বেদ ও প্রাচীন ভারতের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য (নিয়মিত পর্ব-২৭)


ওঁ তৎ সৎ

বেদের শব্দগুলো ধ্যানের গভীর থেকে এসেছে, একটা মন্ত্র, একটা শব্দ আসছে সেইটাই তাঁরা নিজেদের শিষ্যদের যখন দিচ্ছেন তখন তাঁরা নিজেদের নাম নিচ্ছেন না। একবারেই যে নাম নিতেন না তা নয়, আমরা যদি এখান থেকে ইতিহাসের দিকে একটু এগিয়ে আসি তাহলে দেখতে পাব যে বৈশাম্পয়নের খুব নামকরা শিষ্য ছিলেন যাজ্ঞবল্ক্য তিনিও ছিলেন একজন খুব নামকরা ঋষি। একবার কোন একটা ঘটনায় গুরুর সাথে যাজ্ঞবল্কের ঝগড়া হয়ে যায়। একবার গুরুর অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির জন্য একটা গোহত্যা হয়ে গেছে। এখন তার জন্য প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। গুরু তখন যাজ্ঞবল্ক্যকে প্রায়শ্চিত্তের জন্য যজ্ঞের আয়োজন করতে বললেন। যাজ্ঞবল্ক্য তখন গুরুকে বললেন- হে গুরুবর, আপনার কাছে একটা কথা আমি নিবেদন করতে চাই। আপনার শিশ্যরা সবাই অল্প বয়সী, এই ধরণের যজ্ঞের ব্যাপারে খুবই অপটু, আপনি আমার উপরে সব ভার দিয়ে দিন আমি একাই সব সুন্দর ভাবে ব্যাবস্থা করে দিচ্ছি, আপনি কোন চিন্তা করবেন না। যাজ্ঞবল্কের এই কথা শুনে গুরু খুব রেগে গেলেন- তোমার এত অহঙ্কার! আর তুমি আমার শিষ্যদের এতো ছোট করলে! তোমাকে আমি যা কিছু শিখিয়েছি সব আমাকে ফেরত দিয়ে যাও। যজ্ঞবল্ক্যও খুব অপমানিত বোধ করলেন, তিনি মনে মনে ভাবলেন- যে গুরু নিজের শিষ্যকে বুঝতে পারে না, বুঝতে চায় না, এই রকম গুরুর শিষ্য হয়ে থেকে আমার কাজ নেই। যাজ্ঞবল্ক্য খুব তেজস্বী ছিলেন। এখন গুরুর কাছ থেকে লব্ধ জ্ঞান তাঁকে ফেরত দিয়ে দিতে হবে। তখন যাজ্ঞবল্ক্য পুরো যোগশক্তি লাগিয়ে বেদের যত জ্ঞান পেয়েছিলেন বমি করে তিনি সেটাকে বার করে দিলেন। এমন গুরু আর এমন বিদ্যাও আমি চাইনা। এখনতো মহা সমস্যা হয়ে গেল। যাজ্ঞবল্ক্য ছিলেন বৈশাম্পায়নের প্রধান শিষ্য, আর তিনি বৃদ্ধও হয়ে গেছেন। কেননা বেদ হচ্ছে গুরু-শিষ্য পরম্পরা বিদ্যা, এখন গুরু যেটা শেখাল শিষ্য সেটাকে থু করে ফেলে দিল, এখন কি হবে? যে বিদ্যাটা আমি শিষ্যকে দান করলাম সেটাতো নষ্ট হয়ে যাবে। তখন বৈশাম্পয়ন ঋশি তাঁর বাকি শিষ্যদের বললেন তোমরা তিতির পাখি হয়ে যাজ্ঞবল্ক্য যে বিদ্যাটা বমি করে দিয়েছে সেই বমিটা খেয়ে নাও। কেননা মানুষতো আর বমি খেতে পারেনা, পাখিরা খেতে পারে, তাই তাদের তিতির পাখি হয়ে বমিটা খেয়ে নিতে বলা হয়েছিল। এইভাবে যাজ্ঞবল্কের গুরুভাইদের মধ্যে বেদের জ্ঞানটা এসে গেল। তিতির পাখি হয়ে এরা এই বিদ্যাটা পেয়েছিল বলে বেদের এই শাখাটাকে বলা হয় তৈত্তিরীয় শাখা। এই তৈত্তিরীয় শাখা থেকেই তৈত্তেরীয় উপনিষদ এসেছে। আর এটা বমি করা বিদ্যা বলে এর নাম হয়ে গেল কৃষ্ণযজুর্বেদ, কেননা এই বিদ্যার মধ্যে সেই আগের শুদ্ধতা থাকল না বলে কৃষ্ণ বলা হয়েছে। আর যাজ্ঞবল্ক্য গুরুকে ত্যাগ করে বলল-এমন গুরুর আমার দরকার নেই, কোন মানুষকে আমি আর গুরু করব না, সাক্ষাৎ ভগবানই আমার গুরু হবেন। সেই আশ্রম পরিত্যাগ করে তিনি সূর্যোপসনা করতে থাকলেন। পরে সূর্য একটা বাজপাখি হয়ে যাজ্ঞবল্ক্যকে সে যে বিদ্যা বৈশাম্পায়নের কাছ থেকে পেয়েছিলেন সেই বিদ্যাটাই নতুন করে শিখিয়ে দিলেন। যাজ্ঞবল্ক্য আবার বেদের পণ্ডিত হয়ে গেলেন। তিনি যে বিদ্যাটা পেলেন তার নাম হয়ে গেল শুক্লযজুর্বেদ, যেহেতু সূর্য থেকে এই বিদ্যাটা এসেছিল তাই এর নাম হয়ে গেল শুক্ল, আবার বাজপাপাখির কাছ থেকে শ্রবণ করেছিলেন বলে এর আরেকটা নাম বাজশনীয় সংহিতা, বাজপাখি হচ্ছে শক্তির প্রতীক। শুক্ল আর কৃষ্ণ যজুর্বেদের মন্ত্রগুলি মোটামুটি একই, শুধু এদের বিন্যাসটা অন্য রকম।
এই কাহানীতে আমরা বেদের যে বৈশিষ্ট্যকে পাচ্ছি তা হল বেদ হচ্ছে পুরোপুরি একটা মুর্ত্ত রূপ। এ কারণে এই কাহিনীটাকে অবতারণা করা হল, ঋষিরা কোথাও নাম নিতেন না, কিন্তু কোন কোণ ক্ষেত্রে যে ওনারা নাম ব্যবহার করেননি তা নয়, এইখানে শুক্লযজুর্বেদের ক্ষেত্রে যাজ্ঞবল্ক্য বলছেন- এই বিদ্যাটা আমি পেয়েছি। অথচ তাঁর আগে যাঁরা ছিলেন তাঁদের নাম কেউই জানে না। যাজ্ঞবল্ক্য কি পেয়েছিলেন? যে বিদ্যাটা তিনি আগে পেয়ছিলেন সেটাকেই তিনি আবার পুনরায় উদ্ধার করে বললেন আমি পেয়েছি। আমরা অদি অশুদ্ধ মনে বলি- যাজ্ঞবল্ক্য এখানে একটু কায়দা মেরে ঐখান থেকে নিয়ে পরে নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছে। তাই যদি হত, তাহলে বৈশাম্পয়ন ঋষি কি যাজ্ঞবল্ক্যকে ছেড়ে দিতেন? আমরা আজকে এই প্রশ্ন গুলি করতে পারি, কিন্তু কই, তখনকার দিনেতো কেউ কোন রকম প্রশ্ন এই ব্যাপারে যাজ্ঞবল্ক্যকে করেনি। এই কারণে অনেকে চারটে বেদের জায়গায় পাঁচটা বেদ বলেন- যখন যজুর্বেদে আসবে তখন তারা এটাকে দুইভাগে বিভক্ত করে বলে শুক্লযজুর্বেদ ও কৃষ্ণযজুর্বেদ।
ক্রমশঃ

Advertisements

বেদ ও প্রাচীন ভারতের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য (নিয়মিত পর্ব-২৬)


ওঁ তৎ সৎ

কেন ঋষিরা তাঁদের নামকে বেদের সঙ্গে যুক্ত করলেন না?
এই বিষয়টি তখনকার দিনের মানুষের কাছে পরিষ্কার ধারণা ছিল না। স্বামীজী পরে এসে এই জিনিষগুলিকে অনেক বেশি পরিষ্কার করে দিলেন। আমরা এর আগেও বলেছি যে- ঋষিরা ধ্যানের গভীরে গিয়ে অনন্ত জ্ঞানভাণ্ডার থেকে কিছু রত্ন পেয়ে গেলেন, তারপর তিনি সেটা তাঁর শিষ্যদের দিয়ে দিতেন। তিনি ভালো করে জানতেন যে এটা আমার জিনিষ নয়, আর আমার সাধ্যেরও বাইরে এই রত্নকে আবিষ্কার করা। যেটা তাঁদের সাধ্যের মধ্যে নয় তার সাথে এনারা কখনই নিজেদের নামকে যুক্ত রাখতে চাইতেন না। এনারা মনে করতেন যে বেদের সব কিছু অন্য এক দিব্যশক্তির কাজ, যে কাজটা নিজের নয় তার সাথে নিজেদের নামকে যুক্ত করা তাঁদের চিন্তাতেও নিয়ে আসা একটা মারাত্মক গর্হিত কর্ম।
এই জিনিষটাকে ভালো করে বুঝতে হবে- শব্দ থেকে শব্দের জন্ম হয়। দুটো বাচ্চা ছেলে কথা কাটাকাটি করছে, একটা বাচ্চা আরেকটা বাচ্চাকে বলছে- তুই একটা গাধা। গাধা শব্দ শুনেই তার মনটা ক্রোধবৃত্তিতে ভরে গেল, সেও প্রত্যুত্তরে বলে দিল- তুই একটা প্যাঁচা। এ আবার বলছে- তুই আমাকে প্যাঁচা বললি, তাহলে তুই একটা ছাগল। এইভাবে শব্দ থেকে শব্দ জন্ম নিচ্ছে। সব সময় আমরা যে ধরণের কথাবার্তা বলি এর সবটাই শব্দ থেকে শব্দ জন্ম নিচ্ছে। বেশির ভাগ সাহিত্যিক, লেখক যা কিছু লিখছেন এও সেই শব্দ থেকে শব্দের জন্ম দিচ্ছেন। যত সংবাদপত্র ছাপা হচ্ছে সব শব্দ থেকে শব্দের জন্ম দিচ্ছে, ফলে কি হয় এক দিন কি দুদিন থাকবে তারপরে এই সব বই, খবরের কাগজ, ম্যাগাজিন সব সেরে দরে বিক্রী হয়ে যাবে। কিন্তু যখনই শব্দ মৌন থেকে, নিস্তব্দতা থেকে জন্ম নেবে তখন সেই শব্দের মূল্য অনেক গুণ বেড়ে যায়। যাঁরা খুব বিখ্যাত কবি তাঁরা যে কবিতা রচনা করেন, সেই কবিতার শব্দগুলি মৌন থেকে জন্ম নেয়। আবার যখন ধ্যানের গভীর থেকে যে শব্দ গুলি আসে সেই শব্দগুলিই শাস্বত বাণী হয়ে যায়। হাজার হাজার বছর ধরে সেই শব্দ জনমানসে গেঁথে থাকে। এইভাবে শব্দ তিন ভাবে জন্ম নেয়- শব্দ থেকে, মৌনতা থেকে আর ধ্যানের গভীর থেকে। যাঁরা সমাধিবান পুরুষ, সমাধি হল ধ্যানের আরও উচ্চ অবস্থা, সমাধিবান পুরুষরা যে কথাগুলি বলেন সেগুলো ভগবানরই কথা।

ক্রমশঃ

বেদ ও প্রাচীন ভারতের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য (নিয়মিত পর্ব-২৫)


ওঁ তৎ সৎ

এর আগে বলা হয়েছিল যে চার্বাকরা বলছে বেদ যারা লিখেছে তারা হচ্ছে- ত্রয়ী বেদস্য কর্তার ধূর্ত ভ্রষ্ট নিশাচরঃ। যখন বেদের ব্যাপারে কিছু বলতে হয় তখন সারা দেশ মীমাংসকরা যেটা বলছে সেটাকেই অনুসরণ করে। পূর্বমীমাংসদের বিখ্যাত দার্শনিকের নাম হচ্ছে জৈমিনি। তিনি সূত্র আকারে বেদের বিষয়ে লিখে গেছেন, এর নাম হচ্ছে মীমাংসাসূত্র। এর প্রথম সূত্রই হচ্ছে- অথাতো ধর্ম জিজ্ঞসা-আমরা এখন ধর্মের ব্যাপারটা জানব। চার্বাকদের বিরুদ্ধে মীমাংসকরা দুটো বড় যুক্তি নিয়ে এলেন। হিন্দুধর্মের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে বেদের বিরুদ্ধে যত ধরণের আক্রমণ হয়েছিল তাকে আটকাবার জন্য যে সব যুক্তিগুলিকে আনা হয়েছিল সেই যুক্তি গুলি আজ থেকে তিন হাজার বছর আগেই একটা নির্দিষ্ট ছকে দাঁড় করান হয়ে গিয়েছিল। তার ফলে এখন কারুর পক্ষে কোন প্রকার বেদবিরুদ্ধ কথা বলা বা বেদের বিরুদ্ধে কোন নতুন যুক্তি কে দাঁড় করান একেবারেই অসম্ভব ব্যাপার। মানুষের ভোগের ব্যাপার আগেও ছিল এখনও রয়েছে আর চিরদিনই মানুষের ভোগাকাঙ্খা থাকবে। সুতরাং যারা ভোগী তারা যোগীদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে এটা কোন নতুন ব্যাপার নয়। ভোগীদের মধ্যেও অনেক বড় বড় তাত্ত্বিক নেতারা ছিলেন আর তাদের বেদবিরুদ্ধ যুক্তি গুলিকে মারত্মক রকমের শক্তিশালী ছিল। এই যুক্তিগুলী খণ্ডন করার জন্য মীমাংসকরাও আর জোড়ালো যুক্তি দাঁড় করালেন। বেদ হচ্ছে জ্ঞানরাশি, আর জ্ঞানকে কখনই মানবজাতির পক্ষে তৈরী করা সম্ভব নয়। আমরা আবিষ্কার করতে পারি, জানতে পারি কিন্তু মাধ্যাকর্ষণের মত একটা নিয়মকে আমরা বানাতে পারব না। এখন নিউটন এসে এই মাধ্যাকর্ষণের নিয়মটাকে আবিষ্কার করে তিনি কতকগুলি সিদ্ধান্ত করে নিলেন। পরে আইনষ্টাইন এসে নিউটনের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে আরো কয়েকটা নতুন সিদ্ধান্ত দিয়ে নিয়ে এলে Laws of relativity, এতে কি মাধ্যাকর্ষণের নিয়মের কোন পরিবর্তন হবে? কক্ষণই হবে না। মাধ্যাকর্ষণ নিয়ম যেমন চলছিল সেই একই নিয়মে চলতে থাকবে, বিজ্ঞানীদের নিজেদের সিদ্ধান্তের পরিবর্তন হয়েছে মাত্র। সুতরাং বেদ হচ্ছে সেই জ্ঞান, তত্ত্ব যা অনাদিকাল থেকে চলে আসছে তাই বেদকে বলা হচ্ছে সনাতন আর অনন্ত। দ্বিতীয় যে যুক্তিটা মীমাংসকরা নিয়ে আসেন তা হচ্ছে মানুষ যখন কিছু রচনা করে তখন সেখানে নিজের নাম অবশ্যই দেবে। আজকে যদি আমি আপনি কিছু রচনা করে নাম না দিয়ে আমাদের বন্ধু বান্ধবদের শুনিয়ে দিলাম। তারপর যদি এই রচনাটা জনপ্রিয় হয়ে যায় তখন আমার বন্ধু বান্ধবরা বলবে যে ‘এটা আমার এক বন্ধুর রচনা’। কিন্তু বেদের কোথাও আজ পর্যন্ত এইভাবেও কোন ধরণের একটা নামেরও উল্লেখ আমাদের নজরে পড়বে না। বেদের যে এত বিশাল কাণ্ড, যত পুঁথি এখনও যা হারিয়ে, নষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও অবশিষ্ট রয়েছে, তাতেই একটা বিশাল ঘরে সঙ্কুলান হবে না। কিন্তু কোথাও একটা কারুর নাম পাওয়া যাবে না যে এগুলো কে রচনা করে গেছেন? এটা পরিষ্কার বোঝে যাচ্ছে যে একজনের পক্ষে এই বিশাল বেদকে রচনা করা সম্ভবই নয়। তবে ভাষাকে বিশ্লেষণ করে ভাষাবিদরা বলছেন যে বেদ বিভিন্ন সময়ে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। আবার কিছু মন্ত্র ইন্দ্রের, কিছু মন্ত্র বরুণ, অগ্নি এই রকম বিভিন্ন দেবতাদের উদ্দেশ্য। যেটা থেকে বোঝা যায় যে বেদ একজন লোকের কাজ নয়। এখন বেদ যদি অনেক লোকের কাজ হয়ে থাকে তাহলে একজন লোক হয়তো ধাপ্পা দিতে পারে যে আমার নাম দিলাম না যাতে কেউ জানতে পারে যে আমি ধাপ্পা দিচ্ছি কিন্তু এত লোক কখনই এই একই ভাবে ধাপ্পা দিতে পারে না। মীমাংসকরা চার্বাকদের বিরুদ্ধে এই যুক্তিই দিচ্ছে- যখন কেউ কিছু রচনা করে তখন সে তার নাম দিয়ে দেয়। বাল্মিকী যখন রামায়ণ রচনা করলেন তিনি নিজেই তাঁর নাম উল্লেখ করে দিয়ে বলেছেন- আমি এর রচয়িতা। ব্যাসদেব প্রথমে বেদের পুনর্বিন্যাস করে বলে দিলেন- বেদকে আমি এইভাবে বিন্যাস করে দিয়েছি মাত্র। কিন্তু পরে তিনি মহাভারত রচনা করে বললেন আমি মহাভারত রচনা করেছি। ভাগবতের ক্ষেত্রেও তিনি বললেন এটা আমার রচনা। সবাই নাম ব্যবহার করছেন কিন্তু বেদের ক্ষেত্রে কোন নাম কেউ ব্যাবহার করলেন না। যখন কোন নিন্মমানের রচনা হয় তখন তার সাথে নিজের নামকে যুক্ত করতে না চাওয়াটা অযৌক্তিক মনে হবে না, কিন্তু সেই অর্থে বেদকে বেদবিরোধিরাও কেউ কখন কোন দিন স্বপ্নেও নিন্মমানের রচনা মনে করবে না। তাহলে কেন ঋষিরা তাঁদের নামকে বেদের সঙ্গে যুক্ত করলেন না?
ক্রমশঃ

বেদ ও প্রাচীন ভারতের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য (নিয়মিত পর্ব-২৪)


ওঁ তৎ সৎ

বেদকে সনাতন বলা হয়। আরেকটা যে শব্দ বেদের সাথে যুক্ত করা হয় তা হল- বেদ হচ্ছে অপৌরুষেয়। অপৌরুষেয় কথার অর্থ হল, যে জিনিষ কোন মানুষের দ্বারা সৃষ্টি বা রচিত হয়নি। পতঞ্জলি তাঁর যোগসূত্রে বলছেন যে শব্দ সনাতন নয়, শব্দ যে জ্ঞানকে প্রকাশ করছে সেই জ্ঞান হচ্ছে সনাতন। শব্দের বদলে আমাদের ঋষিরা আরেকটি শব্দ ব্যবহার করতেন তার নাম হচ্ছে স্ফোট, শব্দ আর স্ফোট সমার্থক। এখন যদি পঞ্চাশ জন লোককে রাম এই শব্দটা উচ্চারণ করতে বলা হয় তখন দেখা যাবে প্রত্যেকেরই রাম উচ্চারণ আলাদা হবে। আবার একই ভাষা এক জেলা থেকে অন্য জেলাতে এসে পাল্টে যাবে। আমাদের অনেকেই আত্মা শব্দকেই আত্তা উচ্চারণ করে। এখন আত্মাই বলুক আর আত্তাই বলুক আমরা বুঝতে পারি সে কি বলতে চাইছে। এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে যে যে কোন শব্দের দুটো দিক আছে- একটা হচ্ছে তার বাহ্যিক আকার আর আরেকটি হচ্ছে শব্দের অন্তর্নিহিত ভাব। এখন যে আত্মা বলছে আর যে আত্তা বলছে আমরা কিন্তু বুঝে নিচ্ছি যে আত্তা বলছে সেও সেই আত্মার কথাই বলতে চাইছে। তার মানে শুধু উচ্চারণের সঙ্গে শব্দের বিশেষ কোন সম্পর্ক নেই, উচ্চারণটা হচ্ছে শব্দের বাহ্যিক রূপ, জামা কাপড়ের আড়ালে একটা শরীর আছে যেটা হচ্ছে আসল বস্তু। শব্দের আসল বস্তুটা হচ্ছে অন্তর্নিহিত ভাব, যেটাকে জ্ঞান বলা হচ্ছে। যে কোন শব্দেরই এই দুটো দিক থাকবেই। জলকে যেমন বিভিন্ন নামে চিহ্নিত করা যায় কিন্তু জলের বিভিন্ন নাম একটা বস্তুকেই নির্দেশ করছে। বেদকে যখনই বলা হচ্ছে সনাতন ও অনন্ত তখন বেদকে শব্দের বাহ্যিক রূপের কথা বলা হচ্ছে না, এখানে বেদের অন্তর্নিহিত জ্ঞানের কথাকেই বলা হচ্ছে। যখন ‘ওঁ নমঃ শিবায়’ এই মন্ত্রটা বলা হল, তখন এটা হয়ে গেল মন্ত্রের বাহ্যিক রূপ। এই মন্ত্রের একটা অন্তর্নিহিত রূপও আছে। এখানে এই রুপটা কি- শিবের যে আসল স্বরূপ সেইটাকে জানার চেষ্টা। যিনি এই মন্ত্রের দ্বারা মন্ত্রের স্বরূপকে জেনে নিলেন, তিনি এখন ঐ মন্ত্রটাকে পাল্টে বলতে পারেন ‘ওঁ গং গণেশায় নমঃ’। এই মন্ত্রে বাহ্যিক রূপটা পাল্টে গেছে কিন্তু ভাবটা একই থেকে যাবে। এর মূল ভাবটা কি? সেই সচ্চিদানন্দম্‌। সেই এক সত্তাকে উদ্দেশ্য করে নির্দেশ করার জন্য কতকগুলি শব্দের ব্যবহার করা হচ্ছে। সে যে মন্ত্রই হোক না কেন, স্বামীজীর ওঁ হ্রীং ঋতম্‌ও এই একই নিয়মে সেই এক পরমসত্তাকে নির্দেশ করছে। এই যে বলছে ‘আবহী বরদে দেবী’ এখানেও বাকদেবীকে স্তুতি করা হচ্ছে, আবার এর মধ্যে পরমসত্তার জ্ঞানের কথাও রয়েছে।
এইটাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্বামীজী মাধ্যাকর্ষণের নিয়মের কথা নিয়ে এসে বলছেন- তোমরা কি মনে কর মাধ্যাকর্ষণের জ্ঞান কোথাও পড়েছিল আর নিউটন এসে সেটাকে আবিষ্কার করলেন? মাধ্যাকর্ষণের জ্ঞান আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। একটা মজার জোক আছে- একটা ক্লাশে পড়ান হচ্ছে আটারশো সালে অক্সিজেন আবিষ্কার হয়েছিল। ক্লাশের একটি মেয়ে এইটা শুনেই গালে হাত দিয়ে চিন্তায় পড়ে গেছে। শিক্ষক তাকে জিজ্ঞেস করছে ‘তুমি কি ভাবছ’? মেয়েটি বলছে ‘আঠারশো সালের আগে মানুষ মানুষ নিঃশ্বাস নিতো কিভাবে’? অক্সিজেন তো সব সময়েই রয়েছে। বেদের যে মন্ত্রগুলি আমরা পাচ্ছি এই মন্ত্রগুলিও আগে থাকতেই আছে। যুগ যুগ ধরে হিন্দুরা যে গায়ত্রী মন্ত্র উচ্চারণ করছে, এটাও আগে থাকতেই আছে। যুগ যুগ ধরে হিন্দুরা যে গায়ত্রী মন্ত্র উচ্চারণ করছে, এটাও আগে থাকতেই ছিল- ওঁ ভুর্ভবঃ স্বঃ তৎ সবিতুর্বরেণ্যং- এই সর্বলোকের যে মালিক তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলা হচ্ছে, হে প্রভু তুমি আমার বুদ্ধিকে পরিশ্রুত করে আলোকিত করে দাও যাতে সমস্ত জ্ঞান আমার মধ্যে আসতে পারে। এটাও হচ্ছে একটা জ্ঞান, কতকগুলি শব্দের মধ্যে তাকে রুপ দেওয়া হচ্ছে। প্রভুর কাছে যখন প্রার্থনা করা হচ্ছে তখন তার বুদ্ধি প্রচোদিত হয়ে যায়। এই জ্ঞান বা ভাব নিয়ে যদি কোন বাচ্চা ইংরাজী ভাষায় প্রার্থনা করে তাহলেও কাজ হবে। পার্থক্য হচ্ছে গায়ত্রী মন্ত্র হচ্ছে সিদ্ধ মন্ত্র, ধ্যানের গভীরে গিয়ে উচ্চকোটির মহান ঋষি বিশ্বামিত্র এই মন্ত্রটাকে বের করে এনেছিলেন। আর বাচ্চা ছেলেটা যা বলছে সেটা কতকগুলি মামুলি শব্দের বিন্যাস মাত্র। কিন্তু সেও যদি এই জ্ঞানের ভাবে পরিপূর্ণ হয়ে আবৃত্তি করে তাহলেও কাজ হবে। কারণ যে কোন জ্ঞান হচ্ছে সনাতন। মাধ্যাকর্ষণের জ্ঞানকে যে ভাষাতেই বলা হোক না কেন তার জ্ঞানটাতো আর পাল্টে যাবে না। শব্দ দিয়ে যে জ্ঞানের দিকে ঈঙ্গিত করা হয় সেই জ্ঞানটা হচ্ছে সনাতন। এইটাই হচ্ছে পতঞ্জলির যোগসুত্রের ব্যাখ্যা।

ক্রমশঃ