ভগবানের কাছে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি


ভগবানের কাছে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি
আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য
কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ
(কথোপকথনটি হয়েছিল ১৯৭৪-এর ২৯শে জুন, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে)

সাংবাদিক:  শ্রীল প্রভুপাদ, আপনার গ্রন্থে আপনি ব্রহ্মলোকের কথা উল্লেখ করেছেন, সেটাকে আমি মনে করি স্বর্গলোক যেখানে আমরা অবশেষে ভগবানকে দেখতে পাব।

শ্রীল প্রভুপাদ:  না সর্বপ্রথমে, স্বর্গলোক হচ্ছে শুধুমাত্র উচ্চতর ভৌতিক গ্রহলোক, যেখান থেকে আপনি সরাসরি ভগবানকে দেখতে পারেন না।  অনেক ভৌতিক লোক বা গ্রহলোক আছে, এবং স্বর্গ হচ্ছে তাদের মধ্যে একটি।  তা ছাড়া  ব্রহ্মলোকও তাদের মধ্যে একটি।  আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না?   অসংখ্য গ্রহ সহ বহু ভৌতিক লোক গ্রহমণ্ডল আছে।  গ্রহমণ্ডলের মধ্যে ব্রহ্মলোক, চন্দ্রলোক, বরুণলোক, সূর্যলোক এ ছাড়া আরও অনেক গ্রহলোক  অন্তর্ভুক্ত আছে।

সাংবাদিক:  সুতরাং যখন আমরা স্বর্গের কথা বলি, তখন কি আমরা এই ভৌতিক স্থানের কথাই বলি?  সেটা কী ভৌতিক গ্রহলোকই হবে?

শ্রীল প্রভুপাদ:  যেমন মনে করুন এই ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে অবস্থিত যে গ্রহলোকগুলিকে আপনি দিবারাত্র দেখছেন।  সেগুলি ভৌতিক কী নয়?  ধরুন সূর্যটি।  সূর্য কী একটি ভৌতিক গ্রহলোক নয়?

সাংবাদিক:  হ্যাঁ।

শ্রীল প্রভুপাদ:  ‘ভৌতিক’ বলতে আপনি কী মনে করেন?

সাংবাদিক:  বেশ, প্রকৃতপক্ষে অবস্থিত জড়…..

শ্রীল প্রভুপাদ:  রাতের বেলায় বহু গ্রহ- অসংখ্য গ্রহলোক অবস্থিত তা কী আপনি দেখতে পান না?  সেগুলি কী ভৌতিক, অথবা নয়?

সাংবাদিক:  তারকামণ্ডল এবং গ্রহসকল সেগুলি হচ্ছে ভৌতিক, হ্যাঁ।

শ্রীল প্রভুপাদ:  হ্যাঁ। এই উদাহরণটি বিচার করুন।  যখন আপনি বলেন ‘আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র’ তখন আপনি চিন্তা করছেন যথার্থ একটি স্থান।  সেখানে আছে জীবসত্তা- মানুষ, পাহাড়-পর্বত এবং নদ নদী।  সব কিছুই সেখানে আছে।

অনুরূপভাবে, এই ব্রহ্মাণ্ডের এই গ্রহলোকগুলি- সেগুলি জীব-সমূহের দ্বারা অধ্যুষিত।  সেখানে একই রকমের নগর ও শহর, পাহাড়-পর্বত ও নদ-নদী এবং সমুদ্র আছে।  সেখানকার সব কিছু যদিও প্রতিটি গ্রহলোক অনুপম বৈশিষ্ট্যগত।

সুতরাং স্বর্গলোকে, সব কিছু উৎকৃষ্ট গুণসম্পন্ন, উৎকৃষ্ট বৈশিষ্ট্যগত।  তার ফলে, আপনার বর্তমান দেহে সেখানে যেতে সক্ষম হবেন না, এবং সেখানে বসবাস করতে পারবেন না।

এমনকি এই একটি গ্রহলোকে জায়গায় জায়গায় বিভিন্ন ধরনের জলবায়ু।  উত্তরমেরু অঞ্চলে কিছু জীব বসবাস করতে পারে, কিন্তু আমাদের পক্ষে সেখানে বসবাস করা কষ্টকর।  একটি স্থান এক ধরনের লোকের উপযোগী; অন্য একটি স্থান উপযোগী অন্য ধরনের লোকেদের।

সুতরাং, প্রতিটি গ্রহলোকে, গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে এবং স্থান থেকে স্থানান্তরে, আপনি জীবসত্তা দেখতে পাবেন।  এবং এই জীবসমূহ বিভিন্ন রকমের জড়-দেহ লাভ করেছে বিভিন্ন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে।

উদারহরণস্বরূপ, আপনি সমুদ্রের মধ্যে বসবাস করতে পারেন না, কিন্তু কেবলমাত্র সেই কারণে আপনি বলতে পারেন না যে, কেউই জলের মধ্যে বসবাস করতে পারে না।  কিন্তু বহু রকমের মাছ আছে যারা খুব সুখে-স্বাচ্ছন্দে বসবাস করছে।

সুতরাং, আপনারা বর্তমান অভিজ্ঞতা অন্যান্য জীবসমূহের মধ্যে আরোপ করতে চেষ্টা করবেন না।  সেটা তা হলে খুব একটা ভাল যুক্তিবিচার হবে না।   এখন, এখানে এই গ্রহলোকে তথাকথিত বহু বিজ্ঞানীরা- তারা বলছে যে অন্যান্য গ্রহলোকে জীবসত্তা নেই!  কেন? এই তথাকথিত বিজ্ঞানীরা বহু রকমের কারণ উপস্থাপনা করছে- ‘এই উপাদানটির অভাব।’  ‘ঐ উপাদানটির অভাব।’ কিন্তু মিঃ বৈজ্ঞানিক, আপনি অন্য জায়গার অবস্থা কিভাবে জানতে পারেন যা আপনার বর্তমান অভিজ্ঞতা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ? কার্যত অন্যান্য গ্রহলোক সম্বন্ধে আপনি কিছুই জানেন না।  তা হলে কীভাবে আপনি বলছেন যে সেখানে কোন জীব নেই?

সাংবাদিক:  আমি সম্পূর্ণরূপে একমত।  প্রায়ই এই বিজ্ঞানীরা বড় বড় কথা বলে উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া।  সুতরাং বস্তুত, জীব সহ স্বর্গলোক আছে, এবং এটা কী এই জড়-ব্রহ্মাণ্ডেরর মধ্যে অবস্থিত?

শ্রীল প্রভুপাদ:  হ্যাঁ।  এই জড়-ব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে আপনি জীবাত্মাদের জন্য একটি জায়গা খুঁজে পাবেন যাঁরা সৎভাবে বসবাস করছে, অথচ ভগবানের শুদ্ধভক্ত নয়।  সেটাকেই বলা হয় স্বর্গ, যেখানে পর্যাপ্ত পরিমাণে জড়-জাগতিক ঐশ্বর্য আছে।  কিন্তু স্বর্গলোক চিন্ময় জগতের মধ্যে সংরক্ষিত আছে যাঁরা ভগবানের প্রতি শুদ্ধভক্তির স্তরে উন্নীত হয়েছে।  সুতরাং স্বর্গলোকে আপনি ভগবানকে দেখতে পারেন না।  এবং এমন কি আপনি সেখানে হাজার হাজার বছর জীবন উপভোগ করতে পারেন, অবশেষে আপনাকে অবশ্যই মৃত্যু বরণ করতে হবে এবং এই পৃথিবীলোকে আর একটি জন্ম গ্রহণ করতে হবে।

সাংবাদিক:  আপনি যেগুলিকে পারমার্থিক জীবনের নিয়মনীতি বলছেন সেগুলি কী বাকি জীবনের জন্যও পালনীয়।

শ্রীল প্রভুপাদ:  হ্যাঁ।  যে সব লোক পাপী, যারা পারমার্থিক বিধিনিষেধ মানে না, তারা ভগবান বা ভগবদ্ভক্তিকে বুঝতে পারেন না।  সাধারণত মৌলিক নিয়মনীতি চারটি বিধিনিষেধের অন্তর্গত।  আমরা আমাদের শিষ্যদের নির্দেশ দিয়ে থাকি- দ্যূতক্রীড়া, অবৈধ যৌনসঙ্গ, মাছ-মাংস-ডিম আহার, আর সিগারেট-চা-কফি ইত্যাদি নেশা পরিত্যাগ করতে।

সাংবাদিক:  কফি এবং চা পান করাও কী নিষেধ?

শ্রীল প্রভুপাদ:  ওহ্ হ্যাঁ, এটাও এক রকমের নেশা।  দ্যূতক্রীড়া, অবৈধ যৌনসঙ্গ, মাংসাহার, নেশা- এগুলি হচ্ছে পাপময় জীবনের চারটি স্তম্ভ স্বরূপ।  সুতরাং যদি না একজন এই চারটি জিনিস পরিত্যাগ করে, সে বুঝতে পারবে না ভগবান কী, ভগবানের রাজ্য কী, এখানে ভৌতিক জগতে আমাদের যথার্থ উদ্দেশ্য কী- অর্থাৎ ভগবানের কাছে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি।

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s