বেদ ও প্রাচীন ভারতের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য (নিয়মিত পর্ব-২৫)


ওঁ তৎ সৎ

এর আগে বলা হয়েছিল যে চার্বাকরা বলছে বেদ যারা লিখেছে তারা হচ্ছে- ত্রয়ী বেদস্য কর্তার ধূর্ত ভ্রষ্ট নিশাচরঃ। যখন বেদের ব্যাপারে কিছু বলতে হয় তখন সারা দেশ মীমাংসকরা যেটা বলছে সেটাকেই অনুসরণ করে। পূর্বমীমাংসদের বিখ্যাত দার্শনিকের নাম হচ্ছে জৈমিনি। তিনি সূত্র আকারে বেদের বিষয়ে লিখে গেছেন, এর নাম হচ্ছে মীমাংসাসূত্র। এর প্রথম সূত্রই হচ্ছে- অথাতো ধর্ম জিজ্ঞসা-আমরা এখন ধর্মের ব্যাপারটা জানব। চার্বাকদের বিরুদ্ধে মীমাংসকরা দুটো বড় যুক্তি নিয়ে এলেন। হিন্দুধর্মের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে বেদের বিরুদ্ধে যত ধরণের আক্রমণ হয়েছিল তাকে আটকাবার জন্য যে সব যুক্তিগুলিকে আনা হয়েছিল সেই যুক্তি গুলি আজ থেকে তিন হাজার বছর আগেই একটা নির্দিষ্ট ছকে দাঁড় করান হয়ে গিয়েছিল। তার ফলে এখন কারুর পক্ষে কোন প্রকার বেদবিরুদ্ধ কথা বলা বা বেদের বিরুদ্ধে কোন নতুন যুক্তি কে দাঁড় করান একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার। মানুষের ভোগের ব্যাপার আগেও ছিল এখনও রয়েছে আর চিরদিনই মানুষের ভোগাকাঙ্খা থাকবে। সুতরাং যারা ভোগী তারা যোগীদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে এটা কোন নতুন ব্যাপার নয়। ভোগীদের মধ্যেও অনেক বড় বড় তাত্ত্বিক নেতারা ছিলেন আর তাদের বেদবিরুদ্ধ যুক্তি গুলিকে মারত্মক রকমের শক্তিশালী ছিল। এই যুক্তিগুলী খণ্ডন করার জন্য মীমাংসকরাও আর জোড়ালো যুক্তি দাঁড় করালেন। বেদ হচ্ছে জ্ঞানরাশি, আর জ্ঞানকে কখনই মানবজাতির পক্ষে তৈরী করা সম্ভব নয়। আমরা আবিষ্কার করতে পারি, জানতে পারি কিন্তু মাধ্যাকর্ষণের মত একটা নিয়মকে আমরা বানাতে পারব না। এখন নিউটন এসে এই মাধ্যাকর্ষণের নিয়মটাকে আবিষ্কার করে তিনি কতকগুলি সিদ্ধান্ত করে নিলেন। পরে আইনষ্টাইন এসে নিউটনের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে আরো কয়েকটা নতুন সিদ্ধান্ত দিয়ে নিয়ে এলে Laws of relativity, এতে কি মাধ্যাকর্ষণের নিয়মের কোন পরিবর্তন হবে? কক্ষণই হবে না। মাধ্যাকর্ষণ নিয়ম যেমন চলছিল সেই একই নিয়মে চলতে থাকবে, বিজ্ঞানীদের নিজেদের সিদ্ধান্তের পরিবর্তন হয়েছে মাত্র। সুতরাং বেদ হচ্ছে সেই জ্ঞান, তত্ত্ব যা অনাদিকাল থেকে চলে আসছে তাই বেদকে বলা হচ্ছে সনাতন আর অনন্ত। দ্বিতীয় যে যুক্তিটা মীমাংসকরা নিয়ে আসেন তা হচ্ছে মানুষ যখন কিছু রচনা করে তখন সেখানে নিজের নাম অবশ্যই দেবে। আজকে যদি আমি আপনি কিছু রচনা করে নাম না দিয়ে আমাদের বন্ধু বান্ধবদের শুনিয়ে দিলাম। তারপর যদি এই রচনাটা জনপ্রিয় হয়ে যায় তখন আমার বন্ধু বান্ধবরা বলবে যে ‘এটা আমার এক বন্ধুর রচনা’। কিন্তু বেদের কোথাও আজ পর্যন্ত এইভাবেও কোন ধরণের একটা নামেরও উল্লেখ আমাদের নজরে পড়বে না। বেদের যে এত বিশাল কাণ্ড, যত পুঁথি এখনও যা হারিয়ে, নষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও অবশিষ্ট রয়েছে, তাতেই একটা বিশাল ঘরে সঙ্কুলান হবে না। কিন্তু কোথাও একটা কারুর নাম পাওয়া যাবে না যে এগুলো কে রচনা করে গেছেন? এটা পরিষ্কার বোঝে যাচ্ছে যে একজনের পক্ষে এই বিশাল বেদকে রচনা করা সম্ভবই নয়। তবে ভাষাকে বিশ্লেষণ করে ভাষাবিদরা বলছেন যে বেদ বিভিন্ন সময়ে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। আবার কিছু মন্ত্র ইন্দ্রের, কিছু মন্ত্র বরুণ, অগ্নি এই রকম বিভিন্ন দেবতাদের উদ্দেশ্য। যেটা থেকে বোঝা যায় যে বেদ একজন লোকের কাজ নয়। এখন বেদ যদি অনেক লোকের কাজ হয়ে থাকে তাহলে একজন লোক হয়তো ধাপ্পা দিতে পারে যে আমার নাম দিলাম না যাতে কেউ জানতে পারে যে আমি ধাপ্পা দিচ্ছি কিন্তু এত লোক কখনই এই একই ভাবে ধাপ্পা দিতে পারে না। মীমাংসকরা চার্বাকদের বিরুদ্ধে এই যুক্তিই দিচ্ছে- যখন কেউ কিছু রচনা করে তখন সে তার নাম দিয়ে দেয়। বাল্মিকী যখন রামায়ণ রচনা করলেন তিনি নিজেই তাঁর নাম উল্লেখ করে দিয়ে বলেছেন- আমি এর রচয়িতা। ব্যাসদেব প্রথমে বেদের পুনর্বিন্যাস করে বলে দিলেন- বেদকে আমি এইভাবে বিন্যাস করে দিয়েছি মাত্র। কিন্তু পরে তিনি মহাভারত রচনা করে বললেন আমি মহাভারত রচনা করেছি। ভাগবতের ক্ষেত্রেও তিনি বললেন এটা আমার রচনা। সবাই নাম ব্যবহার করছেন কিন্তু বেদের ক্ষেত্রে কোন নাম কেউ ব্যাবহার করলেন না। যখন কোন নিন্মমানের রচনা হয় তখন তার সাথে নিজের নামকে যুক্ত করতে না চাওয়াটা অযৌক্তিক মনে হবে না, কিন্তু সেই অর্থে বেদকে বেদবিরোধিরাও কেউ কখন কোন দিন স্বপ্নেও নিন্মমানের রচনা মনে করবে না। তাহলে কেন ঋষিরা তাঁদের নামকে বেদের সঙ্গে যুক্ত করলেন না?
ক্রমশঃ

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s