বেদ ও প্রাচীন ভারতের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য (নিয়মিত পর্ব-২৭)


ওঁ তৎ সৎ

বেদের শব্দগুলো ধ্যানের গভীর থেকে এসেছে, একটা মন্ত্র, একটা শব্দ আসছে সেইটাই তাঁরা নিজেদের শিষ্যদের যখন দিচ্ছেন তখন তাঁরা নিজেদের নাম নিচ্ছেন না। একবারেই যে নাম নিতেন না তা নয়, আমরা যদি এখান থেকে ইতিহাসের দিকে একটু এগিয়ে আসি তাহলে দেখতে পাব যে বৈশাম্পয়নের খুব নামকরা শিষ্য ছিলেন যাজ্ঞবল্ক্য তিনিও ছিলেন একজন খুব নামকরা ঋষি। একবার কোন একটা ঘটনায় গুরুর সাথে যাজ্ঞবল্কের ঝগড়া হয়ে যায়। একবার গুরুর অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির জন্য একটা গোহত্যা হয়ে গেছে। এখন তার জন্য প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। গুরু তখন যাজ্ঞবল্ক্যকে প্রায়শ্চিত্তের জন্য যজ্ঞের আয়োজন করতে বললেন। যাজ্ঞবল্ক্য তখন গুরুকে বললেন- হে গুরুবর, আপনার কাছে একটা কথা আমি নিবেদন করতে চাই। আপনার শিশ্যরা সবাই অল্প বয়সী, এই ধরণের যজ্ঞের ব্যাপারে খুবই অপটু, আপনি আমার উপরে সব ভার দিয়ে দিন আমি একাই সব সুন্দর ভাবে ব্যাবস্থা করে দিচ্ছি, আপনি কোন চিন্তা করবেন না। যাজ্ঞবল্কের এই কথা শুনে গুরু খুব রেগে গেলেন- তোমার এত অহঙ্কার! আর তুমি আমার শিষ্যদের এতো ছোট করলে! তোমাকে আমি যা কিছু শিখিয়েছি সব আমাকে ফেরত দিয়ে যাও। যজ্ঞবল্ক্যও খুব অপমানিত বোধ করলেন, তিনি মনে মনে ভাবলেন- যে গুরু নিজের শিষ্যকে বুঝতে পারে না, বুঝতে চায় না, এই রকম গুরুর শিষ্য হয়ে থেকে আমার কাজ নেই। যাজ্ঞবল্ক্য খুব তেজস্বী ছিলেন। এখন গুরুর কাছ থেকে লব্ধ জ্ঞান তাঁকে ফেরত দিয়ে দিতে হবে। তখন যাজ্ঞবল্ক্য পুরো যোগশক্তি লাগিয়ে বেদের যত জ্ঞান পেয়েছিলেন বমি করে তিনি সেটাকে বার করে দিলেন। এমন গুরু আর এমন বিদ্যাও আমি চাইনা। এখনতো মহা সমস্যা হয়ে গেল। যাজ্ঞবল্ক্য ছিলেন বৈশাম্পায়নের প্রধান শিষ্য, আর তিনি বৃদ্ধও হয়ে গেছেন। কেননা বেদ হচ্ছে গুরু-শিষ্য পরম্পরা বিদ্যা, এখন গুরু যেটা শেখাল শিষ্য সেটাকে থু করে ফেলে দিল, এখন কি হবে? যে বিদ্যাটা আমি শিষ্যকে দান করলাম সেটাতো নষ্ট হয়ে যাবে। তখন বৈশাম্পয়ন ঋশি তাঁর বাকি শিষ্যদের বললেন তোমরা তিতির পাখি হয়ে যাজ্ঞবল্ক্য যে বিদ্যাটা বমি করে দিয়েছে সেই বমিটা খেয়ে নাও। কেননা মানুষতো আর বমি খেতে পারেনা, পাখিরা খেতে পারে, তাই তাদের তিতির পাখি হয়ে বমিটা খেয়ে নিতে বলা হয়েছিল। এইভাবে যাজ্ঞবল্কের গুরুভাইদের মধ্যে বেদের জ্ঞানটা এসে গেল। তিতির পাখি হয়ে এরা এই বিদ্যাটা পেয়েছিল বলে বেদের এই শাখাটাকে বলা হয় তৈত্তিরীয় শাখা। এই তৈত্তিরীয় শাখা থেকেই তৈত্তেরীয় উপনিষদ এসেছে। আর এটা বমি করা বিদ্যা বলে এর নাম হয়ে গেল কৃষ্ণযজুর্বেদ, কেননা এই বিদ্যার মধ্যে সেই আগের শুদ্ধতা থাকল না বলে কৃষ্ণ বলা হয়েছে। আর যাজ্ঞবল্ক্য গুরুকে ত্যাগ করে বলল-এমন গুরুর আমার দরকার নেই, কোন মানুষকে আমি আর গুরু করব না, সাক্ষাৎ ভগবানই আমার গুরু হবেন। সেই আশ্রম পরিত্যাগ করে তিনি সূর্যোপসনা করতে থাকলেন। পরে সূর্য একটা বাজপাখি হয়ে যাজ্ঞবল্ক্যকে সে যে বিদ্যা বৈশাম্পায়নের কাছ থেকে পেয়েছিলেন সেই বিদ্যাটাই নতুন করে শিখিয়ে দিলেন। যাজ্ঞবল্ক্য আবার বেদের পণ্ডিত হয়ে গেলেন। তিনি যে বিদ্যাটা পেলেন তার নাম হয়ে গেল শুক্লযজুর্বেদ, যেহেতু সূর্য থেকে এই বিদ্যাটা এসেছিল তাই এর নাম হয়ে গেল শুক্ল, আবার বাজপাপাখির কাছ থেকে শ্রবণ করেছিলেন বলে এর আরেকটা নাম বাজশনীয় সংহিতা, বাজপাখি হচ্ছে শক্তির প্রতীক। শুক্ল আর কৃষ্ণ যজুর্বেদের মন্ত্রগুলি মোটামুটি একই, শুধু এদের বিন্যাসটা অন্য রকম।
এই কাহানীতে আমরা বেদের যে বৈশিষ্ট্যকে পাচ্ছি তা হল বেদ হচ্ছে পুরোপুরি একটা মুর্ত্ত রূপ। এ কারণে এই কাহিনীটাকে অবতারণা করা হল, ঋষিরা কোথাও নাম নিতেন না, কিন্তু কোন কোণ ক্ষেত্রে যে ওনারা নাম ব্যবহার করেননি তা নয়, এইখানে শুক্লযজুর্বেদের ক্ষেত্রে যাজ্ঞবল্ক্য বলছেন- এই বিদ্যাটা আমি পেয়েছি। অথচ তাঁর আগে যাঁরা ছিলেন তাঁদের নাম কেউই জানে না। যাজ্ঞবল্ক্য কি পেয়েছিলেন? যে বিদ্যাটা তিনি আগে পেয়ছিলেন সেটাকেই তিনি আবার পুনরায় উদ্ধার করে বললেন আমি পেয়েছি। আমরা অদি অশুদ্ধ মনে বলি- যাজ্ঞবল্ক্য এখানে একটু কায়দা মেরে ঐখান থেকে নিয়ে পরে নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছে। তাই যদি হত, তাহলে বৈশাম্পয়ন ঋষি কি যাজ্ঞবল্ক্যকে ছেড়ে দিতেন? আমরা আজকে এই প্রশ্ন গুলি করতে পারি, কিন্তু কই, তখনকার দিনেতো কেউ কোন রকম প্রশ্ন এই ব্যাপারে যাজ্ঞবল্ক্যকে করেনি। এই কারণে অনেকে চারটে বেদের জায়গায় পাঁচটা বেদ বলেন- যখন যজুর্বেদে আসবে তখন তারা এটাকে দুইভাগে বিভক্ত করে বলে শুক্লযজুর্বেদ ও কৃষ্ণযজুর্বেদ।
ক্রমশঃ

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s