কর্ম ও ভক্তি


কর্ম ও ভক্তি

কর্ম বলতে যে সকল কার্য্য লোকে ইহজন্মে ও পরজন্মে নিজ সুখভোগের আশায় করে কিংবা এই দেহকে ‘আমি’ বুদ্ধি করে এর সম্পর্কে যে যে ব্যক্তিকে আপনজ্ঞান করে, তাদের সুখের জন্য করে, সেগুলিকে বুঝায়। আর ভগবানের সেবা উদ্দেশ্য করে যা কিছু করা যায়, তাই ভক্তি। একই কার্য্য ক্ষেত্রবিশেষে কর্ম হতে পারে অন্য ক্ষেত্রে ভক্তি হতে পারে, কর্ত্তার চিত্তবৃত্তি অনুসারে তার কর্মত্ত্ব বা ভক্তাঙ্গত্ত্ব। স্বর্গকামনার বশে কৃত হয়, তখন সেগুলি কর্ম।

আমরা কর্মফল ভোগ করতে বাধ্য। কর্ম আমাদের বন্ধন যোগ্যতা বৃদ্ধি করে আমাদেরকে সংসার ভোগ করায়। কর্মে সুখের সঙ্গে সঙ্গে দুঃখও অনুস্যুত আছে। সংসারে এমন কোন সুখ নেই, যার পিছনে দুঃখ লুকিয়ে থাকে না। সংসারে সুখভোগে শান্তি নেই। ভোগ করলে কাম বাড়ে। আর কামনার অতৃপ্তিতে দুঃখ আছেই। নিরবিচ্ছিন্ন সুখ সংসারে থাকতেই পারে না। স্বর্গসুখেও তো কামনার শেষ নেই। ইন্দ্র-চন্দ্রকে পাপ কর্মে লিপ্ত হতে হয়। আবার পুণ্য শেষ হলে স্বর্গচ্যুত হয়ে অধঃপতিত হয়।

‘ভক্তিই আমাদের নীতিবৃত্তি। ভগবান নিত্য চিদঘনবিগ্রহ, জীবের স্বরূপও চিৎ। এই স্থানে ভগবান ও জীবে নিত্য অভেদ। এ জগতে জীব অচিৎসংস্পর্শে স্থাবর-জঙ্গমত্ব প্রাপ্ত হয়ে সংসার ভোগ করছে। নির্ম্মল চিৎকণা জীব হরিসেবারত।’ এই জ্ঞানের সন্ধান পেয়ে যখন জীব শ্রদ্ধাসহকারে নিকিঞ্চন ভক্তের পাদাশ্রয় করে শ্রবণ কীর্ত্তনাদি ভক্তাঙ্গগুলি সাধন করতে থাকে, তখন জীবের সংসারক্ষয় হয়ে জড়মুক্তিক্রমে অনর্থ্যনিবৃত্তি ঘটে। তখন নিষ্ঠা, রুচি, আসক্তি, ভাবক্রমে জীব ভগবত প্রেমের অধিকারী হয়। এই প্রেমই পরমপ্রয়োজন, পরমপুরুষার্থ। ভক্ত ধর্ম, অর্থ, কাম-এই ত্রিবর্গাত্মক কর্ম এবং মোক্ষঅভিসন্ধানরূপ অপবর্গ-এই চার পুরুষার্থকে নরকসদৃশ জ্ঞান করে অহৈতুকী ভক্তির যাজন করেন।

অনেকের ধারণা, কর্ম করতে করতে তারই ফলরূপে ভক্তি আসবে, যেহেতু কর্মীরাও হরিপুজাদি করে থাকেন। কিন্তু ভগবত-সিদ্ধান্ত তা নয়। কর্ম করতে করতে কেবল কামনার বৃদ্ধি হতে থাকে। সুতরাং কর্মের ফল কিভাবে ভক্তি হতে পারে? কর্মে যে ভক্তির মত কিছু অনুষ্ঠান দেখা যায়, উহা কর্মাঙ্গ, ভক্তি নয়। ভগবান আমাদের নিত্যসেবা, সুতরাং আমাদের সকল ভোগবাঞ্ছা পরিহার করে ভগবানেরই সেবা করা কর্ত্তব্য-এই বুদ্ধিতে পরিচালিত হয়ে কর্মিগণ ভক্তির আশ্রয় গ্রহণ করেন নাই। তাঁদের চাই নিজের ভোগ। সেই সাধনের জন্য আনুষ্ঠানিক ক্রিয়ায় কিছু ভক্তির আভাস আছে। এই যে ভক্তি, ইহা ভক্তের অহৈতুকী ভক্তি নয়, ইহা কর্মাঙ্গ। সুতরাং ইহা দ্বারা ভক্তিলাভ হতে পারে না।

শ্রীধ্রুব মহারাজের কথা হতে আমরা জানতে পারি, যদিও তিনি রাজ্যলাভের জন্য ভগবানের আরাধনা করেছিলেন, তাহলেও তিনি পদ্মপলাশলোচন অনাথনাথ ভগবান আছেন, এই বিশ্বাস্ব ভক্তি পথ গ্রহণ করেছিলেন, কর্মাঙ্গের অন্যতম অনুষ্ঠানরূপে অনিত্য ভক্তির আবাহন করেন নাই। ভগবানের জন্য তাঁর প্রাণ কেঁদেছিল, তবে রাজ্যলাভরূপ দুর্ব্বাসনা তাঁর চিত্তে ছিল। পরে ভগবান্‌ কৃপা করিয়া তাঁহাকে দেবর্ষি নারদের সঙ্গ করিয়ে তাঁহার দুর্ব্বাসনা দূর করে তাঁকে শুদ্ধভক্তি প্রদান করেন। শ্রীপ্রহলাদ মহারাজের ভক্তি আদৌ মিশ্রা ছিল না। গর্ভবাসকালেই তিনি দেবর্ষির সঙ্গ পেয়েছিলেন। সুতরাং কোন কামনা তাঁর চিত্তকে কুলষিত করতে পারেনি। সাধুসঙ্গের এমনই ফল। সাধুসঙ্গ ব্যতীত আমাদের শুদ্ধ ভক্তিলাভের আর অন্য উপায় নেই।

সংকলনে- দাসানুসার #কৃষ্ণকমল।

 

Advertisements

আষাঢ়ে প্রভু জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা


আষাঢ়ে প্রভু জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা
শ্রীমৎ নারায়ণ পুরী মহারাজ

রথযাত্রায় লোকারণ্য, মহা ধুমধাম। ভক্তেরা লুটিয়ে প্রণাম করছে। জগদীশ্বর জগন্নাথ অগ্রজ বলভদ্র ও ভগিনী সুভদ্রাকে সঙ্গে নিয়ে রথারোহণ করেছেন। তিনি মন্দিরের রত্নবেদী থেকে ভক্ত দর্শনে জনপথে নেমে এসেছেন। তিনি যে ভক্তাধীন, ভক্তপ্রিয়; ভক্তেরই ভগবান।
আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথির পুণ্যদিনে এই রথযাত্রা উৎসব হয় প্রতিবছর। জনতা জনার্দনের রথের রশি টেনে নিয়ে যায়। ভক্ত না হলে ভগবানের চলে না।
অন্তর্যামী চিরদিন অন্তরে থাকেন, লীলা করেন। এই সেই দেবতা যিনি জনারণ্যে বেরিয়ে আসেন। শাস্ত্রে আছে, ‘রথে তু বামনং দৃষ্টা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে’। হৃদয় গুহায় যে আত্মা বিরাজ করেন তাঁকে দেখলে পুর্নজন্ম আর হয় না। ‘পুনরপি জননং পুনরপি মরণং’ অর্থাৎ পুনরায় জননী জঠরে শয়ন আর হয় না।
তখন জন্ম মরণ থেকে চিরদিনের জন্য অব্যাহতি পায়। রথযাত্রা উৎসবের গভীরে এই তত্ত্বই অন্তর্নিহিত। কবির ভাষায় : রথ ভাবে আমি দেব/পথ ভাবে আমি/উভয়ের কথা শুনে হাসেন অন্তর্যামী।
চট্টলার বুকে পাহাড় শিখরে স’াপিত তুলসীধামে শ্রীশ্রী মদনমোহন নরসিংহ গোপাল জীও’র মন্দিরে জগন্নাথ-সুভদ্রা ও বলরামের শ্রী বিগ্রহ অনেক দিন থেকে নিত্য পূজিত।
১৮শ’ খৃষ্টাব্দের পর থেকে তুলসীধামে রথযাত্রা উৎসবের প্রচলন শুরু হয়। জগন্নাথ তো স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। রথযাত্রার এই শুভদিনে মহানির্বাণতীর্থ তুলসীধাম পরিণত হয় ভক্ত আর ভগবানের মহামিলন তীর্থে। শ্রীশ্রী জগন্নাথের দর্শন অভিলাষী হাজার হাজার আবালবৃদ্ধ ভক্তপ্রাণের সমাবেশ ঘটে। রথযাত্রা উৎসবের মূল কেন্দ্র শ্রীক্ষেত্র পুরীর পুরুষোত্তম ধাম। এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গ্রামে-গঞ্জে-নগরে জগন্নাথ রথ পরিক্রমায় বের হন।
পুরীধামে তিন দেবতা তিনটি রথে আরোহণ করেন। সবার পেছনের রথখানিতে থাকেন শ্রী জগন্নাথ। অন্যত্র একই রথে তিনজন। এই রথের রশি ধরার জন্য কতো হুড়োহুড়ি।
এসবের মূল বিষয় দেবতার কৃপা লাভ ও পুণ্য অর্জন। ঋষি শিল্প গভীর তত্ত্বাবগাহী। কে এই জগন্নাথ? তিনি জগতের নাথ বা প্রভু। জগতের ধারক, বাহক ও পরম পালক। তারপরের অবস’ানে সুভদ্রা। লৌকিক জগতে পরম প্রভু পুরুষোত্তমের ভগ্নি। সু অর্থ সুন্দর।
ভদ্র অর্থে কল্যাণ ও মঙ্গল। সুভদ্রা হচ্ছেন শুভ ও সুন্দরের প্রতীক। সুভদ্রার পরে বলরাম। বলরাম ত্রাণশক্তি। শ্রীমৎ ভগবৎ গীতা ও উপনিষদে পরব্রহ্মের স্বরূপ সম্বন্ধে বলা হয়েছে ‘সর্বেন্দ্রিয় গুণাভাসং সর্বেন্দ্রিয় বিবর্জিতম্‌’। ইন্দ্রিয়গ্রাম না থাকলেও তাঁর মধ্যে সব ইন্দ্রিয় ও গুণের আভাস আছে। ইন্দ্রিয় বিরহিত হয়েও তিনি সবকিছু দর্শন, স্পর্শ, শ্রবণ করতে পারেন। চরণ না থাকলেও সর্বত্র বিচরণ করতে পারেন।
যজুর্বেদের দু’টি ভাগ। শুক্ল যজুর্বেদ ও কৃষ্ণ যজুর্বেদ। কৃষ্ণ যজুর্বেদের অন্তর্গত কঠোপনিষদ হলো যম-নচিকেতা সংবাদ। যম নচিকেতাকে আত্মতত্ত্বের সংবাদ দিয়ে বললেন-‘‘আত্মানং রথিনং বিদ্ধি শরীরং রথমেবতু। বুদ্ধিং তু সারথি বিদ্ধি মন প্রগ্রহমেব চ ॥ ইন্দ্রিয়ানি হয়ানাঞ্চ বিষয়াংসে’ষু গোচরান। আত্মেন্দ্রিয় মনোযুক্ত ভোক্তত্যাহর্মনীষিনং ॥” অর্থাৎ, হে নচিকেতা! আত্মাকে রথী, শরীরকে রথ, বুদ্ধিকে সারথি, মনকে বল্গা ও ইন্দ্রিয়বর্গ সেই রথের অশ্ব এবং দেহ, মন ইন্দ্রিয়যুক্ত আত্মাই সব কিছুর ভোক্তা।
আমাদের জীবনের দুইদিকে আছে জীবাত্মা ও পরমাত্মা। জীবাত্মা ষড়রিপুর জালে জড়িয়ে পড়ে সবকিছু ভোগ করতে চায়। মন যদি বল্গাহারা, চঞ্চল ও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে তবে তার লাগাম টেনে ধরা চাই। মন বেপরোয়া হলে বিপদ ঘটে। মন ইন্দ্রিয়ের অধিপতি। ইন্দ্রিয়গ্রামের লাগাম টেনে না ধরলে সে রথচক্র দুরন্ত বেগে ছুটতে গিয়ে ভেঙ্গে পড়বে। দেহপুরে আত্মারূপে যিনি বিরাজ করেন তাঁকে জানাই দুঃখমুক্তি ও আনন্দ লাভের উপায়। রথের সারথি ভগবান যদি দেহরথখানি পরিচালনা করেন, সাধক তখন আনন্দ সাগরে ভাসেন। দেহমন তখন আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। যোগ সঙ্গীতের বর্ণনায় আছে-
দেহ কুরুক্ষেত্র মাঝে বিরাজে নর নারায়ণ,
দশদলে ধনঞ্জয় দ্বিদলে মধুসূদন।
কৌরবরা যত সৈন্য ইন্দ্রিয় রূপেতে গণ্য,
প্রকাশে যুদ্ধ নৈপুণ্য মানে না কারও শাসন।
দেহ ইন্দ্রিয় কোন শাসন মানতে চায় না। আপথে-বিপথে চলে আসক্তির কানা গলিতে পথ হারায়। আত্মশক্তির ক্ষয় করে ফেলতে চাইলেও দেহের ভগবৎ শক্তি বিরাজমান থাকে। সেই শক্তিকে চিনে নিতে পারার মধ্যে রয়েছে জীবনের সার্থকতা।
রথ থেমে যায়, যদি রথ সারথিবিহীন হয়। মন্দিরে যদি মাধব না থাকে তবে কোন পূজা চলে না। অপশক্তি ততদিন সক্রিয় থাকে, যতদিন ভগবানে আত্ম সমর্পিত হতে না পারি। কালের স্মরণী ধরে জগন্নাথের রথযাত্রা নিত্য চলছে। সে পথে দেহ রথকে পরিচালনা করার মধ্যে নিহিত আছে রথযাত্রার সফলতা।

লেখক : অধিপতি-ঋষিধাম,
মোহন্ত মহারাজ-তুলসীধাম, চট্টগ্রাম।

শ্রীকৃষ্ণকে জানুন


শ্রীকৃষ্ণকে জানুন

আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য
কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ
(১৯৬৭ সালের আগষ্ট মাসে নিউইর্য়ক ইসকন মন্দিরে প্রদত্ত
ভাগবত প্রবচনের অংশবিশেষ)

Prabhupada

ন মে বিদুঃ সুরগণাঃ প্রভবং ন মহর্ষয়ঃ।
অহমাদির্হি দেবানাং মহর্ষীণাং চ সর্বশঃ॥
(ভগবদ্গীতা ১০/২)

অর্থাৎ ‘‘দেবতা বা মহর্ষিগণের কেউই আমার উৎস ও ঐশ্বর্যসমূহ সম্বন্ধে অবগত হতে পারে না, কেননা আমিই সকল দেবতা ও মহর্ষিগণের আদি কারণ।’’

পরমেশ্বর ভগবান কৃষ্ণ এই শ্লোকে বলছেন, কেউই তাঁকে অবগত হতে পারে না।  এমনকি স্বর্গের দেবতারাও, যাঁরা মানুষের থেকে অনেক উন্নত বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন, তারাও শ্রীকৃষ্ণ সম্বন্ধে অজ্ঞ।  ধ্রুবতারার সন্নিকটস্থ সপ্তর্ষিগণও শ্রীকৃষ্ণ সম্বন্ধে সম্যক অবহিত নন।  কিন্তু কেন দেবতা ও ঋষিগণ শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কে যথাযথভাবে অবগত নন?  এর উত্তর শ্রীকৃষ্ণ নিজেই প্রদান করে বলেছেন অহমার্দির্হি দেবানাং মহর্ষীণাং চ সর্বশঃ- ‘‘কেননা আমিই এইসকল দেবতা ও মহর্ষিগণের উৎস বা আদি কারণ।’’  শ্রীমদ্ভাগবতে বিশ্বের সৃষ্টি ও ব্রহ্মার উৎপত্তি, ব্রহ্মা থেকে সপ্তর্ষিগণের উদ্ভব এবং সাধারণ মানবসমূহের সৃষ্টির কথা সুন্দরভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

অতএব, শ্রীকৃষ্ণ হলেন সবকিছুর আদি উৎস।  এই একই কথা বলা হয়েছে বেদান্ত সূত্রে- জন্মাদ্যস্য যতঃ- ‘‘সবকিছুই তাঁর থেকে উদ্ভূত।’’  যার অর্থ হল পরমেশ্বর ভগবান কৃষ্ণ পরমাত্মা ও ব্রহ্মজ্যোতিরও কারণ।  সর্বশঃ শব্দটি দ্বারা শ্রীকৃষ্ণ দৃঢ়ভাবে নির্দেশ করছেন যে, ‘‘আমিই সকল কারণের পরম কারণ।’’  তাই শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন পরম মহান এবং সবকিছুর আদি উৎস।

কিন্তু ভগবান এত সুমহান হওয়া সত্ত্বেও কেউই যদি তাঁকে জানতে না পারে তাহলে কিভাবে তাঁকে জানা যাবে?  দেবতারা যদি তাঁকে জানতে না পারেন, উচ্চমার্গের ঋষিগণ যদি তাঁকে না জানতে পারে, তবে কিভাবে তাঁকে জানা যাবে?  হ্যাঁ, তাঁকে আমরা অবশ্যই জানতে পারি, যখন তিনি আপনার সম্মুখে আসেন, যখন তিনি স্বয়ং আপনার সম্মুখে প্রকাশিত হন, তখনই তাঁকে আপনি জানতে পারেন।  আপনি আপনার অপূর্ণ জ্ঞানের ভিত্তিতে তাঁকে জানতে পারবেন না।  অতঃ শ্রীকৃষ্ণনামাদি ন ভবেদ্ গ্রাহ্যম্ ইন্দ্রিয়ৈঃ।  যেহেতু আমাদের ইন্দ্রিয়গুলি ক্রটিপূর্ণ, আমরা আমাদের ইন্দ্রিয়গত ক্ষমতাকে কৃত্রিমভাবে বিস্তৃত করলেও, এমনকি লক্ষাধিক বছরের মাপকাঠিতে কষ্ট কল্পনা চালিয়ে গেলেও আমরা পরম পুরুষোত্তম ভগবান কৃষ্ণকে হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হব না।

কিন্তু তাঁকে জানার একটি উপায় রয়েছে- সেবোন্মুখে হি জিহ্বাদৌ স্বয়মেব স্ফুরত্যদঃ- যখন আপনি তাঁর দাসত্ব স্বীকার করবেন, তখন আপনি তাঁকে জানতে পারবেন।  জিহ্বাদৌ শব্দের দ্বারা এই নির্দেশ করা হচ্ছে যে, ভগবানের উপলব্ধির সূচনা হয় জিহ্বার দ্বারা।  জিহ্বার কার্য হচ্ছে খাদ্যগ্রহণ ও শব্দ উচ্চারণ।  আমরা এই পদ্ধতিকে কৃষ্ণের সেবায় নিয়োজিত করতে পারি-  হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে / হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে, এই মহামন্ত্র কীর্তন ও কৃষ্ণকে নিবেদিত আহার অর্থাৎ কৃষ্ণপ্রসাদ গ্রহণের মাধ্যমে।  আপনি আপনার জিহ্বাকে অন্য কোনকিছুর স্বাদ গ্রহণে নিয়োজিত করবেন না।  যদি আপনি কৃষ্ণপ্রসাদ গ্রহণের মাধমে আপনার জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন এবং যদি আপনি আপনার জিহ্বাকে হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র উচ্চারণে নিয়োজিত রাখেন, তাহলে একদিন আপনার নিকট স্বয়ং কৃষ্ণ প্রকাশিত হবেন- কেবলমাত্র পরমেশ্বর ভগবানের সেবায় আপনার জিহ্বার ক্রিয়াকলাপকে নিয়োজিত রাখার মাধ্যমে এই সাধারণ দাসত্ব বরণ বা আত্মসমর্পণের মাধ্যমে।

জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে আপনি আপনার অন্যান্য ইন্দ্রিয়গুলিকেও নিয়ন্ত্রণ বা সংযত করতে পারবেন এবং সেটা করুন।  আপনি যদি আপনার জিহ্বাকে সংযত করতে না পারেন তাহলে আপনি আপনার অন্যান্য ইন্দ্রিয়গুলিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না।  তাই প্রথম এবং সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আপনার জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করা।  আপনি আপনার জিহ্বাকে অন্য কোন কাজে নিযুক্ত করবেন না।  কৃষ্ণ আমাদের জন্য উৎকৃষ্ট সমস্ত জিনিসের ব্যবস্থা করে রেখেছেন।  গতকাল এখানে এক প্রসাদ উৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল।  প্রত্যেকেই কৃষ্ণপ্রসাদের অনন্য স্বাদ আস্বাদন করেছেন।  আমাদের জিহ্বাটি অত্যন্ত রুচিবাগীশ।  সে কেবল এটা ওটার স্বাদ নিতে চায়।  তাই কৃষ্ণ এত কৃপাময় যে তিনি আমাদের জন্য বিবিধ প্রকারের প্রসাদ প্রদান করেন, যাতে আমরা তার স্বাদ গ্রহণ করে আমাদের কামনাকে পরিতৃপ্ত করতে পারি এবং একসাথে নিজের পারমার্থিক উন্নতি ঘটাতে পারি।  এটি বেশ সুন্দর এক ব্যবস্থা।
এটি এমন নয় যে, কেবল আমাদের সাথে যোগদান করেই আপনি এগুলি করতে পারবেন।  আপনি এই পদ্ধতি শিখে নিজের বাড়িতে তা অনুশীলন করতে পারেন।  বাড়িতে আপনি সুস্বাদু নিরামিষ ভোগ প্রস্তুত করে কৃষ্ণকে তা নিবেদন করতে পারেন।  এটি মোটেই কঠিন কিছু নয়।  প্রতিদিন এইভাবে ভোগ প্রস্তুত করে আমরা নিম্নলিখিত মন্ত্রে ভগবানকে তা নিবেদন করতে পারি।

নমো ব্রহ্মণ্যদেবায় গো-ব্রাহ্মণ-হিতায় চ।
জগদ্ধিতায় কৃষ্ণায় গোবিন্দায় নমো নমঃ॥

‘‘সকল ব্রাহ্মণগণের পূজ্য গো, ব্রাহ্মণ ও জগতের হিতকারী ভগবান কৃষ্ণের উদ্দেশ্যে আমি আমার প্রণতি নিবেদন করি।  কৃষ্ণ  ও গোবিন্দ অভিধাপ্রযুক্ত পরমেশ্বর ভগবানকে আমি পুণঃ পুণঃ প্রণাম জানাই।’’

এই পদ্ধতিটি কঠিন নয়।  প্রত্যেকেই ভোগ প্রস্তুত করে কৃষ্ণকে তা নিবেদন করতে পারেন এবং তারপর সেই প্রসাদ পরিবার-পরিজন মিলে গ্রহণ করতে পারেন।  তারপর শ্রীকৃষ্ণের ছবির সম্মুখে বসে জপ করতে পারেন, তাঁর নাম হরেকৃষ্ণ মহামন্ত্র- হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে / হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।  এই পদ্ধতিতে আপনি এক দিব্য জীবন লাভ করতে পারে।  পরীক্ষা করে দেখুন এবং তার ফলাফল লক্ষ্য করুন।
প্রতিটি গৃহে প্রতিটি মানুষ যদি শ্রীকৃষ্ণকে জানার এই পন্থা অবলম্বন করে, তাহলে একদিন সমস্ত পৃথিবীটাই বৈকুণ্ঠে পরিণত হবে।  বৈকুণ্ঠ হচ্ছে এমন একটি স্থান যেখানে কোন কুন্ঠা বা উদ্বেগ নেই। ‘বৈ’ অর্থ হলো ব্যতীত বা বিহীন এবং ‘কুণ্ঠ’ অর্থ হলো উদ্বেগ।  আমাদের এই জগৎটি উদ্বেগপূর্ণ, কেননা আমরা জড় জাগতিক জীবনের অস্থায়ী অবস্থাকে যথাসর্বস্ব মনে করি।  কিন্তু চিন্ময় জগৎ বৈকুণ্ঠ ঠিক তার বিপরীত।

আমরা সকলেই উদ্বেগ থেকে পরিত্রাণ পেতে চাই, কিন্তু তার উপায়টি কেউই আমরা জানি না।  নেশা করে অচেতন হয়ে থাকাটা উদ্বেগ থেকে মুক্তি লাভ করার উপায় নয়।  মাদকদ্রব্য সাময়িক বিস্মৃতি এনে দেয়।  কিছুক্ষণের জন্য আপনি সবকিছুকে ভুলে যেতে পারেন, কিন্তু চেতনা ফিরে পেলেই আবার সেই যাতনা ভোগ করতে হয়।  যদি এই যন্ত্রণা বা দুঃখ-দুর্দশা থেকে অব্যাহতি পেতে চান, যদি পরম সুখ ও জ্ঞানময় চিরন্তন শাশ্বত জীবনের অধিকারী হতে চান, তবে শ্রীকৃষ্ণকে জানুন।  আর সেই জানাটা সম্ভব ভক্তিভরে তাঁকে সেবা করার মধ্যমে এবং সেই ভগবৎ সেবা শুরু হবে আপনার জিহ্বার মাধ্যমে। শ্রীমদ্ভাগবতের বিভিন্ন স্থানে একটু ভিন্নভাবে এই পদ্ধতিটিই বর্ণিত হয়েছে।  এক স্থানে (১০/১৪/৩) উল্লেখিত হয়েছে-

জ্ঞানে প্রয়াসমুদপাস্য নমস্ত এব
জীবন্তি সম্মুখরিতাং ভবদীয় বার্তাম্ ।
স্থানে স্থিতাঃ শ্রুতিগতাং তনুবাঙমনোভির্যে।

প্রায়শোঽজিত জিতোঽপ্যসি তৈস্ত্রিলোক্যাম্-  এই শ্লোকটিতে বর্ণনা করা হয়েছে যে, ভগবানকে কেউই জয় করতে পারে না।  তাই তাঁর এক নাম অজিত, তাঁকে কেউ জয় করতে পারে না।  তথাপি তিনি বিজিত হন।  যদিও তিনি অজ্ঞেয়, যদিও তিনি অজেয়, তবুও আপনি তাঁকে জয় করতে পারেন।  কিভাবে? আপনার বর্তমান সামাজিক অবস্থানে স্থিত থেকে কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম নীতি মেনে চলুন।  প্রথমতঃ জ্ঞানে প্রয়াসম্ উদপাস্য- সমস্ত রকম জল্পনা-কল্পনা ত্যাগ করুন, লক্ষ লক্ষ বই সংগ্রহ করে কি হবে!  প্রত্যেক বছর পৃথিবীতে লক্ষাধিক অপ্রয়োজনীয় বই প্রকাশিত হচ্ছে।  কিন্তু ছ’ মাস পরেই সেগুলি ফেলে দেওয়া হচ্ছে।  তাই, এভাবে নয়, ওভাবে, ওভাবে নয় এভাবে- এই জল্পনা-কল্পনার পথ গ্রহণ করবেন না।  আমাদের ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান সীমিত।  সুতরাং, কেউই ভগবানের সমকক্ষ বা ভগবান থেকে মহান হতে পারে না।  তাই তাঁর আনুগত্য স্বীকার করাটাই তাঁকে জানার একমাত্র পন্থা।  তাঁকে নিয়ে জল্পনা-কল্পনা, অনুমান করে সময় নষ্ট করবেন না।  নিজেকে সীমিত বলে জেনে, তাঁর শরণাগত হোন।

কর্ম আর ভক্তির পার্থক্য


কর্ম আর ভক্তির পার্থক্য

আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের প্রতিষ্ঠাতা-আচার্য
কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়চরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ
(১৯৬৮ সালের ৯ মার্চ আমেরিকায় সান ফ্রান্সিসকো শহরের শ্রীকৃষ্ণ মন্দিরে
জনৈক সাক্ষাৎকারীর সাথে সংলাপের সারমর্ম)

সাক্ষাৎকারী:  কৃষ্ণভাবনামৃত আস্বাদনের অনুশীলনে নামতে হলে কোনও পরীক্ষাধীন স্তর অতিক্রম করতে হয়, না কি, যে-যার চিন্তা-ভাবনার বিকাশ অনুসারেই জ্ঞান-উপলব্ধি অর্জন করতে পারে?

শ্রীল প্রভুপাদ:  হ্যাঁ, সব কিছুতেই উৎসাহ-উদ্দীপনা থাকা চাই বৈকি!  যেমন, একটা ছেলে কোনও উৎসাহ-উদ্দীপনা ছাড়াই স্কুলে যাচ্ছে, আর একটি ছেলে বেশ উৎসাহের সঙ্গেই স্কুলে রোজ যাচ্ছে।  একটি ছেলে পরীক্ষায় প্রথম হচ্ছে, অন্য ছেলেটি ব্যর্থ হচ্ছে কিংবা ক্লাশে সবার নিচে থাকছে।  তাই আমি আগেও বলেছি পরীক্ষাধীন সময়- কৃষ্ণভাবনা অনুশীলনের ক্ষেত্রেও উৎসাহ-উদ্দীপনা থাকা চাই।
মানুষের উৎসাহ-উদ্দীপনার ওপরেই তার উন্নতি বা বিকাশের সম্ভাবনা নির্ভর করে থাকে।  কে কতটা গুরুত্ব দিয়ে শিখছে।  প্রত্যেককে বেশ গুরুত্ব সহকারে শিখতে হয় সব কিছু।  সিদ্ধি সাফল্যের ক্ষেত্রে সর্বত্রই এই নিয়ম।  সুতরাং কৃষ্ণভাবনা অনুশীলনের ক্ষেত্রে সার্থক সিদ্ধিলাভের জন্য খুব বেশি উৎসাহ-উদ্দীপনা থাকা চাই।  হ্যাঁ, তা ছাড়া উন্নতি সম্ভব নয়।  জীবনের সকল ক্ষেত্রেই সেই একই কথা।

আর মানুষকে ধীরস্থির হতে হবে।  ধৈর্য ধারণ করে সিদ্ধিলাভের জন্য প্রতীক্ষা করে থাকতে হবে।  উৎসাহ-উদ্দীপনা থাকার মানে এই নয় যে, আমি এখনই কোনও বিষয়ে উৎসাহ নিয়ে কাজে লাগি তো এখনি তার সুফল হাতেনাতে পেয়ে যাব।  না।  ফল লাভে দেরি হতেই পারে।  কিন্তু তা হলে আমাদের বিচলিত হওয়া চলবে না।  তা সত্ত্বেও সমানভাবে উৎসাহ আর উদ্দীপনা বজায় রেখে আমাদের কাজ করে চলতে হবে।  একেই বলা হয় ধৈর্য, অধ্যবসায়।  উৎসাহ, উদ্দীপনা, ধৈর্য, অধ্যবসায় এবং আত্মবিশ্বাস, নিজের ওপরে ভরসা।

যেহেতু, আমরা শ্রীকৃষ্ণে বিশ্বাস রেখে চলি, তাই জানি, শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, তুমি এই কাজটি করলে এই ফল লাভ করবে।  অতএব আমার নিজের ওপরে ভরসা থাকা চাই।  ঠিক যেমন শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, শুধুমাত্র তাঁকে উপলব্ধির মাধ্যমে, তিনি কে, কিভাবে তিনি এলেন, কিভাবে চলেন, এই সমস্ত উপলব্ধির দ্বারা অচিরেই মানুষ তাঁর চিন্ময় ধামে প্রবেশ লাভের পাসপোর্ট পেয়ে যেতে পারে।  অতএব ভগবদ্ধামে, আমাদের নিজধামে ফিরে যেতেই হবে এইভাবে।  এটাই হল আত্মবিশ্বাস।

সুতরাং উৎসাহ-উদ্দীপনা, ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস।  আর……উৎসাহাৎ নিশ্চয়াদ্…….তৎ তৎ কর্ম প্রবর্তনাৎ।  শুধু চাই উদ্দীপনা, আর কোনও কিছু নয়।  তবে কৃষ্ণভাবনাময় নির্ধারিত কর্তব্যকর্মে লেগে থাকাও চাই।  আর সকল সময়ে ভক্তদের সান্নিধ্যে নিজেকে জড়িয়ে রাখতে হবে।  আমি বলতে চাই, এই জিনিসগুলিই কৃষ্ণভাবনামৃত আস্বাদনের পথে প্রেরণা জাগায়।

অতএব, যতই বেশি করে এই ছয়টি নীতি মেনে চলার ব্যাপারে নিজেকে অনুপ্রাণিত করে রাখা যাবে- ধৈর্য, উৎসাহ-উদ্দীপনা, তার পরে আত্মবিশ্বাস, তার পরে ভক্তিমূলক কাজকর্মে আত্মনিয়োগ করে থাকা, ভক্তদের সঙ্গ-সান্নিধ্য লাভ করা আর অভক্তদের সঙ্গ বর্জন করা- ততই লাভ।  এটাও একটা মনে রাখার মতো ব্যাপার।

ঠিক যেমন আগুন জ্বালাতে হলে, কাঠ যত শুকনো হবে, তত ভাল আগুন পাওয়া যাবে।  যদি ভিজে কাঠ আনা হয় তো জ্বলতে খুব কষ্ট।  তাই অভক্তদের সান্নিধ্যে গিয়ে ভিজে না যাই, সেদিকে খেয়াল রেখে, নিজেদের শুকনো অর্থাৎ শুদ্ধ রাখতে হবে।  এটাও একটা পন্থা।  এদিকে লক্ষ্য রাখা দরকার।

যদি আপনারা গীতা-ভাগবতের ক্লাসে আসেন, আর অন্য সব ক্লাসেও যান, কোনও নাইট ক্লাবের আড্ডায় যান, তা হলে তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া হয়ে সব বরবাদ হয়ে যাবে।  বুঝেছেন?  অতএব এটা করতেই হবে- যদি আপনি আগুন জ্বালাতে চান ঠিকমতো, তা হলে জল থেকে সেটিকে বাঁচাতেই হবে।  আর যদি আগুন জ্বালিয়ে তাতে জল ঢালেন, তা হলে কি লাভ হল?  কিছুই না।

সুতরাং, কৃষ্ণভাবনা অনুশীলনে উন্নতি লাভ করতে হলে অভক্তদের সঙ্গে আপনাদের সান্নিধ্য বর্জন করতে হবে।  এই ছয়টি নিয়মনীতি মেনে চলতে পারলে তবেই কৃষ্ণভাবনামৃতের প্রকৃত আস্বাদন-মাধুর্য লাভ করা সম্ভব হবে।

সাক্ষাৎকারী:  কর্মজীবনের কাজের মধ্যে যে-বিশ্বাস সক্রিয় থাকে তার মধ্যে কৃষ্ণভাবনার ভূমিকা কিছু থাকে কি?

শ্রীল প্রভুপাদ:  হ্যাঁ, থাকে।  কৃষ্ণভাবনাময় কাজকর্ম আপাতদৃষ্টিতে কর্মজীবনের মতো কাজের ধারা বলেই বোধ হয়।  বুঝতে হবে কর্ম আর ভক্তির মাঝে পার্থক্যটা কি?  যেমন, আমরা এই টেপ রেকর্ডার, এই মাইক্রোফোন ব্যবহার করছি।  কোনও রাজনৈতিক নেতার কাছে গেলেও আপনারা একই সামগ্রী দেখতে পাবেন।  আমিও এই সবের মাধ্যমে কথা বলছি, তিনিও দেখা-সাক্ষাতের সময় এতেই কথা বলছেন।  তা হলে আপাতদৃষ্টিতে আমরা সবাই সমান।  কিন্তু এটা হল ভক্তি আর ওটা হল কর্ম।  ভক্তি আর কর্মের মাঝে কিসের তফাৎ?

 

কর্ম মানে আপনি কিছু করছেন এবং আপনি যা কিছুই করছেন, তার একটা ফল হচ্ছে।  অতএব, ফলটাও আপনি গ্রহণ করছেন।  মনে করুন, আপনি কোনও ব্যবসা করেন।  তা থেকে লক্ষ টাকা লাভ হল।  তা হলে সেটা আপনি নিলেন।  আর তা থেকে লক্ষ টাকা লোকসান হল।  আপনি লোকসান মেনে নিলেন।  এই হচ্ছে কর্ম।  নিজের হিসাব মতো কাজ করছেন আর তার ফল পাচ্ছেন।  পরিষ্কার হল?  একে বলে কর্ম।

কিন্তু আমাদের কাজকর্ম হল শ্রীকৃষ্ণের সেবার উদ্দেশ্যে।  তাই আমরা কাজ করি।  কোনও লাভ হলে সেটা কৃষ্ণের।  কোনও লোকসান হলে, সেটা কৃষ্ণের।  আমাদের কিছুই হয় না।  আমরা কৃষ্ণভাবনামৃত প্রচারের জন্য কাজ করে চলেছি।  কেউ যদি আসেন তো তিনি কৃষ্ণেরই, আমার নন।  এই সব ছেলেরা আমার সেবা করছে, আমার ইন্দ্রিয় পরিতৃপ্তির জন্যে নয়, এরা কাজ করছে কৃষ্ণভাবনার অনুশীলন বাড়িয়ে তোলার জন্য।

এই সব কথা ভগবদ্গীতায় চমৎকারভাবে বোঝানো হয়েছে।  ভাগবতেও বোঝানো হয়েছে।  কৃষ্ণসেবার পরিকল্পনাটি খুবই বিরাট। মানুষকে এটা বোঝাবার চেষ্টা করতে হবে।  কৃষ্ণভাবনামৃত আন্দোলনটা কোনও অন্ধ বিশ্বাসের ব্যাপার নয়।  আমাদের পদ্ধতি অবশ্য খুবই সহজ-সরল।  আমরা ছোট-বড় সকলকে বলি, “এসো বসো, হরেকৃষ্ণ নাম জপ কর।”  ক্রমে মানুষ বুঝতে পারে।  এই বিষয়ে পড়াশুনা করতে থাকে।  শিক্ষিত না হলেও কেবল  কৃষ্ণনাম জপ করার মাধ্যমেও সেই তত্ত্ব ক্রমে উপলব্ধি হতে পারে।  কত সুন্দর পন্থা!  এই পন্থা বিদ্বানের জন্যেও যা, বাচ্চা শিশুর জন্যেও তাই।