কেন উপনিষদ । প্রথম খণ্ড । মন্ত্র ১


কেনেষিতং পততি প্রেষিতং মনঃ
কেন প্রাণঃ প্রথমঃ প্রৈতি যুক্তঃ।
কেনেষিতাং বাচমিমাং বদন্তি
চক্ষুঃ শ্রোত্রং ক উ দেবো যুনক্তি।।১।।

শান্তিপাঠ।–আমার সমস্ত অঙ্গ এবং বাক, প্রাণ, চক্ষুঃ, শ্রোত্র, বল ও ইন্দ্রিয় সমূহ বৃদ্ধি বা পুষ্টি লাভ করুক। উপনিষৎ-প্রতিপাদিত ব্রহ্ম আমার নিকট প্রতিভাত হউক; আমি যেন ব্রহ্মকে নিরাস বা অস্বীকার না করি এবং ব্রহ্মও যেন আমাকে প্রত্যাখ্যান বা পরিত্যাগ না করেন। তাঁহার নিকট আমার এবং আমার নিকট তাঁহার সর্ব্বদা অপ্রত্যাখ্যান (নিয়ত সম্বন্ধ) বিদ্যমান থাকুক। আর আত্মনিষ্ঠ আমাতে উপনিষৎপোক্ত ধর্মসমূহ প্রকাশিত হউক।

মূলানুবাদ।–মন কাহার ইচ্ছায় প্রেরিত হইয়া (স্ববিষয়ে) গমন করিতেছে? শ্রেষ্ঠ প্রাণইবা কাহার নিয়োগে গমনাগমন করিতেছে? লোক সকল কাহার ইচ্ছাপ্রণোদিত শব্দ উচ্চারণ করিতেছে এবং কোন দেবতা এই চক্ষুঃ ও কর্ণকে স্ব স্ব কার্য্যে নিযুক্ত করিতেছেন?।।১।।

শঙ্কর ভাষ্যানুবাদ।–মন কোন্‌ কর্ত্তার অভিলাষিত ও প্রেষিত হইয়া অর্থাৎ কাহার ইচ্ছা-নিয়োজিত হইয়া স্ব কার্য্যাভিমুখে যাইতেছে? ইষ্‌’ ধাতুর অর্থ আভীক্ষ্ণ্য (পৌনঃপুন্য) গতি ও ইচ্ছা। তন্মধ্যে  আভীক্ষ্ণ্য ও গত্যর্থের এখানে সম্ভব নাই; কাজেই এখানে ইচ্ছার্থক, ‘ইষ্‌’ ধাতুর প্রয়োগে বুঝিতে হইবে। “প্রেষিতং” পদটিও ইচ্ছার্থাক ‘ইষ্‌’ ধাতু হইতে ‘প্র’ উপসর্গ যোগে নিষ্পন্ন হইয়াছে। এখানে উহার অর্থ নিয়োগ করা। শ্রুতিতে “ইষিতং” না বলিয়া যদি কেবল “প্রেষিতং”ই বলা হইত; তাহা হইলে প্রেষয়িতা ও প্রেষণ সম্বন্ধে বিশেষ সংবাদ জানিবার জন্য পুনশ্চ আকাঙ্খা হইত, অর্থাৎ মন যাহার প্রেরণায় ধাবিত হয়, সেই প্রেষয়িতা কে? এবং তাহার প্রেষণই বা কি প্রকার? ইহা জানিবার জন্যও ঔৎসুক্য থাকিয়া যাইত; কিন্তু “ইষিতং” বিশেষণেই সেই বিশেষার্থ নির্দ্ধারিত হওয়ার তদ্বিষয়ক বিশেষাকাঙ্খা আপনা হইতেই নিবৃত্ত হইয়াছে।

এখন প্রশ্ন হইতেছে যে, যদি ঐ রূপ অর্থবিশেষ নিরূপণ করাই শ্রুতির অভিপ্রেত হয়, তাহা হইলে “ইষিতং” পদের যখন সেই অভিপ্রায় অবধারিত হইল, তখন আর “প্রেষিতং” বিশেষণ প্রয়োগ করা উচিত হইতনা; বিশেষতঃ, শব্দের আধিক্য থাকিলে যখন অর্থেরও আধিক্য থাকা যুক্তিসিদ্ধ, তখন এরূপ অর্থও প্রতীত হইতে পারে যে, যিনি [আমাদেরই মত] স্বীয় ইচ্ছা, চেষ্টা বা বাক্যদ্বারা মনকে প্রেষিত করেন, তিনি কেন? না; প্রশ্ন সামার্থ্যেই ওরূপ প্রতীতি হইতে পারে না; কারণ, উক্ত প্রশ্ন দৃষ্টে মনে হয় যে, কোন লোক যেন ইন্দ্রিয়াদির সমষ্টিভূত, অনিত্য দেহাদিতে বিরক্ত (বৈরাগ্য প্রাপ্ত হইয়া দেহাদির অতিরিক্ত একটি কূটস্থ নিত্য বস্তুর অম্বেষণে ঐরূপ প্রশ্নের অবতারণা করিয়াছেন; সুতরাং তাঁহার পক্ষে উক্তপ্রকার প্রতীতিমূলক প্রশ্ন কখনই সম্ভবপর হইতে পারে না। পক্ষান্তরে, ইন্দ্রিয়াদি সঙ্ঘাতময় এই দেহ যে, ইচ্ছা, চেষ্টা ও, বাক্য দ্বারা মনকে প্রেরণ করে, ইহাত সর্ব্বজন-বিদিত এবং প্রশ্ন-কর্ত্তাও নিশ্চয়ই ইহা অবগত আছেন; সুতরাং তাঁহার পক্ষে ঐরূপ প্রশ্নের উত্থাপন একেবারেই অর্থহীন নিষ্প্রয়োজন হইয়া পড়ে। ভাল, এ রূপ বলিলেও ‘প্রেষিত’ শব্দের ত কোনই অর্থ-বিশেষ প্রদর্শিত হইল না? না,–এ প্রশ্নও যুক্তিযুক্ত হইল না; কারণ, যে লোকের মনে মনের প্রেষণ ও প্রেষয়িতৃ-সম্বন্ধে সংশয় বিদ্যমান আছে, তাহার পক্ষে সংশয়-ভঞ্জনার্থ ‘প্রেষয়িতা’পদের সার্থকতা প্রদর্শন করা যাইতে পারে। অর্থাৎ ইন্দ্রিয়াদির সমষ্টিময় এই দেহই ‘প্রেষয়িতা’ বলিয়া লোকপ্রসিদ্ধ;  বস্তুতঃ সেই দেহই কি মনেরও প্রেরক? না; তদতিরিক্ত, এমন স্বতন্ত্র (স্বাধীন) কেহ আছেন, যাঁহার ইচ্ছামাত্রে মন প্রভৃতির প্রেষণকার্য্য অনায়াসে সম্পাদিত হয়; এইরূপ বিশেষাভিপ্রায়-বিজ্ঞাপনার্থই ‘ইষিত’ ও ‘প্রেষিত’ বিশেষণ দুইটি প্রযুক্ত হইয়াছে।

জিজ্ঞাসা করি,–মনই স্বয়ং স্বাধীনভাবে স্ববিষয়ে গমন করে, ইহাই ত লোকপ্রসিদ্ধ; তবে আর ঐরূপ প্রশ্ন সঙ্গত হয় কিরূপে? হ্যাঁ, এ প্রশ্নের উত্তর বলা যাইতেছে; মন যদি নিজের প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তিতে স্বাধীন হইত, তাহা হইলে কাহারও কখন অনিষ্ট-চিন্তা আসিতে পারিত না; অথচ মন জানিয়া শুনিয়াও অনর্থ (অনিষ্ট) চিন্তা করিয়া থাকে; বাধা সত্ত্বেও মন অতি প্রচণ্ড দুঃখকর কার্য্যে প্রবৃত্ত হইয়া থাকে; [মন স্বাধীন হইলে এরূপ হইত না।] অতএব, “কেন ইষিতম্‌” ইত্যাদি প্রশ্ন যুক্তি-যুক্তই বটে।

প্রাণ কাহার দ্বারা নিযুক্ত (প্রেরিত) হইয়া গমন করে, অর্থাৎ স্বীয় কার্য্য সম্পাদন করে? [পঞ্চবৃত্তি] প্রাণই সমস্ত ইন্দ্রিয়ের প্রথমোৎপন্ন; এই কারণ প্রাণকে ‘প্রথম’ বিশেষণে বিশেষিত করা হইয়াছে। সাধারণ লোক সকল কাঁহার প্রেরিত শব্দ উচ্চারণ করে? এবং কোন দেবতা (দ্যুতিমান্‌) চক্ষুঃ ও শ্রবণেন্দ্রিয়কে স্ব স্ব কার্য্যে প্রেরণ করেন?।।১

– See more at: http://ebanglalibrary.com/religious/?p=1829#more-1829

Advertisements