কৃষ্ণ-সম্পর্কিত প্রশ্নই শ্রেষ্ঠ প্রশ্ন


কৃষ্ণ-সম্পর্কিত প্রশ্নই শ্রেষ্ঠ প্রশ্ন

আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য
কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ
(২ আগস্ট, ১৯৬৮ কানাডার মন্ট্রিয়েল শহরের কৃষ্ণ-মন্দিরে প্রদত্ত ভাগবত প্রবচন থেকে সংকলিত)

শ্রীমদ্ভাগবতের প্রথম স্কন্ধের দ্বিতীয় অধ্যায়ের প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, নৈমিষারণ্যের ঋষিরা শ্রীল সূত গোস্বামীকে ছয়টি প্রশ্ন করেছিলেন এবং তাই তিনি একে একে সেই প্রশ্নগুলির উত্তর দিয়েছিলেন।

শ্রীসূত গোস্বামী প্রথমেই মহর্ষি শ্রীল শুকদেব গোস্বামীকে প্রণতি নিবেদন করেছিলেন এবং তারপরে পরমেশ্বর ভগবান নারায়ণ, সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ নর-নারায়ণ ঋষি নামক ভগবৎ-অবতার, বিদ্যাদেবী সরস্বতী এবং শ্রীল ব্যাসদেবকে তাঁর সশ্রদ্ধ প্রণতি জ্ঞাপন করেন।  (ভাগবত ১/২/৪)

অতঃপর শ্রীল সূত গোস্বামী বলেন,‘হে ঋষিগণ, আপনারা আমাকে যথার্থ প্রশ্নই করেছেন।  আপনাদের প্রশ্নগুলি অতি উত্তম, কেননা সেইগুলি সমস্তই কৃষ্ণ-বিষয়ক এবং তাই তা জগতের মঙ্গল সাধন করে।  এই ধরনের পরিপ্রশ্নের দ্বারাই কেবল আত্মা সম্পূর্ণরূপে প্রসন্ন হয়।’

শ্রীমদ্ভাগবতে পরম সত্যই হচ্ছে জ্ঞাতব্য বিষয়।  তাই নৈমিষারণ্যের ঋষিদের প্রশ্নগুলি ছিল যথার্থ পরিপ্রশ্ন, কারণ সেইগুলি ছিল পরমেশ্বর ভগবান পরম সত্য শ্রীকৃষ্ণেরই সম্বন্ধে।  ভগবদ্গীতায় (১৫/১৫) পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন যে, সমস্ত বেদের একমাত্র জ্ঞাতব্য বিষয় হচ্ছেন তিনি।  তাই শ্রীকৃষ্ণ সম্বন্ধীয় প্রশ্নগুলিই হচ্ছে বৈদিক অনুসন্ধানের সারবস্তু।

সেই কারণেই শ্রীল সূত গোস্বামী, প্রবক্তা রূপে, সমবেত ঋষিবর্গকে অভিনন্দন জানিয়েছেন তাঁদের কৃষ্ণ-বিষয়ক অনুসন্ধিৎসার জন্য।  কৃষ্ণসংপ্রশ্নো।  যৎকৃতঃ কৃষ্ণসংপ্রশ্নো। আপনারা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ-বিষয়ক চমৎকার প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন–শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কে, ধর্ম সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। (ভাঃ ১/২/৫)
যৎকৃতঃ কৃষ্ণসংপ্রশ্নো, ভবদ্ভির্লোকমঙ্গলম্ ।  এই ধরনের প্রশ্ন প্রত্যেক মানুষের পক্ষেই অতি মঙ্গলজনক।  যখন আমরা শ্রীকৃষ্ণ বিষয়ে অনুসন্ধিৎসা প্রকাশ করি এবং কৃষ্ণকথা আলোচনা করি, তখন উভয়পক্ষই আমরা উপকৃত হই।  তাই শ্রীল সূত গোস্বামীকে যখন শ্রীকৃষ্ণতত্ত্ব এবং ধর্ম-বিষয়ক প্রশ্ন করা হল, তখন তিনি ভারি খুশি হয়েছিলেন।

কারণ, যাঁরা ভগবদ্গীতা পাঠ করেছেন, তাঁরা অবশ্যই জেনেছেন এবং বুঝেছেন যে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দু’টি উদ্দেশ্যে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।  একটি উদ্দেশ্য হল–ধর্ম সংস্থাপনার্থায়, সদ্ধর্মের নীতিগুলির পুনরুজ্জীবনের জন্য, এবং পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্, দুষ্কৃতকারীদের কবল থেকে সাধু-সজ্জন ব্যক্তিদের পরিত্রাণ তথা সুরক্ষার জন্য।

সাধু মানে যাঁরা ভগবানের ভক্ত।  তাঁদের বলা হয় সাধু ব্যক্তি।  আর যারা হল অভক্ত, তাদের বলা হয় দুষ্কৃতাম্ । দুষ্কৃতাম্ বলতে তাদেরই বোঝায়, যারা সদা-সর্বদাই পাপময় ক্রিয়াকর্মে মেতে থাকে। তারা হল দুষ্কৃতাম্ ।  সেই জন্য শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছেন, পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্ ।

সুতরাং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের অর্থ দু’টি উদ্দেশ্য সাধন ।  তাই প্রশ্নটি হয়েছিল–

ব্রূহি যোগেশ্বরে কৃষ্ণে ব্রহ্মণ্যে ধর্মবর্মণি।
স্বাং কাষ্ঠামধুনোপেতে ধর্মঃ কং শরণং গতঃ॥
(ভাগবত ১/১/২৩)

নৈমিষারণ্যের ঋষিরা প্রশ্ন করেছিলেন, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ধর্ম সংস্থাপন করার জন্য আবির্ভূত হন।  সেই পরম ব্রহ্ম যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ সম্প্রতি তাঁর নিত্যধামে অন্তর্ধান রূপ অপ্রকট লীলায় প্রবেশ করলে সনাতন ধর্ম কার শরণাপন্ন হয়েছে, তা আমাদের বলুন।  -এই ছিল তাঁদের প্রশ্ন।

এই প্রশ্ন শুনে শ্রীল সূত গোস্বামী তাঁদের অভিনন্দন জানাচ্ছেন যে, ‘এই প্রশ্নটি অতীব মঙ্গলজনক।’  লোকমঙ্গলম্ ।  লোক মানে এই গ্রহলোক, পৃথিবী, আর মঙ্গলম্ মানে কল্যাণকর।

তাই তিনি প্রথমেই ব্যাখ্যা করছেন ধর্ম কি।  ধর্ম হল এমন কতকগুলি সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য যার পরিবর্তন করতে আপনারা পারেন না।  তাকে বলে ধর্ম।  কোন একটা বিশ্বাসকেই ধর্ম বলে না।  বিশ্বাস হল অন্য একটা জিনিস।  বিশ্বাস মেনে চলা হয় অন্ধভাবে, কিংবা সামাজিক সংস্কারবশে বা অন্য কোন উপায়ে।  সেই বিশ্বাস হলো ধর্ম থেকে ভিন্ন ব্যাপার।  কিন্তু ধর্ম হল সেই বস্তু, যা আপনার সামাজিক সংস্কার, দেশ-কাল, সব বদলে গেলেও সেটি বদলায় না।  সেই হল ধর্ম।

সেই ধর্ম প্রচলন করেন পরম পুরুষোত্তম ভগবান।  যেমন, শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, ধর্মসংস্থাপনার্থায়–‘ধর্মের নীতিসমূহ পুনঃ প্রবর্তনের জন্য।’  সেই ধর্মের কথা শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, যা মানুষের জীবনে জীবমাত্রেরই জীবনে অপরিহার্য এবং অপরিবর্তনীয়।  যে অবস্থাতেই থাকি, ধর্ম আমাদের মেনে চলতেই হবে,  জীবনের কতকগুলি বৈশিষ্ট্য আমাদের স্বীকার করতেই হবে।  সেই বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে একটি হলো–অন্যের সেবায় আত্মনিয়োগ–প্রত্যেক জীবকে এই বৈশিষ্ট্য মেনে চলতে হয়।  মানুষ, পশু-পাখি–প্রত্যেক জীবই অন্য কোনও না কোনও জীবকে সেবা করে চলেছে।  সেটাই জীবের অপরিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য তথা ধর্ম।

তাই শ্রীমদ্ভাগবতে এই ধর্মেরই প্রকৃতি নানাভাবে বোঝানো হয়েছে–কাকে ধর্ম বলে।  বলা হয়েছে–স বৈ পুংসাং পরো ধর্মো যতো ভক্তিরধোক্ষজে (ভাঃ ১/২/৬), ‘সমস্ত মানুষের পরম ধর্ম হচ্ছে সেই ধর্ম যার দ্বারা পরম পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবা অভিমুখী ভগবদ্ভক্তি অর্জন করা যায়।’ সেটি হল সর্বোত্তম ধর্ম।  সেই সম্পর্কিত প্রশ্নই হল সর্বশ্রেষ্ঠ প্রশ্ন।

সমগ্র জগৎ নানাবিধ প্রশ্ন এবং উত্তরে পরিপূর্ণ।  পশু-পাখি, মানুষ–সকলেই নিরন্তর প্রশ্ন এবং উত্তরে ব্যস্ত।  সকালবেলায় পাখিরা তাদের প্রশ্ন এবং উত্তরে ব্যস্ত হয়, আবার সন্ধ্যাবেলায় তারা নীড়ে ফিরে প্রশ্ন এবং উত্তরে ব্যস্ত হয়।  মানুষ রাত্রে গভীর নিদ্রায় যখন মগ্ন থাকে, সেই সময়টি ছাড়া সর্বক্ষণ সে হয় প্রশ্ন করে, নয়ত উত্তর দেয়।  বাজারে দোকানদারেরা প্রশ্ন-উত্তরে ব্যস্ত, বিচারালয়ে আইনজীবীরা প্রশ্ন-উত্তরে ব্যস্ত।  রাজনীতিবিদেরা এবং সাংবাদিকেরাও প্রশ্ন-উত্তরে ব্যস্ত।  স্কুল-কলেজে ছাত্র-ছাত্রীরাও প্রশ্ন-উত্তরে ব্যস্ত।  সংসদে দেশনেতারা সকলে প্রশ্ন-উত্তরে ব্যস্ত ।  যদিও তারা সারা জীবন ধরে এইভাবে প্রশ্ন-উত্তর নিয়েই ব্যস্ত থাক, তবু তারা প্রসন্ন হতে পারে না।  আত্মার মধ্যে সেই প্রসন্নতা পেতে হলে কেবলমাত্র কৃষ্ণ-বিষয়ক প্রশ্ন এবং উত্তরের মাধ্যমেই তা লাভ করা যায়।
কারণ, পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমাদের সবচেয়ে অন্তরঙ্গ প্রভু, সখা, পিতা, পুত্র ও প্রেমিক।  শ্রীকৃষ্ণকে ভুলে যাওয়ার ফলে আমরা প্রশ্ন এবং উত্তরের কত বিষয় উদ্ভাবন করেছি, কিন্তু তার একটিও আমাদের পূর্ণ প্রসন্নতা প্রদান করতে পারে না।

তাই মানুষের কর্তব্য শ্রীমদ্ভাগবতের তত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করে সব রকমের সামাজিক, রাজনৈতিক অথবা ধর্ম বিষয়ক প্রশ্ন এবং সমস্যার সমাধান করা।  শ্রীমদ্ভাগবত এবং শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন সব কিছুর সমষ্টি।

প্রতিটি জীবই তাই স্বরূপে নিত্য, এবং শ্রীকৃষ্ণ তাদের সকলের নিত্য আকর্ষণ।  শ্রীকৃষ্ণ পূর্ণ পুরুষোত্তম, এবং অন্য সব কিছুই তাঁর বিভিন্ন অংশ।  শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে সমস্ত জীবের সম্পর্ক প্রভু-ভৃত্যেরই সম্পর্ক।  সেই সম্পর্কের অস্তিত্ব চিন্ময় এবং তা আমাদের জড় জগতের অভিজ্ঞতা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে আমাদের তথা জীবকুলের যে প্রভু-ভৃত্যের সম্পর্ক, তা স্বতঃস্ফূর্ত ভালবাসার সম্পর্ক।  ভগবদ্ভক্তির পথে কিছুটা অগ্রসর হওয়ার পর এই তত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করা যায়।

সকলেরই কর্তব্য, পরমেশ্বর ভগবানের প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত হয়ে থাকা। তার ফলে মানুষ ধীরে ধীরে তার যথার্থ জীবন সম্বন্ধে অবগত হয়ে সম্পূর্ণভাবে প্রসন্ন হতে পারবে।

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s