শ্রীনৃসিংহদেবের কথা


ওঁ বিষ্ণুপাদ শ্রীল ভক্তি নির্ম্মল আচার্য্য মহারাজের হরি-কথামৃত
আজকে খুবি শুভ দিন—ভগবান শ্রীনৃসিংহদেবের আবির্ভাব তিথি । ভক্তকে রক্ষা করবার জন্য ভগবান আবির্ভূত হয়েছেন আজকে দিনে ।

সমস্ত কিছু ভগবানের ইচ্ছায় হয় ।

হিরণ্যকশিপু আর হিরণ্যাক্ষ আসলে দুই ভাই বৈকুণ্ঠের দ্বাররক্ষক ছিলেন, তাদের নাম জয় আর বিজয় ছিল । এক দিন যখন নারায়ণ ও লক্ষ্মীদেবী তার ঘরের ভিতরে বিশ্রাম করছিলেন, জয় আর বিজয় পাহারা দিলেন, তখন ব্রহ্মার চারি পুত্র উলঙ্গ অবস্থায় সেখানে চলে গিয়েছিলেন । জয় আর বিজয় তাচ্ছিল্য করছিলেন, “তোমাদের এখানে যাওয়া হবে না ।” যে তারা ব্রহ্মার পুত্র ছিলেন, সে তারা জানতেন না, তাই তারা শিশুদের তাড়িয়ে দিয়েছিলেন । তখন শিশুর মধ্যে একজন বললেন, “তোমাকে আমরা অভিশাপ দেব ! তোমাদের এই মর্ত্যে ফিরে আসতে হবে আর বৈকুণ্ঠে থাকতে পারবে না ।” জয় আর বিজয় অবাক হয়ে গেলেন ।

এই সময় ভিতর থেকে নারায়ণ চেঁচামেচি শুনে বাহিরে চলে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “কি হয়েছে ?”

জয় আর বিজয় বললেন, “প্রভু, আমরা আপনার দ্বাররক্ষক আর এই ছেলেটা আমাদের আপনার বিশ্রামে বিঘ্ন করতে বললেন, রাজি হয়ে গেলাম না, তখন তারা আমাদের অভিশাপ দিয়ে দিলেন ।”

নারায়ণ তখন বললেন, “তথাস্তু ! ঠিকই হয়েছে, তাই হবে ।”

“সে কি ? আমাদের মর্ত্যে যেতে হবে ??”

“যখন তারা অভিশাপ দিয়েছে, তখন যেতে হবে ।” (সব কিছু ভগবানের ইচ্ছায়ই হয়েছে ।) তখন নারায়ণ তাদেরকে এক শর্ত দিলেন, “যদি এই জন্মে এসে আমার সঙ্গে মিত্রতা কর, আমার পূজা, সেবা কর, তাহলে সাত জন্ম লাগবে । আর যদি আমার সঙ্গে শত্রুতা কর, তাহলে তিন জন্ম লাগবে । কোনটা করবে ?”

“প্রভু, তাড়াতাড়ি চলে আসব আপনার কাছে—আমরা শত্রুই থাকব !”

তখন তারা সত্যযুগে হলেন হিরণ্যকশিপু আর হিরণ্যাক্ষ, ত্রেতাযুগে হলেন রাবণ আর কুম্ভকর্ণ, আর দ্বাপরে হলেন শিশুপাল আর দন্তবক্র—তারা সবসময় কৃষ্ণের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন ।

হিরণ্যকশিপু আর হিরণ্যাক্ষ দুই ভাই হলেন । সেই দুই ভাই অসুর সবাইকে উৎপাটন করতে শুরু করলেন । উহু, কত ভীষণ অত্যাচার তারা করতে লাগলেন ! স্বর্গ থেকে দেবতারা উৎপাত সহ্য করতে না পেরে স্বর্গ রাজ্য থেকে পলায়ন করল । এটা শুনে হিরণ্যাক্ষ আরও বেশি অত্যাচার করতে লাগলেন, তখন ভগবান রেগে রেগে শূকর-রূপ ধারণ করে হিরণ্যাক্ষকে বধ করলেন ।

তখন যে তার ভাই মরে গেলেন হিরণ্যকশিপু শুনে আরো বেশি রেগে গেলেন । তখন কি করলেন ? জঙ্গলে চলে গিয়ে ব্রহ্মার ধ্যান করতে লাগলেন । না খেয়ে দেয়ে হাজার হাজার বছর ধরে তপস্যা করেছিলেন তিনি, তখন ব্রহ্মা তার তপস্যায় খুব খুশি হয়েছেন । অসুরটার কাছে হাজির হয়ে ব্রহ্মা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “বল তুমি কি বর চাও ?”

“আমি অমরতা চাই ।”

“এটা তো আমার বাহিরে, এটা আমার হাতে নয় । আমার অনেক আয়ু আছে কিন্তু আমারও এক দিন এই দেহ ছাড়তে হবে । আমি এটা তোমাকে দিতে পারব না । আর অন্য কিছু চাও ?”

হিরণ্যকশিপু খানিক ভেবে বললেন, “তখন আমি চাই যে, আমি দিনেও মরব না, রাতেও মরব না ।”

ব্রহ্মা বললেন, “ঠিক আছে ।”

“আমি তোমার কোন সৃষ্ট জীব দ্বারা মরব না ।”

“তাও ঠিক আছে ।”

“আমি আকাশেও মরব না, মাটিতেও মরব না, পাতালেও মরব না ।

“তাও ঠিক আছে ।”

“আমি ঘরেও মরব না, বাহিরেও মরব না ।”

“তাও ঠিক আছে । তুমি যেই বরটা চাও, আমি তোমাকে এই বর দিয়ে দিলাম ।”

এই ফাঁকে হিরণ্যকশিপু তার স্ত্রী বাড়িতে রেখে গেছিলেন—তার নাম ছিল কয়াধু । যখন হিরণ্যাক্ষকে ভগবান বধ করেছিলেন, দেবতারা আবার স্বর্গে ফিরে আসল । এক দিন তারা হিরণ্যকশিপুর বাসস্থানে এসে অসুরের বাড়িটা লণ্ডভণ্ড করল । কয়াধুকে একা দেখে তারা ওকে নিয়ে চলে গেল হত্যা করতে । মাঝখানে রাস্তায় নারদের সঙ্গে দেখা হয় ।

নারদ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা একে নিয়ে কোথায় যাচ্ছো ? মহিলাটার স্বামী এখন ব্রহ্মার ধ্যান করতে জঙ্গলে গিয়েছেন, তোমরা কোথায় একে নিয়ে যাচ্ছো ?”

“একে মেরে ফেলে দিতে যাচ্ছি ! এর গর্ভে হিরণ্যকশিপুর সন্তান আছে, এ সন্তানটা যদি জন্ম গ্রহণ করে, তাহলে সেও অসুর হবে । আমরা এটা সহ্য করতে পারব না !”

নারদ তখন তাদেরকে বুঝিয়ে দিলেন, “তোমরা জান না, এই গর্ভে যে সন্তান হবে, সে মহান ভক্ত হবে আর তোমাদেরটি রক্ষা করবে । বরং মহিলাকে আমার কাছে দিয়ে দাও ।”

তাই, কয়াধু নারদের সঙ্গে তার আশ্রমে চলে গেলেন । সেখানেই তিনি ঠাকুরের বাসন মাজা, সব কিছু সেবা, পূজা করতে লাগলেন, আর যখন নারদ প্রত্যেক দিন ভাগবত্ পাঠ করতেন, তখন প্রত্যেক দিন সেই কয়াধু শ্রবণ করতেন । ভাগবতে যে শিক্ষাগুলো দিয়েছেন, প্রহ্লাদ মহারাজ মায়ের পেটে বসে সেগুলাই শ্রবণ করেছেন আর পরে তিনি বাবাকে আর স্কুলের বালকগণকে সেই শিক্ষা দিতেন ।

কয়াধুর সেবায় খুব খুশি হয়ে নারদ তাকে একদিন বললেন, “কয়াধু, তোমার সেবায় আমি খুব খুশি হয়েছি, তুমি কি বর চাও, বল ।” কয়াধু বললেন, “হিরণ্যকশিপু চলে যাচ্ছে বনে ব্রহ্মার ধ্যান করতে, সে অসুর হল—ও তো আমার স্বামী… আপনি আমাকে এমন বর দেন—স্বামী ফিরে না আসা পর্যন্ত আমার সন্তান প্রসব হবে না । সে বরটা আমাকে দেন ।” নারদ রাজি হয়ে তাকে ওই বরটাই দিয়ে দিলেন ।

এদিকে হিরণ্যকশিপু ব্রহ্মার কাছ থেকে বর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে ফিরে আসলেন । এসে তিনি দেখলেন যে, বাড়িটা লণ্ডভণ্ড ছিল—রেগে গিয়ে তিনি হুংকার দিলেন, “কোথায় গেল আমার স্ত্রী ?!” কেউ তাকে বলল, “নারদ মুনি এখানে এসে নিয়ে গেলেন, আপনার স্ত্রী তাঁর আশ্রমে ।” নারদ গোস্বামীর আশ্রমে গিয়ে হিরণ্যকশিপু স্ত্রীকে নিয়ে চলে আসলেন । তখন তার সন্তান প্রসব হল, নাম রাখল প্রহ্লাদ ।

আস্তে আস্তে প্রহ্লাদ বড় হতে লাগল । অসুরদের গুরু ছিল শুক্রাচার্য্য, তার দুই পুত্র ছিল, ষণ্ড আর অমর্ক । হিরণ্যকশিপু ছেলেকে তাদের কাছে পড়তে পাঠিয়ে দিয়ে আজ্ঞা দিলেন, “সাম-দান-দণ্ড-ভেদ সবগুলো শিক্ষা তাকে দাও—কার সঙ্গে দণ্ড করতে হবে, কার সঙ্গে ভেদ জ্ঞান করতে হবে, এ সব শিক্ষা দেবে ।” কিন্তু যা ষণ্ড-অমর্ক শিক্ষা দিচ্ছে, প্রহ্লাদের ওই সব কিছুই কানে যাচ্ছে না ।

একদিন হিরণ্যকশিপু ষণ্ড-অমর্কে ডাকলেন, “আমার ছেলে কি শিখেছে ? তাকে একবার নিয়ে চলে এস !” প্রহ্লাদ বাড়িতে এলেন, মা তাকে নতুন জামা-কাপড় পরিয়ে, সব কিছু করে, আর বাবার কাছে বসিয়ে দিলেন । তখন বাবা ছেলেকে নিজের কোলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “বাবা, তুমি এই স্কুলে পড়লে কি ভালো শিক্ষা পেয়েছো ? তুমি যেটা ভালো শিখেছো তার মধ্য থেকে একটা সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা বল ।”

প্রহ্লাদ বললেন, “বাবা, আমি শিক্ষাটা বলব ।” তখন বললেন,

ঈশ্বরঃ পরমঃ কৃষ্ণঃ সচ্চিদানন্দবিগ্রহঃ ।
অনাদিরাদির্গোবিন্দঃ সর্ব্বকারণকারণম্ ॥

যখন এটা শুনলেন, হিরণ্যকশিপু তাকে এবার কোল থেকে ছুড়ে ফেলে দিলেন, “এটা আমার ঘরে শত্রু জন্মিয়েছে !! আমার ঘরে শত্রু হয়েছে !” ষণ্ড-অমর্ককে ডাক করে বললেন, “ও রে ! আমার ছেলেকে তোমরা কি শেখাচ্ছ ?!”

ষণ্ড-অমর্ক সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “প্রভু, বিশ্বাস করুন, এসব শিক্ষা আমরা তোকে কোন দিন দেইনি ! কোথা থেকে যে পেয়েছে আমরা বুঝতে পারছি না ।”

হিরণ্যকশিপু তখন তাদেরকে কঠোর নির্দেশ দিলেন, “ভালো করে লক্ষ্য রাখ ! তোমাদের স্কুলে অন্য কেউ আসে, কেউও তা শিখিয়ে দেয় !”

“ঠিক আছে ।”

প্রহ্লাদ কি করলেন ? যে স্কুলে অসুর ছিল, তাদের দলে নিয়ে আসল—স্কুলের মাস্টরমশাইটা যা বলতেন, প্রহ্লাদ তাদেরকে উলটো কথা বলতেন ।

আর এক দিন হিরণ্যকশিপু বাড়িতে প্রহ্লাদকে নিয়ে এলেন, আবার জিজ্ঞেস করলেন, “বল, কি ভালো শিক্ষা শিখেছিস তুই ? মাস্টরমশাইটা কি শিখিয়েছে ?”

প্রহ্লাদ তখন বললেন, “শ্রবণং, কীর্ত্তনং, স্মরণং, বন্দনং, পাদ-সেবনম্, দাস্যং, সখ্যম, আত্মনিবেদনম…”

“এ কি ??! এসব কি বলছিস ?!”

একবারে হিরণ্যকশিপু রেগে হয় আর কি ! হুংকার দিয়ে বললেন, “কুলাঙ্গার !” আর মনে মনে ভাবলেন, “একে যে অবস্থা হয়, একে বধ করতে হবে !”

নানা উপায় চেষ্টা করেছিলেন হিরণ্যকশিপু তার ছেলেকে মেরে ফেলতে—জলের মধ্যে ফেলে দিলেন, হতির পায়ের মধ্যে বেঁধে দিলেন, সাপের বিষ দিলেন, আগুনের মধ্যে ফেলে দিলেন, বিভিন্ন উপায় চেষ্ঠা করলেন কিন্তু কিছু তেই তাকে মারতে পারচ্ছেন না ! অনেক বহুবার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু বিফল ।

তখন হিরণ্যকশিপু তার লোক ডেকে বললেন, “তোমার দ্বারা কিছু হবে না, আমার কাছে তাকে নিয়ে চলে এস ! আমি তাকে উচিত শিক্ষা দিয়ে দেব !” প্রহ্লাদ তার পাশে এসে বসলেন ।

হিরণ্যকশিপু হুংকার দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তুই এই শিক্ষা কোথা থেকে পেয়েছিস ?”

প্রহ্লাদ শান্ত স্বরে বলল, “বাবা, আমাকে যাঁর শিক্ষা, সেই শিখিয়ে দিয়েছেন ।”

“মাস্টরমশাইও বলছেন এটা তার শিক্ষা নয় !” মনে মনে বললেন, “তোমরা মারতে না পারলে, আমি ও ব্যবস্থা নিচ্ছি !” আবার বললেন, “হে কুলাঙ্গার ! বল, তুই এই শিখা কোথা থেকে পেয়েছিস ? আগুনে পুড়ে মরছিস না, জলের মধ্যে ফেলে দিলে ডুবে মরছিস না, তোকে পাহাড় থেকে ফেলে দিলাম, তুই মরলি না ! বল ! তোকে কে এমন বল দিয়ে দিল ?”

“হে পিতা ঠাকুর ! আপনি যে বলে বলীয়ান, আমিও সেই বলে বলীয়ান । আপনি যেখান থেকে বল পেয়েছেন, আমিও সেখান থেকে পেয়েছিলাম । আপনি ব্রহ্মার কাছ থেকে বল পেয়েছেন আর ব্রহ্মা তার শক্তি কৃষ্ণ থেকে পেয়েছিলেন । আপনি ব্রহ্মার কাছ থেকে বল পেয়ে অহঙ্কারে একবারে মত্ত হয়ে ভুলে গিয়েছেন আপনি বলটা কোথা থেকে পেয়েছেন । সব বল হরির কাছ থেকে ।”

“আ ! তুই বারবার ‘হরি’, ‘হরি’ বলছিস, তোর হরি কোথায় আছে ?”

“কৃষ্ণ সর্বত্রই আছেন ।”

“তোর হরি কোথায় থাকে ?”

“হরি কোথায় না থাকে ?”

“সব জায়গায় আছে ? হরি এই স্তম্ভের মধ্যেও আছে ?”

“হ্যাঁ, এখানেও আছে ।”

“এখানে আছে তোর হরি ?!!!”

তখন হিরণ্যকশিপু স্তম্ভে ঘুষি মারলেন—স্তম্ভটা ভেঙ্গে পড়ে গেল আর সেখান থেকে বিশাল চিৎকার শুরু হয়ে গেল ! চিৎকারটা শুনে দেবতারা উপরে ভয়ে কাঁপতে শুরু করল । লক্ষ্মীদেবীকে সবাই বলল, “লক্ষ্মী, তুমি যাও, প্রভুর হুংকারে এই পৃথিবী লয় হয়ে যাবে !”

লক্ষ্মী বললেন, “আমি পারব না, আমি খাণ্ডার নারায়ণে সেবা করলেই প্রভু আরো রেগে যাবেন ।”

তখন স্তম্ভ থেকে নৃসিংহদেব (আধ নর, আধ সিংহ) আবির্ভুত হলেন । তাকে দেখে হিরণ্যকশিপু খুব উদ্দণ্ড মত্ত হয়ে যাচ্ছে আর নৃসিংহদেবও খুব উন্মত্তও হয়ে যাচ্ছে । ভগবান জয় আর বিজয় বলেছিলেন, “তোমাদের সঙ্গে লড়াই করব,” সে লড়াইটার কথা তিনি মনে করছিলেন ।

তখন হিরণ্যকশিপুর সঙ্গে নৃসিংহদেবের জোর লড়াই হচ্ছে । সব দেবতারা বলছেন, “হায় হায় ! হায় হায় কি হলো ? আমার প্রভু এক্ষুনি হেরে যাবে ! যদি ভগবান হেরে যায়…” কিন্তু ভগবান হিরণ্যকশিপুকে হাত থেকে ছুটতে দিয়ে তখনই তাকে আবার হাতে ধরলেন আর আবার ফট্ করে ছুড়ে দিলেন—ভগবানের ইচ্ছা করে ছেড়ে দিলেন । দেবতারা ভয় পেয়ে বললেন, “হায় হায় ! প্রভু জয় করবে ? জয় করবে না ? প্রভু লড়াই হেরে গেলেন ?!” তখন হিরণ্যকশিপু নৃসিংহদেবের শ্রীঅঙ্গে আঘাত করলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে আর সময় না দিয়ে নৃসিংহদেব তাকে ধরে তুলে ফেললেন । তারপর নৃসিংহদেব তাকে তুলে ঊরুর মধ্যে রেখে (ব্রহ্মা তাকে বর দিলেন যে, তিনি মাটিতে মরবে না, আকাশে মরবে না, পাতালে মরবে না, কোন অস্ত্র দ্বারা মরবে না, প্রভৃতি ।) নখ দিয়ে তার উদরটা ছিঁড়ে ফেললেন আর নাড়িভুঁড়িটাকে বাহির করে গলায় পড়লেন !

তারপরে, প্রহ্লাদ মহারাজকে দেখে খুব আনন্দ পেলেন নৃসিংহদেব । ভগবান বললেন, “প্রহ্লাদ, বাবা, তুমি একটা কিছু বর চাও ?”

প্রহ্লাদ বললেন, “প্রভু আমি আর কি বর চাইব ? তুমি আমাকে কৃপা করবার জন্য এসেছো, প্রভু, আমি আর কিছু চাই না…”

“না, কিছু নিতে হবে ।”

“তাহলে এই বর দাও—আমার বাবা তোমার শ্রীঅঙ্গে আঘাত করেছেন—আমার বাবাকে উদ্ধার কর, কৃপা কর ।”

“তোমার বাবা আমার অঙ্গ স্পর্শ করেছে । আমার যে কীর্ত্তন করে, আমার যে নাম করে, আমাকে যে একবার দর্শন করে, সে কৃপা পেয়ে চলে যাচ্ছে, আর তোমার বাবা আমাকে স্পর্শ করেছে—সে যখন রাগে লড়াই করে মারামারি খেলায় করলে, তবু আমাকে স্পর্শ করে সে আমার ধাম প্রাপ্ত হয়ে গেছে । তাহলে এটা বর নয় । বল আর কি বর চাও ? কি বর আমি তোমাকে দিতে পারি ?”

তখন প্রহ্লদ বললেন, “আর কি চাইব ? তোমার যদি কিছু দিতেই হয় আমাকে, তখন এই বর আমি চাই—আমি চাই যে আমার জন্য চাওয়ার বাসনাটা কেটে যায়, এই বর দাও ।”

এইটা হল main (মূল) শিক্ষা । ভগবানের কাছ থেকে চাওয়ার বাসনাটা কেটে যেতে হবে । ভগবানকে নিজের ইন্দ্রিয়তর্পণ করবার জন্য আমরা সবসময় এই চাই, সেই চাই—এইটা বন্ধ করতে হবে । প্রহ্লাদ মহারাজ, হিরণ্যকশিপু, নৃসিংহদেবের অর্থ হয়েছে যে, লোকেরা নৃসিংহদেবের কাছে সবসময় বলে, “আমার ছেলে চাকরি হোক,” “মেয়ের বিয়ে হোক,” “শরীর ভালো হোক,” “টাকা-পয়সা হোক” ইত্যাদি । যে শুদ্ধ ভক্ত, সে প্রার্থনা করে, “ভগবান, আমি তোমাকে একমাত্র প্রার্থনা করি, যেন শুদ্ধ ভক্তি আর তোমার চরণে অচলা ভক্তি থাকে, তোমার চরণে যেন রতিমতি থাকে, যেন তোমার করুণায় তোমার জন্য চিরন্তর আমি সেবা করতে পারি । ভক্তির বিনাশ না হয় তুমি শুদ্ধ ভক্তির বিঘ্ন বিনাশ কর ! ওই মায়ার কবলে পড়ে যেন আমার কোন ভক্তিতে বিনাশ না হয়, সেইটা তুমি একবার দেবে । সেই আমি বরটা চাই, নিজের ইন্দ্রিয়তর্পণের জন্য কিছু চাই নি !”

জয় শ্রীলগুরুমহারাজ কী জয় !

Advertisements

হিন্দুধর্মে পারমার্থিক লাভের পথ/ মার্গ


পারমার্থিক লাভের পথঃ

হিন্দুধর্মে পারমার্থিক লাভের বিভিন্ন পথ নির্দেশিত হয়েছে। পারমার্থিক লাভের বিভিন্ন মার্গ/পথের মধ্যে প্রধানত: তিনটি পথ/মার্গ বিশেষ ভাবে বৈদিক শাস্ত্রে উল্লেখ যোগ্য বলে বিবেচিত। আমরা এ পারমার্থিক পথ/মার্গ গুলোর যেকোন একটি পথ অনুসরণ করে সাধন পথে অগ্রসর হলে ঈশ্বরের সাক্ষাৎ প্রত্যক্ষ সম্ভব। এ পথ/মার্গ তিনটি হলঃ (ক) জ্ঞানমার্গ (খ) ভক্তিমার্গ এবং (গ) কর্মমার্গ

এ তিনটি মার্গ সম্পর্কে কিছুকথা নিম্নরূপঃ

(ক) জ্ঞানমার্গঃ জ্ঞানবাদীরা মনে করেন যে, জ্ঞানের পথই পরমার্থ বা মোক্ষলাভের শ্রেষ্ঠ পথ, কর্মের পথ নয়। নামরূপাত্মক দৃশ্য প্রপঞ্চের অতীত যে নিত্য, শাশ্বত, অক্ষয়, অব্যয়, অনাদিতত্ত্ব, তাই পরমতত্ত্ব, তাই ব্রহ্ম। জ্ঞান যোগে তাকেই জানতে হবে। আত্মতত্ত্ব ও ব্রহ্মতত্ত্ব এক। জীব মায়ামুক্ত হলে এই একত্ব জ্ঞান লাভ করে। শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসন আত্মজ্ঞান বা ব্রহ্মজ্ঞান লাভের তিনটি প্রয়োজনীয় অঙ্গ। শ্রবণ ব্রহ্মজ্ঞানের প্রথম সোপান। এর অর্থ গুরুর কাছ থেকে উপনিষদের বাণী শ্রবণ। দ্বিতীয় সোপান মনন এর অর্থ যৌক্তিক বিশ্লেষণের সাহায্যে এই উপদেশের তাৎপর্য উপলদ্ধি। তৃতীয় ও চরম সোপান নিদিধ্যাসন এর অর্থ বুদ্ধি অনুমোদিত তত্ত্বের বিরবচ্ছিন্ন ধ্যান। এরই মাধ্যমে পরমজ্ঞান লাভ হয়। এরই নাম প্রজ্ঞা। এরই মাধ্যমে তত্ত্বের প্রত্যক্ষ দর্শন ও সাক্ষাৎ উপলদ্ধি হয়।

(খ) ভক্তিমার্গঃ জ্ঞানমার্গ খুবই কঠিন। সে কারণে এই পথ সকলের জন্য নয়, সীমিত কয়েক জনের জন্য। নির্গুণ, নির্বিশেষ ব্রহ্ম, যাকে জগৎস্রষ্টা, প্রভু বা ঈশ্বর কোন ভাবেই বর্ণনা করা যায় না, তাকে ধারণা করা মানুষের পক্ষে কঠিন এবং তার সঙ্গে ভাবভক্তির সম্বন্ধ প্রতিষ্ঠা করাও মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষ পরমতত্ত্বকে যতখানি হৃদয় দিয়ে উপলদ্ধি করতে চায় ততখানি বৃদ্ধি দিয়ে অনুভব করতে চায় না। তাই এসে পড়ে সগুণ ব্রহ্ম বা ঈশ্বরের কল্পনা এবং ভক্তির মাধ্যমে ভক্তের ঈশ্বর এর সাক্ষাৎকারের কথা। উপাসনা ভক্তিমার্গের সাধনা, ভক্তিমার্গের প্রাণ। অনুরাগই ভক্তির স্বরূপ। ভক্তিশাস্ত্রে- নয় প্রকার ভক্তির সাধন উল্লিখিত আছে। যেমন- শ্রবণ, কীর্তন, স্মরণ, পদসেবা, অর্চনা, বন্দনা, দাস্য, সখ্য, আত্মনিবেদন। ভগবানই একমাত্র আশ্রয়- একমাত্র অগ্রতির গতি- এই ভাব অবলম্বন করে ভগবানে আত্মসমর্পণই ভক্তিমার্গের একটি প্রধান ভাব।

(গ) কর্মমার্গঃ কর্মমার্গ পরমার্থ লাভের জন্য নিষ্কাম কর্ম সম্পাদনের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। রাগ, দ্বেষ ও মোহ মুক্ত হয়ে যে কর্ম সম্পাদন করা হয় তাই হল নিষ্কাম কর্ম। গীতায় নিষ্কাম কর্ম সাধনের কথা বলা হয়েছে। জীব অনাসক্তভাবে, কর্মের ফলাফলে উদাসীন হয়ে, নিঃদ্বন্দ্ব ও সমত্ববুদ্ধিযুক্ত হয়ে এবং ঈশ্বরে সর্ব-কর্মফল সমর্পণ করে যদি কর্ম করে তবে সেই কর্মে কোন বন্ধন হয় না এবং আর পুনর্জন্ম হয় না। এই নিষ্কাম কর্মের মাধ্যমে সাক্ষাৎ ঈশ্বর দর্শন হয়।

এই তিনটি মার্গের মধ্যে যেকোন একটি মার্গ অনুসরণ করলেই ঈশ্বর দর্শন সম্ভব এবং আমাদের মানব উদ্দেশ্যের সার্থকতা এখানেই।

শ্রীমদ্ভগবদগীতার উৎপত্তি ও ইতিকথা


শ্রীমদ্ভগবদগীতার উৎপত্তি ও ইতিকথা

শ্রীমদ্ভগবদগীতা বহু প্রাচীন কাল থেকে একটি পবিত্র ধর্মগ্রন্থ হিসেবে সমাদৃত হয়ে আসছে। আজ থেকে হাজার হাজার বছর পূর্বে দ্বাপর যুগে শ্রীগীতার এ অমিয় বাণী কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অগ্রহায়ণ মাসের শুক্লা একাদশী তিথিতে অর্জুনকে ব্যক্ত করেছিলেন। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন যিনি মহর্ষি ব্যাসদেব নামে সমধিক পরিচিত তিনি মহাভারত রচনা করে এই কথোপকথন ভীষ্ম পর্বের ২৫ অধ্যায় হতে ৪২ অধ্যায় পর্যন্ত সপ্তশতী শ্লোকে অন্তর্ভূক্ত করেন। অবশ্য শ্রীগীতার উত্পত্তি আর ও অনেক প্রাচীন।
শ্রীমদ্ভগবদগীতার ৪র্থ অধ্যায়ের প্রথম শ্লোকে এর উত্পত্তি ও ইতিকথা সর্ম্পকে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।

ইমং বিবস্বতে যোগং প্রোক্তবানহমব্যয়ম্ ।
বিবস্বান্মনবে প্রাহ মনুরিক্ষ্বাকবেহব্রবীত্ । ৪/১

অনুবাদ :
পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন – আমি পূর্বে সূর্যদেব বিবস্বানকে এই অব্যয় নিষ্কাম কর্মসাধ্য জ্ঞানযোগ করেছিলাম। সূর্য তা মানব জাতির জনক মনুকে বলেন এবং মনু তা ইক্ষ্বাকুকে বলেছিলেন।
শ্রীমদ্ভগবদগীতার উত্পত্তি ইতিহাস অতি পুরাতন। পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজেই শ্রীগীতার ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। সূর্যকে একটি শক্তিরূপে কল্পনা করে প্রাচীন কাল থেকে তাকে দেবতা হিসেবে মনে করা হত। তিনি সকল গ্রহের রাজা। অশেষ তেজবিশিষ্ট এবং জগতের চক্ষুস্বরূপ। মানুষ যেমন চক্ষু ব্যতীত কোন কিছু দেখতে পায়না তেমনি সূর্য ছাড়া সারা পৃথিবী অন্ধকার। তিনি অন্যান্য গ্রহকে তাপ ও আলো দান করেন। ভগবান অতি কৃপা করে প্রথম শিষ্যরূপে সূর্যদেব (বিবস্বান)কে গ্রহণ করেন এবং তাকে শ্রীমদ্ভগবদগীতার সমুদয় জ্ঞান করেছিলেন এবং পরবর্তীতে বিবস্বানের মাধ্যমে বিভিন্ন গ্রহের রাজাদেরকেও তা দান করেছিলেন।পৃথিবীতে যখন ত্রেতা যুগ শুরু হয় তখন তার প্রারম্ভে ভগবত্তত্ত্ব জ্ঞান বিবস্বান (সূর্যদেব) মানব জাতির জনক মনুকে দান করেন। মনু পরবর্তীকালে এই তত্ত্বজ্ঞান তার পুত্র সসাগরা পৃথিবীর অধিশ্বর এবং রঘু বংশের জনক ইক্ষ্বাকুকে দান করেন । প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে রঘু বংশে শ্রীরামচন্দ্র আর্বিভূত হন। অতএব এই শ্রীগীতার তত্ত্ববাণীর জ্ঞান শুরু থেকে শিষ্যতে পরম্পরাক্রমে ধারাবাহিকভাবে প্রচারিত ও প্রবাহিত হয়ে আসছে। কিন্তু এক সময় এই পরম্পরা ছিন্ন হয়ে যায় এবং এই জ্ঞান আমরা হারিয়ে ফেলি । তাই পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজে এসে আবার এই জ্ঞান দান করলেন।
পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যখন সূর্যদেব বিবস্বনকে শ্রীমদ্ভগবদগীতা শোনান তখন অর্জুনও অন্যকোন রূপে সেখানে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু ভগবানের সাথে পার্থক্য হচ্ছে যে , অর্জুন তা ভুলে গেছেন। কিন্তু ভগবান তা ভোলেন নি। তাই পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শ্রীগীতার ৪র্থ অধ্যায়ের ৫ম শ্লোকে বলেছেন-

বহূনি মে ব্যতীতানি জন্মানি তব চার্জুন ।
তান্যহং বেদ সর্বাণি ন ত্বং বেত্থ পরন্তপ ॥ ৪/৫

অনুবাদঃ
পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বললেন – হে পরন্তপ অর্জুন, আমার এবং তোমার বহু জন্ম অতীতে হয়েছে। আমি সেই সমস্ত জন্মের কথা স্মরণ করতে পারি কিন্তু তুমি তা পারো না ।
মানুষ কথনো পূর্ব জন্মের ঘটনা প্রবাহ জানতে পারেনা। তাই দ্বাপর যুগে অর্জুন কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধে দাঁড়িয়ে তাঁর বিপক্ষীয় কুরুবংশের আত্মীয় স্বজনদের বধ করে রাজ্য লাভ করতে কিছুতেই রাজী হচ্ছিলেন না। কিন্তু পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সেই পূর্বে প্রচারিত শ্রীমদ্ভাগবদগীতার বাণী পুনরায় শোনানোর কারণে অর্জুনের জ্ঞান ফিরে আসে এবং ধর্মযুদ্ধ করতে মনস্থির করলেন।

সহজ কথায় ধর্মঃ


সহজ কথায় ধর্মঃ
Image result for dharma
 ধর্মঃ
ধর্ম শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ধৃ(ধরে রাখা, বহন করা, রক্ষণ করা) ধাতু থেকে। অর্থাৎ, যা কোন কিছুকে ধরে রাখে বা রক্ষা করে অথবা যা ছাড়া কোন কিছুরই অস্তিত্ব অসম্ভব তাইই হল ধর্ম। বেদ ও অন্যান্য গ্রন্থের ধর্মালোচনা থেকে ধর্মের যে ধারণা পাওয়া যায়, তা হল; ন্যায়, বিশেষ পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত, নৈতিক মূল্যবোধ, কর্তব্যনিষ্ঠতা, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায়, নীতির প্রতি অবিচল আস্থা ও ন্যায্যকর্ম সম্পাদন, অন্যের(মানুষ বা যেকোনো প্রাণীর) প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন করা, জনকল্যাণে সংবেদনশীল ও সহযোগী হওয়া, প্রাকৃতিক গুনাগুণ বা চরিত্র, দায়িত্ব, কর্তব্য, সংবিধান ইত্যাদি। সোজা কথায়, ধর্ম হল এমন একটি পদ্ধতি যা, মহাজাগতিক শৃঙ্খলাকে ধরে রাখে, মানুষের জীবনের সাথে প্রকৃতির ঐকতান সৃষ্টি করে ও এই ঐক্যকে ধারণ করে। অর্থাৎ, আমরা যখন ধর্ম পালন করি, তখন আমরা আসলে বিশ্বপ্রকৃতির নিজস্ব প্রাকৃতিক নিয়মের সাথেই সহাবস্থান করি।
অবস্থাভেদে বা পরিপ্রেক্ষিত অনুযায়ী ধর্মের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের পরিবর্তন ঘটে। আর এই বিশেষ কারণে, মাত্র এক লাইনে ধর্মের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা সম্ভব নয়। এই কারনেই এর (ধর্মের) অর্থের প্রায়োগিক ব্যাপকতা অনেক বিস্তৃত ও গভীর।
আসুন, আরেকটু বিস্তৃত আলোচনা করা যাক। প্রথমেই আসি ধর্মের মূল আভিধানিক অর্থ; অর্থাৎ যা দ্বারা কোন কিছুকে ধারণ করা বোঝায়। যেমন, জলের ধর্ম তারল্য, বায়ুর ধর্ম বায়বীয়, কঠিন যেকোনো পদার্থের ধর্ম তার কাঠিন্য। এখন জল যদি তার তারল্য হারায়, তখন তা আর জল থাকবে না, অন্য কোন পদার্থ; বরফ বা বাস্পে পরিণত হতে পারে। একইভাবে, কঠিন পদার্থ তার কাঠিন্য, বায়ু তার বায়বীয়তা হারালে তা তাদের স্বাভাবিক সত্ত্বা হারিয়ে অন্য কোন পদার্থে রূপান্তরিত হবে। তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি,
ধর্ম হল পদার্থের বা অন্য যেকোনো কিছুর এমন এক নিজস্ব গুণ, যা হারালে পদার্থ তার স্বাভাবিক অবস্থা হারায়, তার নিজস্বতা হারিয়ে হয় ধ্বংস প্রাপ্ত হয় নয়ত অন্য কোন কিছুতে পরিণত হয়, যা তার স্বাভাবিক, গুনগত অবস্থা নয়।
এরপর আসি ধর্মের অন্য অর্থ যেমন; নীতি (বেদাদি ধর্মগ্রন্থ সমুহে এটি ধর্মের আরেক রুপ)। মানুষ পশু প্রজাতি হলেও, তার উন্নত মনন, দূরদৃষ্টি, চিন্তাভাবনার গতিশীলতা ও সাবলীলতার কারণে সে অন্যান্য প্রানীদের মত স্বভাবজাত নয়, বরং সে তার স্বতপ্রবৃত্তির বাইরে ও চিন্তা করতে পারে এবং নিজ আদিম প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই দারুন ক্ষমতার জন্যই সে আর সব প্রানী থেকে আলাদা। একই কারণে যে বন্য প্রাণীর মত স্বভাবজাত মানসিকতা নিয়ে চলতে পারেনা, বরং তার সমস্ত নিজস্ব কার্যকারণের আদ্যোপান্ত সে জানতে চায় ও তার সমর্থন চায়। আর এই কার্যকারণের পক্ষে সমর্থন যোগাতে সে নীতি আশ্রয়ী হয়, জীবনে চলার পথে নীতি-অনীতি, সত্য-অসত্য, ন্যায়-অন্যায়, ঔচিত্য-অনোচিত্য প্রভৃতি যাচাই করে এবং এই যাচাইের সুবিধার্থে নৈতিক কর্মপন্থার খোঁজ করে। একজন ব্যাক্তি তাঁর জীবনের জন্য এমন কিছু নীতির খোঁজ করেন বা এমন নীতি নিয়ে চলেন, যা তাঁকে বৃহত্তর সামাজিক সম্পর্কের পর্যায়ে স্বচ্ছন্দ করে তোলে, সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় নীতির সাথে সামঞ্জস্য সৃষ্টি করে একটি অর্থপূর্ণ, স্বচ্ছন্দ ও নিরাপদ জীবনযাপনে সহায়তা করে এবং বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট ঘাত প্রতিঘাত এড়িয়ে চলতে সাহায্য করে, শুধু তাই নয়, বিশেষ প্রয়োজনীয় মুহূর্তে তাঁর কর্তব্যকর্ম স্থির করতে ও সাহায্য করে। এরকম নীতি যেকোনো ব্যাক্তি বা সমষ্টি বা সামাজিক চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য উপাদান। এই উপাদান না থাকলে বা নষ্ট হলে, ব্যাক্তি বা সমাজের কোন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই থাকেনা। অনেকটা চরিত্রহীন, হীনমন্য, বিবেকহীন, বোধহীন পরজীবী ক্লীবে পরিণত হয়। এই ধরনের ব্যাক্তি বা সমাজের ধ্বংসই একমাত্র নিয়তি। এক্ষেত্রে, নীতিই ব্যক্তি বা সমাজের ধর্ম হিসেবে আবির্ভূত। যা থাকলে স্বীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হওয়া যায় আর না থাকলে নিজ গুনাগুণ রহিত হয়ে অপরের মুখাপেক্ষী হতে হয় এবং স্বীয় অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়।
অর্থাৎ, আবারো ধর্মহীনতাই বিলুপ্তির কারণ।
এরপর, ধর্মের আরেকটি অর্থের কথা বলতে হয়, যা হল ন্যায়। যারা মহাভারত পড়েছেন, তাঁরা জানেন, কুরু পাণ্ডবের মধ্যেকার যুদ্ধটি সংগঠিত হবার মূল কারণ ছিল ন্যায়। পাশাখেলায় পরাজিত হবার শাস্তি হিসেবে পাণ্ডবদের ১২ বছর বনবাস ও ১ বছর অজ্ঞাত বাস করতে হয়। শর্ত ছিল, শাস্তিভোগের পর পাণ্ডবরা তাঁদের রাজ্য ও সম্পদ ফিরে পাবে। কিন্তু, কৌরবরা শর্তভঙ্গ করে ও পাণ্ডবদের রাজ্য ফেরত দিতে অস্বীকার করে, উল্টো যুদ্ধের হুমকি দেয়। প্রাপ্য ফেরত পাওয়ার সমস্ত তৎপরতা এবং কুটনৈতিকতা (সাম, দান, ভেদ) ব্যর্থ হলে পাণ্ডবরা “কুরুক্ষেত্রে” যুদ্ধে(দণ্ডনীতি)অবতীর্ণ হয়। এই যুদ্ধ ছিল ন্যায্য প্রাপ্তির যুদ্ধ অর্থাৎ ন্যায়ের যুদ্ধ। আর এই ন্যায়ের যুদ্ধকেই মহাভারতে বলা হয়েছে ধর্মযুদ্ধ। এখানে, ন্যায় ও ধর্ম সমার্থক। দেখুন, যে কাউকেই সমাজে বসবাস করতে হলে, তাঁকে আর দশজনের সাথে মিলেমিশে বসবাস করতে হয়। মানুষের মধ্যেকার পারস্পরিক সম্পর্ক যেমন তৈরি হয় তেমনি আবার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সংঘাত ও তৈরি হয়। ঠিক এই জায়গাটাতেই ন্যায়ের প্রশ্ন আসে। আমি যদি অপর ব্যাক্তির সাথে অন্যায় আচরণ করি, তবে তারও আমার প্রতি অন্যায় আচরনের অধিকার আছে, কারণ, আমি আগে অন্যায় আচরণ করে তাঁকে সে অধিকার দিয়েছি। এটা আইন শৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়। এটা নৈতিকতার প্রশ্ন ও অধিকারের প্রশ্ন। দুই বা ততোধিক ব্যাক্তির পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে যদি ন্যায় অনুপস্থিত হয়, তবে সম্পর্কের মধ্যে অন্যায় আসবে, একপাক্ষিকতা আসবে, বঞ্চনা আসবে, বৈষম্য আসবে। এই ধরনের সম্পর্কের মধ্যে কোন শ্রদ্ধাবোধ বা ভালবাসা তৈরি হয়না বরং শঠতা ও প্রতারনা তৈরি হয়। পরিণামে তা একটি সুস্থ, স্বাভাবিক সম্পর্কের অন্তরায় হয়, সুস্থ, স্বাভাবিক সমাজ ও জাতি গঠন অসম্ভব হয়ে পড়ে। অরাজকতা তৈরি হয়, মাৎস্যন্যায় তৈরি হয়, দুর্বলের উপর সবলের উৎপাত বৃদ্ধি পায়, পরিবার ও সমাজের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ ভেঙ্গে পড়ে এবং এর ফল অবশ্যম্ভাবী ধ্বংস। কুরুক্ষেত্রে কৌরবদের ধ্বংস হয়েছিল। আর বর্তমানে ক্ষয়িষ্ণু হিন্দুরা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
অতএব আবার দেখতে পাচ্ছি, ন্যায়স্বরূপ ধর্মের অনুপস্থিতি এবং নিশ্চিত ধ্বংস।
 ধর্মের সংজ্ঞাঃ
Dharma is an expression of “Ethical Principals” which uphold a cosmic order that harmonize the relationship “among men and also between men and broader nature” through combining both “materialistic development and spiritual enlightenment”, which, when practiced consciously ultimately leads to “Moksha” that is releasing oneself from the cycle of “birth and death”.
ধর্ম হল কর্তব্যকর্মের এমন এক নীতিমালা, যা এক মহাজাগতিক শৃঙ্খলার নির্দেশক, যা বৈষয়িক উন্নয়ন ও আধ্যাত্মিক জ্ঞ্যানকে একীভূত করে, মানুষে মানুষে এবং মানুষ ও বৃহত্তর প্রকৃতির মধ্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্কের ঐকতান সৃষ্টি করে, যার সচেতন চর্চায় মোক্ষলাভের (জন্ম ও মৃত্যুর চক্র হতে মুক্তি) পথ সুগম হয়।
অতএব, আমরা দেখতে পাচ্ছি, ধর্ম বলতে কর্তব্যকর্ম সম্পাদনের নীতিকেই বোঝায়, যে নীতির আলোকে মানুষ তাঁর আর্থ ও কাম চরিতার্থ করবে, যে নীতিতে মানুষ তাঁর পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, বৃহত্তর মানবজাতি ও বৃহত্তর প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক স্থাপন করবে, তাঁদের কল্যাণে নিজের জীবন উৎসর্গ করবে, যে নীতির সচেতন চর্চায় তাঁর সুপ্ত মানবিক গুনগুলোকে সুষমামণ্ডিত করে তুলবে এবং ধাপে ধাপে তাঁর আধ্যাত্মিক সত্তাকে উপলব্ধি করবে, জীবাত্মা ও পরমাত্মার পার্থক্য দুরীভুত হবে।
কর্তব্যকর্ম ছেঁড়ে যারাই মোক্ষের প্রত্যাশায় লালায়িত হবে, সংসার ছেঁড়ে, সংসারের প্রতি দায়িত্ব ছেঁড়ে যারাই আধ্যাত্মিকতার চর্চা করতে যায়, তাঁরা অধার্মিক। ধর্ম ও ধার্মিক সমাজের চোখে তাঁরা অনাকাঙ্ক্ষিত ও অথর্ব। তাঁরা মানবজাতির কাছে ভারসম। আবার যারা কর্তব্যকর্ম ছেঁড়ে কেবলমাত্র আত্মসর্বস্ব জীবনযাপন করেন, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র চুলোয় যাক, আপনি বাচলে বাপের নাম, কর্তব্য এড়াতে যারা কখনও দর্শনের নামে, কখনও বিশ্ব মানবতার নামে, কখনও অহিংসার নামে কঠিন বাস্তবতাকে অস্বীকার করেন, তারাও সমান অধার্মিক, শঠ, প্রতারক এবং তারাও ধর্মের চোখে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অথর্ব। এরাও মানবজাতির কাছে অপ্রয়োজনীয় ও ভারসম।
কেবল যারা যোগী (কর্মযোগী), যারা পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, সভ্যতা, ন্যায় অন্যায়, রাজনীতি, আর্থসামাজিক চাপানউতর এর মধ্যে শান্ত, সংযত, কর্তব্যপরায়ণ ও ধীসম্পন্ন থাকেন, ধর্মে অবিচল থাকেন, ধর্ম প্রতিষ্ঠায় অবিচল থাকেন, ধর্ম প্রচার, প্রসার ও রক্ষায় বাঘের ন্যায় ক্ষিপ্র, সাহসী, ধৈর্যশীল ও বলবান থাকেন, যেকোনো বাঁধার সামনেই অভিযোগশুন্য, অকুতোভয়, সাত্ত্বিক ও বলীদানে প্রস্তুত থাকেন তাঁরাই প্রকৃত ধার্মিক। এঁদের হাতেই ধর্মের প্রতিষ্ঠা হয়, ধর্মের সুরক্ষা হয়, অপরাপর মানুষের, সমাজের, সংস্কৃতির ও সভ্যতার সুরক্ষা হয়। এঁরাই (পুরুষ ও স্ত্রী উভয়ই) নেতৃত্ব দানের যোগ্য, এঁরাই সহজাত নেতা হন। এঁদের সংখ্যা কম হতে পারে, কিন্তু এঁদের প্রভাবই সমাজকে, সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এরা যেকোনো কেউ বা যে কোন পেশার হতে পারেন।
এঁরা সকলে যেক্ষেত্রে এক কাতারে দাঁড়ান, তা হল ধর্মের প্রতি অনন্যসাধারণ চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞা, অসাধারণ শক্ত মানসিকতা, প্রজ্ঞ্যা, ধী এবং সর্বোপরি যা তাঁদের বাকী সবার চাইতে অনন্য ও আলাদা করে, বাকী সবার চোখে তাঁরা নায়ক/ নায়িকার আসনে অধিষ্ঠিত হন, তা হল যেকোনো বৃহত্তর স্বার্থে নিঃশঙ্ক চিত্তে “আত্মত্যাগের” ক্ষমতা।