প্রশ্ন: পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা বড় মন্দির কোনটি? কোথায় অবস্থিত?


Image result for world biggest temple

উত্তর:
অ্যাংকর ভাট (অর্থাৎ “শহরের মন্দির”, “অ্যাংকর” হল সংস্কৃত “নগর” শব্দের স্থানীয় উচ্চারণ) কম্বোডিয়ার অ্যাংকরে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক মধ্যযুগীয় মন্দির। সুবিশাল এই স্থাপনাটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ মন্দির।

১২শ শতাব্দীতে এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন রাজা ২য় সূর্যবর্মণ। তিনি এটিকে তাঁর রাজধানী ও প্রধান উপাসনালয় হিসাবে তৈরি করেন। তখন থেকেই এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান হিসাবে বিবেচিত। প্রথমদিকে হিন্দু মন্দির হিসাবে ব্যবহৃত হলেও পরে এটি বৌদ্ধ মন্দিরে পরিণত হয়।

অ্যাংকর ভাট মন্দিরের নির্মাণকার্য শুরু হয় ১২শ শতাব্দীর প্রথমভাগে, রাজা ২য় সূর্যবর্মণের রাজত্বকালে (১১১৩-১১৫০)। মন্দিরটির আরাধ্যদেবতা ছিল বিষ্ণু।

রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের ফলশ্রুতিতে কম্বোডিয়ায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রচলন ঘটে। ফলে ১৪শ বা ১৫শ শতাব্দীতে অ্যাংকর ভাট বৌদ্ধ মন্দিরে পরিণত হয়। বর্তমানে অ্যাংকর ভাটের মন্দিরটি কম্বোডিয়ার জাতীয় প্রতীকে পরিণত হয়েছে। এটি দেশবাসীর গৌরব। ১৮৬৩ সালে প্রথম প্রবর্তনের পর থেকে কম্বোডিয়ার সব পতাকাতেই অ্যাংকর ভাটের প্রতিকৃতি স্থান পেয়েছে। সারা বিশ্বে এটিই একমাত্র ভবন যা কোন দেশের পতাকায় প্রদর্শিত হয়েছে।

মূল মন্দিরটি শহরের অন্যান্য স্থাপনা হতে উঁচুতে অবস্থিত। এতে রয়েছে তিনটি পর্যায়ক্রমে উচ্চতর চতুষ্কোণ গ্যালারি, যা শেষ হয়েছে একটি কেন্দ্রীয় টাওয়ারে। মন্দিরের ভিতরে গ্যালারিগুলো যথাক্রমে রাজা, ব্রহ্মা, এবং বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে নিবেদিত।

সূত্র: উইকিপিডিয়া

 

Advertisements

পুরীকে কেন জগন্নাথধাম বলে?


Image result for puri temple

শ্রীক্ষেত্র পুরীকে বলা হয় ‘জগন্নাথ ধাম’. মন্দিরটির নামও জগন্নাথ মন্দির. কিন্তু জগন্নাথের সঙ্গে একই বেদীতে রয়েছেন বলভদ্র ও সুভদ্রা. তাঁদের ভুমিকাটা কী? কেউ তো বলে না বলরামের মন্দির কি সুভদ্রার মন্দির. অথচ এই তিন দেব দেবীর অবস্হান ও গুরুত্ব সমান. তিন জনের পূজার আলাদা মন্ত্র. বিশেষ বেশবাস. বিশেষ ভোগের ব্যবস্হা. তিন জনের তিন খানি রথ, নিদির্ষ্ট নিয়ম মেনে তৈরী করা হয়. নবকলেবরের তিন দেবদেবী সেই সঙ্গে সুদর্শনের দারু চিহ্নিত করা সংগ্রহ ও প্রতিষ্ঠা আলাদাভাবেই হয়. রথযাত্রার সময় বলরাম আর সুভদ্রার রথ জগন্নাথের আগে আগে চলে. মন্দির থেকে বেরবার কিংম্বা ঢোকার সময় বলরাম ও সুভদ্রা আগে যান. তবু পুরীর রথ সবার মুখে জগন্নাথের রথ. সচরাচর কেউ বলে না আমি বলরাম দর্শনে এসেছি বা সুভদ্রা দর্শনে. সবাই বলে আমি জগন্নাথ দর্শনে এসেছি.

এর কারণ খুজলে দেখা যাবে আদিতে বলরাম- সুভদ্রার নাম পাওয়া যায় না. জগন্নাথ কাহিনীর সুরুতে শবররাজ পূজিত যে নীলমাধবের উল্লেখ আছে সেখানে তিনি একা. আবার ঐতিহাসিক দিকটি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় দ্বাদশ শতাব্দীর পূর্ব পর্যন্ত পুরীর দেবতা হিসেবে রয়েছে পুরুষোত্তমের নাম. ১০২০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১০৪০ খ্রিষ্টাব্দ এই সময় কালে রচিত রাজমর্তন্ডে পুরুষোত্তম নামটির উল্লেখ আছে. এই সময় পুরীকেও পুরুষিত্তমক্ষেত্র বলা হত. এই সময় কালে জগন্নাথদেবের নামের উল্লেখ পাওয়া যায় না. ১০৭৮ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১১৪৭ খ্রিষ্টাব্দ রাজা চোড়গঙ্গ দেবের রাজত্বকালে পুরীর নাম পুরুষোত্তম ক্ষেত্রই ছিল. শ্রী মন্দিরে একা দারুদেবতাই বিরাজ করতেন. শিব পুরাণে বলা হয়েছে…

“পুরুষোত্তমাৎ পরম ক্ষেত্রং নাস্ত্যন্যৎ ভবমোচনম্..
তত্র সাক্ষাৎ পরম ব্রম্ভ দারু ব্রম্ভ শরীর ভৃৎ..”

—‘অর্থাৎ মুক্ত লাভ করার জন্য পুরুষোত্তম ক্ষেত্রছাড়া অন্য ক্ষেত্র সংসারে নেই. এই ক্ষেত্রে সাক্ষাৎ পরম ব্রম্ভ দারুব্রম্ভরুপে শরীর ধারণ করে রয়েছেন’…ক্রমশ.

শক্তিপীঠ বিমলা


 

কালিকাপুরাণ মতে, চার মহাপীঠ তন্ত্রসাধনার কেন্দ্র। এগুলির মধ্যে পশ্চিমদিকের পীঠটি হল ওড্ডীয়ন বা উড্ডীয়ন অঞ্চলের কাত্যায়নী। এই পীঠের ভৈরব জগন্নাথ। বুঝে নিতে অসুবিধে হয় না, এই ওড্ডীয়ন বা উড্ডীয়ন হল আজকের ওড়িশা। আর এই কাত্যায়নী হলেন শ্রীক্ষেত্র জগন্নাথ ধামের রক্ষয়িত্রী দেবী বিমলা। পীঠশক্তি রূপে কাত্যায়নীর নাম পাওয়া যায় হেবজ্র তন্ত্র গ্রন্থেও। সেখানে তাঁকে বলা হয়েছে উড্র পীঠের ভৈরবী। আর সেখানেও ভৈরব হলেন জগন্নাথ।

দক্ষকন্যা সতীর উপাখ্যান ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে হিন্দুদের একাধিক পুরাণে ও লোককথায়। ব্রহ্মার মানসপুত্র দক্ষ প্রজাপতির ছিল আট মেয়ে। তাঁদের মধ্যে সবার বড়ো ছিলেন সতী। দক্ষ সতীকে শিবের হাতে সমর্পণ করেছিলেন। শিব শ্বশুরকে যথোচিত সম্মান করতেন না। বরং শ্বশুরের সামনেই তাঁর অশেষ গুণাবলির নিদর্শন স্থাপন করতেন। এজন্য দক্ষও তাঁর এই জামাইটির প্রতি বিশেষ সন্তুষ্ট ছিলেন না। সঙ্গে সঙ্গে সতীও হয়ে উঠেছিলেন বাবার বিশেষ অনাদরের পাত্রী। দক্ষ তাঁর অন্য মেয়ে-জামাইদের বাড়িতে ডাকতেন। কিন্তু শিব-সতীকে কখনই ডাকতেন না। সতীর বিয়ের কিছুদিন পরে দক্ষ এক মহাযজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন। যথারীতি সেই যজ্ঞে তিনি অন্যান্য মেয়ে-জামাইদের আমন্ত্রণ জানালেন; শুধু ডাকলেন না শিব-সতীকে। সতী লোকমুখে জানলেন বাবার যজ্ঞ আয়োজনের খবর। তিনিও যজ্ঞস্থলে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। শিব বারণ করলেন। সতী শুনলেন না। অনাহত হয়ে সটান যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হয়ে দক্ষকে প্রশ্ন করে বসলেন, ‘বাবা, দেবাদিদেব মহাদেব কেন এই যজ্ঞে আমন্ত্রিত হননি?’ দক্ষ উত্তরে বললেন, ‘শিব সংহারের দেবতা। তাই তিনি অমঙ্গল বয়ে আনতে পারেন। তাছাড়া তাঁর বেষভূষাও ভদ্রজনোচিত নয়। তিনি শ্মশানচারী। ভূতপ্রেত তাঁর নিত্যসঙ্গী। সেই সব নগ্ন অনুচরবৃন্দের সম্মুখে তিনি নানান কুৎসিত অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করে থাকেন। তাঁকে নিমন্ত্রণ করলে সমবেত সুধী দেবমণ্ডলীর সামনে আমাকেও অপ্রস্তুত হতে হবে। সেই কারণেই শিবকে এই যজ্ঞে নিমন্ত্রণ করা হয়নি।’ মঙ্গলময় জগদ্‌গুরু শিব। তায় তিনি তাঁর প্রাণের ঠাকুর। বাপের মুখে পতিনিন্দা সতীর প্রাণে শেলের মতো বিঁধল। যজ্ঞাগ্নিতে সতী-দেহ আহুতি দিলেন শিবানী। সতীর দেহত্যাগের সংবাদ পৌঁছালো দেবাদিদেবের কানে। ক্রোধে উন্মত্ত দেবাদিদেব বীরভদ্র, ভদ্রকালী প্রমুখ অনুচরবৃন্দকে দিয়ে দক্ষযজ্ঞ পণ্ড করালেন। কন্যার দেহত্যাগের কারণ দক্ষের মুণ্ডচ্ছেদ করলেন। তারপর সতীর অর্ধদগ্ধ দেহ কাঁধে তুলে উন্মত্তের মতো ছুটে বেড়াতে লাগলেন এলোক থেকে সেলোক। ত্রিভুবন ধ্বংস হওয়ার জোগাড় হল তাঁর ক্রোধের তেজে। তাই আসরে নামতে হল বিষ্ণুকে। সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ খণ্ড খণ্ড করে ছড়িয়ে দিলেন পৃথিবীর নানা প্রান্তে। সতীদেহের অন্তর্ধানে শান্ত হলেন শিব। বসলেন মহাধ্যানে।

এদিকে সতীর দেহের খণ্ডগুলি ভারতবর্ষের নানা প্রান্তে জন্ম দিল এক এক মহাপীঠের। শক্তিপীঠগুলির সংখ্যা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। পীঠনির্ণয়তন্ত্রচূড়ামণি মতে পীঠের সংখ্যা ৫১। শিবচরিত মতে ৫১ পীঠ ও ৫১ উপপীঠ। আবার সর্বশ্রেষ্ঠ শাক্ত পুরাণ দেবীভাগবত মতে ১০৮ পীঠ। বিমলা শক্তিপীঠের উল্লেখ বেশ কয়েকটি প্রধান গ্রন্থে পাওয়া যায়। আবার এই পীঠকে একাধিক নামেও চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা যায়।

তন্ত্রচূড়ামণি গ্রন্থের ‘পীঠনির্ণয়’ বা ‘মহাপীঠনির্ণয়’ অংশে উৎকলের বিরজা ক্ষেত্রকে শক্তিপীঠ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পীঠের শক্তি বিমলা ও ভৈরব জগন্নাথ। সতীর নাভি এখানে পড়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে এই গ্রন্থে। তন্ত্রচূড়ামণি গ্রন্থেই অন্য একটি অধ্যায়ে অবশ্য বিমলাকে উপপীঠ বলে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এখানে সতীর উচ্ছিষ্ট পড়েছিল। তন্ত্রচূড়ামণি মন্দিরের অবস্থান উল্লেখ করতে গিয়ে ‘নীলাচল’ কথাটির উল্লেখ করেছে। নীলাচল বা নীলপর্বতের উল্লেখ শিবচরিত গ্রন্থেও পাওয়া যায়। এই গ্রন্থেও বিমলা উপপীঠ। এখানকার শক্তি বিমলা ও ভৈরব জগন্নাথ। উল্লেখ্য, নীলাচল নামটি জগন্নাথ ক্ষেত্রের সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে যুক্ত। সতীর উচ্ছিষ্ট পড়ার ঘটনার সঙ্গে জগন্নাথের উচ্ছিষ্ট ভোগে বিমলার পূজার কোনো যোগ থাকাও অসম্ভব নয়। তবে সেসব গবেষকদের আলোচনার বিষয়।

ফিরে আসি অন্যান্য তন্ত্র ও পুরাণ গ্রন্থগুলির আলোচনায়। কুব্জিকাতন্ত্র বলে, বিমলা ৪২টি সিদ্ধপীঠের একটি। এখানে সাধনা করলে সিদ্ধাই নামে এক ধরনের অলৌকিক ক্ষমতা লাভ করা সম্ভব। দেবীভাগবত পুরাণ, প্রাণতোষিণী তন্ত্রবৃহৎ নীলতন্ত্র মতে, বিমলা ১০৮ শক্তিপীঠের অন্যতম। দেবীপুরাণ মতে, এখানে পড়েছিল সতীর পা। মৎস্যপুরাণ মতে, পুরুষোত্তম ক্ষেত্রের বিমলা একটি শক্তিপীঠ। বামনপুরাণ মতেও এটি একটি মহাতীর্থ। মহাপীঠ নিরুপণ গ্রন্থে বিমলা ও জগন্নাথকে এই তীর্থের পীঠদেবতা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মহাশক্তির ১০৮ পৌরাণিক নামের তালিকা নামাষ্টত্তরশত গ্রন্থেও পুরুষোত্তম ক্ষেত্রের বিমলার উল্লেখ পাওয়া যায়।

এখানে একটি প্রশ্ন ওঠা খুব স্বাভাবিক। ‘ভৈরব’ শব্দটি ও শাক্ত-তান্ত্রিক শক্তিপীঠের ভৈরব ধারণাটির সঙ্গে সাধারণত যে দেবতার সম্পর্ক তিনি দেবাদিদেব মহাদেব। নারায়ণ বা কৃষ্ণ নন। রামানুজী বিশিষ্টাদ্বৈত বা চৈতন্য-অনুসারী গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনে পুরীর জগন্নাথ নারায়ণ বা কৃষ্ণের স্বরূপ। বিভিন্ন শাস্ত্রেও দেবী বিমলাকে কাত্যায়নী, দুর্গা, ভৈরবী, ভুবনেশ্বরী বা একানংশা দেবী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নারায়ণ-পত্নী লক্ষ্মী বা কৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তি শ্রীরাধার সঙ্গে বিমলার কোনো সাদৃশ্য আদৌ দেখা যায় না। তবে কেন জগন্নাথকে ভৈরব বলা হল? কেনই বা তিনি দুর্গা-স্বরূপা বিমলার ভৈরব হলেন?

এর দুটি ব্যাখ্যা দেওয়া যায়। একটি অদ্বৈত একেশ্বরবাদী ব্যাখ্যা। এই ব্যাখ্যা অনুসারে, শিব ও বিষ্ণু অভিন্ন। তাই শিবশক্তি দুর্গা ও বিষ্ণুশক্তি লক্ষ্মীও অভিন্না। সেই অর্থেই জগন্নাথ বিমলার ভৈরব। তবে এই ব্যাখ্যা ততটা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, বিমলার সঙ্গে  শৈব-তান্ত্রিক সম্প্রদায়ের যোগ যতখানি, অদ্বৈত সম্প্রদায়ের যোগ ততখানি নয়। তন্ত্র মতে, জগন্নাথ নারায়ণ বা কৃষ্ণের নয়, শিবের রূপ। সেই জন্যই তিনি শিব-ভৈরব। মনে হয়, এই কারণেই তন্ত্রগ্রন্থগুলিতে জগন্নাথকে ভৈরব আখ্যা দেওয়া হয়েছে। আর তাই শাক্ত বিশ্বাসে দেবী বিমলা হয়ে উঠেছেন পুরুষোত্তম শক্তিপীঠের প্রধান দেবী তথা জগন্নাথ মন্দিরের রক্ষয়িত্রী।

এ তো গেল শাস্ত্রের কথা। কিন্তু ইতিহাস কী বলে?

ইতিহাস বলে, বিমলা মন্দিরের ইতিহাস সম্ভবত বৈষ্ণব জগন্নাথ-কাল্টের চেয়েও প্রাচীন। জগন্নাথ মন্দিরের বর্তমান কাঠামোটি খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীর পরে নির্মিত। অথচ বর্তমান বিমলা মন্দিরটি খ্রিস্টীয় নবম শতাব্দীতে পূর্ব গঙ্গ রাজবংশের রাজত্বকালে নির্মিত। তাও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের ফলে জানা গিয়েছে খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে নির্মিত আদি বিমলা মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের উপরই গড়ে উঠেছে নবম শতাব্দীর এই মন্দিরটি। জগন্নাথ মন্দিরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে রোহিণীকুণ্ডের পাশে অবস্থিত বিমলা মন্দিরের সঙ্গে মন্দির চত্বরের মুক্তিমণ্ডপের কাছে অবস্থিত নৃসিংহ মন্দিরের স্থাপত্যগত মিলটি বেশ লক্ষণীয়। মাদলা পাঁজি বলছে, দক্ষিণ কোশলের সোমবংশী রাজবংশের রাজা যযাতি কেশরী এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা।  উল্লেখ্য, এই বংশের রাজা প্রথম যযাতি (খ্রিস্টীয় ৯২২–৯৫৫) ও দ্বিতীয় যযাতি (খ্রিস্টীয় ১০২৫–১০৪০) উভয়েই “যযাতি কেশরী” নামে পরিচিত ছিলেন। মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী–বিশেষত পার্শ্বদেবতাদের মূর্তি ও মূল মূর্তিটির পিছনের পাথরের খণ্ডটি সোমবংশী শৈলীর নিদর্শন বহন করে। হয়তো এগুলি আদি মন্দিরেরই অংশ ছিল। তাই বলাই যায়, চত্বরের প্রধান মন্দির জগন্নাথ মন্দিরের তুলনায় দেবী বিমলার মন্দির প্রাচীনতর।

খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে আদি শঙ্করাচার্য পুরীতে গোবর্ধন মঠ স্থাপন করেছিলেন বিমলাকে প্রধান দেবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। প্রথা অনুসারে, আজও গোবর্ধন মঠের অধ্যক্ষ পুরীর শঙ্করাচার্য বিমলা মন্দিরের প্রসাদ হিসেবে এক থালা মহাপ্রসাদ ও এক থালা খিচুড়ি ভোগ রোজ পেয়ে থাকেন। দ্য জগন্নাথ টেম্পল অ্যাট পুরী গ্রন্থের লেখক স্টারজার মতে, প্রাচীনকালে জগন্নাথ মন্দির ছিল ত্রিমূর্তি অর্থাৎ ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিবপূজার কেন্দ্র। এই তিন দেবতার শক্তি তথা হিন্দুধর্মের প্রধান তিন দেবী সরস্বতী, লক্ষ্মী ও পার্বতীও তাই পূজিত হতেন জগন্নাথ মন্দিরে। তার মধ্যে দেবী পার্বতীর পূজা হত বিমলা রূপে। খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত পুরীতে শ্রীবিদ্যা উপাসনার প্রাবল্য লক্ষিত হয়েছে। পরবর্তীকালে বৈষ্ণবধর্ম জগন্নাথ মন্দির চত্বরে প্রাধান্য বিস্তার করে। কমে যায় শ্রীবিদ্যা ও শৈব-তান্ত্রিক সম্প্রদায়ের প্রভাব। তবে এই প্রভাব একেবারেই অবলুপ্ত হয়নি। তান্ত্রিক পঞ্চমকার উপচারের বদলে বিমলা মন্দিরে নিরামিশ ভোগ ও দেবদাসী নৃত্যের প্রথা চালু হয়েছিল। তবে মাছভোগ দেবার প্রথাটি বজায় ছিল। রাজা নরসিংহদেব (শাসনকাল ১৬৩২–৪৭ খ্রিস্টাব্দ) মন্দিরে মাছ ও মাংস ভোগের প্রথা বন্ধ করে দেন। পরবর্তীকালে অবশ্য সেই প্রথা আবার চালু হয়। বর্তমানে বিমলা মন্দিরের জন্য সাধারণত আলাদা ভোগ রান্না করা হয় না। জগন্নাথের নিরামিশ ভোগই দেবী বিমলাকে নিবেদন করা হয়। শুধু দুর্গাপূজার সময় দেবীকে আমিষ ভোগ দেবার প্রথা রয়েছে। এই সময় খুব ভোরে গোপনে মন্দিরে পাঁঠাবলিও হয়। স্থানীয় মার্কণ্ড মন্দিরের জলাশয় থেকে মাছ ধরে এনে রান্না করে বিমলাকে নিবেদন করা হয়। পূজা হয় তন্ত্র মতে। এই সব অনুষ্ঠান ভোরে জগন্নাথ মন্দিরের দরজা খোলার আগেই সেরে ফেলা হয়। বৈষ্ণব ও স্ত্রী ভক্তদের এই সময় বিমলা মন্দিরে ঢুকতে দেওয়া হয় না। অনুষ্ঠানের অল্প কয়েকজন দর্শকই শুধু “বিমলা পারুষ” বা বিমলার আমিষ ভোগ পান। দেবী বিমলার ভক্তদের বিশ্বাস, দুর্গাপূজায় দেবী উগ্রমূর্তি ধারণ করেন। সেই সময় তাঁকে শান্ত করতে আমিষ ভোগ দিতেই হয়। যদিও এই মন্দিরে পশুবলি ও আমিষ ভোগ নিবেদন নিয়ে বৈষ্ণবদের আপত্তিও সুবিদিত।

বেলেপাথর ও ল্যাটেরাইটে নির্মিত বিমলা মন্দিরের স্থাপত্যশৈলীটি কলিঙ্গ স্থাপত্যশৈলীর দেউল রীতির নিদর্শন। মন্দিরের চারটি অংশ: বিমান (গর্ভগৃহ যে অংশে অবস্থিত), জগমোহন (সভাঘর), নাটমণ্ডপ (উৎসবাদির স্থান) ও ভোগমণ্ডপ (ভোগ ও বিনোদনের স্থান)। এর মধ্যে বিমান অংশটি রেখ দেউল। এর আকার শম্বুকাকৃতির চিনির ডেলার মতো। বিমলা মন্দিরের বিমানটির উচ্চতা ৬০ ফুট। গায়ে নানারকম ছবি খোদাই করা। কেন্দ্রীয় গর্ভগৃহে রাখা আছে দেবী বিমলার মূর্তিটি। দেবী এখানে চতুর্ভূজা। তাঁর তিন হাতে জপমালা, বরমুদ্রা ও অমৃতকুম্ভ। চতুর্থ হাতের বস্তুটি ঠিক কী, তা নিয়ে মতান্তর দেখা যায়। তবে দেবী দুর্গার যে মূর্তি আমরা সচরাচর দেখতে অভ্যস্থ, দেবী বিমলার মূর্তি আদৌ সে রকম নয়। শুধু দেবী পার্বতীর দুই সখি জয়া ও বিজয়াকে দেবী বিমলার দুই পাশে দেখা যায়। মূর্তির উচ্চতা ৪ ফুটের কিছু বেশি।

বিমানের বাইরে জগমোহন, নাটমণ্ডপ ও ভোগমণ্ডপও নানারকম খোদাইচিত্রে শোভিত। বিমানে তিনটি কুলুঙ্গি আছে। তার একটিতে অষ্টভূজা মহিষমর্দিনী ও আর একটিতে ষড়ভূজা চামুণ্ডার মূর্তি দেখা যায়। তৃতীয় কুলুঙ্গিটি খালি। সম্ভবত সেখানকার দেবীমূর্তিটি চুরি গিয়েছে। জগমোহনের বৈশিষ্ট্য এর পিরামিড-আকৃতির ছাদ। নাটমণ্ডপে দশমহাবিদ্যা সহ মোট ষোলোজন হিন্দু দেবীর মূর্তি অঙ্কিত আছে। ভোগমণ্ডপের কুলুঙ্গিতে আছে অষ্টভূজ গণেষ ও ষড়ানন কার্তিকের মূর্তি। এছাড়া ভোগমণ্ডপের প্রবেশপথের মাথায় দাঁড়িয়ে আছে দেবী বিমলার বাহন গজসিংহ – পরাজিত হাতির উপর দাঁড়ানো বিজয়দর্পে গর্বিত এক সিংহ।

২০০৫ সালে বিমলা মন্দির সংস্কার করা হয়েছে। বর্তমানে এটির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার ভুবনেশ্বর সার্কেল।

বিমলা মন্দিরের প্রধান উৎসব দুর্গাপূজা। প্রতি বছর আশ্বিন মাসে ষোলোদিন ধরে মন্দিরে উদযাপিত হয় দুর্গাপূজা। পুরীর রাজা বিজয়াদশমীর দিন বিমলাকে মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গার রূপে পূজা করেন। এই মন্দিরের দুর্গাপূজার সবচেয়ে পুরনো উল্লেখটি পাওয়া যায়এখন নতুন দিল্লিতে রাখা কোণার্ক শিলালিপিতে (খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দী)। এই শিলালিপির তথ্য অনুসারে, রাজা প্রথম নরসিংহদেব (রাজত্বকাল: ১২৩৮–১২৬৪) বিজয়াদশমীর দিন দুর্গা-মাধব (বিমলা-জগন্নাথ) পূজা করেছিলেন। হিন্দুধর্মের সনাতন বিশ্বাস, মেয়েরা কোমলস্বভাব। তাই বিমলার উগ্রমূর্তি মহিষাসুরমর্দিনীর পূজা আজও দেখতে দেওয়া হয় না মেয়েদের।

বিমলা মন্দিরের একটি বৈশিষ্ট্য হল, জগন্নাথের প্রসাদী নারকেল বাটা, পনির ও মাখন দিয়ে শুকনো ভাত দিয়ে দেবী বিমলার নিত্যভোগের ব্যবস্থা। দুর্গাপূজার আমিষ ভোগ রান্নার ব্যবস্থা ছাড়া বিমলা মন্দিরের জন্য পৃথক ভোগ রান্নার ব্যবস্থা নেই। উচ্ছিষ্ট ভোগে হিন্দুধর্মে দেবদেবীর পূজা নিষিদ্ধ। তবে বিমলা মন্দিরে কেন এই ব্যবস্থা? ওড়িশায় একটি লোকশ্রুতি আছে এই নিয়ে। বৈকুণ্ঠে নারায়ণ-দর্শনে গিয়েছেন দেবাদিদেব মহাদেব। নারায়ণ তখন খেতে বসেছেন। মহাদেব দেখলেন, নারায়ণের থালা থেকে তাঁর ভোজ্যের কয়েক টুকরো উচ্ছিষ্ট পড়েছে মাটিতে। প্রসাদজ্ঞানে সেই উচ্ছিষ্ট তুলে মুখে দিলেন মহাদেব। সেসময় তাঁর অনবধানে কিছুটা লেগে রইল তাঁর দাড়িতে। কৈলাশে ফেরার পর মহাদেব দেখলেন, তাঁর পথ চেয়ে অপেক্ষা করে আছেন দেবর্ষি নারদ। নারদ দেখলেন মহাদেবের দাড়িতে লেগে আছে ভোজনাবশেষ। তিনি জানতেন, মহাদেব গিয়েছিলেন বৈকুণ্ঠে নারায়ণ-সন্দর্শনে। দুইয়ে দুইয়ে চার করলেন নারদ। তাঁর বুঝতে দেরি হল না, মহাদেব যাঁর শ্রেষ্ঠ ভক্ত, সেই নারায়ণেরই উচ্ছিষ্ট লেগে রয়েছে মহাদেবের দাড়িতে। তিনি চকিতে সেই উচ্ছিষ্ট তুলে নিয়ে মুখে দিলেন। ঘটনাটি নজর এড়ালো না শিবপত্নী পার্বতীর। ক্ষুণ্ণ হলেন তিনি। সোজা চলে এলেন বৈকুণ্ঠে। নালিশ জানালেন, নারায়ণ-প্রসাদে তাঁর ন্যায্য পাওনা থেকে দেবর্ষি তাঁকে বঞ্চিত করেছেন। তখন পার্বতীকে শান্ত করে নারায়ণ বললেন, “দেবী, দুঃখ কোরো না। কলিযুগে বিমলা রূপে নিত্য আমার প্রসাদ পাবে তুমি।” ভক্তেরা বলেন, সেই থেকে পুরীর মন্দিরে জগন্নাথের প্রসাদী অন্নে বিমলার পূজার নিয়ম।  উল্লেখ্য, জগন্নাথের প্রসাদ বিমলাকে উৎসর্গ করার পরই তা পায় মহাপ্রসাদের মর্যাদা।

শাক্ত সম্প্রদায়ের কাছে বিমলা মন্দির একটি মহাতীর্থ। ওড়িশাবাসী শাক্তদের কাছে বিমলা প্রধান শাক্ততীর্থ। তান্ত্রিকদের কাছে তো এই মন্দিরের গুরুত্ব মূল জগন্নাথ মন্দিরের চেয়েও বেশি।  জগন্নাথ মন্দিরের প্রথা অনুসারে, মূল মন্দিরে জগন্নাথকে পূজা করার বিমলাকে পূজা করা হয়।  প্রতিদিন এই মন্দিরের গর্ভমন্দির মুখরিত হয় শ্রীশ্রীচণ্ডী, আদি শঙ্করাচার্যের ‘দেব্যাপরাধক্ষমাপণ স্ত্রোত্র’ ও পুরুষোত্তম রক্ষিতের ‘বিমলাষ্টক স্তোত্রে’র সুরে। সন্তান আকুতি জানান, “মা, তোমার চরণসেবা করিনি কোনোদিন। কোনোদিন কিছুই ভালবেসে তুলে দিই নি তোমার হাতে। তবু আমাকে তোমার স্নেহের ছায়া থেকে কোনোদিন বঞ্চিত করোনি তুমি। আমি জানি, কুপুত্র জন্মায়, কিন্তু কুমাতা কখনও হয় না। আমার মতো পাপী আর কেউ নেই। তোমার মতো পাপঘ্নীও কেউ নেই। তাই হে জগজ্জননী, এরূপ জেনে যা উচিত তাই করো!”

 

(এই নিবন্ধটি লেখকেরই রচিত উইকিপিডিয়া নিবন্ধ অবলম্বনে অনুলিখিত। এটির সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত। লেখকের অনুমতি ছাড়া অন্যত্র প্রকাশ আইনত নিষিদ্ধ। হিন্দু সংস্কৃতির প্রসার কল্পে অন্যত্র অবাণিজ্যিক প্রকাশের অনুমতি দেওয়া হয়। লেখকের সঙ্গে যোগাযোগের ঠিকানা (ফেসবুক): https://www.facebook.com/profile.php?id=100004574179249)

অর্ণব দত্ত

পিরামিডের অজানা রহস্য !


 

সংকীর্তন মাধব's photo.

প্রাচীন সপ্ত আশ্চর্যের একটি মিশরের পিরামিড । সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে রহস্যময় ও আশ্চর্যময় স্থাপত্যের নাম পিরামিড । রূপকথার পুস্পিতবাক্যে নানা রঙ্গে সাজিয়ে ও মিশিয়ে কবি, লেখকরা তাকে নিয়ে রচনা করেছেন বহু কাব্য, ইতিহাস । অন্যদিকে প্রচুর শক্তি সম্পন্ন চশমা, লেন্স চোখে এটে তাবৎ বিশ্বের বিজ্ঞানীরা খুঁজে দেখতে চেষ্টা করছেন পিরামিডের অর্ন্তদিক । আর নিরপেক্ষ দর্শকগন মন্ত্রমুগ্ধের মত যুগযুগ ধরে পিরামিডের সৌন্দর্য উপভোগ করে চলছেন । কিন্তু পিরামিড কিংবা ইজিপ্টের রহস্য জালের শেষ কোথায় ?

বহু প্রাচীন এবং আধুনিক বিজ্ঞানী এবং ঐতিহাসিকদের মতে প্রাচীন বৈদিক সভ্যতা এবং মিশরের সভ্যতার মধ্যে শতভাগ মিল পাওয়া যায় । পিটার ভন বোহরেন, আল মুনসুরী, স্যার উইলিয়াম জোনস, পল উইলিয়াম রবার্ট, এডলফ ইরামসহ বহু ঐতিহাসিক এই কথা এক বাক্যে স্বীকার করেছেন । প্রথমত মিশর বা ‘ইজিপ্ট’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘অজপ’ বা ‘অজপতি’ থেকে । ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের পিতামহ । আবার শ্রীরামের নামে যে ইজিপ্টের নামকরণ করা হয়েছে তার সত্যতা মিলেছে স্বয়ং ইজিপ্টের শাস্ত্রগ্রন্থে । মিশরবাসীরা দেবতা বা ভগবানকে ‘ফারাও’ নামে সম্বোধন করে । আশ্চর্যজনকভাবে মিশরের এক ফারাও এর নাম ‘রামইসি’ । ড. এস কে ভি তার গ্রন্থে “হিন্দু মাইথোলজী এন্ড প্রিহিস্টোরী” তে মিশরের প্রাচীন ইতিহাস পর্যালোচনা করেছেন । তিনি লিখেছেন একসময় মিশরে দদাতি মহারাজ এবং তার দুই স্ত্রী দেবযানী ও শর্মিষ্ঠা বাস করতেন । একসময় এক বিশেষ কারণে দদাতি মহারাজ যুবক অবস্থায় বৃদ্ধ দশা প্রাপ্ত হয়েছিলেন । তখন তিনি তার পুত্রদের অনুরোধ করেন তাকে তাদের যুবক দেহ প্রদান করে বৃদ্ধ দেহ বিনিময় করার জন্য । অন্যান্য পুত্ররা পিতাকে সম্মতি জ্ঞাপন না করলেও কনিষ্ঠ পুত্র পুরু সম্মতি জ্ঞাপন করে এবং সিংহাসন আরোহন করে । পরবর্তীতে এই পুরুর বংশধররা একসময় ‘পরুবাস’ এবং পরবর্তীতে ‘ফারাওস’ নামে মিশরে পরিচিতি লাভ করে ।

“Proof of Vedic Cultures Global Existence” নামক গ্রন্থে স্টিফেন নেপ লিখেছেন যে, পাশ্চত্যবাসীরা পূর্বে রামকে ‘রাহাম’ নামে উচ্চারণ করত । কালের প্রভাবে পরবর্তীতে রা উচ্চারন বিস্মৃত হয় এবং আফ্রিকার স্কুল পাঠ্যবইয়ে লিখিত আছে যে, আফ্রিকানদের ‘কুশইটেস’ বলা হয় (কুশইটেস এসেছে রামপুত্র কুশ থেকে) এবং তাদের পিতার নাম ‘হাম’ । অন্যদিকে রামচন্দ্রের অন্য পুত্র ‘লব’ সংস্কৃত ভাষায় লব্য নামে পরিচিতি যার থেকে ‘লিবিয়া’ নামক দেশের নাম সমাদৃত হয়েছে । অপরদিকে ব্রিটিশ আর্মি অফিসার জন এইচ স্পিকি ১৮৪৪ সালে মিশরের বিখ্যাত নাইল বা নীল নদের উৎস আবিষ্কার করেন । সংস্কৃত শব্দ নীল (Blue) থেকে মূলত নীল নদ এসেছে । এছাড়া মিশরের বহু স্থান এবং বস্তুর নামের উৎস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এগুলোর উৎস মূলত বৈদিকশাস্ত্র বা সংস্কৃত ভাষা ।
এছাড়া সনাতন বৈদিক ধর্ম থেকেই যে প্রাচীন ইজিপশিয়াম ধর্মের উদ্ভব তার বহু নিদর্শন সেখানে রয়েছে । স্কন্দ পুরাণ মতে, মিশর বা আফ্রিকা শঙ্খ দ্বীপ হিসেবে পরিচিত । এছাড়া সৃষ্টিলীলা পর্যবেক্ষণ করলেও উভয় ক্ষেত্রে মিল পাওয়া যায় । প্রাচীন ইজিপ্ট ধর্ম মতে হ্রি হিরি হচ্ছেন সমস্ত দেবতা এবং বিগ্রহের উৎস যেখানে বৈদিক মতে, শ্রীহরি বা শ্রীকৃষ্ণ হচ্ছেন সমস্ত দেবতাদেরও ঈশ্বর বা পরমেশ্বর । এটি সত্যিই আশ্চর্যকর মিল । এছাড়া মিশরীয় শাস্ত্রে আরো উল্লেখ আছে যে, সৃষ্টির পূর্বে নাহরাইন (NHRYN) (বৈদিক শাস্ত্র মতে নারায়ণ) জলের উপর শায়িত ছিলেন । এছাড়া প্রাচীন ইজিপ্টের জনগন ছিলেন কঠোর নিরামিশাষী । তাদের ঔষধবিদ্য, মহাকাশবিদ্যা ও ভাস্তু বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন ।

ঐতিহাসিক মতে, বৈদিক যুগে সমগ্র পৃথিবী বৈদিক শাস্ত্র মতে পরিচালিত হত । তৎকালীন সময়ে সমগ্র পৃথিবীর মানুষ ভারতবর্ষে এসে তপস্যা, সংযম এবং শাস্ত্রগ্রন্থাদি অধ্যয়ন করতেন । এভাবেই বৈদিক ভাস্তুশাস্ত্র সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে । বিখ্যাত ভাস্তুবিদ ড. ভি গণপতি স্থপতি পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, ভারতের দক্ষিণ অংশ, ইজিপ্টের পিরামিড এবং মেক্সিকোর মায়ান সভ্যতার মধ্যে স্থাপত্যগত মিল পাওয়া যায় । ভাস্তু মতে যাকে ‘শিখর’ বলা হয় ইজিপ্টবাসীরা তাকে ‘পিরামিড’ বলে । পিরামিডের বিস্ময়কর স্থাপত্য মূলত ভাস্তুশাস্ত্রের একটি ক্ষুদ্র শাখা মাত্র । এছাড়া পিরামিডের অভ্যন্তরেও বৈদিক সভ্যতার অনেক নিদর্শন পাওয়া গেছে । যেমনঃ- মিশরীয়রা পূর্ণজন্ম বিশ্বাস করে । তারা বিশ্বাস করে যে, মৃত্যুর পর আত্মা পরবর্তী দেহ লাভ করে এবং পরবর্তী দেহ লাভ না করা পর্যন্ত সে আত্মার সুরক্ষাকল্পে তারা ‘মমি’র সন্নিকটে খাদ্যদ্রব্য রেখে দেয় । এছাড়া মিশরে ৩০০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দেরও প্রাচীন পিরামিডে খনন কার্য সমাপনের সময় ভগবদগীতা শ্লোক সমন্বিত প্যাপিরাস পাতা আবিষ্কৃত হয় । শ্লোকটি ছিল “বাসাংসি জীর্ণানি যথা…..” অর্থাৎ কেউ যখন জীর্ণ বস্ত্র ত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করে তেমনি আত্মা জীর্ণ দেহ পরিত্যাগ করে । এছাড়া আরো আশ্চর্যকর ব্যাপার হচ্ছে যে, ভারতীয় ‘মসলিন’ কাপড় দ্বারা মৃত ফারাওদের দেহকে মোড়ানো হয় । এছাড়া প্রাচীন ভারতবর্ষের বৈদিক শাস্ত্রবিদগণও পিরামিড তৈরি করতে জানত । ঠিক যেমন সম্প্রতি মহেঞ্জোদারোতে বৈঞ্জানিক খননকার্য সমাপনের সময় মিশরের টেরাকোটা মমির মত অবিকল মমি আবিষ্কৃত হয় ।

পরবর্তী পোষ্টে পিরামিড সম্পর্কিত আরো চমকপ্রদ তথ্য উপস্থাপন করা হবে

http://egy-king.blogspot.com/…/egypt-and-vedic-civilization…
http://www.indiadivine.org/…/42473-vedic-founders-egypt-pic…

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা স্কুল's photo.

মায়ান সভ্যতা কি ময়দানবের তৈরি ?

উত্তর আমেরিকা মহাদেশের পেরু এবং মেক্সিকোর উপকূলে অবস্থিত আছে এক আশ্চর্যকর প্রাচীন সভ্যতা । কয়েক শতক ধরে বিজ্ঞানীদের নানা গবেষণাকর্ম সম্পাদন করা সত্ত্বেও এই পৌরণিক সভ্যতার রহস্যের জাল ভেদে করা সম্ভব হয়নি । বর্তমান এটি একটি পৃথিবীর বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে । এখনো পর্যন্ত এই স্থানে অবস্থিত পিরামিডগুলো পর্যটকদের বিনোদন দান করলেও বিজ্ঞানীদের মাথার চুল হরণ হচ্ছে এর চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে । মেক্সিকোর উপকূলে এই বিখ্যাত সভ্যতার নাম “মায়ান সভ্যতা ।” মায়ান সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল তখনই, যে সময়ে বিজ্ঞানী সমাজের ধারণা মতে একের পর এক বানর সমাজ থেকে মানুষের উদ্ভব হচ্ছিল । এটি বিজ্ঞানীদের কাছে ধাঁধার মত বিষয় ।
মিসরীয় পিরামিড ও মায়ান পিরামিডের মধ্যে স্থাপত্যগত মিল পাওয়া যায় । যেমনঃ- উভয়ের চারকোণা, সকীর্ণ শিখর এবং বিস্তৃত ভূমি রয়েছে । কিন্তু তাঁদের মধ্যে একটি পার্থক্য হল মায়ান পিরামিডগুলো আসলে মন্দির বা উপসনালয় ছিল । অন্যদিকে মিসরীয় পিরামিডগুলো হল সমাধি স্তম্ভ ।

“চিচেন ইটা” নামক স্থানটি ছিল মায়ান বা ময়রাজ্যের রাজধানী । এখানে নির্মিত স্থাপত্যগুলো কমপক্ষে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৩৫ বা ৪৫৫ সালের । এই স্থানটি নতুন সপ্ত আশ্চর্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে । এখানে সবচেয়ে অপূর্ব দর্শনীয় পিরামিড হচ্ছে “কুলকোন পিরামিড” । এই কুলকোন পিরামিডের আশ্চর্যকর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, ঠিক দুপুর ৩টায় যখন এই পিরামিডের শিখরে রোদ পড়ে তখন আলো ছায়ার সংমিশ্রনে এক অপূর্ব পাখি আকৃতির দেহ তৈরির দৃশ্যের অবতারণা ঘটে । মায়ানরা এই পাখিকে ভগবানের সেবক রূপে দর্শন করে (বৈদিক সভ্যতায় ভগবান বিষ্ণুর সেবক গড়ুর পাখি) ।

রেইন ফরেস্ট এর অভ্যন্তরে মায়ান সভ্যতার নিদর্শন আরেকটি স্থান হচ্ছে “কোবা” । এই স্থানের আশ্চর্যকর নিদর্শন হচ্ছে “মুল” মন্দির এছাড়া এখানে ‘ক্যানোট’ নামক প্রাকৃতিক কুয়া দর্শনীয় । এখন প্রশ্ন হল উত্তর আমেরিকা এই সকল পিরামিড কি বৈদিক সভ্যতার আলোকে তৈরি ? এ প্রশ্নের সমাধানের উদ্দেশ্য বিশ্ব পরিভ্রমনে বের হন ভারতীয় বিখ্যাত আর্কিটেক্ট ডঃ ভি. গণপতি স্থপতি । ১৯৯৫ সালে বসন্তে তিনি উত্তর আমেরিকার মেক্সিকো এবং পেরু পরিদর্শন করেন । এর পূর্বে তিনি প্রাচীন বৈদিক এবং তামিল স্থাপত্য বিষয়ক শাস্ত্র গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন । তিনি শাস্ত্র গবেষণা করে জানতে পারেন যে, প্রাচীন ভারতবর্ষ এবং প্রাচীন আমেরিকা মহাদেশের মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে । ঠিক যেমন বর্তমানে হয়তো অনেকেই জানেন যে, বিখ্যাত নাবিক কলম্বাস প্রথম আমেরিকা আবিষ্কার করেন নি । তা যদি হত তবে ভারতীয়
বৈদিক সভ্যতা আমেরিকাতে প্রবেশ লাভ করে কিভাবে ?

ডঃ গণপতি প্রথমে পেরুতে হাজার বছরের প্রাচীন শিব মন্দিরের অস্তিত্ব আবিষ্কার করেন । তিনি মায়ান পিরামিড পরিদর্শন করেন । তিনি দেখেন যে, এই পিরামিড কিংবা অন্যান্য স্থাপত্যগুলোর সাথে উত্তর ভারতের বৈদিক স্থাপত্যের শুধুমাত্র কাঠামোগত মিলই নয় বরং জ্যামিতিক ভাস্তু পুরুষমন্ডলেরও আশ্চর্যকর মিল রয়েছে । এছাড়া তিনি ইন্ডিয়ান মন্দিরের শিখর এবং মায়ান পিরামিড শিখরের মধ্যে তাত্ত্বিক মিল পেয়েছেন । যেমন উভয়ের শিখরের দৈর্ঘ্য ৮×৮ বর্গফুট । এছাড়া গবেষণায় আরও একটি আশ্চর্যকর তথ্য পাওয়া গেছে । মূলত পেরুর, মেক্সিকোর কুলকু নামক এলাকার সকল স্থাপত্য এবং পিরামিড মূলত, ‘বসতি’ নামক বৈদিক স্থাপত্য শাস্ত্রের আলোকে নির্মিত হয়েছে । জমির মাপ, দরজা ও জানালার দিকে, ছাদের অবস্থান সহ সম্পূর্ণ স্থাপত্যের প্রতিটি কলাম ও ইঞ্চি পরিমাণ জায়গা ব্যবহৃত হয়েছে সম্পূর্ণ ময়দদানব লিখিত ‘বসতি’ নামক শাস্ত্রানুসারে, যে সকল সূত্র বর্তমান ভারতের ৬০ শতাংশ ঘরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে ।

অমল পুরাণ শ্রীমদভাগবতমে এই ময়দানবের বর্ণনা দেওয়া আছে । তিনি ছিলেন স্থাপত্যবিদ্যা, যন্ত্রবিদ্যাসহ আরো নানা বিদ্যায় পারদর্শী । এছাড়া শ্রীমদ্ভাগবত হতে আরো জানা যায় যে, ময়দানবের নিবাসস্থল হচ্ছে সুতল নামক গ্রহ, কিন্তু তিনি একসময় পৃথিবীতে আসেন । ময়দানবের বহু বৈদিক স্থাপত্য পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা জুড়ে রয়েছে । এখন প্রশ্ন হল ময়দানব কি উত্তর আমেরিকা ভ্রমণ করেছিলেন ? পৌরাণিক শাস্ত্র মতে কমপক্ষে ৮০০০ বছর পূর্বে পৃথিবী গ্রহের উপর ময়দানবের প্রভাব ছিল অসীম ।

ময়দানবের আশ্চর্য শক্তিমত্তা ও জ্ঞান । তিনি স্থাপত্যবিদ্যা নিয়ে কয়েকটি শাস্ত্র লিখেন এবং স্থাপত্য নির্মানে মগ্ন হন । ধারণা করা হয় যে, তিনি পরবর্তীতে বর্তমান আমেরিকার পূর্ব উপকূলে বৈদিক স্থাপত্য নির্মান করে মায়ান সভ্যতার বিকাশ শুরু করেন । মূলত, ময়দানব থেকে ‘ময়া’ বা মায়ান সভ্যতার উৎপত্তি বলে ধারণা করা হয় । তবে এই তথ্যের পেছনে শক্তিশালী যুক্তি রয়েছে । যেমন – বহু মায়ান ও বৈদিক শব্দের মধ্যে মিল পাওয়া গেছে । ময়া শব্দ ‘কুলটালিনী’ বলতে স্বর্গীয় শক্তিকে বোঝায় ঠিক সংস্কৃত শব্দ ‘কুন্ডলিনী’ বলতে জীবনের শক্তি বা চেতনার শক্তিকে বোঝায় । এছাড়া সংস্কৃত শব্দ ‘যোগ’; ময়া সভ্যতায় ‘যোগহ’ । ভাস্তু মতে, বর্গাকার গ্রীড কে বলা হয় মনডুকা মন্ডল । যে কোন বৈদিক স্থাপত্যের কেন্দ্রে অবস্থিত চতুবর্গাকার স্থানকে ‘ব্রহ্মস্থান’ বলা হয় । এই অংশে এমন আশ্চর্যকর শক্তি থাকে যে, এই স্থানে কোন মানুষের পক্ষে থাকা সম্ভব হয় না । এই স্থানে মূলত ভগবানের বিগ্রহ অধিষ্ঠিত থাকে । মায়ানরা এই স্থানকে ‘চিলামবুরাম’ বলে যার অর্থ পবিত্র কক্ষ । মায়ান রুমগুলো বর্গাকৃতির এবং সম্পূর্ণ ‘বসতি’ মতে নির্মিত ।

পিরামিড সত্যিই এক আশ্চর্যকর স্থাপত্য যা হাজার হাজার বছর পূর্বে নির্মিত হয়েছিল । কিন্তু বর্তমানেও পিরামিডের প্রয়োগ বিভিন্ন ক্ষেত্রে হচ্ছে যেহেতু এটির মহাজাগতিক শক্তি রয়েছে । প্রাচীন বৈদিক শাস্ত্রকারগণ পিরামিডের আশ্চর্যময় শক্তি সম্পর্কে ধারণা ছিল এবং তারা বিভিন্ন যন্ত্র তৈরিতে পিরামিডের ধারণা ব্যবহার করত । যেমন – বর্তানেও ভারতের প্রায় ঘরে পিরামিড আকৃতির ‘শ্রীযন্ত্র’ ব্যবহার করা হয় । এছাড়া পিরামিডের শক্তি ভাস্তু, জ্যোতিষতত্ত্ব, রং থেরাপি, মেডিটেশন সহ আরো অনেক ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে । এছাড়া মিশর বা মেক্সিকো ছাড়াও হিমালয় সহ পৃথিবীর আরো ৪০ টি স্থানে পিরামিড রয়েছে । পিরামিডের আশ্চর্যকর গুণাবলী সম্বন্ধে বহু গবেষণা হয়েছে । যেমন ফ্রান্সের গবেষক ড. বোবসি গবেষণায় আবিষ্কার করেছেন যে, যে কোন স্থাপত্যের চেয়ে পিরামিড ও ভাস্তুশাস্ত্র সম্বলিত স্থাপত্যে; খাবার, ফুল-ফল অধিক সতেজ থাকে । এছাড়া পিরামিড আকৃতির গৃহে খাবার জল ও খাবার তাড়াতাড়ি হজম হয় এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত হয় । এছাড়া আধ্যাত্মিক উন্নতির ক্ষেত্রেও পিরামিড কিংবা ভাস্তু স্থাপত্য অধিক ফলপ্রসু ।

উপরোক্ত আলোচনায় জানা গেল যে, পিরামিড মূলত বৈদিক ভাস্তু স্থাপত্য এবং এটির মূল কেন্দ্র হচ্ছে বৈদিক সভ্যতা । সুতরাং এ আলোচনা থেকে আমরা আরো বুঝতে পারি যে, বৈদিক সভ্যতা এবং বৈদিক শাস্ত্র কতটা উন্নত ও ব্যবহারিক ।