কার্তিকের বাহন ময়ূর কেন ?


Image result for কার্তিক

কার্তিক সৌন্দর্যের প্রতিমূর্তি। অপর দিকে সে সৌন্দর্যের আর ও উতকর্ষ সাধনে পক্ষীকুলের মধ্যে আরেক সুন্দর যুক্ত হয়েছে এক সঙ্গে। উভয়ের এ মিলন সৌন্দর্যকে অধিকতর বাড়িয়ে দিয়েছে।
কিন্তু সৌন্দর্যই একে অপরকে কাছে আনেনি।ময়ূর এবং মোগর সমবর্গীয় পাখি।পন্ডিত চানক্য ময়ূর আর মোগরের চারটি গুনের কথা উল্লেখ করেছেন।গুনগুলো হচ্ছে –
(১)যুদ্ধ
(২)প্রাতরুত্থান
(৩)স্বজাতি প্রীতি
(৪)স্ত্রী রক্ষা
অর্থাত্‍ ময়ূর আর মোগরের দিকে যদি আমরা দৃষ্টি দেই তাহলে উপরোক্ত চারটি গুণ সহজেই তাদের মাঝে অবলোকন করি।আর এ গুনগুলো যদি বিশ্লেষন করি তাহলে আমরা লক্ষ্য করি যে প্রতিটি গুন বিরাজিত থাকে একজন ক্ষত্রিয়ের মধ্যে।তাই ক্ষত্রিয়ের প্রতীক শ্রী শ্রী কার্তিকের বাহন হিসাবে যথার্থ বৈ কি ময়ূর।

ময়ূর সর্ম্পকে এখানে আরো বলা যায় ময়ূর তার পুচ্ছ দিয়ে শুধু সৌন্দর্যই প্রকাশ করে না – এটাকে ঢাল হিসাবেও ব্যবহার করে। সে হিংস্রতার প্রতীক সর্পের হন্তা। সাপের সাথে ময়ূরের যুদ্ধ কৌশল দর্শনীয়।

কার্তিকের বন্দনায় আমাদের মধ্যে জাগরুক হোক , ক্ষাত্রশক্তির সে অমোঘ ধারা যা আজকের হিন্দুর জন্য অতীব প্রয়োজন।

কার্তিকের প্রণাম মন্ত্র –
কার্তিকেয় মহাভাগ দৈত্যদর্পনিসূদন।
প্রণতোহহংমহাবাহো নমস্তে শিখিবাহন॥

বিদ্যা, অবিদ্যা, ত্রৈবিদ্যা


বিদ্যা, অবিদ্যা, ত্রৈবিদ্যা
বিশ্বজিত পাল


বিদ্যা শব্দের আবিধানিক অর্থ অধ্যয়নজনিত জ্ঞান। সাধারণ অর্থে জ্ঞান বলতে বুঝায় বোধ, বুদ্ধি, অনুভব শক্তি, বোঝার বা বিচার করার ক্ষমতা। জ্ঞান আছে এমন ব্যক্তিকে বলা হয় জ্ঞানী। যে ব্যক্তি প্রকৃতি প্রাপ্ত বই, পুস্তক, পুঁথি ও শাস্ত্র পাঠ করে জ্ঞান লাভ করেন তাকে বলে শাস্ত্রজ্ঞ। বেদ যিনি ভালোরূপে বোঝেন বা জানেন তাকে বলে প-িত বা বেদজ্ঞ। আর যিনি ব্রহ্ম, আত্মা, পরমাত্মা ইত্যাদি ঈশ্বরতত্ত্ব সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করেন তাকে বলা হয় পরমাত্মিক জ্ঞানী বা তত্ত্বজ্ঞ।

জ্ঞান সম্পর্কে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছেন মান শূন্যতা, দম্ভহীনতা, অহিংসা, সহিষ্ণুতা, সরলতা, সদগুরুর সেবা, শৌচ, আত্মসংযম, ইন্দ্রিয় বিষয়ে বিরক্তি, অহংকার, জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধিকে দুঃখ হিসেবে দেখা, পুত্র-স্ত্রী-গৃহের প্রতি আসক্তি রহিত হয়ে নিত্যের (ঈশ্বরের) প্রতি মনোনিবেশ করা, বঞ্চিত ও অবাঞ্ছিত বস্তু প্রাপ্তিতে সমভাবাপন্ন, জনবহুল স্থান বর্জন, নির্মল স্থান প্রিয়তা ও অনন্য নিষ্ঠা ও অপ্রতিহতা ভক্তির মাধ্যমে আমার সেবা করার নামই জ্ঞান। আর এ নিত্য, আধ্যাত্ম ও তত্ত্বজ্ঞান যিনি অনুসন্ধান করেন তিনিই জ্ঞানী। বাকিরা অজ্ঞানী। এতে স্পষ্ট যে, যে বিদ্যা আধ্যাত্ম, পারমাত্মিক, বা ঐশ্বরিক জ্ঞান দান করে না তা বিদ্যা নয়, অবিদ্যা।

অবিদ্যা শব্দের আবিধানিক অর্থ অজ্ঞান বা মায়া। মায়া ঈশ্বরের ছায়া, তবে ঈশ্বর থেকে পৃথক নয়। যেমন- একজন মানুষের ছায়া তার থেকে পৃথক নয়। এটা ওই মানুষটির প্রতিবিম্ব যা তার সঙ্গে সঙ্গেই থাকে এবং দেখতে উল্টো দেখায়। তাই একটি ছায়া দেখে তার সংশ্লিষ্ট মানুষটিকে শনাক্ত করা সম্ভব নয়। ছায়া মরীচিকার ন্যায় মায়ারূপ এক প্রতিবিম্ব, আদর্শ রূপ নয়। ময়লা থাকলে যেমন আয়নাতে নিজের রূপ দেখা যায় না, ঠিক তেমনি মায়ায় আচ্ছন্ন ব্যক্তি ঈশ্বরের স্বরূপ দেখতে পায় না। এ মায়া বা অবিদ্যা পাঁচ প্রকার। যথা- তম, মোহ, মহামোহ, তামিস্র ও অন্ধতামিস্র।

তম:- সত্ত্ব, রজ, তম এ তিনটি প্রকৃতিগত গুণ থেকে তম সবচেয়ে নিকৃষ্টতম। তম গুণ সম্পন্ন ব্যক্তিরা প্রমাদ (ভ্রান্তি বা বিমূঢ়তা) আলস্য ও নিদ্রা দ্বারা আচ্ছন্ন থাকে। তাই তারা কখনই ঈশ্বরকে জানতে পারে না।

মোহ:- প্রাকৃতিক জিনিসের প্রতি প্রবল আসক্ত থাকার নাম মোহ।

মহামোহ:- প্রত্যাশিত জিনিসটি না পাওয়া পর্যন্ত আসক্তি, পুনঃপুনঃ বৃদ্ধির নাম মহামোহ।

তামিস্র:- আবিধানিক অর্থে যে ক্রোধ জন্মায় তাকে তামিস্র বলে। শাস্ত্র মতে এটি একটি নরক বিশেষ। নিশাচর বা দুঃখের স্থান।

অন্ধতামিস্র:- নিবিড় অন্ধকার। এটি একটি ঘোর নরক বিশেষ। অত্যন্ত দুঃখের স্থান।

এ পাঁচ প্রকার অবিদ্যা প্রকৃতিজাত। তাই অবিদ্যার আরেক নাম প্রকৃতি। এই প্রকৃতি ঈশ্বরের সৃষ্টি এবং অনাদি। সব বিকার এবং গুণ প্রকৃতি থেকে জন্ম। তাই এ প্রকৃতি বা অবিদ্যা এক মায়ারূপ বন্ধন যার অবস্থান ঈশ্বর ও মানুষের মাঝখানে। এটি একটি অস্বচ্ছ পর্দাও বটে যার কারণে মানুষ ঈশ্বরকে দেখতে না পেয়ে মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে ভুল পথে চলে। তারা ক্রমশ অন্ধকার থেকে অন্ধকার জগতে প্রবেশ করতে করতে শেষ পর্যন্ত নীচকুলে (পশু-পাখির যোনিতে) জন্ম গ্রহণ করে।

ত্রৈবিদ্যা বলতে ঋক, সাম, যজু নামক তিনটি বেদকে বুঝায়। যে ব্রাহ্মণ এই তিনটি বেদ অধ্যয়ন করেছেন তাকে বলা হয় ত্রিবেদি। যারা এ তিনটি বেদ থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত তারা মনুষ্য সমাজে সম্মান ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। দুর্ভাগ্যবশত: বেদের অনেক বড় বড় প-িতরা বৈদিক জ্ঞানের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারেন না। তাই তারা কেবল আনুষ্ঠানিকতাবশত বেদ অধ্যায়ন করেন এবং ইন্দ্র, চন্দ্র, আদি দেবতাদের উদ্দেশ্যে যজ্ঞ করার প্রতি অত্যন্ত আসক্ত হয়। তাই বেদান্ত সম্পর্কে শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছেন- ‘আমিই হলাম ত্রিবেদিদের একমাত্র লক্ষ্য।’ তাই যথার্থ ত্রিবেদি শ্রীকৃষ্ণের চরণারবিন্দের শরণাগত হন এবং তার প্রীতি উৎপাদনের জন্য বিশুদ্ধ ভক্তিযোগে নিয়োজিত থাকেন। এ ভক্তিযোগ শুরু হয় হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন ও কৃষ্ণতত্ত্ব জানার প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে। যথার্থ ত্রিবেদিরা জানেন হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রই অর্থাৎ নামযজ্ঞই হচ্ছে সব যজ্ঞের শ্রেষ্ঠ যজ্ঞ এবং একমাত্র শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছেন পুরুষোত্তম। তাই তাকে জানার মধ্যেই নিহিত রয়েছে মানব জীবনের পরম সার্থকতা।

ঈশ্বর নিরাকার। তিনি যখন নিরাকার, তখন তাকে বলা হয় ব্রহ্ম। ব্রহ্ম সব জীব জগতের উপর প্রভূত্ব করেন। তাই ব্রহ্মের আরেক নাম ঈশ্বর। ঈশ্বর শব্দটির মানে হচ্ছে প্রভূ। এ ব্রহ্ম বা ঈশ্বর যখন আমাদের কৃপা করেন, জগতের মঙ্গল করেন, তখন তাকে বলা হয় ভগবান।

ব্রহ্ম সব প্রাণের উৎস স্বরূপ। তার থেকেই জগতের সৃষ্টি। তার মধ্যেই জগতের অবস্থান। আবার তিনিই আত্মারূপে জীবের মধ্যে অবস্থান করেন। তাই ধর্মগ্রন্থ উপনিষদে বলা হয়েছে ‘সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম।’ অর্থাৎ সবকিছু ব্রহ্ম বা ঈশ্বর। সুতরাং ব্রহ্ম, ঈশ্বর, ভগবান দেব-দেবী এবং আত্মা আলাদা কিছু নয়। একই ঈশ্বরের ভিন্ন নাম ও পরিচয়। তাই শুধু দেব-দেবী কেন জীবকে সেবা করলেও ঈশ্বরের সেবা করা হয়।

নিরাকার হলেও সর্বশক্তিমান ঈশ্বর যে কোন আকার ধারণ করতে পারেন। তাই তিনি সাকারও। ঈশ্বরের ভিন্ন ভিন্ন গুণ বা শক্তি যখন ভিন্ন ভিন্ন আকার লাভ করে তখনই তাকে বলা হয় দেব-দেবী। এককথায় ঈশ্বরের সাকার রূপই হচ্ছে দেব-দেবী। ঈশ্বরের বিদ্যা, জ্ঞান ও ধী শক্তির সাকার রূপই হলো সরস্বতী। তাই সরস্বতী বিদ্যার দেবী। তিনি সবাইকে বিদ্যা দান করেন।

দেবী সরস্বতী যে বিদ্যা দান করেন তা ঈশ্বরেরই একটি গুণ। বেদ, পুরান প্রভৃতি ধর্মগ্রন্থে দেব-দেবীর পূজা করার পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে। তাই বৈদিক মতে দেব-দেবীর পূজা করলে তারা সন্তুষ্ট হন। দেব-দেবীরা সন্তুষ্ট হলে ঈশ্বর সন্তুষ্ট হন। সুতরাং দেব-দেবীর পূজার মাধ্যমে ঈশ্বরেরই পূজা করা হয়।

প্রতি বছর মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে পূজার মাধ্যমে আমরা সরস্বতী দেবীকে আহ্বান করি। স্তবস্তুতির মাধ্যমে তার প্রশংসা করি। তার কাছে কাম্য বস্তু অর্থাৎ বিদ্যা প্রার্থনা করি-

‘সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে

বিশ্বরূপে বিশালাক্ষী বিদ্যাং দেহি নমহস্তুতো’

হে মহাভাগ সরস্বতী, বিদ্যাদেবী কমলনয়না, বিশ্বরূপা, বিশালাক্ষী আমাকে বিদ্যা দাও। তোমাকে নমস্কার।

বিদ্যাহীন ও জ্ঞানহীন ব্যক্তিরা মায়ামুখী। তাই তারা ঈশ্বর বিদ্বেষী। তারা ঈশরকে ভুলে গিয়ে মহামোহে আচ্ছন্ন হয়ে ঘোর নরকে প্রবেশ করে। কোনকালেই তারা ঈশ্বরকে পায় না।

হে মা সরস্বতী আমাদের বিদ্যা দান কর। আমরা যেন অহৈতুকী সেবার মাধ্যমে ঈশ্বরের পরম ভক্ত হতে পারি। এ শুভলগ্নে তোমার কাছে এই একমাত্র মিনতি। কৃপা কর, দয়া কর মা এ অধম সন্তানদের। তোমর চরণে পুনঃপুনঃ অগণিত প্রণাম।

[লেখক : শিক্ষক।]

শ্রীশ্রী লক্ষ্মী দেবী (বৈদিক পুরাণিক ইতিবৃত্ত)


লক্ষ্মী দেবীর কথা যেমন আছে আমাদের বেদ-উপনিষদে এবং নিন্ম অধিকারির বোঝার জন্য পুরাণ গ্রন্থে। আমাদের অত্র অঞ্চল ছাড়িয়েও ‘শ্রী লক্ষ্মী’ অন্য নামে পৃথিবীর নানা দেশে পুজিত।

10753_10153776970510375_1274116584_n
বৈদিক উষাই পৌরাণিক লক্ষ্মী। বেদে অনেক স্থলে উষা সুৰ্য্যপ্রিয়ারূপে বর্ণিত হয়েছেন। বৈদিক বিষ্ণু সূৰ্য্যের নামান্তর মাত্র। সুতরাং সূৰ্য্যপ্রিয়া বৈদিক উষা বিষ্ণুপ্রিয়া পৌরাণিক লক্ষ্মী হয়েছেন।
গ্ৰীক্ রোমীয় ঊষার ন্যায় বৈদিক উষারও রথ আছে। শ্ৰীসূক্তে শ্রীকে ‘অশ্বপুর্ব্বা’ ‘রথমধ্যা’ বলা হয়েছে। কিন্তু পৌরাণিক ঐ জলধিদুহিতা, মন্থনকালে সমুদ্র হতে উৎপন্না। গ্রীক্ উষা সমুদ্র হতে অশ্বযুক্ত শকটে আরোহণ করে প্রভাতগগন রঞ্জিত করে আসতেন। বেদে সমুদ্র বলতে অনেক স্থলে অন্তরীক্ষ বুঝাতো, সেই হিসাবে উষা সমুদ্রদুহিতা।
বৈদিক স্ত্রী-দেবত’গণের মধ্যে উষার আসন সৰ্ব্বাপেক্ষা উচ্চে, অথচ পৌরাণিক যুগে উষার উল্লেখ নাই, পুরাণে সে সুবর্ণকিরণ একেবারে নির্বাপিত। সেই উষা পুরাণে একেবারে লুপ্ত হোন নাই, তিনি লক্ষ্মীরূপে এখনও বিরাজ করছেন। উষাকে বেদে বাঞ্জিনীবতী বা অন্নবতী বলা হয়েছে। লক্ষ্মীও অন্নদাত্রী।
লক্ষ্মীর একটি নাম শ্ৰী। ঋগ্বেদে এবং তৈত্তিরীয় সংহিতায় রূপ ও ঐশ্বর্য্য অর্থে ‘শ্রী’ কথাটি পাওয়া যায়, কিন্তু তথায় ‘শ্ৰী’ বলে কোন দেবীর উল্লেখ নেই। এখন ‘শ্ৰী বা লক্ষ্মী’ দেবীর নিকট আমরা প্রচুর শস্য, অন্ন, বস্ত্র, ধন-সম্পদের জন্য প্রার্থনা করি। বৈদিকযুগে আর্য্যগণ প্রচুর শস্য ও পার্থিব সম্পদের জন্য পুরন্ধি ধিষণা প্রভৃতির নিকট প্রার্থনা করতেন, এরূপ বর্ণনা আছে। এখনকার আর্থিক অনটনের দিনে লোকে বহুপুত্র কামনা করতে সাহস করে না। কিন্তু আর্য্যগণের তখন লক্ষ্য ছিল, কিরূপে দলপুষ্টি হয়, অনাৰ্য্য শক্রগণের সাথে যুদ্ধে ও সাংসারিক কার্য্যে সহায়তার জন্য পুত্রের আবশ্যকতা তাঁহারা অনুভব করতেন এবং সেইজন্য তাঁহারা উপাস্য দেব- দেবীগণের নিকটে পুত্রলাভের প্রার্থনা জানাতেন। কুহু ও সিনীবালীর নিকট তাঁহারা সন্তানের জন্য প্রার্থনা করছেন, এরূপ বর্ণনা আছে। অথৰ্ব্ববেদে আছে, তাঁহার সম্পদ ও বীরপুত্রের জন্য কুহূর নিকট প্রার্থনা করছেন। ঋগ্বেদে বিষ্ণুপত্নী বলে কারও উল্লেখ আছে বলে বোধ হয় না। ঋগ্বেদের শেষ অংশের একটি সূক্ত সুপ্রজননের জন্য বিষ্ণু ও সিনীবালীর নিকট প্রার্থনা বোধ হয় সেই জন্য অথৰ্ব্ববেদে সিনীবালীকে বিষ্ণুপত্নী বলা হয়েছে। পৌরাণিক যুগের বিষ্ণুপত্নী শ্ৰী বা লক্ষ্মীর নিকট সন্তান সুপ্রসবের জন্য বা বহু সন্তান লাভের জন্য প্রার্থনা কেহ করে না। বৌদ্ধযুগে যক্ষিণী হারিতী সে ভার লয়েছিলেন; আধুনিক যুগে জন্তলা রাক্ষসী, পাঁচুঠাকুর ও যষ্ঠীদেবী তা নিয়েছেন। তথাপি লোক আশীৰ্ব্বাদ করবার সময় ‘ধনে পুত্রে লক্ষ্মীলাভের কথা এখনও উল্লেখ করে। শ্ৰীসুক্তে দেখা যায়, প্রার্থনাকারী ধন ধান্য গো-হস্তি-রথ-অশ্ব ও আয়ু প্রার্থনা করবার সঙ্গে সঙ্গে পুত্র-পৌত্রের জন্যও কামনা জানাইতেছেন, কারণ পুত্রপৌত্রও ত সম্পৎ-সৌভাগ্যের চিহ্ন।
শাঙ্খ্যায়নগৃহ্যসূত্রে ও শতপথ-ব্রাহ্মণে শ্ৰী দেবী হয়েছেন। তৈত্তিরীয় উপনিষেদও বহুকেশবতী ‘শ্ৰী’র উল্লেখ আছে। শাঙ্খ্যায়নগৃহ্যসূত্রে ধিষ্ণু, অনুমতি, অদিতি প্রভৃতি দেবীগণের মধ্যে শ্রীর নাম পাওয়া যায়। শতপথ-ব্রাহ্মণেও শ্ৰী দেবীরূপে কল্পিত হয়েছেন- তথায় তাঁহার ধন-সম্পদ ঐশ্বৰ্য্য সবই আছে। শতপথ ব্রাহ্মণে শ্ৰী সম্বন্ধে যে কাহিনীটি বিবৃত হয়েছে, তাতে আছে প্রজাপতি প্ৰজা সৃজন করবার জন্য তপস্যা করছিলেন। তিনি তপ করতে করতে শ্রান্ত হলে শ্ৰী তাঁহার মধ্য হতে বাহির হয়ে আসলেন। (গ্ৰীক্‌ দেবেন্দ্র জিউসের মস্তক হতে এথেনা দেবীর উদ্ভব ইহার সাথে তুলনীয়।) শ্ৰী দীপ্তিমান অবয়বে সমস্ত জগৎ উদ্ভাসিত করে অবস্থান করলেন। সেই শোভাময়ী আলোর প্রতিমা দেখে দেবগণ তাঁহাকে ধ্যান করতে লাগলেন। তাঁদের ইচ্ছা হল, তাঁহাকে নিধন করে উহার শোভাসম্পদ কেড়ে নিবেন। প্রজাপতি দেবগণকে নিরস্ত করে বললেন, “শ্রী স্ত্রীলোক, লোকে স্ত্রী হত্যা করে না।” প্রজাপতি শ্রীকে প্রাণে না মারিয়া তাঁহার যথাসৰ্ব্বস্ব কড়িয়া নিবার পরামর্শ দিলেন। পরামর্শ কর্য্যে পরিণত হতে বিলম্ব হল না। অগ্নি তাহার অল্প নিলেন, সোম তাঁহার রাজ্য, বরুণ তাঁহার সাম্রাজ্য, মিত্র তাঁহার ক্ষত্র, ইন্দ্র উহার বল, বৃহস্পতি তাঁহার ব্ৰহ্মতেজ, সবিতৃ তাঁহার রাষ্ট্র, পুষা তাঁহার ঐশ্বৰ্য্য, সরস্বতী তাঁহার পুষ্টি এবং তুষ্টা উহার রূপ নিলেন। পরে শ্রী প্রজাপতির পরামর্শে যজ্ঞ করে ঐ-সকল দেবতাকে আহবান করলেন; এবং তাঁহারা যাহা যাহা নিয়েছিলেন, তুষ্ট হয়ে, সব শ্রীকে একে একে ফিরিয়ে দিলেন।
শ্ৰীসূক্ত শ্ৰী দেবীর উদ্দেশে রচিত। ঠিক বৈদিক যুগে ইহা রচিত নাও হতে পারে, কিন্তু সেইজন্য এর প্রাচীনত্ব সম্বন্ধে সন্দিহান হলে চলবে না, কারণ বৃহদ্দেবতাগ্রস্থে মন্ত্রদ্রষ্ট্রী বা সূত্ত-প্রণেত্রীগণের নামের মধ্যে শ্রীর নাম পাওয়া যায়। পৌরাণিকযুগে ও বৌদ্ধযুগে শ্রী প্রধান দেবীগণের মধ্যে পরিগণিতা। পৌরাণিক বৃত্তান্ত-অনুসারে সমুদ্রমন্থন হতে শ্রীর উৎপত্তি। (গ্রীক্‌দিগের প্রেম-সৌন্দর্য্যের দেবী এফ্রোডাইটিও Aphrodite সমুদ্রফেন হতে উৎপন্না) মহাভারতে আছে, মন্থনকালে শ্বেতপদ্মাসীনা লক্ষ্মী ও সুরাদেবী উদ্ভূত হলেন। রামায়ণে বারুণীর নাম আছে বটে, কিন্তু শ্রীর নাম নাই। বিষ্ণুপুরাণে আছে, শ্রী ভৃগু ও থ্যাতির কন্যা এবং ধর্মের পত্নী। তাহার পর যখন রুষ্ট দুৰ্ব্বাসার অভিশাপে ইন্দ্র শ্রীভ্রষ্ট হলেন, দেবগণ দানবহস্তে পরাজিত হতে লাগলেন, তখন বিষ্ণুর পরামর্শে সমুদ্রমন্থন করে দেবগণ পুনরায় শ্রীকে পেলেন।
শ্রীবিষ্ণুপুরাণ ও শ্রীমদ্ভাগবতে সাগর হতে লক্ষ্মীর উৎপত্তির যে বর্ণনা আছে, তা বাস্তবিকই কবিত্বময়। বিষ্ণুপুরাণে আছে, ধন্বন্তরির পর স্ফুরৎকান্তিমতী বিকসিত-কমলে-স্থিতা পঙ্কজহস্তা শ্রীদেবী সাগর হতে উত্থিত হলেন। মহর্ষিগণ শ্রীসূক্তে তাঁহার স্তব করলেন। বিশ্বাবসু আদি গন্ধৰ্ব্বগণ তাঁহার সম্মুখে গান করতে আরম্ভ করলেন। গঙ্গা আদি নদী তাহার স্নানার্থ জল লইয়া উপস্থিত হইলেন। দিগ্‌গজ-সকল হেমপাত্রস্থিত বিমল জল লইয়া সৰ্ব্বলোকমহেশ্বরী সেই দেবীকে স্নান করাতে লাগল। ক্ষীরোদ সাগর রূপ ধারণ করিয়া তাঁহাকে অম্লানপঙ্কজমালা প্রদান করিল। বিশ্বকর্ম্মা তাঁহাকে অলঙ্কারে বিভূষিত করলেন। দেবী স্নাতা, ভূষণভূষিতা ও দিব্যমালাম্বরধরা হয়ে সৰ্ব্বদেব-সমক্ষে হরির বক্ষঃস্থল আশ্রয় করলেন।

শ্ৰীমদ্ভাগবতের বর্ণনা আরও কবিত্বময় এবং আরও বিস্তারিত। কান্তিপ্রভায় দিগমণ্ডল রঞ্জিত করে দেবী বিদ্যুন্‌মালার ন্যায় অবিভূর্তা হলেন। মহেন্দ্র তাঁহাকে অদ্ভুত আসন এনে দিলেন, শ্রেষ্ঠ নদীগণ মুর্ত্তিমতী হয়ে হেমকুম্ভে পবিত্র জল দিল। ভূমিদেবী অভিষেচন-উপযোগী ওষধি সকল, গোগণ পঞ্চগব্য এবং বসন্ত মধুমাসের উৎপন্ন উপহাররাজি প্রদান করলেন । গন্ধৰ্ব্ব কন্ঠোচ্চারিত মঙ্গলপাঠ, নটীগণের নৃত্যগীত, মেঘের তুমুলনিস্বনে বাদ্যযন্ত্র-বাদন, দিগ্‌গজগণ কর্তৃক পুর্ণকলস হতে জলবর্ষণ ও দ্বিজগণ কর্তৃক সূক্তবাক্য উচ্চারণ-
এই সকলের মধ্যে ঋষিগণ দেবীর অভিষেক-কাৰ্য্য সম্পাদন করলেন। তাহার পর দেবীর সজ্জা। সমুদ্ৰ পীত কৌশেয়বাস, বরুণ মধুমত্ত ভ্রমরগুঞ্জরিত কুহমদাম, বিশ্বকৰ্ম্মা বিচিত্ৰ ভূষণ, সরস্বতী হার, ব্রহ্মা পদ্ম এবং নাগগণ কুণ্ডল দিলেন। তাঁহার পর ভ্রমরগুঞ্জিত মালা লইয়া নুপুরশিঞ্জিত চরণে হেমলতার ন্যায় ভ্রমণ করতে করতে দেবী নারায়ণের গলে সেই মাল্য প্রদান করে অপূৰ্ব্ব ভঙ্গীতে লজ্জাবিভাসিত স্মিতবিস্ফারিত লোচনে তাঁহার বক্ষে অবস্থান করতে লাগলেন।
তাহার পর ব্রহ্মবৈবৰ্ত্ত-পুরাণে লক্ষ্মীচরিত্র যেমন অঙ্কিত হয়েছে, তাহা দেখলে মনে হয়, দেবী যেন কোন বঙ্গ গৃহস্থের কুলবধূ। তিনি নারায়ণের পত্নী—গঙ্গা ও সরস্বতী তাঁহার সপত্নী। পুরাণকার সপত্নীগণের কলহ ও তাঁহার মধ্যে লক্ষ্মীর অবিচল শান্তভাব বর্ণনা করেছেন; লক্ষ্মীচরিত্র আদর্শ বধুচরিত্র। কলহ-রতা দুই সপত্নীর মধ্যে দণ্ডায়মান হয়ে তাদের কলহ শান্তি করতে গিয়ে লক্ষ্মী বিনাদোষে সরস্বতী কর্ত্তৃক অভিশপ্ত হলেন। লক্ষ্মী কাহাকেও অভিশাপ দিলেন না, তাঁহার সপত্নীযুগল পরস্পরকে শাপ প্রদান করলেন। অভিশাপের কাণ্ড শেষ হলে নারায়ণ লক্ষ্মীর উপর সুবিচার করে গঙ্গাকে শিবের নিকট এবং সরস্বতীকে ব্ৰহ্মার নিকট প্রেরণ করতে চাইলেন। এখনও লক্ষ্মী, তিনি স্বামীকে সপত্নীদ্বয়ের উপর প্রসন্ন হবার জন্য অনুনয় করলেন। গুণমুগ্ধ স্বামী তাঁহার নিঃস্বার্থ প্রার্থনা রক্ষা করেছিলেন।
পৌরাণিক যুগের লক্ষ্মী চরিত্রের তুলনা নাই। পুরাণকারগণ দুঃসাহসী। লক্ষ্মীর স্বাভাবিক নম্রতার জন্য তাঁহাদের সাহস বেড়ে গিয়েছিল। ফলে, দেবীভাগবতের গ্লানিকর বৃত্তান্ত। লক্ষ্মীর ভ্রাতা উচ্চৈঃশ্রবার পৃষ্ঠে আরোহণ করে যখন সূৰ্য্যপুত্র রেবন্ত আসতেছিলেন, তখন অশ্ব ও অশ্বারোহীর প্রতি একাস্তে দৃষ্টিপাত করতে লক্ষ্মী নারায়ণ কর্তৃক অভিশপ্ত হলেন। লক্ষ্মীকে অশ্বীরূপ ধারণ করতে হল। তাহার পর অশ্বরূপী বিষ্ণুর ঔরসে তাহার পুত্র হয়। অশ্বরূপধারণের কাহিনীটি বৈদিক সূৰ্য্য-সরণ্যু বা পৌরাণিক সূৰ্য্যসংজ্ঞার কাহিনী অবলম্বনে লিখিত। বৈদিক সূৰ্য্য ও বৈদিক বিষ্ণু একই দেবতা। পুরাণের যুগেও বিষ্ণু ও সূর্য্য উভয়েই আদিত্য।।
সুতরাং দেবী-ভাগবতের কাহিনিটি রচনা করতে বিশেষ অসুবিধা হয় নাই। তাহার পর মহাদেব যে লক্ষ্মীর শাপমোচন করলেন, তার দ্বারা শিবের ক্ষমতা প্রমানের চেষ্টা হয়েছে। দেবীভাগবতকে একখানি শাক্ত ও সেই হিসাবে শৈব পুরাণ বলা যেতে পারে। শৈব পুরাণে শিবের মাহাত্ম্য দেখানোর চেষ্টা যে সমগ্র কাহিনীটি রচনার কারণ, ইহাও বলা যেতে পারে।
কোন কোন স্থলে মানব কি কি অনুষ্ঠান করলে শ্রী তাঁহার গৃহে অধিষ্ঠান করেন, তাহার বিবরণ মহাভারতের লক্ষ্মীবাসর-সংবাদে আছে। সিরি কালকন্নী জাতকে সিরি (শ্রী)ও প্রায় তাই বলতেছেন । বৌদ্ধযুগে সিবি বা সিরি-মা দেবতা একটি উপাস্য দেবী। সিরি-কালকন্নী জাতকে সিরি উত্তরদিক্‌পাল ধৃতরাষ্ট্রের দুহিতা; পশ্চিমদিক্‌পাল বিরুপাক্ষের দুহিতা কালকন্নী। কালকন্নীকে কথাবার্ত্তায় আমাদের অলক্ষ্মী বলিয়া মনে হয়। যেখানে লোভ, দ্বেষ, হিংসা, নিষ্ঠুরতা, যেখানে পরনিন্দা, মুর্খতা, ঘৃণা, সেইখানেই কালকন্নী বা অলক্ষ্মী। স্কন্দপুরাণের কাশীখণ্ডের এক স্থলে কালকন্নী ও অলক্ষ্মীর একত্রে উল্লেখ আছে। পদ্মপুরাণে স্বর্গখণ্ডে আছে, সমুদ্রমন্থনকালে অলক্ষ্মী জন্মগ্রহণ করেন; তাহার পর লক্ষ্মীর উদ্ভব হয়। অলক্ষ্মী বৈদিক নর্ঝতির পৌরাণিক রূপান্তর।Image result for kojagari lakshmi puja 2017
আমাদের দেশে ভাদ্র, পৌষ ও চৈত্র মাসে লক্ষ্মীপূজা হয়। এতদ্ব্যতীত অশ্বিন মাসে পূর্ণিমায় কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা হয়। শ্যামাপূজার দিন অমাবস্যায় কোন কোন স্থলে লক্ষ্মীপুজা হয়ে থাকে এবং ঐ দিন কোন কোন গৃহস্থের বাড়ী প্রথমে অলক্ষ্মীর পূজা হলে পরে অলক্ষ্মীকে বিদায় করে লক্ষ্মীপূজা হয়।
শারদীয়া পূর্ণিমাতে যে লক্ষ্মীপূজা হয়—যার প্রচলিত নাম কোজাগর-লক্ষ্মীপূজা-তা এখনও হিন্দুর নিকট একটি প্রধান পৰ্ব্ব। পূজনীয় স্মার্ত্ত-শিরোমণি রঘুনন্দন তাহার তিথিতত্ত্বে শাস্ত্রীয় বচন উদ্ধৃত করে এই তিথির করণীয় কাৰ্য্যের বিধান দিয়ে গেছেন। কোজাগর-পূর্ণিমাতে লক্ষ্মী ও ঐরাবতস্থিত ইন্দ্রের পুজা এবং সকলে সুগন্ধ ও সুবেশ ধারণ করে অক্ষক্রীড়া করে রাত্রি জাগরণ করবে; কারণ, নিশীখে বরদা লক্ষ্মী বলেন, “কে জাগরিত আছে ? যে জাগরিত থেকে অক্ষক্রীড়া করে, তাহাকে আমি বিত্ত প্রদান করি। নারিকেল ও চিপিটকের দ্বারা পিতৃগণ ও দেবগণের অর্চনা করবে এবং বন্ধুগণের সাথে উহা ভোজন করবে।” যে নারিকেলের জলপান করে অক্ষক্রীড়ায় নিশি অতিবাহিত করে, লক্ষ্মী তাহাকে ধন দান করে থাকেন।
আশ্বিন-পূর্ণিমায় এই কোজাগর লক্ষ্মীপূজা একটি বহু প্রাচীন উৎসবের সাথে জড়িত। বহুশতাব্দী পূৰ্ব্বে শরৎকালে শস্য কৰ্ত্তন হলে সীতা-যজ্ঞ হোত এবং তাতে সীতা এবং ইন্দ্র আহুত হতেন। পারস্কর-গৃহ্যসূত্রে এই স্থানে সীতাকে ইন্দ্রপত্নী বলা হয়েছে; কারণ, সীতা লাঙ্গলপদ্ধতিরূপিণী শস্য-উৎপাদয়িত্রী ভূমিদেবী; ইন্দ্র বৃষ্টি-জলপ্রদানকারী কৃষিকার্য্যের সুবিধাদাতা দেব। পূৰ্ব্বে সীতা-যজ্ঞে ইন্দ্র আহুত হতেন বলে তিথিতত্ত্বে কোজাগর-পূর্ণিমায় ইন্দ্রের পূজার বিধি আছে। লক্ষ্মী যে সীতার রূপান্তর, তা রামায়ণাদি গ্রন্থে বার বার বলা হয়েছে। তা ছাড়াও লক্ষ্মীর যে-মূৰ্ত্তি কল্পনা করা হয়েছে, তাঁতে দেখতে পাওয়া যায়, লক্ষ্মীর হস্তে ধান্যমঞ্জরী। তন্ত্রে মহালক্ষ্মীর একটি ধ্যানে লক্ষ্মীর হস্তে শালিধান্যের মঞ্জরী। এখনও লক্ষ্মীপূজার সময় কাঠায় ভরে নবীন ধান্য দেওয়া হয়ে থাকে।
শ্রীসূক্তে লক্ষ্মী হিরণ্যবর্ণা, আবার পদ্মবর্ণা বলে বর্ণিতা। তন্ত্রে মহালক্ষ্মীর ধ্যানে দেবী বালাৰ্কদ্যুতি, সিন্দূরারুণকান্তি, সৌদামিনী সন্নিভা। তিনি নানালঙ্কারভূষিতা। তিথিতত্ত্বে আদিত্যপুরাণ হতে লক্ষ্মীর যে ধ্যান উদ্ধৃত হয়েছে, তাতে তিনি গৌরবর্ণা। তাঁহার হস্তসংখ্যা এবং হস্তে তিনি কি কি ধারণ করে থাকবেন, এই দুইটি বিষয়ে অনেক বিভিন্নতা দৃষ্ট হয়। দেবী কোথাও দ্বিহস্ত, কোথাও বা চতুর্হস্তা, কোথাও বা তিনি ষড়ভূজা বা অষ্টভুজা। আবার এক স্থানে মহালক্ষ্মী অষ্টাদশভূজারূপে কল্পিত হয়েছেন। এই মহালক্ষ্মী মহাকালীমুর্ত্তির অন্যরূপ বিকাশ। কোন কোন স্থলে লক্ষ্মীপূজায় যে বলিদানের বিধি আছে, তাহ বোধ হয় এই মহালক্ষ্মীর পুজা।
তিথিতত্ত্বে উদ্ধৃত আদিত্যপুরাণ অনুসারে লক্ষ্মীর হস্তে পাশ, অক্ষমালা, পদ্ম ও অঙ্কুশ। লক্ষ্মীর প্রত্যেক মুর্ত্তিকল্পনাতেই হন্তে পদ্ম থাকে। কোন কোন মূৰ্ত্তিতে হস্ত বসুপাত্র (রত্নপূর্ণ পাত্র) স্বর্ণপদ্ম ও মাতুলুঙ্গ (লেবু) থাকে। কমলার হস্তধৃত লেবুই কমলালেবু নামে অভিহিত হইয়াছে কি না, তা বলা যায় না। অষ্টাদশভূজা মহালক্ষ্মীর হস্তে যথাক্রমে অক্ষ, স্ৰক্‌, পরশু, গদা, কুলিশ, পদ্ম, ধনু, কুণ্ডিকা (কমণ্ডলু,) দণ্ড, শক্তি, অসি, চৰ্ম্ম, জলজ, ঘণ্টা, সুরাপাত্র, শূল, পাণ ও সুদর্শন (চক্র)। শুক্রনীতিসার অনুসারে লক্ষ্মীর এক হস্তে বীণা, দুইটি হস্তে বর এবং অভয়মুদ্রা থাকবে। তথায় আর-একটি হস্তে লুঙ্গফলেরও উল্লেখ আছে। লুঙ্গফল সস্তবতঃ মাতুলুঙ্গ। মূৰ্ত্তিবিশেষে দেবীর এক হস্তে শ্ৰীফল থাকবে, এইরূপ উল্লেখ পাওয়া যায়। শ্ৰীফল সম্বন্ধে একটি পৌরাণিক কাহিনী আছে যে, একদা শিব-পুজাকালে একটি পদ্মের অভাব ঘটায় লক্ষ্মী মুকুলিত পদ্মসদৃশ আপনার একটি স্তন কৰ্ত্তন করে দিয়েছিলেন। মহাদেবের বরে তাঁহাই বিল্ব বা শ্রীফল হয়। মৎস্যপুরাণে বর্ণিত লক্ষ্মীমূৰ্ত্তির হস্তে পদ্ম ও শ্ৰীফল। এই গজলক্ষ্মীমূৰ্ত্তি। দেবী পদ্মাসনে উপবিষ্টা, দুইটি হস্তী দেবীর উপর জলবর্ধণ করিতেছে।
বিষ্ণুমূৰ্ত্তিসহ যে লক্ষ্মীমূৰ্ত্তি দেখা যায়, তা দ্বিহস্তবিশিষ্ট। শ্ৰীযুক্ত বিনোদবিহারী কাব্যতীর্থ বিদ্যাবিনোদ মহাশয়ের ‘বিষ্ণুমূৰ্ত্তি পরিচয়’ নামক পুস্তক হতে জানা যায় যে, বাসুদেব, ত্ৰৈলোক্যমোহন, নারায়ণ প্রভৃতি বিষ্ণুমূৰ্ত্তিতে লক্ষ্মীমুৰ্ত্তিও আছেন। লক্ষ্মীনারায়ণমূৰ্ত্তিতে দেবী নারায়ণের বাম অঙ্কের উপর উপবিষ্ট এবং কোন কোন স্থলে তাঁহার হস্ত দ্বারা পরস্পরকে আলিঙ্গন করে রয়েছেন। অগ্নিপুরাণ হতে জানা যায়, লক্ষ্মী বরাহরূপধারী বিষ্ণুর পদতলে উপবিষ্ট থাকেন। অনন্তশায়িনী বিষ্ণুমূর্তিতে বিষ্ণু নাগের উপর শয়ান এবং লক্ষ্মী তাঁহার পদসেব করছেন। অগ্নিপুরাণের হরিশঙ্কর মূৰ্ত্তিতে নারায়ণ জলশায়ী অবস্থায় বামপাশ্বে শয়ান। ইহাঁর শরীরের এক অংশ রুদ্র (মহাদেব)-মূৰ্ত্তি এবং অপর অংশ কেশব (বিষ্ণু)-মুর্ত্তির লক্ষণযুক্ত এবং মূৰ্ত্তিটি গৌরী ও লক্ষ্মীমুর্ত্তিসমন্বিত। ভারতবর্ষে শৈব বৈষ্ণব প্রভৃতি ধৰ্ম্ম প্রচলিত থাকলেও তাহাদের উপাস্য দেবদেবীগণের মধ্যে ঐক্য-সম্পাদনের চেষ্টা ছিল। সেই সেই চেষ্টার ফলে হরিশঙ্কর মূৰ্ত্তি ও মহালক্ষ্মী মহাকালী মহাসরস্বতীমূৰ্ত্তি।
চিত্রে লক্ষ্মীর বাহন পেচক দেখা যায় । ইহার কারণ ঠিক বলা যায় না। মার্কণ্ডেয়পুরাণের অন্তর্গত চণ্ডী অনুসারে দেবগণের যে বাহন, তাঁহাদের শক্তিরূপিণী দেবীগণেরও সেই বাহন। সুতরাং বৈষ্ণবীর বাহন গরুড়; সেই হিসাবে লক্ষ্মীর বাহন গরুড় হওয়া উচিত ছিল। পেচককে গরুড়ের স্ত্রী-সংস্করণ বলিয়াই বোধ হয়। এথেন্সের পুর্বলক্ষ্মী বা রক্ষয়িত্রী এথেন দেবীর প্রিয় পক্ষীও পেচক।
দেবী-ভাগবতে আছে যে, লক্ষ্মী নানা মূৰ্ত্তিতে নানা স্থানে অবস্থান করছেন। স্বৰ্গধামে তিনি স্বৰ্গলক্ষ্মী, এই লক্ষ্মীর অভাবে ইন্দ্র শ্ৰী-ভ্রষ্ট হয়েছিল। রাজভবনে তিনি রাজলক্ষ্মী, এইজন্যই পরমভাগবত। গুপ্তরাজগণ মুদ্রায় লক্ষ্মীচিহ্ন অঙ্কিত করেছিলেন। আর মর্ত্ত্যলোকে তিনি গৃহলক্ষ্মী- এই মূৰ্ত্তিতে তিনি এখনও হিন্দুগৃহে বিরাজ করছেন।

(মাসিক বসুমতী, অগ্রহায়ণ) শ্ৰী ক্ষেত্ৰগোপাল মুখোপাধ্যায় এর লক্ষ্মী বিষয় ইতিবৃত্ত থেকে সংকলিত- #কৃষ্ণকমল

ভোলানাথ শিবশংকর এবং ভষ্মাসুর


Image result for bhasmasura

অনেক যুগ আগের কথা সারা সৃষ্টিতে ঔঁ নমঃ শিবায় এই সুমধুর ধ্বনি ধ্বনিত হচ্ছে । দেবর্ষিনারদ ব্যাকুল হয়ে পরমপিতা ব্রক্ষার কাছে গেলেন ।ব্রক্ষা বললেন ভষ্মাসুর নামক এক দানব শিবের এ

ই আরধনা করছে । এই মধুর ঔঁ নমঃ শিবায় ধ্বনি তার মুখ থেকে নিঃসৃত হচ্ছে । নারদ বলল কি সুমধুর মন্ত্র তন মন পবিত্র করে দেয় এই ধ্বনি ।ব্রহ্মা   বললেন এই ধ্বনি বেশিক্ষন উচ্চারিত হলে সৃষ্টির বিনাশ হয়ে যাবে । দেবেশ্বর শিবশংকরকে দ্রুত কিছু করতে হবে । নারদ কিছুই বুঝল না ব্রক্ষার কথার অর্থ ।
তিনি প্রশ্ন করতে যাবেন ঠিক সেই সময় ব্রক্ষা চোখ বন্ধ করে ধ্যান মগ্ন হয়ে গেলেন ।নারদ বিষন্ন মনে ব্রক্ষলোক থেকে পৃথিবী লোকের দিকে রওনা দিলেন ।এদিকে ভষ্মাসুরের তপস্যার সাথে সাথে তার তপস্যার তেজ ও শক্তি বেড়ে চলছিল । সমগ্র পৃথিবীতে হাহাকার শুরু হয়ে গেল । তখন শিবশংকর কৈলাস থেকে অদৃশ্য হয়ে ভষ্মাসুরের কাছে এলেন এবং তাকে বর চাইতে বললেন । ভষ্মাসুর বর চাইলেন যার মাথায় ভষ্মাসুর হাত রাখবেন সেই ভষ্ম হয়ে যাবে ।শিব তথাস্তু বললেন । বর পেয়ে অসুরের মাথায় কুবুদ্ধি এল ।ভষ্মাসুর শিবকে বলল বর দিলেন যে এটা সত্য না মিথ্যা তার প্রমান কি ।শিব বলল প্রয়োগ করে দেখ । তখন ভষ্মাসুর বলল সামনে তো আপনি ছাড়া আর কেউ নেই তবে আপনার উপরেই প্রয়োগ করে দেখি । শিব এই কথা শুনে দৌড় দিলেন ।কারন শিবের মাথায় হাত দিলে শিব যদি ভষ্ম হয় তবে সংহার কাজ থেমে যাবে ।আর যদি ভষ্ম না হয় তবে বর মিথ্যা হয়ে যাবে ।

শিব পৃথিবী আকাশ সব স্থানেই দৌড়ে বেড়ালেন কিন্তু ভষ্মাসুর পিছনে পিছনে আসছে । শিব চাইলেই ভষ্মাসুরকে বধ করতে পারে কিন্তু নিজের ভক্তকে নিজে মারা অশোভনীয় । তাই তিনি বধ

ও করতে পারছেন না কি করবে ভেবে না পেয়া দীনবন্ধু করুনাসিন্ধু শ্রী নারায়নকে আহ্বান করলেন । আহ্বানের সাথে সাথে শ্রী হরি প্রকট হলেন ।শ্রী নারায়ন শিবকে গাছের আড়ালে যেতে বলে নিজে মোহিনী অবতার ধারন করল । এরপর ভষ্মাসুর শিবের খোজ করতে করতে সেখানে এলেন এবং নৃত্যরত মোহিনীকে দেখলেন ।মোহিনী রুপ ধারী নারায়নের নৃত্য দেখে সমগ্র সৃষ্টিতে নৃত্যপূর্ন ভাব বিরাজ করছিল । ভষ্মাসুরও মোহিনীর সাথে নৃত্য শুরু করে দিল ।এরপর ভষ্মাসুর নৃত্যর মাঝে এমন মোহিত হয়ে গেল যে কখন নৃত্যর তালে মোহিনীর দেখাদেখি মাথায় হাত রাখল নিজেই বুঝতে পারল না ।মাথায় হাত রাখার সাথে সাথে ভষ্মাসুর ছাই হয়ে গেল । এরপর মোহিনী থেকে নারায়ন রুপে ফিরে আসলেন । তখন শিব নারায়নের স্তব করে নারায়নকে খুশি করলেন এবং দেবেশ্বর শিবশংকর কৈলাসে এবং জগদীশ্বর বিষ্ণু বৈকুন্ঠে প্রস্থান করলেন ।

এই ঘটনা বলার একটাই উদ্দেশ্য অনেকে জানেন যে সাগরমন্থনের সময় বিষ্ণু মোহিনী অবতার নেয় ।এবার জানলেন যে ঐ সাগর মন্থন ছাড়াও বিষ্ণু মোহিনী অবতার নেয় ।এছাড়াও আরও কিছু ঘটনা আছে বিষ্ণুর মোহিনী অবতার নেয়ার ।সব জগতের এবং দেবতাদের কল্যানে ।