শ্রবণ দিয়ে শুরু, শেষে সর্বাত্মসমর্পণ


শ্রবণ দিয়ে শুরু, শেষে সর্বাত্মসমর্পণ

আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য
কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ
(১০ মে, ১৯৬৯ আমেরিকার ওয়াহো রাজ্যের কলাম্বাস শহরে শ্রীল প্রভুপাদের কক্ষে প্রদত্ত সংলাপ থেকে সংকলিত)

prabhupada
আমরা সকলে ব্রহ্ম।  অহং ব্রহ্মাস্মি।  আমাদের প্রত্যেকেই, জীবমাত্রই ব্রহ্ম।  কিন্তু সবার উপরে রয়েছেন পরমব্রহ্ম।  ঠিক যেমন এখানে সকলেই আমেরিকান, কিন্তু সকলের উপরে রয়েছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট, পরম প্রধান আমেরিকান।  বোঝা গেল? ঠিক তেমনই, শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরম ব্রহ্ম।  আপনারা সকলে ব্রহ্ম কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ সকলের ঊর্ধ্বে পরম ব্রহ্ম।  পরিষ্কার হলো?  বেশ, ঠিক আছে।

এই সমস্ত কথা আমি যখন আমার গুরুদেবের কাছে বসে শুনতাম, তখন বাস্তবিক আমি প্রথম দিকে তাঁর কথা বুঝতে পারতাম না ।  অতি উচ্চ স্তরের দার্শনিক কথা।  আর আমি ছিলাম খুবই অল্পবয়সী নতুন ছেলে।  তাই তাঁর কথা বুঝতাম না, কিন্তু সত্যি সত্যিই তাঁর মুখনিঃসৃত ব্যাখ্যা শুনে আমার ভারি আনন্দ হতো।  ব্যস্, তাতেই হতো।  অতএব সেইটাই ছিল আমার যোগ্যতা কিংবা যা কিছু বলা যেতে পারে।

আমি গুরুদেবের আশ্রমে গেলেই কেবল জিজ্ঞাসা   করতাম, ‘গুরুমহারাজ  কখন প্রবচন দেবেন?  কখন তিনি পাঠ করবেন?  কখন?’  আর সেখানে বসে পড়তাম আর সমস্ত কথা চুপ করে শুনতে থাকতাম।  সেই সমস্ত কথা আমি বুঝতাম কী না-ই বুঝতাম- সবাই উঠে চলে যেত আমি চলে যেতাম না।

এই ব্যাপারটা গুরুদেব লক্ষ্য করতেন।  হ্যাঁ, প্রথম দিকে একটা ঘটনা ঘটেছিল।  সেই সময়ে আমার তখনও দীক্ষা গ্রহণ করা হয়নি।  তখন একবার সমগ্র বৃন্দাবন পরিক্রমার আয়োজন করা হয়েছিল।  তাই, আমি যদিও তখনও দীক্ষিত হইনি, তবুও আমি ঐ পরিক্রমার বিশিষ্ট ভক্তদের মধ্যে ভিড়ে গিয়েছিলাম।  আমি ভাবলাম, ‘যাই না, এই সমস্ত লোকগুলো কিভাবে সারা বৃন্দাবন পরিক্রমা করেন, তা দেখতে হবে তো?’

অতএব ঐ পরিক্রমার মাধ্যমে আমি মথুরা গিয়েছিলাম।  তারপর বৃন্দাবনের অভ্যন্তরে যে জায়গাটির নাম কোশী, সেখানে গিয়েছিলাম।  সেখানে ঐ কোশীতে আমার এক গুরুভ্রাতা জানালেন যে, শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর প্রভুপাদ আগামীকাল মথুরায় ফিরছেন।  তাই আজ সন্ধ্যায় তিনি প্রবচন দেবেন।  যারা তাঁর মুখের কথা শুনতে চায়, তারা থাকতে পারে। অনেকে শেষশায়ী মন্দির দেখতে যাবে ঠিক করেছিল।  আমি পরিক্রমার দলে নতুন ভক্ত হলেও শেষশায়ী মন্দির  দেখতে যেতে আমি ইচ্ছা করিনি।  আমি ঠিক করলাম, আমি গুরুদেবের কথা বসে বসে শুনব।

তখন আমি ছিলাম নতুন।  অন্য সকলের মধ্যে কিছু প্রধান গুরুভ্রাতাদের সঙ্গে আমিও গুরুদেবের প্রবচন শুনতে বসেছিলাম, যেমন এখানে সকলে বসে গিয়েছে।  তা হলে, দেখতে হবে, তিনিও লক্ষ্য করেছিলেন, ‘এই ছেলেটি নতুন এসেছে।’  সবাই চলে গেছে, কয়েকজন মাত্র বসে রয়েছে, কিছু প্রবীণ গুরুভাইরা রয়েছেন।  তাঁদের মধ্যে গুরুদেব আমাকে লক্ষ্য করেছিলেন যে, এই ছেলেটি আমার কথা শুনবে বলে আগ্রহ নিয়ে বসে রয়েছে।

এই শোনাটাই আসল কাজ, শ্রবণ।  ঠিক যেমন অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের মুখের কথা মন দিয়ে শুনেছিলেন।  আমার জীবনেও তেমনি গভীর গুরুত্ব দিয়ে শুনতাম, এবং তাই আমি আজ গুরুত্ব দিয়ে কীর্তন করছি, মানে, প্রবচন মাধ্যমে ভগবানের গুণকীর্তন করছি, অর্থাৎ তাঁর মাহাত্ম্য প্রচার করছি।  যা বলছি, নিশ্চয়ই বুঝতে পারা যাচ্ছে?

অতএব শ্রবণে যিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন, ভবিষ্যতে তিনি চমৎকারভাবে প্রচারকার্যে ব্রতী হতে পারেন।  শ্রবণং কীর্তনং।  শ্রবণ করলে তার পরবর্তী পর্যায়ের যে করণীয় ব্রত- কীর্তন, তার বিকাশ সাধন  হয়।  শ্রবণের মাধ্যমেই কীর্তনের যোগ্যতা আয়ত্তাধীন হয়ে থাকে।  কেউ যদি বাস্তবিকই সুন্দরভাবে শ্রবণ করে, তবে সে সুন্দরভাবে বক্তব্য বলতেও পারে।   শ্রবণং কীর্তনং স্মরণং।  শ্রবণ আর কীর্তন চর্চার মধ্যে দিয়েই আপনা হতে শুদ্ধ চেতনার বিকাশ ঘটতে থাকে, কারণ আমরা যখন ভগবানের কথা শুনি কিংবা বলি, তখন আপনা হতেই আমাদের শুদ্ধ চেতনা পর্যায়ক্রমে বিকাশ লাভ করতে থাকে।  মন যদি একাগ্র না থাকে, চেতনা যদি শুদ্ধ না থাকে, তবে কেউ যথাযথভাবে শুনতে কিংবা কিছু বলতে পারে না।

শ্রবণং কীর্তনং স্মরণং পাদসেবনম্ ।  পরবর্তী পর্যায় হল- কিভাবে পরব্রহ্ম শ্রীকৃষ্ণের সেবা সম্পাদন করা যায়।  শ্রীকৃষ্ণ এত প্রীতিপূর্ণ, শ্রীকৃষ্ণ এত মহান- এই সমস্ত  ভাবধারা তখন আপনা হতে জাগতে থাকে  কেবলমাত্র নীরবে নয়, কাজে-কর্মেও পাদসেবনম্ মানে ভগবানের চরণ বন্দনার সেবাকার্য যেই মাত্র শুরু হয়, তখনই ভক্তিময় ক্রিয়াকর্ম চলতে থাকে।  তৎক্ষণাৎ।

এইভাবে সবশেষে আসে সর্বাত্মসমর্পণম্ ।  ঠিক বলী মহারাজের মতো।  দিচ্ছেন, দিচ্ছেন, দিচ্ছেন, দিচ্ছেন, দিচ্ছেন, দিচ্ছেন।  তখন বামনদেব বললেন, ‘এখন, বলী মহারাজ আপনি সব কিছু হারিয়ে ফেলেছেন।  এখনও আমার আরও একটি পদক্ষেপ বাকি রয়েছে।’

‘হ্যাঁ, তার জন্য এই তো একটি জায়গা বাকি রয়েছে।  এই যে আমার মাথাটি বাকি রয়েছে।  আসুন।’- বলী মহারাজ মাথা পেতে দিয়েছিলেন, আত্মসমর্পণ করেছিলেন তিনি ভগবানের কাছে।

বামনদেবকে বলী মহারাজ বলেছিলেন, ‘আপনি তো আমাকে কিনে নিয়েছেন।  তাই আমি আপনার সেবক হয়ে রইলাম চিরকালের জন্য।’

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবা-দাসত্ব করলে কোনই লোকসান নেই, লাভই হয় কেবল।  চিরকালের জন্য, অনন্তকালের জন্য লাভ জমা হয়ে থাকে।  সেই লাভের যে মূল্য কী পরিমাণ, তা আমরা এখনই জানতে পারি না, কারণ আমরা জড় বাসনার আবরণে ঢাকা পড়ে রয়েছি।  আমরা মনে ভাবি- শ্রীকৃষ্ণের সেবা বুঝি জড় জগতের অন্যান্য সেবাগুলির মতো।   জড় জগতের সেবা তো মায়ামাত্র।  কেউ তাতে খুশি হবে না, কেউ না।  জড় জাগতিক সেবা দিয়ে কাউকে সন্তুষ্ট করা যায় না, তাতে নিজেরও সন্তুষ্টি হয় না।  তার সেরা নিদর্শন তো আমেরিকা দেশেই রয়েছে।

আমেরিকান প্রেসিডেন্ট কেনেডি আমেরিকানদের কতভাবে সেবা করেছিলেন আর তার পরিণামে তো আমেরিকানরা তাঁকে হত্যা করেছিল।  আমেরিকাবাসীদের মধ্যে থেকেই কেউ আমেরিকার সর্বপ্রধান সেবক তথা রাষ্ট্রপতিকে গুলিবিদ্ধ করেছিল।  তার অর্থ এই যে, আমেরিকাবাসীরা তাঁর সেবার মর্যাদা দেয়নি- তাঁর সাধ্যমতো তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ সেবাই দিয়েছিলেন।

তেমনি, জড় জগতেও মানুষ মানুষকে যা কিছু সেবাই করে, তা সবই কেবল সময় নষ্ট করা।  কিন্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্যে সেবা নিবেদন করলে মানুষ নিজে সন্তুষ্ট হয়,  শ্রীকৃষ্ণ সন্তুষ্ট হন এবং যেহেতু শ্রীকৃষ্ণ সন্তুষ্ট হন, তাই প্রত্যেকেই সন্তুষ্ট হন।

2

সুতরাং কৃষ্ণকথা শ্রবণ, কৃষ্ণকথা আলোচনা, কৃষ্ণলীলা স্মরণ, শ্রীকৃষ্ণের সন্তুষ্টিবিধানের উদ্দেশ্যে বাস্তবিক কোনও সেবাকার্য সম্পন্ন করা, পূজা-অর্চনা, ভক্তজনের সাথে সখ্যতা এবং এক কথায় বলতে গেলে, আমরা যা কিছু করব, তা সবই ভগবান শ্রীকৃষ্ণেরই প্রীতি সাধনের উদ্দেশ্য নিয়ে করব।  এমন মনোভাব হৃদয়ে সদা জাগরূক রেখে সব কিছুই কৃষ্ণভাবনামৃত আস্বাদনের আশায় করতে পারলে তবেই জীবন সার্থক হবে।  সেটাই হবে জীবনের পরম সার্থকতা।

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s