বেদ কি ?


98.jpg

“বেদ” শব্দে “জানা” অর্থ সংসূচিত হয় । যদ্বারা “জানা” যায় তাহাই বেদ । বেদ সত্য-মিথ্যার স্বরুপ-তত্ত্ব জানাইয়া দেয়; বেদ ধর্ম জানায়; বেদ অধর্ম জানায় । ফলতঃ যাঁহার দ্বারা ধর্মাধর্মের সত্যাসত্যের জ্ঞান লাভ হয়, অর্থাৎ যাঁহার দ্বারা স্বরুপ জানিতে পারা যায়, এক কথায় যাঁহার দ্বারা ঐহিক ও পারত্রিক সর্ব্বসিদ্ধ জ্ঞানের অধিকারী হওয়া যায়, তাহাই বেদ । সেই সর্ব্ববিধ জ্ঞানেরই নামান্তর- সত্য -বিষয়ক জ্ঞান, পরমেশ্বর-বিষয়ক জ্ঞান । অতএব, যদ্বারা সত্য-তত্ত্ব অধিগত হয়, পরমেশ্বর-সম্বন্ধে স্বরুপ জ্ঞান জন্মে, পরব্রক্ষ্মকে জানিতে পারা যায় এবং তাঁহাকে সন্মিলিত হইবার আকাঙ্ক্ষা আসে ও তদ্ববিষয়ক উপায়-পরস্পরা অবগত হওয়া যায়, তাহাই বেদ । বেদই আত্মায় আত্মসন্মিলনের একমাত্র উপায় ।

কিবা সামগানে, কিবা মন্ত্রউচ্চারণে, কিবা অন্য কোনরূপ স্তোত্রে, যেখানে যে নামে যে ভাবে ভগবানের অর্চ্চনা করা হউক না কেন, সে সকল অর্চনাই সর্ব্ব-স্বরুপ সেই একেরই উদ্দেশ্য বিহিত হয় । বুঝা উচিত -সকল পুজাই তাঁহার পুজা ।

হে মিত্রদেব ! হে বরুণদেব! হে অদিতি! হে সিন্ধুদেব ! হে পৃথিবীদেব! হে দ্যুদেব অতপরঃ আপনারা আমাদিগকে রক্ষা করুন । তাঁহারা কোথায় অবস্থান করেন, কোথায় থেকে আসিয়া আমাদের রক্ষা করিবেন, কে তাঁহারা ? এই নিয়েই “দেবতাদের স্বরুপ তত্ত্ব” আলোচনায় আনিতে চাহি যদি আজ্ঞা দান করেন ।

বেদ মানব সভ্যতার সর্বোচ্চ গ্রন্থ। মনুষ্য জীবনের প্রতিটি কার্যকলাপের সঠিক দিক নির্দেশনা সম্বলিত এক পূর্নাঙ্গ জীবন বিধান। অহিংসা,সত্য, উদার এবং মহত্বে অধিষ্ঠিত হওয়ার উপদেশ বেদ আমাদের দিয়েছে। কিন্তু একটি নিরীহ নির্দোষ প্রাণী হত্যার দ্বারা কি কখনো মহত্বে অধিষ্ঠিত হওয়া যেতে পারে? বেদ কি আদৌ আমাদের নির্দোষ প্রাণীদের হত্যা করার শিক্ষা দেয়?
কখনোই না। কারন বেদেই স্পষ্ট আছে – [“অনাগো হত্যা বৈ ভীমা কৃত্যে”(অথর্ববেদ ১০।১।২৯) অর্থাৎ হে হিংসক্রিয়ে, নিরপরাধ এর হত্যা নিশ্চিতভাবে ভয়ংকরপ্রদ] অতএব নিরাপরাধ পশুদের নিরন্তর রক্ষা করো।
যজুর্বেদ ১৩ অধ্যায়ের ৪৭ – ৫০ নং মন্ত্রগুলোতে ইহা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে-
.
=>>যজুর্বেদ ১৩।৪৭
হে হাজারো প্রকার দৃষ্টিযুক্ত রাজন! তুমি সুখ প্রাপ্ত করার জন্য নিরন্তন বৃদ্ধি হয়ে এই দ্বিপদী মনুষ্য এবং চতুষ্পদী পশুকে মেরো না। হে জ্ঞানবান! তুমি পবিত্র অন্ন উৎপন্ন কারী বন্য পশুকে প্রেম করো, তাদের বৃদ্ধি প্রার্থনা করো। এবং তাদের বৃদ্ধি দ্বারা নিজ সম্পদ বৃদ্ধি হয়ে নিজ শরীর মধ্যে হৃষ্ট পুষ্ট হয়ে স্থির হও। তোমার সন্তাপকারী ক্রোধ বা তোমার পীড়া, হিংসক বন্য পশুর প্রাপ্ত হোক। এবং যাদের আমরা প্রীতি করি না, তাদের তোমার সন্তাপকারী ক্রোধ বা পীড়া প্রাপ্ত হোক।
(অনুবাদঃ জয়দেব শর্মা)
=>> যজুর্বেদ ১৩।৪৮
হে পুরুষ! এই হর্ষ ধ্বনি কারী , যা সব প্রকার কষ্ট সহনের সামর্থ্য এক ক্ষুরযুক্ত বেগবান,যা সংগ্রামপযোগী পশুদের মধ্যে সবচেয়ে অধিক বেগবান অশ্ব, গাধা,খচ্চর আদি পশুকে মেরো না। জঙ্গলে গৌর নামক পশু কে লক্ষ্য করে তোমাকে আমি এই উপদেশ করছি যে, তাদের বৃদ্ধিতে তুমি নিজেকেও বৃদ্ধি করে নিজ শরীর কে রক্ষা করো। তোমার শোক, সন্তাপ বা ক্রোধ সেই গৌর নামক ক্ষেতের হানিকারক মৃগের প্রাপ্ত হোক।যাদের প্রতি আমাদের প্রীতি নেই, তোমার শোক সন্তাপ বা ক্রোধ তাদের প্রাপ্ত হোক।
(অনুবাদঃ জয়দেব শর্মা)
=>>যজুর্বেদ ১৩।৪৯
আকাশ অন্তরীক্ষের মধ্যে বিবিধ প্রকারে বিস্তার কারী শত ধারা বর্ষনকারী আশ্রয়, সোমরূপ মেঘের সমান লোক মধ্যে বিদ্যমান শতজনের ধারক পোষক এবং হাজারো সুখপ্রদ পদার্থের উৎপাদক এই বৃষ কে এবং মনুষ্যের হিতের জন্য ঘী, দুগ্ধ, অন্ন আদি পুষ্টিকারক পদার্থ প্রদানকারী অহিংসনীয়, পৃথিবী সমান গাভী কে, হে রাজন! আপন সর্বোৎকৃষ্ট স্থান মধ্যে বা আপন রক্ষন কার্যের মধ্যে তৎপর হয়ে মেরো না। তোমাকে আমি বন্য পশু গবয় এর উপদেশ করি। উহা দ্বারা নিজ ঐশ্বর্য কে বৃদ্ধি করে নিজ শরীরকে স্থির করো। তোমার শোক সন্তাপ বা ক্রোধ “গবয়” নামক পশুর প্রাপ্ত হোক। এবং যেই শত্রুকে আমরা দ্বেষ করি, তোমার সন্তাপ এবং পীড়াদায়ক ক্রোধ তাহার প্রাপ্ত হোক।
(অনুবাদঃ জয়দেব শর্মা)
=>>যজুর্বেদ ১৩।৫০
হে রাজন! তুমি পরম সর্বোচ্চ “ব্যোম” অর্থাৎ বিবিধ প্রাণীদের রক্ষাধিকারে নিযুক্ত হয়ে সর্ব জগতের রচয়িতা পরমেশ্বর কে প্রজাদের সবার উত্তম বা সবার সবার আদি উৎপাদক কারণ, মেঘের সমান সুখের উৎপাদক, বরুন অর্থাৎ বরণ করার যোগ্য সুখের মূল কারণ দ্বিপদী এবং চতুষ্পদী পশুদের মধ্যে শরীরকে লোম আদি দ্বারা আবৃতযুক্ত এই ” ঊর্নায়ু ” উল প্রদানকারী মেষ আদি জীবকে মেরো না। তোমাকে আমি বন্য উট এর উপদেশ করি। উহা দ্বারা সমৃদ্ধ হয়ে শরীরের সুখকে প্রাপ্ত করো। তোমার পীড়াজনক প্রবৃত্তি, দাহকারী পীড়দায়ক জীবের প্রাপ্ত হোক।এবং তোমার দুঃখদায়ী ক্রোধ তাহার প্রাপ্ত যাদের আমরা দ্বেষ করি।
(অনুবাদঃ জয়দেব শর্মা)


উপরিউক্ত মন্ত্রগুলি দ্বারা এটা স্পষ্ট যে, বেদ কোন নির্দোষ পশু কে হত্যার উপদেশ করে নি।বরং উপদেশ করেছে, পশুস্ত্রাঁয়েথাঙ (যজুর্বেদ ৬।১১) অর্থাৎ পশুদের রক্ষা করো এবং তাদের বর্ধিত করো।কারন বেদ সর্বদাই কল্যাণময়।

Advertisements

বেদের পরিচয়- ১৫


বেদের পরিচয়- ১৫


জগতের কালনির্ণয়েই বেদের কাল নির্ণয় করা উচিত। ত্রিকালজ্ঞ ভগবানের অভিন্ন ভগবজ্‌জ্ঞানস্বরূপ বেদশাস্ত্রকে কালাধীন করতে হলে, মনুস্মৃতি প্রমাণ এই যে-
মনুসংহিতা, অধ্যায় ১, শ্লোক ৬৮-৭৩, ৭৯-৮০।
#হে মহর্ষিগণ! ব্রহ্মার দিবারাত্রির ও সত্যত্ৰেতাদি এক এক যুগের যে পারমাণ, তা আমি ক্রমে ক্রমে সংক্ষেপে আপনাদিগকে বলিতেছি, অবধান করুন। ৬৮ #দৈবপরিমাণে চারি সহস্ৰ বৎসরে সত্যযুগ হয়, সেই যুগের পূর্ব্ব চারি শত বৎসর সন্ধ্যা ও ঐ যুগের উত্তর চারি শত বৎসর সন্ধাংশ হয়। ৬৯
#ত্রেতা-দ্বাপরাদিতে যুগের পরিমাণ ক্রমে এক সহস্ৰ বৎসর করিয়া ও সন্ধাংশের পরিমাণ এক শত বৎসর করিয়া ন্যুন হইয়া যায় অর্থাৎ তিন সহস্ৰ বৎসরে ত্রেতাযুগ, তিন শত বৎসর যাহার সন্ধ্যা ও তিন শত বৎসর সন্ধাংশ। এই সহস্ৰ বৎসরে দ্বাপরযুগ, দুই শত বৎসর তাহার সন্ধা। দুই শত বৎসর সন্ধ্যাংশ হয়। সহস্ৰ বৎসরে কলিযুগ, এক শত বৎসর তাছার সন্ধা ও এক শত বৎসর সন্ধ্যাংশ হয়। ৭০
#ইতঃপূৰ্ব্বে মনুষ্যদিগের যে চারিযুগের সংখ্যা নিরূপিত হইল, ইহার স্বাদশ সহস্ৰ সংখ্যা পরিমাণে দেবগণের এক যুগ বলা যায়। ৭১
#দৈবপরিমাণের সহস্ৰ যুগসংখ্যাতে ব্ৰহ্মার এক দিন হয় এবং ঐ পরিমাণে তাঁহার এক রাত্রি হয়। ৭২
#দৈবপরিমাণে সহস্ৰ যুগ পরিসমাপ্তিতে ব্ৰহ্মার এক দিন হয় ও ঐ পরিমাণে তাঁহার এক রাত্রি হয়। এই পবিত্র দিবারাত্রির পরিমাণ যাহারা অবগত আছেন, তাহাদিগকে অহোরাত্রবেত্তা বলা যায়। ৭৩
#পরমাত্মা পূৰ্ব্বোক্ত স্বীয় অহোরাত্রের অবসানে প্রতিবুদ্ধ হয়েন এবং প্রতিবুদ্ধ হইয়াই ভূলোকাদি সৃষ্টি করিবার জন্য মনকে নিয়োগ করেন। ব্রহ্মার এইপ্রকার-নিয়োগের নাম মনঃসৃষ্টি। ৭৪
#পরমাত্মা সৃষ্টি করিবার ইচ্ছা করিলে পর সেই ইচ্ছায় প্রেরিত মহত্তত্ত্ব হইতে আকাশ উৎপন্ন হয়। ময়াদি আকাশের গুণ শব্দ বলিয়াছেন। ৭৫
#বিকৃতভাবাপন্ন আকাশ হইতে সুগন্ধ ও দুর্গন্ধবহু প্রবল পবিত্র বায়ু সমুদিত হয়। মন্বাদি উহার স্পর্শগুণ বলিয়াছেন।৭৬
#বিকৃতভাবাপন্ন বায়ু হইতে তমোনাশক, সকল বস্তুর প্রকাশক, দীপ্তিমান তেজ উৎপন্ন হয়; ঐ তেজের গুণ রূপ। ৭৭
#তেজ বিকৃতভাবাপন্ন হইলে বিকারজনক তেজ হইতে জল জন্মে, জলের গুণ রস। জল হইতে গন্ধগুণসম্পন্ন পৃথিবী উৎপন্ন হয়, মহাপ্রলয়াবসানে সৃষ্টির প্রথমে পঞ্চভূতের উৎপত্তিক্রম এইরূপ। ৭৮
#পুৰ্ব্বে দ্বাদশ সহস্ৰ সংখ্যায় পরিগণিত দৈবপরিমাণে যে যুগনির্ণয় করা হইয়াছে, তাহাকে একসপ্ততি গুণ করিলে যে ফল হয়, অর্থাৎ (৮,৫২,০০০) আট লক্ষ বাহান্ন সহস্ৰ দৈববৎসর, তাহাকে এক মন্বন্তর বলা যায়। ৭৯
#পরমেষ্ঠী পিতামহ ব্ৰহ্মা যেন ক্রীড়া করিতে করিতে বার বার অসংখ্য মন্বন্তর এবং অনন্ত সৃষ্টি ও সংহার করিতেছেন। ৮০
উক্ত প্রমাণ অনুসারে জগতের ও বেদের কাল নির্ণয় করা দুঃসাধ্য ব্যাপার। যা হোক, বেদ কোন প্রাকৃত সাহিত্যের সমপর্য্যায়ের গ্রন্থ নহেন-বেদ ব্রহ্মজ্ঞান-প্রতিপাদক অখণ্ডজ্ঞানস্বরূপ। সুতরাং পারমার্থিক বিচার ধারায় অবরোহ বা শ্রৌতপন্থা অনুয়ায়ীই এর উৎপত্তি অনুসন্ধান করা সত্যানুসন্ধিৎসুর পক্ষে মঙ্গল বিধায় আমরাও সেই শাশ্বতী ধারা অবলম্বন করলাম।
ক্রমশঃ-

বেদের পরিচয়- ১৪


বেদের পরিচয়- ১৪


সৃষ্টির প্রথম হতে আজও পর্য্যন্ত পারমার্থিক ভারতের বৈদিক ব্রাহ্মণগণের মধ্যে পুরাতন পরম্পরা রীতি চলে আসছে। গুরু সমগ্র বেদমন্ত্র শিষ্যকে বলেন এবং শিষ্য সেই শ্রুত মন্ত্র সমুদায় একাদশ প্রকারে অভ্যাস করে বিশুদ্ধ ভাবে স্মৃতিপটে রক্ষা করে আসছেন। এখনও ভারতে এমন বৈদিক ব্রাহ্মণ আছেন যে, আজ যদি সমস্ত বেদগ্রন্থ অগ্নিতে ভস্মীভূত হয় তাহলেও বেদ নষ্ট হবে না- অর্থাৎ সেই সকল বৈদিক ব্রাহ্মণ গণের কণ্ঠ হতে শিষ্য পরম্পরায় শ্রৌতপথে বর্ত্তমান থাকবে। এমন কি, এখনও যে সকল ব্যক্তি বেদের সংহিতাভাগ মুদ্রণ করেন, তার বর্ণশুদ্ধি, সুর-স্বর, উদাত্ত-অনুদাত্ত-স্বরিত চিহ্নাদি এই প্রাচীন পন্থাবলম্বী পণ্ডিতগণ তাঁদের স্মৃতি হতেই সংশোধন করে থাকেন। মুদ্রাকর-প্রমাদ অনেক হতে পারে, কিন্তু বৈদিকগণের শ্রৌতপন্থায় প্রাপ্ত বেদ বিশুদ্ধই আছে। আমরা যদি বেদ “বেদপাঠ বিধি” সম্বন্ধে আলোচনা করি তাহলে সহজেই বুঝতে পারবো কিভাবে এই বিশুদ্ধতা বজায় থাকে।

এ প্রকার বেদের যদি কালগত সময় নির্দ্দেশ করতে হয়, তাহলে জগৎউৎপত্তির সময় হতেই বেদ জগতে প্রকাশিত বলতে হবে।
ক্রমশঃ-

বেদের পরিচয়- ১৩


বেদের পরিচয়- ১৩


পারমার্থিক আস্তিক হিন্দুগণ বেদের নিত্যত্ব ও উৎপত্তি সম্বন্ধে নানাবিধ শাস্ত্রপ্রমাণ মূলে গুরু পরম্পরায় বিশ্বাস ও স্বীকার করেন। আর অধ্যক্ষ কেবলমাত্র যুক্তিবাদী আরোহপথ অবলম্বী বেদ-বাদরত প্রাচ্য ও প্রতীচ্য পণ্ডিতগণ বেদের কাল-নির্ণয়ে বহু মত-মতান্তর উপস্থিত করেছেন। বেদের শিক্ষা, উদ্দেশ্য ও প্রতিপাদ্য বিষয় যখন নিত্য-সত্য বাস্তব-বস্তু ভগবান্‌, তখন অবাস্তব-রাজ্যের সীমাবদ্ধ ভূমিকায় দাঁড়িয়ে অসম্যক্‌ আরোহ-পথে বাহ্যিক প্রমাণ আদি দ্বারা বেদের সিদ্ধান্ত নিরূপণ বা কাল নির্দ্দেশ দ্বারা অজ্ঞ-সমাজে বিজ্ঞ বলে খ্যাতি অর্জ্জন বা তাহার সেই সময়কার ও প্রাকৃতিক ক্ষণভঙ্গুর আপেক্ষিক মূল্য থাকলেও পারমার্থিকগণ তাহার বিশেষ আদর করেন না। চিৎসাহিত্য ও জড়-সাহিত্য আলোচনা সমপর্য্যায়ে বিবেচিত হলে আকারে সামঞ্জস্য এবং বস্তুগত বিভেদত্ব নিবন্ধন জোনাকিপোকা অগ্নি-স্ফুলিঙ্গ-ভ্রমরূপ বিবর্ত্ত উৎপাদন করবে। ভ্রমপ্রমাদ-বিপ্রলিপ্সা-করণাপাটব দোষচতুষ্টয়যুক্ত পণ্ডিত-সমাজের জড়-সাহিত্যে আত্মশ্লাঘা শোভা পেলেও চিৎসাহিত্য-জগতে তাঁহারা কতটুকু স্থান পেতে পারেন, তাহার নিরপেক্ষ বিচার হওয়া আবশ্যক।
ভট্ট-মোক্ষ-মূলার, ম্যাক্‌ডোনাল্ড প্রভৃতি জড়-সাহিত্যিকগণের বেদ আলোচনার প্রভূত প্রচেষ্টা ভূয়সী প্রশংসাযোগ্য সন্দেহ নাই। কিন্তু বেদের নিগুঢ় তথ্য, সিদ্ধান্ত ও প্রতিপাদ্য বিষয়ের সুষ্ঠু জ্ঞান উপলব্ধি আর্য্য ঋষিগণেরই হয়েছিল। বেদ-গ্রন্থে লেখা অক্ষরে কোন সময়ে লিপিবদ্ধ হয়েছিল, সঠিক স্থিরীকৃত হলেও তা হতে বেদের সময় নির্দ্দেশ করা সম্ভব নয়। জড়-সর্ব্বস্ববাদের যুগে বহিঃপ্রজ্ঞা প্রচলিত পথে চলতেই মানবের স্বাভাবিকী বৃত্তি; সুতরাং কোনপণ্ডিত, বিশেষতঃ কোন বৈদেশিক আবার আমাদের জীবনসর্ব্বস্ব পরমার্থরাজ্যের বেদ-রত্ন সম্বন্ধে কি বলেন, তাহার আদর করতেই আমাদের প্রগাঢ় অনুরাগ। কিন্তু তত্ত্বতঃ বস্তুর অনুধাবন করার প্রবৃত্তি স্বল্প সংখ্যক লোকের হলেও, তা আদরণীয়। অদ্য যদি কোন বিষয়ের সংবাদ কোনও ব্যক্তি অন্য দশব্যক্তিকে বলেন এবং তারা যদি সেই শ্রুত কথা দশ বৎসর পরে লিপিবদ্ধ করেন, তাহলে যেমন পরবর্ত্তীকালের পাঠকগণ সেই দশ বৎসর পরে লিখিত সংবাদের উদয় কাল যে আজই, তাই বলবেন, এবং প্রথম লেখা হয়েছিল আজবধি দশ বৎসর পরে, তেমনি বেদের উৎপত্তিকাল বলে গেলে সৃষ্টির অভ্যুদয়ের প্রথমে ভগবৎকীর্ত্তিত ও ব্রহ্মার দ্বারা শ্রুত সময়কেই ইহ জগতে বেদের উৎপত্তির কাল নির্দ্দেশ করা যায়। পরে কোন্‌ সময়ে বেদব্যাস বেদ বিভক্ত করে লেখেছিলেন, এবং কোন্‌ সময়ে কোন্‌ ব্যক্তি কোন্‌ পুঁথিরূপে বেদমন্ত্র হস্তলিপিতে দিয়েছিলেন, তারসম্বন্ধে কতকগুলি প্রামাণিক এবং কতক আনুমানিক বলা যেতে পারে। যেমন, কেউ বলেন বেদের উৎপত্তি খৃষ্টপূর্ব্ব ২৪০০ বৎসর, কেউ বলেন খৃঃ পূর্ব্ব ২৬০০ বৎসর, কারও মতে খৃঃ পূঃ ৩০০০ বৎসর, আর কারও মতে ৩১০০ বৎসর। স্ব স্ব দেশে, সমাজ ও মনোবৃত্ত অনুয়ায়ী যাঁরা আরোহপন্থায় উক্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, তাদের আর্য্য বিচারধারা ও সল্কল্প পঠন বিদ্যার জ্ঞান থাকলে ঐ প্রকারে পরস্পরে বিরোধ সিদ্ধান্ত সম্ভব হতো না। বাহ্য বিচারে পুস্তক আকারে থাকলেই প্রত্যেক গ্রন্থের আলোচনা একটি পদ্ধতি অনুসারে গৃহীত হতে পারে না। রসায়নশাস্ত্র, পদার্থ বিদ্যাশাস্ত্র, অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, সমাজ-নীতি, নাটক, উপন্যাস প্রভৃতি জড়-সাহিত্য যে প্রকারে শিক্ষা আলোচনা করা হয়ে থাকে সে প্রকারেই অপ্রাকৃত বিষয়ক চিৎসাহিত্য বিচার করতে গেলে সত্যের অপলাপ হবে।
ক্রমশঃ-