শ্ৰীচৈতন্যমহাপ্রভুকৃত জগন্নাথ-স্তোত্ৰং/অষ্টকম (মূল শ্লোক ও অর্থ সহ)


শ্ৰীজগন্নাথায় নমঃ!
কদাচিৎ কালিন্দীতট-বিপিন-সঙ্গীতক-রবো
মুদাভীরীনারী বদনকমলাস্বাদ-মধুপঃ।
রমাশম্ভুব্ৰহ্মাসুরপতিগণেশার্চ্চিতপদো
জগন্নাথঃ স্বামী নয়নপথগামী ভবতু মে॥১॥
ভুজে সব্যে বেণুং শিরসি শিখিপিচ্ছং কটিতট
দুকূলং নেত্ৰান্তে সহচর-কটাক্ষং বিদধতে।
সদা শ্ৰীমদ্বৃন্দাবন বসতি লীলা পরিচয়ো
জগন্নাথঃ স্বামী নয়নপথগামী ভবতু মে॥২॥
মহাম্ভোধেস্তীরে কনকরুচিরে নীলশিখরে
বসন্‌ প্রাসাদান্তে সহজবলভদ্ৰেণ বলিনা।
সুভদ্ৰামধ্যস্থঃ সকলসুরসেবাবসরদো
জগন্নাথঃ স্বামী নয়নপথগামী ভবতু মে॥৩॥
কৃপাপারাবারঃ সজলজলদশ্রেণিরুচিরো
রমাবাণী রামঃ স্ফুরদমলপদ্মেক্ষণমুখৈঃ।
সুরেন্দ্রৈরারাধ্যঃ শ্রুতিগণ শিখাগীতচরিতো
জগন্নাথঃ স্বামী নয়নপথগামী ভবতু মে॥৪॥
রথারূঢ়া গচ্ছন পথিমিলিত ভূদেবপটলৈঃ
স্তুতি প্ৰাদুৰ্ভাবং প্রতিপদমুপাকর্ণ্য সদয়ঃ।
দয়াসিন্ধুর্বন্ধু সকলজগতাংসিন্ধুসদয়ো
জগন্নাথঃ স্বামী নয়নপথগামী ভবতু মে॥৫॥
পরব্রহ্মাপীড়্যং কুবলয়দলোৎফুল্ল নয়নো
নিবাসী নীলাদ্রৌ নিহিতচরণোহনন্ত শিরসি।
রসানন্দো রাধাসরসবপুরালিঙ্গন সুখো
জগন্নাথঃ স্বামী নয়নপথগামী ভবতু মে॥৬॥
ন বৈ যাচে রাজ্যং ন চ কণকমাণীক্যবিভবং
ন যাচেহহং রম্যাং সকলজনকাম্যাং বরবধূম্‌।
সদা কালে কালে প্ৰমথপতিনা গীতচরিতে
জগন্নাথঃ স্বামী নয়নপথগামী ভবতু মে॥৭॥
হর ত্বং সংসারং দ্রুততরমসারিং সুরপতে
হর ত্বং পাপানাং বিততিমপরাং যাদবপতে।
অহো! দীননাথং নিহিতমচলং নিশ্চিতপদং
জগন্নাথঃ স্বামী নয়নপথগামী ভবতু মে॥৮॥
জগন্নাথাষ্টিকং পুণ্যং যঃ পঠেৎ প্ৰযতঃ শুচিঃ
সৰ্ব্বপাপ বিশুদ্ধাত্মা বিষ্ণুলোকং সগচ্ছতি॥৯॥
যিনি এক সময়ে কালিন্দী তটবৰ্ত্তী বিপিন মধ্যে সঙ্গীত শ্ৰবণে চঞ্চল হইয়া প্রীতিভরে ভৃঙ্গের ন্যায় গোপাঙ্গণাগণের বদনকমল আস্বাদন করিয়াছিলেন; লক্ষ্মী, শিব, ব্ৰহ্মা, ইন্দ্র ও গণেশ যাহার পদযুগল অৰ্চনা করেন, সেই প্ৰভু জগন্নাথ আমার নয়ন পথবৰ্ত্তী হউন॥১
যিনি বামভুজে বেণু, মস্তকে ময়ুরপিচ্ছ এবং কটিতটে পীতাম্বর ও নয়ন প্ৰান্তে সহচরী গোপালাদিগের প্রতি কটাক্ষপাত করিয়া সদা বৃন্দাবন ধামে বাস ও লীলা করিতে প্ৰবৃত্ত আছেন, সেই প্ৰভু জগন্নাথ আমার দৃষ্টি পথগামী হউন॥২
যিনি মহাসমুদ্রের তীরদেশে, কনকোজ্জল নীলাদ্রির শিখরে প্রাসাদাভ্যন্তরে বলশালী বলরাম ও সুভদ্রার মধ্যভাগে বাস করিতেছেন, যিনি সমস্ত দেবগণকে সেবা করার নিমিত্ত অবসর প্রদান করিতেছেন সেই প্ৰভু জগন্নাথ দেব আমার নয়ন পথবৰ্ত্তী হউন॥৩
যিনি কৃপাসিন্ধু তুল্য, যিনি সজল-জলধারা-রুচির কান্তি, লক্ষ্মীসরস্বতী যাহার বামভাগে অবস্থিত, যাহার মুখমণ্ডল অমল কমলবৎ শোভমান, দেবেন্দ্ৰগণ যাঁহাকে আরাধনা করিয়া থাকেন, শ্রুতি সমূহ যাহার চরিত্র গান করেন, সেই প্ৰভু জগন্নাথ দেব আমার নয়নপথগামী হউন॥ ৪
রথে আরোহণ করিয়া গমন করিলে পথিমধ্যে ব্ৰাহ্মণগণ মিলিত হইয়া যাহার স্তব করিয়া থাকেন, যিনি তাদৃশ স্তব শ্রবণে পদে পদে প্ৰসন্ন হয়েন, সেই দয়াসিন্ধু, সকল জগতের বন্ধু, সমুদ্রের প্রতি সদয় হইয়া তত্তীরবাসী সেই জগন্নাথ স্বামী আমার নয়ন পথগামী হউন॥ ৫
নিরাকার পরব্রহ্ম স্তবনীয় হইলেও সাকার অবস্থায় যাঁহার নেত্র কুবলয়দলের ন্যায় প্ৰফুল্ল যিনি নীলাদ্রির উপরে অনন্তের শিরে পদার্পণ করিয়া বাস করতঃ শ্ৰীরাধিকার রসময় দেহ আলিঙ্গনে সুখী, সেই প্ৰভু জগন্নাথ আমার নয়নপথগামী হউন আমি রাজ্য চাহি না, স্বর্ণ মাণীক্যাদি বিভবও প্রার্থনা করি না এবং সকল লোক কমনীয়া মনোহারিণী কামিনীও চাই না, আমি সর্ব্বদা একান্ত মনে প্রার্থনা করি যেন ভূতনাথ যাঁহার চরিত্র কীৰ্ত্তন করেন সেই প্ৰভু জগন্নাথ আমার নয়নপথগামী হয়েন॥৭॥
হে সুরপতে! তুমি আমার এই অসার সংসার হরণ কর, হে যাদব পতে! তুমি আমার অশেষ পাপভার ও হরণ কর। যিনি দীন ও অনাথ জনে নিশ্চয় চরণ সমৰ্পণ করেন, সেই এই প্ৰভু জগন্নাথ দেব আমার নয়নপথগামী হউন ৷৷ ৮
যে ব্যক্তি শুচি হইয়া, এই জগন্নাথাষ্টক পাঠ করে, সে ব্যক্তি সৰ্ব্ব পাপ হইতে বিশুদ্ধ হইয়া বিষ্ণুলোকে গমন করিয়া থাকে॥ ৯
#কৃষ্ণকমল।
অডিও ভিডিও- https://www.youtube.com/watch?v=Tb1hIN4YvSMhttp://www.youtube.com/watch?v=Tb1hIN4YvSM

Advertisements

বিজ্ঞান ও অবতার বাদে নৃসিংহ দেবতা।



বিষ্ণুর চতুর্থ অবতার নৃসিংহ=নৃ=অর্থে চালক, পথপ্রদর্শক। হিংস ধাতৃর্থ=হিংসা করা, যিনি চালক এবং হিংসা করেন তিনি নৃসিংহ। যিনি স্থূলদেহে আবদ্ধ হয়ে সূক্ষ্ম বিষয় বিস্মৃত হয়েছেন, অথচ যাকে চালিয়ে নিয়ে যান! এর শ্রৌত প্রমাণ “পরাঞ্চিখানি ব্যতৃনৎ স্বয়ম্ভূঃ”।
মানব ভ্রুণের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করলে আমরা দেখতে পাই। প্রথমে একরাত্রে তার কলল অর্থাৎ শুক্রশোণিতে মিশ্রণ হয়, পঞ্চরাত্রে বুদ বুদ্‌ দশ দিনে বদরী ফলের ন্যায় কঠিন তারপর পেশী অর্থাৎ মাংসপিণ্ডের আকার বা অণ্ডাকার ধারণ করে।
১) বুদ্বুদ ২) কলল অবস্থার পর ভ্রুণের প্রথম তাপের প্রভাবে বহিরাবরণ(Chorion) দৃশ্যত হয়, যেমন গোলাকার লোহাকে তাপ দিলে, যখন লৌহপিণ্ড গলতে আরম্ভ করে, তখন তার বাইরের আবরণ প্রথমে গলতে আরম্ভ করে, তেমনি এই তৃতীয় অবস্থায় তার বাইরের আবরণের ক্রিয়ার সূচনা আরম্ভ হয়ে থাকে, আত্মা সচ্চিদানন্দময় হয়েও সত্ত্ব রজ ও তম ময় প্রকৃতিকে অবলম্বন করেই মাতৃগর্ভে প্রবেশ করে। কোন বীজই মাটির সংস্পর্শে না হলে কখন ও বৃক্ষরূপে পরিণত হতে পারে না। ভূমি সংলগ্ন হলে বীজ বৃক্ষে পরিণত হয়। মনই সংসার বৃক্ষের বীজ। সত্ত্ব রজ ও তম, এই ভূমিতে রোপন করা হলে সূক্ষ্মভাবে, আত্মার সাথে মন অবতরণ করে অরূপ জগৎ; রূপ জগৎ এবং ভূবর্লোকের ভিতর দিয়ে স্থূল, দৃশ্যগোচর জগতে পতিত হয়ে, মৎস্য-কূর্ম এবং বরাহ অবতারের পর অর্দ্ধনর ও অর্দ্ধ পশুদেহ লাভ করে, নর ও পশুর মধ্যে অবস্থায় উপনীত হয়। অন্তর ও বাহ্য দ্বিবিধভাবে এই কাজ আরম্ভ হল, এই দ্বিবিধভাবের দুই শক্তিই হিরণ্যাক্ষ ও হিরণ্যকশিপু। অন্তররাজ্যের মধ্যে এই শক্তি লাভের পর, বাহ্য শক্তির বিকাশ আরম্ভ হল। পরবর্তি সাত অবতারের মধ্যে চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ অবতারে জড়ের মধ্যে চৈতন্যের প্রবেশ, তারপরে সপ্তম অবতারে জড় ও চৈতন্য সমভাবে অবস্থানের পর ক্রমে অষ্টম, নবম ও দশম অবতারে জড়কে জয় করে চৈতন্যের পূর্ণ অভিব্যক্তি লাভ। জড়ের মধ্যে চৈতন্যের প্রবেশ তমের কাজ। জড়কে পরাজয় করে চৈতন্যের অভিব্যক্তি সত্বগুণের কার্য্য এবং মধ্য অবস্থাই রজোগুণের কার্য্য। এইগুলি অন্যভাবে বুঝতে হলে, দেখব প্রথমে দেহ, তাহার পর প্রাণ তাহার পর কামনা, তাহার পর কামনা যুক্ত মন, তাহার পর শুদ্ধ মন, তাহার পর বুদ্ধি, এবং সর্ব্ব শেষ আত্মা। ভ্রুণতত্ত্ব মধ্যে যখন বাহ্য আবরণ স্বরূপ Chorion বিনির্ম্মিত হল, তখনই মধ্য বিন্দুস্থিত ভ্রুণ বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়ে আবরন গুলি একটির পর অপরটি ক্রমে লাভ করে সপ্তমাসে জীব সকল অঙ্গগুলি লাভ করে, ক্রমে অঙ্গগুলির পূর্ণ পরিণতির জন্য দশমাস অতিক্রম করে গর্ভ হতে নির্গত করে থাকে।
এই(অবতারে) জীবের অন্তরে দুই শক্তির আবির্ভাব হয় হিরণ্যাক্ষ এবং হিরণ্যকশিপু=আবরণ ও বিক্ষেপ শক্তি। ভ্রুণের মধ্যে কেন্দ্রশক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে আবরণ শক্তির বিকাশ ও Chorion উদ্ভবের পর হতে দেখা দেয়। প্রথম তিন অবতারে ঐতিহাসিক ভাবে মৎস্য, কূর্ম ও বরাহের পর দুই শক্তির বিকশের প্রতীক রূপে উভয় শক্তিকে সংহার করে তাকে আয়ত্ব করে উভয় শক্তির পরিণতির ফলস্বরূপ সর্ব্বত্র, এমন কি স্থুল স্তম্ভ ও যে তাঁর আবির্ভাব স্থান, তাহাও বর্ণিত হয়েছে।
পূর্ব্বে বলেছি যিনি চালক ও হিংসা করেন তিনি নরসিংহ। এই হিরণ্যকশিপুর পুত্র প্রহলাদ আত্মা স্বরূপ, আন্তরে প্রকটীভূত হন; কিন্তু বাইরে এই আত্মানন্দ প্রকাশের আবরণ স্বরূপ দেহ, প্রাদুর্ভূত হয়ে এই আন্তরের বিষয় উপলব্ধি করতে বাধা প্রদান করে। গর্ভাবস্থায় ভ্রুণের এই দুই অবস্থা লাভের সাথে বিশেষ সাদৃশ্য রয়েছে।
জয় ভগবান বিষ্ণুর অবতার নৃসিংহদেবের জয়।
#কৃষ্ণকমল

শ্রীনৃসিংহদেবের কথা


ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তি নির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের হরি-কথামৃত
আজকে খুবি শুভ দিন—ভগবান শ্রীনৃসিংহদেবের আবির্ভাব তিথি । ভক্তকে রক্ষা করবার জন্য ভগবান আবির্ভূত হয়েছেন আজকে দিনে ।

সমস্ত কিছু ভগবানের ইচ্ছায় হয় ।

হিরণ্যকশিপু আর হিরণ্যাক্ষ আসলে দুই ভাই বৈকুণ্ঠের দ্বাররক্ষক ছিলেন, তাদের নাম জয় আর বিজয় ছিল । এক দিন যখন নারায়ণ ও লক্ষ্মীদেবী তার ঘরের ভিতরে বিশ্রাম করছিলেন, জয় আর বিজয় পাহারা দিলেন, তখন ব্রহ্মার চারি পুত্র উলঙ্গ অবস্থায় সেখানে চলে গিয়েছিলেন । জয় আর বিজয় তাচ্ছিল্য করছিলেন, “তোমাদের এখানে যাওয়া হবে না ।” যে তারা ব্রহ্মার পুত্র ছিলেন, সে তারা জানতেন না, তাই তারা শিশুদের তাড়িয়ে দিয়েছিলেন । তখন শিশুর মধ্যে একজন বললেন, “তোমাকে আমরা অভিশাপ দেব ! তোমাদের এই মর্ত্যে ফিরে আসতে হবে আর বৈকুণ্ঠে থাকতে পারবে না ।” জয় আর বিজয় অবাক হয়ে গেলেন ।

এই সময় ভিতর থেকে নারায়ণ চেঁচামেচি শুনে বাহিরে চলে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “কি হয়েছে ?”

জয় আর বিজয় বললেন, “প্রভু, আমরা আপনার দ্বাররক্ষক আর এই ছেলেটা আমাদের আপনার বিশ্রামে বিঘ্ন করতে বললেন, রাজি হয়ে গেলাম না, তখন তারা আমাদের অভিশাপ দিয়ে দিলেন ।”

নারায়ণ তখন বললেন, “তথাস্তু ! ঠিকই হয়েছে, তাই হবে ।”

“সে কি ? আমাদের মর্ত্যে যেতে হবে ??”

“যখন তারা অভিশাপ দিয়েছে, তখন যেতে হবে ।” (সব কিছু ভগবানের ইচ্ছায়ই হয়েছে ।) তখন নারায়ণ তাদেরকে এক শর্ত দিলেন, “যদি এই জন্মে এসে আমার সঙ্গে মিত্রতা কর, আমার পূজা, সেবা কর, তাহলে সাত জন্ম লাগবে । আর যদি আমার সঙ্গে শত্রুতা কর, তাহলে তিন জন্ম লাগবে । কোনটা করবে ?”

“প্রভু, তাড়াতাড়ি চলে আসব আপনার কাছে—আমরা শত্রুই থাকব !”

তখন তারা সত্যযুগে হলেন হিরণ্যকশিপু আর হিরণ্যাক্ষ, ত্রেতাযুগে হলেন রাবণ আর কুম্ভকর্ণ, আর দ্বাপরে হলেন শিশুপাল আর দন্তবক্র—তারা সবসময় কৃষ্ণের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন ।

হিরণ্যকশিপু আর হিরণ্যাক্ষ দুই ভাই হলেন । সেই দুই ভাই অসুর সবাইকে উৎপাটন করতে শুরু করলেন । উহু, কত ভীষণ অত্যাচার তারা করতে লাগলেন ! স্বর্গ থেকে দেবতারা উৎপাত সহ্য করতে না পেরে স্বর্গ রাজ্য থেকে পলায়ন করল । এটা শুনে হিরণ্যাক্ষ আরও বেশি অত্যাচার করতে লাগলেন, তখন ভগবান রেগে রেগে শূকর-রূপ ধারণ করে হিরণ্যাক্ষকে বধ করলেন ।

তখন যে তার ভাই মরে গেলেন হিরণ্যকশিপু শুনে আরো বেশি রেগে গেলেন । তখন কি করলেন ? জঙ্গলে চলে গিয়ে ব্রহ্মার ধ্যান করতে লাগলেন । না খেয়ে দেয়ে হাজার হাজার বছর ধরে তপস্যা করেছিলেন তিনি, তখন ব্রহ্মা তার তপস্যায় খুব খুশি হয়েছেন । অসুরটার কাছে হাজির হয়ে ব্রহ্মা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “বল তুমি কি বর চাও ?”

“আমি অমরতা চাই ।”

“এটা তো আমার বাহিরে, এটা আমার হাতে নয় । আমার অনেক আয়ু আছে কিন্তু আমারও এক দিন এই দেহ ছাড়তে হবে । আমি এটা তোমাকে দিতে পারব না । আর অন্য কিছু চাও ?”

হিরণ্যকশিপু খানিক ভেবে বললেন, “তখন আমি চাই যে, আমি দিনেও মরব না, রাতেও মরব না ।”

ব্রহ্মা বললেন, “ঠিক আছে ।”

“আমি তোমার কোন সৃষ্ট জীব দ্বারা মরব না ।”

“তাও ঠিক আছে ।”

“আমি আকাশেও মরব না, মাটিতেও মরব না, পাতালেও মরব না ।

“তাও ঠিক আছে ।”

“আমি ঘরেও মরব না, বাহিরেও মরব না ।”

“তাও ঠিক আছে । তুমি যেই বরটা চাও, আমি তোমাকে এই বর দিয়ে দিলাম ।”

এই ফাঁকে হিরণ্যকশিপু তার স্ত্রী বাড়িতে রেখে গেছিলেন—তার নাম ছিল কয়াধু । যখন হিরণ্যাক্ষকে ভগবান বধ করেছিলেন, দেবতারা আবার স্বর্গে ফিরে আসল । এক দিন তারা হিরণ্যকশিপুর বাসস্থানে এসে অসুরের বাড়িটা লণ্ডভণ্ড করল । কয়াধুকে একা দেখে তারা ওকে নিয়ে চলে গেল হত্যা করতে । মাঝখানে রাস্তায় নারদের সঙ্গে দেখা হয় ।

নারদ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা একে নিয়ে কোথায় যাচ্ছো ? মহিলাটার স্বামী এখন ব্রহ্মার ধ্যান করতে জঙ্গলে গিয়েছেন, তোমরা কোথায় একে নিয়ে যাচ্ছো ?”

“একে মেরে ফেলে দিতে যাচ্ছি ! এর গর্ভে হিরণ্যকশিপুর সন্তান আছে, এ সন্তানটা যদি জন্ম গ্রহণ করে, তাহলে সেও অসুর হবে । আমরা এটা সহ্য করতে পারব না !”

নারদ তখন তাদেরকে বুঝিয়ে দিলেন, “তোমরা জান না, এই গর্ভে যে সন্তান হবে, সে মহান ভক্ত হবে আর তোমাদেরটি রক্ষা করবে । বরং মহিলাকে আমার কাছে দিয়ে দাও ।”

তাই, কয়াধু নারদের সঙ্গে তার আশ্রমে চলে গেলেন । সেখানেই তিনি ঠাকুরের বাসন মাজা, সব কিছু সেবা, পূজা করতে লাগলেন, আর যখন নারদ প্রত্যেক দিন ভাগবত্ পাঠ করতেন, তখন প্রত্যেক দিন সেই কয়াধু শ্রবণ করতেন । ভাগবতে যে শিক্ষাগুলো দিয়েছেন, প্রহ্লাদ মহারাজ মায়ের পেটে বসে সেগুলাই শ্রবণ করেছেন আর পরে তিনি বাবাকে আর স্কুলের বালকগণকে সেই শিক্ষা দিতেন ।

কয়াধুর সেবায় খুব খুশি হয়ে নারদ তাকে একদিন বললেন, “কয়াধু, তোমার সেবায় আমি খুব খুশি হয়েছি, তুমি কি বর চাও, বল ।” কয়াধু বললেন, “হিরণ্যকশিপু চলে যাচ্ছে বনে ব্রহ্মার ধ্যান করতে, সে অসুর হল—ও তো আমার স্বামী… আপনি আমাকে এমন বর দেন—স্বামী ফিরে না আসা পর্যন্ত আমার সন্তান প্রসব হবে না । সে বরটা আমাকে দেন ।” নারদ রাজি হয়ে তাকে ওই বরটাই দিয়ে দিলেন ।

এদিকে হিরণ্যকশিপু ব্রহ্মার কাছ থেকে বর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে ফিরে আসলেন । এসে তিনি দেখলেন যে, বাড়িটা লণ্ডভণ্ড ছিল—রেগে গিয়ে তিনি হুংকার দিলেন, “কোথায় গেল আমার স্ত্রী ?!” কেউ তাকে বলল, “নারদ মুনি এখানে এসে নিয়ে গেলেন, আপনার স্ত্রী তাঁর আশ্রমে ।” নারদ গোস্বামীর আশ্রমে গিয়ে হিরণ্যকশিপু স্ত্রীকে নিয়ে চলে আসলেন । তখন তার সন্তান প্রসব হল, নাম রাখল প্রহ্লাদ ।

আস্তে আস্তে প্রহ্লাদ বড় হতে লাগল । অসুরদের গুরু ছিল শুক্রাচার্য্য, তার দুই পুত্র ছিল, ষণ্ড আর অমর্ক । হিরণ্যকশিপু ছেলেকে তাদের কাছে পড়তে পাঠিয়ে দিয়ে আজ্ঞা দিলেন, “সাম-দান-দণ্ড-ভেদ সবগুলো শিক্ষা তাকে দাও—কার সঙ্গে দণ্ড করতে হবে, কার সঙ্গে ভেদ জ্ঞান করতে হবে, এ সব শিক্ষা দেবে ।” কিন্তু যা ষণ্ড-অমর্ক শিক্ষা দিচ্ছে, প্রহ্লাদের ওই সব কিছুই কানে যাচ্ছে না ।

একদিন হিরণ্যকশিপু ষণ্ড-অমর্কে ডাকলেন, “আমার ছেলে কি শিখেছে ? তাকে একবার নিয়ে চলে এস !” প্রহ্লাদ বাড়িতে এলেন, মা তাকে নতুন জামা-কাপড় পরিয়ে, সব কিছু করে, আর বাবার কাছে বসিয়ে দিলেন । তখন বাবা ছেলেকে নিজের কোলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “বাবা, তুমি এই স্কুলে পড়লে কি ভালো শিক্ষা পেয়েছো ? তুমি যেটা ভালো শিখেছো তার মধ্য থেকে একটা সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা বল ।”

প্রহ্লাদ বললেন, “বাবা, আমি শিক্ষাটা বলব ।” তখন বললেন,

ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ ।
অনাদিরাদির্গোবিন্দঃ সর্ব্বকারণকারণম্ ॥

যখন এটা শুনলেন, হিরণ্যকশিপু তাকে এবার কোল থেকে ছুড়ে ফেলে দিলেন, “এটা আমার ঘরে শত্রু জন্মিয়েছে !! আমার ঘরে শত্রু হয়েছে !” ষণ্ড-অমর্ককে ডাক করে বললেন, “ও রে ! আমার ছেলেকে তোমরা কি শেখাচ্ছ ?!”

ষণ্ড-অমর্ক সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “প্রভু, বিশ্বাস করুন, এসব শিক্ষা আমরা তোকে কোন দিন দেইনি ! কোথা থেকে যে পেয়েছে আমরা বুঝতে পারছি না ।”

হিরণ্যকশিপু তখন তাদেরকে কঠোর নির্দেশ দিলেন, “ভালো করে লক্ষ্য রাখ ! তোমাদের স্কুলে অন্য কেউ আসে, কেউও তা শিখিয়ে দেয় !”

“ঠিক আছে ।”

প্রহ্লাদ কি করলেন ? যে স্কুলে অসুর ছিল, তাদের দলে নিয়ে আসল—স্কুলের মাস্টরমশাইটা যা বলতেন, প্রহ্লাদ তাদেরকে উলটো কথা বলতেন ।

আর এক দিন হিরণ্যকশিপু বাড়িতে প্রহ্লাদকে নিয়ে এলেন, আবার জিজ্ঞেস করলেন, “বল, কি ভালো শিক্ষা শিখেছিস তুই ? মাস্টরমশাইটা কি শিখিয়েছে ?”

প্রহ্লাদ তখন বললেন, “শ্রবণং, কীর্ত্তনং, স্মরণং, বন্দনং, পাদ-সেবনম্, দাস্যং, সখ্যম, আত্মনিবেদনম…”

“এ কি ??! এসব কি বলছিস ?!”

একবারে হিরণ্যকশিপু রেগে হয় আর কি ! হুংকার দিয়ে বললেন, “কুলাঙ্গার !” আর মনে মনে ভাবলেন, “একে যে অবস্থা হয়, একে বধ করতে হবে !”

নানা উপায় চেষ্টা করেছিলেন হিরণ্যকশিপু তার ছেলেকে মেরে ফেলতে—জলের মধ্যে ফেলে দিলেন, হতির পায়ের মধ্যে বেঁধে দিলেন, সাপের বিষ দিলেন, আগুনের মধ্যে ফেলে দিলেন, বিভিন্ন উপায় চেষ্ঠা করলেন কিন্তু কিছু তেই তাকে মারতে পারচ্ছেন না ! অনেক বহুবার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু বিফল ।

তখন হিরণ্যকশিপু তার লোক ডেকে বললেন, “তোমার দ্বারা কিছু হবে না, আমার কাছে তাকে নিয়ে চলে এস ! আমি তাকে উচিত শিক্ষা দিয়ে দেব !” প্রহ্লাদ তার পাশে এসে বসলেন ।

হিরণ্যকশিপু হুংকার দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তুই এই শিক্ষা কোথা থেকে পেয়েছিস ?”

প্রহ্লাদ শান্ত স্বরে বলল, “বাবা, আমাকে যাঁর শিক্ষা, সেই শিখিয়ে দিয়েছেন ।”

“মাস্টরমশাইও বলছেন এটা তার শিক্ষা নয় !” মনে মনে বললেন, “তোমরা মারতে না পারলে, আমি ও ব্যবস্থা নিচ্ছি !” আবার বললেন, “হে কুলাঙ্গার ! বল, তুই এই শিখা কোথা থেকে পেয়েছিস ? আগুনে পুড়ে মরছিস না, জলের মধ্যে ফেলে দিলে ডুবে মরছিস না, তোকে পাহাড় থেকে ফেলে দিলাম, তুই মরলি না ! বল ! তোকে কে এমন বল দিয়ে দিল ?”

“হে পিতা ঠাকুর ! আপনি যে বলে বলীয়ান, আমিও সেই বলে বলীয়ান । আপনি যেখান থেকে বল পেয়েছেন, আমিও সেখান থেকে পেয়েছিলাম । আপনি ব্রহ্মার কাছ থেকে বল পেয়েছেন আর ব্রহ্মা তার শক্তি কৃষ্ণ থেকে পেয়েছিলেন । আপনি ব্রহ্মার কাছ থেকে বল পেয়ে অহঙ্কারে একবারে মত্ত হয়ে ভুলে গিয়েছেন আপনি বলটা কোথা থেকে পেয়েছেন । সব বল হরির কাছ থেকে ।”

“আ ! তুই বারবার ‘হরি’, ‘হরি’ বলছিস, তোর হরি কোথায় আছে ?”

“কৃষ্ণ সর্বত্রই আছেন ।”

“তোর হরি কোথায় থাকে ?”

“হরি কোথায় না থাকে ?”

“সব জায়গায় আছে ? হরি এই স্তম্ভের মধ্যেও আছে ?”

“হ্যাঁ, এখানেও আছে ।”

“এখানে আছে তোর হরি ?!!!”

তখন হিরণ্যকশিপু স্তম্ভে ঘুষি মারলেন—স্তম্ভটা ভেঙ্গে পড়ে গেল আর সেখান থেকে বিশাল চিৎকার শুরু হয়ে গেল ! চিৎকারটা শুনে দেবতারা উপরে ভয়ে কাঁপতে শুরু করল । লক্ষ্মীদেবীকে সবাই বলল, “লক্ষ্মী, তুমি যাও, প্রভুর হুংকারে এই পৃথিবী লয় হয়ে যাবে !”

লক্ষ্মী বললেন, “আমি পারব না, আমি খাণ্ডার নারায়ণে সেবা করলেই প্রভু আরো রেগে যাবেন ।”

তখন স্তম্ভ থেকে নৃসিংহদেব (আধ নর, আধ সিংহ) আবির্ভুত হলেন । তাকে দেখে হিরণ্যকশিপু খুব উদ্দণ্ড মত্ত হয়ে যাচ্ছে আর নৃসিংহদেবও খুব উন্মত্তও হয়ে যাচ্ছে । ভগবান জয় আর বিজয় বলেছিলেন, “তোমাদের সঙ্গে লড়াই করব,” সে লড়াইটার কথা তিনি মনে করছিলেন ।

তখন হিরণ্যকশিপুর সঙ্গে নৃসিংহদেবের জোর লড়াই হচ্ছে । সব দেবতারা বলছেন, “হায় হায় ! হায় হায় কি হলো ? আমার প্রভু এক্ষুনি হেরে যাবে ! যদি ভগবান হেরে যায়…” কিন্তু ভগবান হিরণ্যকশিপুকে হাত থেকে ছুটতে দিয়ে তখনই তাকে আবার হাতে ধরলেন আর আবার ফট্ করে ছুড়ে দিলেন—ভগবানের ইচ্ছা করে ছেড়ে দিলেন । দেবতারা ভয় পেয়ে বললেন, “হায় হায় ! প্রভু জয় করবে ? জয় করবে না ? প্রভু লড়াই হেরে গেলেন ?!” তখন হিরণ্যকশিপু নৃসিংহদেবের শ্রীঅঙ্গে আঘাত করলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে আর সময় না দিয়ে নৃসিংহদেব তাকে ধরে তুলে ফেললেন । তারপর নৃসিংহদেব তাকে তুলে ঊরুর মধ্যে রেখে (ব্রহ্মা তাকে বর দিলেন যে, তিনি মাটিতে মরবে না, আকাশে মরবে না, পাতালে মরবে না, কোন অস্ত্র দ্বারা মরবে না, প্রভৃতি ।) নখ দিয়ে তার উদরটা ছিঁড়ে ফেললেন আর নাড়িভুঁড়িটাকে বাহির করে গলায় পড়লেন !

তারপরে, প্রহ্লাদ মহারাজকে দেখে খুব আনন্দ পেলেন নৃসিংহদেব । ভগবান বললেন, “প্রহ্লাদ, বাবা, তুমি একটা কিছু বর চাও ?”

প্রহ্লাদ বললেন, “প্রভু আমি আর কি বর চাইব ? তুমি আমাকে কৃপা করবার জন্য এসেছো, প্রভু, আমি আর কিছু চাই না…”

“না, কিছু নিতে হবে ।”

“তাহলে এই বর দাও—আমার বাবা তোমার শ্রীঅঙ্গে আঘাত করেছেন—আমার বাবাকে উদ্ধার কর, কৃপা কর ।”

“তোমার বাবা আমার অঙ্গ স্পর্শ করেছে । আমার যে কীর্ত্তন করে, আমার যে নাম করে, আমাকে যে একবার দর্শন করে, সে কৃপা পেয়ে চলে যাচ্ছে, আর তোমার বাবা আমাকে স্পর্শ করেছে—সে যখন রাগে লড়াই করে মারামারি খেলায় করলে, তবু আমাকে স্পর্শ করে সে আমার ধাম প্রাপ্ত হয়ে গেছে । তাহলে এটা বর নয় । বল আর কি বর চাও ? কি বর আমি তোমাকে দিতে পারি ?”

তখন প্রহ্লদ বললেন, “আর কি চাইব ? তোমার যদি কিছু দিতেই হয় আমাকে, তখন এই বর আমি চাই—আমি চাই যে আমার জন্য চাওয়ার বাসনাটা কেটে যায়, এই বর দাও ।”

এইটা হল main (মূল) শিক্ষা । ভগবানের কাছ থেকে চাওয়ার বাসনাটা কেটে যেতে হবে । ভগবানকে নিজের ইন্দ্রিয়তর্পণ করবার জন্য আমরা সবসময় এই চাই, সেই চাই—এইটা বন্ধ করতে হবে । প্রহ্লাদ মহারাজ, হিরণ্যকশিপু, নৃসিংহদেবের অর্থ হয়েছে যে, লোকেরা নৃসিংহদেবের কাছে সবসময় বলে, “আমার ছেলে চাকরি হোক,” “মেয়ের বিয়ে হোক,” “শরীর ভালো হোক,” “টাকা-পয়সা হোক” ইত্যাদি । যে শুদ্ধ ভক্ত, সে প্রার্থনা করে, “ভগবান, আমি তোমাকে একমাত্র প্রার্থনা করি, যেন শুদ্ধ ভক্তি আর তোমার চরণে অচলা ভক্তি থাকে, তোমার চরণে যেন রতিমতি থাকে, যেন তোমার করুণায় তোমার জন্য চিরন্তর আমি সেবা করতে পারি । ভক্তির বিনাশ না হয় তুমি শুদ্ধ ভক্তির বিঘ্ন বিনাশ কর ! ওই মায়ার কবলে পড়ে যেন আমার কোন ভক্তিতে বিনাশ না হয়, সেইটা তুমি একবার দেবে । সেই আমি বরটা চাই, নিজের ইন্দ্রিয়তর্পণের জন্য কিছু চাই নি !”

জয় শ্রীলগুরুমহারাজ কী জয় !

শ্রীনৃসিংহদেবের চতুর্দশী ব্রত মাহাত্ম্য


” বৈশাখ মাসের শুক্লা চতুর্দশীতে শ্রীনৃসিংহদেব আবির্ভুত হয়েছিলেন,,তাই এই তিথিতে ব্রতপালন পুর্বক তাঁর পুজা ও উৎসব করতে হয়।।
শ্রীনৃসিংহদেব বলেছেন,,আমার ব্রতদিন জেনেও যে ব্যক্তি লঙ্ঘন করে, চন্দ্র-সুর্য যতদিন থাকবে ততদিবসে নরক যাতনা ভোগ করবে। যদিও আমরা তাঁর ভক্তরা এই ব্রত পালন করে থাকি,,তবুও প্রত্যেকের এই ব্রত পালন করার অধিকার আছে।।
প্রহ্লাদ মহারাজ ভগবান শ্রীনৃসিংহদেবের কাছে প্রার্থনা করে বললেন,,,, হে ভগবান, হে নৃসিংহদেব, হে সকল দেবগণের আরাধ্য প্রভু আপনাকে প্রণাম জানাই। এবং আমি জিজ্ঞাসা করছি,, হে প্রভু , তোমার প্রতি আমার ভক্তি কিরুপে উৎপন্ন হল? কিরুপে আমি আপনার প্রিয় ভক্ত হলাম,,,,,?
শ্রীনৃসিংদেব বললেন,, হে বুদ্ধিমান একান্ত মনে শোনো। প্রাচীন কালে তুমি ব্রাহ্মণ ছিলে, কিন্তু বেদপাঠ করনি। তোমার নাম ছিল বসুদেব এবং তুমি ছিলে বেশ্যাসক্ত। তোমার কোন সুকর্ম ছিল না,, কেবল একটি মাত্র আমার ব্রত করেছিলে। সেই ব্রত প্রভাবে তোমার এরকম আমার প্রতি ভক্তি হয়েছে।।
প্রহ্লাদ বললেন,,,, হে নৃসিংহদেব, হে অচ্যুত, হে প্রভু, আমি কার পুত্র ছিলাম এবং কি করতাম,,? বেশ্যাসক্ত অবস্হায় কিভাবে আপনার ব্রত পালন করলাম,,? দয়া করে বলুন,,,।।
শ্রীনৃসিংহদেব বললেন,,পুরাকালে অবন্তীপুরে এক বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ ছিল। তার নাম ছিল বসুশর্মা। ধর্মপরায়ণ ও বৈদিক ক্রিয়া অনুষ্ঠানে তৎপর ছিলেন। এবং তাঁর স্ত্রী জগৎপ্রসিদ্ধা সুশীলা পতিব্রতা সদাচারিণী ছিলেন। তাদের পাঁচ পুত্র ছিল। চারজন ছিল সদাচারী, বিদ্বান, পিতৃভক্ত। কিন্তু কনিষ্ঠ পুত্রটি ছিল অসদাচারী, সর্বদা বেশ্যাসক্ত,সুরাপায়ী। সেই কনিষ্ঠ পুত্রটি ছিলে তুমি। নিত্য বেশ্যাগৃহেই তুমি বসবাস করতে। এক বনমধ্যে তুমি ও তোমার সেই বান্ধবী বেড়াতে গিয়েছিলে। তোমরা মনে করেছিলে দিনটা বেশ ভালোই কাটবে। কিন্তু তোমাদের নিজেদের মধ্যে চরিত্র বিষয়ে বিশেষ রকমের কলহ বেধে যায়। তোমাদের মধ্যে মনোমালিন্যের কারণে মৌনভাবে তোমরা আলাদাভাবে একটি স্হানে এসে বসেছিলে। সেখানে তুমি অতি পুরনো ধ্বংসাবশেষ গৃহ নিদর্শন স্বরুপ কিছু ইট পাথর দেখেছিলে। সেই নির্জন স্হানে আলাদাভাবে উপবেশন করে তোমরা দুইজন ক্রন্দন করছিলে আপন আপনভাবে। সারাদিন তোমরা অনাহারী ছিলে,,এমনকি জল পর্যন্ত পান করনি। সারারাতও তোমরা জাগরিত ছিলে। ক্লান্ত শরীরে দুঃখিত অন্তরে মনোমালিন্য ভাবে তুমি সেখানে শুয়ে পড়ে প্রার্থনা করছিলে,, হে ভগবান, হে শ্রীহরি, এই জগতের কত লোক সুন্দর! আমার মা-বাবা কত সুন্দর ধর্মপ্রাণ। আমার ভাইয়েরা কত সুন্দর! তারা নিষ্ঠাবান, চরিত্রবান। কিন্তু আমি অধঃপতিত। আমি মহা মন্দমতি। আমি চরিত্রহীন। পথের পাগলের চেয়েও অধম। হে ভগবান, ভালো লোকেরা তোমার শরণাগত। আমি মুর্খ কারও শরণাগত নই। আমি অতি নিঃসঙ্গ।আমি বড় অসহায় অবস্হায় তোমার কাছে প্রার্থনা করছি,, হে ভগবান,, আমাকে বিশুদ্ধ জীবন দান করো,,। এভাবে তুমি ক্রন্দন করছিলে।।
আর তোমার বান্ধবী,, সেও একান্ত মনে প্রার্থনা করছিল, হে ভগবান,, আমি সমাজের মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য স্তরের জীব। সভ্য সমাজ থেকে আমি বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন। এই জগতে অনেক নিষ্ঠাবতী স্বাধ্বী সুন্দরী নারী রয়েছে। আর,, আমি মহাপাপী গণিকাবৃত্তি করেই জীবন নষ্ট করেছি। প্রতিদিনই কেবল পাপের বোঝা বাড়িয়েছি। নরকযাতনা কতই না এই পোড়া কপালে অপেক্ষা করছে। ভদ্র সমাজে কেউ কোনদিনও আমার দিকে তাকাতেও চায় না। আমিও এই জগতের কোনও পথ খুঁজে পাই না। হে পরম করুনাময় ভগবান,, যদি তোমার অহৈতুকী কৃপাদৃষ্টি আমার প্রতি থাকে তবে দয়া করে আমার এই জীবন পরিবর্তন করে দাও! এভাবে সে আকুল অন্তরে ক্রন্দন করতে লাগলো।।
শ্রীনৃসিংহদেব বললেন,, হে প্রহ্লাদ,, সেই স্হানটি ছিল আমার প্রাচীন মন্দির। সেই দিনটি ছিল বৈশাখ মাসের শুক্লা চতুর্দশী আমার আবির্ভাবের দিন। তোমারা উপবাসী ছিলে, রাত্রি জাগরণ করছিলে,, জীবনের কল্যাণ প্রার্থনা করছিলে। অর্থাৎ অজ্ঞাতসারেই তোমরা আমার পরম-মঙ্গলময় চতুর্দশী ব্রত পালন করেছিলে। সেই ব্রত প্রভাবে তুমি এ জন্মে আমার প্রিয় ভক্তরুপে জন্মগ্রহণ করেছ। আর সেই বেশ্যাও স্বর্গলোকে অস্পরা জীবন লাভ করে ত্রিভুবনে সুখচারিনী হয়েছে।।
হে প্রহ্লাদ! আমার ব্রতের প্রভাব শোনো। সৃষ্টিশক্তি লাভের জন্য ব্রহ্মা আমার এই চতুর্দশী ব্রত পালন করেছিলেন। ত্রিপুরাসুরকে বধের উদ্দেশ্যে মহাদেব এই ব্রত করেছিলেন। স্বর্গসুখ লাভের জন্যই দেবতারা আগের জন্মে আমার ব্রত করেছিলেন। বেশ্যাও এই ব্রত প্রভাবে ত্রিলোকে সুখচারিনী হয়েছে। যে সমস্ত মানুষ আমার এই ব্রতশ্রেষ্ঠ পালন করবে,, শতকোটি কল্পেও তাদের সংসারে পুনরাগমন নেই। আমার ব্রত প্রভাবে অপুত্রক ভক্তপুত্র লাভ করে,, দরিদ্র ধনশালী হয়,, তেজস্কামী তেজঃলাভ করে,, রাজ্যকামী রাজ্য পায়,, আয়ুস্কামী দীর্ঘায়ু লাভ করে। স্ত্রীলোকেরা আমার এই চতুর্দশী ব্রত পালন করলে ভাগ্যবতী হয়,,এই ব্রত সৎপুত্র প্রদ,, অবৈধব্যকর ও পুত্রশোক বিনাশন, দিব্য সুখপদ। স্ত্রী-পুরুষ যারা এই উত্তমব্রত পালন করে,,, তাদের আমি সুখ ও ভুক্তি-মুক্তি ফল দান করি।।
হে প্রহ্লাদ,,, দুরাত্মাদের আমার ব্রত পালনে মতি হয় না। পাপকর্মেই সর্বদা তাদের মতি।। ( জয় হোক ভগবান শ্রীশ্রীনৃসিংহদেবের জয় হোক )