বিস্তার করে। কিন্তু সে ধারণা এখন প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার ফলে ভেঙে পড়েছে। উত্তর-পশ্চিম ভারতে হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোতে এক উচ্চস্তরের নগরভিত্তিক সভ্যতার অস্তিত্বের প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া গেছে। তা প্রাগৈতিহাসিক মিশরীয় ও ইউফ্রেটিস উপত্যকার সুমেরীয় সংস্কৃতির সমসাময়িক বলে প্রত্নতত্ত্ববিদদের ধারণা। সুতরাং তা বৈদিক যুগের আগেই ভারতে সসম্মানে অধিষ্ঠিত ছিল। এইসব নূতন আবিস্কারের সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করে বৈদিক আর্যদের ভারতে আগমন এবং ঋগবেদের কাল নির্ণয় করা প্রশস্ত হবে।

প্রাগৈতিহাসিক যুগকে প্রত্নতাত্ত্বিকগণ তিনটি অধ্যায়ে ভাগ করেন। প্রথম অধ্যায়ে প্রাচীন প্রস্তর যুগ। তখন মানুষ আগুন জ্বালাতে শিখেছে। তার জীবিকা ছিল খাদ সংগ্রহ করা। খাদ্য উৎপাদন করতে তখনও সে শেখেনি। তার ব্যবহৃত প্রধান অস্ত্র ছিল ভোঁতা পাথরের কুচি। তারপর দ্বিতীয় পর্যায় এল এক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে। মানুষ তখন খাদ্য উৎপাদন করতে শিখল। পশুপালন ও কৃষি তার জীবিকার অবলম্বন হল। ফলে জীবনের রীতি একেবারে পরিবর্তত হয়ে গেল। তারপর আর একটি বিপ্লব এল। তখন মানুষ ধাতুর ব্যবহারের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। সে পঞ্জিকা উদ্ভাবন করেছে এবং তার লিপিজ্ঞান হয়েছে। তখন সে নগরভিত্তিক সংস্কৃতি গড়ে তুলল। এই তিনটি অধ্যায়ের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ আমরা স্থাপন করবার প্রস্তাব করি।

ই গর্ডন চাইল্ড-এর ধারণায় (Man Makes Himself) প্রাচীনতম প্রস্তর যুগের আরম্ভ হয় সম্ভবত ২,৫০,০০০ লক্ষ বৎসর পূর্বে এই যুগ স্থায়ী হয় প্রায় দু’লক্ষ বছর। সুতরাং মানুষের সংস্কৃতি প্রায় স্থাণু অবস্থায় দীর্ঘকাল রয়ে গিয়েছিল।

অনুমান করা হয় এই যুগের মানুষ আগুন জ্বালাতে শিখেছিল। তারা পাথরের ফলক যন্ত্র হিসাবে ব্যবহার করত। জন্তুর হাড়ও যন্ত্র হিসাবে ব্যবহার করত। তাদের জীবিকার অবলম্বন ছিল খাদ্য সংগ্রহ করা; কারণ তখন তারা খাদ্য উৎপাদন করতে শেখেনি। অর্থাৎ তারা পশু, পাখী, মাছ প্রভৃতি শিকার করত এবং ফলমুল সংগ্রহ করত। এই উপায়েই তাদের দেহের পুষ্টির ব্যবস্থা ছিল। ঠিক কিভাবে তারা জীবনধারণ করত তা অনুমানের বিষয়। তবে ধরে নেওয়া হয় তারা পশু, পাখী, মাছ, টিকটিকি, ফল, ঝিনুক, ডিম প্রভৃতি সংগ্রহ করে খেত। তারা মাটি খুঁড়ে মূল এবং অন্য খাদ্য সংগ্রহ করত। এটাও অনুমান করা হয় যে তারা পশুর চামড়া হতে পোশাক বানাত। তারা আগুন জ্বালতে শিখেছিল এবং পশুর মাংস আগুনে ঝলসিয়ে খেত।

এই যুগের নিদর্শন হিসাবে পিকিং-এর নিকটে অবস্থিত চু-কু-টিয়েন-এর এক গুহায় কিছু তথ্য পাওয়া গিয়েছে। সেখানে সে যুগের মানুষের কিছু কঙ্কাল, অধুনালুপ্ত জন্তুর কঙ্কাল, অগ্নিদগ্ধ হাড় এবং ভোঁতা পাথরের ফলক পাওয়া গিয়েছে। এদের কপালের হাড় আধুনিক মানুষ হতে অনেক পুরু ছিল এবং ভুরুর ওপরে উঁচু হয়ে উঠেছিল। এর থেকে মনে হয় সেকালের মানুষের দৈহিক ক্রমবিকাশ তখনও চলেছিল। তারা গুহায় বাস করত এবং প্রধানত শিকার বৃত্তি অবলম্বন করে জীবনধারণ করত। পোড়া হাড় থেকে অনুমান করা যায় তারা আগুনের ব্যবহার জানত। (*Paul Sanet,Man in Search of Ancestors.)

তারপর প্রায় দু’লক্ষ বৎসর পরে আমরা এক নূতন সংস্কৃতির সন্ধান পাই। এখন হতে পায় ৫০,০০০ বছর পূর্বে শেষ বরফের যুগের আবির্ভাবের পুর্বে ইউরোপে একশ্রেণীর মানুষের আবির্ভাব হল যাদের মুসটারিয়ান (Mousterions) বলত। অত্যন্ত ঠান্ডা পরিবেশের জন্য তারা সাধারণত গুহার বাস করত। তাদের দৈহিক গঠন বর্তমান মানুষের থেকে কিছু পৃথক ছিল। তাদেরও কপালের হাড় উঁচু ছিল। মাথাগুলো তারা ঠিক সোজা করে রাখতে পারত না এবং পা ঘসটে চলত। তাদের নিয়ান্ডার্টাল (Neandertal) মানুষ বলা হত। তারা এখন লোপ পেয়ে গিয়েছে। তারা বড় বড় জন্তু শিকার করত, যেমন ম্যামথ এবং পশম ঢাকা গন্ডার। ফাঁদ পেতে তারা এই সব বড় শিকার ধরত। সুতরাং অনুমান করে যায় তারা ভাষার ব্যবহার জানত; কারণ এই শিকার করতে অনেক মানুষের একযোগে কাজ করা প্রয়োজন। তারা মৃতকে কবর দিত। ফ্রাসে লা শাপেল ও স্যাঁ-এর (La Chapelle aux Saints) গুহার এ রকম কবরের মধ্যে মনুষ্য কঙ্কাল পাওয়া গিয়েছে।

কয়েক সহস্র বৎসর পরে ইউরোপের আবহাওয়ার কিছু উন্নতি হল। তখন দেখি নিয়ানডারটাল মানুষ অপসৃত হয়েছে। তার জায়গায় যে মানুষের আবির্ভাব হয়েছে আকৃতিতে সে বর্তমান মানুষের মতই দেখতে। এই ধরনের মানুষের এই সময় উত্তর আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ায়ও আবির্ভাব হয়েছিল।

এরা যে সংস্কৃতির বাহক তাকে পরিণত পুরাতন প্রস্তর যুগ (Upper Paleolithic age) বলা হয়। পরিবেশের সঙ্গে যুদ্ধ করবার হাতিয়ার হিসাবে তারা অনেক নতুন যন্ত্র বা অস্ত্র উদ্ভাবন করেছিল। শুধু পাথর নয়, হাতীর দাঁত এবং হাড় দিয়েও তারা যন্ত্র তৈরি করত। তারা ধনুক উদ্ভাবন করেছিল এবং বল্লম ছোঁড়বার জন্যও এক প্রকার যন্ত্র উদ্ভাবন করেছিল।

এই সংস্কৃতির সব থেকে উৎকৃষ্ট নিদর্শন পাওয়া যায় ফ্রান্সের মধ্যবর্তী অঞ্চলে। এই অঞ্চলের পরিবেশ খাদ্য সংগ্রহ করে জীবনধারণের বিশেষ উপযোগী ছিল। এখানে বিস্তৃত তৃণভূমি ছিল যেমন এখন সাইবেরিয়ায় আছে। সেখানে ম্যামথ, হাতী, বল্লা হরিণ, বাইসন, ঘোড়া এবং অন্য শ্রেণীর তৃণভোজী জীব চরত। দোর দঙে (Dordogne) ও ভেজের (Vezere) নদীতে প্রতি বৎসর অনেক স্যামন (Salmon) মাছ উঠত। উপত্যকার ধারে ধারে অনেক গুহা ছিল। এখানে প্রথমে অরিগনাসিয়ান (Aurignacian) ও পরে মাদলিনিয়ান (Magdalenians) জাতি এক আদর্শ সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিল। খাদ্য সংগ্রহের ওপর নির্ভরশীল এমন উচ্চমানের সংস্কৃতি আর দেখা যায় না।

এরা ধনুক এবং বল্লম ছোঁড়বার যন্ত্র ব্যবহার করতে জানত। সম্ববত মাদলিনিয়ারা এই সড়কি ছোঁড়বার যন্ত্র উদ্ভাবন করেছিল। তারা দলবদ্ধভাবে বড় বড় জন্তু শিকার করত এবং গুহায় বাস করত। মাদলিনিয়ানরা বঁড়শি ও হারপুন দিয়ে মাছ ধরত। তারা যে গুহার বাস করত সেখানে ভুমধ্যসাগর হতে আনীত কড়ি পাওয়া গিয়েছিল। তা প্রমাণ করে সম্ভবত বাহিরের মানবগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের আদান প্রদান চলত।

এই সংস্কৃতির দক্ষতা সব থেকে পরিস্ফুট হয়েছিল নানা শিল্পবস্তু সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। তারা হাতীর দাঁত বা পাথরের মূর্তি খোদাই করত, মাটি দিয়ে নানা জন্তুর মূর্তি গড়ত, অস্ত্রগুলি কারুকার্য খচিত করত এবং গুহার দেয়ালে বা ছাতে মূর্তি আঁকত বা খোদাই করত। এদের গুহার চিত্র এবং খোদাই কার্য বড় বিচিত্র এবং বেশ উচ্চমানের ছিল। প্রথম যুগের চিত্রগুলি রেখাচিত্র। আঙুলে কাদা মাখিয়ে তা দেয়ালে আঁকা হত, কিম্বা পাথরের ফলক দিয়ে আঁচড় কেটে আঁকা হত, কিম্বা কাঠ কয়লা দিয়ে আঁকা হত। এগুলি প্রথম যুগের চিত্র এবং সম্ভবত আরিগনাসিয়ানদের আঁকা।

মাদলিনিয়ানদের সময় অঙ্কন রীতি ও ভাস্কর্য আরও উন্নত হয়েছিল। তারা চিত্রগুলি রঞ্জিত করত এবং রঙের ঘনত্ব দিয়ে গভীরতা বা তৃতীয় আরতি ফোটাত। সেই প্রাচীন যুগের মানুষের পক্ষে এটি একটি মস্তবড় কৃতিত্ব। এই চিত্র ও ভাস্কর্যগুলি গুহার গভীর অঞ্চলে অঙ্কিত বা খোদাই করা হত। সেখানে দিনের আলো বড় একটা পৌছাত না। কাজেই অনুমান করা যায়, কৃত্রিম আলোর সাহায্যে শিল্পী কাজ করত। গুহাগুলির মধ্যে পাথরের প্রদীপ পাওয়া গেছে। কাজেই অনুমান করা যায় চর্বি দিয়ে প্রদীপ জ্বেলে এই শিল্প কর্মগুলি চিত্রিত বা খোদাই করা হত। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে এই সব জীবজন্তু চিত্রিত করার পেছনে একটি ব্যবহারিক উদ্দেশ্য ছিল। তা হল ছবি এঁকে যাদু শক্তির সাহায্যে পশুশিকারে সাফল্য অর্জন করা। তার সপক্ষে দুটি যুক্তি দেখানো হয়েছে। প্রথম, তা না হলে এত কষ্ট করে এই শিল্প কর্মগুলি সৃষ্টি করা হত কেন? দ্বিতীয়ত এইসব পশুদের দেহে অনেক সময় বিদ্ধ অবস্থায় তীর দেখানো হয়েছে। তা নাকি তাদের মূল উদ্দেশ্যের পরিচয় দেয়। সে যাই হোক আদি মানুষের সৃষ্ট এই চিত্রগুলি তাদের শিল্পশক্তির সুন্দর পরিচয় দেয়।

তারপর শেষ তুষার যুগের কয়েক শতাব্দী পরে মানুষের সংস্কৃতির জীবনে প্রথম বিপ্লব এল। এতদিন তার জীবিকার ভিত্তি ছিল খাদ্য সংগ্রহ। এখন তার জীবিকার ভিত্তি হল খাদ্য উৎপাদন। অর্থাৎ সে চাষ করে শস্য উৎপাদন করতে শিখল। প্রথম যুগে গম ও যবই সে খাদ্যশস্য হিসাবে উৎপাদন করতে শিখল। সঙ্গে সঙ্গে পশুপালনও করতে শিখল। এই পশুগুলি ছিল শৃঙ্গবিশিষ্ট এবং তৃণভোজী। তাদের ব্যবহারের সুবিধা এই যে তাদের মাঠে চরিয়ে খাওয়ান যায়। অপর পক্ষে শস্য ঝাড়াই-এর পর যে খড় অবশিষ্ট থাকে তাও তাদের খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করতে পারা যায়। পশুপালনের সুবিধা অনেক। প্রথম প্রয়োজন মত তাদের নির্বাচিত করে বধ করে তাদের মাংস খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করে যায়। দ্বিতীয়ত ভেড়া ও ছাগলের লোম হতে যে পশম পাওয়া যায়, তা হতে বস্ত্র বয়ন করা যায়। তাদের দোহন করা দুধও খাদ্য হিসাবে খাওয়া যায়। এইভাবে এক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে মানুষ খাদ্য সংগ্রহকারী জীব হতে খাদ্য উৎপাদনকারী জীবে পরিণত হল।

এই যুগের বিপ্লবের ফলশ্রুতি হিসাবে মানুষ আরও কতকগুলি নূতন বিদ্যা আয়ত্ত করেছিল। সেগুলিরও একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ এখানে দেওয়া যেতে পারে।

চাষের জন্য মাটি খোঁড়ার দরকার হয়। এই প্রসঙ্গে কোদালের উদ্ভাবন হল। সেকালের কোদালে ধাতু ব্যবহার করা হত না। একখন্ড পাথরের এক দিক ঘষে সরু করে ধার করা হত। তারপর তাকে কাঠের হাতলের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হত। কোথাও পাথরের মধ্যে গর্ত করে কাঠখন্ড অনুপ্রবিষ্ট করা হত। কোথাও কাঠের সঙ্গে পাথরখন্ড বেঁধে দেওয়া হত। সম্ভবত চামড়ার দড়ি দিয়ে বা জন্তুর অস্ত্র দিয়ে বেঁধে দেওয়া হত। কোনও কোনও কোদালে যে পাথর ব্যবহার হত তার দুই মুখই ঘষে পাতলা এবং সরু করা হত।

উৎপাদিত শস্যকে সংরক্ষিত করার জন্য পাত্রের প্রয়োজন। এই সূত্রেই এই নূতন প্রস্তর যুগে মানুষ মৃতপাত্র উদ্ভাবন করতে শিখেছিল। এটি নিশ্চিত একটি বড় পদক্ষেপ। প্রথমে মাটিকে নরম করে ভিজিয়ে তাকে ইচ্ছামত পাত্রে রুপান্তরিত করে তারপর শুকিয়ে নিতে হয়েছিল। তারপর তাকে অন্তত ৬০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড উত্তাপে পুড়িয়ে নিতে হয়েছিল। প্রথম দিকে আংটির আকারে মাটিকে রূপ দিয়ে একটির পর একটি আংটি জুড়ে পাত্রটি গড়ে তোলা হত। পরে চক্র উদ্ভাবন হবার পর কাজ অনেক সোজা হয়ে যায়।

প্রাচীন প্রস্তর যুগের মানুষ চামড়ার আচ্ছাদন ব্যবহার করত। নূতন প্রস্তর যুগে মানুষ বস্ত্র বয়ন করতে শিখল। সেকালের শনের আঁশ দিয়ে সূতো তৈরী হত এবং সেই সূতো দিয়ে বস্ত্র বয়ন করা হত। উত্তর মিশরে ফায়ুম হ্রদের ধারে যে নূতন প্রস্তর যুগের মানুষ বাস করত তারা শনের বস্ত্র উৎপাদন করত। উল দিয়েও বস্ত্র বয়ন করা হত। তুলা দিয়ে বস্ত্র বয়ন করা বোধ হয় পরে এসেছিল। খৃষ্টপূর্ব ৩০০০ বছরের অব্যবহিত পরেই সিন্ধু উপত্যকায় তুলার চাষ যে হত তার প্রমাণ পাওয়া যায় (Gordon Childe, Man Makes Himself P. 94)।

এর অর্থ হল সে যুগের মানুষ দুটি বিষয়ে কৌশল অর্জন করেছল। প্রথমত সূতো কাটতে এবং দ্বিতীয়ত বস্ত্র বয়ন করতে। সূতো কাটতে সম্ভবত টাকুর মত (Spindle) বস্ত্র ব্যবহার হত। বয়ন করতে নিশ্চয় তাঁতের ধরনের একটি যন্ত্র উদ্ভাবিত হয়েছিল। এটিও প্রগতির পথে একটি বড় পদক্ষেপ।

এই যুগের বৈশিষ্ট্য হল তখন নানা ধরনের কর্ম উদ্ভাবিত হলেও কোন বিশেষ শ্রেণীর ওপর কোন বিশেষ কর্তব্য ন্যস্ত হয়নি। প্রতি পরিবার এবং প্রতিগোষ্ঠী এ বিষয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। তারা নিজেরাই শস্য উৎপাদন করত, নিজেরাই পশু পালন করত, নিজেরাই মাটির পাত্র তৈরী করত এবং নিজেরাই বস্ত্র বয়ন করত। সম্ভবত মেয়েদের ও পুরুষদের মধ্যে কাজের একটা বিভাগ ছিল। সমস্ত স্তরের উচ্চ সংস্কৃতির সম্পর্ক বর্জিত আধুনিক মানুষের মধ্যে দেখা যায়, মেয়েরা চাষ করে, মৃৎপাত্র বানায়, সূতো কাটে এবং বস্ত্র বয়ন করে; অপর পক্ষে পুরুষেরা আশ্রিত পশুদের দেখাশোনা করে, জমিকে চাষের উপযুক্ত করে এবং যন্ত্রদি বানায়।

প্রাগৈতিহাসিক মানুষের জীবনে সর্বক্ষেত্রেই যে একই সময়ে এই বিপ্লব এসেছিল তা নয়। কোথাও আগে এসেছিল; কোথাও অনেক পরে এসেছিল। গর্ডন চাইল্ড-এর ধারণায় সর্বপ্রথম এই বিপ্লব এসেছিল খৃষ্টপূর্ব ৮০০০ হইতে ১০০০০ বছরের মধ্যে।

নূতন প্রস্তর যুগের শেষে মানুষ আরও কতকগুলি কৌশল আয়ত্ত করেছিল, যা একটি নূতন বিপ্লবের পথ প্রস্তুত করে দিয়েছিল। এই নূতন উদ্ভাবনগুলির আবির্ভাব সময় খৃষ্টপূর্ব ৬০০০ হইতে ৩০০০ অব্দের মধ্যে। তারা হল প্রাকৃতিক শক্তি বা পশুশক্তির ব্যবহার, লাঙল আবিস্কার, চাকাওয়ালা গাড়ী আবিস্কার, ধাতু সন্বন্ধে জ্ঞান এবং তাকে ভিত্তি করে তামা গলিয়ে, তা দিয়ে অস্ত্রাদি নির্মাণের কৌশল এবং ইট নির্মাণের কৌশল। এগুলি সম্ভব হয়েছিল যেখানে কৃষির পক্ষে প্রাকৃতিক অবস্থা স্থায়ীভাবে অনুকূল ছিল। প্রথমে চাষ হত কোদালের সাহায্যে মানুষের হাতের শক্তি দিয়ে। তার ক্ষমতা সীমিত। তাছাড়া ভূমির উর্বরতা ক্ষয় হয়ে গেলে নূতন জমিতে চাষ করতে হত। স্থায়ীভাবে বসতি করতে এবং বিস্তৃত ক্ষেত্রে শস্য উৎপাদন করতে এমন জায়গার প্রয়োজন যেখানে প্রকৃতির আনুকূল্যে ভূমির উর্বরতা আপনি সম্পাদিত হয়। সেটা সম্ভব বড় বড় নদী উপত্যকায় যেখানে বর্ষার জলে স্ফীত হয়ে নদী দুইকূল প্লাবিত করে ভূমিকে নূতন করে উর্বর করে দিতে পারবে। তাই দেখি, এই ধরনের নূতন উদ্ভাবনগুলি নীল উপত্যকায়, তাইগ্রীস ও ইউফ্রেটিস নদীর উপত্যকা, সুমেরু অঞ্চলে এবং ভারতে সিন্ধু উপত্যকাকে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। আদি উচ্চমানের মানব সংস্কৃতির এই কারণেই এই স্থানগুলি লালন ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

এই যুগে মানুষ নৌকাতে পাল তুলে বাতাসকে নিজের কাজে লাগিয়েছিল। এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ। কারণ এই পথেই অগ্রসর হয়ে বর্তমান যুগের মানুষ প্রাকৃতিক শক্তিকে ব্যবহার করে তার বিরাট প্রযুক্তি বিদ্যা গড়ে তুলেছে।

বলদ বা গাধাকেও মানুষ এই যুগে নিজের কাজে ব্যবহার করতে শিখেছিল। গাধা হয়েছিল ভার বহনের প্রধান অবলম্বন। সঙ্গে সঙ্গে লাঙল উদ্ভাবিত হওয়ায় ভূমি কর্ষণের শক্তি মানুষের অনেক পরিমাণে বেড়ে গিয়েছিল। কোদালের সীমিত শক্তিতে যে পরিমাণ ভূমি কর্ষণ করা যায় বলদ দিয়ে লাঙল চালিয়ে তার থেকে অনেক বেশী পরিমাণ ভুমি চাষ করা যায়। অতিরিক্তভাবে বন্যার জলে প্লাবিত অঞ্চলে উর্বরতা হ্রাস পাবার সম্ভাবনা না থাকায় একই ভূখন্ড বছরের পর বছর চাষ করা সম্ভব হয়েছিল। এটাও অনুমান করা যায় এখন হতে ভূমি কর্ষণের কাজ পুরুষের উপর ন্যস্ত হয়েছিল।

চাকা উদ্ভাবনও একটি বিস্ময়কর আবিস্কার। ঠিক বলতে কি বর্তমান যুগের সংস্কৃতি চাকার ওপর নির্ভর করে চলে। চাকা না থাকলে রেলগাড়ী চলত না, মোটর গাড়ী চলত না, এয়ারোপ্লেন চলত না। চলাচল এবং পরিবহণ একেবারে অসম্ভব হয়ে পড়ত। প্রথম যে চাকা নির্মিত হত তা নিশ্চিত কাঠ দিয়ে তৈরী হত। সুতরাং সেকালের চাকা বহুকাল আগে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তবে প্রাচীনকালে পাথরে বা মৃৎপাত্রের গায়ে খোদিত চাকাওয়ালা গাড়ীর চিত্র পাওয়া যায় এবং তা হতে অনুমান করা যায় কতকাল পূর্বে গাড়ীগুলির অস্তিত্ব ছিল। অর্থাৎ যার ওপর খোদিত হয়েছে তার বয়সকে ভিত্তি করেই এ বিষয় চক্রবিশিষ্ট যানের উদ্ভাবনের কাল অনুমান করা যায়। তা হতে দেখা যায়, সুমেরু (Sumeria) অঞ্চলে খৃষ্টপূর্ব ৩০০০ অব্দে চাকা-বিশিষ্ট যানের আবির্ভাব হয়। খৃষ্টপূর্ব ২৫০০ শতাব্দীতে গো-যান এবং রথ সিরিয়া এবং মেসোপটমিয়াতে ব্যবহৃত হত। খৃষ্টপূর্ব ২৫০০ শতাব্দীতে যে সিন্ধু-উপত্যকায় চাকা বিশিষ্ট যানের ব্যবহার ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

এই যুগে গাধা ও গরুর মত ঘোড়াও পোষ মানান হয়েছিল। সম্ভবত গোড়ায় ঘোড়া ব্যবহার হত তার দুধের জন্য বা যান টানার জন্য। রথ টানতে নিশ্চয় ঘোড়া ব্যবহার হত। সুমেরু অঞ্চলে খৃষ্টপূর্ব ২০০০ শতাব্দীতে ঘোড়া ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। সেখান হতে আরও পরে তা মিশরে আমদানী করা হয়। আরোহণের জন্য ঘোড়ার ব্যবহারের নিশ্চিত প্রমাণ খৃষ্টপূর্ব ১০০০ শতাব্দীর আগে পাওয়া যায় না।

অনুরূপভাবে জলে পরিবহণের ব্যবস্থারও উন্নতি হয়েছিল। প্রথমে ডোঙা ও চামড়ার নৌকার ব্যবহার প্রচলিত হয়। মিশরে প্যাপিরাসের ভেলা ব্যবহার করা হত। মিশরের প্রাগৈতিহাসিক মৃৎপাত্রের গায়ে তার চিত্র পাওয়া যায়। তারপর পালতোলা কাঠের তৈরী নৌকার আবির্ভাব হয়। খৃষ্টপূর্ব ৩০০০ শতাব্দীতে ভূমধ্য সাগরে এবং সম্ভবত আরব সাগরে পালতোলা জাহাজ যে চলাফেরা করত তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

কৃষির সমস্যার সমাধানের জন্য মানুষ প্রথম পঞ্জিকা আবিস্কার করে। সমস্যাটি ছিল বিশেষ করে মিশরের। সেখানে প্রতি বছর দক্ষিণে আবিসিনিয়া অঞ্চলের পাহাড়ে যে বর্ষা নামত তাই উত্তরে এসে মিশর অঞ্চলে নদীর দুপাশে প্লাবন সৃষ্টি করত। এই প্লাবনের পরে কৃষিকার্য আরম্ভ হত। কিন্তু কৃষিকার্য চালাতে আগে হতে প্রস্তুতি দরকার। সেইজন্য জানা দরকার ঠিক কখন প্লাবন আসবে। এই সমস্যার সমাধানের চেষ্টা হতেই মিশরবাসী পঞ্জিকা আবিস্কার করে বসল। পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেল যে, যখন নীল নদীতে বন্যা আসে তখন পূর্ব আকাশে সুর্যোদয়ের ঠিক পুর্বে যে তারা দেখা যায় তা হল লুব্ধক (Sirius) নক্ষত্র। কয়েক বছর হিসাব করে দেখা গেল এই লুব্ধক নক্ষত্র আকাশে শেষ তারা হয়ে দেখা দেয় ৩৬৫ দিন পরে। সুতরাং ৩৬৫ দিনে যে একবছর হয় এই তথ্য আবিস্কৃত হল। কেউ বলেন এই পঞ্জিকা উদ্ভাবিত হয়েছিল ৪২৩৬ খৃষ্টপূর্ব অব্দে; কেহ বলেন ২৭৭৬ খৃষ্টপূর্ব অব্দে।

এই সব নূতন আবিস্কার ও উদ্ভাবনের ফলে এমন একটি নূতন পরিবেশ সৃষ্টি হল যে আর একটি নূতন বিপ্লব এসে গেল। এতদিন প্রত্যেক গোষ্ঠী বা পরিবার আত্মকেন্দ্রিক এবং স্বয়ংনির্ভর ছিল। এখন আর তা সম্ভব হল না। এত ধরনের নূতন জীবিকা সৃষ্টি হয়েছে যে একই মানুষ সব শিক্ষা করে উঠতে পারত না। যে চাষ করত যে চাষ নিয়ে থাকল; যে পশুপালন করত সে পশু পালনে আত্মনিয়োগ করল। না না কারিগর শ্রেণী এল। কেউ নৌকা বানায়, কেউ রথ বানায়, কেউ বস্ত্র বয়ন করে, কেউ যন্ত্রপাতি তৈরী করে, কেউ মৃৎপাত্র নির্মাণ করে। এইভাবে শ্রমের প্রকারভেদে বিভিন্ন জীবিকা গড়ে উঠল। কাজেই সমাজের পুরাতন শ্রমের বিন্যাস আর বজায় রইল না। জীবিকা অনুসারে পেশা ভিন্ন ভিন্ন প্রকার হয়ে উঠল।

ফলে জনসংখ্যা বাড়ল। এক নূতন শাসক সমাজ এল। তারা সংখ্যায় অল্প হলেও তাদের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হল। তারা কৃষকদের নিকট কর আদায় করতে লাগল। শহর গড়ে উঠল। দেশে অনেক নগর স্থাপিত হল। মিশরে রাজ্যশাসন চালিত হল রাজার তত্ত্বাবধানে। সুমেরু দেশে রাজ্য শাসনের দায়িত্ব এল পুরোহিত সম্প্রদায়ের ওপর। তারা দেবতার অছি নিযুক্ত হয়ে রাজ্য শাসন করত, কর আদায় করত।

এখন আর শুধু সাধারণ গৃহস্থের জন্যে ছোট গৃহ নির্মাণ হয় না। রাজপুরুষদের জন্য প্রাসাদ নির্মিত হল। সুমেরু দেশে দেবতার জন্য বিরাট মন্দির গড়া হল। তা যে কৃত্রিম পাহাড়ের উপর স্থাপিত হল তার নাম হল জিগ্গারাট (Ziggurat)। মিশরে রাজাকে কবর দেবার জন্য বিরাট পিরামিড নির্মাণ হল। এইভাবে সমাজের রূপ একেবারে পরিবর্তিত হয়ে গেল। একেই দ্বিতীয় বিপ্লব বলা হয়।

এইভাবে খৃষ্টপূর্ব ৩০০০ শতাব্দীতে নগরভিত্তিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠায় মানব সংস্কৃতির রূপ একেবারে পরিবর্তিত হয়ে গেল। এই পরিবর্তন মিশর দেশ, সুমেরু এবং সিন্ধু উপত্যকায় মোটামুটি একই সময়ে সংঘটিত হয়েছিল। ছোট ছোট কৃষকের খামার আর তখন সমাজ বিন্যাসের উপাদান রইল না; সমাজ বিন্যাস বেশ জটিল আকার ধারণ করল। রাষ্ট্র এল সবার উপরে। তার তত্ত্বাবধানে রইল নানা শ্রেণী। তাদের কেউ প্রাথমিক উৎপাদক, কেউ নয়। সমাজে শ্রেণীভেদ এল। প্রথম শ্রেণীতে স্থান পেল রাজ পরিবারের মানুষ, পুরোহিত, মশীজীবী এবং রাজপুরুষ। তারপর স্থান পেল বিভিন্ন শ্রেণীর কারিগর, পেশাদার সৈন্য এবং শ্রমিক। সবার নিম্নস্তরে অর্থনৈতিক বিন্যাসের ভিত্তি হিসাবে রইল কৃষিজীবী। এই সব অঞ্চলের মাটি খুঁড়ে প্রত্নতাত্ত্বিক কৃষির যন্ত্র এবং গৃহে উৎপাদিত ব্যবহার্য দ্রব্য পেল না। পরিবর্তে পেল আসবাব-পত্র, অস্ত্র, উন্নত ধরনের মৃৎপাত্র, অলংকার এবং নানা বিলাস দ্রব্য। গৃহস্থের গৃহের ভগ্নাবশেষের পরিবর্তে প্রত্নতাত্ত্বিক পেল স্মৃতিমন্দির, দেবমন্দির, প্রাসাদ এবং কারখানার ভগ্নাবশেষ।

এই সংস্কৃতি ছিল নগর ভিত্তিক সংস্কৃতি। মিশর, সুমেরু ও সিন্ধু উপত্যকায় মোটামুটি একই ধরনের এই নগরভিত্তিক নূতন সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। এই দেশগুলির মধ্যে বাণিজ্যের আদানপ্রদান ছিল। অবশ্য বিভিন্ন দেশে উৎপাদিত পণ্যদ্রব্যের মধ্যে স্থানগত বিভিন্নতা ছিল। তবে তা মৌলিক নয়। মোটামুটি একই ধরনের পণ্য উৎপাদিত হত। অর্থাৎ তারা সকলেই একই প্রযুক্তি বিদ্যা আয়ত্ত করতে পেরেছিল।

তিনটি দেশেই সংস্কৃতির বেশ উচ্চমানে আরোহণ করেছিল। তবে বর্তমান প্রসঙ্গে মিশর ও সুমেরীয় সংস্কৃতির বিস্তারিত বিবরণ দেবার প্রয়োজন দেখা যায় না। সিন্ধু উপত্যকার সংস্কৃতির সহিত বরং আমাদের একটু পরিচিত হওয়া প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে।

দুর্ভাগ্যক্রমে মিশরীয় ও সুমেরীয় সংস্কৃতি সন্বন্ধে যেমন বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে, সিন্ধু উপত্যকার সংস্কৃতি সন্বন্ধে তেমন পাওয়া যায় নি। আমরা জানতে পারি খৃষ্টপূর্ব ২৫০০ শতাব্দীর এই নগরভিত্তিক সংস্কৃতি ভারতের উত্তর পশ্চিম অঞ্চলে এক বিস্তৃত ভূখন্ডে ছড়িয়ে পড়েছিল। পাঞ্জাব হতে সিন্ধু নদীর মোহনা পর্যন্ত এবং পশ্চিমে পাহাড়ের কোল পর্যন্ত এই নগরভিত্তিক সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু এই সমগ্র অঞ্চলে একই শাসকগোষ্ঠীর অধীন ছিল কিনা জানা যায় না। প্রধান অন্তরায় অন্য জায়গার যেমন লিখিত আকারে অনেক তথ্য সংগৃহীত ছিল, এখানে প্রত্নতাত্ত্বিক তেমন কিছু পাননি। প্রত্নতাত্ত্বিক আবিস্কারের মধ্যে লেখা পাওয়া গেছে; কিন্তু এখনও তার পাঠ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সম্ভব হলে কিছু আলোকপাত হত; কিন্তু তা হতে এখনও আমরা বঞ্চিত আছি। তা সত্ত্বেও হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোতে যে প্রত্নতাত্ত্বিক দ্রব্য পাওয়া গেছে তা হতে ধারণা করে যায়, এ অঞ্চলে এক উচ্চমানের নগরভিত্তিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল।

মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পা খুঁড়ে যে সব প্রত্নতাত্ত্বিক দ্রব্য আবিস্কৃত হয়েছে তা একটি উন্নত নগরভিত্তিক সংস্কৃতির পরিচয় দেয়। মহেঞ্জোদারো সিন্ধুনদের ডান দিকে সিন্ধু প্রদেশে স্থাপিত। হরপ্পা রাভি নদীর বাম দিজে পাঞ্জাবে অবস্থিত। হরপ্পা সংস্কৃতি এই দুটি নগরকে কেন্দ্র করে তাদের আশেপাশে গড়ে উঠেছিল। তাদের সংস্কৃতির মানের উচ্চতা সন্বন্ধে ধারণা করবার জন্য সেখানে আবিস্কৃত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ভিত্তিতে যে তথ্য পাওয়া গেছে তার একটি সংক্ষিপ্ত পরিচয় নীচে দেওয়া হল।

শহর দুটি চতুর্ভুজ আকারে নির্মিত। মাঝখানে একটি দুর্গের মত অট্টালিকা একটি উচ্চ বেদীর উপর স্থাপিত ছিল। তার উপরের অংশে কতকগুলি গৃহ ছিল। মনে হয় সেগুলি কোনও আনুষ্ঠানিক কাজের জন্য ব্যবহৃত হত। তার আশেপাশে ছিল রাস্তা। সেই রাস্তার দুধারে সারি সারি বাড়ী ছিল। তার বাইরে ছিল শ্রমিক শ্রেণীর ঘর। তারা নানা শিল্পে কাজ করত।

এই সংস্কৃতি সন্বন্ধে স্টুয়ার্ট পিগোট তাঁর গ্রন্থে এইরূপ লিখেছেনঃ(পৃঃ ১৫৩)
হরপ্পার সংস্কৃতির যে প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্য পাওয়া যায় তার থেকে যুক্তিসম্মতভাবে এই সিদ্ধান্ত করা যায় যে, এটি এমন একটি রাজ্য ছিল যা চুড়ান্ত ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাজ্য কর্তৃক শাসিত হত। তারা পুরোহিত শ্রেণী হতে নির্বাচিত হত। তারা দুটি কেন্দ্র হতে শাসনকার্য পরিচালনা করত এবং একটি বড় নাব্য নদী মুল সংযোগ সুত্রের কার্য সম্পাদন করত। এই দুটি নগর এবং খানিক পরিমাণে ছোট ঘরগুলির অধিবাসীদের ভরণপোষণের জন্য এবং তাদের খাদ্যশস্য সরবরাহের জন্য দ্বৃত্ত শস্য উৎপাদনের উপযুক্ত নিশ্চয় একটি সুবিন্যস্ত শস্য উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। প্রমাণ পাওয়া যায় গম এবং যব উৎপন্ন হত। মটরসুঁটি ও রাই উৎপাদনের প্রমাণ পাওয়া যায়। এরা যে তুলা উৎপাদন করত মহেঞ্জোদারোতে তার প্রমাণ পাওয়া গিয়াছে।

যে সব পশু পালিত হত তাদের মথ্যে কুঁজযুক্ত ষাঁড় অন্যতম। এ ছাড়া মহিষ, ছাগল, ভেড়া, শূয়র গৃহপালিত পশু হিসাবে পালিত হত। কুকুরও যে পালিত হত তার প্রমাণ পাওয়া যায়। হরপ্পায় যে অস্থি পাওয়া গেছে তা হতে প্রমাণ হয় দু শ্রেণীর কুকুর পালিত হত। একটি ছিল বর্তমানে যে দেশী শ্রেণীর কুকুর পাওয়া যায় তাই এবং অপরটি আকারে বড় ম্যাসটিফ (mastiff) শ্রেণীর ছিল। হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোতে উটের হাড়ও পাওয়া গেছে। সুতরাং অনুমান করে যায় উট পোষা হত। গাধা ও ঘোড়া পোষা হত। এমন কি হাতীও যে পোষা হত তারও প্রমাণ পাওয়া যায়।

মহেঞ্জোদারো নগরটির কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করার প্রয়োজন আছে। তার বিস্তার ছিল এক বর্গমাইল জুড়ে। প্রাগৈতিহাসিক যুগের পক্ষে সেটি একটি বড় শহর ছিল স্বীকার করতে হবে। এখানে ৪০ ফুট দীর্ঘ এবং ২৪ ফুট প্রস্থ এবং ৮ ফুট গভীর ইট দিয়ে বাঁধানো একটি জলাধার পাওয়া গেছে। সম্ভবত এটি স্নানের জন্য ব্যবহৃত হত। আর একটি খুব বড় অট্টালিকা পাওয়া গেছে। তা দৈর্ঘ্যে ২৩০ ফুট এবং প্রস্থে ৭৮ ফুট; মাঝে একটি প্রাঙ্গণ। প্রত্নতাত্ত্বিকরা অনুমান করেন এটি সম্ভবত একটি শিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ছিল।

পরিবহণের জন্য বলদের গাড়ী ব্যবহার হত। তার মাটিতে তৈরী নিদর্শন হরপ্পা সংস্কৃতির বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে সর্বত্রই পাওয়া যায়। নদীতে নৌকা পরিবহন হত। তবে তার নিদর্শন মাত্র দুটি পাওয়া গেছে – একটি মৃতপাত্রের ভগ্ন অংশে এবং অন্যটি একটি শীলমোহরে। এক্কা গাড়ীর মত এক রকম গাড়ীও তখন ব্যবহার হত। সম্ভবত তা বলদে টানত। এর দুটি নিদর্শন পাওয়া গেছে। একটি হরপ্পায়, অন্যটি চানহুদারোতে। দুর্ভাগ্যক্রমে যে জন্তু জোতা ছিল তা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। মহেঞ্জোদারোতে এই উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত দুটি ব্রোঞ্জ-এর বলদ পাওয়া গিয়েছে। তা হতে অনুমান করা যায় এই ধরনের এক্কাগাড়ী বলদে টানত।

হরপ্পা সংস্কৃতিতে লেখার রীতি উদ্ভাবিত হয়েছিল। সাধারণত এই লেখার নিদর্শন শীলমোহরে পাওয়া যায়। কিছু কিছু লেখা মৃৎপাত্রও পাওয়া যায়। অন্য কোন প্রাগৈতিহাসিক বর্ণমালার সঙ্গে এর সাদৃশ্য পাওয়া যায় না। হিসাব করে দেখা গেছে মোট ৪০০টি অক্ষর ব্যবহার হত। একই অক্ষরের পরিবর্তিত রূপ বাদ দিলে মোট অক্ষরের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৫০। দুর্ভাগ্যক্রমে এই লেখাগুলির পাঠ উদ্ধার এখনও সম্ভব হয়নি। তা হলে এই সংস্কৃতি সন্বন্ধে নূতন আলোকপাতের সম্ভাবনা আছে।

পণ্যদ্রব্য ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য বাটখারার প্রচলন ছিল। বাটখারার ওজনগুলি নিঁখুতভাবে সমান রাখা হত। বড় মাপের বাটখারা পণ্যদ্রব্য ওজনের জন্য রাখা হত। ছোট মাপের বাটখারা অলংকার এবং পুঁথি ওজনের জন্য ব্যবহৃত হত। মহেঞ্জোদারোতে পুঁথির দোকানে অনেক ছোট ওজনের বাটখারা পাওয়া গেছে।

দৈর্ঘ্য পরিমাপের জন্যও মাপকাঠি ব্যবহার হত। দুটি স্বতন্ত্র ধরনের মাপকাঠি পাওয়া গিয়াছে। মহেঞ্জোদারোতে একটি মাপকাঠি পাওয়া গিয়াছে। তার দৈর্ঘ্য ১৩.২ ইঞ্চি। হরপ্পায় একটি ব্রোঞ্জের নির্মিত মাপকাঠি পাওয়া গেছে। তার দৈর্ঘ্য ২০।।৬২ ইঞ্চি। মনে হয় দুইর ধরনের মাপকাঠিই একসঙ্গে ব্যবহৃত হত।

হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোতে অনেক অলংকারও আবিস্কৃত হয়েছে। সোনার গহনা পুঁথি এবং নানা মূল্যবান পাথরের অলংকারও ব্যবহার হত। সবুজ বর্ণের পাথর (Jade) এবং নীলকান্তমণির (Lapis lasuli) অলংকার ব্যবহৃত হত। সোনার ফলক (plaque), সোনার আর্মলেট (Armlet), সোনার শঙ্কু (Conical ornament) কানের মাকড়ি, গলার হার, কোমরের মেখলা – এইসব শ্রেণীর নানা অলংকার আবিস্কৃত হয়েছে।

এই সংস্কৃতিতে তামার বা তামা ও টিন মিশ্রিত ধাতু দিয়ে গড়া ধাতুর অস্ত্র প্রভৃতি ব্যবহৃত হত। অস্ত্রগুলি নির্মিত হত দুই রীতিতে – ঢালাই করে (casting) এবং পিটিয়ে (forging)। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসাবে কুঠার ও বর্শার ফলক, বঁড়শি, আয়না ইত্যাদি পাওয়া গেছে।

যে মানুষেরা প্রাচীনকালে এই উচ্চমানের সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিল তারা কোন গোষ্ঠীর মানুষ ছিল সে বিষয় কিছু তথ্য পাওয়া যায়। পিগোট বলেন যে সমস্ত কঙ্কাল পাওয়া গেছে তাদের খুলির হাড় দেখে অনুমান করা যায় যে তারা প্রধানত আদি অস্ট্রেলিয় (Proto-Austroloid) শ্রেণীর ছিল। এদের ললাট অনুন্নত এবং নাসিকা অনতিপ্রশস্ত। ডঃ বিরজাশঙ্কর গুহ এদের প্রথমে অস্ট্রেলিয় বলে স্বীকার করে পরে ককেশীয় জাতি বলে মত প্রকাশ করেছেন। আর একশ্রেণীর করোটি পাওয়া যায় যা বর্তমান ভারতের আদিম অধিবাসীদের অনুরূপ মানুষের পরিচয় দেয়। আর একশ্রেণীর কঙ্কাল পাওয়া যায় যা ইঙ্গিত করে এদের মস্তক লম্বা ছিল, নাসিকা অপ্রশস্ত। ফ্রিডরিকস (Friedericks) ও মূলার (Muller) -এর ধারণায় তারা আদি আর্মিনিয় (Armenoid)। মনে হয় বেশীর ভাগ অধিবাসী আদি-অস্ট্রেলিয় শ্রেণীর ছিল।

সিন্ধু উপত্যকার এই মানুষগুলি প্রায় হাজার শতাব্দী ধরে তাদের উচ্চসংস্কৃতি অক্ষুণ্ন রেখে বাস করেছিল। তারপর প্রমাণ পাওয়া যায় আনুমানিক খৃষ্টপূর্ব পঞ্চদশ শতাব্দীতে পশ্চিম হতে এক নূতন জাতি আসে তাঁদের পর্যুদস্ত করেছিল। অনুমান করা হয় এরাই হল বৈদিক সংস্কৃতির বাহক আর্যজাতি। এখন প্রশ্ন হল এই আর্যজাতি কোথা হতে এল। মনে হয় তুলনামুলক ভাষাতত্ত্বের সাহায্যে তার একটা সমাধান করা যায়।

১৭৬৭ খৃষ্টাব্দে কুর্দু (Courdoux) লক্ষ্য করেন যে সংস্কৃত ভাষার সঙ্গে গ্রীক ও লাতিন ভাষার বেশ সাদৃশ্য দেখা যায়। স্যর উইলিয়ম জোনস একজন বিখ্যাত সংস্কৃতের পন্ডিত ছিলেন। তিনি প্রথম ‘অভিজ্ঞান শকুন্তলম্’ গ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদ করেন। এই সাদৃশ্যও তাঁরও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই সাদৃশ্য হতে তাঁরা অনুমান করেন যে এই ভাষাগুলি একটি প্রাচীনতর ভাষা হতে উৎপন্ন হয়েছে। ১৮৩১ খৃষ্টাব্দে বপ (Bopp) এ বিষয় গবেষণা করে একটি স্থির সিদ্ধান্তে আসেন যে এই অনুমানের সপক্ষে প্রবল যুক্তি আছে। তিনি এই ভাষাগুলিকে ভারত-ইয়োরোপীয় (Indo-European) গোষ্ঠীর ভাষা বলে নামকরণ করেন।

এই ভাষাগুলিতে মৌলিক শব্দগুলির (যেমন পারিবারিক সন্বন্ধসূচক এবং সংখ্যাসূচক শব্দ) মধ্যে পরস্পর আশ্চর্য রকম সাদৃশ্য লক্ষিত হয়। যেমন সংস্কৃত পিতৃ শব্দ লাতিন পাটের (Pater) হয়ে গেছে, ইংরাজি (Father), জার্মান ভাষার ফাটের (Vater) এবং ফরাসীতে প্যার (Pere)। সংস্কৃত শতম্ লাতিন ভাষায় সেন্টাম (Centum)। সংস্কৃত ত্রি ইংরেজীতে থ্রি (Three) জার্মান ভাষায় ড্রাই (drei), ফরাসীতে ত্রোয়া (Trois) ইত্যাদি। এইসব সাদৃশ্য হতে এই রকম অনুমান করা হয় যে এইসব ভাষাভাষীদের এক সাধারণ পূর্বপুরুষ ছিল এবং তারা একই ভাষায় কথা বলত। পরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপে তারা যখন বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ল তাদের ভাষা পরিবর্তিত হয়ে পরস্পর হতে বিভিন্ন হয়ে গেল। অনুমান করা হয় যে, এই পূর্বপুরুষের গোষ্ঠী কৃষিজীবী ছিল, তারা ঘোড়াকে পোষ মানিয়েছিল এবং তামা এবং ব্রোঞ্জের ব্যবহার জানত এবং মানুষের আদর্শে কল্পিত (anthropomorphic) দেবতাদের পুজা করত। উদাহরণস্বরূপ বৈদিক যুগে বর্ণিত অশ্বমেধ যজ্ঞের মত অনুষ্ঠান আলতাই টার্কদের মধ্যে এখনও প্রচলিত আছে এবং আয়ার্ল্যান্ডে খৃষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত প্রচলিত ছিল।

এখন প্রশ্ন হল এই আদিম জাতির বাসভূমি কোথায় ছিল। এই নিয়ে প্রচুর মতদ্বৈধ আছে। জার্মান পন্ডিত কোসিনা (Kosinna) প্রতিপাদিত করতে চেষ্টা করেছিলেন যে, তাদের আদি বাসভুমি ছিল উত্তর ইওরোপীয় উপত্যকায়। ভারতীয় গবেষক বাল গঙ্গাধর তিলক প্রমাণ করতে চেষ্টা করেছেন যে প্রাচীন আর্য জাতির বাস ছিল ৬০০০ খৃষ্টপূর্ব শতাব্দীতে উত্তর মেরু অঞ্চলে।

তুলনামূলক ভাষাতত্ত্ব ও প্রত্নতত্ত্ব হতে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে একটি তৃতীয় মত গড়ে উঠেছে। অধ্যাপক জে. এল. মায়ার্স (J.L. Myers), হ্যারল্ড পীক (Harold Peake) এবং চাইল্ড (Childe) এই মতটির সমর্থক। তাঁদের ধারণায় খৃষ্টপূর্ব তৃতীয় ও দ্বিতীয় সহস্রাব্দীতে এদের নিবাস ছিল দক্ষিণ রুশিয়াতে এবং তার পূর্বাঞ্চল কাম্পিয়ান সাগরের তীরে। এরা খানিকটা যাযাবর ছিল তবে কৃষিকার্য করত এবং স্থায়ী বসতিও স্থাপন করত। তারা মেষ, গরু ও অশ্ব পালন করতে শিখেছিল। তারা মৃতদের সমাধিস্থ করত।

পিগোটের ধারণায় খৃষ্টপূর্ব ২০০০ শতাব্দীর পরবর্তী শতাব্দীগুলিতে উত্তর পশ্চিম থেকে ভারত একাধিক জাতি কর্তৃক আক্রান্ত হয়েছিল। ভারত-ইয়োরোপীয় ভাষাভাষী মানুষও তাদের অন্যতম ছিল। এই সময় পারস্যের সীমানায় কাসাইট (Kasite) এবং মিটানিয়ানদের (Mittanian) স্থাপিত রাজ্য গড়ে ওঠে। তারা ভারত-ইয়োরোপীয় ভাষাভাষী গোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত ছিল।

হুইলার-এর ধারণা এই সময়ই ঋগবেদ বর্ণিত প্রাচীন আর্যজাতি উত্তর পশ্চিম ভারতে প্রবেশ করে এবং হরপ্পা সংস্কৃতির ধারক যে মনুষ্য গোষ্ঠী ছিল তাদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এই সংঘর্ষে যারা অধিনায়কের ভূমিকা গ্রহণ করে তাদের আদর্শেই ঋগবেদের দেবতা ইন্দ্রের চরিত্রটি কল্পিত হয়েছে। তিনি বলেন ঋগবেদের ‘পুরন্দর’ কথাটি ইন্দ্রের উপাধি হিসাবে ব্যবহৃত। ইন্দ্র সিন্ধুনদের অববাহিকায় যে সভ্য প্রাচীন জাতিদের শহর ছিল সেইগুলি ধ্বংস করেন বলেই তাঁর নাম পুরন্দর। সিন্ধু অববাহিকাবাসীরা প্রস্তরের এবং মৃত্তিকার দুর্গ নির্মাণ করত। তাদের ধংসাবশেষ প্রত্নতত্ত্ববিদ এই অঞ্চলে সম্প্রতি অনেক আবিস্কার করছেন। ঋগবেদে ইন্দ্র এই ধরনের দুর্গ যে ধ্বংস করেছিলেন বলে বর্ণনা আছে তা এই সকল দুর্গকেই সূচিত করে। (Wheeler Indian Civilization p. 90f)

পিগোট হুইলার-এর এই প্রতিপাদ্য গ্রহণ করেছেন। (Stuart Piggot. Prehistoeric India, chap VII)। তিনি বলেন এটা সুবিদিত যে, খৃষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দীর গোড়ার দিকে ভারতে হরাপ্পা সংস্কৃতি পূর্ণ মহিমায় অধিষ্ঠিত ছিল। তাদের সংস্কৃতি নগরকেন্দ্রিক এবং সেই নগরগুলি দুর্গ দিয়ে সুরক্ষিত ছিল। আর্যজাতি ভারতে প্রবেশ করলে তাদের সহিত যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং তাদের দুর্গগুলি ধ্বংস করে দেয়। এই ঐতিহাসিক ঘটনারই ছায়াপাত হয়েছে ঋগবেদের ইন্দ্রের বীরত্ব সূচক কীর্তির বর্ণনায়। বৈদিক সাহিত্যে যে জাতির সঙ্গে তারা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল তাদের দস্যু বা দাস বলে বর্ণনা করা হয়েছে। তাদের আকৃতি সম্পর্কে বলা হয়েছে তারা কৃষ্ণকায় এবং ‘অনাস’ অর্থাৎ তাদের নাক চ্যাপ্টা ছিল। আমরা পুর্বেই বলেছি এই প্রাচীনতর জাতির মানুষের অধিকাংশ ছিল অস্ট্রেলিয় গোষ্ঠীভুক্ত। তারা কৃষ্ণকায় ছিল এবং তাদের নাক চ্যাপ্টা ছিল।

এই প্রসঙ্গে ইন্দ্রের বীর্যসুচক ভুমিকার ঋগবেদে যে উল্লেখ আছে সে বিষয় তিনি প্রসঙ্গত আলোচনা করেছেন। যেমন ঋগবেদ প্রথম মন্ডলের ৫৩ সূক্তে আছেঃ “হে ইন্দ্র তুমি শত্রুধর্ষণকারীরূপে যুদ্ধ হতে যুদ্ধান্তরে গমন কর, বল দ্বারা নগরের পর নগর ‘ধ্বংস কর।” (রমেশচন্দ্র দত্তের অনুবাদ) দ্বিতীয় মন্ডলের ১৫ সূক্তে আছেঃ “ইন্দ্র বলকে বিদীর্ণ করেছিল, পর্বতের দৃঢ় দ্বার উদঘাটিত করেছিল; তাদের কৃত্রিম রোধ সকল উদ্ঘাটিত করেছিল।” ইন্দ্রকে যে পুরন্দর বলা হয় সে কথারও তিনি উল্লেখ করেছেন।

এই সকল তথ্য হতে অনুমান করা যায় যে খৃষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দীর গোড়ার থেকে উত্তর-পশ্চিম হতে আর্য জাতিরা ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে প্রবেশ করে এবং সেখানে অধিষ্ঠিত যে প্রাচীনতর নগর ভিত্তিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল তার সহিত সংঘর্ষে আসে। ঋগবেদের সূক্তগুলিতে এই সংঘর্ষের ছায়াপাত হয়েছে।

এই ভিত্তিতে ঋগবেদের রচনাকালের সমস্যার একটি মীমাংসা করে নেওয়া যায়। ঋগবেদ রচিত হয় আর্য জাতি সিন্ধু উপত্যকাবাসীদের পরাস্ত করবার পর এখানে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করবারও পরে। ভারতে প্রবেশ এবং বসতি করে ঋগবেদ রচনা শুরু করতে কয়েক শতাব্দী কাল সময় লাগবে অনায়াসে অনুমান করা যায়। এই তথ্যের ভিত্তিতে ঋগবেদের রচনাকালকে খৃষ্টপূর্ব পঞ্চদশ শতাব্দীতে ফেলা যায়।

এই প্রতিপাদ্যের সমর্থনে কিছু প্রমাণও পাওয়া যায়। একটি মিটানিয়ান নথী পাওয়া গেছে যার আনুমানিক কাল খৃষ্টপূর্ব ১৩৮০ অব্দ ধার্য করা হয়েছে। তাতে কতকগুলি ঋগবেদের দেবতার নাম উল্লিখিত হয়েছে। তা হতে পিগোট অনুমান করেন ঋগবেদের রচনাকাল খৃষ্টপূর্ব ১৪০০-১৫০০ শতাব্দীর মধ্যে। মনে হয় এই সিদ্ধান্ত যুক্তিসম্মত।

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s