(১) শ্রীকৃষ্ণ-ভারতের ইতিহাসে প্রাণস্থানীয়; কেন-না, বিপ্লবের বিষম আবর্ত্তে পতিত ভারত তরণীকে তিনিই রক্ষা করিয়াছিলেন।


(১) শ্রীকৃষ্ণ-ভারতের ইতিহাসে প্রাণস্থানীয়; কেন-না, বিপ্লবের বিষম আবর্ত্তে পতিত ভারত তরণীকে তিনিই রক্ষা করিয়াছিলেন।

[শ্রীকৃষ্ণ-বিপ্লব হিন্দু-সমাজের রক্ষাকর্ত্তা, -লোপপ্রাপ্ত প্রাচীন জাতি সমূহের সহিত হিন্দু-জাতির তুলনায়;- শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব-কালে ভারতের রাজনৈতিক, সামাজনৈতিক ও ধর্ম্মনৈতিক অবস্থার চিত্র,-কংস, জরাসন্ধ, দুর্য্যোধন প্রভৃতির প্রসঙ্গে এবং তাৎকালীন সমাজের ব্যভিচারাদের বিষয় উল্লেখ্য]


শ্রীকৃষ্ণ-ভারতের ইতিহাসে প্রাণস্থানীয়
পৃথিবীর উপর দিয়া বিবর্ত্তনের কি প্রবল প্রবাহই চলেছে! কতই ভাঙ্গিছে-কতই গড়িছে। কত জাতির অভ্যুত্থান ও অধঃপতন ঘটল,- কত নব নব সাম্রাজ্য, কত নব নব ধর্ম্ম-সম্প্রদায়, কত ভাবে কালের ক্রোড়ে ক্রীড়া করে গেল! কিন্তু সেই বিশ্ব-বিপ্লবকারী বিবর্ত্তন-প্রবাহের মধ্যেও ভারতবর্ষ আপনার স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করতে সমর্থ হইল। সে দেখল-তাহার চক্ষুর উপর কত জাতি কত ভাবে ভেসে গেল! সে দেখল- কালের তাণ্ডব লীলা কত সম্প্রদায়কে কেমন ভেঙ্গে গড়ে নিয়েছে! কিন্তু, কি আশ্চর্য্য, তাহার উপর বিবর্ত্তনের সে প্রভাব কার্য্যকরী হইল না! কি জানি, কোন্‌ মহীয়সী মহিমা সে বিপ্লবে তাহাকে রক্ষা করল! জল-বুদবুদের ন্যায় কত জাতি উঠল ও মিশে গেল; কিন্তু ভারতবর্ষের হিন্দু-জাতি অক্ষুন্ন রইল! কত সমাজ কত ধর্ম্ম-সম্প্রদায় কত চাকচিক্যই দেখাবার প্রয়াস পেল, কিন্তু জলদ-কোলে ইন্দ্রধনুর ন্যায় তাহাদের অস্তিত্ব কোথায় লুকায়ে গেল! অথচ, সূসূর্য্যসম প্রভাববান্‌ হয়ে রহিল-ভারতবর্ষের সনাতন ধর্ম, আর সেই হনাতন ধর্মের অনুসারী এই সনাতন ধর্মাবলম্বী/হিন্দু-জাতি। যখন দেখিতে পাই বিবর্তনই বিশ্বজনীন নিয়ম; তখন সেই নিয়মের ব্যতিক্রমকারী এ অভাবনীয় অচিন্ত্য-পূর্ব্ব ঘটনার কারণ কি? এক কারণ-ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। শুভক্ষণে ভারতভূমিতে কৃষ্ণচদ্রের আবির্ভাব হইয়াছিল; – তাই সেই বিবর্তনের বিষম সঙ্কটের দিনেও হিন্দুজাতি রক্ষা পেয়ে গেল! শ্রীকৃষ্ণ যদি ভারতবর্ষে আবির্ভূত না হতেন তাহা হলে বোধ হয়, ‘ভারতবর্ষে’ নাম পর্য্যন্ত লোপ পেত; তাহা হলে বোধহয়, ‘হিন্দুস্থান’ সংজ্ঞা ইতিহাসের অঙ্গ হইতে মুছিয়া যেত; তাহা হলে বোধ হয় পৃথিবীর অন্যান্য লোপ-প্রাপ্ত প্রাচীন জাতি-সমূহের নামের সঙ্গে, ‘হিন্দুর’ নামটি মাত্র ক্বচিৎ গ্রথিত থাকিত! কোথায় সে প্রাচীন মিশর-কাল প্রচাবে ভাসিতে ভাসিতে গিয়া কাহার অঙ্গে অঙ্গ মিশাইয়া দিল! সে জাতির কীর্ত্তি-স্তম্ভ পিরামিড-স্তুপ!- তুমি কি সাক্ষাৎ দিতে পার- তোমার সেই লোক প্রসিদ্ধ নির্ম্মাতৃগণ এখন কি ভাবে কোথায় অবস্থান করিতেছেন! প্রাচীন রোম! -প্রাচীন গ্রীস! -তোমরা তো জগতের বক্ষে সে দিন মাত্র ক্রিড়াশীল ছিলে! -টমরাই বা এখন কোথায় কি ভাবে অবস্থিতি করিতেছ? কাল-প্রবাহে বিচরণশীল আসিরীয়া, বাবিলন, ফিনিসীয়া-বুদ্‌বুদের প্রায় কোথায় মিশে গেল? প্রাচীন কাহারও কোনোও পরিচয়-চিহ্ন-ক্রম-পর্য্যায়-কোথাও অনুসন্ধান করিয়া মিলবে না। কিন্তু সে পরিচয় অক্ষুন্ন আছে-ভারতবর্ষে। ভারতবর্ষ আজও তারস্বরে ঘোষণা করিতে সমর্থ-তাহার পিতৃ-পরিচয়ের এখনও ক্রমভঙ্গ হয় নাই। সেই হিন্দু, আজিও আপনাকে হিন্দু বলিয়া পরিচয় দিতে স্পর্দ্ধা অনুভব করিতে পারেন; সেই ব্রাহ্মণ-আজিও আপনাকে বরণ্যে আসনে অধিষ্ঠিত রাখিতে সমর্থ আছেন। এ ক্রম-পর্য্যায় রক্ষার মূলাধার-ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। শ্রীকৃষ্ণ-ভারতের ইতিহাসে তাই প্রাণস্থানীয়।

বিপ্লব-বিভীষিকার চিত্র।
শ্রীকৃষ্ণ-বিপ্লব হিন্দু-সমাজের রক্ষাকর্ত্তা- (প্রথম ভাগ)
(-লোপপ্রাপ্ত প্রাচীন জাতি সমূহের সহিত হিন্দু-জাতির তুলনায়;- শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব-কালে ভারতের রাজনৈতিক, সামাজনৈতিক ও ধর্ম্মনৈতিক অবস্থার চিত্র,-কংস, জরাসন্ধ, দুর্য্যোধন প্রভৃতির প্রসঙ্গে এবং তাৎকালীন সমাজের ব্যভিচারাদের বিষয় উল্লেখ্য।)
কি বিপ্লব-বিপদ হইতেই শ্ৰীকৃষ্ণ ভারতবর্ষকে রক্ষা করিয়াছিলেন ? রাষ্ট্র-বিপ্লব, ধৰ্ম্ম-বিপ্লব, সমাজ-বিপ্লব, নীতি-বিপ্লব—যত প্রকার বিপ্লব সম্ভবপর, ভারতবর্ষে সেই সকল বিপ্লব সঙ্ঘটিত হইতে আরম্ভ হইয়াছিল। তখন রাজন্যবর্গ কি দুবৃত্ত-দুশ্চরিত্র হইয়াই উঠিয়াছিলেন! যে জাতির মূল-মন্ত্ৰ—“পিতা স্বর্গ পিতা ধর্ম পিতাহি পরমন্তপঃ’; সে জাতির অধিপতি হুইয়া, রাজচক্রবর্ত্তী কংস আপনার পিতা উগ্রসেনকে কারাগারে বন্দী করিয়া রাখিতে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন! রাজার রাজধর্ম-পালনে ব্যভিচার, ইহার অধিক আর কি হইতে পারে? সৌভ্রাত্র্য যে জাতির শ্রেষ্ঠ শিক্ষা, সে জাতির নৃপতি দুৰ্য্যোধন বঞ্চনায় ভ্রাতৃগণকে হৃতসৰ্ব্বস্ব করিতে উদবুদ্ধ হইয়াছিলেন। তারপর, কি ভীষণ!-কি লোমহর্ষণ!-জরাসন্ধের অত্যাচার! জরাসন্ধ শঙ্কর-পূজার অছিলায় নরবলি প্রদান করিতেন; আর তাঁহার সেই অত্যাচারে কত গৃহস্থকে প্রাণভয়ে দেশান্তরে পলায়ন করিতে হইয়াছিল!(জরাসন্ধের নরবলির বিষয়-মহাভারত, সভাপর্ব্ব, দ্বাবিংশ অধ্যায় প্রভৃতি দ্রষ্টব্য)সমাজের এ অধঃপতনের কি তুলনা আছে ? রাজার এবম্বিধ অত্যাচারের কি পার আছে ? কেবল কি প্রজার প্রতি এই অত্যাচার ? শ্বসভ্য রাজনীতির নিয়ম অনুসারে অধীন করদ-মিত্র রাজন্যবর্গ প্রধান রাজার আশ্রয়-লাভে শান্তিসুখে সুখী থাকেন। কিন্তু জরাসন্ধের আধিপত্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায়, তাঁহাদের কি দুর্দশাই উপস্থিত হইয়াছিল! তাঁহারা জরাসন্ধের অত্যাচারে দিবারাত্রি পরিত্রাহি ডাক ডাকিতেছিলেন। ইতিহাসে প্রকাশ, পারিপার্শ্বিক এক শত ক্ষুদ্র রাজ্য, জরাসন্ধের বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য হইয়াছিল; কিন্তু জরাসন্ধ সুযোগক্রমে সেই সকল নৃপতিকে নরবলি প্রদান করিবেন। অপিচ, তখন ভারতএমন কেহই সামর্থ্যবান ছিলেন না যে, জরাসন্ধে! সে অত্যাচারের বাধা দিতে পারেন। রাজসূয়-যজ্ঞ সম্পাদনে মহামতি যুধিষ্ঠির যখন রাজচক্রবর্ত্তী বলিয়া পরিচিত হইবেন স্থির হয়, তখন সে অত্যাচার-নিবারণে তাঁহারও বিক্রম, বিভীষিকা দেখিয়াছিল। জরাসন্ধের অত্যাচারের বিষয় জ্ঞাপন করিয়া শ্রীকৃষ্ণ যখন কহিলেন,- “সেই এক শত অধীন নৃপতির মধ্যে ষড়শীতি ভূপতি জরাসদ্ধ কর্ত্তৃক সমানীত হইয়া বলিদানার্থ নিরুপিত রহিয়াছেন। কেবল চতুর্দ্দশ মাত্র অবশিষ্ট আছেন, তাঁহারা হস্তগত হইলে, ঐ ঘোরতর ক্রুর কর্ম্ম অচিরে সম্পদিত হইবে। অতএব ঐ ব্যাপারে যিনি বিঘ্ন প্রদান করিতে সমর্থ হইবেন, তিনিই প্রদীপ্ত যশোরাশি লাভ করিতে পারিবেন, এবং যিনি তাঁহাকে জয় করিতে পারিবেন, তিনি নিশ্চই সাম্রাজ্য ভোগ করিবেন।” কিন্তু স্মরণ করিয়া দেখুন, যুধিষ্টির তাহাতে কি উত্তর দেন! জরাসদ্ধের ন্যায় প্ররাক্রমশালী নৃপতি বিদ্যমান থাকিতে, তাঁহার রাজসূয়-যজ্ঞ সম্পন্ন হওয়া এক রূপ অসম্ভব বলিয়াই তিনি ব্যক্ত করেন। অধিকন্তু শ্ৰীকৃষ্ণ যখন উৎসাহ-সহকারে জরাসন্ধ-বধের প্রস্তাব করেন, যুধিষ্ঠির হতাশ-ভাব-প্রকাশে কহিয়াছিলেন,—“আমি মনে করি, ভীমাজ্জুন আমার নেত্র-যুগল, আর তুমি আমার মন। অতএব নয়ন-মন বিহীন হইয়া আমি কিরুপে জীবিত থাকিব? ফলতঃ, অত্যাচারীর অত্যাচারদমনের সামর্থ্যও তখন লোপ পাইয়াছিল। রাজশক্তি বিচ্ছিন্ন হওয়ায়, যথেচ্ছাচারিতা যেন রাজ্য বিস্তার করিয়া বসিয়াছিল। যেমন জরাসন্ধ, তেমনই শিশুপাল। শিশুপাল চেদীদেশের অধিপতি ছিলেন। তিনি ভগদ্বিদ্বেষী ঘোর অত্যাচারী হইয়া উঠিয়াছিলেন। ভেদবুদ্ধি শিক্ষা দেওয়াই যেন তাঁহার রীতি-নীতি হইয়া দাড়াইয়াছিল। ভগবদ্ভক্তি, ভগবৎ-প্রীতি মানুষ যাহাতে বিস্মৃত হইয়া যায়, চেদীপতি শিশুপালের কার্য্যে ও বাক্যে সেই শিক্ষাই বিকাশমান। পৌণ্ড্রদেশের অধিপতি বাসুদেব কর্ত্তৃক ভগবানের প্রতি বিদ্রুপপ্রকাশই বা কি শিক্ষা দিতেছিল? মানুষ ভগবানের প্রতি বিদ্রুপপরায়ণ হউক-এ কি নীচ শিক্ষা! এইরূপ কত দিকে কত ভাবে উচ্ছৃঙ্খলা রাজত্ব করিয়া বেড়াইতেছিল, তাহার ইয়ত্তা হয় না। তখন রাজশক্তি কি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হইয়াই পড়িয়াছিল!
উত্তর-দক্ষিণ পূর্ব্ব-পশ্চিম—ভারতের যে প্রান্তে দৃষ্টিপাত করিবেন, সেই দিকেই দেখিতে পাইবেন, রাজলক্ষ্মী কাঁদিয়া কাঁদিয়া আশ্রয় অনুসন্ধান করিয়া বেড়াইতেছিলেন। উত্তরে দেখুন- কত রাজ্য কত জনপদ আপনাপন ক্ষুদ্র-শক্তির গরবে অধীর হইয়া যথেচ্ছাচার আরম্ভ করিয়াছে, আর সেই সুযোগে কত বৈদেশিক আচারভ্রষ্ট জাতি ভারতের দ্বারে প্রবেশোন্মুখ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। পূর্ব্বে পশ্চিমে দক্ষীণে-সকল দিকেই সমান বিশৃঙ্খলা-সমান বিভিষিকা! বর্ত্তমান ইতিহাস বলিয়া থাকে,-‘আলেক্‌জাণ্ডারের ভারতাক্রমণই বিধর্ম্মী বৈদেশিক জাতিগণের ভারতের সহিত প্রথম সম্বদ্ধ স্থাপন।’ *স্বার্দ্ধ দ্বিসহস্র বৎসর পূর্ব্বের ইতিহাস হিসাবে সেই আক্রমণই প্রথম আক্রমণ বলিয়া মনে করা যাইতে পারে বটে, কিন্তু যে সময়ের প্রসঙ্গ উত্থাপন করিয়াছি, তখনও একবার ভারতের সেই অবস্থার উপক্রম হইয়াছিল। ভারত হইতে বিতাড়িত আচার ভ্রষ্ট পারদ-পহ্নব-চীন-যবনাদি জাতিগণ তখনও পূর্ব্ব-অপমান পূর্ব্ব-শত্রুতা বিস্মৃত হইতে পারে নাই। পরস্তু, তখনও তাহারা ভারতবর্ষকে গ্রাস করিবার জন্য জিহবা-লেহন করিতেছিল, আর ধীরে ধীরে আহার্য্যের অন্বেষণে অগ্রসর হইতেছিল। যেমন রাষ্ট্র বিপ্লব, তেমনই সমাজ-বিপ্লব ও নীতি বিপ্লব সঙ্ঘটিত হইয়াছিল। যাঁহারা আদর্শ-স্থানীয় হইবেন, তাঁহারাই তখন কি কলুষ-চরিত্রের পরিচয় দিতে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। যখন দেখিতে পাই-যুধিষ্ঠিরের ন্যায় আদর্শ পুরুষ বিভ্রান্ত দ্যূতক্রীড়াসক্ত, আর তাহাতে রাজ্য-সাম্রাজ্য-এমন কি, সহধর্ম্মিণীকে পর্য্যন্ত পণ করিতে অকুন্ঠিত-চিত্ত, তখন সমাজ যে কি অধঃপাতে যাইতে বসিয়াছিল, তাহা সজজেই উপলব্ধি হয় না কি? কলির আগমনের সূচনা, তাৎকালিক বহু নর-চরিত্রেই যেন প্রকাশ পাইতেছিল। নীতি কি বিকৃতি-প্রাপ্তই হইয়াছিল। রাজদণ্ডধর রাজার সভায় রজঃস্বলা রমণীকে কেশাকর্ষণে লইয়া গিয়া বিবস্ত্র-করণের চেষ্টা-ইহার অধিক নীতিবিগর্হিত কার্য্য আর কি হইতে পারে? সমাজ-বন্ধন কি শিথিল হইয়াই পড়িয়াছিল! সম্ভান্ত পরিবারের মধ্যে বর্ণসঙ্কর সৃষ্টি, আর গান্ধর্ব্ব-রাক্ষসাদি বিবাহের প্রবর্ত্তনা-সমাজের অধঃপতনের কি ভীষণ চিত্রপট নয়ন-পথে প্রতিফলিত করে! তখন সচ্চরিত্র সাধু-সজ্জন যে একেবারে অন্তর্হিত হইয়াছিলেন, তাহা বলিতেছি না, তবে কুচরিত্র কদাচারের প্রশ্রয় যে দিন-দিনই বৃদ্ধি পাইতেছিল, আর প্রসিদ্ধ প্রধান সংসারবিশেষের মধ্যে যে ব্যভিচার স্রোতে প্রকাশ পাইয়াছিল, তাহাতে কোনই সংশয় নাই। সেই অবস্থাই অধর্ম্মের অভ্যুদয়ের অবস্থা। গীতায় যে শ্রীভগবান বলিতেছেন,-
“যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত ।
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্ ।।”
‘হে ভারত! যখনই যখনই ধর্ম্মের হানী ও অধর্মের আধিক্য হয়, তখনই তখনই আমি নরদেহ ধারণ করিয়া ভূভার-হরণে অবতীর্ণ হই’ পারিপার্শ্বিক অবস্থার আলোচনার সেই সময়ই উপস্থিত হিয়াছিল বলিয়া মনে হয় না কি? ফলতঃ, সে বিশৃঙ্খলার ভাব যদি বর্দ্ধমান থাকিত, সে বিলাস-ব্যসনের স্রোতে সমাজ যদি ভাসমান হইত, তাহা হইলে ভারতের হিন্দুজাতির অস্তিত্ব কোন্‌ দিন কোথায় লুকাইয়া যাইত। পাপের এই প্রবল বন্যার মাঝে, সমাজ-বিপ্লবের এই খর-স্রোত-সন্মুখে, গিরিবরের ন্যায় বিলাশ বৃক্ষ বিস্তার করিয়া যিনি দণ্ডায়মান হইয়াছিলেন, আর যাঁহার প্রভাবে সেই প্রচণ্ডগতি পরিবর্ত্তত হইয়াছিল; তাঁহার মহিমার কি পরিসীমা আছে? শ্রীকৃষ্ণ অপরিসীম প্রভাববান হইয়াছিল; তাঁহার মহিমার কি অপরিসীমা আছে? শ্রীকৃষ্ণ-সেই অপরিসীম প্রভাববান; বিপ্লবের বিষম আবর্ত্তে নিপতিত ভগ্নপ্রায় ভারত-তরণিকে তিনিই তখন রক্ষা করিয়াছিলেন।


*আধুনিক ইতিহাস হিসাবে আলেকজাণ্ডারের আক্রমণই প্রথম আক্রমণ বটে, কিন্তু অন্য দেশে অন্য জাতির স্বতন্ত্র ভাবে প্রতিষ্ঠার পূর্ব্বে ভারত হইতে বিতাড়িত জাতিরা যে মধ্যে মধ্যে ভারত আক্রমণের চেষ্টা পাইয়াছিল, মহাভারতে তাহার আভাষ পাওয়া যায়।


পৃথিবীর ইতিহাস – পঞ্চম খণ্ড (দুর্গাদাস লাহিড়ী)
সংকলনে- ‪#‎কৃষ্ণকমল‬

Advertisements

শ্রীকৃষ্ণ – (সকল তত্ত্বের আদর্শ- তিনিই সত্য-স্বরূপ)



(১) শ্রীকৃষ্ণ-ভারতের ইতিহাসে প্রাণস্থানীয়; কেন-না, বিপ্লবের বিষম আবর্ত্তে পতিত ভারত ত রণীকে তিনিই রক্ষা করিয়াছিলেন।
(২) শ্রীকৃষ্ণ সাম্রাজ্য-প্রতিষ্ঠাতা; কেন-না, তিনি বিচ্ছিন্ন রাজ শক্তিকে কেন্দ্রীভূত করিয়াছিলেন।
(৩) শ্রীকৃষ্ণ- স্বয়ং ভগবান; কেন-না, সকল ভগবদ্বিভূতি তাঁহাতে বিদ্যমান দেখি।
(৪) শ্রীকৃষ্ণ- পরম দার্শনিক; কেন-না, তিনি সাংখ্য পাতঞ্জলাদি সকল দর্শনের সার-সমন্বয় সাধন করিয়া গিয়াছেন।
(৫) শ্রীকৃষ্ণ- পরম জ্ঞানী; কেন না, জ্ঞানের চরম স্ফূর্ত্তি তাঁহাতে প্রকাশ পাইয়াছেন।
(৬) শ্রীকৃষ্ণ- পরম যোগী; কেন-না, যোগের সকল অঙ্গ সার তত্ত্ব তিনি প্রদর্শন করিয়া গিয়াছেন।
(৭) শ্রীকৃষ্ণ- পরম প্রেমিক; কেন-না, তিনি বিশ্বপ্রেমের মূলাধাররূপে বিদ্যমান আছেন।
(৮) শ্রীকৃষ্ণ- পরম নীতিবৎ; কেন-না, রাষ্টনীতি, সমাজনীতি, ধর্ম্মনীতি-সকল নীতিশিক্ষাদানেই তাঁহার মহিমা বিকশিত।
(৯) শ্রীকৃষ্ণ- সনাতন ধর্ম্মের উদ্ধারকর্ত্তা; কেন-না ধর্ম্ম সাম্রাজ-প্রতিষ্ঠায় আদর্শ তিনি প্রদর্শন করিয়া গিয়াছেন।
(১০) শ্রীকৃষ্ণ- পরম ত্যাগী; কেন-না, তিনি সকল ত্যাগের সারভূত কর্ম্মের প্রবর্ত্তক।
(১১) শ্রীকৃষ্ণ- সকল সত্য তত্ত্বের আদর্শ, কেন-না, তিনিই সত্য-স্বরূপ।

ক্রমশঃ-

আসন্ন জন্মাষ্টমী উৎসব উপক্ষ্যে ‘শ্রীকৃষ্ণ’ বষয়ক বিশেষ পোষ্ট-
পৃথিবীর ইতিহাস – পঞ্চম খণ্ড (দুর্গাদাস লাহিড়ী)
সংকলনে- #কৃষ্ণকমল।