বেদ ও প্রাচীন ভারতের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য (নিয়মিত পর্ব-১৬)


ওঁ তৎ সৎ
%e0%a6%ac%e0%a7%87%e0%a6%a6-%e0%a6%93-%e0%a6%ad%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%a4%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%86%e0%a6%a7%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a6%95-%e0%a6%90
বেদকে ত্রয়ী কেন বলা হয় আমরা দেখলাম। যেহেতু বেদকে ত্রয়ী বলা হয় সেইজন্য পাশ্চাত্য দর্শনের পণ্ডিতরা বলেন প্রথমে তিনটি বেদ ছিল- ঋক, সাম ও যজু। যেহেতু অথর্ব্বেদ পরে রচনা করা হয়েছে তাই বেদকে চতুর্বেদ বলা যায় না। প্রাচ্যের পণ্ডিতরা এই মতকে অস্বীকার করেন। তাদের মতে ছন্দের তিনটি রূপ আছে, এই তিনটি ছন্দ তিনটে বেদে প্রতিফলিত হয়েছে, অথর্ববেদের বিশেষ কোন ছন্দ নেই। ঋকবেদের ছন্দকে বলা হয় ঋক্‌, স্মাওবেদের ছন্দকে বলা হয় সামগান আর যজুর্বেদে যে ছন্দ আছে তাকে বলা হয় যজুস্‌ ছন্দ। অথর্ববেদ হচ্ছে ঋক আর যজুস্‌ ছন্দের সংমিশ্রণ। অথর্ববেদে ছন্দের দিক থেকে আলাদা কোন বৈশিষ্ট্য নেই বলে বেদকে ত্রয়ী বলা হচ্ছে। আমরা কিন্তু আমাদের পরম্পরা যে দৃষ্টিভঙ্গী সেটাকেই মানব।
বেদ- বেদ কথার অর্থ আমরা আগেই বলেছি। বেদ হচ্ছে যেটা দিয়ে জানা যায়। একটা মানুষের মনুষ্য জীবনে যা কিছু জানার আছে এই বেদ থেকেই সে সব জানতে পারে।
এই হচ্ছে বেদের চারটি নাম। একই জিনিষের বিভিন্ন নাম, আর প্রত্যেকটি নামের মধ্যে বেদের তাৎপর্য নিহিত রয়েছে, কোন ধরণের কল্পিত বা খেয়াল হল একটা কিছু নাম দিয়ে দেওয়া হয়েছে তা নয়। প্রত্যেকটি নামের একটা বিশেষ তাৎপর্য আছে- এই এই অর্থের জন্য বেদকে এই নামেও অভিহিত করা যায়।
শঙ্করাচার্য বেদের সংজ্ঞা দিচ্ছেন- পরমাত্মানাং লভন্তে ইতি। শঙ্করাচার্যের মতে যার দ্বারা পরমাত্মাকে লাভ করা যায় তাকেই বেদ বলা হয়। মীমাংসকরা বেদের সংজ্ঞা দিচ্ছে-শ্রুয়তে ধর্ম অনয়া ইতে। বেদের এই দুটো সংজ্ঞাতেই বিরাট পার্থক্য এসে গেল। বেদের অর্থ দু দিকে চলে গিয়ে ভারতে দুটো দর্শনের জন্ম নিয়ে নিল। ধর্ম সাধন হচ্ছে যা আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করছে, আধ্যাত্মিক জীবন যাপন করতে সাহায্য করছে আর আমাদের বাস্তবিক স্বরূপকে জানার একমাত্র লক্ষ্য করে যে সাধন করা হবে তাকে বলা হচ্ছে মোক্ষ সাধন। মীমাংসকরা বেদের সংজ্ঞা দিচ্ছে বেদের দ্বারা ধর্ম সাধন হয় আর শঙ্করাচার্য বেদের সংজ্ঞা দিচ্ছেন বেদের দ্বারা মোক্ষ সাধন হয়। বেদ অধ্যয়ন করতে গিয়ে যে নানান ধরণের সংসয় আসবে তার মূলে হচ্ছে বেদের এই দুটো বিপরীত সংজ্ঞা। যদিও আমাদের ষড়্‌দর্শন পুরোপুরি বেদের উপর আশ্রিত কিন্তু দুটি প্রধান দর্শন বেদের উপরে বেশি জোর দেয়, এর একটা হচ্ছে পূর্বমীমাংসা আর দ্বিতীয় হচ্ছে উত্তরমীমাংসা-একদল বলছে বেদ হচ্ছে ধর্মসাধন আরেক পক্ষ বলছে বেদ হচ্ছে পরমাত্মাকে জানার সাধন, পরমাত্মাকে জানার সাধনই হচ্ছে মোক্ষ সাধন।
ধর্মসাধনের সাথে মোক্ষের কোন সম্পর্কই নেই। কিন্তু ধর্মসাধনে মানুষ অনেক ভদ্র, নম্র, পবিত্র, মার্জিত হয়ে একজন ভালো মানুষে রূপান্তরিত হয়। সকালে উঠে গঙ্গা স্নান করা, জপ করা, উপোস করা এগুলো হচ্ছে ধর্মসাধন, এর সাথে পরমাত্মার সাধনের কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু এগুলো করার ফলে মানুষের মধ্যে একটা ভালো সংস্কার তৈরী হয়ে একজন মানুষকে ভালো মানুষ হতে সহায়তা করে। এখন জপও করছে আবার ঝগড়া মারামারিও করছে, তা এটা ভালো না খারাপ? জপ না করার থেকে এটা অনেক ভালো। মিথ্যা কথাও বলে আবার মন্দিরেও যায়। তার স্বভাবে আছে সেতো মিথ্যে কথা বলবেই কিন্তু তাই বলে কি সে মন্দিরে যাওয়া ছেড়ে দিবে। এখানে সে ধর্মসাধন করছে, এই ধর্মসাধন করতে করতে ধীরে ধীরে তার মিথ্যে কথা বলাটা বন্ধ হয়ে যাবে।
একটি উদাহরণ দেয়া যাক ভারতের তেলোভেলোর মাঠে ডাকাতের ঘটনা দিয়ে-
কালীকে পূজা দিয়ে ডাকাতরা ডাকাতি করত, ডাকাতি করে আবার এসে মা কালীকে পূজা করত। এখন আরেকজন ডাকাতি করছে সে এসব কিছুই করছে না, এ কিন্তু কোন দিনই ডাকাতি ছাড়তে পারবে না, যদিও বা ছাড়ে সে ভালো মানুষ হতে পারবে না, অন্য কোন খারাপ কিছু করতে থাকবে। কিন্তু যে কালীকে পূজা করে ডাকাতি করছে, যেদিন সে ডাকাতি করা ছেড়ে দেবে সেদিন থেকে সে এক অন্য মানুষ হয়ে যাবে। আজকে তেলোভেলো গ্রামে বিরাট মন্দির হয়েছে, যারা ডাকাতি করত তারাই আজ ভক্ত হয়ে গেছে। অন্যান্য ধর্ম থেকে হিন্দু ধর্মের এইটাই হচ্ছে বিশেষত্ব- তুমি যাই কর, চুরি কর আর ডাকাতি কর, তোমার মনটাকে ভগবানের দিকে দাও, তাতেই আস্তে আস্তে তোমার কর্মগুলি পাল্টাতে থাকবে।
ক্রমশঃ

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s