বেদ ও প্রাচীন ভারতের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য (নিয়মিত পর্ব-১৭)


ওঁ তৎ সৎ

ধর্মসাধনে আমাদের দুটো ভালো জিনিষ হচ্ছে- একটা হচ্ছে সে ভালো মানুষ হয়ে যাচ্ছে আর যেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে আমাদের কর্মটা পাল্টাতে থাকে। কর্ম পাল্টে গেলে মানুষের কাম আর অর্থে সিদ্ধিটা আসতে থাকে। অর্থোপার্জনে যে বাধাগুলো ছিল সেগুলো সরে যায়, এখন সে চেষ্টা করলেই প্রচুর অর্থ রোজগার করতে পারবে। এরপরে আসছে কাম লাভ, কাম মানে শুধু পুরুষ-নারী সম্পর্ককেই বোঝায় না, যে কোন ধরণের সুখ ভোগকে কাম বলা হয়- ভালো খাওয়া, ভালো থাকার জায়গা, ভালো পোষাক, গাড়ি, যে কোন ভোগই হচ্ছে কাম, ধর্মসাধনে এগুলো ভোগ করার শক্তিটা বেড়ে যায়। আমরা মনে করি বেশি ধর্মসাধন করলে মাথা খারাপ হয়ে যায়, কিন্তু না, উল্টোটাই হয়। যার দিনকাল খুব খারাপ যাচ্ছে সে যদি খুব করে ধর্মসাধন করে তাহলে তার ঐ রাখাপ অবস্থাটা কেটে যায়। এখনও দেখে যায় কারুর যদি সময় রাখাপ যাচ্ছে তাকে বলা হয় একদিন সত্যনারায়ণের পূজো দাও, কিংবা রোজ এক অধ্যায় করে চণ্ডী পাঠ কর, হনুমান চল্লিশা পাঠ কর সব ভালো হয়ে যাবে। সত্যি সত্যিই ভালো হয়ে যায়, কারণ যে বাজে কর্মগুলো আছে সেগুলি এই শুভ কর্মের দ্বারা কেটে যায়। যেসব বাচ্চারা খুব চঞ্চল, অবাধ্য, এদের যদি জোর করে রোজ জগন্নাথের আটকে প্রসাদ আর একটু গঙ্গাজল খাইয়ে দেওয়া হয় কিছুদিন পরে দেখাযায় এদের স্বভাবটা আগের থেকে অনেক শান্ত হয়ে গেছে। একদিনে হবে না, সময় লাগবে, কিন্তু ফল দেবেই।
মীমাংসকরা এইগুলোও বলছেন যে তোমার চরিত্র পাল্টে যাবে, তোমার কর্মের গোলমালগুলো ঠিক হয়ে গিয়ে কামসিদ্ধি ও অর্থসিদ্ধি হবে। কিন্তু মীমাংসকদের কাছে সব থেকে যেটা বেশী গুরুত্ব তা হচ্ছে, ধর্মসাধন ভালোভাবে করলে মৃত্যুর পরে তুমি উচ্চ স্বর্গে যাবে, তারপর স্বর্গ থেকে পরে যখন তোমার পতন হবে তখন তুমি কোন ভালো বংশে, ভালো বাড়িতে জন্ম গ্রহণ করবে। মীমাংসকদের মতে ধর্মসাধনে এই তিনটে জিনিষ হচ্ছে- তোমার স্বভাব পাল্টে গিয়ে তোমাকে ভালো মানুষ করতে সাহয্য করবে, দ্বিতীয় তোমার কর্মগুলি ঠিক হয়ে তোমার অর্থ ও কাম লাভের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং সব শেষে তৃতীয় যেটা সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ তা হল তোমার ভেতরে যে সূক্ষ্ম শরীর রয়েছে সেটা তোমার মরার পর আরেকটা শরীর ধারণ করে উচ্চ থেকে উচ্চ স্বর্গে গিয়ে সে শরীরের মাধ্যমে আরো ভালো সুখ ভোগ করতে থাকবে। মীমাংসকরা মোক্ষ বলে কিছু মানেই না, মুক্তি বলে কিছু নেই। এদের কাছে ধর্মই হচ্ছে সব কিছু, কর্ম কর, ধর্মকার্জই হচ্ছে কর্ম, কর্ম করলেই এই জীবনে সুখ ভোগ করবে আর মৃত্যুর পর ভালো স্বর্গে যাবে, আবার সেখান থেকে তুমি আবার ভালো ঘরে জন্ম নেবে। এদের এইটাই মত – জন্ম নিচ্ছে মরে যাবে, আবার জন্ম নেবে আবার মরবে এইটাই চলতে থাকবে, মুক্তি-ফুক্তি বলে কিছু নেই। গীতাতেও শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন- তুমি যদি মীমাংসকদের মত মনে কর আত্মা জন্মে নেবে আবার মরবে, তারপরে আবার জন্ম নেবে, তাহলেও তোমার শোককরা উচিৎ নয়- অথ চৈনং নিত্যজাতং নিত্যং বা মন্যসে মৃতম্‌। তথাপি ত্বং মহাবাহো নৈনং শোচিতুমর্হসি।। মীমাংসকদের এইটাই হচ্ছে সিদ্ধান্ত – আত্মার জন্ম নেই মৃত্যু নেই, সৃষ্টিও অনাদিকাল চলতে থাকবে, আত্মাও জন্ম নিয়ে একটা শরীর ধারণ করবে আবার মৃত্যু হবে, মৃত্যুর পর তার কর্মানুসারে স্বর্গে যাবে, সেখান থেকে আবার জন্ম নেবে এইভাবেই কোটি কোটি বছর চলার পর সৃষ্টিতে প্রলয় হবে, প্রলয়ের পর আবার যখন কোটি কোটি বছর পর আবার সৃষ্টি হবে তখন আবার এই জন্ম-মৃত্যুর খেলা চলতে থাকবে, এর শেষ নেই। সমুদ্রের জল বাষ্প হয়ে মেঘ হয়ে চলে গেল আবার বৃষ্টি হয়ে নদী দিয়ে সেই জল প্রবাহ হয়ে সমুদ্রে এসে পড়ল, এইভাবে অনাদি কাল ধরে চলতেই থাকবে। এদের এই মতবাদকে খণ্ডন করা খুবই কষ্টসাধ্য, শঙ্করাচার্যকে এর জন্য প্রচুর খাটতে হয়েছিল। চার্বাক দর্শনে এগুলো মানা হয় না, তাদের মতে মৃত্যুর পর সব শেষ।
ক্রমশঃ

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s