পুরাণ নিয়ে আলোচনা- ১২


পুরাণ নিয়ে আলোচনা- ১২
পুরাণধর্মী শাস্ত্রের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য –


পুরাণের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা দিক হল, যা গত পর্বে কিছুটা আলোচনা করেছি, কোথাও একটা সত্য রয়েছে, সেটাকে কেন্দ্র করে একটা মিথ্‌ দাঁড় করানো। এই যে মিথ্‌ যাকে আমরা মাইথলজি বলছি, অনেক সময় একে মিথকও বলা হয়, এটাই পুরাণের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ একটা দিক। বাল্মীকি রামায়ণ আর মহাভারত হল ঠিক ঠিক কাব্যিক বর্ণনা, এই দুটোতে আমরা মিথ্‌ পাই না। যেমন কালিদাস একটি নারী চরিত্রের বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি নারীর সৌন্দর্য্যকে এমন একটা রূপ দিয়ে দাঁড় করাচ্ছেন, যে সৌন্দর্য আমার কোথাও খুঁজে পাবো না, কিন্তু তাকে আমরা মিথ্‌ বলতে পারবো না, তখন তা একটি কাব্যিক বর্ণনা হয়ে যাবে। মাইথলজিতে সাধারণ মানুষের কল্পনাকে পুরোপুরি ছাড়িয়ে যায়। মানুষের সৌন্দর্য্য বোধের একটা ধারণা আছে, সেই মানুষই নিজে চিন্তা ভাবনা করছে, কল্পনার জগতে বিচরণ করছে, আর এভাবেই সে তখন তার শরীরের কোন অঙ্গকে সরিয়ে দিবে, তার মানবীয় গুণকে বাদ দিয়ে দেবে অথচ কোথাও একটা মানব বা মানবীর আকার থেকে যাবে, তখনই তা মিথ্‌ হয়ে যাবে, তখন সেই মানবী হয়ে যাবে অস্পরা। যখনই অস্পরা হয়ে গেলে তখনই তা মাইথলজিতে চলে গেল, কারণ অপ্সরার মধ্যে সাধারণ নারীর সৌন্দর্য থাকল না। আবার ভীম, অর্জুন এই ধরণের অনেক চরিত্র আছে যাদের মধ্যে অনেক রকম গুণ ও ক্ষমতা দিয়ে দেওয়া হয়েছে, বীর, রণকৌশলে নিপুণ ইত্যাদি তখনও এই চরিত্রগুলো মাইথলিজিতে যাবে না, কাব্যিক বর্ণনার মধ্যেই থেকে যাবে। কিন্তু যখন মা দুর্গা, মা চামুণ্ডা যিনি হুঙ্কারেই লক্ষ লক্ষ দৈত্য দানব নাশ করে দিচ্ছেন তখন এটাই মাইথলজির পর্যায় চলে যাচ্ছে। বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে যবে থেকে সাহিত্য রচনা শুরু হয়েছে তার আগে থেকেই মানুষের মধ্যে মাইথলজির উপাদান রয়েছে। তাই প্রাচীন কাল থেকে সাহিত্যে কিছুটা কাব্যিক কিছুটা মিথ্‌ মিশিয়ে কাহিনী তৈরী হয়ে আসছে।
পুরাণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হল পুরাণের কাহিনীতে অতিপ্রাকৃত চরিত্রের প্রচুর সমাবেশ থাকবে। দেবী, দেবতা, অসুর, ভগবানের কথা যদি কোন সাহিত্যে না থাকে অথচ পৌরাণিক ভাব-ধারাকে বজায় রাখছে, তাহলে সেটাকে পুরাণ না বলে অন্য নামে বলা হবে। ছোটবেলা আমরা অনেকেই সিগুরেলার কাহিনী পড়েছি। সিগুরেলাকে পুরোপুরি কাব্যিক বর্ণনা বলা যাবে না, আবার এর মধ্যে মাইথলজির অনেক উপাদান পাওয়া যাবে। এই ধরণের কাহিনী আমাদের ঈশ্বরের পথে নিয়ে যাবে না বা তাতে ঈশ্বরীয় প্রসঙ্গ কিছু নেই, সেইজন্য এই কাহিনীগুলিকে বলা হয় কল্প কাহিনী।
ক্রমশঃ

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s