আষাঢ়ে প্রভু জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা


আষাঢ়ে প্রভু জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা
শ্রীমৎ নারায়ণ পুরী মহারাজ

রথযাত্রায় লোকারণ্য, মহা ধুমধাম। ভক্তেরা লুটিয়ে প্রণাম করছে। জগদীশ্বর জগন্নাথ অগ্রজ বলভদ্র ও ভগিনী সুভদ্রাকে সঙ্গে নিয়ে রথারোহণ করেছেন। তিনি মন্দিরের রত্নবেদী থেকে ভক্ত দর্শনে জনপথে নেমে এসেছেন। তিনি যে ভক্তাধীন, ভক্তপ্রিয়; ভক্তেরই ভগবান।
আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথির পুণ্যদিনে এই রথযাত্রা উৎসব হয় প্রতিবছর। জনতা জনার্দনের রথের রশি টেনে নিয়ে যায়। ভক্ত না হলে ভগবানের চলে না।
অন্তর্যামী চিরদিন অন্তরে থাকেন, লীলা করেন। এই সেই দেবতা যিনি জনারণ্যে বেরিয়ে আসেন। শাস্ত্রে আছে, ‘রথে তু বামনং দৃষ্টা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে’। হৃদয় গুহায় যে আত্মা বিরাজ করেন তাঁকে দেখলে পুর্নজন্ম আর হয় না। ‘পুনরপি জননং পুনরপি মরণং’ অর্থাৎ পুনরায় জননী জঠরে শয়ন আর হয় না।
তখন জন্ম মরণ থেকে চিরদিনের জন্য অব্যাহতি পায়। রথযাত্রা উৎসবের গভীরে এই তত্ত্বই অন্তর্নিহিত। কবির ভাষায় : রথ ভাবে আমি দেব/পথ ভাবে আমি/উভয়ের কথা শুনে হাসেন অন্তর্যামী।
চট্টলার বুকে পাহাড় শিখরে স’াপিত তুলসীধামে শ্রীশ্রী মদনমোহন নরসিংহ গোপাল জীও’র মন্দিরে জগন্নাথ-সুভদ্রা ও বলরামের শ্রী বিগ্রহ অনেক দিন থেকে নিত্য পূজিত।
১৮শ’ খৃষ্টাব্দের পর থেকে তুলসীধামে রথযাত্রা উৎসবের প্রচলন শুরু হয়। জগন্নাথ তো স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। রথযাত্রার এই শুভদিনে মহানির্বাণতীর্থ তুলসীধাম পরিণত হয় ভক্ত আর ভগবানের মহামিলন তীর্থে। শ্রীশ্রী জগন্নাথের দর্শন অভিলাষী হাজার হাজার আবালবৃদ্ধ ভক্তপ্রাণের সমাবেশ ঘটে। রথযাত্রা উৎসবের মূল কেন্দ্র শ্রীক্ষেত্র পুরীর পুরুষোত্তম ধাম। এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গ্রামে-গঞ্জে-নগরে জগন্নাথ রথ পরিক্রমায় বের হন।
পুরীধামে তিন দেবতা তিনটি রথে আরোহণ করেন। সবার পেছনের রথখানিতে থাকেন শ্রী জগন্নাথ। অন্যত্র একই রথে তিনজন। এই রথের রশি ধরার জন্য কতো হুড়োহুড়ি।
এসবের মূল বিষয় দেবতার কৃপা লাভ ও পুণ্য অর্জন। ঋষি শিল্প গভীর তত্ত্বাবগাহী। কে এই জগন্নাথ? তিনি জগতের নাথ বা প্রভু। জগতের ধারক, বাহক ও পরম পালক। তারপরের অবস’ানে সুভদ্রা। লৌকিক জগতে পরম প্রভু পুরুষোত্তমের ভগ্নি। সু অর্থ সুন্দর।
ভদ্র অর্থে কল্যাণ ও মঙ্গল। সুভদ্রা হচ্ছেন শুভ ও সুন্দরের প্রতীক। সুভদ্রার পরে বলরাম। বলরাম ত্রাণশক্তি। শ্রীমৎ ভগবৎ গীতা ও উপনিষদে পরব্রহ্মের স্বরূপ সম্বন্ধে বলা হয়েছে ‘সর্বেন্দ্রিয় গুণাভাসং সর্বেন্দ্রিয় বিবর্জিতম্‌’। ইন্দ্রিয়গ্রাম না থাকলেও তাঁর মধ্যে সব ইন্দ্রিয় ও গুণের আভাস আছে। ইন্দ্রিয় বিরহিত হয়েও তিনি সবকিছু দর্শন, স্পর্শ, শ্রবণ করতে পারেন। চরণ না থাকলেও সর্বত্র বিচরণ করতে পারেন।
যজুর্বেদের দু’টি ভাগ। শুক্ল যজুর্বেদ ও কৃষ্ণ যজুর্বেদ। কৃষ্ণ যজুর্বেদের অন্তর্গত কঠোপনিষদ হলো যম-নচিকেতা সংবাদ। যম নচিকেতাকে আত্মতত্ত্বের সংবাদ দিয়ে বললেন-‘‘আত্মানং রথিনং বিদ্ধি শরীরং রথমেবতু। বুদ্ধিং তু সারথি বিদ্ধি মন প্রগ্রহমেব চ ॥ ইন্দ্রিয়ানি হয়ানাঞ্চ বিষয়াংসে’ষু গোচরান। আত্মেন্দ্রিয় মনোযুক্ত ভোক্তত্যাহর্মনীষিনং ॥” অর্থাৎ, হে নচিকেতা! আত্মাকে রথী, শরীরকে রথ, বুদ্ধিকে সারথি, মনকে বল্গা ও ইন্দ্রিয়বর্গ সেই রথের অশ্ব এবং দেহ, মন ইন্দ্রিয়যুক্ত আত্মাই সব কিছুর ভোক্তা।
আমাদের জীবনের দুইদিকে আছে জীবাত্মা ও পরমাত্মা। জীবাত্মা ষড়রিপুর জালে জড়িয়ে পড়ে সবকিছু ভোগ করতে চায়। মন যদি বল্গাহারা, চঞ্চল ও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে তবে তার লাগাম টেনে ধরা চাই। মন বেপরোয়া হলে বিপদ ঘটে। মন ইন্দ্রিয়ের অধিপতি। ইন্দ্রিয়গ্রামের লাগাম টেনে না ধরলে সে রথচক্র দুরন্ত বেগে ছুটতে গিয়ে ভেঙ্গে পড়বে। দেহপুরে আত্মারূপে যিনি বিরাজ করেন তাঁকে জানাই দুঃখমুক্তি ও আনন্দ লাভের উপায়। রথের সারথি ভগবান যদি দেহরথখানি পরিচালনা করেন, সাধক তখন আনন্দ সাগরে ভাসেন। দেহমন তখন আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। যোগ সঙ্গীতের বর্ণনায় আছে-
দেহ কুরুক্ষেত্র মাঝে বিরাজে নর নারায়ণ,
দশদলে ধনঞ্জয় দ্বিদলে মধুসূদন।
কৌরবরা যত সৈন্য ইন্দ্রিয় রূপেতে গণ্য,
প্রকাশে যুদ্ধ নৈপুণ্য মানে না কারও শাসন।
দেহ ইন্দ্রিয় কোন শাসন মানতে চায় না। আপথে-বিপথে চলে আসক্তির কানা গলিতে পথ হারায়। আত্মশক্তির ক্ষয় করে ফেলতে চাইলেও দেহের ভগবৎ শক্তি বিরাজমান থাকে। সেই শক্তিকে চিনে নিতে পারার মধ্যে রয়েছে জীবনের সার্থকতা।
রথ থেমে যায়, যদি রথ সারথিবিহীন হয়। মন্দিরে যদি মাধব না থাকে তবে কোন পূজা চলে না। অপশক্তি ততদিন সক্রিয় থাকে, যতদিন ভগবানে আত্ম সমর্পিত হতে না পারি। কালের স্মরণী ধরে জগন্নাথের রথযাত্রা নিত্য চলছে। সে পথে দেহ রথকে পরিচালনা করার মধ্যে নিহিত আছে রথযাত্রার সফলতা।

লেখক : অধিপতি-ঋষিধাম,
মোহন্ত মহারাজ-তুলসীধাম, চট্টগ্রাম।

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s