শ্রীমতী রাধারাণী কে ?


শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা স্কুল's photo.

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আদিশক্তি শ্রীমতী রাধারাণী । শ্রীরাধা ও শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই, তাঁরা এক । কেবলমাত্র লীলারস আস্বাদন করার জন্য দুই দেহ ধারণ করেছেন । ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে বর্ণিত আছে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজেকে আনন্দ প্রদান করার জন্য নিজের বাম অংশ থেকে শ্রীরাধাকে সৃষ্টি করলেন । শ্রীমতী রাধারাণী আদিশক্তি রূপে জগতে খ্যাত হয়ে তাঁর নিজের চিৎশক্তির বলে অসংখ্য গোপী ও লক্ষ্মীদেবীদের কৃষ্ণের প্রীতিবিধান করার জন্য সৃষ্টি করেছেন । তবে সাধারণ লোকেরা এ তত্ত্ব না জেনে শ্রীমতী রাধারাণীকে একজন সাধারন নারী বলে জ্ঞান করেন । কারণ কামের বশবর্তী হয়ে তারা এ জগতে সমস্ত বস্তুকে কামময় দৃষ্টিতে দর্শন করেন । কিন্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীমতী রাধারাণী সমস্ত লীলা হচ্ছে প্রেমময় । এ জগতে প্রেমের লেশমাত্র গন্ধ নেই । এটি কামময় জগত । কাম ও প্রেমের মধ্যে আকাশ পাতাল তফাৎ ।
আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি-বাঞ্ছা—তারে বলি, ‘কাম’ ।
কৃষ্ণেন্দ্রিয় প্রীতি-ইচ্ছা ধরে ‘প্রেম’ নাম ।। (চৈতণ্য চরিতামৃত ৪/১৬৫)
“নিজের ইন্দ্রিয় তৃপ্তির বাসনাকে বলা হয় কাম, আর পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ইন্দ্রিয়ের প্রীতিসাধনের ইচ্ছাকে বলা হয় প্রেম ।”
শ্রীমতী রাধারাণীর অন্য একটি নাম ‘ক্যাচিৎ’, অর্থাৎ যিনি শ্রীকৃষ্ণকে অখন্ড সুখ প্রদান করেন । “সর্বত্যাগ করি করে কৃষ্ণের ভজন ।” দেহধর্ম, বেদ ধর্ম, লোক ধর্ম সব ত্যাগ করে কৃষ্ণের সেবা করেছিলেন । তবে এ তত্ত্ব সম্বন্ধে সকলে অবগত নয় ।
কখনও কখনও কেউ যুক্তি প্রদান করেন যে শ্রীমতী রাধারাণীর নাম শ্রীমদভাগবতে নেই । কিন্তু এটি জানা উচিত শ্রীমতী রাধারাণীর নাম ও মহিমা শ্রীমদভাগবত ছাড়াও শ্রীব্যাসদেবের রচিত বহু প্রামাণিক শাস্ত্রে উল্লেখিত আছে । শ্রীবৃহৎ ভাগবতামৃতে শ্রীপরীক্ষিত মহারাজের উক্তি –
গোপীনাং বিততাদ্ভুতস্ফুটতর প্রেমানলার্চিশ্ছটাদগ্ধানাং
কিল নামকীর্তনকৃতাত্তাসাং স্পর্শেন সদ্যো মহা-
বৈকল্যং স ভজন্ কদাপি ন মুখে নমানি কর্তুং পভুঃ ।। (বৃহদ্ভাগবতামৃতম্ – ১/৭/১৩৪)
অর্থাৎ মহারাজ পরীক্ষিত নিজ জননী উত্তরাকে বললেন, “হে মাতা ! আমার গুরুদেব শুকমনি ভাগবত কথা কীর্তন করার সময় গোপীদের কারোর নাম উচ্চারণ করতে সমর্থন হননি । তার কারন গোপীদের নাম উচ্চারণ করলে বিশেষ স্মৃতিতে তাঁর চিত্ত অতি বিস্মৃত জ্বালাময় প্রেমানলে মহাবিহবল হয়ে পড়তেন, যার ফলে আর ভাগবত কথা বলতে পারতেন না ।”
তবে বহু প্রামণিক শাস্ত্রে শ্রীমতী রাধারাণীর মহিমা বর্ণনা করা হয়েছে । যেমন, শ্রীগোপাল তাপনীতে বলা হয়েছে –
তস্যাদ্যো প্রকৃতি রাধিকা নিত্য নির্গুণা ।
যস্যাংশে লক্ষ্মী দুর্গাদিকা শক্তয়ঃ ।।
অর্থাৎ – “শ্রীকৃষ্ণের নিত্য শক্তি, আদিশক্তি শ্রীরাধা নিত্য নির্গুনা; এবং লক্ষ্মী, দুর্গাদি সব ভগবৎ শক্তিবর্গ যাঁর অংশ ।”
‘শ্রীবৃহদেগৌতমীয় তন্ত্রে’ শ্রীকৃষ্ণের উক্তি –
সত্ত্বং তত্ত্বং পরত্বঞ্চ তত্ত্বত্রয়মহং কিল ।
ত্রিতত্ত্বরূপিনী সাপি রাধিকা মম বল্লভা ।।
অর্থাৎ – “আমি যেমন নিত্য আনন্দময় হয়ে বিশ্বের কার্য, কারণ ও ত্রিতত্ত্ব-স্বরূপ, তেমনই শ্রীরাধা নিত্য আনন্দময়ী হয়ে কার্য, কারণ স্বভাবস্থিতা ।”
শ্রীপদ্মপুরাণে পাতালখন্ডে শ্রীশিবজী নারদকে বললেন –
দেবী কৃষ্ণময়ী প্রোক্তা রাধিকা পরদেবতা ।
সর্বলক্ষ্মী-স্বরূপা সা কৃষ্ণাহ্লাদ স্বরূপিনী ।।
তৎ সো প্রোচ্যতে বিপ্র হ্লাদিনীতি মনীষিভিঃ ।
তৎকলাকোটিকোট্যাংশা দুর্গাদ্যাস্ত্রীগুণাত্মিকাঃ ।।
অর্থাৎ – “ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরমপুরুষ দেবাদী দেব, এবং শ্রীমতি রাধিকা হচ্ছেন নিত্য শক্তি । রাধিকা সর্বলক্ষ্মী তাঁর অংশ স্বরূপা । হে নারদ, দুর্গাদি দেবীগণ শ্রীমতি রাধিকার কোটি কোটি অংশের এক কলা ।”
শ্রীপদ্মপুরাণে পাতালখন্ডে –
বহুনাং কিং মুনিশ্রেষ্ঠ বিনাতাভ্যাং ন কিঞ্চন ।
চিদ্ তিল্লক্ষণং সর্ব রাধাকৃষ্ণ ময়ং জগত ।।
ইত্থুং সর্ব তয়োরেব বিভূতি বিধি নারদ ।
নশ্যক্যতে মায়াবক্তুং বর্ষ কোটি শতৈরপি ।।
অর্থাৎ – “শ্রী শিবজী নারদ মুনিকে বললেন, হে মুনিবর ! আমি তোমাকে আর কি বলব ? শ্রীরাধাকৃষ্ণ ছাড়া জগতে আর কিছু নেই । এইভাবে সবই তাঁদের বিভূতি বলে জানবে । আমি শত কোটি বছর ধরে বললেও শ্রীরাধাকৃষ্ণের মহিমা বর্ণনা করতে সক্ষম হব না ।”
‘শ্রীগৌতমীয় তন্ত্রে’ বর্ণিত আছে –
দেবী কৃষ্ণময়ী প্রোক্তা রাধিকা পরদেবতা ।
সর্বলক্ষ্মীময়ী সর্বকান্তিঃ সম্মোহিনী পরা ।।
অর্থাৎ – “শ্রীমতী রাধারাণী হচ্ছেন কৃষ্ণের আদিশক্তি এবং আদি লক্ষ্মী । সর্বগুণ বিভূষিতা এবং সমস্তকে আকর্ষণ করেন ।”
‘শ্রীনারদ পঞ্চরাত্রে’ বলা হয়েছে –
সৃষ্টিকালে চ সাদেবী মূলপ্রকৃতিরীশ্বরা ।
মাতা ভাবেন্মহাবিষ্ণোঃ স এব চ মহান্ বিরাট্ ।।
অর্থাৎ – “শ্রীরাধাই মূল প্রকৃতি এবং ঈশ্বরী । জগত সৃষ্টির সময় যে মহাবিষ্ণু হতে জগত সৃষ্টি হয়, সেই বিরাট পুরুষের মাতা শ্রীরাধা । মহাবিষ্ণু হতে জগত সৃষ্টি এবং শ্রীরাধা হতে মহাবিষ্ণু উদ্ভব বলে শ্রীরাধাকে তত্ত্বতঃ জগন্মাতা বলা হয় ।”
‘শ্রীনারদ পঞ্চরাত্রে’ আবার বলা হয়েছে –
রাধা বাম শসম্ভূতা মহালক্ষ্মী প্রকীর্ত্তিতা ।
ঐশ্বর্য্যাধিষ্ঠাত্রী দেবীশ্বরস্যৈব নারদ ।।
অর্থাৎ – যে মহালক্ষ্মী ঈশ্বরের ঐশ্বর্য্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী, তিনি শ্রীরাধার বামসম্ভূতা অর্থাৎ তিনি শ্রীরাধার অংশ । সুতরাং শ্রীরাধা হচ্ছেন সর্ববিধ ঐশ্বর্য্যের মূল অধিষ্ঠাত্রী দেবী ।
ঋগবেদে (১/৩০/৫) “স্ত্রোত্রং রাধানাং পতে গির্বাহোবীর যস্যতে”
অর্থাৎ – “হে বীর রাধানাথ স্তুতি ভাজন তোমার এ রূপ স্তুতি, তোমার বিভূতি সত্য ও প্রিয় হোক ।”
এই রকম শাস্ত্রে বহু প্রমাণ দেখতে পাওয়া যায় যে শ্রীমতী রাধারাণী শ্রীকৃষ্ণের আদিশক্তি ।

Advertisements

শ্রীমতি রাধারাণীর আর্বিভাব ( রাভেল- দিব্য জন্মস্থান সচিত্র সহ )


শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা স্কুল's photo.
(রাধাষ্টমী তথা শ্রীমতি রাধারাণীর আর্বিভাব তিথি। এ উপলক্ষে চৈতন্য সন্দেশের এই বিশেষ লেখাটি নিবেদন আপনাদের উদ্দেশ্য। আপনাদের সবাইকে সকাল থেকে দুপুর ১২ টা পর্যন্ত উপবাস থেকে শ্রীকৃষ্ণ শক্তি এবং অভিন্ন শ্রীমতি রাধারাণীর চরণে প্রার্থনা নিবেদনের জন্য বিশেষ অনুরোধ জানাচ্ছি। এই রাধাষ্টমীর পবিত্র দিনে চলুন শ্রীমতি রাধারাণীর আর্বিভাব স্থানের দিব্য দর্শন লাভ করি)
রাভেল- দিব্য জন্মস্থান
পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নিত্য লীলাবিলাস স্থান শ্রীবৃন্দাবন। এ স্থানের ধূলিকণাও এত পবিত্র যে স্বয়ং শ্রীব্রহ্মাসহ সকল দেবতারা এই পবিত্র ভূমির ঘাস হয়ে জন্মাতে অভিলাষ করেন। শ্রীবৃন্দাবন ধাম সকলেরই আরাধ্য। কিন্তু কালের প্রভাবে একসময় এই ধাম অবলুপ্ত হলে কলিযুগের পাবনাবতারী শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু এই ধামের বহু স্থান উদ্ধার করেন। পরবর্তীতে তিনি তার প্রিয় ষড় গোস্বামীদের উক্ত ধাম পরিচর্যার দায়িত্ব অর্পন করেন। ষড় গোস্বামীগণও বৃন্দাবনের বহু লুপ্ত স্থান উদ্ধার করেন।
বৃন্দাবনের নিকটবর্তী বর্ষাণা এলাকার অন্তর্গত রাভেল নামক অতি পবিত্র স্থানে বৃন্দাবনেশ্বরী শ্রীমতি রাধারাণী আর্বিভূত হন। শ্রীমতি রাধারাণীর আবির্ভাব সম্বন্ধে যে বর্ণনা শাস্ত্রে রয়েছে, তা হল, একদিন রাজা বৃষভানু যমুনা নদীতে স্নান করতে যান। সেই সময়ে যমুনা নদী বর্ষাণার রাভেল স্থানটির পাশ দিয়ে বয়ে যেত। ঐ স্থান দিয়ে এক কালে যমুনা নদী যে বয়ে যেত তা ভূতত্ত্বগত প্রমাণ রয়েছে। সেই যাই হোক, রাজা বৃষভানু যমুনা নদীতে স্নান করতে গিয়ে দেখলেন সহস্য সূর্যের আলোকের মতো জ্যোতির্ময় এক সোনার পদ্ম ঠিক যমুনা নদীর মাঝখানে ফুটে রয়েছে। আর সেই সোনার পদ্মের মধ্যে রয়েছে একটি ছোট শিশুকন্যা। প্রথমে রাজা বৃষভানু বিস্মিত হলেন। কিন্তু ব্রহ্মাজী তখন সেই স্থানে আর্বিভূত হয়ে রাজা বৃষভানুর বিস্ময়ের নিরসন করলেন। তিনি জানালেন যে রাজা বৃষভানু ও তাঁর পত্নী কীর্তিদা পূর্বজন্মে ভগবান বিষ্ণুর পত্নীকে কন্যারূপে লাভ করার জন্য কঠোর তপস্যা সম্পাদন করেছিলেন। সেই তপশ্চর্যার ফলস্বরূপ এই জন্মে তাঁরা স্বয়ং ভগবানের শক্তি তথা পত্নীকে এইভাবে কন্যারূপে লাভ করেছেন। ব্রহ্মাজীর কথা শুনে রাজা বৃষভানু সেই শিশুকন্যা শ্রীমতি রাধারাণীকে নিজ গৃহে নিয়ে এলেন। কিন্তু দেখা গেল সেই শিশু রাধারাণী কিছুতেই চোখ খুলছেন না। তাঁর চোখ সর্বদা বন্ধ রয়েছে। তবে কি এই শিশুকন্যা অন্ধ ? সকলের এই প্রশ্ন নিরসনের উদ্দেশ্য অবশেষে নারদমুনি রাজা বৃষভানুর সম্মুখে উপস্থিত হয়ে শিশুর এই অন্ধত্ব অবস্থা সত্ত্বেও শিশুর জন্মকালীন সকল ধরনের শুভ উৎসবাদির আয়োজন গৃহে করতে বললেন। নারদমুনীর কথা অনুযায়ী রাজা বৃষ্ণভানু গৃহে উৎসবের আয়োজন করলেন। সেই উৎসবে নন্দ মহারাজ ও শিশু কৃষ্ণসহ সপরিবারে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। ঐ অনুষ্ঠানে আগমন করে শিশু কৃষ্ণ যখন হামাগুড়ি দিয়ে শিশু রাধারাণীর দিকে এগিয়ে গেলেন, রাধারাণী তখন এক দিব্য সৌরভের ঘ্রাণ লাভ করলেন, আর সেই মুহুর্তে রাধারাণী চোখ খুলে প্রথমে দর্শন করলেন তার নিত্য পতি পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে। আজ থেকে ৫ হাজার বছর পূর্বে বর্ষাণা ক্ষেত্রের রাভেল নামক স্থানে এইসব ঘটনা ঘটেছিল।
এখন রাভেল অত্যন্ত নির্জন এক প্রান্তর। স্বল্প জনসংখ্যার একটি প্রত্যন্ত গ্রাম। তবে এখনও শ্রীমতি রাণারাণীর লীলাস্থলিগুলো বর্তমান। আসুন আমরা চিত্র অনুসারে সেই দিব্য তীর্থস্থান সমূহ দর্শন করি :

Raval01 Raval02  Raval04 Raval05 Raval03
১. রাভেলে একটি মাত্র মন্দির রয়েছে। মন্দিরটি লাইরি লাল মন্দির নামে খ্যাত।
২. খুব ছোট কিন্তু খুব সুন্দর শ্রী শ্রী রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহ এই মন্দিরে অধিষ্ঠিত রয়েছেন। শ্রীকৃষ্ণের প্রপৌত্র বজ্রনাভ এই বিগ্রহ প্রতিষ্টা করেছিলেন। মন্দিরটি সাদামাটা ছিচছাপ ধরণের।
৩. মন্দির দর্শন ও পরিক্রমার পর আপনি মন্দিরটির প্রশস্ত ছাদে উঠে একদা যমুনা বয়ে যাওয়ার চিহৃ সুস্পষ্ট দেখতে পাবেন। হাজার বছর আগে এখানেই বয়ে যাওয়া যমুনা থেকেই কীর্তিদা ও বৃষভানু রাজা রাধারাণীকে প্রাপ্ত হয়েছিলেন। ভক্তের দৃষ্টিতে এই নির্জন রাভেলের মন্দির প্রাঙ্গন অনবদ্য।
৪. মন্দিরের বিপরীত দিকে রয়েছে রাধারাণীর উদ্যান। এই স্থানে শ্রীমতি রাধারাণী বিভিন্ন লীলাবিলাস সম্পাদন করেন।
৫. এই উদ্যানে প্রায় অঙ্গাঙ্গিভাবে রয়েছে একটি সাদা রঙের ও একটি কালো রঙের দুটি বৃক্ষ, যা রাধাকৃষ্ণ বৃক্ষ নামে পরিচিত।
বর্ষাণায় অনেকেই গমন করেন। কিন্তু রাধারাণীর মূল এই জন্মক্ষেত্র রাভেল অনেকের কাছেই হয়তো এখনো অজানা। এখনো অতি সাধারণ গ্রামটিতে শ্রীমতি রাধারাণীর দিব্য উপস্থিতি অনুভব করা যায়। তাই আপনি যদি শ্রীমতি রাধারাণীর কৃপা লাভ করতে চান তাহলে বৃন্দাবন পরিক্রমায় এই অপ্রাকৃত ধাম রাভেল দর্শন করে আসতে পারেন।
সোজন্যে- Monthly Caitanya Sandesh, মাসিক চৈতন্য সন্দেশ, এপ্রিল’০৯ সংখ্যা, আর্কাইভস থেকে।
URL Link: http://www.facebook.com/monthlycaitanyasandesh

আজ ২১শে সেপ্টেম্বর ২০১৫ শ্রীশ্রী রাধাষ্ঠমী উপলক্ষ্যে সকল ভক্তবৃন্দকে জানাই রাধাকৃষ্ণের প্রীতি এবং শুভেচ্ছা।


শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা স্কুল's photo.
শ্রীশ্রীরাধারানীর প্রনাম মন্ত্র : –
তপ্ত কাঞ্চন-গোরাঙ্গীরাধে বৃন্দাবনেশ্বরী ।
বৃষ ভানু-সুতে দেবী ত্বং প্রণামামি হরি-প্রিয়ে ।।
অনুবাদঃ শ্রীমতি রাধারাণী, যাঁর অঙ্গকান্তি তপ্ত
কাঞ্চনের মতো এবং যিনি বৃন্দাবনের
ঈশ্বরী,যিনি মহারাজ বৃষভানুর দুহিতা এবং ভগবান
শ্রীকৃষ্ণের প্রেয়সী তার চরণকমলে আমি আমার
সশ্রদ্ধ প্রণতি জানাই ।
রাধাষ্টমীর কথা
অনয়ারাধিতো নূনং ভগবান্ হরিরীশ্বর। যন্নোবিহায় গোবিন্দঃ প্রীতযামনয়দ্রহঃ \
অনুবাদ: এই বিশেষ গোপী নিশ্চয়ই যথার্থভাবে সর্বসক্তিমান ভগবান গোবিন্দের আরাধনা করেছিলেন, তাই তাঁর প্রতি অত্যন্ত প্রীত হয়ে তিনি অবশিষ্ট আমাদের পরিত্যাগ করে তাঁকে নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়েছেন।
তাৎপর্য: শ্রীল বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুর বর্ণনা করেছেন যে, আরাধিতঃ শব্দটি শ্রীমতী রাধারাণীর সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ভাষ্য প্রদান করেছেন, “মুনিবর শুকদেব গোস্বামী রাধারাণীর নাম গোপন রাখতে সকল প্রয়াস করেছেন। কিন্তু এখন আপনা থেকেই তাঁর মুখচন্দ্র হতে তা দীপ্তিমান হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে শ্রীমতী রাধারাণীর কৃপাতেই তিনি তাঁর নাম এইভাবে প্রকাশ করেছেন এবং তাঁর পরম সৌভাগ্য ঘোষনা করার জন্য আরাধিতঃ শব্দটি দুন্দুভির মতো নিনাদিত হচ্ছে।” শুকদেব গোস্বামী এত ভাবাপন্ন হয়ে রাধা নাম উচ্চারন করে ভাবছে আমি হয়তো পাঠ শেষ করতে পারবো না। আমারতো পরীক্ষিত মহারাজের সাথে সাতদিনের প্রতিজ্ঞা আছে। কিšতু যদি রাধা নাম বলতে গিয়ে এমনভাবে ভাবাপন্ন হয়ে গিয়ে যদি পাঠ বন্ধ হয়ে যায়, সেজন্য রাধা নাম বলে এত আনন্দ পাবে পরমানন্দ বিপুল হয়ে যাবে হয়তো পাঠ বন্ধ হয়ে যাবে। সেজন্য রাধা নাম বলতে চাননি। কিন্তু তা বলে ফেলেছেন। আরাধিতঃ আরাধিতঃ রাধা নাম সেখানে গোপন করা আছে। আরাধিতঃ কার নাম আছে? কার নাম? রাধা। রাধা রাধা রাধা রাধা রাধা রাধা রাধা রাধা হরিবোল। যদিও গোপীরা যেন শ্রীমতী রাধারাণীর প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে কথা বলেছেন, কিšতু তিনিই শ্রীকৃষ্ণের মনোযোগ আকর্ষণ করেছেন তা লক্ষ্য করে প্রকৃতপক্ষে তারা উল্লসিত হয়েছিলেন। গোপীগন চান কৃষ্ণ যেন খুশি হোক, কৃষ্ণ সন্তুষ্ট হোক। এভাবে একজন গোপী এমনভাবে কৃষ্ণকে সন্তুষ্ট করতে পেরেছে , তাহলে কৃষ্ণতো খুশি হলো তাই গোপীগণ উল্লসিত হলেন। শ্রীল রুপ গোস্বামী তাঁর শ্রীউজ্জ্বলনীলমণি গ্রন্থে শ্রীমতী রাধারাণীর পদচিহ্নের যে বিশদ বিবরন প্রদান করেছেন, শ্রীল বিশ্বনাথ চক্রবর্তী ঠাকুর তা উদ্ধৃত করেছেন “শ্রীমতী রাধারাণীর বাম চরণের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠের মূলে একটি যব চিহ্ন রয়েছে, সেই চিহ্নের নিচে এক চক্র, সেই চক্রের নিচে এক ছত্র, এবং সেই ছত্রের নিচে একটি বলয় রয়েছে। তাঁর চরণের মধ্যভাগ থেকে একটি উর্ধরেখা তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ ও তর্জনীর সন্ধিস্থল পর্যন্ত গিয়েছে। মধ্যমা অঙ্গুলির মূলে একটি পদ্ম, তার নিচে পতাকাসহ ধ্বজ চিহ্ন এবং ধ্বজের নিচে পুষ্পবল্লী। তাঁর কনিষ্ঠাঙ্গুলির মূলে অঙ্কুশ চিহ্ন এবং গোড়ালীতে অর্ধচন্দ্রচিহ্ন। এইভাবে তাঁর বাম চরণে এগারটি চিহ্ন রয়েছে। তাঁর দক্ষিণ চরণের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠমূলে একটি শঙ্খ এবং তার নিচে একটি গদা। কনিষ্ঠা অঙ্গুলির মূলে বেদী এবং তার নীচে একটি কুণ্ডল এবং সেই কুণ্ডলের নিচে একটি গদা এছাড়া তর্জনী, মধ্যমা, অনামিকা ও কনিষ্ঠা অঙ্গুলির নিচে পর্বত চিহ্ন এবং পর্বতের নিচে রথ চিহ্ন রয়েছে, আর গোড়ালীতে মৎস্য চিহ্ন রয়েছে। ‘‘এইভাবে শ্রীমতী রাধারাণীর চরণ- কমলের মোট উনিশটি চিহ্ন রয়েছে।” শ্রীমতি রাধার একটি নাম হচ্ছে মাধবমোহিনী। কৃষ্ণের একটি নাম হচ্ছে মোহন। মাধব সকলকে মোহিত করেন। কিন্তু রাধারানী মাধবের মোহিনী। কৃষ্ণ ভাবছেন আমি আমার লীলা বিস্তার করবো। তার বাম পাশ থেকে রাধারানী বিস্তার হয়ে গেলেন। রাধারানী তার বিভিন্ন সেবা আয়োজন করে ভগবানকে সন্তুষ্ট করেন। রাধারানী সেবা বিস্তার করার জন্য তার বাম পাশ থেকে অনেক গোপী বিস্তার করেন। গোপীগন রাধারাণীর মতো দেখতে। এভাবে কৃষ্ণ যখন মনস্থির করলেন যে আমি দ্বাপর যুগে ব্রজধামে অবতীর্ণ হয়ে লীলা বিস্তার করবো। তিনি রাধারানীকে বললেন, “তুমিও আস।” তখন রাধারানী বললেন, “আমি কী করে ধরাধামে আসবো। তোমায় ছাড়া অন্য পুরুষ দেখতে পারবো না।” কৃষ্ণ বললেন, “ঠিক আছে, আমি ব্যবস্থা করছি। বৃষভানু মহারাজের পত্নী কীর্তিদা গর্ভবতী হলেন। অষ্টমী তিথির মধ্যাহ্নে রাধারানীর জন্ম হলো। এই তিথীতে বর্ষানার ভক্তবৃন্দ গোপ- গোপীগণ সেখানে তারা আনন্দে নাচছে যে, বৃষভানু মহারাজের কন্যা হলেন। উদ্ধব দাস এ সম্পর্কে একটি পদ লিখেছেন-
বৃষভানুপুরে আজ আনন্দ বাধাই।
রত্নভানু সুভানু নাচয়ে তিন ভাই \
দধি ঘৃত নবনীত গোরস হলদি।
আনন্দে অঙ্গনে ঢালে নাহিক অবধি \
গোপ গোপী নাচে গায় গায় যায় গড়াগড়ি।
মুখরা নাচয়ে বুড়ী হাতে লৈয়া নঢ়ি \
বৃষভানু রাজা নাচে অন্তর উল্লাসে।
আনন্দ বাধাই গীত গায় চারিপাশে \
লক্ষ লক্ষ গাভী তখন অলংকৃত করি।
ব্রাহ্মণে করয়ে দান আপনা পাসরি \
গায়ক নর্তন ভাট করে উতরোল।
দেহ দেহ লেহ শুনি এই বোল \
কন্যার বদন দেখি কীর্তিদা জননী।
আনন্দে অবশ দেহ আপনা না জানি \
কত কত পূর্ণচন্দ্র জিনিয়া উদয়।
এ দাস উদ্ধব হেরি আনন্দ হৃদয় \
এভাবে কতো আনন্দ বর্ষানায়। কিন্তু রাধারানীর পিতা – মাতার একটা হচ্ছে দুঃখ হচ্ছে যে, রাধারাণী চোখ খুলছে না। ভাবছে আমাদের কন্যা অন্ধ। চোখ খোলে না। নারদ মুনি নন্দ মহারাজের কাছে গেলেন। তার সন্তান দেখার জন্য। তিনি শ্রীকৃষ্ণকে হাতে নিয়ে আশির্বাদ করেছেন। তোমার খুব ভাগ্য। এ সন্তান নারায়ণের মতো হবে। তুমি এ সন্তানকে যত্ন করো পূজা করো, সন্তানকে যত্ন করো। তোমার আর কোন পূজা করা লাগবে না। এভাবে বিভিন্ন উপদেশ দিয়ে নন্দপুত্রকে আর্শিবাদ দিলেন। নারদ মুনি বুঝলেন, কৃষ্ণ আবির্ভাবের পক্ষকাল পর কে আসে? কে আসে? রাধারাণী। নারদমুনি ব্রজের আশপাশে বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে খোজ করছেন, তোমার কোন কন্যা সন্তান হয়েছে? সব সন্তান নিয়ে এস আমি আশির্বাদ করবো। সন্তান নিয়ে আসলে আশির্বাদ করলো। পরপর বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে খোঁজা হলো। কিন্তু যাকে খুঁজছেন তাঁকে পাওয়া যাচ্ছে না। তখন কীর্তিদা বৃষভানু মহারাজের বাড়িতে গিয়েছেন। সেখানে শ্রীদামসহ বিভিন্ন সন্তান নিয়ে এলেন। কিন্তু তিনি জীজ্ঞাসা করলেন, “আরো একটা মেয়ে সন্তান হয় নি। আমি একটু দেখি দেখাও।” তখন দেখছে সুন্দর রাধারানী নিয়ে এসছে। পনের দিন বয়স। তাঁর মুখমণ্ডল কোটিচন্দ্রের ন্যায় জ্যোতির্ময়। তাকে নারদ মুনির হাতে দিয়েছে। নারদ মুনি রাধারানী, হ্লাদিনী শক্তি, আনন্দের শক্তি হাতে পেয়ে এমন আনন্দে বিভোর হয়েছেন যে, কোনো কথা বলতে পারছেন না, নড়তে পারছেন না। আর শুধু গায়ে কাঁপছে আর চোখের জল গঙ্গা হয়ে পড়ে যাচ্ছে। বৃষভানু মহারাজ ভাবছেন কী করবে। নারদ মুনি একটু স্থির হয়েছেন। তিনি বললেন, “তুমি দুঃখ করো না।” আর ঠিক যেমন কৃষ্ণের পিতা মাতার মতো বলেছেন, “তুমি এ মেয়েকে যতœ করো, পূজা করো। তোমার আর কোনো পূজা করা লাগবে না।” এভাবে নারদ মুনির ইচ্ছে ছিল রাধারানীর কিশোরী রুপ দর্শন করবেন। তাই তিনি ব্রজবনে গিয়ে ধ্যান করে প্রার্থনা শুরু করলেন রাধারাণী দেখা দাও, দেখা দাও। তখন রাধারাণী গোপীগণের সাথে কিশোরীরুপে দেখা দিয়েছেন। তখন গোপীগণ নারদমুনিকে বলেছেন, তুমি যে রাধারাণীর দর্শন পাচ্ছ তার অর্থ রাধারাণীর অসীম কৃপা হয়েছে। রাধারাণীর দর্শন পাওয়ার জন্য কতো যোগী কয়েক কল্পে তপস্যা করেছেন। একটা কল্পে হাজার যুগ, ষোল মন্বন্তর। নারদ মুনি বললেন, “ভবিষ্যতে তোমার মেয়ের দৃষ্টি আসবে। চোখ খুলবে।” একদিন বড় একটা উৎসব হলো। শিশু কৃষ্ণ এসে হামাগুড়ি দিয়ে শিশু রাধারানীর কাছে গিয়েছে। আর রাধারাণী চোখ খুলে শিশু রূপে কৃষ্ণকে দেখেছেন। তিনি অন্তরঙ্গা শক্তি। তটস্থা শক্তি আর বহিরঙ্গা শক্তি। অন্তরঙ্গা শক্তি হচ্ছে রাধারানী। আর বহিরঙ্গা শক্তি পার্বতী বা দুর্গা। আমরা জীবশক্তি আমরা মাঝখানে পরি। যখন আমরা কৃষ্ণের সেবা করবো, তখন আমরা অন্তরঙ্গা শক্তি রাধারাণীর আশ্রয়ে থাকবো। যদি আমরা মায়াকে না বলি অর্থ মায়া যদি আমাদের বলেন ভোগ করো আর আমরা যদি তাকে বলি ‘না’, আমরা কৃষ্ণের সেবা করবো, তাহলে আমরা অন্তরঙ্গা শক্তির অধীনে মধ্যে পড়ি। মায়া আমাদের যখন ভোগ বিলাস করার আয়োজন করে আর আমরা যদি বলি ‘হ্যাঁ’ ‘হ্যাঁ’ আমরা ভোগ করতে চাই, তখন আমরা মহামায়ার অধীনে থাকি এবং আমাদের কর্মফল অনুযায়ী আমাদের মায়ার অধীনের মধ্যে সুখ দুখ পেতে হবে। ভগবদগীতায় আছে মনুষ্যানাং সহস্রেষু কশ্চিৎ যততিসিদ্ধয়ে। অর্থাৎ কৃষ্ণের সমন্ধে খুব অল্প জানে পারে। কিন্তু শ্রীচৈতন্যদেবের কৃপাতে আমরা রাধা কৃষ্ণ সমন্ধে অনেক কিছু জানতে পারি। কিন্তু আমাদের খুব সাবধান থাকতে হবে। যদি আমরা মনে করি রাধাকৃষ্ণের লীলা জড়জগতের স্ত্রী পুরুষের মতো হয় তবে মহা অপরাধ। আমাদের জানতে হবে রাধারাণী হচ্ছেন কৃষ্ণ প্রেমস্বরূপিনী। তিনি কৃষ্ণের প্রেমসেবা করেন। সেটা সম্পূর্ণভাবে পারমার্থিক তত্ত¡। এইভাবে যদি আমরা রাধাকৃষ্ণকে সেবা করি তবে আমরা সেই পরম তত্ত¡ উপলব্ধি করতে পারবো। আসা করি এই রাধাষ্টমীতে রাধারাণীর যে প্রেমভক্তি তার একটা বিন্দু কমপক্ষে আস্বাদন করতে পারেন। এর থেকে আর বড় কোনো প্রার্থনা নাই।
“শ্রী গুরু চরণে রতি, এই সে উত্তম গতি, যে প্রসাদে পুরে সর্ব আশা” অর্থাৎ শ্রী গুরু উপদিষ্ট শ্রী কৃষ্ণ তত্ত, ভক্তি তত্ত, প্রেম তত্ত ও রস তত্ত আদি হৃদয়ে ধরন করিয়া শ্রী গুরু পাদ পদ্মে যাঁহারা রতি বিধান করেন, তাঁহারা শ্রী গুরু ছরনে অকপট ভক্তির বলেই প্রেমের রাজ্যে যাবতীয় প্রাপ্য বস্তুস্মূহের মধে পরমশ্রেষ্ঠ শ্রী রাধা প্রান বন্ধুর শ্রী চরন কমলের সম্বাহনাদিরূপ প্রেমসেবা অনায়েসে লাভ করিয়া ধন্য হন।
হরি ওঁম্