বেদ ও প্রাচীন ভারতের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য (নিয়মিত পর্ব-১৮)


ওঁ তৎ সৎ

চতুর্থ যে মতবাদ আছে সেটা মীমাংসকরা মানে না, কিন্তু যারা বেদান্তী তারা মানে। ধর্মসাধন আমাদের মোক্ষের দিকে এগিয়ে যাবার জন্য প্রস্তুতি করিয়ে দেয়। মঠের সন্ন্যাসীরা যে এত নিষ্ঠা ও নিঃস্বার্থ ভাবে সেবা কাজ করছে, পূজো করছে, সবাই কিন্তু এখানে মীমাংসকদের অনুসরণ করছে। এতে আমাদের মনটা পরিষ্কার করে দিচ্ছে। মনটা যখন পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে তখন তাকে মোক্ষের দিকে এগিয়ে দেবে। আগেই বলা হয়েছে মীমাংসকরা এই মোক্ষ সাধনকে মানে না, বেদ থেকেই এরা বলবে, আর এর জন্য তাদের খুব জোড়াল যুক্তিও দাঁড় করিয়ে দেবে, আবহমান কাল থেকে এই বিতর্ক চলে আসছে। শঙ্করাচার্য বলছেন- পরমাত্মানাং লভন্তে ইতি। কিন্তু পরমাত্মা বলে পূর্বমীমাংসকরা কিছু মানেই না। পূর্বমীমাংসকরা ঈশ্বর মানে না। এদের কাছে আসল হচ্ছে ধর্ম সাধন। কর্ম কর্ম কর্ম, এ ছাড়া মীমাংসকরা আর কিছুই জানে না। পূর্বমীমাংসার দর্শন পুরোপুরি এটার উপরই দাঁড়িয়ে আছে। তারা মানুষ ছাড়া বলবে ভূতপ্রেত আছে আর আছে ইন্দ্রাদি দেবতা। এই ইন্দ্রাদি দেবতাদেরকেও যজ্ঞ দ্বারা পতন করিয়ে দেওয়া যাবে। পূর্বমীমাংসকরা বলছে আমি এমন মন্ত্র জানি যে এই মন্ত্র দিয়ে আমি ইন্দ্রকে টেনে নীচে নামিয়ে আনতে পারি। মহাভারতে এরা এটা করে দেখিয়ে দিয়েছে। জনমেজয় সর্পযজ্ঞ করার সময় যখন জানতে পারল যে তক্ষক ইন্দ্রের মুকুটে লুকিয়ে আছে, তখন পুরোহিতরা বলেছিল যে ইন্দ্রশুদ্ধ তক্ষককে যজ্ঞে টেনে নামিয়ে আন। ইন্দ্র বুঝতে পেরেই তার মুকুটতা খুলে ছুঁড়ে ফেলেছে। বেদের মন্ত্রগুলির এমন শক্তি আছে যে দেবতাদেরও বেঁধে নিয়ে আসতে পারে। এরা বিশ্বাস করত বেদের মন্ত্রের মধ্যেই রয়েছে সর্ব শক্তি। এই মন্ত্রকে যদি যজ্ঞে ঠিক ভাবে প্রয়োগ করা হয় তাহলে যে কোন কার্যসিদ্ধি সম্ভব। এদের কাছে মুক্তি বলে কিছু নেই, সেইজন্য এদের কাছে কর্মই হচ্ছে শেষ কথা। এই যে অনেকে বলে স্বর্গ বলে কিছু আছে নাকি? মৃত্যুর পর আবার কিছু হয় নাকি? মরে গেলেই সব শেষ। এদের এই ধরণের মত হাজার হাজার বছর আগে চার্বাক দর্শনে বলা হয়ে গেছে। বার্বাকরা বলে- যারা বেদ লিখেছে এরা হচ্ছে ধূর্ত, ভ্রষ্ট, নিশাচর দৈত্য। শুধু অর্থ রোজগার করবে, মাংস খাবে এই লোভে এরা বেদ লিখেছে। চার্বাকরা হচ্ছে ভারতের বস্তুবাদী দর্শনের জনক, আজ থেকে চার হাজার বছর আগেই এদের পুরো দর্শন সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়েছিল, কম্যুনিষ্টরা নতুন কিছু কথা আজকে বলছে না। বেদের পণ্ডীতরা এগুলো খুব নির্বিকার ভাবেই গ্রহণ করেন, এরাও এর উপযুক্ত জবাব দিয়ে দেন। তাই আজকালকার কিছু বস্তুবাদী লোকেরা দুই একটা বই পড়ে আমাদের শাস্ত্রকে নিয়ে তর্ক করতে আসে তাদের জন্য একটাই কথা- ভাই তোমরা নতুন কথা কিছু বলছ না বেদের বিরুদ্ধে, আমাদের একটা পুরো দর্শনই এর উপরে বহু বছর আগে থাকতেই চলে আসছে।
মীমাংসকরা বেদের যে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা, যা সমস্ত বেদ শিক্ষার্থীকে প্রথমেই মুখস্থ করতে হয় তা হচ্ছে- মন্ত্র ব্রাহ্মণয়ো বেদানাম্‌ ধ্যেয়- বেদের অর্থ হচ্ছে মন্ত্র আর ব্রাহ্মণ। এই সংজ্ঞা থেকে বোঝা যাচ্ছে মীমাংসকদের কাছে বেদ হচ্ছে শুধু মন্ত্র আর ব্রাহ্মণ, বাকি যা আছে তা বেদ নয়। কারণ উপনিষদ বলছে শুধু আত্মতত্ত্বের কথা, কিন্তু আত্মতত্ত্ব দিয়ে তো আর ধর্ম সাধন হবে না। আরণ্যকেও কোন বাহ্যিক ক্রিয়াদি নেই, শুধু মনে মনে কল্পনা করলেই হবে। এখন এই দিয়েও ধর্ম সাধন হবে না। তাই মীমাংসকরা উপনিষদ আর আরণ্যককে বেদ বলে গ্রহণ করবে না। এখন মন্ত্র হচ্ছে-যজ্ঞে যেটা লাগবে সেটার বর্ণনা করা হয়েছে। আর ব্রাহ্মণে যজ্ঞ কি ভাবে হবে তার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এই দুটোই ধর্ম সাধনের প্রধান অবলম্বন তাই এই দুটোকেই বেদ বলা হয়, তাই বলে উপনিষদ আর আরণ্যককে মীমাংসকরা উড়িয়ে দিচ্ছে না। এই দুটো হচ্ছে গৌণ। গৌণ এই কারণে, লোকেদের মন যাতে ধর্মসাধনে প্রবৃত্ত হয় তার জন্য বেদে আরণ্যক আর উপনিষদের কথা বলা হয়েছে। এই দুটো আমাদের প্রস্তুতি করিয়ে দিচ্ছে মন্ত্র ও ব্রাহ্মণ যাতে ঠিক ভাবে করতে পারি। শঙ্করাচার্য এইটাকেই পুরোপুরি উল্টে দিয়ে বললেন- তুমি আগে মন্ত্র ও ব্রাহ্মণ অনুশীলন করে, মন্ত্র ও ব্রাহ্মণ অনুশীলন করে যখন তোমার মন শুদ্ধ হবে তখন তুমি উপনিষদে চলে আসতে পারবে।
ক্রমশ –

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s