বৈদিক সাহিত্যে কল্পসূত্র


কল্পসূত্র

শুল্ব, শ্রৌত, গৃহ্য, ও ধর্ম সূত্রগুলিকে একত্রে কল্পসূত্র বলা হয়। এদের রচনাকাল খ্রীষ্টপূর্ব ৫০০-৪০০ থেকে খ্রীষ্টাব্দ ৩০০ বা তারও কিছু পরে। শুল্বসূত্র ছাড়া বাকী তিনটি সূত্র সাহিত্যের মূল বিষয় বিভিন্ন ধর্মীয় আচার ও প্রণালী।

শুল্বসূত্র

শুল্বসূত্রের আলোচ্য বিষয় হচ্ছে জ্যামিতি ও গণিত, যা যজ্ঞবেদী নির্মাণের কাজে ব্যবহৃত হত। এতে আছে বিভিন্ন জ্যামিতিক আকার, তাদের সম্বন্ধীয় সূত্রাবলী ও কিছু বীজগণিতের ব্যবহার। প্রসঙ্গত, শুল্ব কথাটির অর্থ হচ্ছে মাপবার ফিতে।

শ্রৌতসূত

শ্রৌত সূত্র গুলি মূলত যথাযথ নির্দেশসহ বিভিন্ন যজ্ঞানুষ্ঠানের প্রণালী বিশদ ভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। শ্রৌত সূত্র গুলিকে প্রচলিত ভাবে এক একটি বেদের সাথে যুক্ত করা হয়। যেমন ঋগ্বেদ শ্রৌতসূত্রের নাম আশ্বলায়ন ও শাঙ্খায়ন। এছাড়াও বিভিন্ন বেদের সংযুক্ত বৌধায়ন, বাধুল, ভারদ্বাজ, আপস্তম্ব, হিরণ্যেকেশী ও বৈখান্‌স, কাত্যায়ন, লাট্যায়ন, দ্রাহ্যায়ণ, জৈমিনীয়, মৈত্রায়ন বা মানব ইত্যাদি নামের শ্রৌতসূত্রে খোঁজ পাওয়া যায়। এদের মধ্যে বৌধায়নের শ্রৌতসূত্র প্রাচীনতম ও বৈখান্‌স নবীনতম মনে করা হয়। অধিকাংশ শ্রৌতসূত্রগুলির বিভিন্ন অধ্যায়কে প্রশ্ন নামে অভিহিত করা হয়েছে, যার থেকে বোঝা যায় যে এদের বিষয়বস্তু পুরোহিত/ঋষি ও ছাত্রের মধ্যে প্রশ্নোত্তরের ছলে ব্যাখ্যা করা। সামবেদীয় শ্রৌতসূত্র গুলিতে সামগানের প্রণালী ব্যাখ্যা করা আছে।

গৃহ্যসূত্র

শ্রৌতসূত্রগুলিতে যেমন প্রধান কোনো গোষ্ঠীর মঙ্গলের জন্য যজ্ঞানুষ্ঠান, তেমনি গৃহ্যসূত্রগুলিতে একক গৃহস্থ্যের জন্য বিভিন্ন অনুষ্ঠানের বিশদ প্রণালী ব্যাখ্যা করা আছে। শিশুর জন্ম থেকে মৃত্যুর পর পারলৌকিক ক্রিয়া পর্যন্ত বিভিন্ন অনুষ্ঠানের পদ্ধতির দীর্ঘ তালিকা আছে গৃহ্যসূত্রগুলিতে। যেমন নবজাত শিশুর জাতকর্ম, আদিত্যদর্শন, নামকরণ, অন্নপ্রাশন, চূড়াকরণ, উপনয়ন। তারপর গুরুগৃহে বেদাধ্যয়ন, অনধ্যায় ও শেষে সমাবর্তন। তারপর গৃহস্থ আশ্রমে বিবাহ অনুষ্ঠানের বিভিন্ন পদ্ধতি, পাণিগ্রহণ, অগ্নিপরিগ্রহণ, সপ্তপদী, লাজহোম, ইত্যাদি। নারীদের গর্ভাবস্থার বিভিন্ন অনুষ্ঠান যেমন পুংসবন, সীমন্তোন্নয়ন, ইত্যাদি। এছাড়াও গৃহ্যসূত্রগুলিতে গার্হপত্য অগ্নি প্রজ্বলন বিধি, প্রায়শ্চিত্ত, কূপ ও দীঘি খনন, হলকর্ষণ, ইত্যাদি লোকাচারের নির্দেশ আছে। আশ্চর্যের ব্যাপার, যে এই তালিকার প্রচুর আচার এখনো হিন্দু সমাজে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

শ্রৌত সূত্রের মত গৃহ্য সূত্রেরও বিভিন্ন শাখা আছে যাদের চার বেদের সাথে যুক্ত করা হয়। ঋগ্বেদের আশ্বলায়ন ও শাঙ্খায়ন, শুক্লযজুর্বেদের বাজসেনয় ও পারস্কর, কৃষ্ণযজুর্বেদের তৈত্তিরীয় সংহিতার বৌধায়ন, ভারদ্বাজ, আপস্তম্ব, প্রভৃতি, সামবেদের গোভিল, জৈমিনীয়, খাদিল ইত্যাদি। অথর্ববেদের কৌশিক সূত্র, যা শ্রৌতসূত্র ও গৃহ্যসূত্রের মিশ্রণ। এদের মধ্যে রচনাকাল হিসেবে আশ্বলায়ন, বৌধায়ন, গোভিল প্রাচীনতম এবং জৈমিনীয়, খাদিল নবীনতম।

ধর্মসূত্র

ধর্মসূত্র গুলিকে সেকালের সমাজনীতি বলা যায়। পরে স্মৃতিসাহিত্য গুলি (মনুস্মৃতি, পরাশরস্মৃতি, নারদস্মৃতি, যাজ্ঞবল্ক্যস্মৃতি ইত্যাদি) যখন লেখা হয়, মনু এই সমাজনীতিগুলিকে যথার্থ ভাবে বিধিবদ্ধ করেছিলেন, যা ব্রিটিশরা ভারতে আসা অবধি অটুট ছিল। এদের রচনাকাল অন্যান্য সূত্র সাহিত্যগুলির সমসাময়িক ও বিভিন্ন শাখাগুলিও অনুরূপ। সামবেদীয় গৌতম ধর্মশাস্ত্র সম্ভবত প্রাচীনতম। এতে দীক্ষানুষ্ঠান থেকে শুরু করে প্রায়শ্চিত্ত, শুদ্ধিকরণ, ব্রহ্মচর্য ও অন্যান্য চতুরাশ্রমের বিধি, এর দশম অধ্যায়ে দেওয়ানী ও ফৌজদারী আইন ও সাক্ষ্যদান সম্পর্কিত আইন লিপিবদ্ধ আছে। বৌধায়ন ধর্মসূত্র, যা পণ্ডিতেরা মনে করেন দাক্ষিণাত্যে উদ্ভূত, গৌতম ধর্মশাস্ত্র থেকে অনেক জায়গা পুনরুক্তি করেছে। এতেও আছে চতুরাশ্রম বিধি, খাদ্য সম্বন্ধে বিধি নিষেধ, পাপ অপরাধ ও শাস্তি। বশিষ্ঠ ধর্মশাস্ত্রে আছে পাপের জন্য সমাজ থেকে বহিষ্কার ও তপস্যার মাধ্যমে পাপক্ষয়ের উল্লেখ। আপস্তম্ব ধর্মশাস্ত্রে সমাজে বর্ণভেদ সম্পর্কে কঠোর মনোভাব প্রকাশ করা আছে ও বর্ণভেদই যে ধর্ম সে রকম বলা আছে। একটি চিত্তাকর্ষক তথ্য এতে আছে – গোমাংস খাওয়া নিয়ে অকুণ্ঠ অনুমোদন।

আগেই বলেছি, সূত্র সাহিত্যগুলি লেখার সময় ভারতের ইতিহাসে কি রকম পরিবর্তন চলছিল। বৈদিক যুগ থেকে সমাজব্যবস্থার প্রচুর পরিবর্তন এসেছিল। লোহার ব্যবহার, উন্নততর অস্ত্র, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হওয়াতে, বাণিজ্যের প্রসার হয়েছিল ও ধনী শ্রেষ্ঠী শ্রেণীর উদ্ভব হয়েছিল, বিভিন্ন বৃত্তির প্রচলন হয়েছিল, এর ফলে অর্থসম্পদের কেন্দ্রীকরণ সম্ভব হয়েছিল। রাজা ও রাজ্যের কর্তব্য সঠিক ভাবে নিরূপণের জন্য নিয়মাবলীর প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। কর্মফল ও জন্মান্তরবাদ এই যুগে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল ও পাপ-পুণ্য, সামাজিক রীতি-নীতি গুলিকে ব্যাখ্যা করার পক্ষে এই দুই মতবাদ খুব সুবিধাজনক হয়ে পড়েছিলে।

কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ব্রাহ্মণশ্রেণীর হাতে সমাজের নীতি ও আইন নির্ধারণের ক্ষমতা। এতে ব্রাহ্মণকূল সমাজের প্রভু হয়ে দাঁড়িয়েছিল ও শূদ্রগণ সবচেয়ে অবহেলিত ও নিপীড়িত শ্রেণী হয়ে পড়েছিল। তাদের মানুষ বলে গণ্যই করা হত না। আরো একটি সামাজিক অবক্ষয় সে যুগে দেখা যায় – নারীদের প্রতি ক্রমেই অশ্রদ্ধার ভাব – তাদের সমাজে হীনতর বলে মনে করা আছে। নারীদের অধিকার ক্রমশই কমে আসছিল, সামান্য অপরাধে তাদের গুরুতর শাস্তি বিধান ছিল।

প্রকৃত সাহিত্য সমাজের দর্পণ। ঋগ্বেদ থেকে সূত্রসাহিত্য, এর মাঝে সমাজ, সংস্কৃতি, ভাষা, রাজনীতি, অর্থনীতি – এই সমস্তই বদলেছে, কালের অমোঘ নিয়মে। বৈদিক সাহিত্যের ঋষিকবিদের রচনায় সমাজের এই ক্রমবিবর্তন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রতিফলিত হতে দেখি। তাই বৈদিক সাহিত্য সঠিক ভাবে বুঝতে গেলে, সমাজের পরিপ্রক্ষিতে তার ব্যাখ্যা করতে হয়, যেটা সুকুমারী ভট্টাচার্য সফলভাবে করে দেখিয়েছেন।

(এই প্রবন্ধটি প্রধানত সুকুমারী ভট্টাচার্যের লেখা “ইতিহাসের আলোয় বৈদিক সাহিত্য” বইটি অবলম্বনে রচিত।)

কৃতজ্ঞতায়-

দিলীপ দাস

অবসর নেট।

Advertisements

বৈদিক সাহিত্যে বেদাঙ্গসূত্র(শিক্ষা নিরুক্ত ব্যাকরণ ছন্দ জ্যোতিষ )


প্রধানত বেদাঙ্গগুলিকে ছয় ভাগে ভাগ করা হয় –  শিক্ষা, ব্যাকরণ, ছন্দ, নিরুক্ত, জ্যোতিষ ও কল্প। কল্পসূত্রগুলি ধর্মবিষয়ক, এদের আবার চার ভাগে ভাগ করা হয় ধর্ম, শ্রৌত, গৃহ্য ও শুল্ব। ভাষা, আঙ্গিক ও বিষয়বস্তুর দিক থেকে বিচার করে পণ্ডিতেরা সূত্রগুলি খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম থেকে তৃতীয় খ্রীষ্টাব্দর মধ্যে লেখা হয়েছিল মনে করেন। সূত্র রচয়িতাদের অধিকাংশদের নামের শেষে অয়ন থাকার জন্যে, যেমন বৌধায়ন, আশ্বলায়ন, অনেকে মনে করেন এঁরা কোনো এক গোষ্ঠীর সাথে যুক্ত ছিলেন।

বেদাঙ্গসূত্রগুলি আখ্যান, দেবস্তুতি বা দেবকাহিনীর জন্য লেখা হয় নি, তাই তাদের স্মৃতিতে রাখা কঠিনতর ছিল। তাই এতে শব্দসংক্ষেপ করে বাহুল্যবর্জিত এক আঙ্গিক দেখতে পাওয়া যায়, যা প্রায় সাংকেতিক পর্যায়ে পৌঁছেছিল, উপযুক্ত ভাষ্য ব্যতীত যাদের অর্থবোধ দুষ্কর হয়ে পড়ে। ভাষার দিক থেকে এদের প্রাক্‌পাণিনীয়  বলেই ধরা হয়। আশ্ব্লায়ন গৃহ্যসূত্রে ‘ভারত’ ও ‘মহাভারত’-এর উল্লেখ আছে, তাই মনে করা হয়, যে সেই যুগে মহাকাব্যদুটির প্রাচীন এক সংস্করণ প্রচলিত ছিল।

বেদাঙ্গসূত্রগুলি রচনার কাল ছিল ভারতের ইতিহাসেরও এক গভীর পরিবর্তনের সময়। এই যুগে যজ্ঞকেন্দ্রিক ধর্মীয় আচার প্রণালীর ওপর যেমন প্রশ্ন উঠেছে, তেমনি বিদেশী পারসিক, গ্রীক, শক, কুষাণ ও কিছু পরে হূণ জাতির সাথে সংযোগ ঘটেছে। তক্ষশীলা, পাটলিপুত্র, কোশাম্বী বা মথুরার মত নগরী তখন রীতিমত বিশ্বজনীন। ভারতে বৈদেশিক বাণিজ্য প্রসার হয়েছে, বিদেশী ভাবধারা, ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতি আস্তে আস্তে ভারতের মধ্যে মিশে গেছে। এই বিদেশী সংমিশ্রণ ও ভাবধারার আত্মীকরণ ভারতবর্ষের ধর্ম, ভাষা, সাহিত্য, শিল্প, বিজ্ঞান, জ্যোতিষ, গণিত, রসায়ন – এই সমস্ত ক্ষেত্রেও জোরালো প্রভাব ফেলেছিল।

এর সাথে সাথে ছিল দেশীয় তথাকথিত অনার্য জনগোষ্ঠীর সাথে ক্রমাগত মিশ্রণ। এই যুগসন্ধিক্ষণে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের মতো ধর্মবিশ্বাসগুলি, যাদের অনেকে প্রতিবাদী ধর্ম বলে থাকেন, সেগুলিও প্রচারিত হয়েছে। বৌদ্ধ ধর্ম রাজানুকুল্য লাভ করাতে প্রাচীন ব্রাহ্মণ্যধর্ম তার যজ্ঞকেন্দ্রিকতা থেকে অনেক সরে এসেছে ও যজ্ঞের প্রাচীন গৌরব অনেক স্তিমিত হয়েছে, (তবে বিলুপ্ত কখনোই হয়ে যায় নি, কারণ আমরা সে যুগের কয়েকজন রাজাকে অশ্বমেধ যজ্ঞ করতে দেখি)।

ভাষার ক্ষেত্রেও এক বড়ো পরিবর্তন হয়েছিল। প্রাচীন বৈদিক ভাষা কথ্য ভাষার থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিল, উচ্চারণ, ব্যাকরণ, ব্যুৎপত্তি, সব কিছুই এক বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে চলেছিল। পতঞ্জলি বৈদিক ভাষাকে ছন্দঃ ও কথ্য ভাষাকে লৌকিক বা ভাষা নাম দিয়েছিলেন। সেই জন্য ভাষা, উচ্চারণ ও ব্যুৎপত্তির জন্য শিক্ষা, ব্যাকরণ, ছন্দ ও নিরুক্ত সূত্র গুলি লেখার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল।

বেদাঙ্গের শিক্ষা সূত্রগুলিতে মূলত ধ্বনিতত্ত্বের আলোচনা পাওয়া যায়। সময়ের সাথে বেদমন্ত্র উচ্চারণের নিয়মগুলি শিথিল হয়ে এসেছিল, ভৌগোলিক অঞ্চল অনুযায়ী উচ্চারণের ভেদ এসেছিল।  তাই শিক্ষাসূত্র গুলিতে বেদমন্ত্র উচ্চারণের বিশেষ প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বহু শিক্ষাগ্রন্থের নাম পাওয়া গেলেও তার মধ্যে বেশির ভাগই লুপ্ত হয়েছে। যাদের নাম পাওয়া যায় তাদের মধ্যে আছে ‘পাণিনীয়’, ‘সর্বসম্মত’ ও ‘সিদ্ধান্ত’। বিভিন্ন মন্ত্রের উচ্চারণপ্রণালী, গান, সুর-সমেত সংহিতা পাঠ ও বাদ্যযন্ত্রের সাথে অঙ্গভঙ্গি ইত্যাদি এই গ্রন্থগুলির মূল উপজীব্য। ‘পাণিনীয়’ শিক্ষা গ্রন্থে উচ্চারণ, সন্ধিবিচ্ছেদ, সংহিতা পাঠ কৌশল দেওয়া আছে। নামকরণ থেকে বোঝা যায় যে এই গ্রন্থ স্বয়ং পাণিনীর রচনা নয়। ভারদ্বাজ শিক্ষা তৈত্তিরীয় সংহিতার সাথে যুক্ত। এতে আছে সন্ধি, সমাস, আবৃত্তির নিয়ম, স্বরন্যাস, পদ, যতি, ছন্দ ইত্যাদি বিষয়ের চর্চা। এই নিয়ে একটি চিত্তাকর্ষক তথ্য জানাতে চাই – অথর্ববেদীয় আপিশলী  শিক্ষায় বর্ণমালার বিভিন্ন অক্ষরের শ্রেণীবিভাগ, তাদের যথার্থ উচ্চারণ ও ধ্বনি নিয়ে আলোচনা আছে। এই ধরনের আলোচনা এর আগে আর কোথাও নেই।
বেদাঙ্গসূত্রের ব্যাকরণ আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই যার নাম আসে তিনি হচ্ছেন পাণিনি। আরো অনেক প্রাচীন বিশেষজ্ঞ থাকলেও, শুধু মাত্র পাণিনির ব্যাকরণটিই এখন পাওয়া যায়। যদিও তাতে ধ্রুপদী বৈদিক ব্যাকরণ সংক্রান্ত একটি মাত্র সংক্ষিপ্ত অধ্যায় আছে। পাণিনির ব্যাকরণ রচনার সময় সংস্কৃত সাধারণের কথ্য ভাষা ছিল না, সেই স্থান অধিকার করেছিল প্রাকৃতভাষা।  সেই কারণে পাণিনিকে খ্রীষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকের বলে ধরা হয়। পাণিনি সংক্ষেপে, শব্দের বাহুল্য বর্জন করে, বিদ্ববত্তার সাথে ভাষাকে সুসংহত করে বেঁধেছিলেন তাই পাণিনির বিশ্লেষণ ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তাঁর ব্যাকরণকে পণ্ডিতেরা সম্পূর্ণ ও প্রথম বিজ্ঞানসম্মত ব্যাকরণ বলেন।

বেদাঙ্গসূত্রের নিরুক্তগুলি হচ্ছে শব্দের ব্যুৎপত্তি নির্ধারণের বিদ্যা। যাস্কের নিরুক্তকে বলা হয় পৃথিবীর প্রাচীনতম নিরুক্ত গ্রন্থ। যদিও যাস্ক নিজে তাঁর পূর্ববর্তী নিরুক্তকারদের নাম উল্লেখ করেছেন, তাঁদের রচনা পাওয়া যায় নি। যাস্ক নিরুক্তর রচনাকাল ধরা হয় খ্রীষ্টপূর্ব ৭০০ থেকে ৫০০ শতকের মধ্যে, অর্থাৎ তিনি পাণিনির পূর্ববর্তী। তিনি চার ধরনের পদের কথা বলে গিয়েছিলেন নাম (বিশেষ্য, বিশেষণ ও সর্বনাম), আখ্যাত (ক্রিয়া), উপসর্গ ও নিপাত (অব্যয়)। তাঁর নিরুক্তে আছে প্রতিশব্দ, সমার্থক শব্দ ও ঋগ্বেদের বিভিন্ন দেবতার নামের বুৎপত্তি। তিনি সর্বদা মূল ধাতু থেকে ব্যুৎপত্তি  সন্ধান করেছেন, তাই সব ক্ষেত্রে তাঁর ব্যুৎপত্তি সঠিক না হলেও তাঁর বিশ্লেষণী ক্ষমতা দেখে আশ্চর্য হতে হয়। যাস্কের পূর্ববর্তী নিরুক্তকার শাকটায়নের মতে বিশেষণের ব্যুৎপত্তিও ধাতু থেকে করা সম্ভব। কিন্তু যাস্ক এই মতের বিরোধিতা করেছেন।

বেদপাঠে ছন্দের ব্যবহার ও তাদের ক্রমাগত বিবর্তন ও নতুন ছন্দের উৎপত্তির জন্য ছন্দশান্ত্রকে সুসংহত করার প্রয়োজন ছিল। সেই জন্য রচিত হয়েছিল বেদাঙ্গের ছন্দসূত্র গুলি। ছন্দসূত্রের মধ্যে নিদানসূত্র ও পিঙ্গলছন্দঃসূত্র – এই দুটিই প্রচলিত। নিদানসূত্রে সামবেদীয় মন্ত্রগুলির ছন্দ ও সুর আলোচিত হয়েছে।  অনেকে বলেন এটি পতঞ্জলির রচনা। পিঙ্গলছন্দঃসূত্র অনেক পরের লেখা কারণ এতে বৈদিক ছন্দ ছাড়াও অনেক অ-বৈদিক ছন্দের আলোচনা আছে।

জ্যোতিষ

বৈদিক যুগে জ্যোতিষের প্রয়োজন হত মূলত কৃষি কাজ ও যজ্ঞানুষ্ঠানের উপযুক্ত সময় ও নক্ষত্র নির্ধারণের জন্য। বৈদিক সাহিত্যে যজুর্বেদের পরে লগধ প্রণীত বেদাঙ্গ জ্যোতিষকে প্রধান বেদাঙ্গ সূত্র ধরা হয়। এতে আছে উত্তরায়ণ ও দক্ষিণায়ন, ঋতু পরিবর্তন, পূর্ণিমা ও অমাবস্যা নির্ণয়, চান্দ্র মাসের গণনার নিয়মাবলী, ইত্যাদি। জ্যোতিষের জটিল অঙ্ক বা আমরা যাকে জ্যোতিষী বলি, সেই বিদ্যা এসেছিল অনেক অনেক পরে।

কৃতজ্ঞতায়-

দিলীপ দাস

অবসর নেট।

বৈদিক সাহিত্যে আরণ্যক



বৈদিক সাহিত্যের জ্ঞানকাণ্ডের মধ্যে পড়ে আরণ্যক ও উপনিষদগুলিকে। যদিও সংহিতা ও ব্রাহ্মণ, আর আরণ্যক ও উপনিষদের মধ্যে সঠিক ভেদরেখা টানা অসম্ভব কারণ এরা প্রায়শই একে অন্যের ওপরে বিস্তার লাভ করেছে। তাই সাধারণত বৈদিক সাহিত্যকে সংহিতাপূর্ব (সংহিতা ও ব্রাহ্মণ) এবং সংহিতাউত্তর (আরণ্যক ও উপনিষদ) ভাগে মোটামুটি বিভাজন করা হয়। প্রচলিত অর্থে আরণ্যকগুলি অরণ্যে রচিত বলে ধরা হয়। পাণিনি ‘আরণ্যক’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন অরণ্যে বসবাসকারী ব্যক্তি হিসেবে। কিন্তু অরণ্যে রচিত গ্রন্থ হিসেবে ‘আরণ্যক’ শব্দের ব্যবহার করেন কাত্যায়ন, যাকে আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকের ধরা হয়। এর থেকে কিছু পণ্ডিত মত পোষণ করেন যে আরণ্যকগুলি আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে রচিত। আকারে ক্ষুদ্রতম হলেও, যুগসন্ধিক্ষণের সাহিত্য বলেই আরণ্যকগুলির তাৎপর্য।

প্রত্যেক সংহিতার এক বা একাধিক ব্রাহ্মণ থাকলেও প্রতি সংহিতার নিজস্ব আরণ্যক বা উপনিষদ নেই। শুধু তিন ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম – ঋগ্বেদের ঐতরেয় ও কৌষীতকী এবং যজুর্বেদের তৈত্তিরীয়, যাদের নিজস্ব সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ রয়েছে।

ঋগ্বেদের ঐতরেয় ও কৌষীতকী আরণ্যকের প্রথম দিকের অধ্যায়গুলিতে আমরা যাগ-যজ্ঞের অনুষ্ঠানেই কথাই দেখি, যা দেখে মনে হয় এই অংশগুলি যেন ব্রাহ্মণেরই প্রলম্বিত শাখা মাত্র। কিন্তু শেষভাগ গুলিতে কিছু প্রতীকী বিশ্লেষণ ও ঔপনিষদিক ভাবধারার পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন প্রাণের উপাসনা, ত্যাগের মাধ্যমে প্রকৃত জ্ঞানলাভ, অতীন্দ্রিয় আধ্যাত্মিক বিবৃতি, উচ্চতর জ্ঞান অর্জন ও প্রজ্ঞার অনুশীলন। এদিকে দিয়ে আরণ্যকগুলিকে জ্ঞানকাণ্ড বলা যুক্তিযুক্ত। জ্ঞানের প্রতি এত শ্রদ্ধা – ইন্দ্র, সরস্বতী ও অশ্বীদ্বয়ের কাছে মেধার জন্য প্রার্থনা, এর আগে হয় নি। এর কারণ হিসেবে বলা যায় যে সত্যিই সেই সময় ধাতুবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা, রসায়নবিদ্যা, প্রাথমিক শারীরবিদ্যা – এদের অনুশীলন শুরু হয়েছিল।

যজুর্বেদের তৈত্তিরীয় আরণ্যক থেকে বিভিন্ন মন্ত্র যেমন নারায়ণসূক্ত, দুর্গাসূক্ত, ইত্যাদি পুরোহিতদের, বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতে, পূজোতে ব্যবহার করতে দেখছি। এই আধুনিক দেবতাদের উল্লেখ থেকে বোঝা যায় যে তৈত্তিরীয় আরণ্যকের কিছু অংশ বেশ আধুনিক। এতেই আছে নারায়ণের মতো অপেক্ষাকৃত আধুনিক দেবতার স্তোত্রর পরে পরেই রুদ্রর প্রশস্তি। যার থেকে বোঝা যায় যে ব্রাহ্মণদের মধ্যে একটা দেবতাভিত্তিক শ্রেণিভেদ, যা বর্তমানের আইয়েঙ্গার ও আইয়ারদের পূর্বসূরি, আরণ্যকের যুগেই প্রচলিত ছিল।

আরণ্যকের যুগের সমাজে কৃষিকাজ মানুষের প্রধান জীবিকা তাই আমরা বৈদিক সাহিত্যে পাই ফসলের রক্ষা, সুবৃষ্টির জন্য প্রার্থনা, যাগ-যজ্ঞ। ক্ষুধা ও তৃষ্ণা থেকে মানুষ পরিত্রাণ চায় তাই ঐতরেয় ও তৈত্তিরীয় আরণ্যকমে দেখি অন্নই শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা। তখন জাতিভেদ সম্পূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত। ব্রাহ্মণবর্ণের মধ্যেও শ্রেণীবিভাগের উল্লেখে স্পষ্ট ইঙ্গিত। তবে তৈত্তিরীয় আরণ্যকমের এক জায়গায় দৃষ্টি আটকে যায়, সেখানের আছে বিবাহিত ও অবিবাহিত, এই দুই প্রকার নারীর গর্ভস্থ সন্তানের রক্ষার জন্য প্রার্থনা।

আরণ্যকের দেবতাকুলের মধ্যেও দেখি অনেক পরিবর্তন। ঋগ্বেদের মিত্র-বরুণ, ইন্দ্র, দ্যৌঃ, উষা – এঁরা পশ্চাৎপটে চলে গেছেন ও সামনের সারিতে দেখি কিছু নতুন দেবতা। রুদ্র এখানে শিব বা নীললোহিত, নারায়ণ ও বাসুদেব প্রাধান্য লাভ করেছেন, তাঁদের সাথে অনিরুদ্ধ, প্রদ্যুম্ন ও সংকর্ষণ বা বলদেবের পূজো হতে দেখি, নারায়ণের সমুদ্রে অনন্তশয্যার বিবরণের মধ্যে পৌরাণিক প্রভাব স্পষ্ট, অগ্নিতুল্য উজ্জ্বল ও দুর্গতিতারিণী দুর্গার প্রথম দেখা পাই তৈত্তিরীয় আরণ্যকে, কুবের এসেছেন ধনের দেবতা হিসেবে, রুদ্র অম্বিকার পতি, হৈমবতী উমার প্রথম সাক্ষাত পাই কেনোপনিষদে। তবে এখানে দেবীদের পরিচয় খালি দেবতাদের স্ত্রী হিসেবে নয়, তাঁরা মাতৃরূপিণী ও নিজেদের শক্তিতে সমুজ্জ্বল।

ব্রহ্ম, জন্ম-মৃত্যু, আত্মা ও পুনর্জন্মের ধারনাগুলি তখন তৈরী হচ্ছিল কিন্তু তা উপনিষদের পূর্ণতা লাভ করে নি।

কৃতজ্ঞতায়-

দিলীপ দাস

অবসর নেট।

বৈদিক সাহিত্যে ব্রাহ্মণ


সূত্র সাহিত্যে তেইশটি ব্রাহ্মণের উল্লেখ থাকলেও এর মধ্যে অনেক কটি এখন লুপ্ত ও আংশিক বা পুরোপুরি ভাবে অন্যান্য ব্রাহ্মণের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে।  ঋগ্বেদীয় ব্রাহ্মণ দুটি, ঐতরেয় ও কৌষীতকী, এদের মধ্যে ঐতরেয় প্রাচীনতর, যার ভৌগোলিক পটভূমিকা কুরুপাঞ্চাল ও বশঊশীনর  অঞ্চল। এতে আছে বিখ্যাত রাজসূয় যজ্ঞের প্রক্রিয়া। এছাড়াও কৌষীতকী ব্রাহ্মণের ভৌগোলিক পটভূমিকা নৈমিষারণ্য – বোঝা যাচ্ছে যে আর্যসভ্যতা ততদিনে দক্ষিণ-পূর্বে সরে এসেছে।

বৈদিক সাহিত্যে সামবেদীয় ব্রাহ্মণ সমৃদ্ধতম – এতে সবচেয়ে বেশী সংখ্যক ব্রাহ্মণ আছে, যা মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল তাণ্ড্য মহা ব্রাহ্মণ বা পঞ্চবিংশতি ব্রাহ্মণ। নাম থেকেই বোঝা যায় এতে আছে পঁচিশটি অধ্যায়। এর আলোচ্য বিষয় হল সামগান ও সাম মন্ত্রের পদ্ধতি। এতে আছে অগ্নিষ্টোম ও অন্য সাতাশি ধরনের যজ্ঞানুষ্ঠান। এর মধ্যে একটি হচ্ছে বিশ্বসৃজাময়ন যজ্ঞ, যা কিংবদন্তী অনুযায়ী এক হাজার বছর ধরে অনুষ্ঠিত হয়। সরস্বতী ও দৃষদ্বতী নদীর অববাহিকা এর ভৌগোলিক পটভূমিকা। ব্রাহ্মণের যুগে যে সমাজে শিল্পচর্চা গুরুত্ব পেত তার প্রমাণ ঐতরেয় ব্রাহ্মণের একটি চিরন্তন সুন্দর কথায় – শিল্প হচ্ছে বাস্তবেরই অনুকরণ। শিল্পের এইধরনের ব্যাখ্যা বৈদিক সাহিত্যে প্রথম।  পঞ্চবিংশতি ব্রাহ্মণে বলা হয়েছে শিল্প তিন প্রকার – নৃত্য, গীত ও বাদ্য। ষড়বিংশ ব্রাহ্মণে আছে স্বাহা, স্বধা, বষট্‌ উচ্চারণের বিধি ও দেবমন্দির ও প্রতিমার উল্লেখ – যা থেকে ধারনা করা যায় বৈদিক সাহিত্যের মধ্যে এটি অনেক আধুনিক।  সামবেদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্রাহ্মণ হচ্ছে ছান্দোগ্য ব্রাহ্মণ, যার শেষ আটটি অধ্যায় নিয়ে রচিত বিখ্যাত ছান্দোগ্য উপনিষদ। সামবেদের আর একটি  ব্রাহ্মণে – সামবিধান ব্রাহ্মণে, আছে একটি চিত্তাকর্ষক কথা – সমস্ত জগত সাত সুরের সঙ্গীত প্রবাহে বিধৃত। এখান থেকেই কি সাত সুরের উৎপত্তি?

কৃষ্ণ যজুর্বেদের একটি মাত্র ব্রাহ্মণ পাওয়া যায় – তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ। একে সাধারণত তৈত্তরীয় সংহিতার অংশ হিসেবেই ধরা হয়। এরই উপসংহারে আছে বিখ্যাত কঠোপনিষদ।

ব্রাহ্মণ সাহিত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বহু গবেষিত হচ্ছে শুক্ল যজুর্বেদের শতপথ ব্রাহ্মণ। এর রচয়িতা হিসেবে দুজনের নাম পাওয়া যায়, শাণ্ডিল্য ও যাজ্ঞবল্ক্য।  শাণ্ডিল্য রচিত অংশটির ভৌগোলিক পটভূমিকা ভারতের উত্তর-পশ্চিম আর যাজ্ঞবল্ক্য রচিত অংশটিতে বিদেহর মতো দক্ষিণ-পূর্বের উল্লেখ আছে। তাই মনে করা হয় এই ব্রাহ্মণ সুদীর্ঘ কাল ধরে রচিত। এতেই আছে মনুর উপাখ্যান-  বিখ্যাত মহাপ্লাবন ও মনু কর্তৃক প্লাবন থেকে রক্ষা এবং যজ্ঞের সাহায্যে পুনঃ সৃষ্টি। এই উপাখ্যানটি পরে পুরাণে বিস্তার লাভ করেছে। জনমেজয়, পরীক্ষিত, শৌনক ইত্যাদি মহাভারতের কিছু চরিত্রের নাম শতপথ ব্রাহ্মণে পাওয়া আয়।

গোপথ ব্রাহ্মণ অথর্ববেদের একমাত্র ব্রাহ্মণ। অন্যান্য ব্রাহ্মণের মতো এতে যজ্ঞানুষ্ঠানের পদ্ধতি প্রক্রিয়া থাকলেও, এতে কিন্তু সেযুগের প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী স্বর খুঁজে পাওয়া যায়। এতে অথর্ববেদের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা দেখে মনে হয় বেদ হিসেবে দীর্ঘকাল অবহেলিত থাকার পর এ যেন এক বিলম্বিত প্রতিবাদ। এই ব্রাহ্মণেই পুত্র শব্দের ব্যুৎপত্তি হিসেবে পুন্নাম নরক থেকে ত্রাণ করে যে সে পুত্র, এর প্রথম উল্লেখ আছে। শতপথ ব্রাহ্মণে আছে যে নারী, শূদ্র, সারমেয় ও কৃষ্ণবর্ণ পাখী দেখা অমঙ্গলজনক।  বোঝাই যাচ্ছে ব্রাহ্মণের যুগে পুরুষ শাসিত সমাজ পুরোপুরিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেই সময় জাতিভেদ  সমাজে প্রতিষ্ঠিত ছিল,  ব্রাহ্মণ বর্ণের শ্রেষ্ঠত্ব ও শূদ্রবর্ণের বিড়ম্বিত জীবনের প্রমাণ ব্রাহ্মণগুলিতে প্রচুর।

ব্রাহ্মণগুলিকে প্রাচীন সংস্কৃত গদ্যসাহিত্যের প্রথম নিদর্শন হিসেবে ধরা হয়। তবে এই গদ্য ছিল ছন্দোবদ্ধ, সমাসবদ্ধ ও স্মৃতিতে রাখার সুবিধার জন্য পুনরাবৃত্তি ও পৌনঃপুনিকতা দুষ্ট। তাই এতে সংহিতার কাব্যঝংকারের আনন্দ অনুপস্থিত। ব্রাহ্মণগুলির ভাষা পাণিনি পূর্ববর্তী হিসেবে ধরা হয়। কেবল গোপথ ব্রাহ্মণকে পাণিনির সমসাময়িক বলা হয়েছে।

ব্রাহ্মণগুলিতে প্রচুর উপাখ্যান আছে, যেগুলি পুরাণের গল্পকথাগুলির পূর্বসূরি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় শতপথ ব্রাহ্মণের দেবাসুরের সংগ্রাম ও প্রজাপতি ব্রহ্মার বরদানের ঘটনাগুলি। বৈদিক সাহিত্যে এখানেই প্রথমবার এই সংগ্রামকে সত্য ও অসত্যের দ্বন্দ্ব হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যে ধারনাটি অনেক পরে বিভিন্ন পুরাণে সম্পূর্ণতা লাভ করেছে।

কৃতজ্ঞতায়-

দিলীপ দাস

অবসর নেট।