বিশ্বকর্মা


বিশ্বকর্মা

দেবতাদের শিল্পী হলেন বিশ্বকর্মা । তিনি নির্মাণ, যন্ত্রপাতি আদির দেবতা । স্বর্গের অনান্য দেবতা দের মতো তাঁরও পূজা হয় । বিশ্বকর্মার ধ্যান মন্ত্রে বলা হয়-

ওঁ বিশ্বকর্মন্ মহাভাগ সুচিত্রকর্মকারক্ ।
বিশ্বকৃৎ বিশ্বধৃক্ ত্বঞ্চ রসনামানদণ্ডধৃক্ ।।

[ এর অর্থ- হে দংশপাল ( বর্মের দ্বারা পালনকারী ) , হে মহাবীর , হে বিশ্বের সৃষ্টিকর্তা ও বিশ্ব বিধাতা, হে সুন্দর চিত্র রূপ কর্মকারক , আপনি মাল্য চন্দন ধারন করে থাকেন । ]

বিশ্বকর্মার প্রনাম মন্ত্রে বলা হয়-

দেবশিল্পি মহাভাগ দেবানাং কার্য্যসাধক ।
বিশ্বকর্মন্নমস্তুভ্যং সর্বাভীষ্টপ্রদয়ক ।।

[ দেবশিল্পী , মহাভাগ ( দয়াদি অষ্ট গুন যুক্ত ) দেবতা দের কারু কার্য্যসাধক সর্বাভীষ্ট প্রদানকারী হে বিশ্বকর্মা আপনাকে নমস্কার ]

ধ্যান ও প্রনাম মন্ত্রে বিশ্বকর্মার যে পরিচয় পাওয়া গেলো- সেটি হল বিশ্বকর্মা মহাবীর আবার দয়াদি অষ্ট গুন যুক্ত। তিনি সৃষ্টি কর্তা আবার সৃষ্টি বিধাতা। তিনি মহাশিল্পী আবার মহাযোদ্ধা। বিশ্বকর্মার এই চরিত্র বেদ এবং পুরানে আরোও পরিষ্কার ভাবে ফুটে উঠে ।

বেদে বিশ্বকর্মা
= = = = = =

ঋক বেদের দশম মণ্ডলের দুটি বিশিষ্ট সূক্তে বিশ্বকর্মাকে স্তব করা হয়েছে । দুল্যক ও ভূলোক প্রথমে জলাকার ও সম্মিলিত ছিল। উভয়ের সীমা যত বৃদ্ধি পেলো- ততই তারা পরস্পর দূরবর্তী হতে লাগলো। এবং এক সময় পৃথক হল। বিশ্বকর্মা মনে মনে এই বিষয়ে চিন্তা করে নিরীক্ষণ করলেন। এই বিশ্ব তাঁরই কর্ম বলে তাঁর নাম বিশ্বকর্মা । বিশ্বকর্মা ‘বিমনা’ অর্থাৎ তিনি সমষ্টি মনা। বিশ্বকর্মা ‘ধাতা’ অর্থাৎ তিনি স্রষ্টা, বিশ্বকর্মা শ্রেষ্ঠ, বিশ্বকর্মা সর্ব দ্রষ্টা , এবং তিনি ‘ধামানি বেদ ভুবনানি বিশ্বা’ বিশ্ব ভুবনের সকল ক্ষেত্রই তাঁর পরিজ্ঞাত এবং তিনি সর্ব অন্তর্যামী ।

বিশ্বকর্মার চোখ, বদন, বাহু , পদ সর্বত্র, সর্ব দিকে । তিনি বিশ্বতশ্চক্ষু, বিশ্বতোমুখ , বিশ্বতস্পাৎ । এই বিশ্ব যজ্ঞে তিনি নিজেকে আহুতি দিয়েছেন । অর্থাৎ বিশ্ব জগতের কল্যাণে তিনি সর্বদা চিন্তা রত। তিনি বাচস্পতি অর্থাৎ বাক্যের অধীশ্বর। তিনি মনোজেব অর্থাৎ মনের ন্যায় বেগ মান । তিনি বিশ্বের সমস্ত প্রানীর মঙ্গলকারী । তিনি সাধুকর্মা অর্থাৎ তাঁর চেষ্টা ও বিধান মঙ্গলময় ।

পুরান শাস্ত্রে বিশ্বকর্মা
= = = = = = = =

বেদের যিনি বিশ্ব স্রষ্টা , পুরানে তিনি দেবতা দের শিল্পী বিশ্বকর্মা । তিনি স্বর্গের একজন দেবতা । তিনি সহস্র রকম শিল্প জানেন । তিনি দেবতা দের শিল্পের কারিগর । কারিগরি সকল বিদ্যা বিশ্বকর্মার হাতে । কোন কোন পুরান বলে বিশ্বকর্মার পিতা হলেন প্রভাস । প্রভাস হলেন অষ্টবসুর এক জন । আর বিশ্বকর্মার মাতা হলেন বরবর্ণিনী । বরবর্ণিনী হলেন দেবগুরু বৃহস্পতির ভগিনী । আবার ব্রহ্মবৈবর্ত্ত পুরান বলে ব্রহ্মার নাভি থেকে বিশ্বকর্মার সৃষ্টি ।

পুরানের বিশ্বকর্মা একজন শিল্পী। তিনি বিমান নির্মাতা ( দিব্য দেব বিমান ), অলংকার ভূষন , আয়ূধ প্রস্তুতকারক । মনুষ্য শিল্পীরা বিশ্বকর্মার প্রবর্তিত শিল্প কেই উপজীব্য করে বেঁচে আছে । বিশ্বকর্মা প্রচুর জিনিষ নির্মাণ করেছেন। কুঞ্জর পর্বতে অবস্থিত অগস্ত্য মুনির ভবন, কুবেরের অলকা পুরী ও দিব্য বিমান, রাবনের স্বর্ণ লঙ্কা , ভগবান শ্রীকৃষ্ণের দ্বারকা পুরী – সকল কিছু বিশ্বকর্মার দ্বারা সৃষ্টি। রাবনের রাজাপ্রসাদের সাথে সুন্দর উদ্যান, গোষ্ঠ, মন্ত্রণা গৃহ, মনোরম ক্রীড়া স্থান, রাজাপ্রাসাদের কারুকার্য ইত্যাদি দেবশিল্পীর নিখুত শিল্প কলার পরিচয় দেয় । এছাড়া ভাগবত পুরান অনুসারে দ্বারকা নগরীর যে সুরক্ষিত, ভাস্কর্য , কলা কৌশলের একটি ধারনা পাওয়া যায়- তাতে শিল্পী বিশ্বকর্মার শিল্প কে দেখে আশ্চর্য হতে হয় ।

বিশ্বকর্মার অপর নির্মাণ হল দেবপুরী । তিনি সমস্ত সৌন্দর্য কে মিলিয়ে এই পুরী নির্মাণ করেছিলেন । এই পুরীকে পাওয়ার জন্য বারংবার অসুর গণ সুর লোকে হানা দিয়েছিলেন। তাই বিশ্বকর্মার সৃষ্টিকে প্রনাম না করে থাকা যায় না । মৎস্য পুরান বলে- কি কূপ, কি প্রতিমা, কি গৃহ, কি উদ্যান সকল কিছুর উদ্ভাবক হলেন বিশ্বকর্মা। শুধু এখানেই বিশ্বকর্মার সৃষ্টি শেষ নয়, যে বিমানে চড়ে দেবতারা গমন করেন- তাও বিশ্বকর্মার তৈরী। এবং বিভিন্ন দিব্য বান- যা কেবল দেবতাদের অস্ত্রাগারে থাকে – তাও বিশ্বকর্মার তৈরী। যে ধনুক দিয়ে ভগবান শিব ত্রিপুরাসুরকে বধ করেছিলেন, যে ধনুক পরশুরামের কাঁধে শোভা পেতো- সেই ধনুক বিশ্বকর্মার সৃষ্টি। বৃত্রাসুর বধের জন্য বিশ্বকর্মা দধীচি মুনির অস্থি থেকে বজ্র নির্মাণ করে দেবেন্দ্র কে দিয়েছিলেন । কিছু পুরান বলে ভগবান বিষ্ণুর চক্র, ভগবান শিবের ত্রিশূল বিশ্বকর্মার সৃষ্টি । শ্রী শ্রী চন্ডীতে দেখি মহিষাসুর বধের জন্য দেবী মহামায়া প্রকট হলে দেবীকে তীক্ষ্ণ বর্শা, অভেদ্য কবচ এবং বহু মারনাস্ত্র বিশ্বকর্মা দেবীকে প্রদান করেন । রামচন্দ্রের সেতু বন্ধনের অন্যতম কারিগর নল এই বিশ্বকর্মার পুত্র । বিষ্ণু পুরান বলে ত্বষ্টা নামক এক শিল্পী ছিল- যিনি বিশ্বকর্মার পুত্র । দেবতাদের শিল্পী যেমন বিশ্বকর্মা , তেমনি অসুর দের শিল্পী হলেন ময় দানব । বায়ু পুরান ও পদ্ম পুরান মতে ভক্ত প্রহ্লাদের কন্যা বিরোচনার সাথে বিশ্বকর্মার বিবাহ হয় । বিশ্বকর্মার ঔরসে বিরোচোনার গর্ভে অসুর শিল্পী ময় দানবের জন্ম হয় ।

ব্রহ্মবৈবর্ত্ত পুরান মতে বিশ্বকর্মা ও তাঁর স্ত্রী ঘৃতাচী দুজনেই শাপ পেয়ে ধরাধামে জন্ম নেন । ঘৃতাচী ছিলেন স্বর্গের এক নর্তকী । তাঁদের নয়টি সন্তান হয় – যথা মালাকার , কর্মকার , কাংস্যকার, শঙ্খকার , সূত্রধর, কুবিন্দক, কুম্ভকার, স্বর্ণকার, চিত্রকর । বিশ্বকর্মা প্রত্যেক কেই নানান শিল্প শেখান । তিনি মালাকারকে পুস্প শিল্প, কর্মকারকে লৌহ শিল্প, কাংস্যকারকে কাংস শিল্প, শঙ্খ কারকে শঙ্খ শিল্প, সূত্রধরকে কাষ্ঠ শিল্প, কুবিন্দক কে বয়ন শিল্প, কুম্ভকারকে মৃৎ শিল্প, স্বর্ণকারকে অলঙ্কার শিল্প, চিত্রকরকে অঙ্কন শিল্প শেখান। স্কন্ধ পুরান বলে বৃত্রাসুর হলেন বিশ্বকর্মার পুত্র। যাকে ইন্দ্র দেবতা বধ করেন । তবে স্কন্ধ পুরানের এই মত অপর কোন পুরানে পাওয়া যায় নি ।

এত সর্তেও বলা যায় বিশ্বকর্মার এক মেয়ে পিতার অমতে বিয়ে করেছিল। এই কারনে বিশ্বকর্মা বানর হয়ে পৃথিবীতে জন্মান । ঘটনা টি এই- বিশ্বকর্মা ও ঘৃতাচীর কন্যা চিত্রাঙ্গদা পৃথিবীর সূর্য বংশীয় রাজা সুরথ কে ভালোবাসতো। সুরথও চিত্রঙ্গদা কে ভালোবাসতো । কিন্তু দেবতা হয়ে ত মানুষের সাথে বিবাহ হয় না । বিশ্বকর্মা জানতে পেরে মেয়েকে যথেষ্ট শাসন করলেন । এই অবস্থায় পৃথিবীর মেয়েরা যা করে বিশ্বকর্মার কন্যা টিও তাই করলো । স্বর্গ থেকে পালালো । দুজনে বিবাহ করে নিলো। ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে বিশ্বকর্মা আসলেন । কন্যা ভাবলেন পিতা বুঝি আশীর্বাদ করতে এসেছেন । কিন্তু না। বিশ্বকর্মা অভিশাপ দিলেন । কন্যার বিবাহ বিচ্ছেদ হোক – এমন অভিশাপ দিলেন । কিন্তু সনাতন ধর্মে বিবাহকে খুব পবিত্র সম্পর্ক মানা হয়- যেখানে বিবাহ বিচ্ছদের স্থান নেই। তাই মহর্ষি ঋতধ্বজ ভাবলেন দেবতা হয়ে বিশ্বকর্মার একি পশুর মতো বুদ্ধি? মুনি বিশ্বকর্মা কে বানর কূলে জন্মাবার শাপ দিলেন । বিশ্বকর্মা বানর হলেন । অবশেষে এক সময় কন্যার বিবাহ মেনে নিলে কন্যা ও বিশ্বকর্মা দুজনেরই শাপ দূর হয় ।

বিশ্বকর্মার হাতে দাঁড়িপাল্লা
== = = = = = = = =

বাঙালী হিন্দু গণ যে বিশ্বকর্মার মূর্তি পূজো করেন তিনি চতুর্ভুজা । এক হাতে দাঁড়িপাল্লা, অন্য হাতে হাতুরী, ছেনী ( লম্বা , ভারী লোহার যন্ত্র, মাথায় হাতুরী মেরে ফুটো করার কাজে ব্যবহার হয় ) , কুঠার থাকে । অবশ্যই এগুলি শিল্পের প্রয়োজনীয় জিনিষ, তাই শিল্প দেবতা বিশ্বকর্মা এগুলি ধারন করে থাকেন । দাঁড়িপাল্লার একটি কারন আছে । আমরা যদি দাঁড়িপাল্লা কে ভালো মতো লক্ষ্য করি- দেখি সুপাশে সমান ওজনের পাল্লা থাকে। ওপরের মাথার সূচক যখন সমান ভাবে ঊর্ধ্ব মুখী হয়- তখন বুঝি মাপ সমান হয়েছে । এভাবে একটি পাল্লায় বাটখারা রেখে অপর টিতে দ্রব্য রেখে পরিমাপ হয় । এর তত্ত্ব কথা আছে । আমাদের জীবনের কাটাতি আত্মিক বিন্দুতে স্থির রাখতে হবে । দুই পাল্লার একদিকে থাকবে জ্ঞান আর কর্ম। জ্ঞানের দিকে বেশী ঝুকে পড়লে কর্ম কে অবহেলা করা হবে- পরিণামে আসবে দুঃখ, অভাব। আর কাটাতি কর্মের দিকে বেশী ঝুকে পড়লে তবে আসবে আধ্যাত্মিক অকল্যাণ । তাই কাটাতি দুয়ের মাঝে সমন্বয় করে রাখতে হবে । কোন দিকেই না যেনো বেশী ঝুকে পড়ে। এই নিয়ম না মেনে চললে বিশ্বপ্রেম , বিশ্ব ভাতৃত্ব সচেতনতা কোন টাই সম্ভব না।

হস্তী কেন বিশ্বকর্মার বাহন ?
= = = = = = = = = = =

বিশ্বকর্মার মূর্তি যদি আমরা দেখি, তাহলে দেখি তাঁর বাহন হস্তী । কলকাতার কর্মকার সম্প্রদায়ের বিশিষ্ট নেতা শিক্ষা ব্রতী স্বর্গত হরষিত কেশরী রায় প্রথম বিশ্বকর্মার হস্তী বাহন বিগ্রহের পূজা করেন । হাতী কেন বাহন ? পুরানের প্রনাম মন্ত্রে বিশ্বকর্মা কে মহাবীর বলে বর্ণনা করা হয়েছে । হাতীর কত টা শক্তি তার আন্দাজ করতে পারি। নিমিষে গাছ পালা মাথা দিয়ে ঠেলে ফেলে দেয় । কারোর ওপর চরণ ভার দিলে- তার মুখ দিয়ে রক্ত উঠে মৃত্যু- আর অস্থি সকল চূর্ণ চূর্ণ হবে । এমন প্রবাদ আছে, হাতী নাকি একটু বড় পাথর শুঁড়ে তুলে ছুঁড়ে মারতে পারে । প্রাচীন কালে রাজারা যুদ্ধে হস্তী বাহিনীর প্রবল ভাবে ব্যবহার করতেন । তাই এই মহা শক্তিমান প্রানী এই দিক থেকে মহা যোদ্ধা বিশ্বকর্মার বাহন হবার যোগ্যতা রাখে ।

হস্তীর হাত নেই । তবে একটি ‘কর’ বা ‘শুন্ড’ আছে । কর আছে বলেই হাতীর এক নাম ‘করী’ । ‘কৃ’ ধাতু থেকেই ‘কর’ শব্দটির উৎপত্তি। সে এই শুন্ডের সাহায্যেই গাছের ডাল টানে, জল খায়, স্নান করে । আবার দেখি শিল্পের মাধ্যমেই কর্ম সংস্থান । তাই বিশ্বকর্মা কর্মের দেবতা । এই শূন্ড দ্বারা কর্ম করা – এই দিক থেকে হস্তী একভাবে বিশ্বকর্মার বাহন হিসাবে মানানসই ।

হস্তীকে দিয়ে অনেক কাজ করানো হয় । বন দপ্তর হস্তীকে দিয়ে কাঠ সরানোতে কাজে লাগায় । মোটা মোটা গাছের গুঁড়ি, কান্ড মাহুতের নির্দেশে হাতী এক স্থান থেকে আর এক স্থানে নিয়ে যায়, আবার কখনো সে গাছের ডাল বয়ে নিয়ে যায় মাহুতের নির্দেশে । আবার বন্য হাতীদের তাড়াতে বন দপ্তর পোষা হাতী গুলিকে কাজে লাগায়। হাতীর জীবন টাই এই রকম কাজের। নিজের খাদ্য আরোহণ থেকে , মাল বওয়া সব সময় কাজ । আর শিল্পের সাথে কর্মের সংস্থান জল আর ঠান্ডার মতো। জলে যেমন ঠান্ডা ভাব থাকে তেমনই কর্মের মাধ্যমেই শিল্পের বিকাশ। তাই বিশ্বকর্মা হলেন কর্মেরও দেবতা । এই দিকে থেকে শ্রমিক হাতী বিশ্বকর্মার বাহন হিসাবে একেবারে মানানসই ।

শিল্পের বিকাশ , বেকার দের কর্ম সংস্থান , শিল্পকে কেন্দ্র করে একটি দেশের বিকাশ যথার্থ বিশ্বকর্মা পূজা । বন্ধ কারখানা , অন্ধকার ময় শ্রমিক বস্তী , বন্ধ কাজ কর্ম- সেখানে বিশ্বকর্মার পূজা অনেক টা ‘ঘরে নাই ভাত- দুয়ারে বাজে ঢাক’ এমন অবস্থা। কর্ম রূপে যেনো আমরা বিশ্বকর্মার পূজা করতে পারি। শ্রম দিবস হিসাবে এই বিশ্বকর্মা পূজার দিন টা যেনো পালন করতে পারি- এই প্রার্থনাই সকলে বিশ্বকর্মার কাছে করবো।

জয় গুরু। জয় মা। জয় প্রভু বিশ্বকর্মা। সনাতন হিন্দু ধর্ম কি জয় ।

লিখেছেন- সুমন বসাক।

Advertisements

দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা


দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী মতে- ইনি হলেন দেবশিল্পী। বিষ্ণুপুরাণের মতে, প্রভাসের ঔরসে বৃহস্পতির ভগিনীর গর্ভে বিশ্বকর্মার জন্ম হয়। বেদে পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তাকে বিশ্বকর্মা বলা হয়েছে। বিশ্বকর্মা মূলত সৃষ্টিশক্তির রূপক নাম। সেই অর্থে ইনি পিতা, সর্বজ্ঞ দেবতাদের নামদাতা। ইনি সর্বমেধ-যজ্ঞে নিজেকে নিজের কাছে বলি দেন। ইনি বাচস্পতি, মনোজব, বদান্য, কল্যাণকর্মা, বিধাতা। ঋগবেদের মতে- ইনি সর্বদর্শী ভগবান।
এঁর চক্ষু, মুখমণ্ডল, বাহু ও পা সর্বদিকে বিদ্যমান। বাহু ও পায়ের সাহায্যে ইনি স্বর্গ ও মর্ত্য নির্মাণ করেন। ইনি শিল্পসমূহের প্রকাশক ও অলঙ্কারের স্রষ্টা, দেবতাদের বিমান-নির্মাতা। এঁর কৃপায় মানুষ শিল্পপকলায় পারদর্শিতা লাভ করে। ইনি উপবেদ, স্থাপত্য-বেদের প্রকাশক এবং চতুঃষষ্টি কলার অধিষ্ঠাতা। ইনি প্রাসাদ, ভবন ইত্যাদির শিল্পী।
ইনি দেবতাদের জন্য অস্ত্র তৈরি করেন। মহাভারতের মতে- ইনি শিল্পের শ্রেষ্ঠ কর্তা, সহস্র শিল্পের আবিস্কারক, সর্বপ্রকার কারুকার্য-নির্মাতা। স্বর্গ ও লঙ্কাপুরী ইনিই নির্মাণ করেছিলেন। রামের জন্য সেতুবন্ধ নির্মাণকালে ইনি নলবানরকে সৃষ্টি করেন। কোনো কোনো পুরাণ মতে, বিশ্বকর্মা বৈদিক ত্বষ্টা দেবতার কর্মশক্তিও আত্মসাৎ করেছিলেন। এই জন্য তিনি ত্বষ্টা নামেও অভিহিত হন।
বিশ্বকর্মার কন্যার নাম ছিল সংজ্ঞা। ইনি এঁর সাথে সুর্যের বিবাহ দেন। সংজ্ঞা সুর্যের প্রখর তাপ সহ্য করতে না পারায়, ইনি সুর্যকে শানচক্রে স্থাপন করে তাঁর উজ্জলতার অষ্টমাংশ কেটে ফেলেন। এই কর্তিত অংশ পৃথিবীর উপর পতিত হলে, উক্ত অংশের দ্বারা বিশ্বকর্মা বিষ্ণুর সুদর্শনচক্র, শিবের ত্রিশূল, কুবেরের অস্ত্র, কার্তিকেয়ের শক্তি ও অন্যান্য দেবতাদের অস্ত্রশস্ত্রাদি নির্মাণ করেন। বলা হয়ে থাকে, শ্রীক্ষেত্রের প্রসিদ্ধ জগন্নাথমূর্তি বিশ্বকর্মা প্রস্তুত করেন।
আধুনিক কালে বিশ্বকর্মা পূজা হিন্দুদের একটি ধর্মীয় উৎসব। দেবশিল্পী বিশ্বকর্মার আশিস কামনায় এ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বকর্মা চতুর্ভুজ ও গজারূঢ়। তাঁর আকৃতি অনেকটা কার্তিকের মতো।
বেদে বিশ্বকর্মাকে পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তারূপে বর্ণনা করা হয়েছে। ভক্তদের বিশ্বাস মতে তিনি বিশ্বের তাবৎ কর্মের সম্পাদক। তিনি শিল্পসমূহের প্রকাশক, অলঙ্কার শিল্পের স্রষ্টা, দেবতাদের গমনাগমনের জন্য বিমান নির্মাতা ইত্যাদি। অর্থাৎ শিল্পবিদ্যায় তাঁর একচ্ছত্র অধিকার। তাই যাঁরা শিল্পকর্মে পারদর্শিতা লাভ করতে চান, তাঁরা বিশ্বকর্মার অনুগ্রহ কামনা করেন। রামায়ণে বর্ণিত অপূর্ব শোভা ও সম্পদবিশিষ্ট লঙ্কা নগরীর নির্মাতা বিশ্বকর্মা বলে কথিত। তিনি উপবেদ, স্থাপত্যবেদ ও চতুঃষষ্টিকলারও প্রকাশক। দেবশিল্পীরূপে তিনি দেবপুরী, দেবাস্ত্র ইত্যাদিরও নির্মাতা। জনশ্রুতি আছে যে, পুরীর প্রসিদ্ধ জগন্নাথমূর্তিও বিশ্বকর্মা নির্মাণ করেন।
ভাদ্রমাসের সংক্রান্তিতে কলকারখানায় বেশ আড়ম্বরের সঙ্গে বিশ্বকর্মার পূজা অনুষ্ঠিত হয়। অন্যান্য দেব-দেবীর মতোই মূর্তি গড়ে অথবা ঘটে-পটে বিশ্বকর্মার পূজা করা হয়। সূতার-মিস্ত্রিদের মধ্যে এঁর পূজার প্রচলন সর্বাধিক। তবে বাংলায় স্বর্ণকার, কর্মকার এবং দারুশিল্প, স্থাপত্যশিল্প, মৃৎশিল্প প্রভৃতি শিল্পকর্মে নিযুক্ত ব্যক্তিগণও নিজ নিজ কর্মে দক্ষতা অর্জনের জন্য বিশ্বকর্মার পূজা করে থাকেন। এ সময় প্রত্যেকের ঘরে বিশেষ খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা হয় এবং কোথাও কোথাও পূজার পরে ঘুড়ি ওড়ানো হয়।

কার্তিকের বাহন ময়ূর কেন ?


Image result for কার্তিক

কার্তিক সৌন্দর্যের প্রতিমূর্তি। অপর দিকে সে সৌন্দর্যের আর ও উতকর্ষ সাধনে পক্ষীকুলের মধ্যে আরেক সুন্দর যুক্ত হয়েছে এক সঙ্গে। উভয়ের এ মিলন সৌন্দর্যকে অধিকতর বাড়িয়ে দিয়েছে।
কিন্তু সৌন্দর্যই একে অপরকে কাছে আনেনি।ময়ূর এবং মোগর সমবর্গীয় পাখি।পন্ডিত চানক্য ময়ূর আর মোগরের চারটি গুনের কথা উল্লেখ করেছেন।গুনগুলো হচ্ছে –
(১)যুদ্ধ
(২)প্রাতরুত্থান
(৩)স্বজাতি প্রীতি
(৪)স্ত্রী রক্ষা
অর্থাত্‍ ময়ূর আর মোগরের দিকে যদি আমরা দৃষ্টি দেই তাহলে উপরোক্ত চারটি গুণ সহজেই তাদের মাঝে অবলোকন করি।আর এ গুনগুলো যদি বিশ্লেষন করি তাহলে আমরা লক্ষ্য করি যে প্রতিটি গুন বিরাজিত থাকে একজন ক্ষত্রিয়ের মধ্যে।তাই ক্ষত্রিয়ের প্রতীক শ্রী শ্রী কার্তিকের বাহন হিসাবে যথার্থ বৈ কি ময়ূর।

ময়ূর সর্ম্পকে এখানে আরো বলা যায় ময়ূর তার পুচ্ছ দিয়ে শুধু সৌন্দর্যই প্রকাশ করে না – এটাকে ঢাল হিসাবেও ব্যবহার করে। সে হিংস্রতার প্রতীক সর্পের হন্তা। সাপের সাথে ময়ূরের যুদ্ধ কৌশল দর্শনীয়।

কার্তিকের বন্দনায় আমাদের মধ্যে জাগরুক হোক , ক্ষাত্রশক্তির সে অমোঘ ধারা যা আজকের হিন্দুর জন্য অতীব প্রয়োজন।

কার্তিকের প্রণাম মন্ত্র –
কার্তিকেয় মহাভাগ দৈত্যদর্পনিসূদন।
প্রণতোহহংমহাবাহো নমস্তে শিখিবাহন॥

বিদ্যা, অবিদ্যা, ত্রৈবিদ্যা


বিদ্যা, অবিদ্যা, ত্রৈবিদ্যা
বিশ্বজিত পাল


বিদ্যা শব্দের আবিধানিক অর্থ অধ্যয়নজনিত জ্ঞান। সাধারণ অর্থে জ্ঞান বলতে বুঝায় বোধ, বুদ্ধি, অনুভব শক্তি, বোঝার বা বিচার করার ক্ষমতা। জ্ঞান আছে এমন ব্যক্তিকে বলা হয় জ্ঞানী। যে ব্যক্তি প্রকৃতি প্রাপ্ত বই, পুস্তক, পুঁথি ও শাস্ত্র পাঠ করে জ্ঞান লাভ করেন তাকে বলে শাস্ত্রজ্ঞ। বেদ যিনি ভালোরূপে বোঝেন বা জানেন তাকে বলে প-িত বা বেদজ্ঞ। আর যিনি ব্রহ্ম, আত্মা, পরমাত্মা ইত্যাদি ঈশ্বরতত্ত্ব সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করেন তাকে বলা হয় পরমাত্মিক জ্ঞানী বা তত্ত্বজ্ঞ।

জ্ঞান সম্পর্কে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছেন মান শূন্যতা, দম্ভহীনতা, অহিংসা, সহিষ্ণুতা, সরলতা, সদগুরুর সেবা, শৌচ, আত্মসংযম, ইন্দ্রিয় বিষয়ে বিরক্তি, অহংকার, জন্ম-মৃত্যু-জরা-ব্যাধিকে দুঃখ হিসেবে দেখা, পুত্র-স্ত্রী-গৃহের প্রতি আসক্তি রহিত হয়ে নিত্যের (ঈশ্বরের) প্রতি মনোনিবেশ করা, বঞ্চিত ও অবাঞ্ছিত বস্তু প্রাপ্তিতে সমভাবাপন্ন, জনবহুল স্থান বর্জন, নির্মল স্থান প্রিয়তা ও অনন্য নিষ্ঠা ও অপ্রতিহতা ভক্তির মাধ্যমে আমার সেবা করার নামই জ্ঞান। আর এ নিত্য, আধ্যাত্ম ও তত্ত্বজ্ঞান যিনি অনুসন্ধান করেন তিনিই জ্ঞানী। বাকিরা অজ্ঞানী। এতে স্পষ্ট যে, যে বিদ্যা আধ্যাত্ম, পারমাত্মিক, বা ঐশ্বরিক জ্ঞান দান করে না তা বিদ্যা নয়, অবিদ্যা।

অবিদ্যা শব্দের আবিধানিক অর্থ অজ্ঞান বা মায়া। মায়া ঈশ্বরের ছায়া, তবে ঈশ্বর থেকে পৃথক নয়। যেমন- একজন মানুষের ছায়া তার থেকে পৃথক নয়। এটা ওই মানুষটির প্রতিবিম্ব যা তার সঙ্গে সঙ্গেই থাকে এবং দেখতে উল্টো দেখায়। তাই একটি ছায়া দেখে তার সংশ্লিষ্ট মানুষটিকে শনাক্ত করা সম্ভব নয়। ছায়া মরীচিকার ন্যায় মায়ারূপ এক প্রতিবিম্ব, আদর্শ রূপ নয়। ময়লা থাকলে যেমন আয়নাতে নিজের রূপ দেখা যায় না, ঠিক তেমনি মায়ায় আচ্ছন্ন ব্যক্তি ঈশ্বরের স্বরূপ দেখতে পায় না। এ মায়া বা অবিদ্যা পাঁচ প্রকার। যথা- তম, মোহ, মহামোহ, তামিস্র ও অন্ধতামিস্র।

তম:- সত্ত্ব, রজ, তম এ তিনটি প্রকৃতিগত গুণ থেকে তম সবচেয়ে নিকৃষ্টতম। তম গুণ সম্পন্ন ব্যক্তিরা প্রমাদ (ভ্রান্তি বা বিমূঢ়তা) আলস্য ও নিদ্রা দ্বারা আচ্ছন্ন থাকে। তাই তারা কখনই ঈশ্বরকে জানতে পারে না।

মোহ:- প্রাকৃতিক জিনিসের প্রতি প্রবল আসক্ত থাকার নাম মোহ।

মহামোহ:- প্রত্যাশিত জিনিসটি না পাওয়া পর্যন্ত আসক্তি, পুনঃপুনঃ বৃদ্ধির নাম মহামোহ।

তামিস্র:- আবিধানিক অর্থে যে ক্রোধ জন্মায় তাকে তামিস্র বলে। শাস্ত্র মতে এটি একটি নরক বিশেষ। নিশাচর বা দুঃখের স্থান।

অন্ধতামিস্র:- নিবিড় অন্ধকার। এটি একটি ঘোর নরক বিশেষ। অত্যন্ত দুঃখের স্থান।

এ পাঁচ প্রকার অবিদ্যা প্রকৃতিজাত। তাই অবিদ্যার আরেক নাম প্রকৃতি। এই প্রকৃতি ঈশ্বরের সৃষ্টি এবং অনাদি। সব বিকার এবং গুণ প্রকৃতি থেকে জন্ম। তাই এ প্রকৃতি বা অবিদ্যা এক মায়ারূপ বন্ধন যার অবস্থান ঈশ্বর ও মানুষের মাঝখানে। এটি একটি অস্বচ্ছ পর্দাও বটে যার কারণে মানুষ ঈশ্বরকে দেখতে না পেয়ে মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে ভুল পথে চলে। তারা ক্রমশ অন্ধকার থেকে অন্ধকার জগতে প্রবেশ করতে করতে শেষ পর্যন্ত নীচকুলে (পশু-পাখির যোনিতে) জন্ম গ্রহণ করে।

ত্রৈবিদ্যা বলতে ঋক, সাম, যজু নামক তিনটি বেদকে বুঝায়। যে ব্রাহ্মণ এই তিনটি বেদ অধ্যয়ন করেছেন তাকে বলা হয় ত্রিবেদি। যারা এ তিনটি বেদ থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানের প্রতি অত্যন্ত আসক্ত তারা মনুষ্য সমাজে সম্মান ও প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। দুর্ভাগ্যবশত: বেদের অনেক বড় বড় প-িতরা বৈদিক জ্ঞানের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারেন না। তাই তারা কেবল আনুষ্ঠানিকতাবশত বেদ অধ্যায়ন করেন এবং ইন্দ্র, চন্দ্র, আদি দেবতাদের উদ্দেশ্যে যজ্ঞ করার প্রতি অত্যন্ত আসক্ত হয়। তাই বেদান্ত সম্পর্কে শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছেন- ‘আমিই হলাম ত্রিবেদিদের একমাত্র লক্ষ্য।’ তাই যথার্থ ত্রিবেদি শ্রীকৃষ্ণের চরণারবিন্দের শরণাগত হন এবং তার প্রীতি উৎপাদনের জন্য বিশুদ্ধ ভক্তিযোগে নিয়োজিত থাকেন। এ ভক্তিযোগ শুরু হয় হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্র কীর্তন ও কৃষ্ণতত্ত্ব জানার প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে। যথার্থ ত্রিবেদিরা জানেন হরে কৃষ্ণ মহামন্ত্রই অর্থাৎ নামযজ্ঞই হচ্ছে সব যজ্ঞের শ্রেষ্ঠ যজ্ঞ এবং একমাত্র শ্রীকৃষ্ণই হচ্ছেন পুরুষোত্তম। তাই তাকে জানার মধ্যেই নিহিত রয়েছে মানব জীবনের পরম সার্থকতা।

ঈশ্বর নিরাকার। তিনি যখন নিরাকার, তখন তাকে বলা হয় ব্রহ্ম। ব্রহ্ম সব জীব জগতের উপর প্রভূত্ব করেন। তাই ব্রহ্মের আরেক নাম ঈশ্বর। ঈশ্বর শব্দটির মানে হচ্ছে প্রভূ। এ ব্রহ্ম বা ঈশ্বর যখন আমাদের কৃপা করেন, জগতের মঙ্গল করেন, তখন তাকে বলা হয় ভগবান।

ব্রহ্ম সব প্রাণের উৎস স্বরূপ। তার থেকেই জগতের সৃষ্টি। তার মধ্যেই জগতের অবস্থান। আবার তিনিই আত্মারূপে জীবের মধ্যে অবস্থান করেন। তাই ধর্মগ্রন্থ উপনিষদে বলা হয়েছে ‘সর্বং খল্বিদং ব্রহ্ম।’ অর্থাৎ সবকিছু ব্রহ্ম বা ঈশ্বর। সুতরাং ব্রহ্ম, ঈশ্বর, ভগবান দেব-দেবী এবং আত্মা আলাদা কিছু নয়। একই ঈশ্বরের ভিন্ন নাম ও পরিচয়। তাই শুধু দেব-দেবী কেন জীবকে সেবা করলেও ঈশ্বরের সেবা করা হয়।

নিরাকার হলেও সর্বশক্তিমান ঈশ্বর যে কোন আকার ধারণ করতে পারেন। তাই তিনি সাকারও। ঈশ্বরের ভিন্ন ভিন্ন গুণ বা শক্তি যখন ভিন্ন ভিন্ন আকার লাভ করে তখনই তাকে বলা হয় দেব-দেবী। এককথায় ঈশ্বরের সাকার রূপই হচ্ছে দেব-দেবী। ঈশ্বরের বিদ্যা, জ্ঞান ও ধী শক্তির সাকার রূপই হলো সরস্বতী। তাই সরস্বতী বিদ্যার দেবী। তিনি সবাইকে বিদ্যা দান করেন।

দেবী সরস্বতী যে বিদ্যা দান করেন তা ঈশ্বরেরই একটি গুণ। বেদ, পুরান প্রভৃতি ধর্মগ্রন্থে দেব-দেবীর পূজা করার পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে। তাই বৈদিক মতে দেব-দেবীর পূজা করলে তারা সন্তুষ্ট হন। দেব-দেবীরা সন্তুষ্ট হলে ঈশ্বর সন্তুষ্ট হন। সুতরাং দেব-দেবীর পূজার মাধ্যমে ঈশ্বরেরই পূজা করা হয়।

প্রতি বছর মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে পূজার মাধ্যমে আমরা সরস্বতী দেবীকে আহ্বান করি। স্তবস্তুতির মাধ্যমে তার প্রশংসা করি। তার কাছে কাম্য বস্তু অর্থাৎ বিদ্যা প্রার্থনা করি-

‘সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে

বিশ্বরূপে বিশালাক্ষী বিদ্যাং দেহি নমহস্তুতো’

হে মহাভাগ সরস্বতী, বিদ্যাদেবী কমলনয়না, বিশ্বরূপা, বিশালাক্ষী আমাকে বিদ্যা দাও। তোমাকে নমস্কার।

বিদ্যাহীন ও জ্ঞানহীন ব্যক্তিরা মায়ামুখী। তাই তারা ঈশ্বর বিদ্বেষী। তারা ঈশরকে ভুলে গিয়ে মহামোহে আচ্ছন্ন হয়ে ঘোর নরকে প্রবেশ করে। কোনকালেই তারা ঈশ্বরকে পায় না।

হে মা সরস্বতী আমাদের বিদ্যা দান কর। আমরা যেন অহৈতুকী সেবার মাধ্যমে ঈশ্বরের পরম ভক্ত হতে পারি। এ শুভলগ্নে তোমার কাছে এই একমাত্র মিনতি। কৃপা কর, দয়া কর মা এ অধম সন্তানদের। তোমর চরণে পুনঃপুনঃ অগণিত প্রণাম।

[লেখক : শিক্ষক।]