আমি হিন্দু-আমার নিকট হিন্দুত্বের মূল্যবোধ-


62-2

আমার জন্ম এক হিন্দু বাবা ও হিন্দু মায়ের ঘরে। তাই জন্মসূত্রে আমি একজন হিন্দু। আমার কোনো নির্দিষ্ট একটি ধর্মগ্রন্থ নেই। বরং আমাদের শত শত, হাজার হাজার ধর্মীয়, দার্শনিক গ্রন্থ আছে। আমি এক ঈশ্বরে বিশ্বাস করে হিন্দু হতে পারি, আবার বহু দেবতায় বিশ্বাস করেও হিন্দু হতে পারি, এমনকি আমি কোনো ঈশ্বরে বিশ্বাস না করেও হিন্দু হতে পারি, যেমনভাবে একজন নাস্তিক আসলে হিন্দুই। আমি প্রতিনিয়ত মন্দিরে যাই না, আমি নিয়মিত ধর্মীয় আচার-নিষ্ঠা পালন করি না। ঈশ্বর তো বন্ধুর মতো। না – আমি ঈশ্বরকে ভয় পাই না। কেউ আমার উপর কখনো চাপ প্রয়োগ করেনি এসব নিয়ম-নিষ্ঠা পালন করার জন্য। যদি আমি হিন্দুধর্মের কিছু আচার-নিষ্ঠাকে চ্যালেঞ্জও করি তবুও কেউ আমাকে অন্য ধর্মে ধর্মান্তরিত করতে পারবে না। কারণ একজন হিন্দু হিসেবে আমি ব্যক্তিগতভাবে ও বস্তুনিষ্ঠভাবে চিন্তা-ভাবনা করতে পারি, কোনো প্রকার শর্তাবলী ছাড়া। আমি একজন হিন্দু হিসেবে আছি জোর করে না, বরং নিজ পছন্দে। হিন্দুধর্ম আসলে কোনো ধর্ম নয়, বরং এক সেট বিশ্বাস ও রীতি-নীতি। এ কোনো এমন ধর্মমত নয় যা কোনো একব্যক্তির দ্বারা প্রচারিত অথবা এর কোনো সংগঠিত সংঘ বা সমিতি নেই। হিন্দুধর্মে কোনো সংস্থাপণ বা কর্তৃত্বধারী গোষ্ঠী নেই অন্য ধর্মমতগুলোর মতো। আমি কোনো ঈশ্বরিক শক্তিকে অস্বীকার করছি না। আমাদের বেদসমূহ, উপনিষদ, গীতা বলেছেন – ঈশ্বর আছেনও আবার নেইও। আমরা কিন্তু সেই সর্বশক্তিমান নির্বস্তুক পরব্রহ্ম যিনি এই বিশ্বব্রহ্মান্ডের সৃষ্টিকারক তার প্রার্থনা ঠিকই করি। আমাদের ঈশ্বর সম্পর্কে ভাবনা একজন ব্যক্তিগত ঈশ্বরের মতো নয় যিনি কিনা মেঘের মাঝে লুকায়ে থেকে আমাদের যুক্তিহীন গল্প শুনিয়ে যাচ্ছেন তার পছন্দমত বার্তাবাহকদের দ্বারা এমনভাবে যেন আমাদের তাকে উপাসনা করতেই হবে; না করলেই শাস্তি। আমার মনে হয় না ঈশ্বর কোনো স্বৈরশাসক বা সম্রাট যিনি চান আমরা উনার সম্মান করি ও ভয় করি। হিন্দুধর্মের মধ্যেও এমন কুসংস্কার আছে। হিন্দুধর্মের দার্শনিক দিকগুলো এসব কুসংস্কারকে ভুল প্রমাণ করে। হিন্দুধর্ম হলো একজন ব্যক্তির ধর্ম, ব্যক্তির জন্য ধর্ম, ব্যক্তির দ্বারা ধর্ম যার শিকড় রয়েছে বেদ ও গীতার মতো ধর্মগ্রন্থে। পুরো বিষয়টা হলো একজন ব্যক্তির ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানো তার নিজস্ব ব্যক্তিগত মাধ্যমে, তার নিজস্ব মানসিকতা ও অন্তর্নিহিত বিবর্তনের মাধ্যমে। কেউ আপনাকে হিন্দুধর্মে ধর্মান্তরিত করতে পারবে না, কারণ এটা কোনো ধর্মমত নয় বরং এক জীবনপ্রণালী, জীবনে চলার রীতি-নীতি সম্বলিত ব্যবস্থা। সকল কিছুই হিন্দুধর্মে গ্রহণযোগ্য কারণ কোনো একক কর্তৃত্বধারী বা সংগঠন নেই যা এর ব্যবস্থাকে বাতিল ঘোষণা করবে বা এর বিরুদ্ধে প্রশ্ন করবে। এখানেই আপনি পাবেন জীবনের অর্থ। সৃষ্টির সকল কিছুকে ভালোবাসাই হলো পরম সত্য। ঈশ্বর বিরাজিত সকল কিছুতেই। কিছুই ঈশ্বর থেকে দূরে নয় কারণ ঈশ্বর সকল কিছুতেই। সকল জীব ও জড়কে ঈশ্বর জ্ঞানে সম্মান করা উচিত আমাদের। ইহাই হিন্দুধর্ম আমাদের শিক্ষা দেয়। এই কারণেই একে বলে সনাতন ধর্ম, চিরন্তন বিশ্বাস। এ এক ধর্ম নামক রীতি দ্বারা চালিত যার অর্থ জীবন চলার প্রথা। হিন্দুধর্মের সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে নিজের প্রতি সৎ থাকা। এর কোনো একক ধ্যান-ধারণা নেই। এটি সকল কিছুর কাছেই উন্মুক্ত। হিন্দুরা এক ঈশ্বরে বিশ্বাস করে যিনি আবার নানা রূপধারণ করতে পারেন। হিন্দুদের কাছে ঈশ্বর সময়হীন ও আকারহীন। বর্তমান হিন্দুদের আদি পূর্বপুরুষগণ বিশ্বাস করতেন চিরন্তন সত্য ও মহাজাগতিক নিয়ম-কানুনে। ধর্ম এখন এক মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং ইন্ডাস্ট্রীতে রূপান্তরিত হয়েছে যা ধর্মান্তরের মাধ্যমে প্রসারের মার্কেট শেয়ার বাড়াতে চাচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ব্যবসা হচ্ছে আধ্যাত্বিকতা। আমি একজন হিন্দু কারণ হিন্দুধর্ম অসহিংসতার ডাক দেয়। আমি একজন হিন্দু কারণ তা আমার মনকে কোনো বিশ্বাস ব্যবস্থার সাথে শর্ত জুড়ে দেয় না। একজন পুরুষ/মহিলা যে তার জন্মগত ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়, সে হলো নকল/ভন্ড/সুবিধাবাদী এবং তার নিজস্ব আদর্শ, সংস্কৃতি ও জীবনের মূল্যবোধকে মূল্য দেয় না।

Advertisements

ধর্ম কি?সনাতন ধর্মের লক্ষণ কি?


ধর্মঃ
ধারণাদ্ ধর্ম ইত্যাহুধর্মেণ বিধৃতাঃ প্রজাঃ।
যঃ স্যাদ্ ধারণসংযুক্তঃ স ধর্ম ইতি নেতরঃ ॥

অর্থাত্‍ ধারণ ক্রিয়া (ধৃ+মন্) থেকে ধর্ম শব্দের উত্‍পত্তি ।ধর্ম সৃষ্টিকে বিশেষভাবে ধারণ করে রয়েছে ।সংক্ষেপে যা কিছু ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন, তাই ধর্ম,এছাড়া অন্য কিছু ধর্ম নয়।

সনাতন ধর্মের লক্ষণ :মনুসংহিতা অনুসারে নিম্লোক্ত চারটিকে বলা হয় মূলত সনাতন ধর্মের লক্ষণ।
ক)বেদ-বেদ সনাতন ধর্মের মূল গ্রন্থ । বেদের ব্যাখ্যা হচ্ছে আরণ্যক ও উপনিষদ । শ্রীশ্রী গীতা হচ্ছে সমস্ত উপনিষদের সারবস্তু।সুতরাং বেদ বা গীতা বা উপনিষদে বিশ্বাস একজন সনাতন ধর্মাবলম্বীর প্রধান লক্ষণ।
খ)স্মৃতি :বিভিন্ল স্মৃতি শাস্ত্রের অনুশাসন মানা যেমনঃ মনুসংহিতা,পুরাণসমুহ প্রভৃতি
গ) সদাচার :মহাপুরুষদের সদাচার থেকে শিক্ষা নেয়া যেমন, রামায়নের রামচন্দ্র ,মহাভারতের শ্রীকৃষ্ণ প্রমুখ
ঘ)বিবেকের বাণী :যেমন শরণাগত ব্যক্তির জীবন বাঁচাতে প্রয়োজনে মিথ্যা বলা
*সনাতন ধর্মের বাহ্য লক্ষণঃ
ধৃতিঃ ক্ষমা দমোহস্তেয়ং
শৌচমিন্দ্রিয়-নিগ্রহঃ।
ধীর্বিদ্যা সত্যমক্রোধো
দশকং ধর্মলক্ষণম্॥
(মনুসংহিতা)
অর্থাত্‍ সহিষ্ণুতা,ক্ষমা ,চুরি না করা ,শুচিতা ,ইন্দ্রিয়সংযম,শুদ্ধ বুদ্ধি,জ্ঞান,সত্য এবং ক্রোধহীনতা-এইটি দশটি লক্ষণের মধ্যে সনাতন ধর্মের স্বরূপ প্রকাশ পায়।
*সনাতন ধর্মের বিশেষ লক্ষণ:
বৈষয়িক দর্শনে বলা হয়েছে-যতোহভ্যুদয়-নিঃশ্রেয়সিদ্ধি সঃ ধর্মঃ ॥
অনুবাদঃ যা থেকে জাগতিক কল্যাণ ও মোক্ষলাভ হয়-সেটিই ধর্ম।*যারা সনাতন ধর্ম না জেনে ধর্ম ত্যাগী হচ্ছে তাদের প্রতি সুস্পষ্ট নির্দেশ:ধর্ম এব হতো হন্তি,ধর্ম রক্ষতি রক্ষিতঃ।(ধর্ম নষ্ট হলে সে ধর্মনষ্টকারীকে নাশ করে;আর রক্ষিত হলে তাকে রক্ষা করে)

সুতরাং সনাতন ধর্ম মানেই তো মানবতা ধর্ম; এরপরও যারা সনাতন ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে পরিচয় দিতে লজ্জা বোধ করে তাদের নিজেদের মহিমান্বিত ধর্ম বিষয়ে কোন জ্ঞান নেই এ কথা অকপটে বলা যায়..

সৃষ্টিরহস্য।


Image result for brahma creation

এ পৃথিবীর আদি কোথায়, ইহা কিরূপে সৃষ্ট বা উদ্ভূত, এই কূট প্রশ্নটি মীমাংসা করিবার জন্য মানব চিরদিন সাধ্যমত চেষ্টা করেন। যথার্থ বলিতে কি, সৃষ্টরহস্য উদ্ভেদ করিবার জন্য তাঁহার কৌতুহলশিখা চিরপ্রদীপ্ত। সকল দেশের সকল ধৰ্ম্মশাস্ত্রেই ইহার বিষয় সম্যক বর্ণিত। তন্মধ্যে খ্ৰীষ্টধৰ্ম্মপুস্তক বাইবেলে এতদ্‌সম্বন্ধে যাহা উল্লিখিত, তাহাতে প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তির মনে কিছুমাত্র সন্তোষলাভ হয় না। যখন সৰ্ব্বশক্তিমান ঈশ্বর স্বর্গের একান্তে বসিয়া বিশ্বসৃষ্টি করিতে মানস করেন, তখন তিনি আদেশ দেন “আলোক হউক” এবং তাহার আদেশানুযায়ী আলোক সৰ্ব্বত্র দেদীপ্যমান হয়। তৎপরে তিনি ছয়দিবস দিবারাত্র ঘোর পরিশ্রম করিয়া এই স্থাবরজঙ্গমাত্মক পৃথিবী, সূৰ্য্য, চন্দ্র, নক্ষত্রমণ্ডলাদি সমুদয় সৃষ্টি করেন এবং সৃষ্টি রচনা করিতে করিতে তিনি এতদূর ক্লান্ত হন, যে সপ্তমদিবসে তিনি বিশ্রামমুখ লাভ করেন। যে ধৰ্ম্ম দ্বারা আজ জগতে অত্যুজ্জল সভ্যতাজ্যোতিঃ বিকীর্ণ, দেখ সেই ধৰ্ম্ম দ্বারা ঈশ্বরের কি অপরূপ মহিমা ও গৌরব প্রকাশিত! তাহা না হইলে, খ্ৰীষ্টধৰ্ম্মের এত শ্রেষ্ঠতা কেন ? কেন ইহার এত প্রশংসাবাদ ও সুখ্যাতিবাদ ? রে মহামহিম খৃষ্টধৰ্ম্ম! তুমিই সংসারে একমাত্র সত্য ধৰ্ম্ম! তুমিই সংসারে যথার্থ জ্ঞানালোক ও সভ্যতালোক বিতরণ করিতেছ। কিন্তু বল দেখি, জড়বিজ্ঞান আজ তোমার উপর কিরূপ মত প্রকাশ করে ? দেখ এই জড়বিজ্ঞান তোমারই প্রিয় পুত্র, তোমার দ্বারাই ইহা লালিত ও পালিত; অথচ সেই জড়বিজ্ঞান আজ তোমার শিরচ্ছেদ করিতে খড়গহস্ত। তোমার অলীক কথা শ্রবণে বিজ্ঞান হাস্য সম্বরণ করেন। এবং প্রকাশ্যভাবে বলে, “তুমি সংসারে গণ্ডমূর্খ বলিয়া এতদিন উপরোক্ত অসত্য প্রচার করিতেছ; এখন যদি তুমি নিজমঙ্গলপ্রার্থী হও, আমার কথায় কৰ্ণপাত কর এবং নিজের ভ্রমসংশোধন কর।” এস্থলে আর অধিক বলিবার আবশ্যকতা নাই।
সৃষ্টিরহস্যোদ্ভেদ করিবার জন্য, পুরাকালের দর্শনশাস্ত্র যেরূপ যত্নবান, আধুনিক জড়বিজ্ঞানও সেইরূপ যত্নবান। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই, যে সকল ক্রিয়াপরম্পরা বা ঘটনাপস্পরা দ্বারা এ জগৎ সৃষ্ট বা ক্রমবিবৰ্ত্তিত, তাহা ধারাবাহিকরূপে, পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে হৃদয়ঙ্গম করা অসম্পূর্ণ মানবমনের সাধ্যাতীত। এ বিষয়ে দর্শনশাস্ত্র অধ্যাত্মবিজ্ঞানের সাহায্যে বহুদূর অগ্রসর হইয়া গুঢ় রহস্যটি বুঝাইবার অনেক প্রয়াস প্রায়; কিন্তু বিজ্ঞান কিয়ৎ-দুর মাত্র অগ্রসর হইয়াই অন্ধকার ক্রমে গাঢ়তর হইতে দেখিয়া ক্ষুন্নমনে প্রত্যাবৰ্ত্তন করে। এ বিষয়ে মনোরথ সিদ্ধ না হওয়ায়, বিজ্ঞানবিৎ পণ্ডিত বলেন, জগৎসৃষ্টি যেরূপ রহস্যময়, একটি পরমাণুসৃষ্টিও সেইরূপ রহস্যময়, তবে কেন বৃথা চেষ্টা ?
কেহ কেহ বলেন, বিশ্বের সৃষ্টিও নাই, প্রলয়ও নাই, ইহা অনাদিকাল হইতে চলিত ও অনন্তকালস্থায়ী; কাল-কৰ্ম্ম-স্বভাব বশতঃ ইহা পরম্পরা চলিত। তাঁহারা বলেন, মানবমনের প্রকৃতি যেরূপ, তাহাতে আমরা সকল বিষয়ের আদি অন্বেষণে ব্যগ্ৰ হই বটে, কিন্তু আদি প্রাপ্ত হওয়া আমাদের অসম্ভব। মনে কর, সৃষ্টির পর প্রলয়, প্রলয়ের পর সৃষ্টি; সেইরূপ সৃষ্টির পূৰ্ব্বে প্রলয় প্রলয়ের পূৰ্ব্বে সৃষ্টি; এরূপ যুক্তিতে আমরা কোন বস্তুর আদ্যন্ত পাই না। অতএব সৃষ্টি অনাদি ও অনন্ত বলাই শ্রেয়।
কালের আদিও নাই, অন্তও নাই, ইহা অনাদি ও অনন্ত। ব্ৰহ্মাণ্ডেরও প্রারম্ভ নাই, অন্তও নাই, ইহা সৰ্ব্বব্যাপী। আকাশেরও সেইরূপ আদিও
নাই অন্তও নাই, ইহা সর্বময়। পৃথিবী যেমন গোলাকার, ইহার প্রারম্ভও নাই, অন্তও নাই; ব্ৰহ্মাণ্ডও সেইরূপ গোলাকার, ইহারও প্রারম্ভ নাই, অন্তও নাই।
সৃষ্টিসম্বন্ধে অধিকাংশ লোকের মনে একটা কুসংস্কার বদ্ধমূল। তাঁহারা ভাবেন, সৃষ্টির পূৰ্ব্বে কিছুই থাকে না। সৃষ্টির প্রাক্কালে ঈশ্বর ভৌতিক পদার্থগুলি ও ভৌতিক শক্তি গুলি সৃজন করেন এবং কতকগুলি প্রাকৃতিক নিয়ম স্থাপন করেন; ইহাতেই বিশ্ব প্রপঞ্চ সৃষ্ট ও উদ্ভূত। সেইরূপ বোধ হয় প্রলয়ের প্রারম্ভে ভৌতিক পদার্থ গুলি ও ভৌতিক শক্তিগুলি নষ্ট হইবে এবং এক আধার ব্যতীত আর কিছুই বিদ্যমান থাকিবে না। বস্তুতঃ সৃষ্টিপ্রক্রিয়াটি এমন সহজ নয়; আর চিরদিনই সৃষ্টিস্থিতিসংহার সমভাবে চালিত। যে ক্রমবিবৰ্ত্তন দ্বারা এ জগৎ সৃষ্ট, পরিবর্তিত ও রূপান্তরিত, সে বিবর্তনের বিরাম নাই, বিচ্ছেদ নাই; উহা চিরদিন সমভাবে চালিত। এখন যে সকল ভৌতিক পদার্থ ও ভৌতিক শক্তি দেখা যায়, উহারাও মন্বন্তরে মন্বন্তরে পরিবৰ্ত্তিত। এজন্য সৃষ্টিপ্রক্রিয়া চিরদিন আমাদের নিকট এত রহস্যময়।
অধ্যাত্মবিজ্ঞানের মতে ব্ৰহ্মই বিশ্বের আদি ও অন্ত। তিনিই ইহার রচয়িতা, তিনিই ইহার উপাদানকারণ এবং তিনিই ইহার আধার। যে চিৎশক্তিযোগে বিশ্ব রচিত, ব্ৰহ্মই সেই চিৎশক্তির সমষ্টি। যে সকল উপাদানযোগে বিশ্ব রচিত, ব্ৰহ্মই সেই সকল উপাদানের সমষ্টি। যে অনন্ত, অসীম আধারে বা স্থলে বিশ্ব রচিত, ব্ৰহ্মই সেই আধারের সমষ্টি। যিনি মায়া যোগে বৰ্দ্ধিত হইয়া বিশ্বপ্রপঞ্চে পরিণত, তিনিই ব্রহ্ম। “একোহং বহু স্যাম” তিনি অগ্ৰে এক থাকেন, পরে বহু হন। শাস্ত্রকারেরা উল্লেখ করেন, যেমন উর্ণনাভ স্বীয় জাল স্বাভ্যন্তর হইতে নিঃসরণ করে এবং পুনরায় উহাকে স্বাভ্যন্তরে সঙ্কুচিত করে; সেই রূপ পরব্রহ্ম সৃষ্টিকালে বিশ্ব প্রপঞ্চকে স্বাভ্যন্তর হইতে প্রকটিত করেন এবং প্রলয়কালে উহাকে স্বাভ্যন্তরে লীন করিয়া লন। এস্থলে উর্ণনাভ ও তদীয় জালে পার্থক্য আছে, কিন্তু বিশ্ব ও ব্রহ্মে কিছুমাত্র পার্থক্য নাই; একই ব্ৰহ্ম বৰ্দ্ধিত হইয়া বিশ্বে পরিণত। ব্ৰহ্মই আবার বিশ্বের অন্ত। প্রলয়কালে বিশ্বরচয়িতা সেই ব্রহ্মের চিৎশক্তি জগৎ রচিত এবং এই স্থূলজগতের মূলদেশে সূক্ষ্ম বা অধ্যাত্মজগৎ ‘বর্তমান; উহাতে যে সকল দেবতা আছেন, তাহারাই উপর হইতে নিম্নস্থ স্থুলজগৎকে পালন, পোষণ ও ধারণ করেন।
সৃষ্ট প্রকরণ লিখিবার পূৰ্ব্বে ইহার বিপরীত অবস্থা প্রলয়সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ উল্লেখ করা কৰ্ত্তব্য। প্রলয় দুই প্রকার (১) মহাপ্রলয় বা প্রাকৃতিক প্ৰলয় (২) নৈমিত্তিক প্রলয় বা খণ্ডপ্রলয়। মহাপ্রলয় সৃষ্টিকর্ত্তা ব্রহ্মার শতবৎসর আয়ুঃশেষে ও খণ্ডপ্রলয় তাঁহার দিবাবসানে প্রত্যেক কল্পের শেষে বা প্রত্যেক মন্বন্তরের শেষে সংঘটিত হয়। মহাপ্রলয়ে চতুর্দ্দশভুবন বা এই দৃশ্যমান জগৎ অসংখ্য অদৃশ্যজগতের সহিত লয় প্রাপ্ত হয় এবং খণ্ডপ্রলয়ে বিশ্বের স্থুলবিশেষ লয়প্রাপ্ত হয় মাত্র। Image result for creation
মহাপ্রলয়ে মায়াময়ী ত্রিগুণাত্মিকা প্রকৃতি পরব্রহ্মে লীন হইয়া অব্যক্ত মূল প্রকৃতিতে পরিণত হয় এবং ভবিষ্যৎসৃষ্টির উপাদান কারণ স্বরূপ অবস্থিতি করে। এই যে পরিদৃশ্যমান জগৎ, সূৰ্য্য, চন্দ্র, নক্ষত্ৰাদি লোকসমূহ, যাহা বহুপূৰ্ব্ব হইতে সূক্ষ্মে পরিণত হইতে থাকে, তাহা মহাপ্ৰলয়কালে পরব্রহ্মরূপ মহাকাশে বিলীন হইয়া তমোময় আধার স্বরূপ রহিয়া যায়। যে চব্বিশতত্ত্ব লইয়া সাংখ্যকারগণ সৃষ্টিরহস্যোদ্ভেদ করেন, তৎসমুদায়ই তৎকালে অব্যক্ত মূল প্রকৃতিতে বিলীন হয়। ব্রহ্মাদি দেবগণ পরব্রহ্মে লয়প্রাপ্ত হন এবং ব্ৰহ্মলোকাদি সকল লোকই তৎকালে নাশ প্রাপ্ত হয়। যথার্থ বলিতে কি, মহাপ্রলয়ের সে অবস্থাটা আমাদের কল্পনাতীত! সে অবস্থা যে কিরূপ, তাহা আমরা আদৌ ভাবিয়া উঠিতে পারি না। সে অবস্থা তমোময়, তমিস্রাময়; আর আলোকের অভাবে যে অন্ধকার দেখা যায়, তাহা মায়ারূপমাত্র; মহাপ্রলয়ে তাহাও থাকে না।
যেমন সুষুপ্তির অবস্থায় মনের মানসিক ক্রিয়া একেবারে রহিত হইয়া যায়; সেইরূপ মহাপ্রলয়েও পরব্রহ্মের চিৎশক্তির ক্রিয়া একেবারে রহিত হয়। মহাপ্রলয়ে পরব্রহ্মের সেই অব্যক্ত অবস্থাটা তোমার স্থুলমনের বোধগম্য করিবার জন্য, তোমার সর্বশ্রেষ্ঠ হিন্দুধৰ্ম্ম প্রলয়পয়োধি মধ্যে অনন্তকাল রূপ শেষনাগোপরি অধিশয়ান ও নিদ্রিত বিষ্ণুরূপ কল্পনা করে এবং জরায়ু গর্তে গর্ভোদক মধ্যে অধিশয়ান ভ্রণের ন্যায় প্রলয়পয়োধি জলোপরি অধিশয়ান নারাণরূপ কল্পনা করে। এরূপ কল্পনা ব্যতীত আমাদের উপায়ান্ত্র নাই।
মহাপ্রলয়ে বিশ্বের প্রকৃত অবস্থা কিরূপ, তাহা সকলের বুঝা উচিত। সকলেই মনে করেন, তৎকালে অখিল বিশ্ব একেবারে ধ্বংস হইয়া কেবল শূন্যময় ও তমোময় হয়। সাংখ্যকারেরা বলেন, সৃষ্টিরচনায় সাম্যাবস্থাপন্ন মূল প্রকৃতি কেবল বিষম, বিমিশ্র ও জটিল অবস্থায় পরিণত হয়। সেজন্য যে সকল তত্ত্ব দ্বারা বিশ্ব রচিত, প্রলয়ের প্রাক্‌কালে সে সকল তত্ত্ব স্ব স্ব উৎপত্তিস্থলে লীন হইয়া সৃষ্টির বৈষম্যাবস্থা নাশ করতঃ সাম্যাবস্থা পুনঃপ্রাপ্ত হয়; যথা পঞ্চভূত পঞ্চতন্মাত্রে, পঞ্চৎন্মাত্র অহংতত্ত্বে, অহংতত্ত্ব মহত্তত্বে লয় প্রাপ্ত হইয়া সকল তত্ত্বগুলি মূলপ্রকৃতিতে বিলীন হয়। সৃষ্টিপ্রক্রিয়ায় তত্ত্বগুলি ক্রমবিবৰ্ত্তিত হয় এবং প্রলয়ে উহারা ক্রমসস্কুচিত হয়। এইরূপে সমগ্ৰ বিশ্ব মহাপ্রলয়ে অব্যক্তাবস্থায় পরিণত হয়। এখন বিশ্বের এই অব্যক্তাবস্থাটী বুঝাইবার জন্য একটি দৃষ্টান্তের উল্লেখ করা আবশ্যক। দেখ, অম্লজন ও উদজন রাসায়নিক আকর্ষণে একত্রিত হইয়া উদক প্রস্তুত করে। সেই অম্লজন ও উদজন উদকাবস্থায় অব্যক্তভাবে থাকে। আমরা কদাচ বলিতে পারি না, উদকাবস্থায় উহাদের নাশ হয়; কারণ উদক পুনরায় বিশ্লিষ্ট করিলে, অম্লজন ও উদজন পুনঃপ্রাপ্ত হওয়া যায়। সেইরূপ মহাপ্রলয়ে বিশ্বের ধ্বংস বা নাশ হয় না; উহা কেবল অব্যক্তাবস্থায় থাকিয়া যায়।
খণ্ডপ্রলয়ে সৃষ্টিকর্ত্তা ব্ৰহ্মা নিদ্রিত যান। তৎকালে যাবতীয় জীবজন্তু ও উদ্ভিজ্জাদি নাশ প্রাপ্ত হয়।
ভূতগ্ৰামঃ স এবায়ং ভূত্বা ভূত্ব প্রলীয়তে
রাত্র্যাগমেহবশঃ পার্থ প্রভবত্যহরাগমে।
গীতা।
“ব্ৰহ্মার রাত্রি হইলে, (খণ্ডপ্রলয়ে) জীবজন্তু ও উদ্ভিজ্জাদি লয় প্রাপ্ত হয় এবং তাঁহার দিন হইলে সকলে আবার উৎপন্ন হয়। এই প্রকারে উহাদের উৎপত্তিও নাশ হয়।” খণ্ডপ্রলয় রুদ্রদেব কর্ত্তৃক সংকর্ষণাদি অগ্নিযোগে বা জলপ্লাবন দ্বারা সংঘটিত হয়। ইহাতে প্রকৃতি স্থলবিশেষে বা অংশবিশেষে বিপ্লবের পর বিপ্লব অতিক্রম করতঃ নূতন অবস্থা প্রাপ্ত হইয়া পৃথিব্যাদিকে বিভিন্ন উন্নত জীবের বাসভূমি করিয়া দেয়। খণ্ডপ্রলয় দ্বারাই লিমুরিয়া ও আটলাণ্টিস মহাদ্বীপ-দ্বয় জলমগ্ন হয় এবং জম্বুদ্বীপ সমুদ্রগর্ভ হইতে উখিত হয়।
শাস্ত্রমতে ব্ৰক্ষার শতবৎসর আয়ুর মধ্যে প্রথমাৰ্দ্ধ অতীত। ইহা চতুর্থ বরাহকল্প এবং চতুর্দ্দশ মনুর অধিকার মধ্যে সপ্তম মনু বৈবস্বতের অধিকারকাল বা মন্বন্তর প্রবর্ত্তিত। ইহাতে বোধ হয়, ব্রহ্মাণ্ড আধুনিক অবস্থা প্রাপ্ত হইবার পূৰ্ব্বে কত প্রকার খণ্ডপ্রলয় অতিক্রম করে, তাহার ইয়ত্তা নাই। যাহা হউক, যে স্থলে অসার খ্ৰীষ্টধৰ্ম্ম কেবলমাত্র ছয় হাজার বৎসর পূৰ্ব্বে ঈশ্বরকে জগতের অন্তরালে বসাইয়া সপ্তদিবসে জগৎ সৃষ্টি করায় সে স্থলে সনাতন হিন্দুধৰ্ম্ম অধ্যাত্মবিজ্ঞানের সুবিমল জ্যোতিঃ প্রাপ্ত হইয়া যুগযুগান্তর কত লক্ষ লক্ষ বৎসর নির্দ্দেশ করতঃ সৃষ্টি বিষয়ে যে সকল মহাসত্য নির্দ্দেশ করে, তাহা এখনও তোমার পূজ্যতম জড়বিজ্ঞান বুঝিতে অক্ষম অথবা অনেক অনুসন্ধান ও পর্য্যবেক্ষণের পর সবেমাত্র উহাদের আভাস পায় কেবল পাশ্চাত্য মুর্খেরাই কতকগুলি মিথ্যা উপদেশ দিয়া আমাদের মস্তিষ্ক বিকৃত করিয়া দেন। তাঁহাদেরই অত্যাচারে আমরা শাস্ত্রের প্রকৃত গৌরব বুঝতে পারি না। আমরা এখন কি ছাইভস্ম পড়িয়া শাস্ত্রোক্ত রত্নগুলিকে পদে দলন করিতে শিক্ষা করি। হায়! ইহা অপেক্ষা পরিতাপের বিষয় আর কি হইতে পারে ?

Image result for brahma creation
শাস্ত্রপাঠে অবগত হওয়া যায়, সৃষ্টিরচনা করিবার পূৰ্ব্বে ব্রহ্ম একটি অত্যুজ্জ্বল হিরন্ময় অণ্ড উৎপাদন করেন। তাহাতে সৃষ্টিকর্ত্তা ব্ৰহ্মা জন্মগ্রহণ করেন, অথবা তিনি ব্রহ্মের নাভিপদ্ম হইতে জন্মগ্রহণ করিয়া কমলযোনি নাম প্রাপ্ত হন। তিনি পদ্মকোষে অবস্থিতিপূৰ্ব্বক শতবৎসর পরব্রহ্মের তপ করিয়া তাহার নিকট সৃষ্টিবিষয়ক জ্ঞানলাভ করেন এবং প্রলয়পয়োধিজল পান করতঃ প্রজাসৃষ্টির জন্য ঋষি ও প্রজাপতিগণকে উৎপাদন করেন। তাঁহারাই সৃষ্টিকর্ত্তা ব্ৰহ্মার মানসপুত্র এবং তাহারাই স্থাবরজঙ্গমাত্মক বিশ্ব সৃষ্টি করেন। জনসাধারণকে সৃষ্টিপ্রক্রিয়াটি সহজ ভাষায় বুঝাইবার জন্যই শাস্ত্রকারেরা রূপকভাবে ঐরূপ লিখিয়া যান। রূপক ভেদ করিয়া সামান্য কাল্পনিক উপাখ্যানের সত্য সংগ্ৰহ করিতে চেষ্টা পাও, বুঝিতে পারিবে, উহার ভিতর আধ্যাত্মবিজ্ঞানের কি জলন্ত সত্য নিহিত।
এ স্থলে অণ্ড, পদ্ম প্রলয়পয়োধি প্রভৃতি যে কয়েকটি উপমাবাচক শব্দ ব্যবহৃত, উহাদের প্রকৃত তাৎপৰ্য্য বুঝা উচিত। যেমন একটি ক্ষুদ্র অণ্ডের অভ্যন্তরস্থ সাম্যাবস্থাপন্ন স্ত্র্যণু পুরুষনিষিক্ত বীর্যের পুমণু সংযোগে পরিবর্তনের পর পরিবর্তন সহ্য করতঃ কালসহকারে বিবিধ অঙ্গপ্রত্যঙ্গে সুশোভিত হইয়া একটি জীবে পরিণত; সেইরূপ বিশ্বের সাম্যাবস্থাপন্না ত্ৰিগুণা মূলপ্রকৃতি পুরুষনিষিক্ত তেজোরাশি দ্বারা বা পরব্রহ্মের চিৎশক্তি দ্বারা সংক্ষোভিত হইয়া পরিবর্ত্তনের পর পরিবর্ত্তন সহ্য করতঃ কালক্রমে অনন্তবৈচিত্র্যবিশিষ্ট আদ্যস্তবিহীন বিশ্বমণ্ডলে পরিণত। এজন্য অখিল বিশ্ব ব্রহ্মের অণ্ডস্বরূপ এবং ইহার নাম ব্রহ্মাণ্ড।
পদ্মের বীজে ভাবি উদ্ভিজ্জের অবয়বগুলি অব্যক্তাবস্থায় নিহিত এবং উত্তাপ ও জলযোগে বৰ্দ্ধিত হইয়া ইহা উদ্ভিজ্জে পরিণত হয়। সেইরূপ মূলপ্রকৃতিতে ভবিষ্যৎ বিশ্বের যাবতীয় উপাদান (সূক্ষ্ম আদিম ভৌতিকপদার্থ গুলি) অব্যক্তাবস্থায় বৰ্ত্তমান এবং ইহাও চিৎশক্তিযোগে পরিবর্ত্তিত হইয়া বিশ্বপ্রপঞ্চে প্রস্ফুরিত। এজন্য যে ব্ৰহ্মার বিরাট দেহ ত্রিখণ্ডিত হইয়া স্বৰ্গ মর্ত্ত্য ও পাতাল বিরচিত, সেই সৃষ্টিকর্ত্তা ব্ৰহ্মা শাস্ত্রে কমলযোনি বলিয়া উক্ত।
এখন কমলযোনি ব্রহ্মার প্রলয়পয়োধিজলে জন্মবৃত্তান্তটি বুঝিবার জন্য জরায়ুগর্ভে ভ্রুণের উৎপত্তিবিষয় ভাবা উচিত। স্ত্র্যণুর সহিত পুমণুর সংযোগ হইলে কিছুদিন পরে জরায়ু গর্ভোদকে (Liq Amnii) পূর্ণ হয় এবং উহাতে একটা জীব ভ্রুণরূপে দৃষ্ট হয়। ইহার নাভিদেশ নালীদ্বারা জরায়ুপুষ্পে সংলগ্ন থাকে। এই ভ্রুণ নিমীলিতাক্ষ হইয়া ধ্যানমগ্নবেশে কয়েক মাস জরায়ুগর্ভে বাস করে। সেইরূপ সৃষ্টিকর্তা ব্ৰহ্মা বিষ্ণুর নাভিপদ্ম হইতে উৎপন্ন হইয়া প্রলয়পয়োধিজলে ভাসমান হন এবং নিমীলিতাক্ষ হইয়া শতবৎসর পরব্রহ্মের ধ্যান করতঃ সৃষ্টিবিষয়ক জ্ঞানলাভ করেন। এস্থলে ভ্রূণের সহিত ব্ৰহ্মার এবং গর্ভোদকের সহিত প্রলয়পয়োধির তুলনা করা হয়। বস্তুতঃ সৃষ্টির পূর্ব্বে জলও থাকে না, স্থুলও থাকে না এবং ব্রহ্মা ও পরব্রহ্ম বা বিষ্ণুর নাভিপদ্ম হইতে উৎপন্ন হন না। যে প্রলয়পয়োধি পান করতঃ ব্ৰহ্মা সৃষ্টি প্রক্রিয়া আরম্ভ করেন, তাহা কেবল তমোগুণের আধিক্য। তমোগুণ বলবৎ হইয়া প্ৰলয় উপস্থিত হয় এবং রজোগুণ বলবৎ হইয়া তমোগুণ নাশ করিলে সৃষ্টি প্রক্রিয়া আরম্ভ হয়।
সৃষ্টি প্রকরণে সাংখ্যকারদিগের মতামত সৰ্ব্বশ্রেষ্ঠ। তাঁহাদের মতামত না উল্লেখ করিলে সৃষ্টিরহস্য উদঘাটিত হয় না। এস্থলে তাঁহাদেরই মত অনুসরণ করা যাউক। তাঁহারা মানবদেহের সৃষ্টি বাখ্যান করিয়া বিশ্বসৃষ্টি ব্যাথ্যান করেন। ইহাতে তাঁহাদের কয়েকটি প্রধান উদ্দেশ্য দেখা যায়। (১) বিশ্ব যে সকল উপাদানে নিৰ্ম্মিত, মানবদেহও সেই সকল উপাদানে নিৰ্ম্মিত; মানবদেহ পরাৎপর পরব্রহ্মের ক্ষুদ্রমূৰ্ত্তি এবং বিশ্ব তাঁহার বিরাট মূৰ্ত্তি। (২) বিরাটমূৰ্ত্তিনিৰ্ম্মাণ হৃদয়ঙ্গম করা মানবের দুঃসাধ্য; মানবদেহনিৰ্ম্মাণ মানবমন অসম্পূর্ণ হইলেও বুঝতে সক্ষম। (৩) মানবমন ও মানবদেহের সহিত বিশ্বের যে সকল সম্বন্ধ বর্ত্তমান, সে সকল সম্বন্ধ নিরূপণ করিয়া উহাদের ভিতর যে সামঞ্জস্য দেখা যায়, তাহার বিষয় ভাবিলে সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার গুঢ়রহস্য কিয়ৎপরিমাণে বুঝা যায়। (৪) যখন মানব বর্ত্তমান; তখন তাহার সমক্ষে বিশ্বও বর্ত্তমান; যখন তিনি অবর্ত্তমান, তখন বিশ্বও তাঁহার সমক্ষে অবর্ত্তমান; যে জগতের কেন্দ্র সৰ্ব্বস্থলে এবং পরিধি কোথাও নাই, সে জগতের আমিই প্রকৃত কেন্দ্র; অতএব মানবদেহ সৃষ্টি বর্ণন করিলে বিশ্বসৃষ্টি বর্ণন করা হয়। (৫) যে সকল প্রক্রিয়াবলে সূক্ষ্ম ক্রমে স্থূলে বিবৰ্ত্তিত, অথবা যে সকল স্তর অতিক্রম করিয়া সূক্ষ্ম ক্রমশঃ স্থূলে পরিণত, তাহা বর্ণন করিবার অন্য সহজ উপায় নাই; অতএব মানবমন ও মানবদেহের সৃষ্টি বর্ণন করিয়া সাংখ্যকারেরা সূক্ষ্মজগৎ ও স্থূলজগতের কথা কথঞ্চিৎ ব্যাখ্যান করেন।
সাংখ্যমতানুযায়ী সৃষ্টিপ্রক্রিয়া উল্লেখ করিবার পূৰ্ব্বে সাংখ্যোক্ত প্রকৃতি, পুরুষ, প্রধান, ত্রিগুণ ও গুণক্ষোভ এই কয়েকটি শব্দের তাৎপৰ্য্য যথাসাধ্য বুঝা উচিত। “মূলগ্রকৃতি” বিশ্বের আদিম উপাদানসমষ্টি; ইহাই উহার উপদান কারণ এবং পরব্রহ্মের আবরণ মাত্র। সূক্ষ্ম মূলপ্রকৃতি ক্রমবিবৰ্ত্তিত হইয়া স্থুলপ্রকৃতিতে পরিণত। এস্থলে কেহ যেন এমন ভাবেন না, যে সকল ভৌতিক পদার্থ দ্বারা জগৎ নিৰ্ম্মিত, উহাদের সমষ্টি মূলপ্রকৃতি। ভৌতিক পদার্থগুলি স্থুল, অতএব উহারা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য। কিন্তু মূলপ্রকৃতি সূক্ষ্ম হইতে স্সূক্ষ্মতম। উহা আমাদের নিকট সম্পূর্ণ অব্যক্ত। যে সকল সূক্ষ্ম আদিম ভৌতিক পদার্থ ক্রমবিবৰ্ত্তিত হইয়া আধুনিক স্থূল ভৌতিকপদার্থে পরিণত, উহাদের সমষ্টি মূলপ্রকৃতি। “প্রধান” মূল প্রকৃতির সৃষ্টিকালীন সাময়িক অবস্থামাত্র। প্রধান ও মূল প্রকৃতিতে অত্যল্প প্রভেদ। উভয়েই ত্রিগুণের সাম্যাবস্থা। অণ্ড হইতে জীবোৎপাদনে স্ত্র্যণু যেরূপ ঘটনাপরম্পরা দ্বারা পরিণত ও পরিবর্ত্তিত বিশ্বরচনায়ও সেইরূপ মূলপ্রকৃতি ঘটনাপরম্পরা দ্বারা পরিণত ও পরিবর্ত্তিত।
পুরূষ পরব্রহ্মের চিৎশক্তি। স্ত্র্যণু যেমন পুমণুর সংযোগ ব্যতীত পরিণাম প্রাপ্ত হয় না; সেইরূপ পরব্রহ্মের মূলপ্রকৃতি পুরুষরূপ তাঁহার চিৎশক্তির সংযোগ ব্যতীত পরিণাম প্রাপ্ত হয় না। এস্থলে পুমণুর সহিত পুরুষের তুলনা করা হয়। জড়বিজ্ঞানের মতে জড়বস্তুর পরমাণুগুলি যেরূপ জড়শক্তির যোগে ক্ষোভিত ও পরিণত মূল প্রকৃতিও সেইরূপ পুরুষযোগে ক্ষোভিত হইয়া পরিণাম, বিকার ও বৈষম্য প্রাপ্ত।
ময়াধ্যক্ষেণ প্রকৃতিঃ সূয়তে সচরাচরং
হেতুনানেন কৌন্তেয় জগদ্বিপরিবর্ত্ততে।
গীত।
“স্বামীরূপে আমা দ্বার বীর্য্য নিষিক্ত হইলে, প্রকৃতি চরাচর বিশ্ব প্রসব করে এবং একারণে জগতের পরিবর্তন ঘটে।”
মম যোনির্মহদ্ব্রহ্ম তস্মিন্ গর্ব্ভং দধাম্যহম্ ।
সম্ভবঃ সর্ব্বভূতানাং ততো ভবতি ভারত ॥৩॥
সর্ব্বযোনিষু কৌন্তেয় মূর্ত্তয়ঃ সম্ভবন্তি যাঃ ।
তাসাং ব্রহ্ম মহদ্­যোনিরহং বীজপ্রদঃ পিতা ॥৪॥
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা চতুর্দ্দশোঽধ্যায়ঃ
“মূলপ্রকৃতিরূপ মহৎব্রহ্ম আমারই যোনি, তাহাতে আমি বীৰ্য্য নিষিক্ত করিয়া গর্ভাধান করি। তাহা হইতেই সকল ভূতের উৎপত্তি। সকল লোকে যে সকল জীবজন্তু ও ভূতাদি উৎপন্ন, সেই সকলের প্রধান যোনি বা উৎপত্তিস্থল মূলপ্রকৃতিরূপ ব্ৰহ্ম এবং আমিই তাহাদের বীজপ্ৰদ পিতা।” এস্থলে সকলের বুঝা উচিত যে, মূলপ্রকৃতি ও চিৎশক্তি লইয়াই ব্ৰহ্ম এবং মূলপ্রকৃতি ব্রহ্মের আবরণমাত্র। ব্রহ্ম নিরুপাধি; কিন্তু প্রধান ও পুরুষ নিরুপাধি ব্রহ্মের উপাধি বিশিষ্ট রূপমাত্র।
এখন ত্রিগুণ শব্দের প্রকৃত অর্থ কি ? স্থূল জগতের যাবতীয় বস্তু উত্তম, মধ্যম ও অধম, এই তিন শ্রেণীতে বিভক্ত; আবার প্রত্যেক বস্তু উপরোক্ত তিন গুণবিশিষ্ট, অর্থাৎ অবস্থাভেদে একই বস্তু উত্তম, মধ্যম ও অধম জ্ঞান করা যায়। এই প্রকার যুক্তি অনুসরণ করিয়া সাংখ্যকার সত্ত্বরজস্তম প্রকৃতির ত্রিগুণ আবিষ্কার করেন; অথবা এই মতটি অধ্যাত্মবিজ্ঞান হইতে গৃহীত। যাহা হউক প্রকৃতির ত্রিগুণ স্থূলজগত প্রকটিত তিনগুণের সূক্ষ্মরূপমাত্র। ইহারা পরব্রহ্মের আদ্যাশক্তি মায়ার ত্রিগুণ। ইহাদের অনন্ত লীলাবশতঃ সংসারে অনন্ত বৈচিত্র্য ও অনন্ত প্রভেদ দৃষ্ট হয়।
সত্ত্বং রজস্তম ইতি গুণাঃ প্রকৃতিসম্ভবাঃ ।
নিবধ্নন্তি মহাবাহো দেহে দেহিনমব্যয়ম্ ॥৫॥
তত্র সত্ত্বং নির্ম্মলত্বাৎ প্রকাশকমনাময়ম্ ।
সুখসঙ্গেন বধ্নাতি জ্ঞানসঙ্গেন চানঘ ॥৬॥
রজো রাগাত্মকং বিদ্ধি তৃষ্ণাসঙ্গসমুদ্ভবম্ ।
তন্নিবধ্নাতি কৌন্তেয় কর্ম্মসঙ্গেন দেহিনম্ ॥৭॥
তমস্ত্বজ্ঞানজং বিদ্ধি মোহনং সর্ব্বদেহিনাম্ ।
প্রমাদালস্যনিদ্রাভিস্তন্নিবধ্নাতি ভারত ॥৮॥
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা চতুর্দ্দশোঽধ্যায়ঃ
“প্রকৃতিসম্ভব বা মাইয়োদ্ভূত সত্ত্বরজস্তম এই গুণত্রয় জীবদেহে অক্ষয় জীবাত্মাকে নিবন্ধ ও জড়িত করিয়া রাখে। তন্মধ্যে সত্ত্বগুণ নিৰ্ম্মলতাপ্রযুক্ত স্বয়ং প্রকাশিত ও দোষম্পর্শশূন্য এবং ইহা জীবাত্মাকে সুখে ও জ্ঞানে যুক্ত করে। সত্ত্বগুণই জীবাত্মার প্রকৃত সুখ ও জ্ঞানের আকর। রজোগুণ অনুরাগ স্বরূপ; ইহা হইতে অভিলাষ ও আসক্তি জন্মে এবং ইহা জীবাত্মাকে কর্ম্মে আবদ্ধ করে। তমোগুণটি অজ্ঞান হইতে উৎপন্ন; ইহা দ্বারাই সকল জীবজন্তু মোহিত এবং ইহা জীবাত্মাকে প্রমাদ, আলস্য ও নিদ্রার অভিভূত করে। সকল অমঙ্গলের কারণ তমোগুণ।”
উপরোক্ত গুণত্রয় ক্ষোভিত হইলে, প্রকৃতি পরিণাম প্রাপ্ত হয়। যেমন জড়বিজ্ঞানের মতে প্রকৃতিজগতে পরমাণু ও জীবাণু ক্ষোভিত হইয়া পরিবর্তিত ও রূপান্তরিত হয়, সেইরূপ সূক্ষ্মজগতেও উপরোক্ত ত্রিগুণ ক্ষোভিত হইলে সূক্ষ্ম মূলপ্রকৃতি পরিণাম ও বিকার প্রাপ্ত হয় এবং পরিবর্তনের পর পরিবর্ত্তন সহ্য করতঃ বিভিন্ন অবস্থায় পরিণত হয়। এখন জিজ্ঞাস্য, যখন ত্রিগুণ সূক্ষ্ম বস্তু বা বস্তুর মনোগ্রাহ্য অবস্থা বা সংজ্ঞা ও প্রকৃত পদার্থ নহে, তখন উহারা কি প্রকারে ক্ষোভিত বা আন্দোলিত হয় ? দুগ্ধের ক্ষোভনে বা মন্থনে নবনীত উৎপন্ন, ইহা প্রত্যক্ষ প্রমাণসিদ্ধ। কিন্তু গুণক্ষোভ শব্দের অর্থ অন্যরূপ। যেমন কোন বিষয় পুনঃ পুনঃ মনে আন্দোলিত হইলে, উহা হইতে কোন সারবস্তু বাহির করা যায়, সেইরূপ সূক্ষ্মজগৎব্যাপী মূল প্রকৃতির সূক্ষ্ম ত্রিগুণ ক্ষোভিত বা পুনঃ পুনঃ আন্দোলিত হইলে, মূলপ্রকৃতি পরিণাম প্রাপ্ত হইয়া বিভিন্ন অবস্থা প্রাপ্ত হয়। এই প্রকারে উহা সাম্যাবস্থা হইতে ক্রমশঃ বিভিন্ন ও বিষম হইতে আরম্ভ হয়। মহাপ্রলয়ে মূল প্রকৃতি সম্পূর্ণরূপ নিশ্চেষ্ট থাকে এবং উহার গুণত্রয় কিছুমাত্র ক্ষোভ প্রকাশ করে না। তৎকালে উহারা স্পন্দরহিত হইয়া মৃতবৎ থাকে। কিন্তু সৃষ্টির প্রাক্‌কালে পুরুষের তেজ মূলপ্রকৃতিতে সংক্রামিত হইলে, উহার গুণক্রিয়া আরম্ভ হয় এবং উহাও এক অবস্থা হইতে অবস্থান্তর প্রাপ্ত হয়। এস্থলে মনের ক্রিয়ার সহিত গুণের ক্রিয়ার তুলনা করা হয়।
এখন সাংখ্যকারদিগের মতে সৃষ্টিপ্রক্রিয়া বর্ণনা করা যাউক। গুণক্ষোভ বশতঃ মূল প্রকৃতির প্রথম পরিণামে মহত্তত্ত্ব উৎপন্ন। মহত্তত্ব আর কিছুই নয়, কেবল বিশ্বব্যাপিনী বুদ্ধিশক্তির বীজস্বরূপ মূলীভুত কারণ বা সমষ্টি। ইহা দ্বারা নির্গুণ ও অব্যক্ত পরব্রহ্ম সগুণ ও ব্যক্ত হইয়া মানবমনের ভাব্য হন স্থাবরজঙ্গমাত্মক বিশ্ব প্রপঞ্চের প্রত্যেক বস্তুতে যে অলৌকিক বুদ্ধিশক্তি অস্তনিৰ্হিত এবং যাহার বলে সমগ্র জগৎ একোদ্দেশ্যসাধনের জন্য ক্রমশঃ অগ্রসর, সেই অসীম বুদ্ধিশক্তি মহত্তত্ত্ব হইতে যাবতীয় পদার্থে প্রতিভাত; যেমন একমাত্র সূৰ্য্যদেব বিশ্বের তমোনাশ করতঃ যাবতীয় পদার্থকে আলোক প্রদান করে, সেইরূপ মহত্তত্ত্বও বিশ্বের যাবতীয় পদার্থকে অল্পাধিক বুদ্ধিশক্তি প্রদান করে। গুণভেদে মহত্তত্ব ত্ৰিবিধ সাত্ত্বিক, রাজসিক ও তামসিক। ইহারাই হিন্দুধর্ম্মে ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বররূপে পূজিত। ইহাই বিশ্বের ও বিশ্বস্থ প্রত্যেক পদার্থের প্রথম সূক্ষ্মতম আবরণ। ইহাই সূক্ষ্ম স্থূলে পরিণত হইবার প্রথম স্তর। জীবদেহে যে চৈতন্য প্রভাবে নেত্রদ্বারা দর্শন, কর্ণদ্বারা শ্রবণ, নাসিকাদ্বারা আঘ্রাণ, রসনা দ্বারা আস্বাদন ও ত্বক দ্বারা স্পর্শ জ্ঞান হয় এবং মনদ্বারা অনন্ত চিন্তা করা যায়, সেই চৈতন্য মহত্তত্ত্বের আংশিক বিকাশ মাত্র।
গুণক্ষোভবশতঃ প্রকৃতির দ্বিতীয় পরিণামে অহংতত্ত্বের উৎপত্তি। যে জ্ঞান দ্বারা সকলের আত্মাভিমান বা আমিত্বজ্ঞান জন্মে, তাহাই অহংতত্ত্ব; অহংতত্ত্বটী মহত্তত্ত্বকে আবৃত করিয়া বিশ্বের দ্বিতীয় আবরণ স্বরূপ হয়। সত্য বটে, ইহা জঙ্গমে যতদূর প্রকটিত, স্থাবরে ততদূর নহে, তথাচ ইহা সৰ্ব্বত্র বর্তমান। গুণভেদে অহংতত্ত্ব আবার ত্রিবিধ, সাত্ত্বিক, রাজসিক ও তামসিক। অহংতত্ত্বরে সাত্ত্বিক অংশ বিকৃত হইয়া মন ও ইন্দ্রিয়াধিষ্ঠাতৃ দেবগণ, রাজসিক অংশ বিকৃত হইয়া দেহের ইন্দ্রিয়গণ ও তামসিক অংশ বিকৃত হইয়া জগতের পঞ্চতন্মাত্র ও পঞ্চমহাভূত উৎপাদন করে। এক অহংতত্ত্বের ত্রিবিধগুণের পরিণাম বশতঃ মন, ইন্দ্রিয়গণ ও পঞ্চভূত সৃষ্ট হওয়ায় জগতে সৰ্ব্বত্র সাৰ্ব্বজনিক সামঞ্জস্য স্থাপিত।
অহংতত্ত্বের তামসিক অংশ ক্ষোভিত হইলে, প্রথমে শব্দতন্মাত্র উৎপন্ন; পরে শব্দতন্মাত্র ক্ষোভিত হইলে, শব্দগুণবিশিষ্ট আকাশ উৎপন্ন এবং উহা মহত্তত্ত্ব ও অহংতত্ত্বকে আবৃত করিয়া বিশ্বের তৃতীয় আবরণস্বরূপ হয়। আকাশ ক্ষোভিত হইলে প্রথমে স্পর্শতন্মাত্র উৎপন্ন; পরে স্পর্শতন্মাত্র ক্ষোভিত হইলে স্পর্শগুণবিশিষ্ট বায়ু উৎপন্ন এবং উহা মহত্তত্ব, অহংতত্ত্ব ও আকাশকে আবৃত করিয়া জগতের চতুর্থ আবরণস্বরূপ হয়। বায়ু ক্ষোভিত হইলে প্রথমে রূপতন্মাত্র, পরে রূপ গুণবিশিষ্ট জ্যোতিঃ উৎপন্ন এবং উহা মহত্তত্ত্ব, অহংতত্ত্ব, আকাশ ও বায়ুকে আবৃত করিয়া জগতের পঞ্চম আবরণস্বরূপ হয়। জ্যোতিঃক্ষোভিত হইলে, প্রথমে রসতন্মাত্র, পরে রসগুণবিশিষ্ট সলিল উৎপন্ন এবং উহা মহত্তত্ব, অহংতত্ত্ব, আকাশ, বায়ু ও জ্যোতিঃ ও সলিলকে আবৃত করিয়া জগতের ষষ্ঠ আবরণস্বরূপ হয়। সলিল ক্ষোভিত হইলে, প্রথমে গন্ধতন্মাত্র, পরে গন্ধগুণবিশিষ্ট পৃথিবী উৎপন্ন এবং উহা মহতত্ত্ব, অহংতত্ত্ব আকাশ, বায়ু, জ্যোতিঃ ও সলিলকে আবৃত করিয়া জগতের সপ্তম আবরণস্বরূপ হয়। এইরূপে অহং তত্ত্বের তামসিক অংশ হইতে জগতের পঞ্চতন্মাত্র ও পঞ্চমহাভূত সৃষ্ট। ইহাতেই জানা যায়, তমো গুণের আধিক্য হইয়া কি প্রকারে সূক্ষ্ম ক্রমশঃ স্থূলে পরিণত।
অহংতত্ত্বের রাজসিক অংশ ক্ষোভিত হইলে, ইন্দ্রিয়গণ উৎপন্ন। ইন্দ্রিয় গুলি দুই প্রকার, জ্ঞানেন্দ্রিয় ও কৰ্ম্মেন্দ্রিয়। চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহবা, ও ত্বক, এ পাঁচট জ্ঞানেন্দ্রিয় এবং পায়ু, উপস্থ, হস্ত, পদ ও বাক্ এই পাঁচটি কৰ্ম্মেন্দ্রিয়। জ্ঞানেন্দ্রিয় দ্বারা মন বাহ্যজগতের জ্ঞানলাভ করে এবং কৰ্ম্মেন্দ্রিয় দ্বারা মন বাহ্যজগতের নানাবিধ কৰ্ম্ম সম্পাদন করে। এস্থলে জিজ্ঞাস্য সৃষ্টি বিষয় লিখিতে গিয়া জীবদেহের ইন্দ্রিয়োৎপত্তির বিষয় কেন লিখিত হইল? শাস্ত্রকারেরা অণ্ডের আদর্শে বিশ্বরূপ ব্রহ্মের অণ্ডের সৃষ্টি বর্ণন করেন বলিয়া, অণ্ড হইতে একটা জীব বিবিধেন্দ্রিয়বিশিষ্ট হইয়া জন্মগ্রহণ করিবার পূৰ্ব্বে জ্ঞানেন্দ্রিয়গুলি ও কর্ম্মেন্দ্রিয়গুলি কিরূপে সূক্ষ্মভাবে উৎপন্ন হইয়া অণ্ডে অব্যক্তবস্থায় থাকে, তাহাই তাঁহার এস্থলে দেখান। তাঁহারা ব্যষ্টিভাবে ইন্দ্রিয়োৎপত্তি বর্ণন করিয়া সমষ্টিভাবে জগতের ইন্দ্রিয়োৎপত্তি বর্ণন করেন মাত্র। ইন্দ্রিয়গুলি জঙ্গমে যতোধিক স্ফুরিত, স্থাবরে তেমনি অস্ফুরিত।
অহংতত্ত্বের সাত্ত্বিক অংশ ক্ষোভিত হইলে, মন ও ইন্দ্রিয়াধিষ্ঠাতৃ দেবগণ উৎপন্ন। ইহাতে বোধ হয়, মন মস্তিষ্ক হইতে উৎপন্ন হইলে ও বস্তুতঃ ইহা কেবল এ স্থূল জগতের বস্তু নয়, ইহা অধ্যাত্মজগতের বস্তু। ইন্দ্রিয়গুলির অধিষ্ঠাতৃ দেবগণ যথা, সূৰ্য্য চক্ষুর, দিকপাল কর্ণের, পবন ত্বকের, প্রচেতা জিহবার, অশ্বিণীকুমার নাসার, মিত্র পায়ুর, প্রজাপতি উপস্থের, ইন্দ্র করের, বিষ্ণু পদের এবং বহ্ণি বাক্যের দেবতা। এই সকল দেবগণ স্ব স্ব অধিকারে থাকিয়া যাবতীয় জীবের ইন্দ্রিয়গুলি চালান এবং এক উদ্দেশ্যসাধন করিয়া জগতে বিশ্বজনীন সামঞ্জস্য স্থাপন করেন। এখন ত্রিগুণাত্মক অহংতত্ত্ব একদিকে সত্ত্বগুণসংযোগে মন, অন্যদিকে তমোগুণসংযোগে তন্মাত্রগুলি এবং মধ্যে রজোগুণসংযোগে ইন্দ্রিয়গুলি উৎপাদন করায়, স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, ইন্দ্রিয়গণ কি প্রকারে তন্মাত্ররূপ উহাদের বিষয়গুলি গ্রহণ করতঃ মনের বিষয়ীভূত করে এবং কি প্রকারে মনের সহিত বাহ্যজগতের অশেষ সামঞ্জস্য স্থপিত।
শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস ও গন্ধ ইহারা পঞ্চতন্মাত্র। ইহারা ইন্দ্রিয়গণের ভোগ্য বিষয় এবং যাবতীয় পদার্থের হন্দ্রিয়গ্রাহ্য গুণবিশেষ। মহাভূতের অস্তর্গত অতীব সূক্ষ্ম অংশকে ইহার তন্মাত্র বলা যায়। ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম এই পাঁচটি মহাভূত। জগতের যাবতীয় পদার্থ ইহাদের দ্বারা বিরচিত। যেমন জীবদেহে পঞ্চেন্দ্রিয়, তেমনি ইহাদের বিষয়ও পঞ্চ এবং বিষয়ের আশ্রয়ভূত মহাভূতও পঞ্চ। এই প্রকারে বাহ্যজগতের সহিত জীবদেহের সাৰ্ব্বজনিক সামঞ্জস্য স্থাপিত। যে মন্বন্তরে জীবে যে কয়েকটি ইন্দ্রিয় স্ফুরিত, সে মন্বন্তরে সেই কয়েকটি বিষয়ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য। এই বৈবস্বত মন্বন্তরে জীবদেহের যেমন পাঁচটি হন্দ্রিয়, ইহাদের বিষয় বা তন্মাত্রও তেমনি পাঁচটি। আগত মন্বন্তরে যখন জীবে যষ্ঠ ইন্দ্রিয় স্ফুরিত হইবে, তখন ইহার বিষয়ও আর একটি বাড়িবে।
এস্থলে বক্তব্য, স্থলাবয়ব বিশিষ্ট পৃথিবী সলিল, অগ্নি ও বায়ু, যাহা আমাদের সচরাচর নয়নগোচর হয়, তাহা দার্শনিকদিগের মহাভূত নহে। পৃথিবীর গন্ধবিশিষ্ট সূক্ষ্মরূপকে পৃথিবী নামক মহাভূত বলা হয়; বস্তুতঃ যে পৃথিবীর উপর সকলে দণ্ডায়মান, তাহা মহাভূত নহে, তাহা পঞ্চ মহাভূতে নিৰ্ম্মিত। সেইরূপ যে সলিল পান করিয়া সকলে জীবনধারণ করে, তাহা মহাভূত নহে, তাহাও পঞ্চমহাভূতে নির্ম্মিত।
সাংখ্যমতে সৃষ্টিরহস্য উদঘাটন করিবার জন্য চেষ্টা করা গেল বটে, কিন্তু সাংখ্যমতের গভীরতম প্রদেশে প্রবেশ করা গেল না। মহামহিম কপিলদেব কিরূপ যুক্তি অবলম্বন করিয়া ঐ সকল মহাসত্য আবিষ্কার করেন, তাই এখন বুঝা অতীব সুকঠিন। বোধ হয়, যোগসিদ্ধ কপিলদেব যোগবলেই জগতের আদ্যস্তর অবগত হন। তিনি যাহা লিখিয়া যান, তাহা সকলেই অধ্যয়ন করেন বটে; কিন্তু অল্প লোকেই উহার অন্তঃপ্রবেশ করেন। “নাস্তি সাংখ্যসমং জ্ঞানং” এ কথার আজ পর্য্যন্ত খণ্ডন হয় নাই এবং কদাচ খণ্ডন হইবে না। সাংখ্যমতটি যাবচ্চন্দ্র দিবাকর জ্ঞানজগতে দেদীপ্যমান থাকিবে। যে বুদ্ধদেব হিন্দুধর্মের চতুৰ্ব্বেদ ও জাতিভেদপ্রথা অমান্য করেন, তিনিও সাংখ্যমতের সমক্ষে নতশির হন; এমন কি ঐ মত লইয়াই তিনি নিজধৰ্ম্ম জগতে প্রচার করেন।
সাংখ্যকারদিগের মহত্তত্ত্বাদি চতুর্ব্বিংশ তত্ত্বের সৃষ্টিকে প্রাকৃতিক সৃষ্টি বলে এবং ঐ চতুৰ্ব্বিংশ তত্ত্ব লইয়া ব্রহ্মাদি দেবগণ যে সৃষ্টি রচনা করেন, তাহা বৈকারিক সৃষ্টি। মহত্তত্ত্বাদি চতুৰ্ব্বিংশ তত্ত্বে বিশ্বরূপ অণ্ড উৎপন্ন হইলে পর, লোকপিতামহ ব্রহ্মা স্বয়ং উহাতে জন্মগ্রহণ করেন এবং তাঁহার হৃদয়াকাশে সৃষ্টিবিষয়ক জ্ঞান পরব্রহ্ম হইতে প্রতিভাত হয়। তৎপরে অণ্ড দ্বিখণ্ড হইয়া যায়, একখণ্ডের নাম ব্ৰহ্মবাক্‌, দ্বিতীয় খণ্ডের নাম ব্রহ্মবিরাজ। ব্ৰহ্মবাক্‌ই সৃষ্টিবিষয়ক পূর্ণজ্ঞান এবং ব্রহ্ম বিরাজ হইতে সমগ্র জগৎ ও অন্যান্য লোক নিৰ্ম্মিত। বিভিন্ন প্রজাসৃষ্টির জন্য সৃষ্টিকর্ত্তা ব্ৰহ্মা দশটি মানস পুত্ৰ সৃজন করেন; তাহারা হিন্দুশাস্ত্ৰে ঋষি ও প্রজাপতি নামে কথিত; বৌদ্ধ দিগের ভিতর তাঁহারা ধ্যানীবুদ্ধ এবং ইহুদিদিগের ভিতর তাহারা সেফিরথ নামে উক্ত। ইহারাই সৃষ্টির আদ্যশক্তি রূপে ব্রহ্মোদিত সৃষ্টিজ্ঞানকর্ত্তৃক প্রনোদিত হইয়া বিবিধ উপাদানসংযোগে বিশ্বসৃষ্টি করেন। সৰ্ব্বপ্রথম সূক্ষ্ম জগৎ সৃষ্টি হয়; তাহাতে স্থূলত্বের গন্ধবাষ্প কিছুমাত্র থাকে না। আজকাল পৃথিবীর জড়বস্তু যে সকল ভৌতিক পদার্থ দ্বারা নিৰ্ম্মিত ও যে সকল ভৌতিক শক্তি দ্বারা চালিত, সূক্ষ্ম জগতে উহারা থাকে না; কিন্তু উহাদের সূক্ষ্ম আদি পুরুষগণ বর্তমান থাকে। বিগত কয়েক মন্বন্তরে সেই সূক্ষ্মজগৎ ক্রমবিবৰ্ত্তিত হইয়া স্থূলজগতে পরিণত ভৌতিক পদার্থগুলি সৃষ্টি এবং জগতের অধিবাসিগণও সূক্ষ্ম হইতে ক্রমশঃ স্থূলত্ব প্রাপ্ত। এখন কোন্‌ কোন্‌ স্তব অতিক্রম করিয়া এবং কোন্‌ কোন্‌ মহাশক্তি দ্বারা চালিত হইয়া সূক্ষ্মজগৎ ক্রমশঃ স্থূলজগতে পরিণত এবং সূক্ষ্ম দেবরূপী মানব আধুনিক স্থূলকায় মানবে পরিণত, তাহা নির্ণয় করা, আমাদের পক্ষে একেবারে অসাধ্য। আমাদের পক্ষে ইহা জানাই যথেষ্ট, যে পৃথিবী আধুনিক অবস্থায় সৃষ্ট হয় নাই, সূক্ষ্ম জগৎ হইতেই স্থূলজগতের উৎপত্তি, সৃষ্টি প্রক্রিয়ার বিরাম নাই, ক্রমবিবৰ্ত্তন (Evolution) দ্বারা ইহা চিরদিন চালিত ও পরিবর্ত্তিত এবং পরিশেষে স্থূলজগৎ পুনরায় সূক্ষ্মজগতে পরিণত হইয়া লয় প্রাপ্ত হইবে।
দর্শনশাস্ত্রমতে জগতের যাবতীয় পদার্থ, কি স্থাবর, কি জঙ্গম, সকলই পঞ্চমহাভূত দ্বারা নিৰ্ম্মিত। আধুনিক উন্নত জড়বিজ্ঞান এই দার্শনিক মতের উপর পদাঘাত করতঃ সাহঙ্কারে উপদেশ দেয়, জগতে যে সোত্তর প্রকার ভৌতিক বর্তমান তাহা দ্বারাই যাবতীয় পার্থিব পদার্থ নিৰ্ম্মিত। এখন নবযুগের নব্যসম্প্রদায়বর্গ নববিজ্ঞানের পক্ষপাতী; যেহেতুক বিজ্ঞান যে সকল চাক্ষুস প্রমাণ দেয়, তাহা কেহ অগ্রাহ্য করিতে পারেন না, এজন্য তাঁহারা ভাবেন, দার্শনিকদিগের মতটা সৰ্ব্বৈব অনুমানসিদ্ধ ও কাল্পনিক। এখন জিজ্ঞাস্য, যে কপিলদেব যোগবলে জড় জগতের আদ্যস্তর অবগত হন, তাহারই মত কি মিথ্যা ? আর যাঁহারা দুইটা বকযন্ত্র ও রিটর্ট (Retort) লইয়া পরীক্ষাগারে কতকগুলি পদার্থ বিশ্লিষ্ট করতঃ তথাকথিত ভৌতিক পদার্থ আবিষ্কার করেন, তাঁহাদেরই মত কি মহাসত্য ? যে স্থূলদর্শী জড়বিজ্ঞান পদার্থের ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য বাহ্যস্তরটি অনুশীলন করিয়া ও ঐকদেশিক প্রমাণ প্রাপ্ত হইয়া কতকগুলি ঐকদেশিক সিদ্ধান্ত করে, তাহারই কথা অখণ্ডনীয় জ্ঞান করা উচিত? আর যে দর্শন অধ্যাত্মবিজ্ঞানের জ্যোতি প্রাপ্ত হইয়া এতদিন জগতে ঐ সকল মহাসত্য প্রচার করে, তাহাই কি একেবারে মিথ্যা ও ভ্রমসঙ্কুল জ্ঞান করা উচিত ? তবে দর্শন ও বিজ্ঞানের বিবাদ কি প্রকারে ভঞ্জন করা উচিত ?
তত্ত্ববিদ্যা উপদেশ দেয়, জড়পদার্থের প্রকৃতি বস্তুতঃ সপ্তধা; তন্মধ্যে আমরা কেবল ইহার বাহ্যস্তরটি বুঝিতে পারি এবং অন্যান্য স্তর আদৌ বুঝিতে পারি না। অতএব যে দর্শন অধ্যাত্মবিজ্ঞানের সাহায্য লইয়া পদার্থের আদ্যস্তর বর্ণন করে, তাহা কদাচ অবিশ্বসনীয় হইতে পারে না এবং যে বিজ্ঞান জড়পদার্থের বাহ্যস্তর মাত্র অনুশীলন করে, তাহার কথাও একমাত্র বিশ্বসনীয় হইতে পারে না।
সত্যবটে অসাধারণ পরীক্ষা ও পর্য্যবেক্ষণ বলে ভৌতিক পদার্থগুলি বিজ্ঞান কর্তৃক জগতে আজ আবিষ্কৃত এবং কি প্রকারে উহাদের সংযোগে ও বিয়োগে রাসায়নিক আকর্ষণের তারতম্য বশতঃ বিভিন্ন যৌগিক পদার্থ উৎপাদিত, তাহাও পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে নিরূপিত; কিন্তু আজকাল অনেক রাসায়নিক পণ্ডিতের বিশ্বাস, যেমন জড় জগতের ভিন্ন ভিন্ন শক্তিগুলি এক মহাশক্তির রূপান্তর বা বিকার, সেইরূপ জগতের যাবতীয় ভৌতিক পদার্থও কোন এক মহাভূতের রূপান্তর মাত্র। তাঁহারা সেই মহাভূতকে প্রোটিল (Protyle) নামে অভিহিত করেন। দর্শনপ্রতিপাদিত মহাভূত পৃথিবীকে প্রোটিল বলা যাইতে পারে। ইহাতেই দর্শন ও বিজ্ঞানের বিবাদ কিয়ৎ পরিমাণে ভঞ্জন করা যায়।
মহাত্মাগণ বলেন, প্রত্যেক কল্পে বা জীব প্রবাহে পঞ্চমহাভূতের মধ্যে এক একটা মহাভূত ইহার বাহ্যরূপে জীবের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়। এখন চতুর্থ কল্প প্রবর্তিত; এখন পঞ্চ মহাভূতের ভিতর চারিটী মহাভূত জীবের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য এবং পঞ্চম মহাভূত আকাশ এখনও ইন্দ্রিয়গ্রাহ হয় নাই। জড়বিজ্ঞান ও অনুমানবলে আকাশের অস্তিত্ব স্বীকার করে এবং ইহাকে ইথার (Ether) নামে অভিহিত করে। এই আকাশের গুণাগুণ বুঝিতে পারিয়া যোগসিদ্ধ মহাত্মারা অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শন করেন। সূৰ্য্যের সুষুম্নাদি যে সাত প্রকার রশ্মি বৰ্ত্তমান, উহারা আকাশের উপাধি এবং উহাদের দ্বারাই জড়শক্তি জড়বস্তু সংযোগে জড় জগতে প্রকাশিত। সকলেই আকাশকে শূন্য জ্ঞান করেন। বস্তুতঃ তাহা নহে। ইহা অনন্ত গুণে গুণান্বিত। অনন্ত মহাকাশ অনন্ত ব্ৰহ্মাণ্ড পরিব্যাপ্ত বা অভিব্যাপ্ত। পরমাণু হইতে অগণ্য নক্ষত্র মণ্ডল পৰ্য্যন্ত সৰ্ব্বত্র আকাশ সমভাবে বর্তমান। লক্ষ লক্ষ যোজন দূরে অবস্থিত গ্রহনক্ষত্রগণ আকাশ দ্বারাই পরস্পর পরস্পরের সহিত সম্বদ্ধ ও সৰ্ব্ব প্রকারে আকৃষ্ট। সূৰ্য্য আকাশ দ্বারাই পৃথিবীকে আলোকিত করে ও জীবসমূহে পুর্ণ করে। এইরূপ তত্ত্ববিদ্যা নানা কথার উল্লেখ করে; কিন্তু স্থূলদর্শী বিজ্ঞান উহাদিগকে কাল্পনিক বলিয়া উড়াইয়া দেয় এবং উহাদিগকে আদৌ বুঝিতে পারে না। তবে আমরাই বা কি প্রকারে বিজ্ঞানের কথায় কর্ণপাত করিয়া দর্শনের কথা একেবারে অবিশ্বাস করি?
যে জড়বিজ্ঞান দর্শনের উপর উপহাস ও বিদ্রুপ করে এবং যাহার উপর লোকের বিশ্বাস এখন ক্রমশঃ বদ্ধমূল, সেই বিজ্ঞান কি প্রকারে সৃষ্টিরহস্যোদ্ভেদ করে, তাহা এস্থলে বর্ণনা করা আবশ্যক। ইহার মতে এই জড়জগৎ কতকগুলি অনাদি অবিনশ্বর ভৌতিক পদার্থ দ্বারা বিরচিত। ঐ সকল ভৌতিক পদার্থের পরমাণুরাশি কতক গুলি অন্তর্নিহিত অবিনশ্বর জড়শক্তির সংযোগে ও বিয়োগে, সংঘট্টনে ও বিঘট্টনে, আকর্ষণে ও বিকর্ষণে বিভিন্নরূপে পুঞ্জীকৃত, রূপান্তরিত, পরিবর্তিত ও বিবৰ্ত্তিত হওয়ায় জড় জগতের যাবতীয় পদার্থ নিৰ্ম্মিত ও বিরচিত। কত লক্ষ লক্ষ বৎসর ব্যাপিয়া এই সৃষ্ট প্রক্রিয়া চলিত, তাহার কিছুমাত্র ইয়ত্তা নাই এবং কতকাল এইরূপ চলিবে তাহারও কিছুমাত্র ইয়ত্তা নাই। এই প্রক্রিয়া বলে জড় জগৎ সাম্যাবস্থা হইতে ক্রমশঃ বিষম, বিমিশ্র ও জটিল অবস্থায় পরিণত।
বিজ্ঞান অনুমান করে, কল্পনাতীত যুগ পূৰ্ব্বে বাষ্পময় ব্রহ্মাণ্ড ঘূর্ণায়মান। তৎকালে যাবতীয় ভৌতিক পদার্থ বাষ্পাকারে অনন্ত আকাশে অভিব্যাপ্ত ও ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত। ঘূর্ণনহেতু বাষ্পরাশি স্থানে গাঢ় ও স্থানে তরল হয়। গাঢ়াংশের বেগতিশয্য বশতঃ তরলাংশ উহার পশ্চাৎ-পদ হয় এবং ক্রমশঃ বিযুক্ত হইয়া উহা হইতে পৃথক হইয়া পড়ে। অনন্তর তরলরাশি পূর্বনির্দিষ্ট ঘূর্ণনবশতঃ গাঢ় রাশিকে কেন্দ্র করিয়া উহার চতুর্দ্দিকে প্রদক্ষিণ করিতে থাকে। এই প্রকারে সূৰ্য্য ও গ্ৰহগণ উৎপন্ন এবং গ্ৰহগণ সূৰ্য্যের পুত্র স্বরূপ। এক একটি তরল রাশি হইতে আবার যাহারা বিচ্ছিন্ন হয়, তাহারা উহার পরিধিক্ষেত্রে উপগ্রহ রূপে পরিভ্রমণ করিতে থাকে। এই প্রকারে চন্দ্রাদি উপগ্ৰহগণ উৎপন্ন।
পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশের উত্তাপ যতই আকাশে বিকীর্ণ হইয়া হ্রাস প্রাপ্ত হয়, ততই উহার বাহ্যস্তর কঠিন হইয়া দুগ্ধসরের ন্যায় জমাট বাধিয়া যায় এবং অভ্যন্তরীণ তরল পদার্থও গাঢ় হইতে থাকে। ইহাতেই পৃথিবীর ব্যাস ক্রমশঃ সঙ্কীর্ণ হইতে থাকে। উপরিস্থিত বায়ুর ভারবশতঃ পৃথিবীর পৃষ্ঠস্তর উহার ব্যাসসঙ্কোচন অনুসরণ করে। পৃষ্ঠস্তরটি সকল স্থানে সমভাবে সঙ্কুচিত হয় না; সে জন্য স্থূলবিশেষে স্থানচ্যুতি ও ব্যতিক্রম ঘটিয়া নিম্নতল ক্ষেত্রগুলি উৎপাদন করে। ভূপৃষ্ঠে বায়ুবিলীন বারিবাষ্প শীতলতাপ্রযুক্ত জলরূপে পরিণত হইয়া নিন্মতলক্ষেত্রগুলি অধিকার করে এবং উহাদিগকে ক্রমশঃ সাগরাদিতে পরিণত করে। বৃষ্টিপাতে উচ্চস্থানগুলি ধৌত হইয়া নিম্নস্থল অধিকার করে এবং ভূপৃষ্ঠের উপর উহা স্তরে স্তরে বিন্যস্ত হইয়া যায়। জলোৎপত্তির পর পৃথিবীতে জীবও উৎপন্ন। এখন কত লক্ষ লক্ষ বৎসর ব্যাপিয়া উপরোক্ত ঘটনাবলি সংঘটিত, তাহর কিছুমাত্র ইয়ত্তা নাই।
এ স্থলে জগৎ-বিখ্যাত পণ্ডিতবর হারবর্ট স্পেনসার সৃষ্টিরহস্যোদ্ভেদে প্রবৃত্ত হইয়া কি লিখিয়া যান, তাহার উল্লেখ করা একান্ত কর্তব্য।
The ultimate mystery continnes as great as ever. The problem of existence is not solved; it is simply removed further back. The Nebular hypothesis throws no light on the origin of diffused matter and diffused matter as needs accounting for as the concrete matter. The genesis of an atom is not easier of conceive than the genesis of a planet. Nay, indeed so far from making the universe a less mystery than before, it makes it a greater mystery.
“চরমরহস্য যেমন তেমনি রহিয়া গেল। জীবনের কুটপ্রশ্ন মীমাংসিত হইল না। কেবলমাত্র ইহাকে পশ্চাতে প্রক্ষেপ করা হইল মাত্র আকাশব্যাপ্ত বিক্ষিপ্ত ভৌতিকপদার্থ কোথা হইতে আসিল, নেবুলার মত উহার প্রকৃত কারণ দেখাইতে পারে না। যৌগিক পদার্থ ও বিক্ষিপ্ত পদার্থের কারণ নির্দেশ করা সমভাবে অত্যাবশ্যক। একটী গ্রহের উৎপত্তি যেরূপ রহস্যময়, একটি পরমাণুর উৎপত্তিও তেমনি রহস্যময়। যথার্থ বলিতে কি, আমি যাহা লিখিলাম, তাহাতে সৃষ্টি রহস্যোদ্ভেদ না করিয়া উহাকে আরও রহস্যময় করিলাম।”
যাহা হউক, এই স্থলেই জড়বিজ্ঞানের সকল দৰ্প চুর্ণ। ইহার এত আস্ফালন ও এত অভিমান, সকলই আজ পণ্ড ও বৃথা। যে বিজ্ঞানের অত্যুজ্জল প্রভায় আজ পাশ্চাত্য জগৎ দীপ্যমান, সেই বিজ্ঞান আজ অধ্যাত্মবিজ্ঞানের নিকট নিস্প্রভ ও নিরুত্তর। এখন জিজ্ঞাস্য, বিজ্ঞান যে বিষয়টি ভালরূপ বুঝিতে পারে না এবং যাহা বুঝিবার জন্য ইহার সহস্ৰ চেষ্টা বিফল সে বিষয়ে দর্শন যাহা উপদেশ দেয়, বিজ্ঞান তাহা কেন খণ্ডন করিতে ও এক তুড়িতে উড়াইয়া দিতে চেষ্টা পায় ? কতকগুলি ঐকদেশিক প্রমাণ সংগ্ৰহ করিয়া বিজ্ঞান যে সকল ঐকদেশিক সিদ্ধান্ত করে, তাহাদের সহিত দর্শনপ্রতিপাদিত সত্যের সংঘর্ষ উপস্থিত হয় বলিয়া বিজ্ঞান যে দর্শনের সকল কথাই উড়াইয়া দিবে, তাহ কেমন করিয়া যুক্তিসঙ্গত বিবেচনা করা যায় ? অতএব দর্শনের কথা আমাদের সম্যক শিরোধাৰ্য্য।
যে ধনশালী বিজ্ঞান দীনদরিদ্র দর্শনের উপর নানা বিযয় লইয়া উপহাস করে, সেই বিজ্ঞানের দর্প চূর্ণ দেখিয়া অধ্যাত্মবিজ্ঞান বলে, রে “সভ্যতাভিমানী জড়বিজ্ঞান! তুমি যে বাহ্যলভ্যতাবৃদ্ধির প্রলোভন দেখাইয়া লোকবর্গকে নিজ কুহকে মোহিত কর, তুমি তাহা লইয়াই চিরদিন ব্যস্ত থাক; কেন তুমি জীবনের কুট প্রশ্ন মীমাংসা করিতে প্রয়াস পাও ? ওদিকে তোমার বুদ্ধি আদৌ স্ফুরিত হইবে না। তুমি সামান্য বক্‌যন্ত্রাদি লইয়া চিরদিন বাল্যলীলায় ব্যাপৃত থাক, ইহাতেই তোমার শ্রেয়োলাভ; আর জীবনের গভীর চিন্তায় কদাচ মনোভিনিবেশ করিও না, উহাতে কিছুমাত্র সারবত্তা নাই।”
পরিশেষে বক্তব্য, অধ্যাত্মবিজ্ঞান, দর্শন ও জড়বিজ্ঞানের মতে সৃষ্টিরহস্য উদ্ভেদ করিতে চেষ্টা করা গেল বটে; কিন্তু রহস্য উদঘাটিত হইল না এবং মনও সন্তোষ লাভ করিল না। মানবমন যেরূপ অসম্পূর্ণ, তাহাতে এ বিষয়ে আমাদের সকল চেষ্টাই বৃথা। যাহা হউক, এবিষয়ে অধ্যায়বিজ্ঞানের কথাই আমাদের শিরোধাৰ্য্য করা আবশ্যক।

তথ্যসুত্র- বৈজ্ঞানিক হিন্দু ধর্ম- ভারতবর্ষের ইতিহাস,

সংকলনে- #কৃষ্ণকমল।

ধৰ্ম্মের সহিত দর্শন ও বিজ্ঞানের সম্বন্ধ।


Image result for relation philosophy and religion

পুরাকালের অধিকাংশ দর্শনশাস্ত্র মানবধৰ্ম্মের বিশেষ পোষকতা করে; কিন্তু আধুনিক উন্নত জড়বিজ্ঞান প্রকাশ্যভাবে উহার বিপক্ষে দণ্ডায়মান। ভূমণ্ডলে আজকাল যে সকল উৎকৃষ্ট ধৰ্ম্ম প্রচলিত, উহাদের সহিত দৰ্শনশাস্ত্রের সম্বন্ধ অতীব ঘনিষ্ঠ; এমন কি, উহাদের মূলভিত্তি সৰ্ব্বত্র দর্শনশাস্ত্রের উপর প্রতিষ্ঠিত। সত্য বটে, কোন কোন দর্শনশাস্ত্র (চাৰ্ব্বাকাদি) নাস্তিক বাদ প্রচার করায় ঘোর ধৰ্ম্মদ্বেষী হয়; কিন্তু অধিকাংশ দর্শনশাস্ত্র সকল দেশে ও সকল সময়ে মানবধৰ্ম্মের সম্যক পোষকতা করিয়া যায়; এমন কি, সকল দেশেই দর্শনলব্ধজ্ঞানই উহার সম্যক উন্নতিসাধন করে। সাংখ্য মত, বেদান্ত মত, কনফুউসাস মত, জোরাষ্টার মত, প্লেটোর মত প্রভৃতি সকল দার্শনিক মতই মানবধৰ্ম্মকে দেশবিশেষে উন্নতির পথে অগ্রসর করিয়া দেয়। প্রাচ্য জগতে দর্শনশাস্ত্র সম্যক উন্নতিলাভ করে; এজন্য প্রাচ্য জগতেই দর্শনপ্রতিষ্ঠিত ধৰ্ম্মগুলি প্রথম প্রচারিত হয় এবং উহারাই কালক্রমে সমস্ত পৃথিবীতে অভিব্যাপ্ত হয়।
দর্শনশাস্ত্রই ভূমণ্ডলে একেশ্বরবাদ বা অন্যরূপ উৎকৃষ্ট ধৰ্ম্মমত প্রচার করে। অনেকের মতে হিন্দুধৰ্ম্মের একেশ্বরবাদ বেদান্ত ও উপনিষদ দ্বারা প্রচারিত এবং ষড়দর্শনের সহিত উহার সম্বন্ধ অতীব ঘনিষ্ঠ। বৌদ্ধমত সাংখ্যদর্শনের উপর প্রতিষ্ঠিত। সেইরূপ খ্ৰীষ্টমতও গ্রীক ও ইরানদর্শনের উপর স্থাপিত। সৰ্ব্বত্র এরূপ দৃষ্ট হয় দর্শনশাস্ত্রের উন্নতিই ধৰ্ম্মবিষয়ক উন্নতির মূলভূত কারণ। সভ্যতাবৃদ্ধির সঙ্গে যে দেশে মানবের বুদ্ধিশক্তি যেরূপ স্ফুরিত হয়, তিনি তদনুরূপ পরমার্থজ্ঞান প্রাপ্ত হইয়া প্রথমে দেশীয় দর্শনশাস্ত্রের, পরে জাতীয় ধৰ্ম্মের উন্নতিসাধন করেন। যৎকালে গ্ৰীশদেশে পৌত্তলিকতা প্রবল, তৎকালে সক্রেটিশ প্রমুখ পণ্ডিতগণ যুক্তিবলে একেশ্বর জ্ঞানলাভ করেন। পরে তিন শতাব্দির ভিতর তাহদের উন্নত মত ক্রমশঃ বহুবিস্তৃত হইলে পর, ধৰ্ম্মজীবন মহাত্মা ঈশ দুন্দভিস্বরে সেই সৰ্ব্বোৎকৃষ্ট একেশ্বরবাদ প্রচার করতঃ তদৰ্থে নিজ প্রাণ আহুতি দিয়া যান। তাঁহারই শিষ্যামুশিষ্যদিগের উৎসাহে ও যত্নে তৎপ্রচারিত ধৰ্ম্ম কালক্রমে পাশ্চাত্যজগতে প্রবল হয়। সেইরূপ মহম্মদ ও প্রাচ্যজগতে একেশ্বরবাদ প্রচার করেন।
এইরূপ নানামত বিজ্ঞানবিৎ পণ্ডিতগণ প্রকাশ করেন তাহারা মানবের জাতীয় ইতিহাস অন্বেষণ করিয়া ঐ সকল সিদ্ধাস্ত করেন। কিন্তু অধ্যাত্মবিজ্ঞানবিৎ পণ্ডিতের উপরোক্ত মত খণ্ডন করতঃ বলেন, যে অধ্যাযত্মবিজ্ঞানের জ্যোতিঃপ্রাপ্ত হইয়াই যোগসিদ্ধ ধৰ্ম্মপ্রবর্তকগণ দেশে দেশে নুতন নুতন ধৰ্ম্মমত প্রচার করেন এবং দার্শনিক পণ্ডিতগণও মানবজীবনের কুট প্রশ্নসম্বন্ধে নুতন নুতন মত প্রচার করেন। যাহা হউক, বিজ্ঞানের মত সত্য, কি অধ্যাত্মবিজ্ঞানের মত সত্য, তাহা এস্থলে সমালোচনা করিবার প্রয়োজন নাই। ধৰ্ম্মের সহিত দর্শনের সম্বন্ধ অতীব ঘনিষ্ঠ, ইহা সৰ্ব্ববাদি সম্মত।
আত্মার অস্তিত্ব ও অবিনশ্বরত্ব, পরলোক ও ঈশ্বরের অস্তিত্ব এবং তৎকর্তৃক জগতের অধিনায়কত্ব প্রভৃতি মানবধর্মের উৎকৃষ্ট মতামত গুলি উন্নতদর্শনশাস্ত্রসম্মত। এখন ঐ সকল শ্রেষ্ঠ মতামত সৰ্ব্ববাদিসন্মত এবং খ্ৰীষ্ট প্রভৃতি শ্রেষ্ঠধর্মের প্রধান অঙ্গস্বরূপ। এমন কি, ঈশ্বর ও পরলোকে বিশ্বাসই আধুনিক উৎকৃষ্ট ধৰ্ম্মের মূলভিত্তি।
দর্শনের সহিত বিজ্ঞানের নানা বিষয়ে বিবাদবিসংবাদ থাকায়, শেষোক্তটী এখন দর্শনপ্রতিপাদিত মানবধৰ্ম্মের উপর খড়গহস্ত এবং উহার সমূলোৎপাটনে ব্যগ্র। সভ্যজগতে আজকাল মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিতগণ কেবল নাস্তিক মত প্রচার করেন। তাঁহারা ঈশ্বর, আত্মা ও পরলোক, কিছুই মানেন না। একমাত্র জড় ও শক্তি তাঁহাদের উপাস্য দেবতা এবং চাক্ষুস প্রমাণই তাঁহাদের উপদেবতা। তাঁহাদের মতে সংসারে ধৰ্ম্মও নাই, অধৰ্ম্মও নাই, কেবল সমাজে বসবাসবশতঃ মানবের ধৰ্ম্মাধৰ্ম্মজ্ঞান ও বিবেক উত্থিত। সত্য বটে, তাঁহারা প্রকৃতির নানা বিভাগে অত্যাশ্চৰ্য্য আবিষ্কার করিয়া প্রকৃতিজগতে অগাধ নিৰ্মাণকৌশল ও অত্যদ্ভুত সামঞ্জস্য দেখান; কিন্তু দুঃখের বিষয়, বিজ্ঞানশাস্ত্রের কোন পংক্তিতে বিশ্বরচয়িতা ঈশ্বরের নামোল্লেখ নাই। তাঁহারা ভাবেন, এত অত্যুজ্জলবিজ্ঞানালোকের মধ্যে ঈশ্বরের নামোল্লেখ মানবের দুৰ্ব্বলতাপরিচায়ক এবং ঈশ্বরস্থানে তাঁহারা আজকাল একমাত্র অন্ধ জড়শক্তির প্রাধান্য স্বীকার করেন।
কোন কোন বিজ্ঞানবিৎ পণ্ডিত ঈশ্বরকে বিশ্বের অজ্ঞেয় আদি কারণ স্বীকার করেন বটে; কিন্তু যখন এই বিশ্বসংসার কতকগুলি অপরিবর্তনশীল প্রাকৃতিক নিয়মানুসারে সৃষ্ট ও পরিচালিত, তখন ঈশ্বরকে মানিবার কি প্রয়োজন? যখন তিনি এ সংসারে সাক্ষীগোপালমাত্র, তখন তাঁহার আরাধনা বা গুণকীৰ্ত্তন করিবার কি প্রয়োজন? তাঁহারা বলেন, দুর্ব্বল মানব নিজের অজ্ঞানতাবশতঃ, নিজের কুসংস্কারবশতঃ বিপদে পতিত হইলেই ঈশ্বরকে ডাকিয়া থাকেন। কিন্তু এখন আমরা বিদ্যাবলে বলীয়ান ও বিজ্ঞানবলে বলীয়ান; বিপদে পতিত হই, বিপদের প্রতিকার করিব; কেন মিছে ঈশ্বরকে ডাকিয়া জিহবা অপবিত্র করিব? বরং লোকের কুসংস্কার দূর করিবার জন্য তাহাদের মন হইতে ঈশ্বরকে বিতাড়িত করিতে চেষ্টা পাইব।
তাঁহারা এখন ঈশ্বর মানেন না বটে; কিন্তু তাঁহাদের নিকট জড়, শক্তি ও অন্ধদৈবই ধৰ্ম্মের উপাস্য ত্রিমূৰ্ত্তি ।
“According to Science, the holy Creative Trinity is inert matter, senseless Force and blind Chance.” Seeret Doctrine.
এখন তাঁহারা ঐ উপাস্য ত্রিমূৰ্ত্তির ষোড়শোপচারে পূজা করেন এবং তাঁহাদের শাস্ত্রগ্রন্থে উহাদের গুণানুবাদ ও গুণকীৰ্ত্তন পূর্ণভাবে বিকাশিত। তাঁহারা বলেন, বিশ্বব্যাপারে জড়শক্তিই সৰ্ব্বেসৰ্ব্বা; ইহা ব্যতীত অন্য কোনরূপ চিৎশক্তি নাই, যাহার নিকট আমাদের মস্তক অবনত করা উচিত।
এবংবিধ জড়পাদ নাস্তিক মতামত পাশ্চাত্যজগতে প্রচারিত হওয়ায়, অল্পদিনের ভিতর তথায় প্রভূত অনিষ্টোৎপত্তি হইতে আরম্ভ হইয়াছে। সভ্যজগতে আজকাল অধিকাংশ কৃতবিদ্যলোক খ্ৰীষ্টধর্মের মতামতের উপর সন্দিগ্ধ; এমন কি, তাঁহারা ধৰ্ম্মের মূলোৎপাটনে ব্যগ্র; তজ্জন্য ধৰ্ম্মযাজক দিগের যৎকিঞ্চিৎ ক্ষমতা এখনও সমাজে যাহা অবশিষ্ট, তাহা সঙ্কুচিত করিতে তাঁহারা বদ্ধপরিকর। এদেশে ও তাহাদের সুশিক্ষিত শিষ্যগণ গানোর (Ganot) এক পৃষ্ঠা পাঠ করিয়া ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করেন। যাহা হউক, বিজ্ঞানোপদিষ্ট নাস্তিক মতামত জগতে বহুবিস্তৃত হইলে, ধৰ্ম্মসম্বন্ধে মানবসমাজে যে যুগান্তর উপস্থিত হইবে, তদ্বিষয়ে অণুমাত্র সন্দেহ নাই। তখনই বোধ হয়, শাস্ত্রোল্লিখিত ঘোর কলি দোর্দ্দণ্ডপ্রতাপে স্বরাজ্য বিস্তার করিবে। এ সকল তাহারই পূৰ্ব্বসূত্রপাত মাত্র।
এ স্থলে জিজ্ঞাস্য, বিজ্ঞান কি যথার্থতঃ মানবধর্মের সমূলোৎপাটন করিতে সক্ষম হইবে? বিজ্ঞান সম্প্রদায়বিশেষের বৈশেষিক মতামত খণ্ডন করিতে পারে, অথবা স্থূলবিশেষে দর্শনপ্রতিপাদিত মানবধৰ্ম্মের মৌলিক মতামতের উপর অবিশ্বাস বা সন্দেহ করিতে পারে কিন্তু সে প্রাকৃতিক বা সামাজিক ধৰ্ম্ম সকল মানবধৰ্ম্মের মূলে নিহিত, বিজ্ঞান উহার কদাচ বিপক্ষতাচরণ করিতে পরিবে না। মানবসমাজের শৈশবাবস্থা হইতে আবহমানকাল যে সনাতন প্রাকৃতিক ও সামাজিক ধৰ্ম্ম চালিত এবং যাহা উহার স্থায়িত্বের সঙ্গে অপরিহার্য্যরূপে জড়িত, সে ধৰ্ম্মের নিকট বিজ্ঞান দুগ্ধপোষ্য বালক মাত্র। বিজ্ঞান সে ধর্মের কোনরূপ অনিষ্টসাধন করিতে পারিবে না; বরং উহার অনিষ্টসাধনে কৃতসঙ্কল্প হয়, বিজ্ঞান নিজে কালকবলিত হইবে। অসার খ্ৰীষ্টধৰ্ম্মের কতকগুলি মতামত থণ্ডন করে বলিয়া বিজ্ঞান সনাতন প্রাকৃতিক ধৰ্ম্মের সমূলোৎচ্ছেদসাধন করিতে সক্ষম, এরূপ যাঁহারা বিবেচনা করেন, তাঁহারা প্রকৃততত্ত্বদর্শী নন। যে ধৰ্ম্ম মানবসমাজের অস্থিমজ্জায় নিহিত, যে ধৰ্ম্মনাশে সমাজধ্বংস অবশ্যম্ভাবী, বিজ্ঞান সে ধৰ্ম্মের কি অনিষ্টতাচরণ করিবে ? যদি বিজ্ঞান উহার প্রতিকূলে দণ্ডায়মান হয়, বিজ্ঞান স্বয়ং লোকসমাজে অবজ্ঞাত ও ঘৃণিত হইবে। চিরকালই ত নাস্তিকমত সমাজে প্রচলিত; তাহাতেই বা সমাজের কি ক্ষতি? সকল স্থলেই দেখা যায়, নাস্তিকগণ মৃত্যুকালে একবার ঈশ্বর ডাকিয়া যান।
বিজ্ঞান ঈশ্বর, আত্মা ও পরলোক না মানিতে পারে; কিন্তু সামাজিক ধৰ্ম্মের নিকট ইহা চিরদিন নতশির। চুরি করা বা নরহত্যা করা সমাজের অমঙ্গলদায়ক, তাহা সকলকেই মানিতে হয়। অতএব সামাজিক ধৰ্ম্মনাশ করিতে বিজ্ঞান কদাচ চেষ্টা পাইবে না, বরং উহার সম্যক পোষকতা করিবে।
আধুনিক জড়বিজ্ঞানের আদিগুরু, সুবিখ্যাত বেকন সাহেব বলেন“A little philosophy inclineth a man’s mind to atheism but depth in philosophy bringeth a man’s mind to religion.”
“অল্পজ্ঞান মানবমনকে নাস্তিকতায় লইয়া যায়; কিন্তু গভীরজ্ঞান উহাকে পুনরায় ধৰ্ম্মপথে আনয়ন করে।” ইহাতে বোধ হয় বিজ্ঞানবিৎ নাস্তিকগণ কালক্রমে আপনাদের ভ্রম দেখিতে পাইবেন এবং তৎকালে তাহারা আর মানবধৰ্ম্মের প্রতিকূলে দণ্ডায়মান হইবেন না।

সংকলনে- কৃষ্ণকমল।