প্রশ্নঃ সনাতন ধর্মশাস্ত্র সম্বন্ধে জানতে চাই!



(শেয়ার করে সংগ্রহে রাখুন)
উত্তরঃ ধর্ম শাসন, মনু আদি প্রণীত ধর্ম প্রতিপাদক গ্রন্থভেদ, স্মৃতি শাস্ত্র, যাতে ধর্ম ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হয়েছে তাকে ধর্মশাস্ত্র বলে। যেমন-
মনুর্যমো বশিষ্ঠোহত্রিঃ দক্ষো বিষ্ণুস্তথাঙ্গিরা।
উশনা বাক্‌পতির্ব্যাস আপস্তম্বোহথ গৌতমঃ॥
কাত্যায়নো নারদশ্চ যাজ্ঞবল্ক্যঃ পরাশরঃ।
সংবর্ত্তশ্চৈব শঙ্খশ্চ হারীতো লিখিত স্তথা॥
ততৈর্যানি প্রণীতানি ধর্মশাস্ত্রাণি বৈ পুরা॥
মনু, যম, বশিষ্ঠ, অত্রি, দক্ষ, বিষ্ণু, অঙ্গিরা, উশনা, বৃহস্পতি, ব্যাস, আপস্তম্ব, গৌতম, কাত্যায়ন, নারদ, যাজ্ঞবল্ক্য, পরাশর, সংবর্ত্ত, শঙ্খ, হারীত ও লিখিত। এই সকল ঋষি যে সকল গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন, তাকে ধর্মশাস্ত্র বলে। এগুলি আচার, ব্যবহার ও প্রায়শ্চিত্ত প্রধানতঃ এই তিনভাগে বিভক্ত। যাজ্ঞবল্ক্য ধর্মশাস্ত্রের প্রযোজক এই কয়েকজনের নাম নির্দেশ করেছেন-

মম্বত্রিবিষ্ণুহারীত যাজ্ঞবল্ক্যোশনোহঙ্গিরা।
যমাপস্তম্বসংবর্ত্তাঃ কাত্যায়নবৃহস্পতী॥
পরাশরব্যাসশঙ্খলিখিতা দক্ষগৌতমৌ।
শাতাতপো বশিষ্ঠশ্চ ধৰ্ম্মশাস্ত্র প্রযোজকাঃ॥
-যাজ্ঞবল্ক্য সংহিতা ১৫।
অর্থাৎ, মনু, অত্রি, বিষ্ণূ, হারীত, যাজ্ঞবল্ক্য, উশনা, অঙ্গিরা, যম, আপস্তম্ব, সংবর্ত্ত, কাত্যায়ন, বৃহস্পতি, পরাশর, ব্যাস, শঙ্খ, লিখিত, দক্ষ, গোতম, শাতাতপ এবং বিশিষ্ঠ, এরা ধর্মশাস্ত্র প্রণয়ন করেছেন।

মলমাস, দায়, সংস্কার, শুদ্ধিনির্ণয়, প্রায়শ্চিত্ত, বিবাহ, একাদশী নির্ণয়, তড়াগ আদি উৎসর্গ, বৃষোৎসর্গ, ব্রত, ব্রতপ্রতিষ্ঠা, জ্যোতিষ, বাস্তু, দীক্ষা, আহ্নিক, কৃত্য, ক্ষেত্র মাহাত্ম্য সমূহ, সামশ্রাদ্ধ, যজুঃশ্রাদ্ধ, শুদ্রকৃত্য, এই সকল বিষয়ের মীমাংসা করে রঘুনন্দন অষ্টাবিংশতিতত্ত্ব নামে স্মৃতিশাস্ত্র প্রণয়ন করেছিলেন, ইহাও ধর্মশাস্ত্র সংগ্রহ নামে খ্যাতি লাভ করে। যথা-
মলিম্লুচে দায়ভাগে সংস্কারে শুদ্ধিনির্ণয়ে।
তড়াগভবনোৎসর্গে বৃষোৎসর্গত্রয়ে ব্রতে॥
প্রতিষ্ঠায়াং পরীক্ষারাং জ্যোতিষে বাস্তুসংজ্ঞকে।
দীক্ষায়ামাহ্নিকে কৃত্যে ক্ষেত্রে শ্রীপুরুষোত্তমে॥
সামশ্রাদ্ধে যজুঃশ্রাদ্ধে শূদ্রকৃত্যবিচারণে।
ইত্যাষ্টাবিংশতি স্থানে তত্ত্বং বক্ষ্যামি যত্নতঃ॥
(রঘ্ননন্দন)
মূল ধর্মসংহিতা গুলিই ধর্মশ্রাস্ত্র, ঐ সকল সংহিতা হতে ধর্মব্যবস্থা নির্ণয় করা যখন দুষ্কর হল, তখন ঐ সংহিতা অবলম্বন করে যে সকল সংগ্রহ গ্রন্থ প্রণয়ন হল, তা হতেই ধর্মব্যবস্থা সকল প্রচারিত হতে লাগল। এই সকল সংগ্রহ গ্রন্থ স্মৃতি নামে অভিহিত।
নিবেদন- শ্রীমান কৃষ্ণকমল(মিন্টু)
নিবেদন- শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা স্কুল

Advertisements

আদি গুরু শঙ্করাচার্য্যের আবির্ভাব কাল নির্ণয়।



শঙ্করাচার্য্যের পিতার নাম শিবগুরু, মাতার নাম সতীদেবী (মতান্তরে ভদ্র)। তাঁহার জন্মস্থান-দক্ষিণাত্যের কেরল-প্রদেশের কালাদি (কাল্‌টি) গ্রামে। ঐ গ্রাম পূর্ণা-নদীর তীরে অবস্থিত। এই মতই প্রসিদ্ধ; কিন্তু ‘শঙ্করবিজয়’ অন্য মত প্রকাশ করেন যে, শঙ্করের মাতার নাম বিশিষ্টা, পিতা বিশ্বজিৎ। বিশিষ্টা-মহাদেবের আরাধনায় সৰ্ব্বদা নিযুক্ত থাকতেন। তার পতি বিশ্বজিৎ তাতে তাকে পরিত্যাগ করে, সন্ন্যাস-ধৰ্ম অবলম্বন করেন। এই সময় দেবাদিদেব মহাদেব জ্যোতিঃরূপে মুখবিবর দিয়ে বিশিষ্টার উদরে প্রবিষ্ট হন। তাতেই গর্ভ-সঞ্চার হয়; আর সেই গর্ভে স্বয়ং শঙ্কর শঙ্করাচার্য রূপে জন্মগ্রহণ করেন। মহাপুরুষদের আবির্ভাব সম্বন্ধে অনেক স্থানেই এরকম অলৌকিক কাহিনী প্রচলিত আছে। জন্মকাল সম্বন্ধেও এমন বিভিন্ন মতান্তরের শেষ নেই। এক গণনায় শঙ্করাচাৰ্য্য খৃষ্ট জন্মের ৪৬৯ বৎসর পূর্বে আবির্ভূত হয়েছিলেন বলে প্রতিপন্ন হয়; আবার অন্য প্রকার গণনায় খৃষ্টীয় নবম শতাব্দীতে তার আবির্ভাব-কাল নিৰ্দ্ধারিত হয়ে থাকে। সূক্ষ্ম-গণনায় পণ্ডিতেরা কেউ বা ৭৮৮ খৃষ্টাব্দে, কেউ বা ৬৬৮ খৃষ্টাব্দে শঙ্করাচার্যের জন্মকাল নির্দেশ করেন। শঙ্করাচার্য্যের আবির্ভাব কাল সম্বন্ধে এরকম মতান্নতর ঘটার প্রধান কারণ,-শক, সন প্রভৃতির গণনায় গণ্ডগোল। ‘শঙ্করবিজয়’ গ্রন্থে তার জন্ম সন লেখা নেই; লেখা আছে, তাঁর জন্ম-সময়ে বৃহস্পতি কেন্দ্রে, রবি মেষ রাশিতে, শনি তুলা রাশিতে এবং মঙ্গল মকর রাশিতে সংস্থিত ছিলেন। “এ মন্তব্যে নানারকম গণন হতে পারে। মতান্তরের এই এক প্রধান কারণ। অন্য কারণ,-বিভিন্ন স্থানে প্রাপ্ত উদ্ভট-শ্লোকে শঙ্করের আবির্ভাব-কাল-নির্ণয়ের প্রয়াস। একটি উদ্ভট শ্লোক পাওয়া যায়,
“দুষ্টাচারবিনাশায় প্রাদুর্ভুতো মহীতলে। স এব শঙ্কারাচাৰ্য্যঃ সাক্ষাৎ কৈবল্যদায়কঃ॥ নিধিনাগেভবহ্ন্যব্দে বিভবে শঙ্করোদয়ঃ। অষ্টবর্ষে চতুৰ্ব্বেদান্‌ দ্বাদশে সৰ্ব্বশাস্ত্রকৃৎ॥
ষোড়শে কৃতবান ভাষ্যং দ্বাত্রিংশে মুনিবভ্যগাৎ॥
কল্যব্দে চন্দ্ৰনেত্রাঙ্কবহ্ন্যাব্দে গুহাপ্রবেশঃ। বৈশাথে পূর্ণিমায়ান্ত শঙ্করঃ শিবতামগাৎ॥
এই শ্লোকটি ‘নাস্তিকত্রাস’ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। দাক্ষিণাত্যে বেলগ্রামে হাতে লেখা পুঁথি মধ্যে এই শ্লোকটি পাওয়া যায়, পণ্ডিতেরা শঙ্করাচার্য্যের আবির্ভাবের ও তিরোভাবের কাল স্থির করে থাকান। ৩৮৮৯ কল্যব্দে(নিধিনাগেভবহ্ন্যব্দে) তাঁহার জন্ম এবং ৩৯২১ কল্যব্দে (চন্দ্রনেত্রাঙ্কবহ্ন্যব্দে) তার শিবত্ব-প্রাপ্তি নির্দিষ্ট হয়। এই মতের উপরই অধিকাংশ বিদেশি পণ্ডিত আস্থা স্থাপন করে গেছেন। কিন্তু এই অপেক্ষা প্রবল যুক্তিপূর্ণ যে মত, সে মতের ভিত্তিস্থান দ্বারাবতী মঠের পিণাকী-চিহ্নিত লিপি। সে লিপির কিছু অংশ এই-
“যুধিষ্ঠিরশকে ২৬৩১ বৈশাখ শুক্লপঞ্চম্যাং শ্রীমচ্ছঙ্করাবতারঃ।
যুধিষ্ঠিরশকে ২৬৩৬ চৈত্রগুক্লনবম্যাং তিথাবুপনয়নম্।
যুধিষ্ঠিরশকে ২৬৩৯ কাৰ্ত্তিকশুক্লৈকাদশ্যাং চতুর্থাশ্রমস্বীকারঃ।
যুধিষ্ঠিরশকে ২৬৪০ ফাল্গুনগুক্লদ্বিতীয়ায়াং গোবিন্দপাদাদুপদেশঃ।
তত আরভ্য ২৬৪৬ জ্যৈষ্ঠ কৃষ্ণ ৩০ পৰ্য্যন্তং বদর্য্যাশ্রমে ষোড়শভাষ্যপ্রণয়নম।
যুধিষ্ঠিরশকে ২৬৪৭ মার্গকৃষ্ণদ্বিতীয়ায়াং মণ্ডনেন সহ বাদারম্ভঃ।
যুধিষ্ঠিরশকে ২৬৪৮ চৈ, শু, ৪ মণ্ডনপরাজয়ঃ।
যুধিষ্ঠিরশকে ২৬৪৯ চৈ, শু, ৯ মণ্ডনমিশ্রস্যোত্তমাশ্রমগ্রহণম্।
যুধিষ্ঠিরশকে ২৬৫০ চৈ, শু, ৩ দিগ্বিজয়মহোৎসবারম্ভঃ।
যুধিষ্ঠিরশকে ২৬৫৪ পৌ, শু, ১৫ হস্তামলকাচাৰ্য্যস্য শৃঙ্গপুর পীঠেহভিষেচনম্।
যুধিষ্ঠিরশকে ২৬৬৩ কা, শু, ২৫ নিখিলজগদ্ধারকো ভগবান্‌ শঙ্করো ব্ৰহ্মাদ্য তীর্থে নিজ শরীরেণৈব বিমানমাস্থায় কৈলাসং জগাম।”
এ হিসাবে, ২৬৩১ যুধিষ্ঠিরাব্দে আবির্ভাব এবং ২৬৬৩ যুধিষ্ঠিরাব্দে তিরোভাব। এই অনুসারে শঙ্করাচাৰ্য্য খৃষ্ট-পূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে আবির্ভুত হয়েছিলেন।জন্ম-গ্ৰহণের পর জাতকর্ম সমাপন মাত্র শিশু শঙ্করাচার্য্য চারটি মহাবাক্য উচ্চারণ করেন। সেই মহাকাব্য-চতুষ্টয়,- “অহং ব্ৰহ্মাস্মি’, ‘তত্ত্বমসি’, ‘প্রজ্ঞানং ব্রহ্ম,’ ‘আয়মাত্মা ব্ৰহ্ম’। পিতা শিবগুরু এই শ্রুতিসার মহাকাব্য-চতুষ্টয় সদ্যোজাত শিশুর মুখে উচ্চারিত হতে শুনে বিস্ময়-সাগরে নিমগ্ন হলেন। শিশুর অপূর্ব কান্তি-মনোহর রূপ! দেশ-দেশান্তর হতে সাধুসন্ন্যাসী ও ব্ৰাহ্মণরা দলে দলে শিশুকে দেখতে আসলেন। একাদশ দিনে শুভলগ্নে শিশুর নামকরণ হল। দশ দিনের শিশু শঙ্করাচাৰ্য্য, দুই বৎসরের বালক অপেক্ষাও হৃষ্টপুষ্ট ও শক্তিমান হয়ে উঠলেন। প্রথম বর্ষে শঙ্করের ভাষা-শিক্ষা সমাপন হল। পঞ্চম বর্ষের মধ্যেই শঙ্করাচাৰ্য্য, ব্যাকরণ, পুরাণ, অলঙ্কার প্রভৃতিতে পারদর্শিতা লাভ করলেন। উপনয়নের আগেই শঙ্করের পিতৃবিয়োগ ঘটে। জননী ভদ্রাদেবী পতির পারলৌকিক কাজ সমাপন করে, কিছুদিন পরে পুত্রের উপনয়নের ব্যবস্থা করলেন। পঞ্চম বর্ষে উপনয়ন শেষে ব্রহ্মচৰ্য্য অবলম্বনে শঙ্কর গুরুগৃহে শাস্ত্র অনুশীলনে প্রবৃত্ত হলেন। অল্পদিনেই বেদ, বেদাঙ্গ, দর্শন, শ্রুতি, স্মৃতি প্রভৃতিতে অসাধারণ ব্যুৎপত্তি প্রকাশ পেল। গুরুগৃহ হতে প্রত্যাবর্তন করে শঙ্কর কিছুদিন জননীর সেবা-পরিচর্য্যায় এবং ব্রাহ্মণের নিত্যকর্ম অনুষ্ঠান যাগযজ্ঞ কাজে ব্ৰতী হন। সেই সময় বহু বিদ্যার্থী শঙ্করের নিকট শিক্ষালাভের জন্য আগমন করেন। উপনয়নের পর হতেই সন্ন্যাসাশ্রম গ্রহণের জন্য শঙ্করের মন একাত্ত উৎসুক হয়; কিন্তু জননীর আপত্তির কারণে কিছু দিন তার সে সঙ্কল্প কাজে পরিণত হয় না। এই সময়ে এক দিন নদীতে স্নান করতে গেলে, এক বৃহৎ আকার কুমীর শঙ্করকে আক্রমণ করে। শঙ্কর জননী কোনরকমে কুমীরের গ্রাস থেকে সন্তানকে মুক্ত করতে পারছেন না।
শঙ্কর তখন জননীকে বলেন,-“আমায় সন্ন্যাস-গ্রহণের অনুমতি প্রদান করলে কুম্ভীর আমায় পরিত্যাগ করতে পারে। কুম্ভীররূপী মহেশ্বর যেন শঙ্করকে বিশ্ব-সংসারের কাজে নিযুক্ত হওয়ার জন্য আহবান করছেন,-শঙ্করের উক্তিতে এই ভাব প্রকাশ পায়। পুত্রের প্রাণের মায়ায় জননী শঙ্করের সন্ন্যাস-গ্রহণে সন্মতি জ্ঞাপন করেন। এর পর একজন আত্মীয়ের পরিচর্য্যাধীনে জননীর সেবার ব্যবস্থা করে শঙ্কর সংসারত্যাগী হন। তখন ভারতবর্ষে বিভিন্ন ধর্ম-সম্প্রদায়ের অভ্যুদয়ে নাস্তিকতার বিজয়-দুন্দুভি নিনাদিত হতেছিল। চাৰ্ব্বাক, শূন্যবাদী, নাস্তিক, বৌদ্ধ প্রভৃতি বিবিধ ধর্ম-সম্প্রদায়ের অভ্যুদয়ে তখন বেদ-বিহিত ধর্ম-কর্ম লোপ পেতে বসেছিল। শঙ্করাচাৰ্য্য সেই সকল ধর্ম-মতের কুজ্ঝটিকা-জাল অপসরণ করে সনাতন ধর্মের দিব্য জ্যোতিঃ প্রকাশ করলেন। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে পুনরায় মঠমন্দির-সমূহ প্রতিষ্ঠিত হল। নিৰ্বাপিত-প্রায় অগ্নি-কণা পুনরায় লকলক শিখা বিস্তার করল; সনাতন হিন্দুধর্মের জয়নিনাদে দিগ মগুল পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। শঙ্করাচাৰ্য্য ধর্ম জগতে এক যুগান্তর উপস্থিত করলেন।

তথ্য সূত্র- পৃথিবীর ইতিহাস চতুর্থ খণ্ড।

সংকলনে- শ্রীমান কৃষ্ণকমল (মিন্টু)

সনাতন সংগঠন।

ভারতের সাহিত্যে আদি শঙ্করাচার্য্য(জীবনী ও কথা)


ধর্ম ও নীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে কবিতা রচনা করে গেছেন বলেই ভারতের অনেক কবি অমর হয়ে আছেন। খণ্ড-কাব্য, মহাকাব্য প্রভৃতির আলোচনা প্রসঙ্গে যাঁদের নাম উল্লেখ করা যায় তাঁরা সকলেই অসাধারণ প্রতিভা-প্রভাবে সেই বিষয়ে চির-যশস্বী হয়ে আছেন। কিন্তু তাদের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মপ্রাণতার জন্য-নীতিপরায়ণতার জন্য আরও অসংখ্য কবি যে অমর হয়ে থাকবেন, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। খণ্ড-কাব্য রচনায় কৃতিত্ব প্রসঙ্গে পূর্বে ভত্তৃহরির নাম উল্লেখ আমরা সবাই জানি। তাঁর সঙ্গে সঙ্গে, আরও অধিক প্রতিভাসম্পন্ন আর এক মহাপুরুষের নাম খণ্ড-কাব্য প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে। সে মহাপুরুষ-শ্ৰীশ্ৰীশঙ্করাচার্য্য। তিনি যেমন দর্শন শাস্ত্র আলোচনায় অলৌকিক প্রতিভা প্রকাশ করে গেছেন, তত্বকথা মূলক খণ্ড-কবিতা রচনায়ও তার তেমনি অসাধারণ শক্তি প্রকাশ পেয়েছে। ভর্ত্তৃহরি যে সুরে যে গান গেয়েছিলেন, সে বিবেক-বৈরাগ্য-মূলক সঙ্গীতে শঙ্করাচার্য্যের সমকক্ষ বোধ হয় দ্বিতীয় কাউকে দেখা যায় না। তাঁহার মোহমুদগর-সংসার মোহ নাশের অমোঘ অস্ত্র-স্বরূপ। ভর্ত্তৃহরির বৈরাগ্যশতকে যে ভাব অঙ্কুরিত মুকুলিত, মোহমুদগরে তা পূর্ণ প্রস্ফুটিত। ভর্ত্তৃহরি স্ত্রীর প্রতি বিরাগ-বশতঃ বলেছিলেন, তার কথা স্মরণ করতেও হৃদয় যাতনায় অস্থির হয়; তার দর্শনে উন্মত্ততা বৃদ্ধি পায়; তার স্পর্শে জ্ঞান লোপপ্রাপ্ত হয়। জানি-না, কেমন করে তার প্রতি ভালবাসা আসে ? কিন্তু শঙ্করাচাৰ্য্য বললেন, ‘কেই বা স্ত্রী, কেই বা পুত্র -এ সংসারে কেউ তোমার আপনার নয়! এই বুঝে তত্ত্ব-চিন্তায় রত হও। ভর্ত্তৃহরি স্ত্রীর ব্যবহারে বিরক্ত হয়ে বৈরাগ্য অবলম্বন করেছিলেন; শঙ্করাচাৰ্য্য সংসারের আত্মীয়-স্বজনের ব্যবহারে ব্যথিত হয়ে, ঐ বৈরাগ্য-বাণী ঘোষণা করে গেছেন। তার আত্মীয়-স্বজন তার প্রতি কি দুৰ্ব্ব্যবহারই না করেছিলেন। জ্ঞাতিদের চক্রান্তে সৰ্বস্বান্ত হয়ে শঙ্করাচার্য্যকে গৃহত্যাগী হতে হয়। সংসারে একমাত্র জননী তার আশাপথ চেয়ে দিনযাপন করতেছিলেন। সহসা জননী পীড়িত হলেন। প্রতিবেশিরা আত্মীয়-স্বজনেরা কেউই চেয়ে দেখলেন না। জননীর মৃত্যুর ঠিক আগে কি জানি প্রাণ কেমন করে উঠেছিল; তাই শঙ্করাচাৰ্য্য গৃহে ফিরে আসেন। গৃহে প্রত্যাবৃত্ত হয়ে যে দৃশ্য অবলোকন করেন, তাতে প্রাণে মর্মভেদী যাতনা অনুভূত হয়। জননী একাকিনী আসন্ন মৃত্যু শয্যাশায়িনী!-নিকটে গণ্ডুষ-জল-দানের কেউ নেই। আত্মীয়রা দুর হতে উপেক্ষার হাসি হাসছেন। এমন অবস্থায় পুত্রের কোলে মাথা রেখে শঙ্কর-জননী লোকান্তর-গামিনী হলেন। ক্ষোভে, বিষাদে, বিষম আত্মগ্লানিতে শঙ্করের হৃদয় সন্তপ্ত হল। অসহায় একাকী আপন গৃহ-প্রাঙ্গণে তিনি জননীর সৎকার-কাৰ্য্য সমাপন করলেন। তার পর অশ্রুভরা চোখে জননী জন্মভূমির নিকট চিরতরে বিদায় নিলেন। আত্মীয়-স্বজনের প্রতি বিরক্তি-বশতঃ নয়; কিসে জীবের অজ্ঞান অন্ধকার দূর করতে পারেন, কিসে মানুষের আত্মপর-ভেদ জ্ঞানের অবসান হয়,-তাহারই উপায় অনুসন্ধানে শঙ্কর সংসার ত্যাগ করলেন। যে সময় এই বৈরাগ্য উপস্থিত হয়, সেই সময়ই তিনি মোহমুদগর রচনা করেছিলেন।

সংসার-ত্যাগী হয়ে দেশ-দশান্তরে পরিভ্রমণ শেষে শঙ্কর বেদান্ত-ভাষ্য, গীতা ভাষ্য প্রভৃতি বহু গ্ৰন্থ রচনা করেন। জ্যোতিষ-শাস্ত্রে ও তিনি অসাধারণ পারদর্শিতা লাভ করেছিলেন। এই অবস্থায় কাশীধামে এক মহাপুরুষের সাথে তার সাক্ষাৎ হয়। মহাপুরুষ বুঝতে পারেন, শঙ্কর উন্নতির মার্গে উপস্থিত হয়েছেন বটে; কিন্তু শ্রেষ্ঠ-স্থান লাভ করবার পক্ষে তখনও সামান্য অন্তরায় আছে। এই বুঝে, জ্যোতিষ সম্বন্ধে শঙ্করাচার্য্যের একটু অহমিকার ভাব দেখে, মহাপুরুষ জ্যোতিষ-সংক্রান্ত প্রশ্নের সমাধানে শঙ্করচার্য্যকে এক সমস্যায় ফেলেন। মহাপুরুষ আপনার একজন শিষ্যের ভাগ্য-গণনার জন্য শঙ্করাচাৰ্য্যকে অনুরোধ করেন; শঙ্করাচাৰ্য্য, শিষ্যের মৃত্যুর দিন নিৰ্দ্ধারণ করে বজ্রাঘাতে মৃত্যু হবে বলে দেন। মহাপুরুষ সেই নিদিষ্ট দিনে যোগবলে শিষ্যের চৈতন্য হরণ করেন, এবং তাকে মাটির ভিতর পুথে রাখেন। শঙ্করের গণনা-মতে বজ্ৰ যথানির্দিষ্ট কালে যথানির্দিষ্ট স্থানে শিষ্যের উপর পতিত হয়। কিন্তু চৈতন্য হীন দেহে বজ্রের ক্রিয়া হয় না। মহাপুরুষ পরিশেষে যোগবলে শিষ্যকে জাগিয়ে তুলেন। এই ঘটনায় শঙ্করাচার্য্য বিস্মিত হন। অঙ্গীকার-মতে শঙ্করাচার্য্যের গ্রন্থ-সমূহ গঙ্গার জলে নিক্ষিপ্ত হয়। সঞ্চিত-ধন গ্ৰন্থরত্ব বিসর্জন দিয়ে, শঙ্করাচার্য্য বড়ই ম্ৰিয়মাণ হন। মহাপুরুষ তা বুঝতে পেরে, শঙ্করাচাৰ্য্যকে গঙ্গা তীরে গিয়া গঙ্গাদেবীর নিকট প্রার্থনা জানাতে বলেন। সেই প্রার্থনার ফলে গ্রন্থগুলি তরঙ্গের সাথে তীরে উপনীত হয়। শঙ্করাচার্য্যের বিস্ময়ের অবধি থাকে না। মহাপুরুষ তখন, শঙ্করাচার্য্যকে কর্ম ও আকাঙ্ক্ষা সম্বন্ধে উপদেশ দেন। শঙ্করাচাৰ্য্য তাতে বুঝতে পারেন, মায়াই সকল অনিষ্টের মূলাধার। তখন গ্রন্থগুলি পুনরায় নিজেই জলমধ্যে নিক্ষেপ করেন; বিদ্যার অভিমান, জ্ঞানের অভিমান, ধর্মের অভিমান-সকলই সেই সঙ্গে সঙ্গে বিসর্জিত হয়। এর পরই শঙ্করাচাৰ্য্য অদ্বৈত-জ্ঞান লাভ করেন। বত্রিশ বৎসর বয়সে কেদারনাথ তীর্থে শঙ্করাচাৰ্য্য দেহরক্ষা করেছিলেন। কেরল-দেশের অন্তর্গত চিদম্বর তাহার জন্মস্থান বলেই পরিচিত। পণ্ডিতদের গবেষণা অনুসারে ৭৮৮ খৃষ্টাব্দ তাহার জন্ম-বর্ষ বলে নিৰ্দ্ধারিত হয়েছে। অল্পদিন মাত্র ইহসংসারে অবস্থান করে শঙ্করাচার্য্য অবিনশ্বর কীৰ্ত্তি-স্মৃতি রেখে গেছেন। বিকৃত বৌদ্ধ ধর্মের কবল হতে তিনি ব্রাহ্মণ্য-ধর্মের পুনরুদ্ধার সাধন করেন। কর্ম মধ্যে তার বিভূতি প্রকাশ পায়; তিনি শঙ্করাবতার শঙ্কর বলেই সম পূজিত হন। শঙ্করাচার্য্যের জীবনী-সম্বন্ধে সাধারণ দৃষ্টিতে নানা মত প্রচারিত আছে। কিন্তু একটু অনুসন্ধান করলে তার জীবনের নানা রহস্যময় কাহিনী অবগত হওয়া যায়। শঙ্করাচার্য্যের জীবন-কাহিনী অলৌকিক ঘটনায় পরিপূর্ণ। ভারতের বিভিন্ন ভাষায় তার অসংখ্য জীবনচরিত বিরচিত হয়েছে। তার সমস্তই লোকোত্তর চরিত্রের বহু তথ্য নিহিত আছে। দুর অতীত কালে সংস্কৃত-ভাষায় তাহার যে সকল জীবনচরিত দেখা যায়, তারমধ্যে শঙ্করদিগ্বিজয় (আনন্দগিরি কৃত), শঙ্করবিজয় (চিদ্ধিলাস যতি বিরচিত), সংক্ষেপ শঙ্করবিজয় (মাধবাচাৰ্য্য কৃত), লঘু শঙ্করবিজয় (নীলকণ্ঠ, সদানন্দ, ব্রহ্মানন্দ প্রভৃতি বিরচিত), শঙ্করাভ্যুদয় (তিরুমল্ল দীক্ষিত প্রণীত), শঙ্করবিজয়-সংগ্রহ (পুরুষোত্তম ভারতী বিরচিত) বিশেষ প্রসিদ্ধ। এই বিভিন্ন জীবনচরিতের আলোচনায় শঙ্করের জীবনের বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপ পরিদৃশ্যমান হয়।

সুত্র- পৃথিবীর ইতিহাস চতুর্থ খণ্ড।

সংকলনে- কৃষ্ণকমল।

বৈদিক সনাতন ধর্মে(হিন্দু) বিবাহ-০৯ 


(সনাতন ধর্ম দর্শনের মহিমা জানুন- ছবিতে লাইক নয় লেখাটি পড়ুন)
স্বামীজি বলতেন- ভারতীয় রমণীদের যে রূপ হওয়া উচিত সীতা তার আদর্শ, রমণী চরিত্রের যত প্ৰকার ভারতীয় আদর্শ আছে সবই এক সীতার চরিত্রে কেন্দ্রীভূত, আমরা সকলেই সীতার সন্তান, আমাদের নারীদেরকে আধুনিক ভাবে গঠন করার যে সকল চেষ্টা চলছে, যদি সে সকল চেষ্টার মধ্যে তাদেরকে সীতাচরিত্রের আদর্শ হতে ভ্ৰষ্ট করার চেষ্টা থাকে, তবে সেগুলি বিফল হবে। ভারতীয় নারীদেকে সীতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে নিজেদের উন্নতি-বিধানের চেষ্টা করতে হবে-এই ভারতীয় নারীর উন্নতির একমাত্র পথ।
…সমগ্ৰ ভারতবাসীর সমক্ষে সীতা যেন সহিষ্ণুতার উচ্চতম আদর্শরূপে বৰ্ত্তমান রয়েছেন। পাশ্চাত্য দেশ বলে- “কৰ্মকর, কর্ম করে তোমার শক্তি দেখাও।” ভারত বলেন ‘দুঃখ কষ্ট সহ করে তোমার শক্তি দেখাও। – এই দুইটি আদর্শই এক এক ভাবের চরম সীমা। সীতা যেন ভারতীয় ভাবের প্রতিনিধি স্বরূপ, যেন মূৰ্ত্তিমতী ভারতমাতা। ভগবান বুদ্ধ বলে গেছেন,-“আঘাতেব পারিবৰ্ত্তে আঘাত করলে সেই আঘাতের কোন প্ৰতিকার হল না, উহাতে কেবল জগতে একটি পাপের বৃদ্ধিমাত্র হবে।’ ভারতের এই বিশেষ ভাবটির সীতার প্রকৃতিগত ছিল। তিনি অত্যাচারের প্রতিশোধের চিন্তা পৰ্য্যন্ত কখনও করেননি।
তথ্যসূত্র- ভারতের নারী।
ক্রমশঃ