ভাগবত-কৃপায় হৃদয় শুদ্ধ হয়


ভাগবত-কৃপায় হৃদয় শুদ্ধ হয়

Related image

আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য
কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ

নষ্ট-প্রায়েষ্বভদ্রেষু নিত্যং ভাগবত-সেবয়া।  সমস্তটা পরিস্রুত হয়নি।  প্রায়, অর্থাৎ পঁচাত্তর শতাংশ পরিষ্কৃত হয়েছে।  তখন তুমি ভগবৎ সেবায় দৃঢ় সংলগ্ন হয়েছ, নৈষ্ঠিকী।  ভগবৎ সেবার বিভিন্ন স্তর আছে।  সে-সব আমি বহুবার আলোচনা করেছি।  সর্ব প্রথম হল, শ্রদ্ধা, সাধু-সঙ্গ, ভজন-ক্রিয়া, অনর্থ-নিবৃত্তিস্যাৎ।  সকল অনাকাঙ্ক্ষিত বস্তুর অবসান হলেই নিষ্ঠা, দৃঢ় বিশ্বাসের সূত্রপাত হবে।  ভগবত্যুত্তম-শ্লোকে ভক্তির্ভবতি নৈষ্ঠিকী।  সুতরাং যতক্ষণ পর্যন্ত মলিনতা থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের কৃষ্ণের প্রতি বিশ্বাস ও কৃষ্ণভক্তি সুদৃঢ় হবে না।  মাঝে মাঝে আমরা পথ-ভ্রষ্ট হব।  আর যখন আমাদের এই পঁচাত্তর শতাংশ আবিলতা দূর হবে তখনই আমাদের ভগবৎ-বিশ্বাস সুদৃঢ় হবে।

উত্তম বলতে বোঝায় উদ্গত-তম।  এই জড় জগৎ অন্ধকারময়।  কৃষ্ণ এই জড় জগতের ঊর্ধ্বে।  তাই তাঁকে পরা বলা হয়।  পরা অর্থ  অলৌকিক।  কৃষ্ণের কাছে আমাদের প্রার্থনার ভাষা সাধারণ শব্দের ভাষা নয়।  সেই জন্য যারা মুক্ত আত্মা নয়, তারা প্রকৃতপক্ষে কোন প্রার্থনা নিবেদন করতে পারে না।  সাধারণ লোকের নয়, মুক্ত আত্মা নিবেদিত প্রার্থনাই আমাদের পুনরাবৃত্তি করতে হবে।  কারণ সাধারণ লোকেরা এখনও উত্তম পদবাচ্য হয়নি, এখনও তাদের অপার্থিব স্তরে উন্নয়ন হয়নি।  সেই কারণে যে সকল সঙ্গীত শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর ও শ্রীল নরোত্তম দাস ঠাকুরদের মতো মুক্ত আত্মাদের দ্বারা  গাওয়া হয়নি সেগুলিকে আমরা আনুমোদন দেই না।  মুক্ত আত্মাদের দ্বারা অনুমোদিত নয় তেমন কোন সাহিত্যও আমাদের কাছে অননুমোদিত।  সাহিত্য সর্বদা বৈদিক নিয়ম মেনে চলে।  প্রকৃত অপার্থিব সাহিত্য হল বেদ।  বৈদিক সাহিত্যের নির্দেশে উৎপন্ন যে কোন সাহিত্যই সুন্দর, নিখুঁত।  কাজেই যখনই আমরা কিছু লিখি তখনই আমরা বৈদিক প্রমাণ দিই।  সংস্কৃত শ্লোকেরও উদাহরণ দেওয়া হয়।  এর কারণ হল আমরা নিজেরা যে কিছু বানিয়ে বলছি না তার প্রমাণ দেওয়া। পরম্পরা পদ্ধতিতে উচ্চতর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আমরা যা শুনেছি, শুধু তাই আমাদের নিজের ভাষায় উপস্থাপন করছি।  তার প্রমাণ এই বৈদিক শ্লোক।  বেদ হল পূর্ণাঙ্গ সাহিত্য।

কোন খেয়াল বশে কৃষ্ণ সম্বন্ধে কিছু কবিতা আমরা লিখতে পারি না।  সেটা সম্ভব নয়।  তাতে ক্ষতি সাধন হবে ।  শ্রীল রূপ গোস্বামী বলছেন,

শ্রুতি-স্মৃতি-পুরাণাদি পঞ্চরাত্রবিধিং বিনা।
ঐকান্তিকী হরের্ভক্তিঃউৎপাতায়ৈব কল্পতে॥

বেদের দ্বারা সমর্থিত নয় এমন কোন ভক্তিপূর্ণ অনুভূতি, শ্রুতি….শ্রুতি অর্থ বেদ এবং স্মৃতি হল বেদের অনুসিদ্ধান্ত, বা বৈদিক ধারণার সমর্থনে যা কিছু লেখা হয়….তাকে বলে স্মৃতি।  তেমনই ভগবদ্গীতা হল স্মৃতি।  ভগবদ্গীতার উদ্দেশ্য বেদের উদ্দেশ্যের সমতুল্য হলেও এটা কিন্তু প্রত্যেক্ষভাবে বেদ নয়।  তাই ভগবদ্গীতাকে স্মৃতি বলে।  শ্রুতি-স্মৃতি-পুরাণাদি।  আঠারোটি পুরাণ আছে।  পুরাণাদি বলতে রামায়ণ, মহাভারতকেও বোঝায়।  শ্রুতি-স্মৃতি-পুরাণাদি-পঞ্চরাত্রবিধিং বিনা। পঞ্চরাত্র বিধি হল নারদ মুনি প্রদত্ত বিগ্রহ-উপাসনার বিধি। পঞ্চরাত্রবিধির নিয়মেই আমরা বিগ্রহ-উপাসনা করছি।  শ্রীল রূপ গোস্বামী বলেছেন যে, ‘‘কোন ভগবৎ সেবার সঙ্গে যদি শ্রুতি, স্মৃতি, পুরাণ ও পঞ্চরাত্রের সম্পর্ক না থাকে তবে সেটা শুধু বিঘ্নসৃষ্টিকারীই হয়।’’ আমরা কিছু সৃষ্টি করতে পারি না।  মাঝে মাঝে আমাদের প্রশ্ন করা হয়, ‘‘আমরা কি এটা করতে পারি?  আমরা কি ওটা করতে পারি? ’’ এটা অবশ্যই ভাল।  কিন্তু কোন ধারণা সৃষ্টি করার প্রয়োজন নেই।  যে সব ধারণা আগে থেকেই রয়েছে, কঠোরভাবে তারই অনুসরণ কর।

অতএব ভগবত্যুত্তমশ্লোকে ভক্তির্ভবতি নৈষ্ঠিকী।  সেই দৃঢ় নিবদ্ধ ভক্তির প্রয়োজন।  কখনও এদিক, কখনও ওদিক দোলায়মান ভক্তি নয়।  একনিষ্ঠ ভগবৎ সেবার দ্বারাই এটা সম্ভব হতে পারে, নিত্যং-ভাগবত-সেবয়া, নিয়মিত ভাগবত-গ্রন্থ ও মহাভাগবতের অর্চনার দ্বারা।  ভগবান সম্বন্ধে প্রকৃতভাবে কিছু না শুনে, কিভাবে আমরা ভক্তিনিষ্ঠ হই?  সুতরাং  আমাদের শুনতে হবে, শৃণ্বতাং স্ব-কথা কৃষ্ণঃ।  কৃষ্ণ-প্রদত্ত কৃষ্ণ-কথা।  যেমন ভগবদ্গীতা।  স্ব-কথার অর্থ হল ‘‘তাঁর নিজের কথা।’’  এই হল ভাগবত।  এবং শ্রীমদ্ভাগবতও স্ব-কথা- নিজের কথা।  পুরাণগুলিও স্ব-কথা।  কারণ এই সমস্ত গ্রন্থই শ্রীল ব্যাসদেব প্রদত্ত।  ব্যাসদেব হলেন কৃষ্ণের অবতার।  তাই এটাও স্ব-কথা।  কাজেই কৃষ্ণ-প্রদত্ত কৃষ্ণকথা আমাদের শুনতে হবে।  ভগবদ্গীতা, ভাগবত এবং অন্যান্য পুরাণ ও বৈদিক সাহিত্য সবই কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসদেব প্রদত্ত।  আর এই পদ্ধতির শিক্ষাগুরু হলেন শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য মহাপ্রভু।  অতএব দেখা যাচ্ছে সব কিছুই কৃষ্ণের।  প্রত্যক্ষভাবে কৃষ্ণ, ব্যাসদেবরূপী কৃষ্ণ, শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ভক্তরূপী কৃষ্ণ।

এটাই আমাদের অনুসরণ করতে হবে।  শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য, প্রভু নিত্যানন্দ, শ্রীঅদ্বৈত, গদাধর. শ্রীবাসাদি গৌরভক্তবৃন্দ।  কৃষ্ণই শিক্ষা দিচ্ছেন কিভাবে কৃষ্ণ সমীপে যেতে হয়।  সেটাই আসল।  অন্য কোন পন্থা আমরা গ্রহণ করতে পারি না।  এটাই অনুমোদিত পন্থা।  সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে তিনি শিক্ষা দিচ্ছেন কিভাবে কৃষ্ণপূজা করতে হয় এবং কিভাবে ভক্ত হতে হয়।  কৃষ্ণায় কৃষ্ণচৈতন্যনাম্নে।  নমো মহাবদান্যায় কৃষ্ণপ্রেম প্রদায়তে।  ‘‘তুমি কৃষ্ণপ্রেম বিতরণ করছ।’’  সাধারণ লোকের পক্ষে কিভাবে সম্ভব এটা?  কিন্তু কৃষ্ণ, কারণ শুধু কৃষ্ণচৈতন্যের নামের মধ্যে আছেন বলেই তুমি কৃষ্ণ।  তাই তোমার জিনিষ, তুমিই শুধু তা বিতরণ করতে পার।’’

শৃণ্বতাং স্ব-কথাঃ কৃষ্ণঃ পূণ্য-শ্রবণ-কীর্তনঃ।
হৃদ্যন্তঃস্থো হ্যভদ্রাণি বিধুনোতি সুহৃৎ সতাম্ ॥

নষ্ট- প্রায়েষ্বভদ্রেষু।  সম্ভবত সামান্য, সবটা নয়।  তবুও প্রারম্ভে কিছু ত্রুটি থাকলেও আমরা যদি আমাদের ভক্তিকে কৃষ্ণের প্রতি নিবদ্ধ করি….ভগবদ্গীতায় এটাও প্রতিপন্ন হয়েছে।

অপি চেৎ সুদুরাচারো ভজতে মামনন্যভাক্।
সাধুরেব স মন্তব্যঃ সম্যগ্ ব্যবসিতো হি সঃ ॥
ক্ষিপ্রং ভবতি ধর্মাত্মা শশ্বচ্ছান্তিং নিগচ্ছতি।
কৌন্তেয় প্রতিজানীহি ন মে ভক্তঃ প্রণশ্যতি॥

প্রথমে আইন-বিধি মেনে চলার ব্যাপারে আমাদের আন্তরিক হতে হবে, খুবই আন্তরিক।  কিন্তু অতীতের অভ্যাসবশতঃ যদি কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়, সেটা ক্ষমা করা যায়।  ইচ্ছাকৃত ত্রুটি হলে তা হবে না।  কারণ কোন কিছুতে আমি অভ্যস্ত ছিলাম এবং বর্তমানে কৃষ্ণভাবনামৃতে অভ্যস্ত হলেও মাঝে মাঝে অতীত অভ্যাস কিছু প্রকাশ হয়ে পড়ে।  তাই কৃষ্ণ বলেছেন, ‘‘ঠিক আছে, যথাসাধ্য চেষ্টা কর।  এটা সংশোধিত হবে।’’  ক্ষিপ্রং ভবতি ধর্মাত্মা।  ‘‘খুব শীঘ্র, তুমি ধর্মাত্মা, নিখুঁত, অতীব আচারনিষ্ঠ হবে।’’  শশ্বচ্ছান্তিং নিগচ্ছতি ‘‘তুমি শান্তি ও প্রশান্তির স্তরে উন্নীত হবে।’’ কৌন্তেয় প্রতিজানীহি ন মে ভক্তঃ প্রণশ্যতি- ‘‘কোন আন্তরিক ভক্ত ব্যর্থ হবে না।  সে অবশ্যই উন্নতি করবে।’’  কিন্তু যদি অন্য কোন উদ্দেশ্য থাকে, তবে সে ব্যর্থ হবে।  সেখানে মায়ার অস্তিত্ব আছে।  মায়া হল ঠিক আলো-আঁধারির মাতো, পাশাপাশি এদের অবস্থান।  এই আলো-আঁধারির তটস্থ রেখা কিছুটা অতিক্রম করলেই অন্ধকার।  তেমনই, অন্ধকার থেকে আলোর রেখা সামান্য অতিক্রম করলেই তুমি আলোর রাজ্যে পৌঁছাবে।

কাজেই কৃষ্ণ ও মায়া পাশাপাশি অবস্থিত।  কৃষ্ণকে ভুলে গেলেই বা নিজের ইন্দ্রিয় উপভোগের কাজে কৃষ্ণকে ব্যবহার করলেই মায়া, অন্ধকার।  আবার যখনই কৃষ্ণের সেবা করতে ইচ্ছুক হবে, সঙ্গে সঙ্গে সব আলো।  তাই আমরা যদি আলোর মাঝে থাকতে চাই তবে অবশ্যই আমাদের সর্বদা কৃষ্ণসেবা করতে হবে।  তখন আর আমাদের মায়ার সংস্পর্শে আসার কোন সম্ভাবনা নেই।

দৈবী হ্যেষা গুণময়ী মম মায়া দুরত্যয়া।
মামেব যে প্রপদ্যন্তে মায়ামেতাং তরন্তি তে॥

এই মায়া খুবই শক্তিশালী।  সূর্য সামান্য পথভ্রষ্ট হলে সারা বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড ঘনীভূত হয়, জমাট বেঁধে যায় এবং অন্যদিক সামান্য সরে গেলে গোটা ব্রহ্মাণ্ড বহ্নিমান হয়।  এই হল অবস্থা।…..আমাদের অবস্থা হলো তটস্থা। তাই আমাদের তটস্থা শক্তি বলা হয়।  আমরা অন্ধকার দিকেও থাকতে পারি আলোর দিকেও থাকতে পারি।  কিন্তু কৃষ্ণভাবনামৃত অর্থ হল সর্বদা আলোর দিকে থাকা।  সর্বদা হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র  জপ করে কৃষ্ণচিন্তা করলে আমরা নিজেদের আলোর দিকে রাখতে পারব।  আর যখনই আমরা ইন্দ্রিয় সুখ-ভোগের চিন্তা করব তখনই আমরা অন্ধকারে নিমজ্জিত হব।  সেই জন্য আমাদের খুবই সতর্ক থাকতে হবে যাতে আমরা অন্ধকারে পতিত না হই। নিত্য ভাগবত সেবার দ্বারা আমরা আমাদের আলোর মাঝে ধরে রাখতে পারব।  শুধুমাত্র শ্রীমদ্ভাগবত, ভগবদ্গীতা পাঠ করে, হরেকৃষ্ণ মন্ত্র জপ করে কৃষ্ণ উপলব্ধি করতে চেষ্টা কর।

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s