সব কিছুই কৃষ্ণকে নির্ভর করে বিদ্যমান


সব কিছুই কৃষ্ণকে নির্ভর করে বিদ্যমান

Image result for srila prabhupada

আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য
কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ
(শ্রীমদ্ভাগবত ৭/৯/২০, মায়াপুর ২৭ ফেব্রুয়ারী ১৯৭৬)

ধনঞ্জয় : ‘‘হে প্রভু, এই জড় জগতে সকলেই সত্ত্ব, রজ এবং তমো গুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে জড়া প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণাধীন।  ব্রহ্মা থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র পিপীলিকা পর্যন্ত সকলেই এই গুণের বশীভূত হয়ে কর্ম করে।  তাই, এই জড় জগতে সকলেই আপনার প্রকৃতির বশীভূত।  যে কারণে তারা কর্ম করে, যে স্থানে তারা কর্ম করে, যে সময়ে তারা কর্ম করে, যে পদার্থ নিয়ে তারা কর্ম করে, তাদের জীবনের যে উদ্দেশ্য সাধনের উপায়–তা সবই আপনার শক্তির প্রকাশ।  প্রকৃতপক্ষে যেহেতু শক্তি এবং শক্তিমান অভিন্ন, তাই এই সমস্ত কর্মই আপনার শক্তিরই রূপ মাত্র।

sp11

শ্রীল প্রভুপাদ :

যস্মিন যতো বর্হি যেন চ যস্য যস্মাদ্
যস্মৈ যথা যদুত যস্ত¡পরঃ পরো বা।
ভাবঃ করোতি বিকরোতি পৃথক স্বভাবঃ
সঞ্চোদিস্তদখিলং ভবতঃ স্বরূপম্ ॥
(ভাঃ ৭/৯/২০)

বৈদিক ভাষায় একথা সংক্ষেপ করে বলা হয়েছে- সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম।  কৃষ্ণ ছাড়া কোন কিছুরই অস্তিত্ব নেই।  ভগবদ্গীতাতেও বলা হয়েছে- ময়া ততম্ ইদং সর্বম্ ।  যা কিছুই আমরা দেখি, তা সে খুব উৎকৃষ্ট বা অপকৃষ্টই হোক, ভাল বা মন্দ হোক, সবই কৃষ্ণ থেকে এসেছে।  মন্দ বিষয়গুলিও কি কৃষ্ণ থেকে এসেছে ?  হ্যাঁ, মন্দ বিষয়ও কৃষ্ণ, কেননা কৃষ্ণ ছাড়া কোন কিছুর অস্তিত্বই সম্ভব নয়।  কোন সত্তাই সম্ভব নয়।  মৎ স্থানি….ময়া ততম্ ইদং সর্বম্ জগদব্যক্ত মূর্তিনা মৎস্থানি সর্বভূতানি….. (গীতা ৯/৪)

krishna

সব কিছুই কৃষ্ণকে নির্ভর করে বিদ্যমান।  ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম–এই জড়া শক্তিগুলোও কৃষ্ণশক্তি।  ভিন্না মে প্রকৃতিরষ্টধা।  তারাও কৃষ্ণের শক্তি।  বিপরীত উপাদানগুলিও।  ঠিক যেমন উষ্ণতা এবং শৈত্য।  তারা তো বিপরীতধর্মী।  শীতোষ্ণ।  শীত মানে শীতকাল।  আর উষ্ণ মানে গ্রীষ্ককাল।  গরম এবং ঠাণ্ডা।  বাস্তবিকভাবেও আমরা দেখি যে একজন পারদর্শী ইলেকট্রিশিয়ান একই বিদ্যুৎশক্তির মাধ্যমে হীটার এবং কুলার চালাচ্ছেন।  বিদ্যুৎশক্তির মাধ্যমে কুলারও চলছে হীটারও চলছে।  সাময়িকভাবে, উষ্ণতা শৈত্যের বিপরীত এবং শৈত্য উষ্ণতার বিপরীত।  কিন্তু উভয়েই একই শক্তির মাধ্যমে কাজ করছে:  এটা শুধু একজন পারদর্শী ইলেকট্রিশিয়ানের নিয়ন্ত্রণের ব্যাপার।

তেমনি ভগবান একজন এবং তাঁর শক্তিও এক।  শক্তি এবং শক্তিমানের মধ্যে কোন ভেদ নেই।  ঠিক যেমন আগুন এবং উত্তাপ।  উত্তাপকে আগুন থেকে পৃথক করা যায় না।  তবুও আগুন কিন্তু উত্তাপ নয়।  উচ্চ তাপে আমার শরীর গরম হতে পারে, কিন্তু আগুন থাকলে আমার দেহ পুড়ে যাবে।  আগুন আর উত্তাপ যদিও একই জিনিস, তবুও তাদের কার্য ভিন্ন।  সুতরাং সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত- সর্বেদমখিলং জগৎ পরস্য ব্রহ্মণঃ শক্তি।  পরস্য মানে হচ্ছে ‘‘পরম ব্রহ্মের’’।  পরম ব্রহ্ম হচ্ছে কৃষ্ণ।  ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ (ব্রহ্মসংহিতা ৫/১)।  অর্জুনও শ্রীকৃষ্ণকে পরমব্রহ্ম বলে স্বীকার করেছেন।  সুতরাং সবকিছুই শ্রীকৃষ্ণ। তাই কৃষ্ণ বলেছেন- ময়া ততমিদং সর্বং জগদব্যক্তমূর্তিনা  (গীতা ৯/৪)।   সৃষ্টির সর্বত্রই আমি ব্যাপ্ত আছি।  অব্যক্ত মূর্তিনা।  কিন্তু তুমি শ্রীকৃষ্ণকে দেখতে পাচ্ছ না।

আমরা জানি এখানে বায়ু রয়েছে।  ইথার, আলোক, উষ্ণতা–এ সবকিছুই রয়েছে, আমরা এসব অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝতে পারি, প্রত্যক্ষ করতে পারি।  কিন্তু অব্যক্ত মূর্তিনা–কৃষ্ণ তো অব্যক্ত নির্বিশেষ বলে মনে হয়।  নিরাকার আর সাকারের মধ্যে এই হচ্ছে পার্থক্য।  কিছু কিছু দার্শনিক রয়েছেন যারা মনে করেন, পরম সত্য হচ্ছে ব্যক্তি।   আবার আর একদল দার্শনিক মনে করেন পরম সত্য হচ্ছে নিরাকার নির্বিশেষ।  কিন্তু আমরা যারা চৈতন্য মহাপ্রভুর অনুগামী, আমরা উভয় সত্যই স্বীকার করি।  তিনি একই সঙ্গে সবিশেষ ব্যক্তি এবং নির্বিশেষ–যুগপৎ।

একে বলা হয় অচিন্ত্য ভেদাভেদ তত্ত্ব।  এ এক চমৎকার দর্শন।  আমাদের খুব সুষ্ঠুভাবে ব্যাকরণগত পার্থক্য বুঝতে হবে।  কী তার নাম?  কর্তা।  সংস্কৃতে কী বলা হয়?  কারক!   কর্তৃ কারক, কর্ম কারক, ইত্যাদি।  হ্যাঁ, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন কাজ করা হচ্ছে।  তাকে বলা হয় কারক।  কেউ কর্তারূপে কাজটি করছিল, অন্যটি হচ্ছে কর্ম, অপরটি হচ্ছে করণ, অন্যটি সম্প্রদান, আরেকটি হচ্ছে সম্বন্ধ।  এখানে এইভাবে তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে- যথা যেন যস্মে, যস্মাৎ।  এগুলি হচ্ছে কারক–কার্যের বিভিন্ন অবস্থা।  কিন্তু এই সমস্ত বিভিন্ন অবস্থাকে একটি মাত্র সত্যে সম্বন্ধিত করা যায়।  তা হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণ, ব্রহ্ম।  একো ব্রহ্ম দ্বিতীয় নাস্তি।  শুধু কৃষ্ণই আছেন, কৃষ্ণ ছাড়া আর কিছুই নেই।  কেউ যদি মনে করেন যে, কৃষ্ণ ছাড়াও আর কিছু রয়েছে–সেই ‘‘কৃষ্ণ ছাড়াও অন্য কিছু’’ই হচ্ছে মায়া।  আসলে কৃষ্ণ ছাড়া আর কিছুই নেই, কিন্তু আমাদের অপূর্ণ জ্ঞানের বশে আমরা মনে করি কৃষ্ণ ছাড়াও আর কিছু রয়েছে।  কৃষ্ণ ছাড়া আর কিছুই নেই।  কৃষ্ণ বলেছেন- ময়া ততমিদং।

অন্যত্র বলা হয়েছে যে,

এক দেশ স্থিতস্য অগ্নের্জ্যাৎস্না বিস্তারিণী যথা
পরস্য ব্রহ্মণঃ শক্তিঃ তথেদমখিলং জগৎ।

ঠিক যেমন এই লাইটটি এখানে রয়েছে, লাইটটি একটি নির্দিষ্ট স্থানে রয়েছে।  এই দৃষ্টান্তগুলি বোঝা খুব সহজ।  যেমন সকালবেলায় তোমরা সকলেই সূর্য দেখে থাক।  সেটি সেখানে রয়েছে–কিন্তু তার উত্তাপ এবং আলোক প্রসারিত হয়ে গেছে–তার দুই শক্তি। সূর্যের জ্যোতির সঙ্গে আমরা আলোক পাচ্ছি।  রাত্রে আমরা ঠাণ্ডায় কাঁপছি।  সুতরাং সূর্য থেকে দু’প্রকার শক্তি নির্গত হচ্ছে–আলোক এবং তাপ।  পদার্থবিদদের প্রাকৃতিক জগৎ সম্পর্কে সমগ্র অধ্যয়নই এই আলোক এবং তাপকে ভিত্তি করে–আর কিছুই নয়।

ঠিক সেই রকম–কৃষ্ণের দু’প্রকার শক্তি রয়েছে–আলোক এবং উত্তাপ।  এই জড় জগতে আমরা তাপ অনুভব করি।  কোন পরিবর্তন ছাড়াই সবকিছু সুন্দরভাবে চলছে।  ঠিক ৬টা ১৫ মিনিটে সূর্য উঠছে, সারাদিন কাজ করে চলছে, আবার ঠিক সন্ধ্যায় ৫টা ৩০ মিনিটে অস্ত যাচ্ছে।  তাই এই জড় জগৎটা হচ্ছে ঐ উত্তাপের মতো।  ঠিক যেমন আমি এখানে বসে আছি, আমি সঙ্গে সঙ্গে উত্তাপ বোধ করছি।  আমি উষ্ণতা বোধ করব।  কোথাও আগুন নিশ্চয়ই রয়েছে।  না হলে কোথা থেকে উত্তাপ আসছে ?  ‘‘দেখ তো কোথায় আগুন আছে।’’ যদি ধোঁয়া দেখা যায় তো বুঝতে হবে যে আগুন রয়েছে।

নৈনিতালে আমি বাস্তবিকভাবে তা প্রত্যক্ষ করেছি।  পাহাড়টা অনেক উঁচু এবং সেখান থেকে ধোঁয়া দেখা যাচ্ছিল।  তাই আমি স্টেশন মাস্টারকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘‘ধোঁয়া কেন ?’’  তিনি উত্তর দিয়েছিলেন,  ‘‘দাবানল জ্বলছে।’’ কেউ সেখানে আগুন লাগাতে যায় না, কিন্তু আগুন লেগে যায়।  ধোঁয়া দেখে মানুষ বুঝতে পারে, আগুন লেগেছে।

ঠিক তেমনি আলোক এবং উত্তাপ থেকে আমাদের কৃষ্ণের উপস্থিতি বুঝতে হবে।  দুটো শক্তি–জড় এবং চিন্ময়। চিন্ময় শক্তি মানে আলোক।  তুমি সরাসরি কৃষ্ণকে দেখতে পাবে।  তুমি তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারবে।  তুমি তাঁর সঙ্গে ভাবের আদান প্রদান করতে পারবে।  আর জড় জগৎটা হচ্ছে উত্তাপের মতো।  কৃষ্ণের শক্তিই কাজ করছে।  পরস্য ব্রহ্মণঃ শক্তিঃ।  কৃষ্ণের শক্তি ছাড়া কিভাবে সবকিছু ঠিক ঠাক চলছে?  তিনি নিজে তা ব্যাখ্যা করছেন।  তিনি বলেছেন ঃ ময়াধ্যক্ষেণ প্রকৃতি সূয়তে স চরাচরম্ (গীতা ৯/১০) মূর্খের মতো ভাববে না যে, এই জড় জগৎ নিজে নিজেই চলছে।  এটা মূর্খের মতো।  জড়া প্রকৃতি স্বাধীনভাবে চলছে না, আকস্মিকভাবে কাজ করছে না।

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s