বেদের পরিচয়-৯


বেদের পরিচয়-৯


গত পর্বে আমরা যে চার শ্রেণীর মানুষের কথা বলেছি ঐ চতুঃশ্রেণীর মানবগণের মধ্যে প্রথম শ্রেণীই সর্ব্বোত্তম এবং দ্বিতীয় শ্রেণীই সর্ব্বনিকৃষ্ট। মায়ার প্রলোভবে মুগ্ধ বদ্ধজীব অসৎ চিন্তা-হৃদয়দৌর্ব্বল্য-দ্বিতীয় অভিনিবেশ(গভীর মনঃসংযোগ)-দেহাত্মবুদ্ধি দোষ চতুষ্টয়ে আক্রান্ত হয়ে আহার-নিদ্রা-ভয়-মৈথুন আদি কার্য্যে ব্যস্ত। সুতরাং বেদসমুদ্রের নিন্মতমভাগে লুকায়িত পরমার্থরত্ন সংগ্রহে তাঁদের সময় কোথায়?- সময় থাকলেও আগ্রহ কোথায়? এবং কারও কারও আগ্রহ থাকলেও যোগ্যতা অভাবে সৎসাহস কোথায়? এ প্রকারের সর্ব্বস্বহারা মৃতপ্রায় বঙ্গসন্তানের যদি বেদ আলোচনায় কিঞ্চিৎ মাত্রও উৎসাহ জাগ্রত হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে যে আশার ক্ষীণ রেখা দৃষ্ট হবে তাতে আর সন্দেহ কি? যে ‘সুজলা-সফলা’ বঙ্গমাতার পুণ্যস্রোতে ভেসেছিল একদিন তাঁহার কৃতিসন্তানগণের গৌরব-গাথা, তাহার মূলে ছিল বেদানুরাগ। যে আর্য্যাবর্ত্তে একদিন গভীর ওঁকারে সামঝঙ্কারে কাঁপত দূর বিমান- যেখানে বেদ-ধ্বনিতে চেতনাচেতন জগৎ মুখরিত হোত- যে দেশের বেদগানের মূর্চ্ছনা সুপ্তহৃদয়েও দিব্যভাব উদ্দীপিত করত- যে পূত-বেদভূমির এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্ত পর্য্যন্ত দ্বিজগণ-মুখে উচ্চারিত ঋক-যজুঃ-সামমন্ত্র দিগন্ত সজীব করে ব্রহ্মাণ্ড ভেদপূর্ব্বক পরব্যোমের দিকে আনন্দের আবেগে জীবন-গতি পরিচালিত করত- যে ধর্মক্ষেত্রে যজ্ঞবেদীতে যাজ্ঞিক ঋত্বিক্‌-অধ্বর্য্যগণের অর্পিত আহুতি মন্ত্রের সাথে ধুমায়িত অগ্নির লেলিহান জিহবার অগ্রভাগ হতে এক দিব্যগন্ধ নিঃসৃত হয়ে ভূলোকবাসিগণকে পুলকিত ও দ্যুলোকবাসী দেবগণের আনন্দ বিধান করে যজ্ঞেশ্বর শ্রীহরির জয়গাঁথাকে সুষমাযুক্ত করে দিত, সেই বেদশাস্ত্রে কি নিগূঢ় তত্ত্ব আছে, তাহা জ্ঞাত হওয়া সকল শ্রেয়স্কামীরই নিত্য আবশ্যকীয় ব্যাপার।
শ্রেয়ঃ(মঙ্গল; ধর্ম; মোক্ষ) ও প্রেয়োভেদে(অভিপ্রেত; মনোমত, বাঞ্ছিত) জগতের বস্তু দ্বিবিধ। তারমধ্যে অনেকেই প্রেয়ের প্রার্থী-যা তাকে প্রীতি প্রদান করে, তাই বরণ করা জীবের স্বাভাবিকী বৃত্তি। কিন্তু বিচার্য্য বিষয় এই যে, জগতের প্রিয়বস্তু কি সর্ব্বসময়ে আমাদের নিকট হিতকর হয়? বস্তুতঃ বস্তু আমাদের বর্ত্তমান রসনার তৃপ্তি বিধান করে না; যেমন, রুগ্ন ব্যক্তি অম্ল মধুর সুস্বাদু খাদ্য গ্রহণ করতে আকাঙ্ক্ষা করেন, কিন্তু সেইপ্রকারের প্রিয়বস্তু যে তাঁহার মৃত্যুকে নিকটে আহবান করবে, তা তিনি বুঝতে পারেন না; আবার, সেই রুগ্ন ব্যক্তির রোগ আরোগ্য করার যোগ্য তিক্ত-ঔষধ তাঁর রসনার তৃপ্তি বিধান না করলেও অন্তিমে তাঁহার রোগ প্রশমিত করবে। এই বিশ্বে এমন কোন প্রাকৃতিক বস্তু লভ্য হয় না, যা সর্ব্বপ্রাণীর পক্ষে সর্ব্ব অবস্থায় যুগবৎ মধুর ও উপকারী। কিন্তু অনুসন্ধান করলে জ্ঞাত হওয়া যাবে যে, এক নিত্য-সুস্বাদু ও পরম মঙ্গলপ্রদ বস্তু গুপ্ত আছে ঐ বেদবাক্যের অন্তরালে।
ক্রমশঃ
@সৌজন্যে- শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা স্কুল

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s