ঈশোপনিষদ-ভূমিকা।


ishoponishod
ভূমিকা
যাহা সংসারের কারণীভূত অবিদ্যাকে সম্পূর্ণরূপে বিনাশ করে, তাহাকে উপনিষৎ বা ব্রহ্মবিদ্যা বলে। ব্রহ্মবিদ্যাপ্রতিপাদক গ্রন্থও উপচারবশতঃ উপনিষৎ নামে অভিহিত হয়। ব্রহ্মবিদ্যাপ্রতিপাদক গ্রন্থসমূহ অবিদ্যা ও অবিদ্যাপ্রসূত সংসারকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করিয়া আমাদের শরীরকে ব্রহ্মাবাপ্তির যোগ্য করিয়া থাকে এবং আমাদের আত্মাকে ব্রহ্মভাবে উন্নীত করে। এই জন্য আচার্য্যগণ ব্রহ্মবিদ্যাপ্রতিপাদক গ্রন্থসমূহকে উপনিষৎ বলিয়া কহিয়াছেন*। প্রতিপাদকরূপে সৎসরূপ আত্মার সমীপস্থ বলিয়াও ইহাকে উপনিষৎ বলিতে পারা যায়।
বেদ কর্ম্মকাণ্ড ও জ্ঞানকাণ্ড ভেদে দুই ভাগে বিভক্ত। কর্ম্মকাণ্ডকে কল্প এবং জ্ঞানকাণ্ডকে রহস্য বলা হয়। মীমাংসকগণ বেদকে মন্ত্র ও ব্রাহ্মণ, এই দুই ভাগে বিভক্ত করিয়াছেন।+ বেদের সংহিতা ভাগে মন্ত্র এবং ব্রাহ্মণ ভাগে ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষৎ উপনিবদ্ধ আছে। মন্তগুলি যজ্ঞাদি কার্য্যে ব্যবহৃত হয়। ব্রহ্মণে যজ্ঞের প্রণালী এবং দুরূহ মন্তসমূহের ব্যাখ্যান প্রদত্ত হইয়াছে। এই জন্য পাশ্চাত্ত্য পণ্ডিতগণ ব্রাহ্মণকে বেদের অংশ বলিয়া স্বীকার করেন না, কিন্তু বেদের ব্যাখ্যা বলিয়া অভিহিত করেন। অরণ্যে রচিত এবং আরণ্যকগণের কর্ত্তব্যের প্রতিপাদক বলিয়া ব্রহ্মণের অংশবিশেষ আরণ্যক নামে আখ্যাত। ব্রহ্মবিদ্যা প্রতিপাদক ব্রহ্মণের অংশ উপনিষৎ রূপে পরিচিত। উপনিষদের অপর নাম বেদান্ত। বেদের অন্তঃ বা প্রতিপাদ্য উপনিষদে রহিয়াছে বলিয়া বেদান্ত এই নামটি সার্থক
উপনিষদে ব্রহ্মতত্ত্ব, জীবতত্ত্ব ও প্রকৃতি-তত্ত্বের সবিশেষ আলোচনা রহিয়াছে। উপনিষৎগুলির মধ্যে ঈশ, কেন, কঠ, প্রশ্ন, মুণ্ডক, মাণ্ডুক্য, তৈত্তরীয়, ঐতরেয়, শ্বতাশ্বতর, ছান্দোগ্য, বৃহদারণ্যক ও মৈত্রায়ণী-এই দ্বাদশখানি প্রাচীন ও প্রামাণিক। আচার্য্য শঙ্কর এই দ্বাদশখানি উপনিষদের ভাষ্য প্রণয়ণ করিয়াছেন।
বেদের সহিত নিরবিচ্ছিন্নভাবে সম্বন্ধ বলিয়া উপনিষৎগুলিও সাধারণতঃ ঋগাদি বেদভেদে চারিটি প্রধান ভাগে বিভক্ত। ঋগ্‌বেদীয় উপনিষৎগুলির মধ্যে ঐতরেয় ও কৌষীতকী প্রসিদ্ধ। সামবেদের ছান্দোগ্য ও কেন; শুক্লযজুর্বেদের বৃহদারণ্যক প্রসিদ্ধ। সামবেদের ছান্দোগ্য ও কেন; শুক্লযজুর্বেদের বৃহদারণ্যক ও ঈশ; কৃষ্ণ যজুর্বেদের তৈত্তিরীয়, কঠ ও শ্বতাশ্বতর; এবং অথর্ববেদের প্রশ্ন, মুণ্ডক, মাণ্ডুক্য, অথর্ব শিরা এবং ব্রহ্ম প্রসিদ্ধ। মুক্তিকা উপনিষদের মতে ঋগ্‌বেদের একুশ, যজুর্বেদের একশত নয়, সামবেদের সহস্র এবং অথর্ববেদের পঞ্চাশটি শাখা ছিল এবং প্রত্যেক শাখার একখানি করিয়া উপনিষৎও ছিল; সুতরাং উপনিষদের মোট সংখ্যা ছিল এগারশত আশি। উক্ত উপনিষদে নিম্নলিখিত ১০৮খানি উপনিষদের নাম দেওয়া ইয়াছে। ঋগ্‌বেদীয় উপনিষদের দশ, সামবেদীয় উপনিষদের ষোল, যজুর্বেদীয় উপনিষদের একান্ন (শুক্ল ১৯ ও কৃষ্ণ ৩২) এবং অথর্ববেদীয় উপনিষদের একত্রিশ,-এই অষ্টোত্তরশত। ইহা ব্যতীত ও আর অনেক উপনিষদের অভ্যুত্থান হইয়াছিল।
প্রতিপাদ্য বিষয় অনুসারে উপনিষৎগুলি তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত হইতে পারে। ঐতরেয়, ছান্দোগ্য, কেন, তৈত্তীরীয়, ঈশ, বৃহদারণ্যক, কঠ, প্রশ্ন, মূণ্ডক, মাণ্ডুক্যপ্রভৃতি উপনিষদে জীবের মুক্তি ও ব্রহ্মের স্বরূপ সবিশেষ আলোচনা রহিয়াছে; অতএব এই সকল উপনিষৎকে পারমার্থিক উপনিষৎ বলা যাইতে পারে। গর্ভ, আর্ষিক, জাবাল, কঠশ্রুতি, আরুণিক, সংন্যাস প্রভৃতি উপনিষদে প্রধানভাবে জীব ও ব্রহ্মের একত্ব প্রতিপাদিত হইয়াছে; সুতরাং এই শ্রেণীর উপনিষৎগুলিকে মুমুক্ষুপজীব্য উপনিশৎ বলা যায়। নারায়ণ, কৃষ্ণ, শিব রাম, দেবীপ্রভৃতি উপনিষৎ সাম্প্রদায়িক ভাবের অভিব্যঞ্জক বলিয়া সাম্প্রদায়িক উপনিষৎ নামে অখ্যাত হইতে পারে।
বৈদিকাচার্য্য সত্যব্রত সামশ্রমীর মতে উপনিষৎগুলি বৈদিক, আর্য্য, কাব্য ও কৃত্রিমভেদে চারি প্রকার। ঈশ, কেন, তৈত্তিরীয়, কৌষীতকী, বৃহদারণ্যক, ছান্দ্যোগ্য প্রভৃতি যে সকল উপনিষদে বৈদিক ধর্ম্মতত্ত্ব উপনিবদ্ধ আছে, তাহারা বৈদিক উপনিষৎ। মাণ্ডুকেয় প্রভৃতি যে সকল উপনিষদে সংহিতার মন্ত্র প্রমাণরূপে উদ্ধৃত হইয়াছে, তাহাদিগকে আর্য উপনিষৎ কহে। নারায়ণ, নৃসিংহ, সরস্বতী, গণেশ প্রভৃতি যে সকল উপনিষদ সাম্প্রদায়িক দেবতা বিশেষ ব্রহ্ম বা ব্রহ্মশক্তিরূপে কীর্ত্তিত হইয়াছেন, তাহাদিগকে কাব্যোপনিষৎ বলে। কতকগুলি আধুনিক সম্প্রদায় স্বীয় মতের পরিপোষক কোন প্রামাণ্য গ্রন্থ না পাইয়া, উক্ত উদ্দেশ্যসিদ্ধির অভিপ্রায়ে যে সকল উপনিষৎ রচনা করিয়াছেন, তাহাদিগকে কৃত্রিম উপনিষৎ বলে। গোপালতাপনী, নৃসিংহতাপনী প্রভৃতি উপনিষৎ এই শ্রেণীর অন্তর্গত। এতদ্ব্যতীত অনেকে জীবিকার নিমিত্ত অর্থের অভিপ্রায়ে উপনিষৎ নাম দিয়া কতকগুলি গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন। এই শ্রেণীর উপনিষৎকে জীবকোপনিষৎ নাম দেওয়া যাইতে পারে। আল্লোপনিষৎ প্রভৃতি এই শ্রেণীভুক্ত।
উপনিষদের গভীর ও সরস উপদেশে অনুপ্রাণিত হইয়া, সাধারণ লোকের মধ্যে উহার প্রচারের উদ্দেশ্যে অনেকে বিভিন্ন ভাষায় ইহাদের অনুবাদ করিয়াছেন। মোগল সম্রাট্‌ আরঙ্গজেবের ভ্রাতা কতিপয় উপনিষদের ফার্সি অনুবাদ করাইয়াছিলেন। পাশ্চাত্ত্য মনীষিগণের মধ্যে ভট্ট মোক্ষমূলার, ডসেন, বার্ণেট, কাউএল, রোয়ার প্রভৃতির নাম এ সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য। ইহারা যে শুধু অনুবাদ করিয়াছেন তাহাই নহে, কিন্তু এতৎসম্পর্কে প্রবন্ধাদি রচনা করিয়াও এই সকল গ্রন্থকে জনসমাজে হৃদয়গ্রাহী করিতে প্রয়াস পাইয়াছেন। উপনিষদের ভাবগাম্ভীর্য্যে মোহিত হইয়া জার্ম্মাণীর প্রসিদ্ধ দার্শনিক পণ্ডিত শোপেনহর বলিয়াছেন- “এরূপ আত্মোৎকর্ষ বিধায়ক গ্রন্থ আর দ্বিতীয় নাই; ইহা আমাকে জীবনে শান্তি দিয়াছে, মৃত্যুতেও শান্তি দিবে।” বাঙ্গালীদিগের মধ্যে প্রথমে রাজা রামমোহন রায়, উপনিষৎ প্রচারের জন্য লেখনী ধারণ করিয়াছিলেন এবং ইংরাজী ও বাঙ্গালা ভাষায় উহার তর্জমা করিয়া প্রকাশ ও প্রচার করিয়াছিলেন। এই সকল চেষ্টার ফলেই আধুনিক শিক্ষিত নরনারীর হৃদয়ে উপনিষৎপ্রীতি জাগ্রত হইয়াছে। সরল ভাষায় উপনিষদের প্রচার হইলে, দেশের নরনারীর উৎসাহ বর্দ্ধিত হইবে এবং শঙ্করের মতবাদ প্রচারের সহায়ক হইবে মনে করিয়া বঙ্গীয় শঙ্করসভা এই দুরূহ কার্য্যে হস্তক্ষেপ করিয়াছেন। আশাকরি জনসাধারণের সহানুভূতি পাইতে এ সভা বঞ্চিত হইবে না।

++। জ্ঞানকাণ্ডের অন্তর্গত বলিয়া উপনিষৎকে রহস্য ও বলা হয়।
*উপনীয়েমমাত্মানং ব্রহ্মাপাস্তদ্বয়ং ততঃ।
নিহস্ত্যবিদ্যাং তজ্জং চ তস্মাদুপনিষন্মাতা।
+মন্ত্রব্রাহ্মণয়ো র্বেদনামধেয়ম্‌।
++বেদান্ত বলিতে আমরা সাধারণতঃ ব্যাসের ব্রহ্মসূত্রকে বুঝিয়া থাকি। উপনিষদের সারসংগ্রহ করিয়াই ব্রহ্মসূত্র রচিত হইয়াছে।

বিনত নিবেদক
শ্রীমাধবদাস দেবশর্ম্মা সাংখ্যতীর্থ

বৃহদারণ্যক উপনিষদ – প্রথম অধ্যায় – প্রথম ব্রাহ্মণ – প্রথম শ্লোক


বৃহদারণ্যক উপনিষদ – প্রথম অধ্যায় – প্রথম ব্রাহ্মণ – প্রথম শ্লোক
১.০১.১ অশ্বমেধযজ্ঞাঙ্গ উপাসনা—কালপ্রভৃতিতে অশ্ব ও তদবয়বচিন্তা এবং অশ্ব ও তদবয়বে কালাদিচিন্তা কথন
অশ্বমেধ-যজ্ঞীয় অশ্বের মস্তকাদি অঙ্গে উষাকাল প্রভৃতি চিন্তার বিধান হইতেছে,—যজ্ঞীয় অশ্বের মস্তক হইতে উষা অর্থাৎ ব্রাহ্ম মুহূর্ত্ত; চক্ষু হইতে সূর্য্য; প্রাণ হইতেছে বায়ু; বিবৃত মুখ হইতেছে বৈশ্বানরনামক অগ্নি; দেহ হইতেছে সংবৎসর; পৃষ্ঠ হইতেছে দ্যুলোক; উদর হইতেছে অন্তরিক্ষ; পাদাধিষ্ঠান হইতেছে পৃথিবী; পার্শ্বদ্বয় হইতেছে দিক্‌সমূহ; পার্শ্বাস্থিসমূহ হইতেছে অবান্তর দিক্‌সমূহ (কোণসমূহ); অবয়ব সমূহ হইতেছে ছয় ঋতু; অঙ্গসন্ধিসমূহ হইতেছে মাস ও অর্দ্ধমাস (এক এক পক্ষ); প্রতিষ্ঠা বা পদসমূহ হইতেছে দিনরাত্র; অস্থি সমূহ হইতেছে নক্ষত্রমণ্ডল; মাংস হইতেছে আকাশস্থ মেঘমালা; উদরস্থ অর্দ্ধজীর্ণ ভুক্তান্ন হইতেছে বালুকারাশি; নাড়ীসমূহ হইতেছে নদীসংঘ; যকৃত ও প্লীহা হইতেছে পর্ব্বতরাশি; লোমসমূহ হইতেছে তৃণ ও বৃক্ষরাজি; পূর্ব্বার্দ্ধ হইতেছে উদীয়মান সূর্য্য, আর পশ্চাদ্‌ভাগ হইতেছে অস্তগামী সূর্য্য; অশ্ব যে জৃম্ভন করে—শরীরবিক্ষেপ করে, তাহা হইতেছে মেঘের বিদ্যুৎসঞ্চার; আর অশ্ব যে শরীর কম্পন করে, তাহা হইতেছে গর্জ্জন করা, এবং অশ্ব যে মূত্রত্যাগ করে, তাহাই মেঘের বারিবর্ষণ; অশ্বের শব্দই মেঘের শব্দ।।১।।
চলবে————————————

মুণ্ডক উপনিষদ – প্রথম মুণ্ডকে প্রথম খণ্ডে শ্রুতি—শ্রুতিপর্য্যন্ত


মুণ্ডক উপনিষদ (মুণ্ডকোপনিষদ / মুণ্ডকোপনিষৎ / মুণ্ডকোপনিষত) — অথর্ব্ববেদীয় উপনিষদ –

প্রথম মুণ্ডকে প্রথম খণ্ডে শ্রুতি—শ্রুতিপর্য্যন্ত

১.১.১-২ ব্রহ্মা হইতে যে সমস্ত আচার্য্য-পর্যায়ক্রমে এই ব্রহ্মবিদ্যা জগতে প্রচারিত হইয়াছে তাহার নির্দ্দেশ

সমস্ত জগতের কর্ত্তা (উৎপাদক) এবং উৎপন্ন জগতের পরিরক্ষক ব্রহ্মা দেবগণের প্রধানরূপে প্রথমে প্রাদুর্ভূত হইয়াছিলেন। তিনি অথর্ব্বনামক জ্যেষ্ঠ পুত্রকে সর্ব্ববিদ্যার আকর ব্রহ্মবিদ্যা উপদেশ করিয়াছিলেন।।১।।

এখন ব্রহ্মবিদ্যা প্রবর্ত্তক সম্প্রাদায় ক্রম বলা হইতেছে—আদি পুরুষ ব্রহ্মা অথর্ব্বন্‌ ঋষিকে যে ব্রহ্মবিদ্যা বলিয়াছিলেন, অথর্ব্বা সর্ব্বপ্রথম সেই বিদ্যা অঙ্গির্‌নামক ঋষিকে বলেন; তিনি ভরদ্বাজবংশীয় সত্যবহকে বলেন; ভরদ্বাজ আবার পূর্ব্ব পূর্ব্ব গুরু হইতে পরবর্ত্তী শিষ্যগণকর্ত্তৃক লব্ধ এই বিদ্যা অঙ্গিরা ঋষিকে বলিয়াছিলেন।।২।।

১.১.৩ ব্রহ্মবিদ্যালাভের উদ্দেশ্যে অঙ্গিরা ঋষির নিকট শৌনকের গমন এবং এই বিজ্ঞানে সর্ব্ববিজ্ঞান-বিষয়ক প্রশ্ন কথন

গ্রহস্থপ্রধান শৌনক যথাবিধি উপস্থিত হইয়া অঙ্গিরাকে জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন,–ভগবন্‌, কাহাকে জানিলে এই সমস্ত (জগৎ) বিজ্ঞাত হয়।।৩।।

১.১.৪-৫ অঙ্গিরা কর্ত্তৃক পরা ও অপরাভেদের বিদ্যার দ্বৈবিধ্য কথন এবং পরা ও অপরাবিদ্যার স্বরূপ নিরূপণ

অঙ্গিরা শৌনকের উদ্দেশে বলিলেন যে, ব্রহ্মবিদ্‌গন (বেদতাৎপর্য্যবেত্তারা) এইরূপ বলিয়া থাকেন যে, পরা ও অপরা, এই দুইটি বিদ্যা অবশ্য জানিতে হয়।।৪।।

সেই উভয় বিদ্যার মধ্যে অপরা বিদ্যা কথিত হইতেছে—ঋগ্বেদ, যজুর্ব্বেদ, সামবেদ, অথর্ব্ববেদ, শিক্ষা, কল্পসূত্র, ব্যাকরণ, নিরুক্ত, ছন্দঃশাস্ত্র ও জ্যোতিষ। অনন্তর পরা বিদ্যা কথিত হইতেছে, যাহা দ্বারা সেই অক্ষর ব্রহ্মকে প্রাপ্ত হওয়া যায়।।৫।।

১.১.৬-৯ পরা বিদ্যায় বিদ্যার বিষয় অক্ষর ব্রহ্মের স্বরূপ কথন এবং ঊর্ণিনাভদৃষ্টান্তে ব্রহ্মের সর্ব্বকারণত্ব সমর্থন

ধীর বিবেকিগণ [এই পরা বিদ্যা দ্বারা] সেই যে, অদৃশ্য, অগ্রাহ্য, অগোত্র (মূলরহিত) নীরূপ, এবং চক্ষুঃ ও কর্ণরহিত, হস্তপদবিহীন, নিত্য, বিভু, সর্ব্বব্যাপী ও অতি সূক্ষ্ম, সেই যে ভূতযোনি (সর্ব্বকারণ) অক্ষরকে সর্ব্বোতোভাবে অবগত হইয়া থাকেন।।৬।।

ঊর্ণনাভি যেরূপ অপর কোন বস্তুর সাহায্য না লইয়া আপনিই তন্তুরাশি সৃষ্টি করে এবং পুনশ্চ যে সমস্ত আত্মসাৎ করিয়া থাকে; পৃথিবীতে যেরূপ ওষধিসমূহ প্রাদুর্ভূত হয়, এবং জীবৎ পুরুষদেহ হইতে যেরূপ কেশ ও লোমসমূহ সমুৎপন্ন হয়; সেইরূপ এই সংসারে অক্ষর ব্রহ্ম হইতে সমস্ত জগৎ প্রাদুর্ভূত হইয়া থাকে।।৭।।

এই শ্রুতিতে উৎপত্তির ক্রম কথিত হইতেছে,–তপস্যা অর্থাৎ উৎপাদনোপযোগী জ্ঞান দ্বারা [উক্ত ভূতযোনি অক্ষর] ব্রহ্ম উপচয় প্রাপ্ত হন, অর্থাৎ সৃষ্টি বিষয়ে উন্মুখতা লাভ করেন; সেই ব্রহ্ম হইতে অন্ন অর্থাৎ জীবোপভোগ্য অব্যাকৃত প্রকৃতি উৎপন্ন হয়, অন্ন হইতে প্রাণ (হিরণ্যগর্ভ), হিরণ্যগর্ভ হইতে মনঃ (অন্তঃকরণ০, তাহা হইতে সত্যনামক সূক্ষ্ম পঞ্চভূত, তাহা হইতে পৃথিব্যাদি লোকসমূহ, (লোকেতে আবার কর্ম্ম) এবং শুভ কর্ম্মে আবার অমৃত অর্থাৎ কর্ম্মফল সমুৎপন্ন হয়।।৮।।

যিনি সর্ব্বজ্ঞ ও সর্ব্ববিৎ, সর্ব্বজ্ঞতারূপ জ্ঞানই যাঁহার তপস্যা, সেই অক্ষর ব্রহ্ম হইতে পূর্ব্বোক্ত হিরণ্যগর্ভনামক ব্রহ্ম, নাম (সংজ্ঞা), শুক্লাদি রূপ ও ধান্যদি অন্ন সমুৎপন্ন হয়।।৯।।

।।ইতি প্রথম মুণ্ডকে প্রথম খণ্ড।।

প্রশ্ন উপনিষদ- প্রথম প্রশ্নে – শ্লোক ১-৩


ওঁ সুকেশা চ ভারদ্বাজঃ শৈব্যশ্চ সত্যকামঃ, সৌর্যাযণী

চ গার্গ্য্‌ কৌসল্যশ্চাশ্বলাযনঃ, ভার্গবো বৈদর্ভিঃ, কবন্ধী
কাত্যায়নঃ তে হৈতে ব্রহ্মপরা ব্রহ্মনিষ্ঠাঃ পরং
ব্রহ্মান্বেষমাণা, এষ হ বৈ তত্সর্বং বক্ষ্যতি ইতি তে হ
সমিত্পাণযো ভগবন্তং পিপ্পলাদমুপসন্নাঃ ||১||

ভরদ্বাজ-নন্দন দুদেশা, শিবিপুত্র সত্যকাম্ম গর্গবংশজাত সৌর্য্যায়ণী, অশ্বলতনয় কৌসল্য, বিদর্ভদেশীয় ভার্গব এবং কত্যপুত্র কবন্ধী, ইহারা সকলেই অপর ব্রহ্মের উপাসনায় তৎপর ও তদুচিত অনুষ্ঠান-নিরত, এবং পর তত্ত্ব জানিতে সমুৎসুক। ইনিই (পিপ্পলাদ) আমাদিগকে সেই সমস্ত বিষয় উপদেশ দিবেন; এইরূপ অবধারণ করিয়া তাঁহার হস্তে যজ্ঞীয় কাষ্ঠ গ্রহণপূর্ব্বক ভগবান্‌ পিপ্পলাদের সমীপে উপস্থিত হইলেন।।১।।

তন্ হ স ঋষিরুবচ ভূয এব তপসা ব্রহ্মচর্যেণ শ্রদ্ধযা
সংবত্সরং সংবত্স্যথ
যথাকামং প্রশ্নান্ পৃচ্ছত যদি বিজ্ঞাস্যামঃ সর্বং হ বো
বক্ষ্যাম ইতি ||২||

পিপ্পলাদ ঋষি তাঁহাদিগকে বলিলেন—তোমরা পুনশ্চ সংবৎসর কাল তপস্যা, ব্রহ্মচর্য্য ও শ্রদ্ধা বা আদরসম্পন্ন হইয়া [গুরুসমীপে] বাস কর; তাহার পর ইচ্ছানুসারে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিও; আমরা যদি জানি, তাহা হইলে অবশ্যই তোমাদিগকে তাহা বলিব।।২।।

অথ কবন্ধী কত্যাযন উপেত্য পপ্রচ্ছ |
ভগবন্ কুতে হ বা ইমাঃ প্রজাঃ প্রজাযন্ত  ইতি ||৩||

কাত্যায়ন কবন্ধী এক বৎসর পরে উপস্থিত হইয়া [পিপ্পলাদকে] জিজ্ঞাসা করিলেন—ভগবন্‌! এই প্রজাগণ (উৎপত্তিশীল জীবগণ) কোথা হইতে জন্মলাভ করে?।।৩।।

চলবে—————