বিদেশে বাঙালি মানবধর্ম-প্রচারক (লোকনাথ চক্রবর্তী)


বিদেশে বাঙালি মানবধর্ম-প্রচারক

লোকনাথ চক্রবর্তী

সুখের টানে জগতের সঙ্গে ঘর করতে গেলে দুঃখের মুখ দেখতেই হয়, তাকে অতিক্রম করার জন্য প্রাথমিক আশ্রয় হল মন। মনই সুখ-দুঃখের বাসা। তাকে ঠিকমতো ঠিক পথে বিনিয়োগ করতে পারলে উদ্‌যাপিত দুঃখের ইন্ধনে উদ্ভাসিত হয় আনন্দ। মানুষ তাই যা ‘ঠিক’ তার সন্ধান করে আপন স্বভাবে। যাকে আমরা ‘মনন’ বলে চিনি। চেতনার সেই মন্থনসূত্রে সভ্যতার প্রাপ্তি হল ধর্ম, দর্শন ও সংস্কৃতি। যা আমার প্রেরণার প্রাণকেন্দ্র, জৈমিনি তাকে বলেছেন ধর্ম। অভ্যুদয় ও নিঃশ্রেয়সের নিরিখে ধর্মকে চিনিয়েছেন কণাদ। আর যা আমাদের ধরে থাকে, আমরাও যাকে ধরে অস্তিত্বের সবটুকু আস্বাদন করতে চাই, তা-ই ধর্ম ধরিয়ে দিয়েছেন ব্যাস। এই অস্তিত্বের সঙ্গে আত্মীয়তার সূত্রে ধর্ম ক্রমশ আমাদের পরিচিত হয়ে দু’টি ধারায় আত্মপ্রকাশ করেছে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক।

এই তত্ত্ব ও ব্যবহারের সঙ্গে সেতুবন্ধন করেছেন ঊনবিংশ শতাব্দর যুগাচার্য স্বামী বিবেকানন্দ। তাঁকে কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপনা করে সাহিত্যিক শংকর সম্প্রতি এগারোজন বাঙালি চিন্তানায়কের বিদেশ পর্যটন ও মানবধর্ম প্রচারকার্যের বর্ণনবিন্দু পরিক্রমণ করেছেন, যার মধ্যে বিংশ শতাব্দরও বেশ কয়েকজন মনীষীর উপস্থিতি রয়েছে। মানবজমিনে যাঁরা ধর্ম, দর্শন ও সংস্কৃতির বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন, শাস্ত্র তাঁদের ঋষি অভিধায় চিহ্নিত করেছে। পরবর্তীকালে শঙ্কর, মধ্ব, রামানুজ, বল্লভ প্রমুখ আচার্যও প্রাচ্যের নানা প্রান্তে সেই কর্মেই ব্যাপৃত থেকেছেন। এরপর এখানে প্রায় হাজার বছরের পরাধীনতার সূত্রে নানা ধর্ম সংস্কৃতির আসা-যাওয়ার দরজা খুলে যায়। অনুভব, বিশ্বাস ও অভ্যাসের নানা সংঘাতের মধ্যে একসময় বিশেষত বাংলায় ব্রাহ্মসমাজের আত্মপ্রকাশ ও সুধী সমাজে তার সমাদর লক্ষ করা যায়। প্রতাপচন্দ্র মজুমদার সেই সমাজ সংস্কারের বার্তা বহন করে, ১৮৮৩ সালে বিদেশে গিয়েছিলেন। তাঁকে যদি আমেরিকায় প্রথম বাঙালি আধ্যাত্মিক দূত হিসেবে গণনা করতে হয়, তাহলে দেখা যাবে তিনি হিন্দু ও খ্রিস্টধর্মের মিলনের প্রচেষ্টার প্রচারও করেছেন এবং পাশাপাশি ‘দি ওরিয়েন্টাল ক্রাইস্ট’ প্রকাশ করেছেন। উলটো দিকে স্বামী বিবেকানন্দ দাপটের সঙ্গে ভারতাত্মার বাণী বিশ্বের দরবারে উন্মোচন করে শুধু আমেরিকায় নয়, সারা পৃথিবীতেই পূজনীয় হয়ে উঠেছেন। মাঝখানে আসে মোহিনীমোহন চট্টোপাধ্যায়ের কথা, তিনি রামমোহনের বংশধর ও জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির জামাই। কবি ইয়েট্স এঁকে সম্মান করতেন, ইনি কবিকে গীতা ও শঙ্করাচার্যের রচনার সঙ্গে পরিচিত করেন। ধর্মে ব্রাহ্ম মোহিনীমোহন ‘থিয়োসফিক্যাল সোসাইটি’-র একজন বিশিষ্ট কার্যকর্তা ছিলেন। তাঁর শ্রীরামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ প্রীতি ও সনাতন মূল্যবোধের উল্লেখ শংকর এই রচনায় করেছেন।

  • ‘একাদশ অশ্বারোহী’-তে বিবেকানন্দ থেকে ত্রিগুণাতীতানন্দ পর্যন্ত মোট পাঁচজন শ্রীরামকৃষ্ণ পরম্পরার সন্ন্যাসীদের সাগরপারে ধর্ম-দর্শন প্রচারের বিশেষ কিছু প্রসঙ্গ রোমন্থিত হয়েছে। একই সঙ্গে সেখানে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে ওই সন্ন্যাসীদের প্রদত্ত ও উপলব্ধ কিছু শিক্ষা এবং কিছু তথ্য। ইতিহাস হাতে এসেছে আর নানা ব্যক্তি-চরিত্রের বৈচিত্রে ধর্মই ধরা দিয়েছে নিজস্ব মাত্রায়। এই রচনায় বিদেশের মাটিতে কিছু মানুষের অসহিষ্ণুতার পাশাপাশি মুক্তমনা মানুষের সান্নিধ্যে শ্রীরামকৃষ্ণ-সন্তানদের অবিচলিত নিষ্ঠা, তিতিক্ষা ও কর্মকুশলতার চিত্রকল্প প্রকাশিত হয়েছে, যা রচনার প্রসাদগুণে মর্মস্পর্শী।বিবেকানন্দের বিদেশযাত্রা ও বিশ্ববাসীর উদ্দেশে তাঁর বার্তা কিংবা তাঁর স্বভাব পরিচর্চা এ যাবত্‌ বিস্তর হয়েছে, শংকর এই বহুচর্চিত বিষয়ে কয়েকটি মৌলিক গ্রন্থের আলোয় স্বামীজির ব্যক্তিত্বের নির্বাচিত কিছু বৈশিষ্ট্যের আস্বাদন পাঠকের সঙ্গে বিনিময় করেছেন। সেখানে তাঁর সুসম্বন্ধ গ্রন্থনায় জানানো হয়েছে ধর্মপ্রচারের পাশাপাশি স্বামীজি ভারতের অসহায় মানুষের আশ্রয় হয়ে প্রকাশিত হয়েছেন। যা ধর্মেরই ব্যবহারিক রূপ! তিনি দাতা। তাঁর হাত অপরের জন্য বরদ হয়ে আছে। তিনি আচার্য। পরিচালক। পরিচালিত নন। উদার এবং সকলের ভালটুকু সংগ্রহ করে বহুজনহিতায় তার বিনিয়োগ করেছেন।

    সারদানন্দ, অভেদানন্দ, তুরীয়ানন্দ ও ত্রিগুণাতীতানন্দের বিদেশযাত্রার সূত্রে যে-গুরুভ্রাতৃপ্রেম, নিষ্ঠা, কৃচ্ছ্রসাধন এবং অনটনে অবিচলতার ইতিহাস একত্রিত হয়েছে, তার মূল্য অপরিসীম। এ ছাড়াও এই বইয়ে আরও চারজন বাঙালির বিদেশজয়ের অল্পবিস্তর খবর দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে দু’জন হলেন বৈষ্ণব, একজন যোগী ও অপরজন অন্নময় সত্তার নির্বিঘ্ন আনন্দময় উত্তরণের দিশারি। এঁদের মধ্যে পরমহংস যোগানন্দ আমেরিকানদের ক্রিয়াযোগের স্নিগ্ধ আনন্দের আস্বাদন করিয়েছেন আর ড. মহানামব্রত ব্রহ্মচারী কটিমাত্র বস্ত্রাবৃত্র হয়ে ধর্মমহাসভায় যোগ দিতে আমেরিকা যান, পরে সেদেশ থেকে বৈষ্ণব বেদান্তে গবেষণা করে ডক্টরেট উপাধি পান। সুবক্তা, বিনয়ী অথচ ঋজু, ভক্তি ও যুক্তির সমন্বয় ছিল তাঁর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। প্রাচীন বিশ্বাস ও আধুনিক অভ্যাসের সমানাধিকরণ্যে তাঁর জনশিক্ষা এদেশ ওদেশকে সমৃদ্ধ করেছে, তার সামান্য আভাস এখানে পাওয়া গেল। এরপর যাঁর কথা বলা হয়েছে, তিনি প্রথম জীবন শ্রীঅরবিন্দ আশ্রমে কাটিয়ে আমেরিকায় ধর্মপ্রচারে আসেন শ্রীচিন্ময়। বহিরঙ্গে ত্যাগ বৈরাগ্যের চিহ্ন চয়ন করেননি, কিন্তু তাঁর অন্তর অনন্তে তা অবগাহিত। ইনি বিদেশিদের কিছু ভারতীয় অভ্যাস আয়ত্ত করিয়েছিলেন। তাঁর প্রণোদিত সংস্কৃতিতে ধর্ম ও বাংলার সুবাস পরিমিত পরিবেশিত হয়েছে। একাদশতম অশ্বারোহীরূপে শ্রীল অভয়চরণ ভক্তিবেদান্ত স্বামীর আমেরিকায় তারকব্রহ্ম নাম প্রচারের উল্লেখ সংক্ষেপে রয়েছে, তবে তাঁর জগত্‌জোড়া কর্মকাণ্ডের আভাস আরও একটু পেলে ভাল লাগত।

    ধর্ম, দর্শন ও সংস্কৃতি চিরকাল একস্থান থেকে অন্যত্র প্রবাহিত হয়ে নিত্যনূতনরূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। আচার্য শঙ্কর, রামানুজ, মধ্ব এঁরাও পরিব্রাজন করেছেন, ধর্ম, দর্শনের বিস্তৃতি ঘটিয়েছেন, তবে সেটা ভারতের মধ্যে। এবং তাঁদের পূর্বপক্ষও ছিল ভারতে উদ্ভূত কোনও দর্শন। পরবর্তীকালে মহাপ্রভু যখন নামপ্রচার করেছেন, তখনও তার সামাজিক প্রেক্ষিতটি ছিল আলাদা। আর একাদশ অশ্বারোহী পাশ্চাত্যে প্রবল প্রতিকূলতার মধ্যেও সেই পরম্পরা অক্ষুণ্ণ রেখেছেন, কখনও পূর্বপক্ষ খণ্ডন করে স্বপক্ষ মণ্ডন করেছেন, কখনও তাঁদের আন্তর আলোকে ও ভালবাসায় দিগ্বিজয় হয়েছে মসৃণভাবে এই প্রাপ্তির এমন অঙ্গীকারের প্রয়োজন ছিল।

  • courtesy- https://www.desh.co.in
Advertisements

সনাতন ধর্মের গ্রন্থাবলী এবং মার্গ


আমার উল্লেখিত গ্রন্থ গুলি ছাড়াও আরও বিভিন্ন গ্রন্থ আছে আমি আমার জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে প্রধান গ্রন্থ এবং মার্গ গুলি উল্লেখ করতে চেষ্টা করলাম …
সনাতন ধর্মে তিনটে জিনিসের উপর জোর দেওয়া হয়েছে শাস্ত্র, আচার্য এবং বিচার , অর্থাৎ শুদ্ধ শাস্ত্র জ্ঞান জ্ঞানী আচার্য এর নির্দেশানুসারে এবং অন্তরের শুদ্ধ বিচার বোধ দ্বারা প্রক্ষালন করলে তবেই ধর্মের সুমধুর ননী লাভ হয় ।
এই শাস্ত্র গুলিকে মূলত দুই ভাগে বিভক্ত শ্রুতি ও স্মৃতি।
শ্রুতিঃ- প্রাচীন ঋষি এই বাহ্যিক জগতের ঊর্ধ্বে উঠে সূক্ষ্ম জগতের সঙ্গে একাত্ম হয়ে যে জ্ঞান লাভ করেন এবং গুরু শিশ্য পরম্পরায় তা সুর করে গাওয়া হতো, একেই বলে শ্রুতি অর্থাৎ যা শোনা হয়েছিল অপর নাম অপৌরুষয় অর্থাৎ যা মানুষ দ্বারা সৃষ্ট নয়।
এই শ্রুত কিন্তু মানুষ সৃষ্ট নয়, এই ব্যাপারটা অনেকে বোঝেন না। তাঁদের জন্য বলি আমরা প্রতিদিন যে সব শব্দ শুনি তা হত বা একটি জিনিসের সঙ্গে অন্য জিনিসের সংঘর্ষে সৃষ্ট শব্দ (দাঁতের সঙ্গে জিভের বা জিভের সঙ্গে মূর্ধার)। কিন্তু প্রাচীন ঋষি গন তাঁদের গভীর চিন্তনে যা শুনেছেন তাকে বলে অনাহত শব্দ অর্থাৎ আমাদের কানের শ্রবণ যোগ্য ফ্রিকোইনসির নিচের বা উপরের শব্দ অর্থাৎ কোনও কিছুর ঘাত প্রতিঘাতে এই শব্দর উৎপত্তি হয়নি, এই শব্দ শাশ্বত অনাদি তাই একে অপৌরুষয় বলে।( আজকের যুগের হিশাবে আমরা যেমন কসমিক বেকগ্রাউন্ড সাউন্ড শুনি যা কটি কটি বছর আগের বিগ ব্যাং এর সৃষ্ট মাইক্রো ওয়েভ সাউন্ড)
একেই বলে বেদ/वेद বা জ্ঞান, বৈদিক সাহিত্যর দিক থেকে এটি প্রাচীনতম সাহিত্য। আধুনিক বিজ্ঞানীদের মতে এর প্রথম দিকের খণ্ড গুলির রচনা কাল আনুমানিক ১৫ হাজার বছর আগে (পাঠ্য বইয়ের হিশাবে প্রায় নিয়ান্দারথাল মানুষের সময় কাল, শেষ হিম যুগের আগে)।
বেদের ব্যবহারিক ভাবে চার ভাগে ভাগ করা যায় ১/ঋক বেদ ২/সাম বেদ ৩/ যজু বেদ এবং ৪/অথর্ব বেদ।
আবার প্রতিটি বেদের গঠন গত ভাবে চার ভাগে ভাগ করা যায় ১ সংহিতা ২ ব্রাহ্মণ ৩ আরণ্যক এবং ৪ উপনিষদ।
সংহিতা এই অংশে আক্ষরিক অর্থ সহ বা অর্থবোধ ছাড়া মন্ত্র, সাধারণ ভাষণ, প্রার্থনা, প্রার্থনা-সংগীত ও আশীর্বচন সংকলিত রয়েছে। এগুলি প্রকৃতি বা বৈদিক দেবদেবীদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গিত। বৈদিক সংহিতা বলতে বোঝায় গাণিতিক নিয়মে নিবদ্ধ ছন্দে রচিত । বেদের লিখিত পদ গুলি কে মন্ত্র বলে কেবল যজুঃসংহিতার কিছু অংশ গদ্যে রচিত।ঋক বেদে আছে দেবস্তুতি, প্রার্থনা ইত্যাদি। ঋক্‌ মন্ত্রের দ্বারা যজ্ঞে দেবতাদের আহ্বান করা হয়, যজুর্মন্ত্রের দ্বারা তাঁদের উদ্দেশে আহুতি প্রদান করা হয় এবং সামমন্ত্রের দ্বারা তাঁদের স্তুতি করা হয়। অথর্ব-বেদ থেকে পাওয়া যায় তৎকালীন চিকিৎসাবিদ্যার একটি বিস্তারিত বিবরণ। এসব কারণে বেদকে শুধু ধর্মগ্রন্থ হিসেবেই নয়, প্রাচীন ভারতের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, সাহিত্য ও ইতিহাসের একটি দলিল হিসেবেও গণ্য করা হয়।
ব্রাহ্মণঃ-
ব্রাহ্মণ মূলত বেদমন্ত্রের ব্যাখ্যা। এটি গদ্যে রচিত এবং প্রধানত কর্মাশ্রয়ী। আরণ্যক কর্ম-জ্ঞান উভয়াশ্রয়ী এবং উপনিষদ বেদান্ত সম্পূর্ণরূপে জ্ঞানাশ্রয়ী।
বেদের বিষয়বস্তু সাধারণভাবে দুই ভাগে বিভক্ত কর্মকাণ্ড ও জ্ঞানকাণ্ড। কর্মকাণ্ডে আছে বিভিন্ন দেবদেবী ও যাগযজ্ঞের বর্ণনা এবং জ্ঞানকাণ্ডে আছে ব্রহ্মের কথা। কোন দেবতার যজ্ঞ কখন কিভাবে করণীয়, কোন দেবতার কাছে কি কাম্য, কোন যজ্ঞের কি ফল ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের আলোচ্য বিষয়।
আর ব্রহ্মের স্বরূপ কি, জগতের সৃষ্টি কিভাবে, ব্রহ্মের সঙ্গে জীবের সম্পর্ক কি এসব আলোচিত হয়েছে জ্ঞানকাণ্ডে। জ্ঞানকাণ্ডই বেদের সারাংশ।জ্ঞানকাণ্ডের এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে ভারতীয় দর্শনচিন্তার চরম রূপ উপনিষদের বিকাশ ঘটেছে। এসব ছাড়া বেদে অনেক সামাজিক বিধিবিধান, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, শিল্প, কৃষি, চিকিৎসা ইত্যাদির কথাও আছে। এমনকি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কথাও আছে।
এই উপনিষদ গুলি সংখ্যার হিশাবে প্রায় একশোটা আছে কিন্তু যে গুলিকে মুখ্য উপনিষদ হিশাবে আদি গুরু শঙ্করাচর্য্য ব্যাখ্যা করেছেন এবং কমেন্টারি বা সূত্র সাহিত্য রচনা করেছেন সেই ১২ উপনিষদ কে স্মৃতি শাস্ত্রজ্ঞ গন প্রধান উপনিষদ বলে বিবেচনা করেন৷
আমি সেই গুলির নাম উল্লেখ করছি ১/কৌশিকতি ২/ কেনও ৩/ কঠ ৪/ তৈত্তিরীয় ৫/ শ্বেতাশ্বেতর ৬/ মৈত্রেয়আনি ৭/ঈশ ৮/ বৃহদারণ্যক ৯/ মান্ডুক্য ১০/ মুন্ডক ১১/ প্রশ্ন ১২/ ঐতরেয়। এই ঐতরেয় উপনিষদটি ঋগ্বেদ এর অংশ হওয়া সত্যেও তেমন জনপ্রিয় নয় তাই শেষে উল্লেখ করলাম।
এই চার বেদ ছাড়াও কয়েকটি উপবেদ কে পাই আমরা , সেগুলি হলো …
১) আয়ুর্বেদ ২) ধনুর্বেদ ৩) বাস্তুবেদ ও
৪) বৈমানিক শাস্ত্র নামে একটি শাস্ত্রশাস্ত্রও পাই যাতে বিভিন্ন বিমান তথা উড্ডয়ন বিদ্যা নিয়ে গভীর আলচনা পাই , কিন্তু মূল বেদটি পাওয়া যায়না৷
স্মৃতিঃ- অর্থাৎ যা পূর্বে ঘটে ছিল বা ইতিহাস, অর্থাৎ পূর্বের ঘটনা বলি এবং তার বর্ণনা সমূহ। যেমন রামায়ণ মহাভারত এবং পুরাণ সমূহ পড়ে। এখানে অবশ্য উল্লেখ্য যে তবে বর্তমানে যে পুরাণ গুলি আমরা পাই সেই গুলির বেশির ভাগই ভারতে মুসলিম আগমনের পটভূমিকায় সংকলিত এবং পরিবর্ধিত হয়েছে ফলে বহু চূতি এবং ভ্রমের শিকার এই নব্য পুরাণ গুলি। মৎস্য পুরাণ, সূর্য পুরাণ, স্কন্দ পুরাণ, পদ্ম পুরাণ, নারসিংহ পুরাণ, বিষ্ণু পুরাণ , লিঙ্গপুরাণ, কালিকা পুরাণ এগুলির মধ্যে অন্যতম। এর অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য গ্রন্থগুলি হল দেবীমাহাত্ম্যম্, তন্ত্র, যোগসূত্র, তিরুমন্ত্রম্, শিবসূত্রএবং হিন্দু আগম। মনুস্মৃতি হল একটি প্রচলিত নীতিগ্রন্থ, যা সামাজিক স্তরবিন্যাসের উপর নিবন্ধিত সামাজিক নিয়মাবলী, যা ছিল বর্ণাশ্রমের আধার তা আজ কলুষিত হয়ে হয়েছে বর্ণ বিদ্বেষের বীজ, যাই হোক সেই সব অন্য বিষয়।
মার্গঃ-
এই বিভিন্ন ভাবে বিচার ও বিশ্লেষণের জন্য দর্শন শাস্ত্রের ছয় ভাগে বিভক্ত মার্গ বা পথ আছে, এই গুলির নাম
১ ন্যায় ২ বৈশেষিক ৩ শাঙ্খ ৪ পতঞ্জলি যোগ সূত্র ৫ পূর্ব মীমাংসা ৬ উত্তর মীমাংসা ।
১ ন্যায়ঃ- এখানে যুক্তি ও তর্কের পদ্ধতির বিচার করা হয়েছে, অর্থাৎ এই বাস্তবতা কে বিশ্লেষণ করতে যে যুক্তি এবং পদ্ধতিতে মূল্যায়ন করা হবে তার মার্গ নির্দেশক।
২ ভিসেশিকাঃ- আজকের যুগে একে বলা যায় ফিজিক্স, কারণ এখানে পদার্থের পরমাণু এবং তার মূল ভুত অবস্থার বিচারের মাধ্যমে বাস্তবতাকে বুঝবার চেষ্টা হয়েছে।
৩ শাঙ্খঃ- শাঙ্খ এর অর্থ সংখ্যা অর্থাৎ এখানে এই প্রপঞ্চময় বাস্তবতার মূল ভুত যে ২৪ রকমের বাস্তবতা কে নিয়ে বিচার এবং বিশ্লেষণের দ্বারা এই জগতের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করে। এখনে দুই ধরনের বাস্তবতা কে সোপান হিশাবে ধরা হয় ১ পুরুষা ২ প্রকৃতি। পুরুষা বা পুরুষ অর্থে এই ত্রিলোক ব্যাপ্ত চেতনা যার আলোয় এই জগত আলোকিত এবং প্রকৃতি অর্থে আপাতও চেতনা রহিত বস্তু, অর্থাৎ এই স্পর্শ যোগ্য জগত।
৪ পতঞ্জলি যোগ সূত্রঃ- ঋষি পতঞ্জলি প্রণীত অষ্টাঙ্গ যোগা এর মূল বিষয়, ১৯৫ টি যোগ সূত্র বিশিষ্ট এই পতঞ্জলি যোগ সূত্র। এর মূল ভুত পদ্ধতি এই যে স্পর্শ যোগ্য এই জগত অনুধাবন করতে প্রকৃতি সৃষ্ট এই শরীরকে সিঁড়ি হিশাবে ব্যবহার এবং ধীরে ধীরে শ্বাস বায়ু থেকে শুরু করে মানব দেহের উপর নিয়ন্ত্রণ দ্বারা চেতনার গভীরে প্রবেশ করে এই দেহের তথা এই জগতের ঘটনা স্রোতের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রণয়ন করা এবং তার দ্বারা এই মায়া প্রপঞ্চ ছিন্ন করে সত্যর মুখো মুখি হওয়া। এই পতঞ্জলি যোগ সূত্র শাঙ্খ এর উপর ভিত্তি করে সৃষ্ট অর্থাৎ এই দৃশ্যমান জগতের দ্বৈত চেতনার উপর নির্ভর শীল। কিন্তু শাঙ্খ তে ঈশ্বরের উল্লেখ নেই কিন্তু যোগ সূত্রে ঈশ্বরের বিশেষ উপস্থিতি আছে। এখানে ঈশ্বর মনের আরাধ্য এবং এক মাত্র লক্ষ্য যার চেতনা উপলব্ধির মাধ্যম এই যোগ সূত্র।
৫ পূর্ব মীমাংসাঃ- এই স্থানে পুরহিত এবং ঋষি গনের যাগ, যোগ্য এবং হোম এর পদ্ধতি এবং ক্রিয়া কলাপ বর্ণিত আছে। কি পদ্ধতিতে এই ক্রিয়া কলাপ দ্বারা অভীষ্ট লক্ষ্য বা কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ হবে।
৬ উত্তর মীমাংসাঃ-
বেদের শেষে যেহেতু এই অংশটি হয় তাই একে বেদান্তও বলে। এই খানে বেদের সার বা প্রতিটি বেদের নিচোর বা জিস্ট বলা যেতে পারে। এই বেদান্ত সমূহে যে পদ্ধতিতে লেখা হয়েছে তাকে বলে সূত্র বা সুতো অর্থাৎ বহু তুলো বুনে যেমন একটি সুতো তৈরি হয়, তেমনই বহু চিন্তনের প্রকাশ ঘটেছে একটি বা দুটি শব্দের মধ্যে দিয়ে। ফলে একে বুঝতে গেলে এবং আধ্যাত্মিক এবং তাত্ত্বিক জ্ঞানে সমৃদ্ধ গুরুর সাহায্য লাগে। ফলে এই বেদান্ত সমূহের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার বা ভাষ্যর দিক থেকে তিন মহান ঋষির নাম এর সঙ্গে জড়িয়ে আছেন, তাঁরা হলেন শঙ্করাচার্য্য, রামানুজাচার্য্য এবং মাধভাচার্য্য। মূলত এই তিনজনের ব্যাখ্যা সনাতন ধর্মের মূল ভাব ধারা প্রকাশ করে। তবে এরা ছাড়াও আরও অনেক মহান ঋষি এই বেদান্ত বা উত্তরমীমাংসার ভাষ্য করেছেন কিন্তু এঁদের ভাষ্যই সনাতনের মূলভুত তত্ত্ব গুলি উজাগর করে।
এই বেদান্ত সমূহের মূল আলোচ্য বিষয় হোল এই দৃশ্যমান বাস্তবের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার মধ্যে দিয়ে অন্তর্নিহিত বাস্তবতার উপর আলোকপাত করা। এই সুগভীর গ্রন্থ গুলি শুধু ধার্মিক গ্রন্থ বললে খুবই অন্যায় হবে, আধ্যাত্মিক চিন্তার মধ্যদিয়ে এই গুলি যে গভীর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টি ভঙ্গি তুলে ধরেছে তা আজকের যুগেরও যেকোনো সাইন্সের মানুষের কাছে পরম বিস্ময়কর।
এই দৃশ্যমান বাস্তব কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তাঁরা যে পদ্ধতির সাহায্য নিয়েছেন তা বিস্ময় কর। এই দৃশ্যমান বাস্তব কি সত্য না নিছক ভ্রম, ঈশ্বর কি আছেন যদি থাকেন তবে কি রূপে কোথায় তিনি অবস্থান করেন, ঈশ্বরের বৈশিষ্ট্য বা চিন্তনের কি রূপ এই রকম বহু ফিজিক্স এবং মেটা ফিজিক্স এই চিন্তনের ফসল এই এই বেদান্ত সমূহ। এই নিয়ে দশহাজার বছরের নিরন্তর ভাব বিনিময় এবং তর্কের মাধ্যমে যে সিধান্তে এই মহান ঋষি গন উপনীত হন তাই তাঁদের ভাষ্যের বিষয় বস্তু। এই দর্শন কথাটি এই বিভিন্ন ভাবে এই বাস্তবকে ব্যাখ্যা করবার বা দ্যাখ বার কথা বলা হয়।
এই নিরন্তর বিচার এবং চিন্তনের অবজেক্টিভ বা উদ্দেশ্য হোল মোক্ষ, অর্থাৎ এই আপাত প্রপঞ্চ(epiphenomena অর্থাৎ আমাদের পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে যা বারংবার বোকা বানাচ্ছে) ময় জগত হতে নিষ্ক্রমণ এবং ব্রহ্মনে মিশে যাওয়া (Transcendental reality)। অর্থাৎ যে চেতনা (Consciousness) হতে এই জগত সৃষ্টি হয়েছে তাতেই মিশে যাওয়া। এবং এইখানেই অন্য সব ধর্মের থেকে ভিন্ন হয়ে ওঠে সনাতন ধর্ম। এখানে স্বর্গ লাভ কালদোষে দুষি তাই সর্গ লাভ নয়, এই জন্ম মৃত্যু থেকে চিরো মুক্তি খোঁজে সনাতন ধর্ম।
ফলে মোটা ভাবে বলতে গেলে বলতে হয় সনাতন ধর্ম বলে আমরা যা কিছু আমাদের অনুভূতির মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করছি যে ব্যক্তি স্বতন্ত্রতা, এই সময় ও স্থান কাল পাত্রের দূরত্ব এবং সময়। এই সব কি সত্যি? আমি যা কিছু প্রত্যক্ষ করছি তার মাঝে আমার অবস্থান কি? কি ভাবে এই আপাত বাস্তবতার মাঝে আমি আমার গন্তব্য স্থির করব? এবং এই চিন্তনের দ্বারা তাঁরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছেন এই আপাত বাস্তবতার বাইরে আছে আরেক বাস্তবতা আর তার খোঁজই করে এই সূত্র এবং এই সূত্রের ব্যাখ্যা দান করে এই ভাষ্য।
ব্রহ্মসূত্রঃ-
এছাড়া এই উত্তর মীমাংসায় ব্রহ্মসূত্র আরেক বিশেষ গ্রন্থাবলী, ব্রহ্মসূত্র হল ন্যায় প্রস্থান বা যুক্তি ভিত্তিক প্রস্থান।
অর্থাৎ বেদান্ত দর্শনে তিনটি প্রধান ধর্ম গ্রন্থকে বোঝানো হয়
1. উপনিষদ বা উপদেশ-প্রস্থান বা শ্রুতি-প্রস্থান
2. ব্রহ্মসূত্র বা ন্যায়-প্রস্থান বা যুক্তি-প্রস্থান
3. শ্রীমদ্ভগবদগীতা, বা সাধন-প্রস্থান বা স্মৃতি-প্রস্থান
এই তিন গ্রন্থ সমূহকে বলে প্রস্থানত্রয়ী বা प्रस्थानत्रयी।
লিখেছেন- সঞ্জয় চক্রবর্ত্তী।
বৈদিক ভারত

প্রশ্নঃ হিন্দুদের অনেক রাজা সূর্য বংশীয়।এই বংশ সম্পর্কে জানতে চাই ?


প্রশ্নঃ হিন্দুদের অনেক রাজা সূর্য বংশীয়।এই বংশ সম্পর্কে জানতে চাই ?

Image result for indian king

উত্তরঃ
পৌরাণিক ইতিহাস থেকে আমরা দেখতে পাই প্রাচীন কাল থেকে দুটি প্রধান শক্তিশালী রাজবংশ ভারত সাম্রাজ্য পরিচালনা করছে।এই দুটি রাজ বংশের নাম সূর্য বংশ এবং চন্দ্র বংশ। রামায়ণ মহাভারত এবং পুরাণ গুলিতে এই বংশ দুটির শৌর্য, বীর্য, ধর্ম এবং পরাক্রম কীর্তিত হয়েছে। বিভিন্ন পুরাণে এই বংশ দুটির পরম্পরা দেয়া আছে। পুরাণ গুলিতে একই বংশের বর্ণনায় কিছুটা তারতম্য দেখা যায় যেমন – কোন পুরাণে বলা হল পুরুবার পাঁচ পুত্র আবার কোথাও আট। এই বিভ্রান্তির প্রথম কারণ হল এর প্রাচীনত্ব। তবে যারা ইতিহাসের মূল নায়ক তাদের নিয়ে দ্বিমত নেই যেমন- দশরথের পুত্র রাম, পাণ্ডু পুত্র যুধিষ্ঠির প্রভৃতি।

যা হোক সূর্য বংশের কথাতে যাই। প্রজাপতি কশ্যপের পৌত্র বিবস্বান (সূর্য) থেকে সূর্য বংশের উৎপত্তি। এই সূর্য বংশের প্রথম নৃপতি হলেন ইক্ষ্বাকু। তিনি বৈবস্বত মনুর পুত্র। তিনি প্রথম অযোধ্যার সিংহাসনে বসেন। তার প্রধান তিন পুত্র ছিল বিবুক্ষি, নিমি, দন্ডা। বিবুক্ষি অযোধ্যার এবং নিমি মিথিলার রাজা হন। বিবুক্ষির রাজ বংশ থেকেই দশরথ, রামচন্দ্র এবং নিমির বহু পরবর্তী রাজবংশ থেকে জনক প্রভৃতি রাজা হন। এই রাজ বংশ থেকে আর্যাবর্তে অনেক বিখ্যাত রাজ বংশের সৃষ্টি হয় । যেমন যুবনাশ্বের পুত্র– মান্ধাতা, তিনি সম্রাট ছিলেন। পুরাণে তার অনেক প্রশস্তি পাওয়া যায়।

এই বংশের আরেক বিখ্যাত রাজা হলেন রাজা হরিশ্চন্দ্র, যার কথা আমরা সকলেই জানি। সূর্য বংশে বিখ্যাত রাজা সগর জন্ম গ্রহন করেন। তার পুত্রগণ সাংখ্য দর্শন প্রণেতা মহর্ষি কপিলকে অপমান করাতে ধ্বংস হয়ে ভষ্ম হয়ে যায়। সগর রাজা জানতে পেরে তার পৌত্র অংশুমানকে পাঠান মুনির ক্রোধ নিবারণের জন্যে। অংশুমানের প্রশস্তিতে মুনি খুশি হন এবং বর দেন তার পৌত্র ভগীরথ স্বর্গ থেকে গঙ্গা মর্তে এনে তার পূর্ব পুরুষ অর্থাৎ সগর রাজার পুত্রদের রক্ষা করবে। আমরা ভাগীরথের মর্তে গঙ্গা আনবার কাহিনি জানি। ভাগীরথের তপস্যায় ভগবান শিব তার জটাতে চির কল্লোলিনী মা গঙ্গাকে ধারণ করেছিলেন।

এই বংশের আরেক বিখ্যাত রাজা হলেন রঘু, যিনি রঘু বংশের প্রতিষ্ঠাতা, তিনিও সূর্য বংশের আগেই বলেছি। এই রঘু বংশে ভগবান শ্রী রামচন্দ্র জন্ম গ্রহণ করেন। রামচন্দ্রের জীবনী নিয়ে রামায়ণ যা জগত বিখ্যাত। অপরদিকে সূর্য বংশীয় মহারাজ নিমির সপ্তবিংশতি(২৭) পুরুষ রাজা জনক, যিনি মা সীতার বাবা। এই হল অতি সংক্ষেপে সূর্য ও তার বিখ্যাত রাজন্য বর্গের বর্ণনা ।

সূত্র: সুধীর চন্দ্র সরকার,পৌরাণিক অভিধান; দূর্গাদাস লাহিড়ী, পৃথিবীর ইতিহাস।