কর্ম ও ভক্তি


কর্ম ও ভক্তি

কর্ম বলতে যে সকল কার্য্য লোকে ইহজন্মে ও পরজন্মে নিজ সুখভোগের আশায় করে কিংবা এই দেহকে ‘আমি’ বুদ্ধি করে এর সম্পর্কে যে যে ব্যক্তিকে আপনজ্ঞান করে, তাদের সুখের জন্য করে, সেগুলিকে বুঝায়। আর ভগবানের সেবা উদ্দেশ্য করে যা কিছু করা যায়, তাই ভক্তি। একই কার্য্য ক্ষেত্রবিশেষে কর্ম হতে পারে অন্য ক্ষেত্রে ভক্তি হতে পারে, কর্ত্তার চিত্তবৃত্তি অনুসারে তার কর্মত্ত্ব বা ভক্তাঙ্গত্ত্ব। স্বর্গকামনার বশে কৃত হয়, তখন সেগুলি কর্ম।

আমরা কর্মফল ভোগ করতে বাধ্য। কর্ম আমাদের বন্ধন যোগ্যতা বৃদ্ধি করে আমাদেরকে সংসার ভোগ করায়। কর্মে সুখের সঙ্গে সঙ্গে দুঃখও অনুস্যুত আছে। সংসারে এমন কোন সুখ নেই, যার পিছনে দুঃখ লুকিয়ে থাকে না। সংসারে সুখভোগে শান্তি নেই। ভোগ করলে কাম বাড়ে। আর কামনার অতৃপ্তিতে দুঃখ আছেই। নিরবিচ্ছিন্ন সুখ সংসারে থাকতেই পারে না। স্বর্গসুখেও তো কামনার শেষ নেই। ইন্দ্র-চন্দ্রকে পাপ কর্মে লিপ্ত হতে হয়। আবার পুণ্য শেষ হলে স্বর্গচ্যুত হয়ে অধঃপতিত হয়।

‘ভক্তিই আমাদের নীতিবৃত্তি। ভগবান নিত্য চিদঘনবিগ্রহ, জীবের স্বরূপও চিৎ। এই স্থানে ভগবান ও জীবে নিত্য অভেদ। এ জগতে জীব অচিৎসংস্পর্শে স্থাবর-জঙ্গমত্ব প্রাপ্ত হয়ে সংসার ভোগ করছে। নির্ম্মল চিৎকণা জীব হরিসেবারত।’ এই জ্ঞানের সন্ধান পেয়ে যখন জীব শ্রদ্ধাসহকারে নিকিঞ্চন ভক্তের পাদাশ্রয় করে শ্রবণ কীর্ত্তনাদি ভক্তাঙ্গগুলি সাধন করতে থাকে, তখন জীবের সংসারক্ষয় হয়ে জড়মুক্তিক্রমে অনর্থ্যনিবৃত্তি ঘটে। তখন নিষ্ঠা, রুচি, আসক্তি, ভাবক্রমে জীব ভগবত প্রেমের অধিকারী হয়। এই প্রেমই পরমপ্রয়োজন, পরমপুরুষার্থ। ভক্ত ধর্ম, অর্থ, কাম-এই ত্রিবর্গাত্মক কর্ম এবং মোক্ষঅভিসন্ধানরূপ অপবর্গ-এই চার পুরুষার্থকে নরকসদৃশ জ্ঞান করে অহৈতুকী ভক্তির যাজন করেন।

অনেকের ধারণা, কর্ম করতে করতে তারই ফলরূপে ভক্তি আসবে, যেহেতু কর্মীরাও হরিপুজাদি করে থাকেন। কিন্তু ভগবত-সিদ্ধান্ত তা নয়। কর্ম করতে করতে কেবল কামনার বৃদ্ধি হতে থাকে। সুতরাং কর্মের ফল কিভাবে ভক্তি হতে পারে? কর্মে যে ভক্তির মত কিছু অনুষ্ঠান দেখা যায়, উহা কর্মাঙ্গ, ভক্তি নয়। ভগবান আমাদের নিত্যসেবা, সুতরাং আমাদের সকল ভোগবাঞ্ছা পরিহার করে ভগবানেরই সেবা করা কর্ত্তব্য-এই বুদ্ধিতে পরিচালিত হয়ে কর্মিগণ ভক্তির আশ্রয় গ্রহণ করেন নাই। তাঁদের চাই নিজের ভোগ। সেই সাধনের জন্য আনুষ্ঠানিক ক্রিয়ায় কিছু ভক্তির আভাস আছে। এই যে ভক্তি, ইহা ভক্তের অহৈতুকী ভক্তি নয়, ইহা কর্মাঙ্গ। সুতরাং ইহা দ্বারা ভক্তিলাভ হতে পারে না।

শ্রীধ্রুব মহারাজের কথা হতে আমরা জানতে পারি, যদিও তিনি রাজ্যলাভের জন্য ভগবানের আরাধনা করেছিলেন, তাহলেও তিনি পদ্মপলাশলোচন অনাথনাথ ভগবান আছেন, এই বিশ্বাস্ব ভক্তি পথ গ্রহণ করেছিলেন, কর্মাঙ্গের অন্যতম অনুষ্ঠানরূপে অনিত্য ভক্তির আবাহন করেন নাই। ভগবানের জন্য তাঁর প্রাণ কেঁদেছিল, তবে রাজ্যলাভরূপ দুর্ব্বাসনা তাঁর চিত্তে ছিল। পরে ভগবান্‌ কৃপা করিয়া তাঁহাকে দেবর্ষি নারদের সঙ্গ করিয়ে তাঁহার দুর্ব্বাসনা দূর করে তাঁকে শুদ্ধভক্তি প্রদান করেন। শ্রীপ্রহলাদ মহারাজের ভক্তি আদৌ মিশ্রা ছিল না। গর্ভবাসকালেই তিনি দেবর্ষির সঙ্গ পেয়েছিলেন। সুতরাং কোন কামনা তাঁর চিত্তকে কুলষিত করতে পারেনি। সাধুসঙ্গের এমনই ফল। সাধুসঙ্গ ব্যতীত আমাদের শুদ্ধ ভক্তিলাভের আর অন্য উপায় নেই।

সংকলনে- দাসানুসার #কৃষ্ণকমল।

 

Advertisements

Leave a Reply

Please log in using one of these methods to post your comment:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s