বেদের পরিচয়- ১৩


বেদের পরিচয়- ১৩


পারমার্থিক আস্তিক হিন্দুগণ বেদের নিত্যত্ব ও উৎপত্তি সম্বন্ধে নানাবিধ শাস্ত্রপ্রমাণ মূলে গুরু পরম্পরায় বিশ্বাস ও স্বীকার করেন। আর অধ্যক্ষ কেবলমাত্র যুক্তিবাদী আরোহপথ অবলম্বী বেদ-বাদরত প্রাচ্য ও প্রতীচ্য পণ্ডিতগণ বেদের কাল-নির্ণয়ে বহু মত-মতান্তর উপস্থিত করেছেন। বেদের শিক্ষা, উদ্দেশ্য ও প্রতিপাদ্য বিষয় যখন নিত্য-সত্য বাস্তব-বস্তু ভগবান্‌, তখন অবাস্তব-রাজ্যের সীমাবদ্ধ ভূমিকায় দাঁড়িয়ে অসম্যক্‌ আরোহ-পথে বাহ্যিক প্রমাণ আদি দ্বারা বেদের সিদ্ধান্ত নিরূপণ বা কাল নির্দ্দেশ দ্বারা অজ্ঞ-সমাজে বিজ্ঞ বলে খ্যাতি অর্জ্জন বা তাহার সেই সময়কার ও প্রাকৃতিক ক্ষণভঙ্গুর আপেক্ষিক মূল্য থাকলেও পারমার্থিকগণ তাহার বিশেষ আদর করেন না। চিৎসাহিত্য ও জড়-সাহিত্য আলোচনা সমপর্য্যায়ে বিবেচিত হলে আকারে সামঞ্জস্য এবং বস্তুগত বিভেদত্ব নিবন্ধন জোনাকিপোকা অগ্নি-স্ফুলিঙ্গ-ভ্রমরূপ বিবর্ত্ত উৎপাদন করবে। ভ্রমপ্রমাদ-বিপ্রলিপ্সা-করণাপাটব দোষচতুষ্টয়যুক্ত পণ্ডিত-সমাজের জড়-সাহিত্যে আত্মশ্লাঘা শোভা পেলেও চিৎসাহিত্য-জগতে তাঁহারা কতটুকু স্থান পেতে পারেন, তাহার নিরপেক্ষ বিচার হওয়া আবশ্যক।
ভট্ট-মোক্ষ-মূলার, ম্যাক্‌ডোনাল্ড প্রভৃতি জড়-সাহিত্যিকগণের বেদ আলোচনার প্রভূত প্রচেষ্টা ভূয়সী প্রশংসাযোগ্য সন্দেহ নাই। কিন্তু বেদের নিগুঢ় তথ্য, সিদ্ধান্ত ও প্রতিপাদ্য বিষয়ের সুষ্ঠু জ্ঞান উপলব্ধি আর্য্য ঋষিগণেরই হয়েছিল। বেদ-গ্রন্থে লেখা অক্ষরে কোন সময়ে লিপিবদ্ধ হয়েছিল, সঠিক স্থিরীকৃত হলেও তা হতে বেদের সময় নির্দ্দেশ করা সম্ভব নয়। জড়-সর্ব্বস্ববাদের যুগে বহিঃপ্রজ্ঞা প্রচলিত পথে চলতেই মানবের স্বাভাবিকী বৃত্তি; সুতরাং কোনপণ্ডিত, বিশেষতঃ কোন বৈদেশিক আবার আমাদের জীবনসর্ব্বস্ব পরমার্থরাজ্যের বেদ-রত্ন সম্বন্ধে কি বলেন, তাহার আদর করতেই আমাদের প্রগাঢ় অনুরাগ। কিন্তু তত্ত্বতঃ বস্তুর অনুধাবন করার প্রবৃত্তি স্বল্প সংখ্যক লোকের হলেও, তা আদরণীয়। অদ্য যদি কোন বিষয়ের সংবাদ কোনও ব্যক্তি অন্য দশব্যক্তিকে বলেন এবং তারা যদি সেই শ্রুত কথা দশ বৎসর পরে লিপিবদ্ধ করেন, তাহলে যেমন পরবর্ত্তীকালের পাঠকগণ সেই দশ বৎসর পরে লিখিত সংবাদের উদয় কাল যে আজই, তাই বলবেন, এবং প্রথম লেখা হয়েছিল আজবধি দশ বৎসর পরে, তেমনি বেদের উৎপত্তিকাল বলে গেলে সৃষ্টির অভ্যুদয়ের প্রথমে ভগবৎকীর্ত্তিত ও ব্রহ্মার দ্বারা শ্রুত সময়কেই ইহ জগতে বেদের উৎপত্তির কাল নির্দ্দেশ করা যায়। পরে কোন্‌ সময়ে বেদব্যাস বেদ বিভক্ত করে লেখেছিলেন, এবং কোন্‌ সময়ে কোন্‌ ব্যক্তি কোন্‌ পুঁথিরূপে বেদমন্ত্র হস্তলিপিতে দিয়েছিলেন, তারসম্বন্ধে কতকগুলি প্রামাণিক এবং কতক আনুমানিক বলা যেতে পারে। যেমন, কেউ বলেন বেদের উৎপত্তি খৃষ্টপূর্ব্ব ২৪০০ বৎসর, কেউ বলেন খৃঃ পূর্ব্ব ২৬০০ বৎসর, কারও মতে খৃঃ পূঃ ৩০০০ বৎসর, আর কারও মতে ৩১০০ বৎসর। স্ব স্ব দেশে, সমাজ ও মনোবৃত্ত অনুয়ায়ী যাঁরা আরোহপন্থায় উক্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, তাদের আর্য্য বিচারধারা ও সল্কল্প পঠন বিদ্যার জ্ঞান থাকলে ঐ প্রকারে পরস্পরে বিরোধ সিদ্ধান্ত সম্ভব হতো না। বাহ্য বিচারে পুস্তক আকারে থাকলেই প্রত্যেক গ্রন্থের আলোচনা একটি পদ্ধতি অনুসারে গৃহীত হতে পারে না। রসায়নশাস্ত্র, পদার্থ বিদ্যাশাস্ত্র, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, সমাজ-নীতি, নাটক, উপন্যাস প্রভৃতি জড়-সাহিত্য যে প্রকারে শিক্ষা আলোচনা করা হয়ে থাকে সে প্রকারেই অপ্রাকৃত বিষয়ক চিৎসাহিত্য বিচার করতে গেলে সত্যের অপলাপ হবে।
ক্রমশঃ-

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s