ভগবানের শ্রেষ্ঠ ভক্ত কে?


ভগবানের শ্রেষ্ঠ ভক্ত কে?

শ্রীমৎ ভক্তিচারু স্বামী মহারাজ

maxresdefaultশ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু একটি বিশেষ সময়ে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।  তিনি যখন অবতরণ করেন, তখন প্রায় সমগ্র ভারতবর্ষই মুসলমানদের অধীনে ছিল।  মুসলমানেরা ভারতবর্ষ দখল করে বৈদিক সনাতন ধর্মাবলম্বী, অর্থাৎ হিন্দুদের উপর ভীষণ অত্যাচার করেছিল।  তাদের অত্যাচারে হিন্দুধর্ম বা হিন্দুরা অত্যন্ত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল।  মুসলমানেরা জোর করে হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করছিল এবং নানাভাবে নির্যাতন করছিল।  কারণ ওদের রাজত্ব।  সুতরাং ওদেরই হাতে সমস্ত ক্ষমতা ।  তারা যা ইচ্ছে তাই করতে পারে।

সেই রকম একটা সময়ে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু অবতরণ করেন।  মহাপ্রভু যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন এই বঙ্গভূমি হুসেন শাহের অধীন।  হুসেন শাহ স্বাভাবিক ভাবে হিন্দুদের উপরে অত্যাচার করছিল।  মহাপ্রভুর লীলায় আমরা দেখতে পাই কিভাবে চাঁদকাজী মহাপ্রভুর সংকীর্তন আন্দোলন বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল।  এইভাবে তখন চারদিকে নানারকম বাধা-বিঘ্ন চলছিল এই বৈদিক সনাতন ধর্ম অনুশীলনকারীদের বিরুদ্ধে।

Pancha-Tattwa

তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে যে, মহাপ্রভু কেন এই রকম পরিস্থিতিতে অবতীর্ণ হলেন?  তার কারণটি হচ্ছে, মহাপ্রভু এভাবে অবতীর্ণ হয়ে শিক্ষা দিলেন যে, আমাদের কৃষ্ণভক্তির প্রচারে আমরা যেন কোনো অবস্থাতেই ভীত বা বিচলিত না হই।  একটা প্রচণ্ড বিরোধিতা সমন্বিত সময়ে মহাপ্রভু এসে কৃষ্ণভক্তি প্রচার করলেন।

দ্বিতীয় কথা, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু তাঁর প্রচার কার্য শুরু করেন তাঁর দীক্ষা গ্রহণের পর থেকেই।  তিনি নিজেও কৃষ্ণপ্রেমে উন্মত্ত হয়ে গিয়েছিলেন।  শ্রীল ঈশ্বরপুরীপাদের কাছ থেকে দীক্ষা গ্রহণের পর তিনি শুদ্ধভক্তির সমস্ত লক্ষণগুলি প্রকাশ করতে থাকেন।  তাঁর দিব্য উন্মাদনা দেখে লোকেরা মনে করেছিল যে, নিমাই পণ্ডিত পাগল হয়ে গেছে।  আসলে নিমাই পণ্ডিত কৃষ্ণপ্রেমে পাগল হয়েছিলেন।

এর কিছুকাল পরে মহাপ্রভু সন্ন্যাস গ্রহণ করে জগন্নাথ পুরীতে চলে যান।  বঙ্গদেশের প্রচার কার্যটি তিনি নিত্যানন্দ প্রভুর ওপর অর্পণ করেন।  রূপ গোস্বামী এবং সনাতন গোস্বামীকে তিনি উত্তর ভারতে পাঠান।  বৃন্দাবনে লুপ্ত তীর্থ উদ্ধার আর শাস্ত্র প্রনয়ণের কার্যভার দান করেন।  আর তিনি নিজে সারা ভারতবর্ষ ভ্রমণ করে লক্ষ লক্ষ মানুষকে কৃষ্ণপ্রেম দান করেছিলেন।  এভাবে মহাপ্রভু তাঁর প্রচার কার্য শুরু করেন।  মহাপ্রভুর বাণী প্রচারে বৃন্দাবনে যে যে গোস্বামীগণ দিয়েছিলেন তাঁদের দান অতুলনীয়।  তারা নানা শাস্ত্রবিচার করে এক সৎ ধর্ম স্থাপন করেছিলেন।

অত্যন্ত নিপুণতার সঙ্গে, অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তাঁরা এক সৎধর্ম সংস্থাপন করেছিলেন।  সৎধর্ম মানে সনাতন ধর্ম বা আত্মার ধর্ম, দেহের ধর্ম নয়।  সেই আত্মার ধর্মটি হচ্ছে কৃষ্ণপ্রেম।  কৃষ্ণপ্রেম যে আত্মার ধর্ম সেটি গোস্বামীগণ নানা শাস্ত্র বিচার করে প্রতিষ্ঠা করেছেন।  এভাবে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু গোস্বামীদের দ্বারা তাঁর সংকীর্তন যজ্ঞের শাস্ত্রভিত্তিক ব্যাখ্যা প্রদান করেন।

গোস্বামীদের মধ্যে প্রধান হচ্ছেন শ্রীল রূপ গোস্বামী ও শ্রীল সনাতন গোস্বামী।  শ্রীল রূপ গোস্বামী প্রচুর গ্রন্থাবলী রচনা করেছেন।  সকল গোস্বামীরাই বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন।  শ্রীল রূপ গোস্বামীর রচিত প্রধান প্রধান গ্রন্থগুলি হচ্ছেভক্তিরসামৃতসিন্ধু, উজ্জ্বলনীলমণি, স্তবমালা, বিদগ্ধ মাধব, ললিত মাধব ইত্যাদি।  শ্রীল সনাতন গোস্বামীর প্রধান গ্রন্থগুলি হচ্ছে হরিভক্তিবিলাস, বৃহৎ ভাগবতামৃত এবং তিনি ভাগবতের বহু টীকা, ইত্যাদি রচনা করেছেন।  শ্রীল সনাতন গোস্বামীর যে বৃহৎ ভাগবতামৃত সেখানে তিনি শ্রীমদ্ভাগবতের প্রকৃত তত্ত্ব বিশ্লেষণ করেছেন।  শ্রীমদ্ভাগবতে যে শিক্ষাটি দেওয়া হয়েছে- শ্রীমদ্ভাগবতের মূল যে বিষয়বস্তু সেই বিষয়বস্তুটি প্রতিষ্ঠিত করেছেন শ্রীল সনাতন গোস্বামী তাঁর বৃহৎ ভাগবতামৃতের মাধ্যমে।

শ্রীল সনাতন গোস্বামীর বৃহৎ ভাগবতামৃতে দুটো বিভাগ আছেপূর্ব বিভাগ আর উত্তর বিভাগ।  পূর্ব মানে প্রথম দিকের আর উত্তর মানে শেষের দিকের।  পূর্ব বিভাগে শ্রীল সনাতন গোস্বামী প্রতিষ্ঠা করেছেন যে, শ্রেষ্ঠ ভক্ত কে? তিনি ভগবানের শ্রেষ্ঠ ভক্তকে খুঁজছেন।

প্রয়াগে ঋষিদের সমাবেশ হয়েছে।  সেখানে বিভিন্ন মুনি ঋষিরা পরস্পরের ভক্তির প্রশংসা করছেন।  তখন নারদমুনি ভাবলেন যে, তিনি খুঁজে দেখবেন প্রকৃত শ্রেষ্ঠ ভক্ত কে?  নারদ মুনি দেখলেন এক ধনাঢ্য ব্রাহ্মণ।  তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠা সহকারে ভগবানের পূজা করছেন।  তা দেখে নারদ মুনি ভাবলেন, ইনিই হচ্ছেন শ্রেষ্ঠ ভক্ত।   তখন নারদমুনি তার কাছে গিয়ে তার ভক্তির প্রশংসা করতে লাগলেন।  বললেন, আপনি ভগবানের প্রকৃত কৃপাপাত্র।  তখন সেই ব্রাহ্মণটি তার উত্তরে বললেন, না- না, আমি ভক্ত নই।  আমি যেটা করছি সেটা আমার বৃত্তি।  সেটা আমার কর্তব্য।  আমি ব্রাহ্মণ, ভগবানের পূজা করাটাই আমার কর্তব্য।  অতএব আমি তাই করছি।

প্রকৃত ভক্ত হচ্ছেন দাক্ষিণাত্যের এক রাজা।  তিনি ক্ষত্রিয় রাজা, তার কতো দায়-দায়িত্ব রয়েছে।  কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠাপরায়ণ ভগবানের ভক্ত।  তিনি ভগবানকে কেন্দ্র করে তার সমস্ত কার্য সম্পাদন করেন।  তা শুনে নারদমুনি সেই রাজার কাছে গেলেন।  তিনি দেখলেন যে, সেই রাজা অত্যন্ত নিষ্ঠাপরায়ণ ভক্ত।  অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে ভগবানকে আরাধনা করছেন এবং পূজা করছেন।  ভগবানকে কেন্দ্র করেই তিনি তার রাজ্য শাসন করছেন।  তখন নারদ মুনি তার ভক্তির প্রশংসা করতে লাগলেন।  তখন সেই রাজা বললেন, আমি ভক্ত নই, প্রকৃত ভক্ত হচ্ছেন স্বর্গের দেবরাজ ইন্দ্র।  তিনি ভগবানের এতো প্রিয় ভক্ত যে ভগবান তাঁর ছোট ভাই বামনদেবরূপে আবির্ভূত হয়েছেন, এবং স্বহস্তে তাঁর নিবেদন গ্রহণ করেছন।

তখন নারদ মুনি ইন্দ্রের কাছে গিয়ে তাঁর প্রশংসা করতে লাগলেন।  ইন্দ্র বললেননা, আমি ভক্ত নই।  আমি কতো অন্যায় করি, কতো ভুল করি।  তার ফলে আমি ভগবানের বিরুদ্ধাচরণ করি- এই বলে ইন্দ্র আক্ষেপ করতে লাগলেন যে, আমি যদি ভগবানের ভক্ত হতাম তাহলে কি এই সমস্ত কার্যগুলো করতে পারতাম।  ভগবানের কতো বিরুদ্ধাচরণ করেছি।  সেজন্য ভগবান আমার প্রতি অত্যন্ত রুষ্ট হয়েছেন।  তাহলে আপনি কেন বলছেন যে, আমি ভগবানের একমাত্র কৃপার পাত্র।  প্রকৃত ভক্ত হচ্ছেন ব্রহ্মা। তিনি বিশ্লেষণ করতে লাগলেন, কেন ব্রহ্মা হচ্ছেন শ্রেষ্ঠ ভক্ত?   

নারদ মুনি ব্রহ্মার কাছে গিয়ে তার ভক্তির মহিমা কীর্তন করতে লাগলেন।  তা শুনে ব্রহ্মা অত্যন্ত লজ্জিত এবং রুষ্ট হয়ে নারদ মুনিকে তিরস্কার করে বললেন, আমি কতবার তোমাকে বলেছি,  আমাকে শ্রেষ্ঠ ভক্ত বলে কখনও বলো না।  আমি কতো ভুল করি।  কত সময় ভগবানের কত অসুবিধার কারণ হয়েছি।  অসুরদের বর দিয়েছি, তার ফলে সেই অসুরেরা কত উৎপাত করেছে।  ভগবানকে এসে তাদের সংহার করতে হয়েছে।  সত্যিই যদি আমি ভক্ত হতাম, তাহলে আমি কি ভগবানের সঙ্গে এই রকম করতাম।  এই বলে ব্রহ্মা তার ভক্তির অক্ষমতা প্রকাশ করলেন।  ব্রহ্মা তখন বললেন, মহাদেব হচ্ছেন শ্রেষ্ঠ ভক্ত।

নারদ মুনি তখন মহাদেবের কাছে গিয়ে তাঁর গুণকীর্তন শুরু করলেন।  তখন মহাদেব নারদ মুনিকে বললেন- এইভাবে তিনি যেন লজ্জা না দেন।  কেননা তিনি প্রকৃত ভক্ত নন।  ভগবান কৃপা করে তার সমস্ত ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দেন।

তিনি ভগবানের ভক্ত হওয়া তো দূরের কথা, নানাভাবে ভগবানের অসুবিধার সৃষ্টি করেন।  এমনকি তিনি ভগবানের সঙ্গে যুদ্ধ পর্যন্ত করেছেন।  তার পূজাতে বিরুদ্ধ পক্ষ অবলম্বন করে তিনি ভগবানের বিরুদ্ধে গেছেন।  এই ভাবে মহাদেব আক্ষেপ করে বললেন, প্রকৃত ভক্ত হচ্ছেন বৈকুন্ঠবাসী গণ।  তিনি বিশ্লেষণ করতে লাগলেন, কেন বৈকুণ্ঠবাসীরা শ্রেষ্ঠ ভক্ত।  তখন পার্বতীদেবী বললেন, না-না, বৈকুন্ঠ ভক্তদের মধ্যে আবার শ্রেষ্ঠ হচ্ছেন লক্ষ্মীদেবী।

নারদ মুনি তখন বৈকুণ্ঠে যাবার জন্য উদ্যত হলেন।  মহাদেব তখন তাঁকে বললেন, বৈকুণ্ঠের ভক্তদের থেকেও শ্রেষ্ঠ ভক্ত হচ্ছেন প্রহ্লাদ মহারাজ এবং তিনি প্রহ্লাদ মহারাজের ভক্তির মহিমা কীর্তন করতে লাগলেন।

তখন নারদ মুনি সুতল লোকে গিয়ে প্রহ্লাদ মহারাজের ভক্তির মহিমা কীর্তন করতে লাগলেন।  প্রহ্লাদ মহারাজ বললেন, আমার ভক্তি কোথায়?  শৈশব অবস্থায় শিশুরা যে রকম কোন কিছুর প্রতি আকৃষ্ট হয়, সেই রকমভাবে আমিও ভগবানের প্রতি একটু আকৃষ্ট হয়েছিলাম এবং সেটা প্রকাশ করেছিলাম।  কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমার ভক্তি নেই।  কেননা আমি যদি ভক্ত হতাম তাহলে ভগবানের সেবা করতাম।  কিন্তু আমি ভগবানের কোন সেবা করিনি।  পক্ষান্তরে, আমাকে শিশু দেখে ভগবান বার বার রক্ষা করেছিলেন।  প্রকৃত ভক্ত  হচ্ছেন হনুমান এবং হনুমান নিষ্ঠা সহকারে ভগবানের সেবা করেছিলেন।

তখন নারদমুনি হনুমানের কাছে গিয়ে হনুমানের মহিমা কীর্তন করতে শুরু করলেন।  তা শুনে হনুমান কাঁদতে লাগলেন।  কাঁদতে কাঁদতে বললেন, এমনিতেই শ্রীরামচন্দ্রের বিরহে আমার হৃদয় বিদীর্ণ হচ্ছে, আর আপনি এসে এইভাবে কেন সেই বিরহের বেদনাটিকে আরও বেশি করে উত্তপ্ত করছেন।  এই বলে হনুমান কাঁদতে লাগলেন।  আমি যদি সত্যি ভগবানের কৃপাপাত্র হতাম তাহলে কেন ভগবান তাঁর সঙ্গ থেকে বঞ্চিত করলেন।  আমি তাঁর বিরহে আকুল হয়ে রয়েছি।  ভগবানের প্রকৃত কৃপাপাত্র হচ্ছেন পাণ্ডবেরা।  ভগবান নানাভাবে তাদের রক্ষা করেছেন, সঙ্গদান করেছেন।

নারদ মুনি তা শুনে তখন হস্তিনাপুরে গেলেন।  পাণ্ডবদের স্থানে সেখানে গিয়ে তিনি যখন পাণ্ডবদের গুণ মহিমা বর্ণনা করতে লাগলেন, তখন পাণ্ডবেরা লজ্জিত হয়ে বললেন- না- না, আমরা ভগবানের ভক্ত কোথায়?  আমরা তো ভগবানকে নানা রকম অসুবিধায় ফেলেছি।  আমাদের জন্য ভগবানকে কতো কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে।  আমাদের তিনি বিপদ থেকে কতো ভাবে রক্ষা করেছেন।  ভগবানের প্রকৃত আপনজন, প্রকৃত কৃপাপাত্র হচ্ছেন যাদবেরা।  তারা ভগবানের এতো ঘনিষ্ঠ, ভগবানের এতো প্রিয় যে, ভগবান তাদের নিজের আত্মীয় বলে মনে করেন।

নারদমুনি তখন দ্বারকাতে গেলেন যাদবদের ভক্তি দর্শন করতে।  তিনি সুধর্ম সভায় গিয়ে যাদবদের ভক্তিমহিমা বর্ণনা করতে লাগলেন।  তখন তারা বললেন যে শ্রেষ্ঠ ভক্ত হচ্ছেন উদ্ধব।  তখন নারদমুনি উদ্ধবের দর্শনের জন্য কৃষ্ণের প্রাসাদের অন্তঃপুরে গিয়ে উদ্ধবের মহিমা কীর্তন করতে লাগলেন।  তখন উদ্ধব বললেন, না-না, আমি ভক্ত কোথায়? অবশ্য একটা সময় আমি ভাবতাম যে, আমিও ভগবানের মহান ভক্ত।  কিন্তু কৃষ্ণ যখন আমাকে  চিঠি দিয়ে গোপীদের কাছে বৃন্দাবনে পাঠিয়েছিলেন তখন আমি বুঝতে পেরেছি  যে, তারাই হচ্ছেন শ্রেষ্ঠ ভক্ত।

নারদ মুনি দেখলেন, কৃষ্ণ তখনও মাথা থেকে পা পর্যন্ত চাদর দিয়ে ঢেকে শুয়ে আছেন।  রোহিণী মাতাসহ সমস্ত মহিষীরা এবং বলরাম সেখানে আছেন। তারা পরস্পরের মধ্যে বলাবলি করছেন, যে কৃষ্ণ রাত্রিতে ব্রজের স্বপ্ন দেখে হৃদয়ে এতো ব্যথিত হয়েছেন যে, বিছানা থেকে ওঠেননি।  তাই ব্রজবাসীদের বিরহে তিনি কাঁদছেন।  তখন রোহিণীদেবী বললেন, ব্রজবাসীদের প্রতি যদি কৃষ্ণের এতোই বিরহ বা আকুলতা থাকে, তাহলে কৃষ্ণ বৃন্দাবনে যায় না কেন?  আর ব্রজবাসীরাও তাঁর বিরহে এতে ব্যথিত হয়ে আছে।

রুক্মিণীদেবী বললেন, কৃষ্ণ দিনের বেলায় সব সময় অন্যমনস্ক হয়ে থাকেন।  মনে হয় যেন তাঁর দেহটি এখানে রয়েছে, কিন্তু মনটি পড়ে আছে বৃন্দাবনে।  রাত্রেও ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কৃষ্ণ ব্রজবাসীদের কথাই কেবল বলেন।  অর্থাৎ দিনের বেলায় কৃষ্ণ অন্যমনস্ক থাকেন আর রাত্রে বৃন্দাবনের স্বপ্ন দেখেন এবং বৃন্দাবনে চলে যান।  সেখানে কৃষ্ণ সখাদের সঙ্গ দেন।  তাঁর গাভীদের নাম ধরে ডাকেন, মা-বাবাদের ডাকেন।

বলরাম তখন বললেন, এটি কৃষ্ণের কপটতা।  ব্রজবাসীদের কৃষ্ণ কেন এইভাবে ব্যথিত করে রেখেছেন?  কেন তিনি সেখানে যাচ্ছেন না?  তখন কৃষ্ণ কাঁদতে কাঁদতে বললেন, (বিছানা থেকে উঠে) আমি যদি পারতাম তাহলে এখুনি চলে যেতাম।  কিন্তু আমি যেতে পারছি না।  এই বলে তিনি বলরামের গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন।  বলরাম এবং কৃষ্ণ মূর্ছিত হয়ে পড়লেন।  তাদের মূর্ছিত হতে দেখে সমস্ত অন্তঃপুরবাসীরা উচ্চস্বরে ক্রন্দন করতে শুরু করেন।

ক্রন্দন শুনে উগ্রসেন প্রমুখেরা সুধর্ম সভা থেকে কি হয়েছে, কি হয়েছে বলে ছুটে এলেন।  তখন ব্রহ্মা গরুড়কে ডেকে বললেন,  তুমি কৃষ্ণ এবং বলরামকে পিঠে চড়িয়ে নব বৃন্দাবনে নিয়ে যাও।  নব বৃন্দাবন সমুদ্রের মধ্যে একটা দ্বীপে অবস্থিত।  বিশ্বকর্মা বৃন্দাবনের মতো একটা নব বৃন্দাবন সৃষ্টি করেছেন।  সেখানে সমস্ত ব্রজবাসীরা আছেন, সমস্ত গাভীরা আছে।  ঠিক যেন সেই বৃন্দাবন।  ব্রহ্মা তখন গরুড়কে বললেন, কৃষ্ণ-বলরামকে নব বৃন্দাবনে নিয়ে যেতে।

তখন গরুড় কৃষ্ণ-বলরামকে তাঁর পিঠে তুলে নিয়ে নব বৃন্দাবনে গেলেন।  বলরামের মূর্ছা ভঙ্গ হলে ব্রহ্মা বলরামকে বললেন, কৃষ্ণকে গোপবেশ পরিয়ে দিতে।  বলরাম কৃষ্ণকে গোপবেশ পরিয়ে দিলেন।  অর্থাৎ হাতে তাঁর মোহন বাঁশি, পরনে পীতাম্বর, মাথায় শিখিপুচ্ছ, গলায় মালা দ্বারা কৃষ্ণকে সাজিয়ে দিলেন।  ঠিক গোপ বেশ।  বলরাম তখন কৃষ্ণকে ডেকে তুললেন।  কৃষ্ণ ঘুম থেকে উঠলেন।  উঠে দেখলেন সূর্য তখন মধ্য গগনে।  কৃষ্ণ বললেন, আমি কি এতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলাম? বলরামকে বললেন, জানো দাদা, এক মজার স্বপ্ন দেখেছি।  আমি স্বপ্ন দেখেছি যে, আমি কোন একটা জায়গায় গিয়ে রাজা হয়ে গেছি এবং সেখানে ১৬,০০০ রাজকন্যার সঙ্গে আমার বিবাহ হয়েছে।

বলরাম তখন কৃষ্ণকে বললেন, চলো অনেক দেরি হয়ে গেছে।  সকলে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে, গোচারণে যেতে হবে।  কৃষ্ণ তখন দেখলেন, মা যশোদা সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন।  মা যশোদা কৃষ্ণকে কিছু বলছেন না দেখে কৃষ্ণ বললেন, মা তুমি কি আমার উপরে রাগ করেছো, এতো বেলায় উঠলাম বলে?  এভাবে কৃষ্ণ তাঁর সঙ্গে কথা বলছেন, বলরাম তাড়া দিচ্ছেন চলো।  তখন কৃষ্ণ বলরামের সঙ্গে ছুটতে লাগলেন।  কিন্তু রাধারাণীকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে তাঁকে প্রাণেশ্বরী বলে সম্বর্ধনা এবং আলিঙ্গন করলেন।  তা দেখে নারদ মুনি তখন বুঝতে পারলেন যে, এই ব্রজবাসীরাই হচ্ছেন শ্রেষ্ঠ ভক্ত এবং তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছেন রাধারাণী।  এইভাবে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শিক্ষা সনাতন গোস্বামী নিরূপণ করলেন।  শ্রেষ্ঠ ভক্ত কে? শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন যে, শ্রীমতী রাধারাণী হচ্ছেন শ্রেষ্ঠ ভক্ত।  কিন্তু কেন, কিভাবে, কোন্ যুক্তিতে, কোন্ প্রমাণে রাধারাণী শ্রেষ্ঠ ভক্ত, শ্রীল সনাতন গোস্বামী উপরোক্ত বর্ণনার মাধ্যমে সেগুলি প্রতিষ্ঠা করলেন।

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s