শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার পথটিই মূল প্রামাণিক পথ


শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার পথটিই মূল প্রামাণিক পথ

আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য
কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ
(১৯৭৫ সালে ১০ ই অক্টোবর দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়েষ্টভিলে
ডারবান বিশ্ববিদ্যালয়ের রেকটর ডঃ এস.পি. অলিভারের সঙ্গে কথোপকথনের অংশবিশেষ)

krishna_arjuna_Mahabharata-Kurukshetra1

ডঃ অলিভার–দক্ষিণ আফ্রিকায় আমাদের ভারতীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে তেমন কোন সুপণ্ডিত কেউ নেই। সাধারণতঃ ভারতীয়রা এখানে আসে চিনি উৎপাদনের ভূমি-শ্রমিক রূপে। কেউ কেউবা স্বর্ণকার, দর্জি এইসব। এর ওপর গত এক শতাব্দী যাবৎ রাজনৈতিক সংঘর্ষ চলছে। তারা এই দেশেই নিজস্ব জায়গা নিয়ে বাঁচার জন্য লড়াই করছে।
আমার মনে হয়, তাদের নিজস্ব বিশ্বাস ও সংস্কৃতির উপর তাদের জোর দেওয়া উচিত। আমি তাদেরকে বলেছিলাম, এই দেশে আমরা তাদের নিজস্ব সত্ত্বা নিয়ে বাস করার সুযোগ দিচ্ছি, কিন্তু তাদের এভাবে শূন্যতার স্রোতে গা ভাসিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকা উচিত নয়।
কিন্তু তারা জানে না, তারা কার কাছে যাবে বা কোথা থেকে শুরু করবে। তাই মূলতঃ তারা, আমি এবং আমরা সবাই জানতে চাইছি যে কিভাবে বা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা তা প্রয়োগ করব?

শ্রীল প্রভুপাদ–শন্তিপূর্ণ উপায়ে কিভাবে এই পৃথিবীতে বসবাস করতে হবে এবং কিভাবে আমাদের প্রকৃত আলয় ভগবদ্ধামে ফিরে যেতে হবে, এই সমস্ত বিষয় ভগবদ্গীতায় বর্ণনা করা হয়েছে।

ডঃ অলিভার–কিন্তু আধুনিক মানুষকে কিভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পাওয়া সম্ভব? আমাদের বেদনাটি হলো এই, আমরা সেই শক্তি থেকে এত দূরে পরিভ্রমণ করছি যে, কোথা থেকে শুরু করতে হবে তা আমরা জানি না এবং ভগবান তাঁর হৃদয়ের কতখানি আমাদের হৃদয়ে দিতে চান সে সম্বন্ধে অনুসন্ধান করার জন্য কয়েকজন সৎ অনুগামীও আমরা পাব না।

শ্রীল প্রভুপাদ–ভগবান স্বয়ং নিজেকে দান করেছেন। আমাদের কেবলমাত্র তাঁকে গ্রহণ করতে হবে। শুধু একটু এগিয়ে আসার প্রয়োজন। পক্ষান্তরে সবকিছুই রয়েছে। ভগবান বলছেন, আত্মা নিত্য এবং শরীরটি পরিবর্তিত হচ্ছে।
এর একটি সহজ উদাহরণ হচ্ছে, বালক যুবক হচ্ছে, যুবক বৃদ্ধ হচ্ছে। এই ঘটনা অস্বীকার করার উপায় নেই। সেটি আপনিও বুঝতে পারছেন, আমিও বুঝতে পারছি। এটি অত্যন্ত সহজ।
আমার মনে আছে, ছেলেবেলায় আমি লাফাতে পারতাম, কিন্তু এখন আমি তা পারি না। কেননা আমার এখনকার শরীরটি ছেলেবেলার শরীরের থেকে ভিন্ন । সুতরাং এ বিষয়ে আমি সচেতন যে, আমি ঐরকম একটি দেহ ধারণ করেছিলাম। এখন আমি সেই দেহ ধারণ করছি না।
দেহের পরিবর্তন হচ্ছে, কিন্তু নিত্যগতভাবে আমি সেই একই ব্যক্তি। এটি উপলব্ধি করার জন্য কেবল একটু বুদ্ধির প্রয়োজন। তাহলেই যথেষ্ট। আমি এই দেহটির মালিক বা দেহী, নিত্যতত্ত্ব-আত্মা। দেহটিই কেবল পরিবর্তিত হচ্ছে।

ডঃ অলিভার–কিন্তু সেটি স্বীকার করা হলেও আরেকটি সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। এর অর্থ বা উদ্দেশ্য কি?

শ্রীল প্রভুপাদ–হ্যাঁ। আমি এই দেহ নই, একথা হৃদয়ঙ্গম করার পরও যদি আমি কেবলমাত্র দেহের স্বাচ্ছন্দ্য রক্ষায় ব্রতী হই, প্রকৃত আমি’র প্রতি যত্নশীল না হই, তাহলে সেটি ভুল করা হবে। আমি নিজে ক্ষুধার্ত থেকে আমার সার্ট ও কোটটি যদি দিনে তিনবার করে পরিষ্কার করি, তাহলে সেটি অবাস্তব কাজ হবে।
ঠিক তেমনই এই সভ্যতাও মূলতঃ ভুল পথে চালিত হচ্ছে। আমি যদি কেবল আপনার সার্ট আর কোটের যত্ন নিলাম, কিন্তু আপনাকে কিছু খেতে না দেই, তাহলে আপনি কতক্ষণ পর্যন্ত সন্তুষ্ট থাকবেন? এটিই হচ্ছে মূল বিভ্রান্তি। আর সে কথাই আমি বলতে চাইছি।
জাগতিক সভ্যতার অর্থ হচ্ছে- এই দেহ ও দেহগত স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতি যত্নশীল হওয়া। কিন্তু এই দেহের কোন মালিক দেহী বা চিন্ময় আত্মার প্রতি তাদের কোন ভ্রূক্ষেপ নেই। তাই সকলেই আজ অস্থিরচিত্ত। তারা কেবল ধনতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ইত্যাদি আদর্শের পরিবর্তন করছে। কিন্তু আসল ভুলটি যে কোথায় তা তারা জানে না।

ডঃ অলিভার–ঐসব আদর্শের মধ্যে খুব সামান্যই পার্থক্য রয়েছে। কেননা তা সবই জাগতিক।

শ্রীল প্রভুপাদ–কম্যুনিষ্টরা ভাবছে, আমরা যদি সরকারের নিয়ন্ত্রণ ভার গ্রহণ করি, তাহলেই সব ঠিক হয়ে যাবে, কিন্তু মূল ভুলটি হচ্ছে- কম্যুনিষ্ট এবং ক্যাপিটালিষ্ট উভয়েই এই দেহের যত্ন নিচ্ছে, চিন্ময়-তত্ত্ব আত্মার নয়। প্রকৃতপক্ষে আত্মার শান্তি হলেই সমস্ত কিছুই শান্তিপূর্ণ হবে–

ভোক্তারং যজ্ঞতপসাং সর্বলোকমহেশ্বরম্ ।
সুহৃদং সর্বভূতানাং জ্ঞাত্বা মাং শান্তিমৃচ্ছতি॥ (গীতা ৫/২৯)

(ভক্তকে) শ্লোকটির অনুবাদ পড়।
ভক্ত–‘‘পূর্ণতত্ত্বজ্ঞ ব্যক্তি আমাকে সকল যজ্ঞ ও তপস্যার মূল ভোক্তা, সর্বলোকের মহেশ্বর এবং জীবাত্মার পরম সুহৃদ রূপে জ্ঞাত হয়ে এই জড়-জাগতিক দুঃখ-কষ্টের মধ্যেও পরম শান্তি প্রাপ্ত হন।’’

শ্রীল প্রভুপাদ–এর অর্থ হচ্ছে, ভগবান কি তা জানা উচিত। কারণ, আপনি হচ্ছেন ভগবানের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, আর তাঁর সঙ্গে আপনার এক অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রয়েছে। ভগবানকে জানা আমাদের কর্তব্য। কিন্তু এখন মানুষের ভগবান সম্বন্ধে কোন ধারণাই নেই।

ডঃ অলিভার–হ্যাঁ, এটা আমি বিশ্বাস করি যে, আকাশে ঘূর্ণায়মান একটি স্যটেলাইট বা উপগ্রহ যদি পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের ঘটনা প্রকাশ করতে পারে, তাহলে যারা ভগবানকে জানতে চায়, যারা তাঁকে মান্য করে, একনিষ্ঠভাবে তাঁর সেবক হতে চায়, তাদের যে কারুর কাছেই ভগবান তাঁর স্বরূপ এবং শক্তির প্রকাশ ঘটাতে পারেন।

শ্রীল প্রভুপাদ–হ্যাঁ, হ্যাঁ। তাই ভগবদ্গীতায় পরমেশ্বর ভগবান স্বয়ং নিজেকে বর্ণনা করেছেন। যুক্তিসম্মত সিদ্ধান্তের সঙ্গে আমাদের তা গ্রহণ করতে হবে। পরমেশ্বর ভগবান সম্বন্ধে তাহলে আমরা একটা স্বচ্ছ ধারণা লাভ করতে পারব।

ডঃ অলিভার–হ্যাঁ। কিন্তু সেটি কিভাবে সম্ভব?

শ্রীল প্রভুপাদ–শিক্ষাটি রয়েছে। আমাদেরকে উপযুক্ত তত্ত্বজ্ঞ অধিকারীর সঙ্গে আলোচনা করে সেটি হৃদয়ঙ্গম করতে হবে।

ডঃ অলিভার–আমিও তাই মনে করি। বোধ হয় সেটিই হচ্ছে শুরু। কয়েকজন অধ্যাপক যেমন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা বিশ্লেষণ করেন, ঠিক তেমনি ভাবেই আমাদের তা আলোচনা করতে হবে।

শ্রীল প্রভুপাদ–এই শ্লোকে তাঁকে হৃদয়ঙ্গম করার পন্থাটি বর্ণনা করা হয়েছে-
তদ্ বিদ্ধি প্রণিপাতেন পরিপ্রশ্নেন সেবয়া।

উপদেক্ষ্যন্তি তে জ্ঞানং জ্ঞানিনস্তত্ত্বদর্শিনঃ॥ (গীতা ৪/৩৪)
(জনৈক ভক্তকে)- শ্লোকটি বের কর।

ভক্ত– ‘‘শ্রীগুরুদেবের সমীপবর্তী হয়ে বা সান্নিধ্যে থেকে পরম তত্ত্বকে জানার চেষ্টা করতে হবে। বিনীতভাবে তাঁকে প্রশ্ন করতে হবে এবং তাঁর সেবা করতে হবে। আত্ম-তত্ত্বজ্ঞ ও সত্যদ্রষ্টা ব্যক্তিগণই কেবলমাত্র সেই জ্ঞান প্রদান করতে পারেন।’’

শ্রীল প্রভুপাদ–বাস্তব উদাহরণ এখানেই রয়েছে। এইসব ইউরোপীয় ও আমেরিকান ছেলেরা সম্পন্ন পরিবার থেকে এসেছে। কিন্তু তারা কেন আমার সেবা করছে? আমি ভারতীয়, একটি দরিদ্র দেশ থেকে এসেছি।
আমি তাদের কোন টাকা-পয়সা দিচ্ছি না। আমি যখন পাশ্চাত্যে আসি তখন আমার কাছে কোন টাকা-পয়সা ছিল না। আমি কেবল চল্লিশ টাকা নিয়ে এসেছিলাম। আমেরিকায় সেটি কেবল এক ঘন্টার খরচ। তবু তারা আমার নির্দেশ পালন করার জন্য আত্মোৎসর্গ করেছে এবং সেজন্য তাদের পারমার্থিক অগ্রগতি হচ্ছে।
প্রণিপাতেন, পরিপ্রশ্নেন-তারা আমাকে প্রশ্ন করছে। আমি তাদের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করছি। এবং তাদের প্রত্যেকেরই আনুগত্য রয়েছে। তারা ক্রীতদাসের মতো সেবা করছে। এটিই হচ্ছে পন্থা।

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s