কালী পুজোর বিধি জানুন বিস্তারিত


অন্বেষা দত্ত লাহিড়ী

দুর্গা পুজো ও লক্ষ্মী পুজোর পরেই সময় শক্তি সাধনার, অর্থাৎ কালী পুজো বা শ্যামা পুজোর| কালী পুজো সাধারণত অমাবস্যা তিথিতে সম্পন্ন করা হয়| ১৮ শতকে নবদ্বীপের রাজা কৃষ্ণচন্দ্র এই পুজো শুরু করেন| এর পর ১৯ শতক থেকে এই পুজো বহুল প্রচলিত হয়| আমাদের সবার কাছে এই পুজো শব্দবাজি এবং আলোর রোশনাইয়ের পুজো| পুজোয় আনন্দ করার সাথে সাথে এই পুজোর বিধি বা নিয়ম সম্পর্কেও যদি অবগত থাকেন তাহলে ক্ষতি কি? সামনেই তো পুজো তাই এখনি জেনে নিন এর সঠিক বিধি বা নিয়ম|

পুজো শুরুর নিয়মাবলী
দেবী কালী বা ভগবতী কালী মূর্তি বন্দনা সাধারণত আমরা করে থাকি| দেবী মূর্তির একটি পা মহাদেবের বুকের ওপর থাকে, এক হাতে অসুরের ছিন্ন মস্তক ও অন্য হাতে খড়গ| এবং দেবীর গলায় থাকে নরমুন্ডের মালা| তবে অনেক ক্ষেত্রে কালী দোয়াত দেবী মূর্তির পরিবর্তে দেবী ভগবতী রূপে বন্দনা করা হয়| পুজো শুরু করার পূর্বে লেখনি দোয়াত বা কালী দোয়াতটি পুজোর আসনে বসানো হয়ে থাকে| অনামিকা অঙ্গুলি দ্বারা লেখনি দোয়াতগুলিতে স্বস্তিক অঙ্কন করা হয়ে থাকে এবং এর জন্য লাল চন্দনবাটা ব্যবহৃত হয়ে থাকে|

স্বস্তিক অঙ্কন সমাপ্ত হলে কালী পুজো শুরু হয়| বহুল আয়োজন বা ভোগ নয়, দেবী কালী শুধু জবা ফুলেই সন্তুষ্ট হন| তবে ভক্তি, আস্থা ও নিষ্ঠা এই পুজোকে সঠিক ভাবে সম্পন্ন করে| সোমরস এই পুজোয় প্রধান ভোগ হিসেবে ব্যবহৃত হয়| মধ্যরাতে পুজো শুরু হয় এবং সাধারণত ভোর রাতে এই পুজো সম্পন্ন হয়|

পুজোর বিধি
কালী পুজো অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সঠিক বিধি মেনে করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়| সাধারণত ধ্যান, দেবীর আবাহন, পুষ্পাঞ্জলি দ্বারা এই পুজোর বিধি সম্পন্ন হয়| আসুন একটু বিস্তারে জানা যাক|

ধ্যান
দেবী ভগবতীমূর্তি বা লেখনি দোয়াত ঠিক মত প্রতিস্থাপন করা হলে ধ্যান দ্বারা এই পুজো শুরু করা হয়| একনিষ্ঠ ধ্যান এবং বিশেষ মন্ত্র উচ্চারণ দ্বারা দেবীর ধ্যান করা হয়|

আবাহন
ধ্যান সম্পন্ন হলে দেবী ভগবতী বা দেবী কালীর আবাহন শুরু হয়| এক্ষেত্রে হাতের একটি বিশেষ মুদ্রা এবং মন্ত্র উচ্চারণ করে দেবীর আবাহন করা হয়ে থাকে| দুটি হাত জোড় করে প্রনামের ভঙ্গিটি করে বুড়ো আঙুলটিকে ভেতরের দিকে রেখে এই বিশেষ মুদ্রাটি করা হয়ে থাকে| দেবী বন্দনায় বিভিন্ন মুদ্রা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| কারণ প্রতিটি মুদ্রার আলাদা আলাদা অর্থ আছে| এই আবাহন দ্বারা দেবী মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়ে থাকে|

পুষ্পাঞ্জলি
পুষ্পাঞ্জলি তিনটি ধাপে সম্পন্ন হয়| প্রথমে ধ্যান এবং আবাহন দ্বারা দেবীর প্রাণ প্রতিষ্ঠা হলে দেবী কালীকে তুষ্ট করার জন্য পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া হয়| এক্ষেত্রে পাঁচটি লাল জবা ফুল দেবীর চরণে অর্পণ করা হয় একটি বিশেষ মন্ত্রের উচ্চারণে| এরপর একে একে চন্দন, পুষ্প, দীপ, ধূপ ও নৈবেদ্য দ্বারা দেবী বন্দনা করা হয়ে থাকে|

প্রতিটি ক্ষেত্রে আলাদা আলাদা মুদ্রা ও মন্ত্র উচ্চারণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ| এরপর একে একে গন্ধ, অক্ষত এবং পুষ্প বাঁ হাত দিয়ে তুলে ডান হস্ত দ্বারা দেবীর চরণে অর্পণ করা হয়ে থাকে এবং নির্দিষ্ট মন্ত্র পাঠ করা হয়ে থাকে এবং পুজো গ্রহণ করা হেতু দেবী ভগবতী বা দেবী কালীকে বারংবার প্রনাম জানানো হয়ে থাকে|

আমাদের চারিদিকের অশুভ শক্তি এবং আমাদের ভেতরের অশুভ শক্তিকে পরাজিত করার কারণ স্বরূপ এই পুজো অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে সম্পন্ন করা হয়ে থাকে| নারীশক্তির স্বরূপ দেবী ভগবতী সমাজের অনিষ্টকারী শক্তিকে বিনষ্ট করে আমাদের অন্ধকার থেকে আলোর পথ দেখান| তাই আমরাও আলো, বাজি এবং অপার ভক্তি ও শ্রদ্ধার সাথে এই পুজোয় সম্মিলিত হয়ে থাকি|

Advertisements

অমরনাথ মন্দির কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?


অমরনাথ যাত্রা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? কিসের টানে লক্ষ লক্ষ মানুষ দুর্গম এই যাত্রা করেন? অমরনাথ হল হিন্দুদের একটি পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। এটি জম্মু কাশ্মীরে অবস্থিত। এটি মূলত একটি গুহা। এবং চারিদিকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা। পাহাড়গুলি আবার বরফাবৃত। গ্রীষ্মকালে খুব কম সময়ের জন্যই এখানে যাওয়া সম্ভব হয়। কারণ বাকি সময় পুরো রাস্তাটি বরফে ঢাকা থাকে। এবং সেই সময় লক্ষ লক্ষ ভক্ত সেখানে  যাত্রা করে। কিন্তু দুর্গম এই পথ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ সাধারন মানুষদের কাছে?অমরনাথের গুহার ভেতর জল চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ে, আর সেই জল জমে জমে শিবলিঙ্গের আকার ধারন করে। আর সেখানেই জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সমস্ত মানুষ যাত্রা করেন। এবং এই শিবলিঙ্গে পূজা  দেন। বিভিন্ন পৌরাণিক ইতিহাস, মানুষের কিছু সাধারন বিশ্বাস তাদের এখানে বার বার টেনে আনে।

প্রচলিত আছে, বহুকাল আগে ভৃণ্ডমুনি সেখা অমরনাথ বা শিবকে দেখতে পান। তারপর থেকেই অমরনাথে যাত্রার প্রচার শুরু হতে থাকে। এবং তারপর থেকেই লক্ষ লক্ষ মানুষ অমরনাথে যাত্রা করতে শুরু করেন।

পুরাণে আছে, শিব পার্বতীকে অমরত্ব শিক্ষা প্রদানের জন্য, এই স্থানে নিয়ে এসেছিলেন। এবং কথিত আছে শিব তার সমস্ত ত্যাগ করেছিলেন অর্থাৎ তাঁর ষাঁড় নন্দি, তার শিরস্থ চন্দ্র, বায়ু, অগ্নি, জল, মৃত্তিকা এবং সর্পকুলকে বিভিন্ন  স্থানে রেখে আসেন অমরনাথ যাত্রা করার আগে। তাই এটি ভক্তদের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ ।

একটি কাহিনি প্রচলিত আছে, মহাদেব পার্বতীকে যখন অমরত্ব সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান করছিলেন, তখন সেখানে কোন প্রানী ছিল না। শুধুমাত্র দুটি পায়রার ডিম ছিল। সেই দুটি নাকি এখনো দেখতে পাওয়া যায় ওখানে। এইসব গল্প কাহিনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, এইরকম গল্প কাহিনীর টানে মানুষ বার বার এখানে ছুটে আসেন।

সাধারন মানুষের একটি আধ্যাত্মিক টান রয়েছে এই তীর্থস্থানের প্রতি। তারা  মনে করেন অমরনাথের শিব লিঙ্গের দর্শন মানে, সাক্ষাৎ মহাদেবের দর্শন। এছাড়াও মানুষের গভীর বিশ্বাস, দুর্গম এই তীর্থস্থানে গেলে পূর্ণ অর্জন হয়। এবং তার সঙ্গে সঙ্গে জীবনের সমস্ত অনৈতিক কাজের নিবৃত্তি সম্ভব। ভগবান শিব মানুষের অতিরিক্ত লালসা, এবং সেই লালসার ফলে হওয়া পাপকে ক্ষমা করে দেন। তাই সেই পূর্ণ অর্জনের জন্যই এত মানুষ যান সেখানে।

এই অমরনাথ যাত্রাকে সবাই অত্যন্ত পবিত্র মনে করেন। শিবরাত্রি ব্রত অত্যন্ত জনপ্রিয় সাধারন মানুষের কাছে। বেশির ভাগ বাঙালী শুধু বাঙালী নয় অন্যান্য ধর্মের মানুষও ঘটা করে শিবের পূজা করেন। অমরনাথের মত পবিত্র স্থানে গিয়ে সকলের ভগবান শিবকে দেখা এবং তার পূজা দেবার ইচ্ছা  প্রবল থাকে। তারা  মনে করেন ভগবানের কৃপাতেই সেই যাত্রা হয়। এবং সবার ভাগ্যে এই পবিত্র যাত্রা থাকে না। আর এই যাত্রা হলে জীবন সার্থক।  তাই অত্যন্ত দুর্গম পথ হলেও তারা যেতে চান। যানও অমরনাথ দর্শনে।

অমরনাথ হিন্দুদের পবিত্র স্থান হলেও ধর্ম  নিরপেক্ষ মানুষ এই যাত্রায় আপনি পাবেন। অমরনাথ যেতে হলে একটা নির্দিষ্ট জায়গা পর্যন্ত গাড়ি যায়। এই গাড়ির অনেক ডাইভার মুসলিম। কেন এই কথা বলছি? আসলে জঙ্গি হামলা যেসময় হয়েছিল অমরনাথে, তখন এই মানুষগুলি জাত পাত ভেদাভেদ না করে বহু পর্যটকের প্রাণ বাঁচিয়েছেন। তারা হলেন সেলিম মির্জা , ইব্রাহিম।  অমরনাথ মানে শুধু হিন্দু মন্দির নয়। জাতিভেদ নির্বিশেষে মানুষের মিলনক্ষেত্র। তাই অমরনাথের মন্দিরের এত মাহাত্ম্য।

কৃষ্ণ প্রেয়সী তুলসীতত্ত্ব কথা


তুলসীর উৎপত্তিঃ

তুলসী দেবীর কৃপা ব্যতীত কৃষ্ণ প্রেম সম্ভব নয়। তাই তুলসী দেবীকে তুষ্ট করার জন্য নিয়মিত তুলসী সেবা আবশ্যক। কৃষ্ণ সেবায় একমাত্র তুলসী পত্র ব্যতীত অন্য কোন কিছুর প্রয়োজন হয় না। তুলসী দেবী কৃষ্ণভক্তি লাভের প্রতীক। এছাড়াও তুলসী পত্র একটি মহাঔষধি।

সর্বৌষধি রসেনৈব পূর্বমৃত মন্থনে।
সর্বোসত্ত্বোপকারায় বিষ্ণুনা তুলসী কৃতা।।
(তথাহি স্কন্ধ পুরাণ)
পরাকালে দেবাসুর হইয়া মিলিত।
সমুদ্র মন্থনে করে উৎপন্ন অমৃত।।
জীবের মঙ্গল হেতু বিষ্ণু হিতময়।
সর্বগুণা তুলসীরে উদ্ধত করয়।।

তুলসী মাহাত্ম্যঃ
ন বিপ্রসদৃশং পাত্র ন দানং সুরভে সমম্‌।
ন চ গঙ্গাসমং তীর্থং ন পত্রং তুলসী সমম্‌।।
অভিন্ন পত্রং হরিতাং হৃদ্যমঞ্জরী সংযুতাম্‌।
ক্ষীরোদার্ণব সম্ভুতাং তুলসী আপদোদ্ধার।।
(তথাহি স্কন্ধ পুরাণ)
ব্রাহ্মণ সমান পাত্র ধেনুতুল্য দান।
ধরাধামে তীর্থ নাহি গঙ্গার সমান।।
তেমনি পত্রের মধ্যে হয় শ্রেষ্ঠ তরা।
তুলসী নামেতে পত্র খ্যাত এই ধরা।।
যে তুলসী সমুদ্ভব ক্ষীরোদ সাগরে।
অচ্ছিন্ন হরিৎ পদ্ম কৃষ্ণ দান করে।।
ক্ষীরোদ সাগরে জন্ম তুলসী হরিৎ।
অচ্ছিন্ন মঞ্জুরী কৃষ্ণে হলে সমর্পিত।।
সকল আপদ নাশি মুক্ত হয় সেই।
ছিন্ন ভিন্ন পক্কপত্র তুলসী না দেই।।

তুলসী জাগরণ মন্ত্রঃ
উত্তিষ্টং তুলসীদেবী গাত্রোত্থানাং কুরু যথা।
অরুণোদয় প্রাতঃ প্রীচরণে প্রণমাম্যহম্‌।।

তুলসীর মূল লেপন মন্ত্রঃ
তুলসী নিপয়তে গঙ্গা স্থানেমেকং বারাণসী।
সেবনে পঞ্চতীর্থানি তুলসীভ্যাং নমো নমঃ।।
তুলসী ত্বং সদা ভক্তা সর্বতীর্থফলং ভবেৎ।
লেপনাৎ তব মূলঃ সর্বপাপৈ প্রমুচ্যতে।।
তন্মুলে সর্বতীর্থানি তৎপত্রে সর্বদেবতা।
তদঙ্গে সর্বপুণ্যানি কৃষ্ণভক্তি প্রদায়িনীং।।

তুলসী স্নান মন্ত্রঃ
গোবিন্দবল্লভাং দেবী ভক্তচৈতন্যকরণীং।
স্নাপয়ামি জগদ্ধাত্রীং কৃষ্ণভক্তি প্রদায়িনীং।।

তুলসী চয়ন মন্ত্রঃ
তুলস্যমৃত নামাসি সদা ত্বং কেশব প্রিয়া।
কেশবার্থে চিনোমি ত্বাং বরদা ভব শোভনে।।
তদঙ্গ সম্ভবৈ পত্রৈ পূজয়ামি যথা হরিং।
তথা কুরু পবিত্রাঙ্গি, কলৌমলবিনাশিনীম্‌।।
চয়ানাদ্ভব দুঃখান্তে যদ্দেবি। হৃদি বর্ততে।
তৎ ক্ষমস্ব জগন্মাতস্তুলসী! ত্বাং নমাম্যহম্‌।।

তুলসী অর্ঘ্য মন্ত্রঃ
শ্রিয়ঃ শ্রিয়ে শ্রিয়াবাসে নিত্যং শ্রীধরসৎকৃতে।
ভক্ত্যা দত্তং ময়া দেবী গ্রহাণার্ঘ্যঃ নমোহস্তুতে।।

গন্ধ পুষ্প দেওয়ার মন্ত্রঃ
ইদং গন্ধং তুলসীদেব্যৈ নমঃ।
এতে গন্ধপুষ্পে তুলসীদেব্যৈ নমঃ।।

পূজান্তে পাঠ্যঃ
নির্মিতা ত্বং পুরা দেবৈ রচিতা ত্বং সুরাসুরৈঃ।
তুলসী হর মে পাপং পূজাং গৃহ্ন নমোহস্তুতে।।

তুলসীর স্তুতিঃ
মহাপ্রসাদ জননী সর্বসৌভাগ্যবর্ধিনী।
আধিব্যাধিহরি নিত্যং তুলসী ত্বং নমোহস্তুতে।।

তুলসীর ধ্যানঃ
তুলসী সর্বভূতানাং মহাপাতকনাশিনী।
স্বর্গাপবর্গদে দেবী বৈষ্ণবানাং প্রিয়ে সদা।।
সত্যে সত্যবতীচৈব ত্রেতায়াং মানবী তথা।
দ্বাপরে অবতীর্ণাসি বৃন্দা ত্বং তুলসী কলৌ।।

তুলসীর প্রণামঃ
বৃন্দায়ৈ তুলসীদেব্যৈ প্রিয়ায়ৈ কেশবস্য চ।
কৃষ্ণভক্তিপদে দেবী সত্যবত্যৈ নমো নমঃ।।
যা দৃষ্টা নিখিলাঘ সঙ্খ সমমী স্পষ্টা বপুঃ পাবনী।
রোগানামভিবন্দিতা নিরসনী সিক্তান্তকত্রাসিনী।।
প্রত্যাশক্তি বিধায়িনী ভগতবঃ কৃষ্ণস্য সংরোপিতা।
ন্যস্তাতচ্চরণে বিমুক্তি ফলদাতস্যৈ তুলস্যৈ নমঃ।।

তুলসী চয়ন নিষিদ্ধ তত্ত্বঃ
অস্বাতা তুলসীং ছিত্বা যঃ পূজা কুরুতে নরঃ।
সোহপরাধা ভবেৎ সত্যং তৎসর্ব নিষ্ফলঃ ভবেৎ।।
ন স্নাতা তুলসীং ছিদ্যাং দেবার্থে পিতৃকর্মণি।
মাসান্তে পক্ষয়োবন্তে দ্বাদশ্রাং নিশি সন্ধ্যয়োঃ।।
তুলসীচ্ছেদনেব বিষ্ণোঃ শিরসি ছেদনম্‌।
বিনা স্নানে করে যদি তুলসী চয়ন।
তাহা দ্বারা করে যদি ভগবৎ অর্চন।
দেবকর্ম পিতৃকর্ম বিফলে তার যায়।
পদ্মপূরাণের মতে বর্ণিলাম তায়।।
দ্বাদশী, সংক্রান্তি, সন্ধ্যা, অমা পৌর্ণমাসী।
রাত্রি কালে কখন না তুলিবে তুলসী।।
যদিস্যাৎ কোন লোক করয়ে চয়ন।
বিষ্ণু শিরচ্ছেদ পাপ হইবে তখন।।

তুলসী আরতিঃ
নমো নমো তুলসী শ্রীকৃষ্ণের প্রেয়সী
জয় রাধাকৃষ্ণের চরণ পাব এই অভিলাষী।।
যে তোমার স্মরণ লয়…. তার বাঞ্ছা পূর্ণ হয়
তুমি কৃপা করি কর তারে বৃন্দাবনবাসী।
এই মনের অভিলাষ …. বিলাস কুঞ্জে দিও বাস
নয়নে হেরিব সদা যুগলরূপ রাশি।।
এই নিবেদন ধর…. সখীর অনুগত কর
সেবা অধিকার দিয়ে কর নিজো দাসী।।
তুমি বৃন্দে নাম ধর…. অঘটন ঘটাতে পার
কৃপা করি সিদ্ধমন্ত্র দিলা পৌর্ণমাসী।।
দীন কৃষ্ণদাসে কয়…. মোর যেন এই হয়
শ্রীরাধা-গোবিন্দ প্রেমে সদা যেন ভাঁসি।।

তুলসী প্রদক্ষিণ মন্ত্রঃ
যানি কানি চ পাপানি, ব্রহ্মহত্যাদি কানি চ।
তৎ সর্ব্বং বিলয়ং যাতি, তুলসী! তৎপ্রদক্ষিণাৎ।।(দুই বার)

হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।।

(কৃষ্ণ প্রেয়সী তুলসীদেবীর তত্ত্ব-কথা সমাপ্ত)

জেনে নিন কালীমূর্তির প্রকৃত রহস্য- 


হিন্দুদের অন্যতম আরাধ্যা দেবী কালিকা বা কালীর সবচেয়ে জনপ্রিয় মূর্তিতে দেবীকে নগ্নিকা হিসেবে দেখা যায়। দেবীর এই মূর্তি অনেকের কাছে কৌতুহলের কারণ, অনেকের কাছে কৌতুকেরও। সেক্ষেত্রে এই দেবীরূপের প্রকৃত তাৎপর্য জানা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।

প্রথমেই বলে রাখা ভাল যে, হিন্দুধর্মে যে কোনও দেব বা দেবীমূর্তিই আদপে প্রতীকী। হিন্দু শাস্ত্রে ব্রহ্মকেই একমাত্র সত্য বলে গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি নিরুপাধি, নির্গুণ। মায়াকে আশ্রয় করে তিনি সগুণ রূপ লাভ করেন। এই সগুণ ব্রহ্মই ঈশ্বর, স্রষ্টা। পুরুষ ও প্রকৃতির লীলার মাধ্যমে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি, অতঃপর স্থিতি ও বিলয় ঘটে থাকে। শক্তি হলেন প্রকৃতি স্বরূপিনী। তিনি জগন্মাতৃকা। আদ্যাশক্তি নিরাকারা এবং মানুষের কল্পনার অতীত। কিন্তু ভক্তের সুবিধার্থেই তাঁকে মানুষের ইন্দ্রিয়বোধ্য রূপে কল্পনা করা হয়ে থাকে। দেবী কালীর প্রচলিত ও সাধারণ্যে পূজিত মূর্তিটিও তাঁর তেমনই একটি কল্পিত রূপমূর্তি। কিন্তু এই রূপকল্পনার বিশেষ শাস্ত্রীয় তাৎপর্য রয়েছে। তাঁর মূর্তির প্রতিটি অংশই গভীর প্রতীকী অর্থ সম্পন্ন। কীরকম সেই অর্থ? সংক্ষেপে জেনে নেওয়া যাক—

১. দেবীর মাথায় কালো চুলের ঢল। তাঁর এই মুক্ত কেশপাশ তাঁর বৈরাগ্যের প্রতীক। তিনি জ্ঞানের দ্বারা লৌকিক মায়ার বন্ধন ছেদন করেছেন। তাই তিনি চিরবৈরাগ্যময়ী।

২. দেবীর গায়ের রং কালো। আসলে তিনি যে কোনও বর্ণের অতীত। আর কালো রং সকল বর্ণের অনুপস্থিতির প্রতীক। কখনও দেবীকে গাঢ় নীল বর্ণেও কল্পনা করা হয়। তিনি গাঢ় নীল আকাশের মতোই অসীম। তাঁর নীল গাত্রবর্ণ সেই গগনসম অসীমতার ইঙ্গিতবাহী।

৩. দেবী ত্রিনয়ন সম্পন্না। এই ত্রিনয়ন চন্দ্র, সূর্য ও অগ্নির ন্যায় অন্ধকার বিনাশকারী। এই ত্রিনয়নের মাধ্যমে দেবী যেমন অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ দর্শন করে থাকেন, তেমনই প্রত্যক্ষ করেন সত্য, শিব ও সুন্দরকে; অর্থাৎ বৃহত্তর অর্থে সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়কে।

৪. দেবী সাদা দাঁতের দ্বারা নিজের রক্তবর্ণ জ্বিহাকে কামড়ে ধরে রয়েছেন। লাল রং রজোগুণের ও সাদা রং সত্ত্বগুণের প্রতীক। দাঁতের দ্বারা জিহ্বাকে চেপে ধরে দেবী তাঁর ভক্তকুলকে বোঝাতে চাইছেন, ত্যাগের দ্বারা ভোগকে দমন করো।

৫. দেবী মুণ্ডমালিনী। দেবীর গলায় রয়েছে মোট ৫০টি মুণ্ডের মালা। এই মুণ্ডগুলি ৫০টি বর্ণ (১৪টি স্বরবর্ণ ও ৩৬টি ব্যঞ্জনবর্ণ) বা বীজমন্ত্রের প্রতীক। এই বীজমন্ত্রই সৃষ্টির উৎস। দেবী নিজে শব্দব্রহ্মরূপিনী।

৬. দেবী চতুর্ভুজা। তাঁর ডানদিকের উপরের হাতে রয়েছে বরাভয় মুদ্রা, নীচের হাতে আশীর্বাদ মুদ্রা। কারণ দেবী তাঁর সন্তানদের যেমন রক্ষা করেন, তেমনই ভক্তের মনোবাঞ্ছাও পূর্ণ করেন। বাঁ দিকের উপরের হাতে তিনি ধরে রয়েছেন তরবারি, আর নীচের হাতে একটি কর্তিত মুণ্ড। অর্থাৎ জ্ঞান অসির আঘাতে তিনি যেমন জীবকুলকে মায়াবন্ধন থেকে মুক্তির পথপ্রদর্শন করতে পারেন, তেমনই মায়াচ্ছন্ন জীবের মস্তিস্কে প্রদান করতে পারেন প্রজ্ঞা কিংবা বিশেষ জ্ঞান।

৭. দেবী কোমরে কর্তিত হাতের মেখলা পরিহিতা। এই হাত কর্মের প্রতীক। মানুষের সমস্ত কর্মের ফলদাত্রী দেবী। জীবনচক্রের শেষে সমস্ত আত্মা স্বয়ং দেবীর অঙ্গীভূত হয়। এবং পরে মাতৃজঠর থেকেই পুনরায় তাদের কর্মফল অনুসারে জন্মলাভ করে।

৮. দেবীর পদতলে শিব শায়িত। শিব স্থিতি, দেবী গতি। শিব ব্রহ্মচৈতন্য, দেবী ব্রহ্মশক্তি। তাঁদের সম্মিলন ব্যতীত সৃষ্টির উৎপত্তি সম্ভব নয়। বঙ্গে সাধারণত দক্ষিণা কালীর পুজো হয়ে থাকে। এই মূর্তিতে দেবীর দক্ষিণ পদ বা ডান পা শিবের বুকে স্থাপিত থাকে।

৯. দেবী নগ্নিকা। তিনি বিশ্বব্যাপী শক্তির প্রতীক। তিনি অসীম। এই চিরশক্তিকে আবৃত করে এমন সাধ্য কোন বস্ত্রের রয়েছে! দেবী তাই দিগম্বরী।