সহজ কথায় ধর্মঃ


সহজ কথায় ধর্মঃ
Image result for dharma
 ধর্মঃ
ধর্ম শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ধৃ(ধরে রাখা, বহন করা, রক্ষণ করা) ধাতু থেকে। অর্থাৎ, যা কোন কিছুকে ধরে রাখে বা রক্ষা করে অথবা যা ছাড়া কোন কিছুরই অস্তিত্ব অসম্ভব তাইই হল ধর্ম। বেদ ও অন্যান্য গ্রন্থের ধর্মালোচনা থেকে ধর্মের যে ধারণা পাওয়া যায়, তা হল; ন্যায়, বিশেষ পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত, নৈতিক মূল্যবোধ, কর্তব্যনিষ্ঠতা, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ন্যায়, নীতির প্রতি অবিচল আস্থা ও ন্যায্যকর্ম সম্পাদন, অন্যের(মানুষ বা যেকোনো প্রাণীর) প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন করা, জনকল্যাণে সংবেদনশীল ও সহযোগী হওয়া, প্রাকৃতিক গুনাগুণ বা চরিত্র, দায়িত্ব, কর্তব্য, সংবিধান ইত্যাদি। সোজা কথায়, ধর্ম হল এমন একটি পদ্ধতি যা, মহাজাগতিক শৃঙ্খলাকে ধরে রাখে, মানুষের জীবনের সাথে প্রকৃতির ঐকতান সৃষ্টি করে ও এই ঐক্যকে ধারণ করে। অর্থাৎ, আমরা যখন ধর্ম পালন করি, তখন আমরা আসলে বিশ্বপ্রকৃতির নিজস্ব প্রাকৃতিক নিয়মের সাথেই সহাবস্থান করি।
অবস্থাভেদে বা পরিপ্রেক্ষিত অনুযায়ী ধর্মের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের পরিবর্তন ঘটে। আর এই বিশেষ কারণে, মাত্র এক লাইনে ধর্মের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা সম্ভব নয়। এই কারনেই এর (ধর্মের) অর্থের প্রায়োগিক ব্যাপকতা অনেক বিস্তৃত ও গভীর।
আসুন, আরেকটু বিস্তৃত আলোচনা করা যাক। প্রথমেই আসি ধর্মের মূল আভিধানিক অর্থ; অর্থাৎ যা দ্বারা কোন কিছুকে ধারণ করা বোঝায়। যেমন, জলের ধর্ম তারল্য, বায়ুর ধর্ম বায়বীয়, কঠিন যেকোনো পদার্থের ধর্ম তার কাঠিন্য। এখন জল যদি তার তারল্য হারায়, তখন তা আর জল থাকবে না, অন্য কোন পদার্থ; বরফ বা বাস্পে পরিণত হতে পারে। একইভাবে, কঠিন পদার্থ তার কাঠিন্য, বায়ু তার বায়বীয়তা হারালে তা তাদের স্বাভাবিক সত্ত্বা হারিয়ে অন্য কোন পদার্থে রূপান্তরিত হবে। তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি,
ধর্ম হল পদার্থের বা অন্য যেকোনো কিছুর এমন এক নিজস্ব গুণ, যা হারালে পদার্থ তার স্বাভাবিক অবস্থা হারায়, তার নিজস্বতা হারিয়ে হয় ধ্বংস প্রাপ্ত হয় নয়ত অন্য কোন কিছুতে পরিণত হয়, যা তার স্বাভাবিক, গুনগত অবস্থা নয়।
এরপর আসি ধর্মের অন্য অর্থ যেমন; নীতি (বেদাদি ধর্মগ্রন্থ সমুহে এটি ধর্মের আরেক রুপ)। মানুষ পশু প্রজাতি হলেও, তার উন্নত মনন, দূরদৃষ্টি, চিন্তাভাবনার গতিশীলতা ও সাবলীলতার কারণে সে অন্যান্য প্রানীদের মত স্বভাবজাত নয়, বরং সে তার স্বতপ্রবৃত্তির বাইরে ও চিন্তা করতে পারে এবং নিজ আদিম প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই দারুন ক্ষমতার জন্যই সে আর সব প্রানী থেকে আলাদা। একই কারণে যে বন্য প্রাণীর মত স্বভাবজাত মানসিকতা নিয়ে চলতে পারেনা, বরং তার সমস্ত নিজস্ব কার্যকারণের আদ্যোপান্ত সে জানতে চায় ও তার সমর্থন চায়। আর এই কার্যকারণের পক্ষে সমর্থন যোগাতে সে নীতি আশ্রয়ী হয়, জীবনে চলার পথে নীতি-অনীতি, সত্য-অসত্য, ন্যায়-অন্যায়, ঔচিত্য-অনোচিত্য প্রভৃতি যাচাই করে এবং এই যাচাইের সুবিধার্থে নৈতিক কর্মপন্থার খোঁজ করে। একজন ব্যাক্তি তাঁর জীবনের জন্য এমন কিছু নীতির খোঁজ করেন বা এমন নীতি নিয়ে চলেন, যা তাঁকে বৃহত্তর সামাজিক সম্পর্কের পর্যায়ে স্বচ্ছন্দ করে তোলে, সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় নীতির সাথে সামঞ্জস্য সৃষ্টি করে একটি অর্থপূর্ণ, স্বচ্ছন্দ ও নিরাপদ জীবনযাপনে সহায়তা করে এবং বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট ঘাত প্রতিঘাত এড়িয়ে চলতে সাহায্য করে, শুধু তাই নয়, বিশেষ প্রয়োজনীয় মুহূর্তে তাঁর কর্তব্যকর্ম স্থির করতে ও সাহায্য করে। এরকম নীতি যেকোনো ব্যাক্তি বা সমষ্টি বা সামাজিক চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য উপাদান। এই উপাদান না থাকলে বা নষ্ট হলে, ব্যাক্তি বা সমাজের কোন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যই থাকেনা। অনেকটা চরিত্রহীন, হীনমন্য, বিবেকহীন, বোধহীন পরজীবী ক্লীবে পরিণত হয়। এই ধরনের ব্যাক্তি বা সমাজের ধ্বংসই একমাত্র নিয়তি। এক্ষেত্রে, নীতিই ব্যক্তি বা সমাজের ধর্ম হিসেবে আবির্ভূত। যা থাকলে স্বীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হওয়া যায় আর না থাকলে নিজ গুনাগুণ রহিত হয়ে অপরের মুখাপেক্ষী হতে হয় এবং স্বীয় অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়।
অর্থাৎ, আবারো ধর্মহীনতাই বিলুপ্তির কারণ।
এরপর, ধর্মের আরেকটি অর্থের কথা বলতে হয়, যা হল ন্যায়। যারা মহাভারত পড়েছেন, তাঁরা জানেন, কুরু পাণ্ডবের মধ্যেকার যুদ্ধটি সংগঠিত হবার মূল কারণ ছিল ন্যায়। পাশাখেলায় পরাজিত হবার শাস্তি হিসেবে পাণ্ডবদের ১২ বছর বনবাস ও ১ বছর অজ্ঞাত বাস করতে হয়। শর্ত ছিল, শাস্তিভোগের পর পাণ্ডবরা তাঁদের রাজ্য ও সম্পদ ফিরে পাবে। কিন্তু, কৌরবরা শর্তভঙ্গ করে ও পাণ্ডবদের রাজ্য ফেরত দিতে অস্বীকার করে, উল্টো যুদ্ধের হুমকি দেয়। প্রাপ্য ফেরত পাওয়ার সমস্ত তৎপরতা এবং কুটনৈতিকতা (সাম, দান, ভেদ) ব্যর্থ হলে পাণ্ডবরা “কুরুক্ষেত্রে” যুদ্ধে(দণ্ডনীতি)অবতীর্ণ হয়। এই যুদ্ধ ছিল ন্যায্য প্রাপ্তির যুদ্ধ অর্থাৎ ন্যায়ের যুদ্ধ। আর এই ন্যায়ের যুদ্ধকেই মহাভারতে বলা হয়েছে ধর্মযুদ্ধ। এখানে, ন্যায় ও ধর্ম সমার্থক। দেখুন, যে কাউকেই সমাজে বসবাস করতে হলে, তাঁকে আর দশজনের সাথে মিলেমিশে বসবাস করতে হয়। মানুষের মধ্যেকার পারস্পরিক সম্পর্ক যেমন তৈরি হয় তেমনি আবার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সংঘাত ও তৈরি হয়। ঠিক এই জায়গাটাতেই ন্যায়ের প্রশ্ন আসে। আমি যদি অপর ব্যাক্তির সাথে অন্যায় আচরণ করি, তবে তারও আমার প্রতি অন্যায় আচরনের অধিকার আছে, কারণ, আমি আগে অন্যায় আচরণ করে তাঁকে সে অধিকার দিয়েছি। এটা আইন শৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়। এটা নৈতিকতার প্রশ্ন ও অধিকারের প্রশ্ন। দুই বা ততোধিক ব্যাক্তির পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে যদি ন্যায় অনুপস্থিত হয়, তবে সম্পর্কের মধ্যে অন্যায় আসবে, একপাক্ষিকতা আসবে, বঞ্চনা আসবে, বৈষম্য আসবে। এই ধরনের সম্পর্কের মধ্যে কোন শ্রদ্ধাবোধ বা ভালবাসা তৈরি হয়না বরং শঠতা ও প্রতারনা তৈরি হয়। পরিণামে তা একটি সুস্থ, স্বাভাবিক সম্পর্কের অন্তরায় হয়, সুস্থ, স্বাভাবিক সমাজ ও জাতি গঠন অসম্ভব হয়ে পড়ে। অরাজকতা তৈরি হয়, মাৎস্যন্যায় তৈরি হয়, দুর্বলের উপর সবলের উৎপাত বৃদ্ধি পায়, পরিবার ও সমাজের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ ভেঙ্গে পড়ে এবং এর ফল অবশ্যম্ভাবী ধ্বংস। কুরুক্ষেত্রে কৌরবদের ধ্বংস হয়েছিল। আর বর্তমানে ক্ষয়িষ্ণু হিন্দুরা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
অতএব আবার দেখতে পাচ্ছি, ন্যায়স্বরূপ ধর্মের অনুপস্থিতি এবং নিশ্চিত ধ্বংস।
 ধর্মের সংজ্ঞাঃ
Dharma is an expression of “Ethical Principals” which uphold a cosmic order that harmonize the relationship “among men and also between men and broader nature” through combining both “materialistic development and spiritual enlightenment”, which, when practiced consciously ultimately leads to “Moksha” that is releasing oneself from the cycle of “birth and death”.
ধর্ম হল কর্তব্যকর্মের এমন এক নীতিমালা, যা এক মহাজাগতিক শৃঙ্খলার নির্দেশক, যা বৈষয়িক উন্নয়ন ও আধ্যাত্মিক জ্ঞ্যানকে একীভূত করে, মানুষে মানুষে এবং মানুষ ও বৃহত্তর প্রকৃতির মধ্যে সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্কের ঐকতান সৃষ্টি করে, যার সচেতন চর্চায় মোক্ষলাভের (জন্ম ও মৃত্যুর চক্র হতে মুক্তি) পথ সুগম হয়।
অতএব, আমরা দেখতে পাচ্ছি, ধর্ম বলতে কর্তব্যকর্ম সম্পাদনের নীতিকেই বোঝায়, যে নীতির আলোকে মানুষ তাঁর আর্থ ও কাম চরিতার্থ করবে, যে নীতিতে মানুষ তাঁর পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, বৃহত্তর মানবজাতি ও বৃহত্তর প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক স্থাপন করবে, তাঁদের কল্যাণে নিজের জীবন উৎসর্গ করবে, যে নীতির সচেতন চর্চায় তাঁর সুপ্ত মানবিক গুনগুলোকে সুষমামণ্ডিত করে তুলবে এবং ধাপে ধাপে তাঁর আধ্যাত্মিক সত্তাকে উপলব্ধি করবে, জীবাত্মা ও পরমাত্মার পার্থক্য দুরীভুত হবে।
কর্তব্যকর্ম ছেঁড়ে যারাই মোক্ষের প্রত্যাশায় লালায়িত হবে, সংসার ছেঁড়ে, সংসারের প্রতি দায়িত্ব ছেঁড়ে যারাই আধ্যাত্মিকতার চর্চা করতে যায়, তাঁরা অধার্মিক। ধর্ম ও ধার্মিক সমাজের চোখে তাঁরা অনাকাঙ্ক্ষিত ও অথর্ব। তাঁরা মানবজাতির কাছে ভারসম। আবার যারা কর্তব্যকর্ম ছেঁড়ে কেবলমাত্র আত্মসর্বস্ব জীবনযাপন করেন, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র চুলোয় যাক, আপনি বাচলে বাপের নাম, কর্তব্য এড়াতে যারা কখনও দর্শনের নামে, কখনও বিশ্ব মানবতার নামে, কখনও অহিংসার নামে কঠিন বাস্তবতাকে অস্বীকার করেন, তারাও সমান অধার্মিক, শঠ, প্রতারক এবং তারাও ধর্মের চোখে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অথর্ব। এরাও মানবজাতির কাছে অপ্রয়োজনীয় ও ভারসম।
কেবল যারা যোগী (কর্মযোগী), যারা পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, সভ্যতা, ন্যায় অন্যায়, রাজনীতি, আর্থসামাজিক চাপানউতর এর মধ্যে শান্ত, সংযত, কর্তব্যপরায়ণ ও ধীসম্পন্ন থাকেন, ধর্মে অবিচল থাকেন, ধর্ম প্রতিষ্ঠায় অবিচল থাকেন, ধর্ম প্রচার, প্রসার ও রক্ষায় বাঘের ন্যায় ক্ষিপ্র, সাহসী, ধৈর্যশীল ও বলবান থাকেন, যেকোনো বাঁধার সামনেই অভিযোগশুন্য, অকুতোভয়, সাত্ত্বিক ও বলীদানে প্রস্তুত থাকেন তাঁরাই প্রকৃত ধার্মিক। এঁদের হাতেই ধর্মের প্রতিষ্ঠা হয়, ধর্মের সুরক্ষা হয়, অপরাপর মানুষের, সমাজের, সংস্কৃতির ও সভ্যতার সুরক্ষা হয়। এঁরাই (পুরুষ ও স্ত্রী উভয়ই) নেতৃত্ব দানের যোগ্য, এঁরাই সহজাত নেতা হন। এঁদের সংখ্যা কম হতে পারে, কিন্তু এঁদের প্রভাবই সমাজকে, সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। এরা যেকোনো কেউ বা যে কোন পেশার হতে পারেন।
এঁরা সকলে যেক্ষেত্রে এক কাতারে দাঁড়ান, তা হল ধর্মের প্রতি অনন্যসাধারণ চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞা, অসাধারণ শক্ত মানসিকতা, প্রজ্ঞ্যা, ধী এবং সর্বোপরি যা তাঁদের বাকী সবার চাইতে অনন্য ও আলাদা করে, বাকী সবার চোখে তাঁরা নায়ক/ নায়িকার আসনে অধিষ্ঠিত হন, তা হল যেকোনো বৃহত্তর স্বার্থে নিঃশঙ্ক চিত্তে “আত্মত্যাগের” ক্ষমতা।

Advertisements

জবালার পুত্র সত্যকাম।


Image result for satyakama jabala

সত্যকাম বাল্য পার হয়ে কৈশোরে পা দিয়েছে। তখন একদিন মাকে বলল সত্যকামঃ মা, ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করে গুরুগৃহে পড়াশুনা করতে যাব। তুমি অনুমতি দাও।”
মা পুত্রকে আশীৰ্বাদ করে দিনক্ষণ দেখে গুরুগৃহে পাঠিয়ে দিলেন। সত্যকাম গৌতমবংশীয় হারিদ্রুমত নামক এক গুরুর গৃহে গিয়ে উপনীত হয়ে তার মনের অভিপ্রায় জানাল। সবিনয়ে সত্যকাম বললঃ
মহাশয়! আপনার গৃহে থেকে আপনার নিকট আমি পড়াশোনা করতে চাই—আপনি অনুমতি দিন।
শান্তস্বরে গুরু বললেনঃ
‘তোমার পরিচয় কী আর গোত্র কী বৎস?’
সত্যকাম পিতার নামও জানে না, কোন গোত্র তাও জানে না। বাড়ি ফিরে এসে সে তার মাকে জিজ্ঞেস করলঃ মা, আমার কোন গোত্র?
জবালা তার মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে বললেনঃ ‘বাবা! আমি বহুজনের সেবা করে তোমায় লাভ করেছি। তোমার পিতার পরিচয় কিংবা গোত্র তো আমার জানা নেই।’

সত্যকাম আবার ফিরে গেল গুরুগৃহে। তারপর মা তাকে যা বলেছিলেন, তাই সে জানাল গুরুকে। গুরু হারিদ্রুমত সত্যকামের এই সরল ও সত্য কথা শুনে বললেনঃ
‘ব্রাহ্মণ ছাড়া আর কেউ এমন সত্য কথা বলতে পারে না। কাজেই তুমিই প্রকৃত ব্রাহ্মণ। তোমার মাতার নাম জবালা—তোমার গোত্র হল জাবাল। তুমি আজ থেকে সত্যকাম জাবাল বলে পরিচিত হবে।’
এই বলে গুরু তাকে আশীৰ্বাদ করলেন এবং বললেন যে তার উপনয়ন দিয়ে তাকে ব্রাহ্মণ করবেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি সত্যকামকে লক্ষ করে বললেনঃ
বৎস! তুমি যে সত্যভ্রষ্ট হওনি, সেজন্য আমি খুবই, খুশি হয়েছি। তুমি যজ্ঞের জন্য কাঠ নিয়ে এসো— আমি তোমার উপনয়ন দেব।’
সত্যকাম গুরুর আদেশে অরণ্যে গিয়ে যজ্ঞের জন্য কাঠ কুড়াল, তারপর কাঠ নিয়ে গুরুগৃহে ফিরে এলে গুরু সেই কাঠে যজ্ঞ করে তার গলায় পৈতে পরিয়ে দিলেন—সত্যকাম ব্রাহ্মণ হল।
তারপর গুরু সত্যকামকে চারশ ক্ষীণ ও দুর্বল গোরু পৃথক করে দিয়ে তাকে লক্ষ করে বললেনঃ ‘এই গাভিগুলির ভার তোমায় দিলাম—তুমি এদের চরিয়ে নিয়ে এস।” গুরুর আদেশে সত্যকাম সেই চারশ’ গরু নিয়ে বনের পথে রওনা হল, আর মনে মনে ভাবলঃ এই চারশ’ গরু হাজারে পরিণত না হওয়া পর্যন্ত আমি গুরুগৃহে ফিরব না।’ সত্যকাম বনে চলে গেল। দীর্ঘকাল সে বনে বনেই কাটাল—তারপর একদিন গরুর সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াল হাজারে!
সত্যকামের শ্রদ্ধা ও তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে তাকে অনুগ্রহ করবার জন্য বায়ুদেবতা এক ষাঁড়ের দেহ আশ্রয় করে সত্যকামকে বললেনঃ
সত্যকাম, গুনে দেখ, আমরা এখন সংখ্যায় হাজার পূর্ণ হয়েছি—এবার আমাদের গুরুগৃহে নিয়ে চল। এই বলে বৃষস্থিত বায়ুদেবতা আবার বললেনঃ সত্যকাম, তোমাকে ব্রহ্মজ্ঞান বিষয়ে কিছু উপদেশ দিতে চাই। সবিনয়ে সত্যকাম বললেনঃ
দয়া করে বলুন, প্রভু।
তখন বৃষরূপী বায়ুদেবতা বললেনঃ
পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ—এই চার দিককে ব্রহ্মের চার অংশ বলে জানবে। যিনি ব্রহ্মকে এইভাবে উপাসনা করেন, তিনি দেবলোক জয় করতে পারেন। এ বিষয়ে অগ্নিও তোমাকে উপদেশ দেবেন।
পরদিন সত্যকাম হাজার গরু নিয়ে গুরুগৃহে ফিরে গেল। তারপর সন্ধ্যা এসে গেছে দেখে গরুদের বেঁধে রেখে যজ্ঞকাষ্ঠ দিয়ে আগুন জ্বালাল। তারপর অগ্নির পশ্চাতে পূর্বমুখী হয়ে বসল । তখন অগ্নি তাকে বললেনঃ
‘সত্যকাম! আমি তোমাকে ব্রহ্ম সম্বন্ধে কিছু উপদেশ দেব। পৃথিবী, আকাশ, স্বৰ্গ আর সমুদ্ৰ—এরা ব্রহ্মের চার অংশ। যাঁরা এভাবে ব্রহ্মের উপাসনা করেন, তারাই পরলোকে জয়ী হন। এ বিষয়ে হংস তোমায় আরও উপদেশ দেবেন।”

পরদিন সত্যকাম আবার গাভিদল চরিয়ে সন্ধ্যাকালে গুরুগৃহে ফিরে এল। তারপর গরু বেঁধে যজ্ঞকাষ্ঠে আগুন জ্বেলে পূর্বমুখী হয়ে বসল। –
তখন সূর্য হংসরূপে সেখানে উড়ে এসে বললেনঃ সত্যকাম, আমি ব্রহ্ম বিষয়ে তোমায় কিছু উপদেশ দেব, শোন। অগ্নি, সূর্য, চন্দ্র আর বিদ্যুৎ—এরা ব্রহ্মের চার অংশ। যারা এভাবে ব্রশ্নের উপাসনা করেন, তারাই পরলোকে চন্দ্রলোক ও সূর্যলোক জয় করতে পারেন। এ বিষয়ে মদগু তোমায় আরও উপদেশ দেবেন।
এই বলে হংস উড়ে চলে গেলেন। পরদিন আবার দিনমানে গরু চরিয়ে সন্ধ্যাকালে সত্যকাম গুরুগৃহে ফিরে এসে অন্যদিনের মতোই গরু বেঁধে আগুন জেলে পূর্বমুখী হয়ে বসলেন।
তখন মদগু নামে এক জলচর পাখি উড়ে এসে বললেনঃ সত্যকাম! ব্রহ্ম বিষয়ে কিছু উপদেশ দেব—শোন! প্রাণ, চক্ষু, কর্ণ আর মন—এরা ব্রহ্মের চার অংশ। যারা এভাবে ব্রহ্মের উপাসনা করেন—তারাই পরলোকে জয়ী হন।’
এই বলে মদগু-রূপী জলদেবতা উড়ে চলে গেলেন। সত্যকাম এই ভাবে ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করবার পর তার দেহে অপূর্ব এক জ্যোতি দেখা দিল। পরদিন সন্ধ্যায় গরুর দল নিয়ে সত্যকাম গুরুগৃহে ফিরে এলে পর তাঁর দিকে তাকিয়ে গুরু হারিদ্রুমত অবাক হয়ে গেলেন তারপর সত্যকামকে লক্ষ করে বললেনঃ
সত্যকাম—তোমার দেহে ব্ৰহ্মতেজ বিদ্যমান দেখছি। কোন ব্যক্তি তোমায় উপদেশ দিযেছেন—সত্য করে বল |’ –
সত্যকাম সবিনয়ে বললেনঃ ‘প্রভু, আমি গুরুত্যাগ করিনি। অপর কোনো মানুষের কাছে আমি উপদেশ পাইনি। যাদের কাছ থেকে পেয়েছি—তারা কেউ মানুষ নন। আপনার কাছ থেকেই প্রকৃত ব্ৰহ্মজ্ঞান লাভ করতে চাই—উপদেশ দিন প্রভু।
তখন গুরু হারিদ্রুমত সত্যকামকে ব্রহ্মবিষয়ে পুনরায় উপদেশ দিলেন। পূর্বে সত্যকাম যে সমস্ত জ্ঞান লাভ করেছিলেন, গুরুর নিকটও সেই উপদেশই পেলেন।
সত্যকাম কালক্রমে একজন প্রকৃত ব্রহ্মজ্ঞাণী হয়ে উঠলেন।

কর্ম ও ভক্তি


কর্ম ও ভক্তি

কর্ম বলতে যে সকল কার্য্য লোকে ইহজন্মে ও পরজন্মে নিজ সুখভোগের আশায় করে কিংবা এই দেহকে ‘আমি’ বুদ্ধি করে এর সম্পর্কে যে যে ব্যক্তিকে আপনজ্ঞান করে, তাদের সুখের জন্য করে, সেগুলিকে বুঝায়। আর ভগবানের সেবা উদ্দেশ্য করে যা কিছু করা যায়, তাই ভক্তি। একই কার্য্য ক্ষেত্রবিশেষে কর্ম হতে পারে অন্য ক্ষেত্রে ভক্তি হতে পারে, কর্ত্তার চিত্তবৃত্তি অনুসারে তার কর্মত্ত্ব বা ভক্তাঙ্গত্ত্ব। স্বর্গকামনার বশে কৃত হয়, তখন সেগুলি কর্ম।

আমরা কর্মফল ভোগ করতে বাধ্য। কর্ম আমাদের বন্ধন যোগ্যতা বৃদ্ধি করে আমাদেরকে সংসার ভোগ করায়। কর্মে সুখের সঙ্গে সঙ্গে দুঃখও অনুস্যুত আছে। সংসারে এমন কোন সুখ নেই, যার পিছনে দুঃখ লুকিয়ে থাকে না। সংসারে সুখভোগে শান্তি নেই। ভোগ করলে কাম বাড়ে। আর কামনার অতৃপ্তিতে দুঃখ আছেই। নিরবিচ্ছিন্ন সুখ সংসারে থাকতেই পারে না। স্বর্গসুখেও তো কামনার শেষ নেই। ইন্দ্র-চন্দ্রকে পাপ কর্মে লিপ্ত হতে হয়। আবার পুণ্য শেষ হলে স্বর্গচ্যুত হয়ে অধঃপতিত হয়।

‘ভক্তিই আমাদের নীতিবৃত্তি। ভগবান নিত্য চিদঘনবিগ্রহ, জীবের স্বরূপও চিৎ। এই স্থানে ভগবান ও জীবে নিত্য অভেদ। এ জগতে জীব অচিৎসংস্পর্শে স্থাবর-জঙ্গমত্ব প্রাপ্ত হয়ে সংসার ভোগ করছে। নির্ম্মল চিৎকণা জীব হরিসেবারত।’ এই জ্ঞানের সন্ধান পেয়ে যখন জীব শ্রদ্ধাসহকারে নিকিঞ্চন ভক্তের পাদাশ্রয় করে শ্রবণ কীর্ত্তনাদি ভক্তাঙ্গগুলি সাধন করতে থাকে, তখন জীবের সংসারক্ষয় হয়ে জড়মুক্তিক্রমে অনর্থ্যনিবৃত্তি ঘটে। তখন নিষ্ঠা, রুচি, আসক্তি, ভাবক্রমে জীব ভগবত প্রেমের অধিকারী হয়। এই প্রেমই পরমপ্রয়োজন, পরমপুরুষার্থ। ভক্ত ধর্ম, অর্থ, কাম-এই ত্রিবর্গাত্মক কর্ম এবং মোক্ষঅভিসন্ধানরূপ অপবর্গ-এই চার পুরুষার্থকে নরকসদৃশ জ্ঞান করে অহৈতুকী ভক্তির যাজন করেন।

অনেকের ধারণা, কর্ম করতে করতে তারই ফলরূপে ভক্তি আসবে, যেহেতু কর্মীরাও হরিপুজাদি করে থাকেন। কিন্তু ভগবত-সিদ্ধান্ত তা নয়। কর্ম করতে করতে কেবল কামনার বৃদ্ধি হতে থাকে। সুতরাং কর্মের ফল কিভাবে ভক্তি হতে পারে? কর্মে যে ভক্তির মত কিছু অনুষ্ঠান দেখা যায়, উহা কর্মাঙ্গ, ভক্তি নয়। ভগবান আমাদের নিত্যসেবা, সুতরাং আমাদের সকল ভোগবাঞ্ছা পরিহার করে ভগবানেরই সেবা করা কর্ত্তব্য-এই বুদ্ধিতে পরিচালিত হয়ে কর্মিগণ ভক্তির আশ্রয় গ্রহণ করেন নাই। তাঁদের চাই নিজের ভোগ। সেই সাধনের জন্য আনুষ্ঠানিক ক্রিয়ায় কিছু ভক্তির আভাস আছে। এই যে ভক্তি, ইহা ভক্তের অহৈতুকী ভক্তি নয়, ইহা কর্মাঙ্গ। সুতরাং ইহা দ্বারা ভক্তিলাভ হতে পারে না।

শ্রীধ্রুব মহারাজের কথা হতে আমরা জানতে পারি, যদিও তিনি রাজ্যলাভের জন্য ভগবানের আরাধনা করেছিলেন, তাহলেও তিনি পদ্মপলাশলোচন অনাথনাথ ভগবান আছেন, এই বিশ্বাস্ব ভক্তি পথ গ্রহণ করেছিলেন, কর্মাঙ্গের অন্যতম অনুষ্ঠানরূপে অনিত্য ভক্তির আবাহন করেন নাই। ভগবানের জন্য তাঁর প্রাণ কেঁদেছিল, তবে রাজ্যলাভরূপ দুর্ব্বাসনা তাঁর চিত্তে ছিল। পরে ভগবান্‌ কৃপা করিয়া তাঁহাকে দেবর্ষি নারদের সঙ্গ করিয়ে তাঁহার দুর্ব্বাসনা দূর করে তাঁকে শুদ্ধভক্তি প্রদান করেন। শ্রীপ্রহলাদ মহারাজের ভক্তি আদৌ মিশ্রা ছিল না। গর্ভবাসকালেই তিনি দেবর্ষির সঙ্গ পেয়েছিলেন। সুতরাং কোন কামনা তাঁর চিত্তকে কুলষিত করতে পারেনি। সাধুসঙ্গের এমনই ফল। সাধুসঙ্গ ব্যতীত আমাদের শুদ্ধ ভক্তিলাভের আর অন্য উপায় নেই।

সংকলনে- দাসানুসার #কৃষ্ণকমল।

 

আষাঢ়ে প্রভু জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা


আষাঢ়ে প্রভু জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা
শ্রীমৎ নারায়ণ পুরী মহারাজ

রথযাত্রায় লোকারণ্য, মহা ধুমধাম। ভক্তেরা লুটিয়ে প্রণাম করছে। জগদীশ্বর জগন্নাথ অগ্রজ বলভদ্র ও ভগিনী সুভদ্রাকে সঙ্গে নিয়ে রথারোহণ করেছেন। তিনি মন্দিরের রত্নবেদী থেকে ভক্ত দর্শনে জনপথে নেমে এসেছেন। তিনি যে ভক্তাধীন, ভক্তপ্রিয়; ভক্তেরই ভগবান।
আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথির পুণ্যদিনে এই রথযাত্রা উৎসব হয় প্রতিবছর। জনতা জনার্দনের রথের রশি টেনে নিয়ে যায়। ভক্ত না হলে ভগবানের চলে না।
অন্তর্যামী চিরদিন অন্তরে থাকেন, লীলা করেন। এই সেই দেবতা যিনি জনারণ্যে বেরিয়ে আসেন। শাস্ত্রে আছে, ‘রথে তু বামনং দৃষ্টা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে’। হৃদয় গুহায় যে আত্মা বিরাজ করেন তাঁকে দেখলে পুর্নজন্ম আর হয় না। ‘পুনরপি জননং পুনরপি মরণং’ অর্থাৎ পুনরায় জননী জঠরে শয়ন আর হয় না।
তখন জন্ম মরণ থেকে চিরদিনের জন্য অব্যাহতি পায়। রথযাত্রা উৎসবের গভীরে এই তত্ত্বই অন্তর্নিহিত। কবির ভাষায় : রথ ভাবে আমি দেব/পথ ভাবে আমি/উভয়ের কথা শুনে হাসেন অন্তর্যামী।
চট্টলার বুকে পাহাড় শিখরে স’াপিত তুলসীধামে শ্রীশ্রী মদনমোহন নরসিংহ গোপাল জীও’র মন্দিরে জগন্নাথ-সুভদ্রা ও বলরামের শ্রী বিগ্রহ অনেক দিন থেকে নিত্য পূজিত।
১৮শ’ খৃষ্টাব্দের পর থেকে তুলসীধামে রথযাত্রা উৎসবের প্রচলন শুরু হয়। জগন্নাথ তো স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। রথযাত্রার এই শুভদিনে মহানির্বাণতীর্থ তুলসীধাম পরিণত হয় ভক্ত আর ভগবানের মহামিলন তীর্থে। শ্রীশ্রী জগন্নাথের দর্শন অভিলাষী হাজার হাজার আবালবৃদ্ধ ভক্তপ্রাণের সমাবেশ ঘটে। রথযাত্রা উৎসবের মূল কেন্দ্র শ্রীক্ষেত্র পুরীর পুরুষোত্তম ধাম। এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গ্রামে-গঞ্জে-নগরে জগন্নাথ রথ পরিক্রমায় বের হন।
পুরীধামে তিন দেবতা তিনটি রথে আরোহণ করেন। সবার পেছনের রথখানিতে থাকেন শ্রী জগন্নাথ। অন্যত্র একই রথে তিনজন। এই রথের রশি ধরার জন্য কতো হুড়োহুড়ি।
এসবের মূল বিষয় দেবতার কৃপা লাভ ও পুণ্য অর্জন। ঋষি শিল্প গভীর তত্ত্বাবগাহী। কে এই জগন্নাথ? তিনি জগতের নাথ বা প্রভু। জগতের ধারক, বাহক ও পরম পালক। তারপরের অবস’ানে সুভদ্রা। লৌকিক জগতে পরম প্রভু পুরুষোত্তমের ভগ্নি। সু অর্থ সুন্দর।
ভদ্র অর্থে কল্যাণ ও মঙ্গল। সুভদ্রা হচ্ছেন শুভ ও সুন্দরের প্রতীক। সুভদ্রার পরে বলরাম। বলরাম ত্রাণশক্তি। শ্রীমৎ ভগবৎ গীতা ও উপনিষদে পরব্রহ্মের স্বরূপ সম্বন্ধে বলা হয়েছে ‘সর্বেন্দ্রিয় গুণাভাসং সর্বেন্দ্রিয় বিবর্জিতম্‌’। ইন্দ্রিয়গ্রাম না থাকলেও তাঁর মধ্যে সব ইন্দ্রিয় ও গুণের আভাস আছে। ইন্দ্রিয় বিরহিত হয়েও তিনি সবকিছু দর্শন, স্পর্শ, শ্রবণ করতে পারেন। চরণ না থাকলেও সর্বত্র বিচরণ করতে পারেন।
যজুর্বেদের দু’টি ভাগ। শুক্ল যজুর্বেদ ও কৃষ্ণ যজুর্বেদ। কৃষ্ণ যজুর্বেদের অন্তর্গত কঠোপনিষদ হলো যম-নচিকেতা সংবাদ। যম নচিকেতাকে আত্মতত্ত্বের সংবাদ দিয়ে বললেন-‘‘আত্মানং রথিনং বিদ্ধি শরীরং রথমেবতু। বুদ্ধিং তু সারথি বিদ্ধি মন প্রগ্রহমেব চ ॥ ইন্দ্রিয়ানি হয়ানাঞ্চ বিষয়াংসে’ষু গোচরান। আত্মেন্দ্রিয় মনোযুক্ত ভোক্তত্যাহর্মনীষিনং ॥” অর্থাৎ, হে নচিকেতা! আত্মাকে রথী, শরীরকে রথ, বুদ্ধিকে সারথি, মনকে বল্গা ও ইন্দ্রিয়বর্গ সেই রথের অশ্ব এবং দেহ, মন ইন্দ্রিয়যুক্ত আত্মাই সব কিছুর ভোক্তা।
আমাদের জীবনের দুইদিকে আছে জীবাত্মা ও পরমাত্মা। জীবাত্মা ষড়রিপুর জালে জড়িয়ে পড়ে সবকিছু ভোগ করতে চায়। মন যদি বল্গাহারা, চঞ্চল ও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে তবে তার লাগাম টেনে ধরা চাই। মন বেপরোয়া হলে বিপদ ঘটে। মন ইন্দ্রিয়ের অধিপতি। ইন্দ্রিয়গ্রামের লাগাম টেনে না ধরলে সে রথচক্র দুরন্ত বেগে ছুটতে গিয়ে ভেঙ্গে পড়বে। দেহপুরে আত্মারূপে যিনি বিরাজ করেন তাঁকে জানাই দুঃখমুক্তি ও আনন্দ লাভের উপায়। রথের সারথি ভগবান যদি দেহরথখানি পরিচালনা করেন, সাধক তখন আনন্দ সাগরে ভাসেন। দেহমন তখন আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। যোগ সঙ্গীতের বর্ণনায় আছে-
দেহ কুরুক্ষেত্র মাঝে বিরাজে নর নারায়ণ,
দশদলে ধনঞ্জয় দ্বিদলে মধুসূদন।
কৌরবরা যত সৈন্য ইন্দ্রিয় রূপেতে গণ্য,
প্রকাশে যুদ্ধ নৈপুণ্য মানে না কারও শাসন।
দেহ ইন্দ্রিয় কোন শাসন মানতে চায় না। আপথে-বিপথে চলে আসক্তির কানা গলিতে পথ হারায়। আত্মশক্তির ক্ষয় করে ফেলতে চাইলেও দেহের ভগবৎ শক্তি বিরাজমান থাকে। সেই শক্তিকে চিনে নিতে পারার মধ্যে রয়েছে জীবনের সার্থকতা।
রথ থেমে যায়, যদি রথ সারথিবিহীন হয়। মন্দিরে যদি মাধব না থাকে তবে কোন পূজা চলে না। অপশক্তি ততদিন সক্রিয় থাকে, যতদিন ভগবানে আত্ম সমর্পিত হতে না পারি। কালের স্মরণী ধরে জগন্নাথের রথযাত্রা নিত্য চলছে। সে পথে দেহ রথকে পরিচালনা করার মধ্যে নিহিত আছে রথযাত্রার সফলতা।

লেখক : অধিপতি-ঋষিধাম,
মোহন্ত মহারাজ-তুলসীধাম, চট্টগ্রাম।